জুনায়েদ খান প্রান্ত এর এক গুচ্ছ কবিতা।

1.মণিকোঠা
জুনায়েদ খান প্রান্ত
——————————
চোখের মণিকোঠার কোণের দিকে দেখিয়ে,
তুমি হাস খিলখিল করিয়া না বুঝে!
দেখিয়াছি নিজের প্রাণ চাহিয়া উল্লাসে,
নিশি রাতদিন কাটে সাবধানে সর্বাঙ্গ জুড়িয়া।
আপনপর ভুলিয়া দক্ষিণপবনভরে পরিহাস,
আমি তাই লাজে যাই মরিয়া স্রোতশ্রীনি ধারাতে।
পুলকব্যাকুল হিয়া অঙ্গ জুড়ে ওঠে যে শিহরিয়া,
সতত রাখিতে আর পারিনা ধরিয়া রুদ্ধশ্বাসে।
আমার অন্তরদামী চেতনা জাগে অবেলাতে,
কেন যেন লেখা আসেনা ভিতর থেকে?
নাকি অসময়ের শব্দভেলা রয়েছে থমকিয়া?
আঁধারের আলোতে বদ্ধ ঘরে বসিয়া সংগোপনে
রদ্ধ হবে যখন শ্বাস অর্ধেক জানালা খুলিয়া,
অফুরন্ত জীবনীশক্তি নিবো আহরণ করিয়া।
সূর্য রশ্মির ছোঁয়াতে সমীকরণ গুলো যায় গুলিয়ে,
বসি গিয়ে বাতায়নে স্বপ্ন ডোর রোদ্দুরে ঝলমলে আলোতে।
ক্ষণতরে পুষ্প বাসর সাজিয়ে বক্ষ পিঞ্জরে,
অঙ্গখানি নবযৌবনকে ভালোবেসে হেনকালে।
পুষ্পের গন্ধ ভাসে খোলা-আকাশে স্বপ্ন বলে,
কিছুই আর থাকেনা তো স্মৃতির নীতিতে।
এমনি করে সকলবেলা ধরনীতে চঞ্চল খেলা,
নবীন শির যায় লুটিয়ে কোনো একদৃশ্যপটে।
হৃদয় প্রাণ সকল কিছু করিবো দান মুক্ত প্রাঙ্গনে,
শুধু রাখবো শরমখানি নিজহাতে সযত্নে মুড়িয়ে।
আঁখি জোড়া মেলে দেখেছ কী ধরনী অন্তরালে?
নাকি মণিকোঠা এখনো রেখেছ বন্ধ অন্ধকারে।

 

 

 

2.দুর্বল দুরাশা

জুনায়েদ খান প্রান্ত

—————————-

হৃদয়ের এ কেমন দুর্বল দুরাশা,

অভিশপ্ত দেহে প্রেতাত্মার পিপাসা।

সাধের বস্তুর মাঝে ও রহিয়াছে উতলা,

চাই আরও চাই এই মনের কামনা-বাসনা।

 

সলিলসমাধি রয়েছে শুধু নেই দেহখানা,

নিষ্ফল হয়েছে ভাবাবেগ মত্তলোকের আশা।

চরণ দুখানা নির্বিত্তে ফুলের শৃঙ্খল সাজিয়ে,

বিশ্বদর্শনে চিত্রপট যেন তুলির আঁচড়ে আঁকা।

 

পথের কাছে বসে কেবলই দূরে তাকিয়ে থাকা,

সকলি হয়েছে নিস্ফল নিরাশা জীবন দুরাশা।

মানবজীবন নিয়ে একান্তভাবেই থাকে জড়তা,

কাটেনি তো তার কিছুই কাটেনি নিছক আবছায়া।

 

কোথায় রহিয়াছে জীবন সংসারের রহস্য?

অন্বেষণ ভূমি নিজের অস্তিমজ্জায় চিন্তাধারা।

মহত্ত্বের আশার মাঝে কাঁটে নিতো নিরাশা,

কোথায় দিবো ঝাঁপ কাটেনাতো জড়ত্ব নির্বুদ্ধিতা।

 

 

3.

কে তুমি অপরিচিতা
জুনায়েদ খান প্রান্ত
================
তুমি এসেছিলে কোনো এক বসন্ত বিকেলে।
রাস্তার মোড়ে রেললাইনের পাশে।
তাকিয়ে ছিলে আমার দিকে।
কাজল কালো আখিঁ জোড়া মেলে।

আমি বুঝতে পারিনি ঐ ছাউনি।
বুঝতে পারিনি তাকানোর মানে কী?
তবে নিস্তব্ধতার মাঝে কী যেন শুনতে পেয়েছিলাম।
পেয়েছিলাম শুনতে তোমার পদধ্বনি নীরবে।

লোক সমাগমের হাঁক ডাকের কারণে,
বুঝেছিলাম তোমার ওভাবে তাকানোর মানে।
আমি হেঁটে চলে গিয়েছিলাম নিজের কাজে।
একবারও তোমার দিকে না তাকিয়ে।

আমি জানিনা কে তুমি অপরিচিতা?
আমি জানিনা তোমার পরিচয় কী?
জানিনা কেন এসে দাঁড়িয়ে ছিলে আমার জন্য?
জানিনা আবার দেখা হবে কিনা?

যেটুকু দেখেছিলাম মন কেড়ে নিয়ে ছিলে তুমি।
কোনো এক ঝরে উতালপাতাল করে গেছে হ্নদয়।
কাঁপুনি উঠেছিলো বুকের বামপাশের হ্নৎপিন্ডে।
প্রতি স্পন্দনে শিউরে উঠছিলাম অজানা সুখে।

নাম না-জানা অপরিচিতা বুঝতে পারিনি,
তোমাতে আমাতে দেখা হবে এভাবে।
কোনো এক হাস্যজ্জল দিনে পড়ন্ত বিকেলে ।
আবার যদি একসাথে দেখা হয় অন্য কোনো বসন্তে,
তোমাকে সাজিয়ে দিবো রামধনুর সাতরঙা সাঁজে।

 

4.অপরিচিতা তুমি

জুনায়েদ খান প্রান্ত

================

আকস্মিক ভাবে জানা ভয়ের সূচনা ঘটে,

মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিল হঠাৎ করে।

তাই চলে গিয়েছিলাম তোমার থেকে একটি দূরে,

আবার এসেছি ফিরে তোমার চিরচেনা প্রান্তের দ্বারে।

 

দেখা হয়েছিল কোনো এক বসন্ত বিকালে,

গ্রীষ্মের দাবদাহের মাঝে এসেছি ফিরে।

লাল টি-শার্ট আর তোমার ধূসর বোরকার সাথে,

মিলিয়ে নিবো দুটি মন এক করে অবেলাতে।

 

যদিও আগের মতো লোকজন চোখে পড়েনা,

এখন আর রেললাইনের পাশে রাস্তার মোড়ে।

তবুও জায়গাখানা আছে আগের মতো,

সবি আছে অপরিচিতা তুমি ছাড়া এই পথে।

 

এখনো হয়নি জানা তোমার নামখানা,

ঠিক জেনে নিবো সময় হলে তোমার কাছ থেকে।

তুমি কী আসবেনা আরেকটি বার আমার কাছে?

সেই অপেক্ষায় প্রহর কাটে ধূসর হয়ে দিনগুলোতে।

 

এ সময়ে একাকিত্বের মাঝে ভাবছি বসে তোমাকে,

সংশয় বাড়ে মনের কিনারা জুড়ে আকাশে।

না জানি হারাও নিমিষে স্রোতের টানে,

কতসব প্রশ্ন জাগে মনের গহীন কোণে?

 

 

5.

অবগুন্ঠিত হৃদয়
জুনায়েদ খান প্রান্ত
——————————-
অবগুন্ঠিত কুন্ঠিত জীবনের মাঝে ,
বিড়ম্বনা বাড়ে তোমার কাছে এসেও না আসাতে।
হৃদয়দল বাহিরভূবনে দরজা খুলিয়া,
অপেক্ষায় আছি তোমার আবার ফিরে আসাতে।
সংগীত মুখরিত ভুবনে ধ্বনি বাজে বুক পিঞ্জরে,
আজি জাগ্রত দ্বারে তোমায় খুঁজি চেনা পথে।
নিবিড় বেদনার পৃথিবীতে মুখরিত লোকজন,
আপনপর ভুলিয়া হাসিমুখ খানা দেখাতে।
সৌরভবিহল রজনী ফুঁটে দ্বারে দ্বারে,
ফুলের গন্ধের মাধুরী বিছিয়ে।

দূর আকাশের নিচে আজও পথ চেয়ে আছি,
আহ্বানের বার্তা নিয়ে অপরিচিতার ফেরাতে।
ব্যকুল বসুন্ধরা কবে সাজবে নতুন করে,
দখিনা বাতাসের সাথে পল্লবে পল্লবে৷
রৌদ্র ছায়ার খেলাতে মুষ্টিবদ্ধ করি তোমাকে,
এরি মাঝে হাসি গাই আপন মনে।
সারাক্ষণ নয়ন জোড়া মেলে রবো দাঁড়িয়ে,
কখন পাবো দেখা তোমার কোন সে শুভক্ষণে।
জীবনের বহে যত অশান্তির ছায়া,
তুমি এসে কাটিয়ে দিবে প্রেমের মায়াতে।

 

 

6.শূন্যতায় ভাসি

জুনায়েদ খান প্রান্ত

=============

ভালোবাসা ভালো লাগা হারিয়ে ফেলেছি।

আমি ভাসি শূন্যতায় ভর করে।

আজ আমরা বাঁচি,আমরা হাসি।

শূন্য তাকে ঘিরে।

 

হয়তোবা দূর গগন তলে,

কিংবা সমুদ্রের অতুল গভীরতায়।

আমি আছি আমার মতো,

আমি আছি গভীর স্তব্ধতায়।

 

আমি হাসি আমি বাঁচি,

নিজের মতো।

 

নিজেকে দেখি, নিজেকে জানি।

নিজের মতো করে।

নিজেকে খুঁজে ফিরি,

অচেনা অজানা জায়গায়।

 

খুঁজে ভের করতে চাই,

নিজের মধ্যে থাকা মনুষ্যত্বকে।

বিলিয়ে দিতে চাই,

নিজের মানবতাকে।

 

আঁকড়ে ধরতে চাই,

নিজের শিকড়কে।

ঘুরে দেখতে চাই,

জগতের মাঝে লুকিয়ে থাকা অমানুষিকতাকে।

 

জাগ্রত করতে চাই,

মানুষের বিবেক কে।

দেখাতে চাই মানবতাকে।

 

যদি মানবতাকে জাগ্রত করতে না পারি,

তবে হারিয়ে যেতে চাই শূন্যতারি মাঝে।

 

 

7.

সন্দেহ
জুনায়েদ খান প্রান্ত
===========
মনের বাহুডোরে আজ নব্যতার সাথে,
আমি নই সব্য তোমার পৃথিবীতে।
ভদ্র হয়েও অভদ্র আমি যখন সবার কাছে,
কথা বলি হাসিমুখে উজ্জীবিত ধরণীর তলে।
কথা যখন হবে তোমাতে আমাতে,
সব কুয়াশা কাটবে আশা করি অচিরে।
আধুনিক রীতিটাকেই মেনে মাঝে মাঝে,
কাপড়চোপড়ে বখাটে ভাবে লোকজনে।
কথা যখন বলি লোকসমাগমে,
সন্দেহ যায় চুকে সবার মন থেকে।

এররও রক্ষা মেলেনা শেষে মিথ্যার কাছে,
জলাঞ্জলি দিতে হয় মানসম্মত রাস্তাঘাটে।
সব হিসাব নিকাশ কষে অত্মসম্মানের ভয়ে,
মাথা উঁচু করে, চুপ করে চলে আসি নীরে।
মনস্থির করি নির্জনে বস্তু অবস্তুর ভিড়ে,
ডাইরি পাতাখানা পড়ে থাকে এককোণে।
তবুও গল্প সাজায় তোমাকে নিয়ে,
রামধনুর সাতরঙা সাঁজে নতুন সূচকের মাঝে।
অদ্ভুত এই ধরনীর বুকে বিচিত্র দৃশ্যের সাথে,
প্রায়শই দেখা মিলে চেনা অচেনা প্রান্তের কাছে।

 

8.

পথ ফেরা
জুনায়েদ খান প্রান্ত
——————–
আজও হাতরে বেড়ায় তুকে,
চেনা অচেনা গলির ফাঁকে।
দিন যায় রাত আসে হৃদয়ে গহীন কোণে ,
আলোছায়া নিয়ে খেলো তুমি কোন সে সমুদ্ররে।

আমি হাসি আমি বাঁচি তোমার স্মৃতি বুকে নিয়ে,
দেখনা বসে আছি আজও তোমার পথ ফেরা নিয়ে।

তুমিও কী খুঁজ আমায় সময়ের স্রোতের সাথে,
নাকি হারিয়ে গেছো তুমি কোনো এক সীমানার কাছে?
তবুও প্রহর গুনি স্বপ্ন দেখি তোমাকে ঘিরে,
এখনো রঙ সাজায় রঙ মাখায় তোমায় কল্পনাতে।

আমি হাসি আমি বাঁচি তোমার স্মৃতি বুকে নিয়ে,
দেখনা বসে আছি আজও তোমার পথ ফেরা নিয়ে।

তুমি কী আসবেনা ফিরে?
জড়াবে না আমায় বাহুডোরে।
নাকি একাকিত্বার সাথে করবো বন্ধন,
তোমার পথ চেয়ে দিগন্তের কাছে বসে লাল সূর্য দেখে।

আমি হাসি আমি বাঁচি তোমার স্মৃতি বুকে নিয়ে,
দেখনা বসে আছি আজও তোমার পথ ফেরা নিয়ে।

 

 

 

9.

স্মৃতি স্মারক
জুনায়েদ খান প্রান্ত
————————-
বহু আকাঙ্ক্ষিত এই মূহুর্তে ,
দাঁড়িয়ে আছি পথের মাঝখানে।
ক্লান্ত, ভ্রান্ত হয়ে ক্ষিপ্ত আমি,
সন্ধানপর্বের দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

তবুও মুগ্ধ আমি এই পথে হাঁটতে গিয়ে,
নির্নিমেষ জ্যোৎস্না আলো ছড়িয়েছি চারদিকে।
নিদ্রার মাঝে শিহরিত হৃদয় জেগে ওঠে,
হাসি,ব্যথা,স্মৃতি অবশিষ্ট যা আছে প্রাণে।

একদিন হয়তো বিদায় নিবো,
এই ধূসর প্রান্তের কাছ থেকে চিরতরে।
কোনো এক অচেনা অজানা দেশে বিস্ময় জাগিয়ে,
জানিনা থাকবো কিনা মানবের মনে স্মৃতি হয়ে?

 

10.

শূন্য হৃদয়সভা
জুনায়েদ খান প্রান্ত
—————————
কোথায় রহিয়াছে সেই দীপ শিখা,
তাহলে কী সেথায় অন্বেষণ ভ্রমি লিখা।
কোথায় গেলে পাবো আলোর দেখা,
বিরহানলে জ্বলছে দ্বিগুণ হারে প্রদীপ শিখা।
ডাকছি তোরে প্রেমাভিসারে গগনবিহারীতে,
বেদনাদূত গাহিয়াছে গান নিশীথ অন্ধকারে।
নিবিড়রতর তিমির চোখ দুখানা উঠছে জলজল করে।
দৃষ্টি অগোচরে তাকিয়ে শুধু তোকেই খোঁজা।
দিচ্ছে হাওয়া গাছের ডাল-পালা জুড়ে,
সে সাথে বাউল গানের সুরে টানছি পথখানা।

শূন্য হৃদয়সভা জুড়িয়া আছে হাহাকার,
কবে তুলবে তুমি ঝংকার এই পথের মাঝে?
জীবন প্রাণে সহজ হবে চলাচল নির্জনে,
আপন করে তোমার নাম দরে তুলবো ধ্বনি।
এভাবেই মানিয়ে নিবো মুহুর্তগুলো একসাথে,
আপন করে হিয়ার নিকুঞ্জ পথে যাবো তুষি।
তোমার অরুণকিরণ রূপে পরিপূর্ণতায় সাঁজে,
নীরব পাঠকদের মন ভরে ওঠে জীবন সন্ধিক্ষণে।
আজি এ ক্ষণে ক্ষণে ভেসে যেতে চায় মন,
সবকিছু ফেলে ছিন্ন মেঘের আবরণে সুপ্ত নদীর তীরে।

11.

অপেক্ষায় রইলাম
জুনায়েদ খান প্রান্ত
================
আমার সমস্থ ভাবনা গুলোকে একত্রে করে,
শহরের রাস্তাগুলোতে হাঁটতে গিয়ে উপলব্ধি বাড়ে।
আত্মাকে স্পর্শ করে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে,
নিমজ্জিত হয়ে বোধশক্তি গভীর প্রাণে।

চিরচেনা গলির মোড়ে কিংবা হাটবাজারে,
লোকজনদের আনাগোনা বড্ড কম চোখে পড়ে।
আমার সমস্ত বোধ নতুন করে আবিষ্কার করি,
স্মৃতিবিজড়িত পুরাতন দিনগুলো ভেবে।

চেনা শব্দটি ক্রমাগত উচ্চারিত হয় আজ,
মনে মনে জানিনা কেনই বা মোহের মত করে,
শব্দটি বারবার ফিরে আসে অজানা মন্ত্রের মাঝে।
বুকের ভিতর আঁকড়ে ছিল যন্ত্রণাক্ত মন্ত্রটি যে।

মুগ্ধমূর্খচোখে ব্যর্থ ব্যক্তিদের মতো করে,
তাকিয়ে দেখি হঠাৎ ঝড়ে ধ্বংসাত্মক শহরটির দিকে।
যেন শূণ্যতায় বিরাজ করে আজ প্রতিটি প্রাণে,
জানা ভয়ে কোনঠাসা হয়ে আছে সবাই বাসাবাড়িতে।

অপেক্ষায় রইলাম জীবিত মৃতের এই খেলাকে নিয়ে,
ঝাপিয়ে আসবে একদিন ঠিকই জয়ধ্বনি সবার মাঝে।
আসবে আবার ফিরে রৌদ্রজ্জল দিন হাসিমুখে,
সবাই একসাথে এগিয়ে নিতে নড়বড়ে দেশটাকে।

 

 

 

12.স্মৃতি কাতরতা

জুনায়েদ খান প্রান্ত

============

আজও মনে পরে সেদিনের কথা,

মমতাময়ী কন্ঠে যখন ডাকতো দাদু আমাকে।

আমিও যেতাম ছুটে এক দৌড়ে তার কাছে।

যখনি যেতাম তার কাছাকাছি,

স্নেহ বন্ধনে জড়িয়া ধরতেন আমার গাঁ খানি।

কারণে অকারণে মা যখন বকতো আমাকে,

দাদুর কোলে গিয়ে মুখ লোকাতাম,

ধূসররঙের কাপড়ের নিচে।

তিনি যখন খেতে বসতেন থালা নিয়ে,

আদুরী বিড়ালছানা বসতো তার পাশ ঘিরে।

মেও মেও শব্দে মুখরিত করতো,

পুরোটা ঘরের আনাচে কানাচে।

দাদুও তাকে খাওয়াতেন মন-প্রাণ উজাড় করে।

যখনি আসতো শীতের হিমেল হাওয়া।

তার সাথে আকড়ে রাখতেন বিড়ালটিকে,

শিমুল তুলার তৈরি লেপের আবরণ দিয়ে।

যখন যেতাম দাদুর কাছাকাছি,

বিড়ালটি ও আমার কাছে আসতো অনায়াসে।

যখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে,

আমার মনের মাঝখানে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে।

আমিও বসে থাকি মন খারাপ করে।

এভাবেই যখন কাটছিলো সাতদিন,

হঠাৎই শুনলাম সকালবেলা ,

দাদু আর নেই এ দুনিয়াতে।

কান্নায় ভারি হয়ে উঠলো পরিবেশ।

আমিও পাশে আনমনে দাঁড়িয়ে,

চোখ থেকে পানি পড়ছিল গড়িয়ে নিজের অজান্তে।

কিছুক্ষন পরে জড়হলো সবলোকজন আমাদের বাড়িতে।

ঘর থেকে বের করে রাখে নিথর দেহটা আমগাছটার নিছে।

কেউবা ছুটাছুটি করে, বড়োই পাতার গরম জল করবে বলে।

চালতা গাছের নিছে আয়োজন করে,

দাদুকে শেষ স্নান করাবে বলে।

স্নান করানো শেষ হলে,

মসজিদ থেকে আনা খাটিয়াতে রাখে সযতনে,

তাকে সাজাতে থাকে সাদা কাপড় আর সুরমা দিয়ে।

আমিও চেয়ে দেখি শেষবারের মতো অপলক দৃষ্টিতে।

যখন নিয়ে যাবে তাকে আপন বাড়িছাড়ি,

শেষবারের মতন মাতুন ওঠে পুরোটা বাড়ি জুড়ে।

জানাজা শেষে তাকে রেখে আসি না ফেরার দেশে,

কবরে শুয়েদেয় পরম আবেশে।

দাদুর সাথে অদৃশ্য হয়ে যায় বিড়ালটিও,

আমি তাকে খুঁজি সারাটাক্ষন জুড়ে।

খু্ঁজে নাহি পাই,উতলা হয়ে ওঠে মনখানি।

হঠাৎ একদিন দেখি,

দাদু যেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল।

বিড়ালটার নিথর দেহখানা সেখানে পড়ে আছে।

আমি ভাবতে থাকি, এ বুঝি মায়ার টান।

এ বুঝি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি প্রাণীর।

এ ভালোবাসা মানুষের প্রতি মানুষের কখনো দেখা যায় না।

ভাইয়া নিয়ে মাটি চাপা দেয় বিড়ালটি।

তারপর কেটে যায় কত বছর।

যখনি আসি বাড়িতে,

দাদুকে খোঁজেফিরি কল্পলোকে।

তার আছে যতসব স্মৃতি রেখা,

মনের মাঝে আড়াল করে রাখি সযত্নে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *