নাইয়ার মাসুদের গল্প : ধূলোর শহর

নাইয়ার মাসুদের গল্প : ধূলোর শহর

উর্দু থেকে ইংরেজি অনুবাদ : মহম্মদ উমর মেনন

বাংলা রূপান্তর :  দোলা সেন

সামনের ঝোপে একটা খচমচ আওয়াজ উঠল। আমি আতঙ্কে পাথর হয়ে গেলাম। আবার ঝোপটা নড়ল! নির্ঘাত সাপ! সাপে আমার চিরকালের ভয়। একবার তো আমি সাপের কামড়ে প্রায় মরেই যাচ্ছিলাম। আর আমার মতো যে একবার অন্তত বিষধর সাপের কামড় খেয়েছে, একমাত্র সেই বুঝতে পারবে ওই পিচ্ছিল জীবটি আসলে কতোটা ভয়ানক। সে তখন সর্বত্রই সাপ দেখে বেড়াবে। ঠিক তার মতো আমিও এই শুকনো ঝোপে সাপ দেখতে পাচ্ছিলাম। এই নির্জন জায়গায় দুটো রাস্তা চলে গেছে। আমি চওড়া এবং সমতল পথটি ধরে চলছিলাম। তার দুপাশে ঝোপের সারি। আমার সন্দিহান চোখ তাদের সবার মধ্যেই একটা সাপ দেখতে পাচ্ছিল। আমি অন্য রাস্তাটার দিকে চাইলাম। পরিত্যক্ত রুক্ষ জমি চেরা পথ। কিন্তু ঝোপঝাড় কম। তার উপর যে কটা  আছে, তারাও রোগাটে, দুর্বল গোছের। আমি সেই দিকে ঘুরে গেলাম।

কিছুটা এগোবার পরে পথ আবারও দু ভাগ হয়ে গেল। একটির ধারে সবুজের সমারোহ, অপরটি ধূসর বর্ণহীন। বরাবরের মতোই আমি ন্যাড়া পথটিই বেছে নিলাম। যদিও জানি যে যেদিকে গাছপালা, চাষের জমি আছে, সেদিকেই মূল বসতি থাকার সম্ভাবনা, তবু… আরে বাবা, এই মনখারাপিয়া পথটাও তো কোথাও না কোথাও পৌঁছাবে! সেই সাপে কামড়ানোর পর থেকে আমার মনে কিছু বদ্ধমূল ভাবনার জন্ম হয়েছে। তবে আমার ধারণা, যাদের সাপে কামড়েছে, তাদের সবারই এমন কিছু না কিছু  বাতিক থাকে। এমন পথের ভাগ দেখলেই আমার মনে হয়, এই নির্জন বিষণ্ণ পথ আমায় আমার গন্তব্যে পৌঁছে দেবে … ঈশ্বরই জানেন সেটা কী… তবু সেজন্যই আমি সবসময় সবুজে সমৃদ্ধ পথ এড়িয়ে চলি।  

এতক্ষণ কারো দেখা না পেলেও এইবার একজনের দেখা পেলাম। এই রুক্ষ নির্জন পথ দিয়ে সে ক্লান্ত পায়ে নিজেকে টেনে নিয়ে চলছিল। একসময় বেচারা ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ল। তার কাছে পৌঁছাবার পর আমারও ক্লান্ত লাগছিল। তাই তার পাশেই বসে পড়লাম। কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে তার দিকে ঘুরে বসলাম – “কোথা থেকে আসা হচ্ছে?”

সে একটা শহরের নাম বলল।                       

“কি করো সেখানে?” – জানতে চাইলাম।

–       “ভিক্ষে।”- চেহারা দেখে আমিও এটাই ভাবছিলাম।

“থাকো কোথায়?”

ক্লান্তভাবে সে হাত তুলে দেখাল – “ডাস্টল্যান্ড।“  

  • “ডাস্টল্যান্ডে ভিক্ষে পাও না?”

লোকটা একদৃষ্টিতে আকাশ দেখছিল – “ পাই, তবে ধুলোর ঝড়ের সময়ে নয়। যখন ঝড় ওঠে, তখন সারা জায়গা ধুলোয় ঢেকে যায়।“

–       “ধুলোর ঝড়?” – আমি জানতে চাইলাম।

–       “সারাদিন ধরে প্রবল ঝড় চলে। সকলে তখন ঘরের ভিতরে থাকে। সন্ধেবেলায় ঝড় থামলে সবাই বেরিয়ে পড়ে। চারপাশ পরিষ্কার করে, রোজকার কাজে লেগে পড়ে। আমি সেইজন্য খুব ভোরে বাড়ি থেকে বের হই, আর রাতে ঝড় থেমে গেলে ফিরে আসি। কিন্তু আজ শহরের ভিখিরিরা ধর্মঘট ডেকেছে, তাই আমি ডাস্টল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছি।“

ডাস্টল্যান্ডে কে রাতে ভিক্ষে দেবে, কেই বা ভিক্ষে পাবে, সে বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। সেও তার ছেঁড়া ঝুলি গোছাচ্ছিল। জানতে চাইলাম – “কি রঙের ঝড়?”

আবার সে আকাশের দিকে চাইল – “মাটির রঙের। ঝড় আসছে।“

সে হাঁটা শুরু করল। আমি জিজ্ঞেস করলাম – “ডাস্টল্যান্ডে বাইরের লোকের থাকার ব্যবস্থা আছে?”

–       “বড়মহল। সেখানে যেতে চাইলে এখনই রওনা দিন।“

–       “তুমি এগোও। আমি আসছি।“

হুমম্। ও কি করে জানবে, ঝড়ের প্রতি আমার প্রবল মুগ্ধতার কথা? সে ছোট্টবেলা থেকেই ঝড় উঠলে আমায় কেউ শত চেষ্টাতেও ঘরে আটকে রাখতে পারত না। সর্বাঙ্গ দিয়ে আমি ঝড়কে অনুভব করতাম। আমার সেই শহরে, ঝড় ছিল রঙিন। কালো ঝড় – সবাই ভয় পেলেও আমার খুব প্রিয় ছিল। সে ঝড় সবকিছুকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিত। তার শুরুর দামামা বাজলে আমার কেন জানি মনে হতো, এই আঁধারে বুঝি আকাশের তারারা ঝিলমিলিয়ে উঠবে। বাড়ির লোকের শত আপত্তি সত্ত্বেও, লাল বা হলুদরঙা ঝড়ের সময়, বাইরে বেরিয়ে চারপাশের রঙ বদলে যাওয়া দেখতাম। সে সময় ঝড় যেন প্রকৃতির উপরে যেন উজ্জ্বল রঙের আবরণ বিছিয়ে দিত। একমাত্র হলুদ ঝড়ের সময় আমার একটু ভয় ভয় করতো। কারণ, আমি সেই ঝড়ের আওয়াজে, কারো গলা শুনতে পেতাম। কে জানে! হয়তো সবটাই আমার কল্পনা ছিল।

আজকাল আর রঙিন ঝড় ওঠে না। সেখানে এখন শুধুই সাধারণ ধুলোর ঝড়। তবু তার মধ্যেও আমার এলোমেলো হওয়া আটকায় না।

মরা আলোয়, ক্লান্ত পা টেনে টেনে চলতে চলতে, একসময় বেশ কিছুটা সামনে ভিখিরিকে দেখতে পেলাম। দিগন্তে ধুলোরঙা কুয়াশাও ছড়িয়ে পড়ছে।

মাটিরঙা ঝড়! আমি এর আগে কখনো দেখিনি। আমি তাকে আমার ওপর দিয়ে বয়ে যেতে দিলাম। মুহূর্তের মধ্যে আমার সারা শরীর ধুলোয় ভরে গেল। মনে হচ্ছিল কেউ যেন আমার উপর বালতি বালতি ধুলো ঢালছে! ধুলোয় ধুলোয় আলাো আরও মলিন হয়ে উঠেছে। কোনোমতে নিজেকে হিঁচড়ে এগোতে এগোতে  একটা বসতি নজরে এল। কিন্তু সে পর্যন্ত যাবার আগেই আমার পা একাধিকবার গর্তে পড়ল। প্রায় উল্টে পড়ি, আর কি! কিন্তু গর্তগুলো প্রাকৃতিক নয়। বরং ছোট ছোট কবরের মতো!

“ডাস্টল্যান্ডে কি শিশু মহামারী হয়েছিল?” – আমি নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করলাম।

রাস্তায় কেউ ছিল না। আমি একা একাই বসতির আসপাশে ঘুরতে লাগলাম। টানা পাঁচদিন ধরে ঝড় চলল। আর পুরো সময়টাই আমি একা ঝড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়ালাম। প্রতিদিন ভোরে ঝড় তীব্রবেগে আছড়ে পড়ত। দুপুর নাগাদ তার তীব্রতা কমতে কমতে, অবশেষে সন্ধ্যার মুখে পুরোপুরি থেমে যেত। পুরো জায়গাটি ততক্ষণে ধুলোয় চাপা পড়ে গেছে। ঝড় থামার পরে সব বাড়ি থেকে লোকজন বড় বড় বাঁশের আগায় বাঁধা ঝাঁটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে, ঝাঁট দিয়ে একধারে ধুলোর পাহাড় জমা করত। তারপর গাড়ি বোঝাই করে সেই ধুলো এলাকার বাইরে কোনো জায়গায় ফেলে আসত। ঝড় সে ধুলো আবার কোথায় উড়িয়ে নিয়ে ফেলত, তা ভগবানই জানেন। রাত নামার আগেই পুরো জায়গাটা পরিষ্কার হয়ে যেত। লোকজন রাস্তায় বেরিয়ে পড়ত। তখন আমি অবশ্য গ্রামের বাইরে – একাট বিরাট গাছের তলায় আমার আপাত আস্তানায়। সেখানে গা-মাথা থেকে ধুলো ঝেড়ে, কিছুটা ভদ্রস্থ হয়ে, আবার গ্রামে ঢুকে কিছু খাবার কিনে, গাছতলায় ফেরত আসতাম। পরদিন ভোরে ঝড়ের আওয়াজ শুরু হতেই সব দরজা বন্ধ হয়ে যেত। সর্বত্র তখন আমার অবাধ গতি।

ধুলোর পর্দার ভিতর দিয়েই আমি সম্পূর্ণ জায়গাটা ভালো করে দেখে নিয়েছিলাম। ছোট এলাকা, আর বাড়িগুলোও খুব পুরোনো নয়। এখানকার লোকজন সম্বন্ধে আমি কিছুই জানতে পারিনি, কারণ প্রথমদিন ভিখারি ও পরে কয়েকজন দোকানী ছাড়া আমার সঙ্গে কারোরই কথা হয়নি। তাই আমি ও এখানকার লোকজন পরস্পরের কাছে অপরিচিতই রয়ে গেছি। যেটা আমি বুঝিনি, তা হলো ঝড়ের সময়ে লোকেরা সময় কাটানোর জন্য, বন্ধ জানলার পিছনে বসে বসে রাস্তা দেখে। তাই তারা সব্বাই জানত যে বাইরে থেকে আসা একটা লোক তুমুল ঝড়ের সময় একলা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, আর গ্রামের বাইরের গাছতলায় রাত কাটায়!

ধীরে ধীরে আমার সঙ্গে অনেকের পরিচয় হলো। প্রথমদিনের সেই ভিখিরির সঙ্গে আমার প্রায়ই গল্প হয়। গ্রামের বাইরে রাত কাটানো, বিশেষতঃ এই গাছতলায় থাকার জন্য সে আমায় বকাবকি করে। এই গাছটা নাকি দুর্ভাগ্য বয়ে আনে। একজন এই গাছ থেকে পড়ে গিয়ে তার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে তার নাম বলে না। জিজ্ঞেস করলে বলে – “নিজেই একদিন জানতে পারবেন।“

সে বারবার আমাকে বড়মহলে থাকার জন্য অনুরোধ করে। সেখানে গরীব মানুষদের থাকার জন্য পয়সা লাগে না। আমি রাজি হই না। আমি তো আর গরীব নই। সেজন্যেই আমি গাছতলায় আস্তানা গেড়েছি। কিন্তু একদিন রাতে আমি গাছটাকে ভয় পেতে শুরু করলাম। ওর বাঁকা ডালগুলোকে আমার সাপ মনে হচ্ছিল। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম যে, দু দুটো সাপ গাছ থেকে আমার পাশে টুপ করে পড়ল। এর আগে কখনো সাপেরা আমার স্বপ্নে হানা দেয়নি। আমি ভয়ে ভয়ে সারা জায়গায় তল্লাশি চালালাম। বলাই বাহুল্য যে কোনো সাপ দেখতে পাইনি। তবু সাপে কামড়ানো মানুষদের মতো, আমারও মনে হতে লাগলো গাছের কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই সাপ আছে। আর আমি যে তাদের নাগালের মধ্যেই আছি – এই ভাবনা আমার দুর্বল মস্তিস্ককে কণামাত্র বিরতি দিল না।

পরদিন আমার পোটলাপুটলি গুছিয়ে অন্য গ্রামের রাস্তার খোঁজ করলাম। আমার পরিচিত ভিখিরির খোঁজও করলাম। কিন্তু যেখানে সে ভিক্ষে করতে বসে, সেখানে সে নেই। একে ওকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে সে বেশ কয়েকদিন ধরে অসুস্থ হয়ে বড়মহলে শুয়ে আছে। সবাই দেখি বড়মহলের ঠিকানা জানে! আমি সেখানে গেলাম। অনেকখানি জায়গা জুড়ে বেশ সুন্দর ঝকঝকে বাড়ি। তাতে অনেক ছোট ছোট ঘর। তারই একটাতে সে তার ছেঁড়া কাঁথা জড়িয়ে শুয়ে আছে। চারপাশের ফিটফাট পরিচ্ছন্নতার মধ্যে বেশ দৃষ্টিকটু। আমায় দেখে সে উঠবার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। আমিও তাকে শুয়ে থাকতেই বললাম। তার চিকিৎসার কি হয়েছে জানতে চাওয়ায় সে বলল – ডাক্তার সাহেব প্রতি তিনদিন পর পর আসেন। আগামীকাল ওঁর আসার কথা।“

এরপর সে তার রোগের বিস্তারিত বর্ণনা শুরু করল। সাধারণ জ্বর, এমনিতেই দু তিনদিনে সেরে যেত, কিন্তু সে এটাকে খুবই গুরুতর ভাবছে। যাই হোক বকতে বকতে সে একসময় আমার খবর জানতে চাইল। আমি তাকে বললাম যে.  “আমি আর ওই গাছতলা বা এই দাতব্যগৃহে থাকব না। তুমি যেখানে ভিক্ষে করতে যাও সেখানে কি থাকার জায়গা পাওয়া যাবে?”

–       “কিন্তু ওখানকার লোকজন দয়ালু নয়। আমি নেহাত পেটের দায়ে ভিক্ষা করতে যাই। কিন্তু এই বড়মহল কী দোষ করল?”

সত্যি বলতে কি, বড়মহলের ব্যবস্থা বেশ ভালো। কিন্তু আমার এখানে থাকার ইচ্ছে নেই। কিভাবে আমার কথাটাকে যুক্তিপূর্ণভাবে বলব, সেটা ভাবতে ভাবতেই ঘরের বাইরে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। ভিখিরি আবার ওঠার চেষ্টা করল – “আরে! ডাক্তার সাহেব আজই এসেছেন!”

এর মধ্যেই ডাক্তারবাবু এবং আরেকজন ভদ্রলোক ঘরের ভিতরে এসেছেন।ভদ্রলোকটি বললেন – “ কী ব্যাপার সর্দার, এতদিন ধরে ভুগছ, একটা খবর দাওনি কেন?”

–       “হুজুর, ডাক্তারসাহেবের কালকে আসার কথা ছিল…”

–       “সে কি? তুমি জানো না যে, কারো শরীর খারাপ হলে ডাক্তারসাহের তাঁর রুটিনের বাইরেও এখানে সোজা চলে আসেন?” – তাঁর ইশারায় ডাক্তারবাবু এবার রুগি দেখতে শুরু করলেন।

তারপর ব্যাগ থেকে ওষুধ বের করে, কিভাবে খেতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে যাবার জন্য উঠলেও, সঙ্গের ভদ্রলোকটি একটা চেয়ার টেনে, ভিখিরির সঙ্গে টুকটাক কথা বলে যাচ্ছিলেন। ডাক্তারকে ইশারায় যেতে বলে দিলেন। ডাক্তার বিদায় নিলে তিনি ভিখিরির দিকে ঘুরে বসলেন – আচ্ছা সর্দার, সবাই বলছে, এই গাঁয়ে নাকি বাইরের লোক এসেছে?”

–       “বাইরের লোক তো মাঝে মাঝেই আসে মুখতারসাহেব।“

–       “উঁহু। এ লোকটা ধুলোঝড়ের মধ্যে বাইরে ঘুরে বেড়ায়।“

আমি এইবার লোকটিকে ভালো করে দেখি। পোষাক ও আচার ব্যবহারে তাকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। ভিখিরি আমার দিকে আঙুল তুলল – “এই সেই লোক।“

মুখতার সাহেব এতক্ষণে আমার উপস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন হলেন। আমি তাঁকে নমস্কার জানালাম। তিনিও যথাবিহিত ভদ্রতার সঙ্গে প্রতিনমস্কার করলেন। ভিখিরি বলল – “মুখতারসাহেব এই জমিদারির দেখাশোনা করেন।“

–       আপনি বড়মহলে থাকেন?”

–       “না, আমি এলাকার বাইরে থাকি। তবে আজ অন্য কোথাও চলে যাব ভেবেছি।“

–       “কেন? বড় মহল আপনার পছন্দ হয়নি? এ তো আপনাদের জন্যেই করা হয়েছে।“

–       “এটা গরীব অভাবী মানুষদের জন্য। আমার এখানে থাকার কথা নয়।“

–       “কেন নয়? আমাদের ধুলোঝড় কি আপনার ঘর ভেঙে দিয়েছে?”

–       “ঝড় আমায় নিরাশ্রয় করে না। আমার শহরে যখন ঝড় উঠত, তখন আমি বাইরে চলে আসতাম। সর্বাঙ্গ দিয়ে তাকে অনুভব করতাম। আমি ঝড় উপভোগ করি।“

তিনি খুব আগ্রহ নিয়ে আমায় দেখছিলেন – “আজব ব্যাপার! আপনাদের ঝড়ও কি ধুলোর?”

–       “বোধহয় না। আমি খেয়াল করিনি।তবে এই মাটিরঙা ঝড়ের মতো তো কখনোই নয়।“

তিনি লম্বা শ্বাস নিলেন – আপনার কাছে ঝড় এক দ্রষ্টব্য বস্তু! আর আমাদের এর সঙ্গে লড়াই করতে হয়।“

–       “তাহলে আপনারা এই জায়গাটায় বসতি স্থাপন করতে গেলেন কেন?”

–       “সে এক লম্বা কাহিনী। যাই হোক, ঝড় আমাদের জায়গাটা পরিচ্ছন্ন রাখার কারণ জোগায়!”

–       “ সে অবশ্য ঠিক। আমি এর চেয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বসতি দেখিনি।“

মুখতার সাহেব উঠে পড়লেন। সর্দারের দিকে খানিক্ষন তাকিয়ে একটা মুখভঙ্গী করলেন – হুম, সর্দার? তোমার কি ঠিকঠাক জামাকাপড় জোটে নি? এই সব ছেঁড়ান্যাতা কেন?”

–       “ আমার ভালো জামাকাপড় আছে মুখতারসাহেব। উৎসবের সময় অথবা বিয়েবাড়িতে সেগুলো পড়ি। কিন্তু ছেঁড়া জামা না পড়লে ভিক্ষে দেবে কে?”

–       “সেও তো বটে!”

পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে তিনি সর্দারের বিছানায়, তার মাথার কাছে রাখলেন। তারপর আমার দিকে ঘুরে বললেন – ”আমাদের খাতিরে আজ অন্ততঃ বড়মহলে থেকে যান। কাল বরং অন্য ব্যবস্থা করে নেবেন? ‎এখন আপনার অন্য গ্রামে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যাবে। রাতের দিকে এখানকার রাস্তাঘাট নিরাপদ নয়। রাস্তাটা তো খানাখন্দে ভর্তি।“

তিনি সর্দারের দিকে চেয়ে হাসলেন – “এর পাশের ঘরটা ফাঁকা আছে। সর্দার আপনাকে সঙ্গ দেবে। বেশ জমাটিয়া লোক। তবে কিনা বড্ডো কথা বলে।“

সর্দার হাসছিল – “মুখতারসাহেব, আপনিও না…”

কিন্তু ততক্ষণে তিনি বিদায় জানিয়ে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন।

সর্দার সত্যিই আসর জমাতে পারে। আমরা অনেক রাত অবধি গল্প করলাম। ডাস্টল্যান্ড সম্বন্ধে অনেক কথাই জানা গেল। নিজেকে খুঁজেপেতে জানতে হলে অন্তত কয়েক মাস লেগে যেত।

“ডাস্টল্যান্ডে প্রথমে কোনো জনবসতি ছিল না। আদতে এটা ছিল পোড়ো জমি। বেঁটে, মোটা লম্বা নানান ঝোপে ভর্তি। আর ছিল কয়েকটা গাছ, যাদের বিশেষ জলের দরকার হয় না। বড়ে মালিক পুরো জায়গাটাই কিনে বাড়ি-ঘরদোর বানিয়ে দেন। নিচু জায়াগা গভীরভাবে কাটিয়ে বিশাল দীঘিও খুঁড়িয়ে দিয়েছেন। এখানে জল অনেক নিচে বলে, কুয়ো কাটালে ধ্বসে যাচ্ছিল। এর মধ্যে এই ঝড় শুরু হয়। বড়ে মালিক তাতে দমার পাত্র নন। তিনি প্রতিবার ঝড়ে জমা ধুলোর ঢিবি পরিষ্কার করিয়ে দিতেন।“ – সে বলছিল।

“এই জায়গা… মানে ডাস্টল্যান্ডই কেন তাঁর পছন্দ হলো?”

“কারণ তিনি তাঁর নিজের নগর পত্তন করতে চেয়েছিলেন। বললাম না আপনাকে যে, না তো এখানে কোনো বসতি ছিল, না জমির মালিক। শুধু প্রতি বছর কিছু জিপসি এসে এখানে তাদের অস্থায়ী ডেরা বসাত। বড়ে মালিক সরকারের কাছ থেকে সব জমি কিনে, পশ্চিম দিকের একটা ছোট জমি, জিপসিদের জন্যে ছেড়ে দেন। তারপর তিনি বাড়িঘর, দোকানপাট তৈরিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু তাঁর সময় হয়েছিল, তাই আল্লাহ্ তাকে নিজের কাছে ডেকে নিলেন।“

লম্বা শ্বাস ফেলে সর্দার জীবনের অনিত্যতা সম্বন্ধে দার্শনিক ভাষণ দিতে শুরু করল। আমি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

গাছতলার কষ্টকর রাতগুলো কাটানোর পর বড় মহলে এসে  এমন আরামে ঘুমোলাম যে, উঠতে অনেক বেলা হয়ে গেল। ততক্ষণে ঝড় আছড়ে পড়েছে, আর সব বাড়ির দরজাও বন্ধ হয়ে গেছে। গাছতলায় থাকাকালীন, বেলাতে ঘুম ভাঙলেও আমি ইচ্ছেমতো ঝড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে পারতাম। কিন্তু এই বড়মহলে আটকে গিয়ে আমার যেন দমবন্ধ হয়ে এল। অগত্যা আমি বিছানাতে শুয়ে ঝিমোতে থাকি। পুরোনো আস্তানায় ফেরা কথা মনেও হয় না। সন্ধেবেলা বাজারে চক্কর দিচ্ছিলাম। দোকানদার এখন আমর চেনা হয়ে গেছে, তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললাম। সেও জানতে চায়, ঝড়ের সময় আমি বাইরে ঘুরে বেড়াই কেন। তাকেও আমি একই কথা বললাম – “ভালো লাগে, তাই।“ সে বলল –“মুখতারসাহেবও এটা জানতে চাইছিলেন। ছোটি মালকিন নিশ্চয়ই জানতে চেয়েছেন।“ এই প্রথম আমি ডাস্টল্যান্ডের মালকিনের কথা শুনলাম। ভাবলাম একে কিছু জিজ্ঞাসা করি, কিন্তু সেটা উচিত হবে না ভেবে উঠে পড়লাম। সর্দারের শরীর আরও খারাপ হয়েছে। সে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল। কেমন আছে জানতে চাইলে ঠিকমতো জবাবও দিতে পারছিল না। ওর খুব শীত করছিল। আমি কী করব বুঝতে না পেরে ওর পাশে বসে থাকলাম। পরে একসময় নিজের ঘরে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন আবারও উঠতে দেরি হলো, আর আমিও বড়মহলের ভিতরে বন্দী হয়ে রইলাম।

সন্ধ্যেবেলায় ডাক্তার সর্দারকে দেখে গেলেন। মুখতারসাহেবও সঙ্গে এসেছিলেন। তিনিও সর্দারের নাড়ি পরীক্ষা করলেন। তারপর আমার কাছে জানতে চাইলেন – “কি করবেন, ঠিক করেছেন?”

কিছুই ঠিক করিনি। কিন্তু আমি আর কিছুতেই এই বড়মহলে থাকব না। তাই হড়বড়িয়ে বলে উঠলাম – “আমি কালই চলে যাব। হয়তো রাত্তিরে আমার পুরোনো আস্তানায় ফিরে যাব। কাল দিনের বেলায় আমি অন্য কোনো জায়াগায় চলে যাব।“

“দিনের বেলায়? ঝড়ের কথা ভেবেছেন?”

“আমি ঝড়ে ঘুরতে অভ্যস্ত।“ – বলতে বলতেই আমার একটা দিন নষ্ট করার জন্য আফশোস হচ্ছিল। গাছতলায় থাকলে আমি ঠিক নতুন জায়গায় চলে যেতে পারতাম। মুখতার সাহেব বোধহয় আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছিলেন। বললেন –“ কিন্তু দিনের বেলা ঝড়ের মধ্যে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়।“ তারপর সেই প্রথম দিনের মতোই বললেন –“অবশ্য ঝড় তো আপনার কাছে দর্শনীয় বস্তু।“

“ঝড় আমার ছেলেবেলা। সেই থেকে আমার কাছে দর্শনীয় এবং প্রয়োজনীয়।“

আমার মনে হচ্ছিল আমি অযথাই তর্কে জড়িয়ে পড়ছি। প্রসঙ্গ বদলাবার উপায় খুঁজছিলাম। এমন সময়ে আচমকাই মুখতার সাহেব বলে উঠলেন –“রঙিন ঝড় কেমন হয়?”

আমি একটা দায়সারা বর্ণনা দিলাম। মুখতার সাহেব শুনে বললেন – “সত্যিই দর্শনীয় – বিশেষতঃ ছোটদের কাছে।“

“কিছু বাচ্চা ভয় পায়। আমার ভয় করত না। তাই আমি বাইরে ঘুরতাম।“

“আজব ব্যাপার!” – প্রথমদিনের মতোই তিনি আবারও বললেন – “আজব ব্যাপার!”

একটু পরে মুখতার সাহেব চলে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ সর্দারের কাছে বসে রইলাম। সে ঘুমিয়ে পড়েছে দেখে আর কথা বললাম না। নিজের ঘরে এসে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম। বেরোবার সময় দেখি মুখতার সাহেব একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর সঙ্গে এক সুবেশা ভদ্রমহিলা এবং জনাকয়েক মজুর‎‎‎। আমি তাঁদের চোখ এড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। কিছুটা যাবার পর দাঁড়িয়ে পড়ে মনের শক্তি সঞ্চয় করছিলাম, যাতে সেই গাছতলায় আবার যেতে পারি। বেশ খানিক্ষণ লাগল এর জন্য। যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছি, পিছন থেকে মুখতার সাহেবের ডাক শুনলাম। তিনি আমার পাশেই চলে এসেছেন – “কোথায় যাচ্ছেন সাহেব?”

“বোধহয় আপনাকে আগেই সেকথা বলেছি।“

“কিন্তু রাতে যাওয়া…”

ঠিক এই সময়েই একজন মজুর এসে তাঁর কাছে দাঁড়াল – “মুখতার সাহেব, ছোটি মালকিন আপনাকে ডাকছেন। আর ওকেও সঙ্গে করে নিয়ে যেতে বলেছেন।“

–       “ও? কাকে?”

–       “যে ঝড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। এই একে…” সে আমার দিকে তাকায়।

–       “ঠিক আছে। তুমি যাও।“ মুখতার সাহেব আমার দিকে ফিরলেন – “চলুন সাহেব। মালীকা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।“

–       “মালীকা কে?”

–       “এই ডাস্টল্যান্ডের মালিক। মাঝে মাঝে তিনি বাইরের লোককে আমন্তজরণ জানান।“

–       “কিন্তু আমাকে কেন?”

–       “সম্ভবতঃ আপনি ঝড়ের সময় বাইরে ঘুরে বেড়ান বলে।“

–       “সেটা এমন কি অদ্ভুত ব্যাপার?”

–       “তা নয়। তবে আমি যখন ওঁকে বলেছিলাম যে আপনি ঝড়ের সময় কিছুতেই বাড়ির ভিতরে থাকতে পারেন না… তখন তিনি বললেন বোধহয় উনি আপনাকে চেনেন। অন্ততঃপক্ষে তাঁর মা চিনতেন, হয়তো বা তাঁর স্বামীও।“

–       “ওঁর স্বামী বেঁচে আছেন?”

–       “আছেন। তবে তাঁর চেতনা নেই।“

–       “কেন?”

–       “তিনি আপনার ওই গাছটা থেকে পড়ে মাথায় চোট পান। সেই থেকেই…”

তাহলে এঁর কথাই সেদিন সর্দার বলেছিল! আমি ভাবলাম। কিন্তু তিনি হঠাৎ গাছে উঠতেই বা গিয়েছিলেন কেন? ভাবতে ভাবতে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে মুখতার সাহেবকে আমি কিছু বলেছি। বোধহয় ভদ্রতাসূচক চিকিৎসার কথা…। মুখতার সাহেব বলছিলেন – “ শহরের অনেক হাসপোাতালেই দেখানো হয়েছিল। দুটোতে কিছু সময়ের জন্য ভর্তিও ছিলেন। ডাক্তার, বদ্যি, ঝাড়ফুঁক, ওঝা, জিপসি… সবরকম চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। জ্ঞান আর ফিরল না। ওঁর জন্য একজন ডাক্তার আছেন। এখন মাঝে মাঝে খুব সামান্য সময়ের জন্য জ্ঞান ফেরে, কিনতু তখনও তিনি কিছুই বুঝতে পারেন না। আগে তো কোনো শব্দই করতে পারতেন না, এখন…” আচমকা থেমে গিয়ে তিনি বললেন – “ওঁর বাড়ি এসে গেছে।“

সামনের বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আমি আর চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমি যেন আমার ছোটবেলার বাড়িকেই দেখছি। বহুযুগ আগে সে হারিয়ে গিয়েছিল। স্মৃতিপটে ভেসে উঠতে তার অনেকটা সময় লাগল। বাড়ির সামনেটা, বারান্দা,দরজা,ভিতরের দেউরি… অবিকল আমাদের বাড়ির মতো!

মুখতার সাহেব বাড়ির ভিতরে গেলেন। আমি এখন আমার বাড়ির সবটুকু মনে করতে পারছি। তার বাসিন্দারা, বাড়ির বড়োরা, চাকরের দল, অতিথি-অভ্যাগত… তাদের চেহারা, গলার আওয়াজ, বাড়ির সেই হই চই – স্মৃতির বন্যায় আমি ভেসে যাচ্ছিলাম। তাঁরা কেউ আর বেঁচে নেই। ভেবেছিলাম, আমিও তাঁদের ভুলে গিয়েছি। সত্যিই ভুলেছিলাম? উঁহু। ভুল ভেবেছিলাম। ছেলে বেলার অন্যান্য স্মৃতির মতো এরাও কোথাও লুকিয়েছিল, এখন একে একে, নাকি একসঙ্গে সব ফিরে আসছে।

এই ভাবনারা কয়েক মুহূর্তেই আমা মনে ভেসে উঠেছিল। মুখতার সাহেব তাড়তাড়িই ফিরে এসেছেন। তিনি আমাকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে জরিপ করছিলেন। আমি তাঁর দিকে মন দিলাম। তিনি বলছিলেন – “আসতে আজ্ঞা হোক। মালিকা আপনাকে ডেকেছেন।“

আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম। বাড়ির বারমহল আমাদের পুরোনো বাড়ির চেয়ে আলাদা। একটা দরজা অন্দরমহলকে বারমহল থেকে আলাদা করেছে। ভেতর থেকে মেয়েদের গলা, শিশুর কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। মুখতার সাহেব দরজায় ধাক্কা দিলয় জোর গলায় হাঁক পাড়লেন – “মালীকাকে বলো, সেই ভদ্রলোক এসেছেন।“

এই সময় আমি বারমহলটা ভালো করে দেখছিলাম। একটা বড়ো ঘরের সঙ্গে আরও দুটো ছোট ঘর। বড়ঘরের দরজা বন্ধ। অফিসের সাধারণ কাগজপত্র এলোমেলোভাবে ছোট ঘরগুলোতে স্তুপীকৃত হয়ে আছে। কিছু বইও আছে, বেশির ভাগই গাছপালা সংক্রান্ত। এদের দরজা খোলা। মুখতার সাহেব আমাকে, তারই একটায় নিয়ে বসালেন।

খানিক পরেই মালীকা এলেন। আমি ভেবেছিলাম একজন বয়স্কা মহিলাকে দেখব – কিন্তু ইনি তরুণী, আমার চেয়ে অনেকই ছোট। আমি আদব কায়দা অনুসারে কথা বলার জন্য তৈরি ছিলাম, কিন্তু বয়েসের এই তফাতটা সেটাকে নড়বড়ে করে দিল। তবুও খানিকক্ষণ আমি খুব ভেবেচিন্তে মেপে মেপে কথা বলছিলাম। তিনি আমাকে সাধারণ ভদ্রতাসূচক কথা বলছিলেন। ‘কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো? এখানকার খোঁজ পেলেন কি করে?’… এই জাতীয়, আর কি। আমি তাঁকে সর্দারের সঙ্গে দেখা হবার একটা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিলাম। খানিক চুপ করে থেকে তিনি মুখতার সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলেন – “এঁকে সব কথা বলেছো?”

–       “সব নয়। ওঁর কথার তোড়ে আমি সে সুযোগই পাইনি।“

–       “বেশ। তাহলে এখন বলো।“ তিনি উঠে পড়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন –“আপনি কী খাবেন, বলুন?”

–       “আমার যা জীবনযাত্রা, তাতে পছন্দ অপছন্দের জায়গা নেই। যখন যেভাবে যা জোটে…

হাত নেড়ে ওঁকে বসতে বললাম – “আমার জন্য ব্যস্ত হবেন না। আমার আজকের খাওয়া হয়ে গেছে।“

মালীকা বসলেন। সামান্য নিস্তব্ধতা। এতক্ষণ ধরে যে প্রশ্ন আমায় অস্থির করছিল, সেটা এবার করেই ফেললাম – “আপনার বাড়িটি খুব সুন্দর। কে বানিয়েছেন?”

–       “আমার আম্মি। একটা বাড়ি তাঁর খুব পছন্দের ছিল। বিয়ের আগে তিনি সেখানে প্রায়ই যেতেন। ডাস্টল্যান্ডে আব্বু যখন আম্মির জন্য বাড়ি বানাচ্ছিলেন, তখন তিনি তাঁর পছন্দের বাড়িটার মতোই একটা বাড়ি চাইলেন। নকশাও আম্মিই বানিয়েছিলেন। মানে যতদূর তিনি মনে করতে পেরেছিলেন…”

বিদ্যুত চমকের মতো আমার সব মনে পড়ে গেল। মালীকার কথার মাঝখানেই বলে উঠলাম – “কিছু মনে করবেন না। আপনার মায়ের নাম কি জীনাত বেগম?”

–       “আপনি কী করে জানলেন?”

–       “তিনি প্রায়ই আমাদের বাড়ির আতিথ্য গ্রহণ করতেন।“

মালীকা মুখতার সাহেবের দিকে তাকালেন – “আশ্চর্য! সত্যিই আশ্চর্য!”

–       “কবে নাগাদ?” – এ প্রশ্নটা আমাকে।

–       “সঠিক সাল-তারিখ বলতে পারব না। তখন আমিই একজন বাচ্চা ছেলে।“

–       “আপনার ওঁর কথা মনে আছে?”

–       “উনি যে আমায় ঝড়ের মধ্যে ঘুরতে দেখতে ভালোবাসতেন! আর বাড়ির সবাই আমায় বাধা দিত, আটকাবার চেষ্টা করত। ঝড় আসছে বুঝতে পারলেই আমি একদৌড়ে তাঁকে খবর দিতাম। তিনি জানলায় দাঁড়িয়ে ঝড় দেখতেন। সে সময় ওখানে রঙিন ঝড় হতো। মনে হয়, সেও তাঁর পছন্দের কারণ।“

জীনাত বেগম বেশ শান্তশিষ্ট আর তাঁর মেয়ের মতোই কমনীয় ছিলেন। একবার ট্রেনে যাবার সময় আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। আমার মায়ের স্বভাব এমনই ছিল যে, আত্মীয়, অনাত্মীয়, এমন কি স্বল্প পরিচিত জনেরাও, তাদের দুঃখকষ্টের ঝাঁপি তাঁর কাছে অকপটে খুলে ধরতে পারত। তাঁর কাছ থেকে তারা সান্ত্বনা ও মনের আরাম পেত। জীনাত বেগমের জীবনেও নানান বেদনা ছিল। তিনি যখন আমাদের বাড়ি আসতেন, তখন দরজা বন্ধ করে মায়ের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। কখনো কাঁদতেন। মা তাঁকে বুঝিয়ে, সান্ত্বনা দিয়ে শান্ত করতেন। পরবর্তী কালে তিনি যে চিঠি লিখতেন, তাতে কখনোই আমার কথা, আমার ঝড়ের উপর আকর্ষণের কথা জানতে চাইতে ভুলতেন না।“

একের পর এক পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আমি স্থানকাল ভুলে স্মৃতিচারণ করছিলাম। মালীকার প্রশ্নে চেতনা ফিরল – “কতদিন অবধি আম্মি আপনাদের ওখানে যেতেন?”

“তা, প্রায় আমার পুরো ছেলেবেলা জুড়েই।“

“এসব আমার জন্মের আগের কথা।“ – নিজেকেই বললেন বোধহয়।

এবার উঠে পড়ে মুখতার সাহেবকে বললেন – “ইনি আমাদের আপনার জন। এঁকে সবকিছু খুলে বলো।“ – তিনি ভিতরে চলে গেলেন।

একটু চুপ করে থেকে মুখতার সাহেব বললেন – “কোথা থেকে শুরু করব, বুঝতে পারছি না।“

আমি অভয় দিলাম – “যা মনে পড়ছে, তাই বলুন। আমার বুঝতে অসুবিধে হলে জিজ্ঞাসা করে নেব।“

মুখতার সাহেব শুরু করলেন –

“জীনাত বেগম আমার দিদি। কম বয়েসেই বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী বড়লোকের ছেলে, বেশ্যাবাড়িতে যাতায়াত করত। দিদির কথা ভাবতই না। দু বছর দিদি এই স্বামীর জন্যে খুব কষ্ট পেয়েছে। স্বামীকে শোধরাবার অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু পারেনি। সে এক বেশ্যার বাড়িতেই মারা যায়। অনেক পয়সাকড়ি ছিল। ফলে জীনাত বেগমকে দুর্দশায় পড়তে হয়নি। একাকীত্বের যন্ত্রণা ভুলতে সে নানা জায়গায় ঘুরতে যেত। তেমনই এক ট্রেনযাত্রায় দিদির সঙ্গে আপনার মায়ের দেখা হয়। তিনি দিদিকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। তাকে প্রায়ই বাড়িতে নিমন্ত্রণ করতেন। আমি তখন বেকার যুবক। জীনাত বেগম আমাকে তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিল। আপনার মা তাকে বারবার নিকাহ্ করতে অনুরোধ করতেন। একসময় সে রাজি হয়। আপনার মা অনেক ভেবেচিন্তেই বড়ে সাহেবকে পছন্দ করেন। তাঁরও আগে একবার বিয়ে হয়েছিল, আর বয়েসটাও অনেক বেশি। তবু আপনার মায়ের বিশ্বাস ছিল তিনি জীনাতের মূল্য বুঝবেন। এবং তিনি ভুল করেননি।“

“তারপর?”

“তাঁর অনেক গুণ ছিল। কত কিছু যে জানতেন, তা আল্লাহই জানেন। শহরে ওঁর অনেকগুলো বাড়ি আর সম্পত্তি ছিল।আপনার মা বিয়েতে আসতে পারেরননি। কারণ কিছুদিন আগেই আপনাদের বাড়ির দুর্ঘটনা…”

মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললাম – “আমি জানি। তারপর কী হলো বলুন।“

“যা বলছিলাম – বড়ে সাহেব অনেক কিছু জানতেন, কিন্তু ওঁর সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল গাছপালায় আর বাড়ি তৈরিতে। সেই শখ পূর্ণ করতে তিনি এই পতিত জমিটা কেনেন। নানান জায়গা থেকে চারা কিনে এনে তিনি ডাস্টল্যান্ডে লাগিয়েছিলেন। গরীব লোকের জন্য বাড়ি – বড়মহল তাদের মধ্যে সবচাইতে বালো। এছাড়া…” মুখতার সাহেব একটু থামলেন। তারপর আবার শুরু করলেন –

“বাবা বেঁচে থাকতেই বড়েসাহেবেজীনাত বেগমও বিয়ের সময়ে শর্ত রেখেছিলর ছোটভাই মারা যায়। তারপর মা। বড়ে সাহেব অনাথ ভাইপোকে মানুষ করেন। তিনিই আমাদের ছোট সাহেব। বিয়ে করার সময় তিনি জীনাত বেগমের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেন যে, ভাইপো তাঁদের সঙ্গেই থাকবে। সে সময় ছোটে সাহেবের বয়েস ছিল বারো বছর। সে শহরের স্কুলে পড়ত। বিয়ের দুবছর পরে মালিকা জন্মায়। ছয় বছর বয়েসে তাকেও সেই একই স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হলো। বাচ্চাকে ছেড়ে থাকতে জীনাত বেগমের খুব কষ্ট হচ্ছিল, তাই বড়ে সাহেব দু বছর পরে তাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে ডাস্টল্যান্ডে নিয়ে আসেন। সেখানে মালিকার জন্য তিনজন শিক্ষক রাখা হয়। তিনি নিজে এই ব্যাপারগুলো দেখতেন। মালিকা ছোট সাহেবের খুব ন্যাওটা ছিল। তাই বড়ে সাহেব পরে ছোটে সাহেবকেও ডাস্টল্যান্ডে নিয়ে এলেন।“

আমি আবার বাধা দিলাম – “তারপর কি হলো বলুন।“ কারো কথার মাঝে এভাবে কথা বলা ভদ্রতা নয়, কিন্তু এত খুঁটিনাটি শুনতে আমার ভালো লাগছিল না। মুখতার সাহেবও বোধহয় আমার  বিরক্তি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি চুপ করে গেলেন। আমার খারাপ লাগছিল। তাই বললাম – “আপনি বরং আপনার কথা বলুন।“ মুখতার সাহেব একটু উজ্জীবিত হলেন –

“জীনাত বেগমও বিয়ের সময় শর্ত রেখেছিল যে, সে বিয়ের পরে ভাইকে সঙ্গে রাখবে। বড়ে সাহেব তার সব শর্তই মেনে নিতে রাজি ছিলেন। কাজেই আমি বড়ে সাহেবের কাছে রয়ে গেলাম। তিনি আমায় তাঁর ভাইপোর মতোই ভালোবাসতেন। একদিন তিনি বললেন – আরে, তোমার নাম যখন মুখতার, তখন তোমাকেই ডাস্টল্যান্ডের ওকালতনামা দেওয়া যাক!”

“দারুণ ভালো লোক তো!” – বললাম আমি।

“একজন অসাধারণ মানুষ। ডাস্টল্যান্ডে বসবাস করার জন্যে তিনি শহর থেকে লোক নির্বাচন করতেন। এদের মধ্যে যাদের সহায় সম্বল ছিল না, তাদের ব্যবস্থা বড়মহলে করা হতো। প্রথমবারেই তিনি সর্দারকে নিয়ে এসেছিলেন। বলতেন যে সব বসতিতেই একজন ফকির থাকা উচিত।“

“বেশির ভাগ লোককেই আমার গরীব মনে হয়েছে।“

“কারণ তারা গরীব। বেশির ভাগই কারিগর অথবা মিস্তিরি। এরা শহরে ঠিক সুবিধে করতে পারেনি। এই সর্দারও সারাদিন দর্গার সামনে বসে থামত। এখানে আসার পরে ওর রোজগর বেড়েছে। ও ডাস্টল্যান্ডের সবচেয়ে পুরোনো বাসিন্দা। অনেক কিছু জানে এর সম্বন্ধে।“

“বড়ে সাহেব ওর সঙ্গে স্বচ্ছন্দ ছিলেন?”

“তিনি সকলের সঙ্গেই আন্তরিকভাবে মেলেমেশা করতেন। মজার কিছু ঘটলে এমন অট্টহাসি হাসতেন যে, পাখিরা গাছ ছেড়ে উড়ে পালাত।“ 

এই গাছের প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ল – “মুখতারসাহেব, এই ডাস্টল্যান্ডে কোনো গাছ ছিল, যা…”

“প্রচুর, প্রচুর। বড়ে সাহেব সব কেটে ফেলেছিলেন। একমাত্র আপনার গাছটাকে মাপার জন্য বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।“ আরও কিছু বলতে যেয়েও চুপ করে গেলেন মুখতার সাহেব। বিদায় নিয়ে চলে গেলেন।

সেই রাতে আমি গাছটাকে খুব ভালো করে লক্ষ্য করলাম। এর মধ্যে কি যেন রহস্য আছে, যা আমি ধরতে পারছি না। ওকে দেখতে দেখতেই আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম ভাঙলে আবারও খুঁটিয়ে দেখলাম। এলোমেলো ডালগুলো ঘন পাতায় ঢাকা। কিন্তু প্রতিটি ডালই চার দিকের একটাকে নির্দেশ করছে! একটা ডালও অন্য দিকে ছড়ায়নি। এইবারে আমি গাছটার অসাধারণত্ব বুঝতে পারলাম। এখন আমি হাজার গাছের ভিড়েও এই গাছটিকে সহজেই খুঁজে পাব।

কিছুদিন পরে ঝড় কমে গেল। ডাস্টল্যান্ড দিনের বেলাতেও কর্মমুখর হয়ে উঠল। একদিন সর্দারের সঙ্গেও দেখা হয়ে গেল। আমরা সারাদিন ধরে গল্প করলাম। সেই জানাল, জিপসিদের দল মাঠে ডেরা বেঁধেছে। সর্দার তাদের নেতার নাম বলে বলল – ‘বাল্লাম সদ্দার ঝুনো হাঁস হলে কি হবে, এখনও শক্ত সমর্থ আছে।“

 বাল্লাম? অতীতের ভূতেরা কি সবাই ডাস্টল্যান্ডে হানা দিয়েছে নাকি? আমার বিরক্ত লাগছিল। যখন বাড়ি ছাড়ি, তখন বাল্লামের দলের সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়েছিলাম। বেশ ভালো লোকজন। সর্দারের কাছ থেকে ফেরার সময়, সোজা জিপসিদের এলাকায় হাজির হলাম। বাল্লাম সদ্দার আমায় দেখেই চিনতে পারল।

অনেক রাত পর্যন্ত আমরা গল্প করলাম। আমি জানতে চাইছিলাম, ওরা কোথায় কোথায় ঘুরেছে। ও বলছিল, বড়ে সাহেবের জন্যে ওরা নানান জায়গা থেকে গাছ এনে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করলাম – “আচ্ছা সদ্দার, যে গাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম…”

“বলতে পারব না। বড়ে সাহেব কোথাও থেকে জোগাড় করেছিল। কিংবা হয়তো এটা প্রথম থেকেই এখানে ছিল। বড়ে সাহেব গাছটার একটা ডালও ভাঙতে দিত না।“

অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল বলে, আমি জিপসিদের তাঁবুতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে মুখতার সাহেবের গলার আওয়াজে ঘুম ভাঙল। তিনি বাল্লাম সদ্দারকে জিজ্ঞাসা করছেন যে, ও আমাকে কিভাবে চিনল। আমাকে জাগতে দেখে বললেন – “আমি আপনাকে গাছতলায় খুঁজছিলাম। আজ আপনাকে মালীকার সঙ্গে দেখা করতে হবে।“

“কখন?”

“যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। সে আপনাকে তার গল্প শোনাতে চায়। ঠিক যেমন তার মা আপনার মাকে শোনাত। আপনাকে বলে সে হালকা হতে চায়।“

একটু পরে মালীকার সঙ্গে দেখা হলো। আজ তিনি খুব উজ্জ্বল পোষাকে সেজেছেন। বিষাদের যে ছায়া তাঁকে ঘিরে থাকে, তা এখন অনুপস্থিত। সাধারণ কিছু কথার পরে তিনি বলতে শুরু করলেন –

“আব্বু আম্মিকে পাগলের মতো ভালোবাসত। আম্মি যখন ধুলোর ঝড় নিয়ে নালিশ করল, তখন আব্বু সেই ঝড় থামনোর উপায় খুঁজতে লাগল। আল্লাহ্ই জানেন কতো রকমের গাছের টব জোগাড় করেছিল আব্বু। খুব যত্ন করত। গাছগুলো বড়োই ছিল। মাটিতে লাগাবার বছর দুয়েকের মধ্যেই তারা বেশ বেড়ে উঠে ছায়া দেবে। একদিন আব্বু আর ছোটে সাহিব খুশিতে ডগমগ হয়ে আম্মিকে জানাল যে, যে গাছগুলো ওরা খুঁজে পাচ্ছিল না. জিপসিরা সেগুলো এনে দিয়েছে। গাছগুলো কিছুটা পরপর লাইন করে লাগালে তার একের পর এক ঝড়কে বাধা দেবে। অবশেষ শেষ গাছের লাইন পেরিয়ে সে যখন বসতিতে ঢুকবে তখন সে তার শক্তি হারিয়ে মৃদু হাওয়ায় পরিণত হবে।

সেবার ঝড় দুদিন ধরে চলেছিল। আব্বু আর ছোটে সাহিব আরও গাছ পোঁতার জায়গা খুঁজতে বাইরে গিয়েছিল। তারা তোমার গাছটা দেখে দিক নির্ণয় করত। হঠাৎ কিডনির ব্যথায় ছটফট করতে করতে আব্বু সেখানেই মারা যায়।“

আমরা দুজনেই চুপ করে রইলাম। খানিক পরে সে বলল – “এরপর আম্মি অস্বাভাবিক রকমের চুপ করে গিয়েছিল। কথাই বলত না। কিন্তু এক রাতে ছোটে সাহিব হলুদ ঝড়ের স্বপ্ন দেখে খুব আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।। তখন আমরা জানতে পারলাম, হলুদ রঙে তার মারাত্মক ভয় অথবা রঙিন ঝড়কে সে ভয় পায়। তার ভয় কাটাতে আম্মু আপনার ঝড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়ানোগল্প করতেন। ছোটে সাহিবের ভয় গেল। সে আপনার কথা এমনভাবে বলত, যেন আপনি তার কতদিনের বন্ধু। আম্মি আপনাদের আন্তরিক আতিথেয়তার গল্পও খুব করত। এই সময়ে সেও অসুস্থ হয়ে পড়ে আর ঘুমের মধ্যেই চিরনিদ্রার দেশে চলে যায়। মুখতারমামা না থাকলে যে আমরা কি করতাম!”

“এ আবার কেমন কথা?” মুখতার সাহেব কখন এসে বসেছেন, আমরা টের পাইনি। তাঁর গলা আবার শোনা গেল – “কেন এসব নিয়ে ভাব?”

“আব্বুর পরে আম্মির চলে যাওয়ায় ছোটে সাহিব খুব ভেঙে পড়েছিল। তবু সে নিজেকে সামলে গাছ লাগানোতে মন দিয়েছিল। তবু…” মালিকার গলা ধরে এল।

“মুখতার মামা, তুমিই বলো বরং…”

“বারবার একই কথা বলে, দুঃখ পেয়ে কি লাভ বেটি?” – মুখতার সাহেব গুরুজনদের মতোই বকুনি দিলেন –

“তুমি বহুবার এটা শুনেছ। আর ইনিও জানেন যে ছোটে সাহেব গাছ থেকে পড়ে গিয়ে…”

“তবু আমি চাই তুমি বলো।“

“বলতে পারি, কিন্তু কথা দাও তুমি কাঁদবে না। তোমার শরীর খারাপ হবে।“

“আমি আর কাঁদি না। কাঁদি?”

“নিজের মনে গুমরে থাক। সেটা আরো খারাপ।“

মুখতার সাহেব বলতে শুরু করলেন – “বড়ে সাহেবের অসমাপ্ত কাজ ছোটে সাহেব হাতে তুলে নিয়েছিলেন। গাছ লাগানো জন্য খোঁড়া গর্তগুলো, বুজে আসছিল। সেগুলো আবার ঠিক করতে হচ্ছিল। তারপর আপনার গাছের ডাল…”

আমার বিরক্ত লাগছিল – “বারবার ‘আমার গাছ’ বলেন কেন?”

“একনাত্র আপনিই ওর তলায় থাকেন। তাই না? আর কেউই থাকে না। তাছাড়া গাছটার নাম আমরা জানিনা। যাই হোক, ছোট সাহেব এই গাছটাকে দেখে দিক ঠিক করতেন। তিনি নতুন করে গাছের জায়গা ঠিক করছিলেন। খুব খুশি ছিলেন সেদিন। তিনি গাছটায় উঠে জায়াগাটা ভালো করে দেখতে চাইছিলেন। সবাই বারণ করছিল, কিন্তু ততক্ষণে তিনি নিচের ডালে চড়ি গেছেন। আমি তাঁকে পড়তে দেখেছি, কিন্তু তিনি যে মাথা দিয়ে পড়েছেন – সেটা বুঝতে পারিনি। খু একটা উঁচু থেকেও পড়েননি, জানেন? ‘মালিইইকা’ বলে ডেকে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন। আমি তাঁকে ধরে নিয়ে আসছিলাম। হঠাৎই ঢলে পড়ে গেলেন। কান তেকে রক্ত বের হচ্ছিল। অজ্ঞান। সঙ্গে সঙ্গে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বাকিটা তো আপনি জানেনই।“

এই সময়ে বাল্লাম সদ্দার এসে দাঁড়ালে, মালীকা কথার মাঝখানেই বলে উঠল – “তুমি ছোটে সাহিবকে দেখতে যাবে না?”

“ নিশ্চয় যাব। সেজন্যেই তো এসেছি।“

মালীকা আমার দিকে ফিরল – “আপনিও আসুন। কাল স্বপ্ন দেখেছি, আজ ওঁর জ্ঞান ফিরে আসবে।“

মনে মনে ভাবলাম, স্বপ্ন কি আর সত্যি হয়? মালীকা, মুখতার সাহেব আর বাল্লামের সঙ্গে আমিও বড় ঘরটায় ঢুকলাম। সেখানে যে মানুষটি শুয়েছিল, সে নাকি আমায় বন্ধু বলত! যদিও আমি তাকে এই প্রথম দেখলাম। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার মনে কী চলছে কেউ জানে না। আবার এমনও হতে পারে যে, কিছুই চলছে না। তার বুকে হাত দিয়ে ডাকলাম – “ছোট সাহেব?”

দীরে ধীরে নাকের কাছে হাত নিলাম। চোখের পাতা তুলে ধরে আবার বুজিয়ে দিলাম। কানের লতি…। কিছু পাবার আশা না করেই, একজন দক্ষ ডাক্তারের মতো আমি পরীক্ষা করছিলাম। কিন্তু সবাই এতো আশা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল যে এ ব্যাপারে আমার অক্ষমতা জাহির করাটা খুব নিষ্ঠুরের কাজ হতো। পুরোটা সময়, আমি  তার নাম ধরে ডেকে যাচ্ছিলাম, আর প্রত্যেকেই নীচু হয়ে একবার ছোট সাহেব আর একবার আমার দিকে তাকাচ্ছিল। কিন্তু ছোট সাহেব আগের মতোই নিস্পন্দ হয়ে শুয়ে রইলেন। দরজার কাছে আরও এক আগন্তুকের দিকে আমার নজর পড়ল। ভালো করে তাকিয়ে দেখি এ তো সর্দার! আজ সে পরিষ্কার হয়ে, ভালো জামাকাপড় পরে এসেছে। সে দরজা থেকেই ছোটে সাহেবকে দেখল। তারপরে নীরবে ফিরে চলে গেল।

আমিও পরীক্ষা শেষ করে মুখতার সাহেবের দিকে ফিরলাম – “উনি কী কখনো কোনো কথা বলেছেন?”

“ওই পড়বার সময় একবার। মালীকা…।“

“আমি জানি এর মানে কি। উনি বলতে চেয়েছিলেন, এই গাছটাকে একলা ছেড়ে দাও। আচ্ছা, আপনার কী মনে হয়? উনি ভালো হয়ে যাবেন তো?“

শেষ প্রশ্নটা আমাকে! আমার মনে পড়ে গেল – দোলনা থেকে পড়ে যাওয়া সেই আত্মীয়ার কথা। মেয়েটা কুড়ি-পঁচিশ বছর ধরে অজ্ঞান হয়ছিল। তার মুখে দাড়িগোঁফের মতো চুল গজিয়ে গিয়েছিল। বীভৎস! আমি নিজে দেখিনি, শুনেছি মাত্র। হয়তো অনেকটাই বাড়িয়ে বলা। জোর করে তার কথা মাথা থেকে সরিয়ে বললাম – “যেতেই পারেন। আপাতদৃষ্টিতে কোনো অসুখ নেই যখন।“

আচমকা আমি ডাস্টল্যান্ডের ব্যাপারে খুব ক্লান্ত বোধ করছিলাম। এখানে এত সময় যে কেন কাটিয়েছি, ভেবে পাচ্ছিলাম না। আমি যখন বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম, তখনকার অনুভূতি আমায় আবার ছেয়ে ফেলল।

 দিনের আলো এখনো অনেক বাকি। আমি গাছের তলা থেকে আমার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলাম। শেষবারের মতো গাছটার দিকে তাকালাম। যাবার আগে কাউকে কিছু বলে গেলাম না। মালীকা, মুখতার সাহেব, সর্দার, বাল্লাম – কাউকে না! নতুন জায়গার খোঁজে এলাকা ছেড়ে চললাম। খুব সাবধানে। মাটির গর্তগুলোকে এড়িয়ে।

নাইয়ার মাসুদ

নাইয়ার মাসুদ

নাইয়ার মাসুদ ভারতীয় উর্দু পণ্ডিত এবং ছোটগল্পকার। জন্ম ১৯৩৬, মৃত্যু ২০১৭। তিনি লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সির অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি সাহিত্য ও শিক্ষার জন্যে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। গবেষণামূলক গ্রন্থ ও কাফকার অনুবাদ তাঁর অন্যতম সৃষ্টি। তাউস চমন কী ময়না বইটি লিখে, তিনি ২০০১ সালে উর্দু সাহিত্যের জন্য সাহিত্য আকাদেমির পুরস্কার পান। ২০০৭ সালে তাঁকে সরস্বতী সম্মান প্রদান করা হয়।

দোলা সেন

দোলা সেন

লেখক। অনুবাদক।
আসানসোলে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *