নাইয়ার মাসুদের গল্প : বিশ্রামাবাস

নাইয়ার মাসুদের গল্প : বিশ্রামাবাস

ইংরেজি অনুবাদঃ মুহাম্মদ উমর মেমন
বাংলা অনুবাদঃ অমিতাভ চক্রবর্ত্তী

ফেলে আসাএ জীবন
আর আমার নয়;
মুছে গেছে উড়ন্ত প্রহর,
ক্ষণচারী স্বপ্নরা যেমন মিলায়
ছবি তার জমা রেখে
শুধু স্মৃতির ভিতর।

~জন উয়িলমট, আর্ল অফ রচেস্টার
‘ভালোবাসা ও জীবন’ থেকে।

জমানা গস্ত, তো হাম গর্দ সো খানা-য়ে খীশ।
(সময় এসেছে ফিরে, তুমিও এবার তবে ফিরে এসো নিজের ঘরে)

~মির্জা গাদা, ‘আলি গাদা’
‘ইমাম-এ তিষ্ণা-জিগর নে পাস আজ নামাজ-এ ‘ইশা’ বিষাদ-গাথা থেকে।

 

এখন আমি শ্রান্ত, অবসন্ন,কিংবা আরো ঠিকভাবে বলতে গেলে, আমার মনে হয় আমিআরো অনেক আগেইক্লান্ত হয়ে গেছি, সম্ভবতঃ সেই দিন থেকে যেদিন আমায় নিশ্চিত করে জানিয়ে দেওয়া হল যে আমার আর কোথাও যাওয়ার দরকার নেই এবং আমার বাকি জীবনটা এই বাড়িতেই কাটবে।অথচ আমি বেশ পরিষ্কার মনে করতে পারি যে এখানে যখন প্রথম পা রেখেছিলাম আমার মন তখনউৎসাহ-উদ্দীপনায় ভরপুর ছিল।

এই বাড়িরসদর দালানের দর্শনধারী চেহারাটি আমার মনে ধরেছিল।ভাল করে দেখব বলেযখন এর কাছেএসে দাঁড়ালাম, বাড়ির সামনেরবাগানটি নজরে এল। দরজা ঠেলে আঙ্গিনার ভিতরে ঢুকে পড়লাম আমি। করমচার ঝোপের ওপাশে বাগানেরগাছ-গাছালির দিকে তাকাতে তাকাতে সদর দালানের দিকে এগিয়ে গেলাম। খুব ইচ্ছে করছিল বাগানে ঢুকে পড়ে প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ঝোপ-ঝাড়, ছূঁয়ে-ছেনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি, কিন্তু ঠিক সেই মুহুর্তেই কোন একজনের গলা শোনা গেল, ‘কাকে চাই?’

একটা বড় ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি, সদর দালানের অনেকটা জুড়ে আছে এই ঘরটা, আর ঘরের মধ্য থেকে যিনি খুব মনোযোগ দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন,তার হাবভাব থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে তিনিই এই বাড়িটির মালিক। তাই দ্বিতীয়বার যখন তিনি আমায় প্রশ্ন করলেন, ‘কাকে চাই?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘আপনাকে।’

‘কোথা থেকে আসছো?’

‘নানা জায়গা ঘুরতে ঘুরতে চলেছি।‘‘

‘ভিতরে এসো’, বললেন তিনি, কিন্তু তারপর নিজেই বের হয়ে এলেন।

‘এইদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি, আপনার বাগান টা দেখে মনে হলো আপনাকে বলি “এটা এরকমই রেখে দিন”।‘

‘কিসের জন্য?’

‘এই বাগানে যা আছে সবই একেবারে প্রাকৃতিক, বন্য। এদের কিছু কিছু সত্যিই খুব উপকারী আর সহজে খুঁজেও পাওয়া যায় না। দয়া করে এগুলো কেটে ফেলবেন না।‘

‘সেটা ঠিক,’ আমার দিকে বেশ মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে বললেন তিনি,‘আমার নিজেরওতাই মত। এখানে কিছু কিছু গাছপালা আছে যা রীতিমতো দুষ্প্রাপ্য, কিন্তু এর বেশি কিছু আর তাদের সম্পর্কে জানিনা আমি।‘

‘এইরকম একটা বাগান তৈরি করা সোজা কাজ নয়।‘

‘ এ বাগান কেউ বানায় নি। জমিটা পড়ে আছে, গাছপালা নিজে থেকেই যা হয় হচ্ছে।‘ তারপর একটু থেমে একটু দ্বিধা নিয়ে যোগ করলেন, ‘এসো,ভিতরে এসে ভালো করে দেখে নাও।’

দু ‘ধাপ পাথরের সিঁড়ি বেয়ে নেমে বাগানের ভিতর গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা। যেমন খুশি গজিয়ে ওঠা গাছপালা-লতাপাতা-ঝোপঝাড় অনেকক্ষণ ধরে সব দেখলাম আমি। বাগানের মালিক শান্তভাবে আমার পিছনে পিছনে আসছিলেন। যখনই কোন পাতা কি গাছের গুঁড়ি কিংবা শিকড়ের উপর হাত রেখে আমি সেগুলো সম্পর্কে কিছু বলতে শুরু করেছি তিনি দ্রুত আমার পাশে চলে এসেছেন, তারপর আবার আমি এগিয়ে গেছি আর তিনি ধীরে ধীরে পিছিয়ে গিয়েছেন। তখন যদি কেউ আমাদের দেখত, তার মনে হতো আমিই মালিক আর উনি আমার অতিথি; সত্যি বলতে কি আমার নিজেকে বেশ একটা মালিক মালিক লাগছিল। মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছিল যেন এই প্রথম আসা কোন অতিথিকে আমি বাগানটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি।

এখন আমরা একটা ঘন গাছপালায় ঘেরা লতা মন্ডপ মতো জায়গায় এসে হাজির হয়েছি।

‘এদের ব্যাপারে তুমি অনেক জানো দেখছি,’বললেন তিনি।

‘সবগুলো সম্পর্কে জ্ঞান নেই আমার, তবে এদের চিনি আমি।‘

‘চেনো তুমি?’একটু অবাক হয়ে বললেন তিনি,‘তাহলে ত …’

‘এদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বিশেষ গুণ আছে। কোন কোনটার সম্বন্ধে আমার কিছুটা জ্ঞান আছে, বাকিগুলোর ব্যাপারে বলতে পারবনা। তবে চিনি এদের সব্বাইকেই।‘

‘তা হলে, এইটার কথা বলো আমায়,’লম্বা লম্বা পাতলা পাতাওয়ালা একটা ডাল ধরে টেনে এনে দেখালেন তিনি।

গাছটার নাম বললাম আমি, তারপর বললাম‘কিন্তু এর গুনাগুণ সম্পর্কে কিছু জানা নেই আমার।’

তারপর আমরা সেই বাইরের ঘরটার দিকে ফিরে চললাম। পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে তিনি আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।’

‘নানান জায়গা ঘুরতে ঘুরতে চলেছি,’ বললাম আমি।

চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে ঘরের দরজায় এসে পৌঁছলাম আমরা।

দেখলাম ঘরের বেশীরভাগ আসন-ই দখল হয়ে গেছে। দরজার গোড়ায় থামলাম আমি। মালিক ভিতরে গিয়ে তার আগের জায়গাটিতেই বসলেন। আমাদের এতক্ষণের কথাবার্তায় মনে হয়েছিল তিনি একজন গম্ভীর, খানিকটা বিষণ্ণ প্রকৃতির মানুষ,কিন্তু এই ঘরের লোকজনদের মধ্যে তাঁকে দেখে বেশ হাশিখুশী খোলামেলা লোক বলেই মনে হল। উপস্থিত লোকজনদের পোষাক-পরিচ্ছদবা কথাবার্তার দিকে খুব খেয়াল না করেও মনে হল এদের বেশিরভাগই এনার অতিথি, তবে দু-চারজন ঘরের লোকও আছে।

যে সবদুর্লভ শিল্পসামগ্রী দিয়ে এই ঘরটি সাজানো সেগুলো নিয়ে কথা বলছিল তারা। মালিককে দেখে মনে হচ্ছিল আমার কথা ভুলে গেছেন তিনি, কিন্তু ফিরে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই পিছন থেকে একটু উঁচু গলায় তাঁকে বলতে শোনা গেল, ‘এখনি চলে যেওনা,’ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন তিনি, ‘এই যে অতিথিরা এসেছেন এখানে, এদের সঙ্গে একটু কথা সেরে নিই।’

দরজার দিকে ফিরে যেতে গিয়ে একটু থমকালেন তিনি, তারপর হাসিমুখে বললেন, ‘একদিক থেকে দেখলে তুমিও একজন অতিথি আমার, আবার এও হতে পারে… সে যাক, তোমাকে তাড়াতাড়িই ডেকে নিচ্ছি আমি।’

দরজা থেকে একটু সরে এসে দাঁড়ালাম আমি। এখান থেকে বাগানের কিছুটা দেখা যাচ্ছিল। সারি দিয়ে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা ডালপালাগুলোদেখে মনে হচ্ছে সব একটা আরেকটার গায়ে গলেগলে জুড়ে গেছে। আর, চওড়া পাতার একটা গুল্ম-লতা এই গাছগুলোর একটাকে পাকে পাকে জড়িয়ে সেটার মাথা ছাড়িয়ে আরো একটু উপরে উঠে ঝুল খেয়ে ঐ ঝোপগুলোকে ছাপিয়ে এগিয়ে গেছে। আমি ওদের সবাইকে চিনতে পারছিলাম, একটার পর একটা, কিন্তু আমি জানতামনা, কিংবা মনে করতে পারছিলামনা যে কোনটা কোন কাজে লাগে।

শেষ পর্যন্ত একটা সময় এল যখন আমার মনে হল যে সেই ঘরে জমা হওয়াসমস্ত অতিথিরাই চলে গেছেন, শুধু বাড়ির লোকেরা কেউ কেউ আছেন এখনো। অনেকক্ষণ কথাবার্তার পর তাদের মধ্যেই কেউ একজন বাইরে বেরিয়ে এসে আমাকে তার পিছন পিছন যেতে বললেন।

জনা চার-পাঁচ হাজির ছিলেন সেখানে, এবং তারা প্রত্যেকেই খুব কৌতুহল নিয়েআমাকে দেখছিলেন। তাদের দৃষ্টির সামনে আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলম। শেষে আমায় যিনিডেকে এনেছিলেন সেই লোকটিই এক সময় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তারপর, কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়িয়েছেন আপনি?’

আমি কিছু কিছু বললাম তাকে।

‘তা, কি কি করলেন এ সব জায়গায়?’

সে নিয়েও কিছু কিছু বললাম আমি।

এর পর তারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কিছুবলাবলি করতে রইলেন, আর আমি ঘরটিতে সাজিয়ে রাখা শিল্পসামগ্রীগুলো দেখায় মন দিলাম। একসময় তারা প্রবল হাসিতে ফেটে পড়লেনআর মালিক আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘আমরা তোমাকেও ঐ ওগুলোর পাশে রেখে দিতে চাই,’ শিল্পবস্তুগুলির দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করলেন তিনি ‘কিন্তু মুস্কিল হল, তুমি এখনও বেঁচে আছো।’

‘এরা সবাই অত্যন্ত দামী দুর্লভ জিনিষ,’ বললাম আমি, ‘কিন্তু প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু কমতি আছে, মানে যা তাদের থাকার কথা ছিল, কিন্তু নেই।’

আমার কথাগুলো আদৌ ধর্তব্যের মধ্যে না এনে মালিক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তা, সে যাই হোক, তুমিকি কয়েকটা দিন এখানে কাটিয়ে যেতে রাজি আছো?তোমার জন্যও একটা জায়গা খুঁজে দেওয়া যাবে।’

মালিকের সাথে বাড়ির লোকেদের ঠিক কি কথাবার্তা হয়েছিল তা আমি শুনতে পাইনি, তবেআমার কিরকম মনে হল যেন,যে কোন কারণেই হোক এরা এই বাড়িটার একটা খালিপড়ে থাকা অংশে লোকজন বসাতে চাইছে। আর এই ফাঁকা অংশটা দেখার জন্য আমার ভিতরে একটা কৌতুহল জেগে উঠল, আমি তাই তড়িঘড়ি বলে দিলাম যে আমি কয়েকটা দিন এখানে বিশ্রাম নিতে থেকে যেতে প্রস্তুত।

‘কাল এই সময় এখানে চলে আসুন,’ বললেন মালিক আর আমিও তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

পরদিন আমি দেখলাম মালিক বাগানে ঢোকবার সিঁড়িগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। হয়ত আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

‘এসো,’ বললেন তিনি এবং আমায় নিয়ে বাড়ির পাশের দিকের একটা দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজার ঠিক মুখোমুখি একটা ঘেরা জায়গা। ছোট ছোট হলদে পাতা চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। আমি উপরের দিকে তাকালাম। এলাকার বেশিটা জুড়েছেয়েথাকাপ্রাচীন গাছটা থেকে খসা পাতারা এক ছন্দে একটানা নেমে আসছিল। গাছের গুঁড়ির গায়ে আমার হাতটা বুলিয়ে নিলাম আমি আর মালিক মাথা থেকে, কাঁধ থেকে সেই সব পাতা ঝেড়ে ফেলে একদিকে আঙ্গুল বাড়িয়ে দিয়ে বললেন – ‘ঐ যে, ঐখানে।’

সামনে তাকিয়ে একটি বাড়ির সামনের ছাদ-ঢাকা উঁচুচওড়া বারান্দা দেখতে পেলাম আমি। মালিকের পিছু পিছু সেটায় উঠে এলাম।বহুকাল আগে চুন-সুড়কি খসে যাওয়া ভাঙাচোরা ছাদেরবেশিটাই খানিকটা নেমে এসেছে, তবে দেয়ালগুলো মজবুত আছে। বারান্দার বাঁদিকের দেয়ালে একটা ছোট দরজা, পাশের ঘরে যাওয়ার। দরজাটা দেখে অবশ্য মনে হচ্ছিল বহুকাল সেটা খোলা হয়নি। কাঠগুলোর আর জোর নেই তেমন। আমি আস্তে করে একদিকের পাল্লা ধরে চাপ দিলাম, কিন্তু সেটা খুললনা।

‘এইটা একসময় লাগোয়া ভাঁড়ার ঘর ছিল’ মালিক জানালেন, ‘কিন্তু এর ছাদ খসে নেমে এসেছে। এখন ঘরটাভাঙাচোরা ইঁট-কাঠের টুকরোয় ভর্তি। বারান্দাটাই শুধু এখনঠিকমত দাঁড়িয়ে আছে।‘

‘এই বারান্দার ছাদটাও গেছে…’

‘না এই ছাদটা বরাবরই ঐরকম,’ বলেন তিনি।

‘কিন্ত দরজাটা…’

‘ভাঙ্গাচোরা ইঁট-বালির স্তুপে দরজাটা ভিতর থেকে আটকে গেছে,‘ বললেন তিনি, ‘তুমি যদি মনে কর এই বারান্দাটায় থাকতে পারবে …’

‘পারব বলেই মনে হয়’, বললাম আমি।

‘তিনটে সমস্যা হবে তোমার,’জানালেন তিনি, ‘দেয়ালের ওপাশে একদল কুকুর আছে। কখনো কখনো ওরা যখন ডাকতে শুরু করে, সারা রাত চেঁচিয়ে যায়। ঘুমের অসুবিধা হবে তোমার।‘

‘আমি এমনিতেই কম ঘুমাই,’ বললাম আমি, ‘আর, যখন ঘুমাই, মনে হয়না কোন কুকুরের ডাক আমার ঘুম ভাঙ্গাতে পারবে।‘

‘আর যখন বৃষ্টি হয়, জলের ছাঁট আসে এখানে।‘

‘কোন না কোন অংশ থাকেই যেখানে ছাঁট পৌঁছতে পারেনা।‘

‘তা থাকে,’ বললেন তিনি, ‘কিন্তু তোমাকে বারে বারে জায়গা বদলাতে হতে পারে। আর কখনো কখনো হঠাৎ করেও বৃষ্টি এসে যায়, তখন আরও সমস্যায় পড়ে যাবে তুমি।‘

‘আমার কোনও সমস্যা হবেনা।‘

‘জায়গাটা আদৌ থাকার জন্য সুবিধার না,’ এমন একটা সুরে বললেন তিনি, যা একইসাথে কিছুটা বিষণ্ণ এবং কিছুটা কৈফিয়ৎ দেওয়া ধরণের।‘আমি চেয়েছিলাম তুমি এখানে কটা দিন থেকে একটু বিশ্রাম নিয়ে নাও।‘

‘আমার কোন অসুবিধা হবেনা, সত্যি বলছি।‘

‘আর হ্যাঁ, তিন নম্বর সমস্যা,’ মনে পড়ে গেল তাঁর আর মেঝের দিকে দেখালেন, ‘মাঝে মাঝে ঘষটে চলার দাগ দেখা যায় এখানে। আমার মনে হয় ভাঁড়ার ঘরটায় …’ থেমে গেলেন তিনি, কেঁপে উঠলেন একটু। আমি মেঝের দিকে তাকালাম। সদ্য সদ্যই ঝাঁট দিয়ে পরিস্কার করা হয়েছে যায়গাটা।

‘সাপশুধু শুধু নিজে থেকে কাউকে কামড়ায়না,’ বললাম আমি। ‘তাছাড়া, সব সাপ বিষাক্তও নয়।‘

‘তা হলে তুমি বলছ, এখানে বিশ্রাম নিতে পারবে তুমি?’

‘পারব বলেইত মনে হচ্ছে,’ বললাম আমি, ‘কিন্তু তাতে যদি অন্যদের অসুবিধা হয় তবে…’

‘লোকজন এদিকটায় খুব কমই  আসে,’ বললেন তিনি। ‘কারো কোন অসুবিধা হবেনা, সত্যি বলতে কি কারো নজরেই পড়বেনা যে তুমি এখানে আছ।‘

মালিক যেমন বলেছিলেন, লোকজন কালে-ভদ্রে বাড়ির এই দিকটায় আসে। অবশ্য মাঝেসাঝে কোন ঠোঁট-ফোলানো বাচ্চা এখানে এসে এদিক ওদিক ঘুরতে থাকে আর একটু পরেই তাকে খুঁজতে পাশের দিকের দরজাটা দিয়ে বড়রা কেউ এসে হাজির হয় তারপর তাকে শান্ত করে বাড়ির ভিতরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বড়দের আসতে দেরী হলে আমি বাচ্চাটির মন ভোলাতে চেষ্টা করতাম, কিন্তু এই বাড়ির বাচ্চারা আমার সাথে সহজ বোধ করতনা।

একদিন একটি বাচ্চা পাশের দরজাটা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে এসে অনেকক্ষণ ধরে গাছটার তলায় বসে রইল। তার মন ভাল করে উঠতে না পেরে আমি বড়দের কারো দেখা পাওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকলাম। কিন্তু বাড়িতে সেদিন বড় রকম কোন ঝামেলা চলছিল মনে হয়। বাচ্চাটি ইতিমধ্যে কান্না থামিয়ে মাটির ঢেলা তুলে তুলে গাছের ডালে ছুঁড়ে মেরে খেলতে শুরু করেছিল।

‘গাছটাকে জ্বালাতন করছ কেন?’ প্রশ্ন করলাম আমি। কিন্তু ইতিমধ্যেই আমার মন তার থেকে সরে গিয়েছিল, আমিও তার জগৎ থেকে মুছে গিয়েছিলাম। হঠাৎ সে চিৎকার করে কেঁদে উঠলে তার দিকে ফিরে তাকালাম আমি। কপাল বেয়ে রক্তের ধারা নেমে এসেছে।বারান্দা থেকে নেমে এসে ওকে কোলে তুলে নিলাম। গভীর হয়ে কেটে গেছে, রক্তও বন্ধ হচ্ছিলনা। ক্ষতটা শক্ত করে চেপে ধরে রেখে বাচ্চাটাকে কোলে করে বাগানের দিকে পা বাড়ালাম আমি। সিঁড়ির কাছাকাছি পৌঁছে পিছন থেকে একটা গলা শুনতে পেলাম, ‘কি হয়েছে?’ বাইরের ঘরটি থেকে মালিক এগিয়ে এসেছেন।

‘কি হয়েছে ওর?’ বাচ্চাটির দিকে উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি। বললাম কি হয়েছে, তাতে ওনার উদ্বেগ আরো বেড়ে গেল।

‘ওর রক্তে কিছু গণ্ডগোল আছে,’ আমায় জানালেন তিনি।‘খুব চট করে ওর ক্ষত বিষিয়ে যায়।‘

‘এইটা বিষোবেনা,’বাগানে নামতে নামতে বললাম আমি।

মালিক আমার পিছন পিছন এলেন। আমি বাচ্চাটিকে কোল থেকে নামিয়ে মাটির উপর এক জায়গায় বসিয়ে দিলাম। এতক্ষণে সে শান্ত হয়ে গেছে এবং ভয়ে ভয়ে মাথা ঘুরিয়ে একবার মালিককে একবার আমায় দেখছিল।

মালিক বললেন, ‘ঐ জায়গাতেই ও এর আগেও একবার চোট পেয়েছিল এবং প্রায় মরতে বসেছিল।‘

ইতিমধ্যে যে পাতাগুলো আমি খুঁজছিলাম সেগুলো পেয়ে গেছিলাম। সেগুলোকেকচলে ফোঁটা ফোঁটা রস বার করে বাচ্চাটির ক্ষতের উপর লাগিয়ে দিলাম আর আর তারপর থেঁতো করা পাতাগুলো দিয়ে ক্ষতটা ঢেকে দিলাম।

‘পাতাগুলো সারা রাত এইভাবে দিয়ে রাখুন। আমি আবার কাল সকালে দেখব ওকে।’

‘এতেই হয়ে যাবে?’সন্দেহ নিয়ে প্রশ্ন করলেন মালিক।

‘কাল সকালে আবার ওকে দেখব আমি,’ আরেকবার বললাম। মালিক বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিয়ে ভিতরে চলে গেলেন।

সকালের মধ্যেই বাচ্চাটির ক্ষত প্রায় শুকিয়ে গিয়েছিল।

এই শুরু হল আমার এই বাড়ির লোকেদের কাটা-ছেঁড়ার চিকিৎসা করা। কিছুদিনের মধ্যেই বাড়ির বাইরে থেকেও এরারোগীদের আমার কাছে চিকিৎসার জন্য পাঠাতে শুরু করলেন। বাড়ির বাইরের লোকেরা বেশির ভাগই আসত অনেকদিনের পুরনো ক্ষত নিয়ে। কিন্তু সেগুলো সবই বাগানে যে সব গাছ-গাছালি পাওয়া যায়, তাই দিয়ে সারিয়ে ফেলা যেত। তবে সেই কাজটা করতে গিয়ে মাঝে মাঝে আগুন আর রান্নারবাসন ইত্যাদি লাগত। ঐ সব সময়ে মালিক বাড়ি থেকে বাসন-পত্র পাঠিয়ে দিতেন। কখনো কখনো নিজেই সেসব বয়ে নিয়ে আসতেন আর অনেকক্ষণ ধরে আমার কাজ-কর্ম দেখতেন।

ঐরকম একদিন যখন তিনি আমার কাজ দেখছিলেন আমি একটা নুতন পাত্র আগুনে বসিয়ে তার মধ্যে কিছু শিকড়ের টুকরো ছেড়ে দিতেই পাত্রের ভিতরটা কালো হয়ে গেল। আমি মালিককে বললাম, ‘কিছু কিছু মাল-মশলা পাত্র নষ্ট করে ফেলে; এইটা খারাপ লাগে আমার।’

‘কিন্তু তুমি যা বানাও তার দাম ঐ পাত্রগুলোর থেকে অনেক বেশি।‘

‘তা ছাড়াও,’ বললাম আমি, ‘নুতন পাত্রে আমার কাজের অসুবিধা হয়। পুরনো বাসন-কোসন যদি আপনার থাকে কোথাও …’

‘আমার মনে হয় সে বন্দোবস্ত করা যাবে,’বললেন তিনি, দেখে মনে হচ্ছিল কিছু একটা মাথায় ঘুরছে তার, তারপর উঠে ঘরে চলে গেলেন।

অল্প কিছু পরেই যে বাচা ছেলেটির কপাল কেটে গিয়েছিল সে এসে পুরনো দেখতে নানা রকম পাত্র আমার সামনে নামিয়ে রেখে গেল। কোন কোনটার হাতল ভাঙ্গা, কারও আবার ঢাকনা নেই, কিন্তু আমার যা কাজ তার জন্য সেগুলো সব কটাই রীতিমত ঠিকঠাক। একটাকে তুলে উনুনে বসাতে যেতেই আমার হাতটা থেমে গেল, আমি পাত্রটা নামিয়ে রাখলাম। আর তারপর সব কটা পাত্র জড়ো করে বাইরের ঘরটিতে নিয়ে গেলাম।

মালিক তার নির্দিষ্ট আসনে বসে আছেন, মাথাটা সামনে ঝুঁকে রয়েছে। আমার পায়ের শব্দ পেয়ে মাথা তুললেন তিনি। আমি ওনার পায়ের কাছে পাত্রগুলো নামিয়ে রাখলাম এবং ঘরের শিল্পবস্তুগুলোর দিকে তাকালাম। সেগুলোর মাঝের ফাঁকা জায়গাগুলোর জন্য ঘরটাকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে, কেমন যেন অসম্পূর্ণ লাগছে। এদিকে মালিক আমার দিকে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছেন।

‘এগুলো ওখান থেকে সরিয়ে নিয়েছেন কেন আপনি?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি। উনি আমার দিকে আরো গভীরভাবে তাকালেন। আমি বুঝতে পারলাম আমার কথার সুর প্রায় জবাবদিহি চাওয়ার মত শোনাচ্ছে, কিন্তু সেটা পাল্টাতে পারার আগেই তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আমি ওগুলো সরিয়ে দেওয়ায় খুশি হওনি তুমি?’

‘কতকাল ধরে এখানে আছে ওগুলো … হয়ত একেবারে গোড়া থেকেই,’ বললাম আমি। ‘ওগুলো ছাড়া আপনার এই ঘরটা মানায়না।’

খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন তিনি, তারপর তার ঠোঁটে একটা হাল্কা হাসি খেলে গেল। ‘তুমি যেদিন প্রথম এ ঘরে এলে,’ বলে চললেন তিনি, ‘আমি তোমায় বলেছিলাম যে আমরা তোমাকে ওদের কাছাকাছি রেখে দিতে চাই।’

‘মনে আছে আমার,’ বললাম আমি, ‘কিন্তু মুস্কিল হল, আমি তখন বেঁচে ছিলাম।’

‘এবং এখনো তাই আছো,’ বলতে বলতে তার হাসি আরও চওড়া হতে উঠল। তারপর তিনি হঠাৎ করেই খুব গম্ভীর হয়ে গেলেন। ‘সেই কারণেই তুমি ওদের সাথে থাকতে পারোনা। কিন্তু ওরা ত তোমার সাথে থাকতে পারে। কি, পারে না?’

‘পারে,’ ধীরে ধীরে বললাম আমি, ‘কারণ ওরা বেঁচে নেই।’

“ওরা বেঁচে নেই,” আমার শেষের কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি, যেন প্রতিধ্বিনি করছেন।

‘কিন্তু ওগুলো ছাড়া এই ঘরটা যে …’

‘আমি সব ঠিক করে সাজিয়ে নেব আবার,’ বললেন তিনি, ‘যাতে ওগুলোর অনুপস্থিতি বোঝা না যায়।’

তিনি আসন থেকে উঠে পড়ে দ্রুতহাতে শিল্পসামগ্রীগুলোকে নাড়াচাড়া করতে শুরু করে দিলেন। তারপর থেমে গিয়ে আমার দিকে ফিরে বললেন, ‘তবে এদের না থাকায়তোমার থাকাটা টের পাওয়া যায়।’

তিনি আবার শিল্পসামগ্রীগুলোর দিকে ফিরলেন। আমি পাত্রগুলো তুলে নিয়ে আমার থাকার বারান্দায় ফিরে এলাম।

আগেকার দিনের ধাতুর তৈরী পাত্র সব। ওগুলোতে যে কোন কিছু বানালে সেসবের কার্যকারিতা অনেকগুণ বেড়ে যায়।

সেই থেকে ঐ পাত্রগুলোর কোন না কোনটা সব সময় আগুনের উপর বসানো থাকত আর আমি বাধ্য হতাম রোজ অন্ততঃ কয়েক দফা বাগানে ঢুঁ মেরে আসতে। এমনকি যখন তেমন দরকার পড়তনা, তখনও যেতাম, স্রেফ ঐ সব লতা-গুল্ম ঝোপঝাড়ের মাঝখান দিয়ে ঘুরে বেড়াতাম।, যেদিন থেকে বুঝতে শুরু করলাম যে আমার আসল বিশ্রামের জায়গা ছিল ঐ বাগান, বারান্দাটা নয়, যদিও বারান্দাতেই বেশির ভাগ সময় কেটে যেত আমার, ওদের মাঝখানে বসে কখনো কখনো একটু জিরিয়েওনিতাম। এখান থেকে ছোট ছোট পাতার গাছটির রূপ বদলানো ভালো করে নজর করতে পারতাম।

কখনো কখনো তার ডালপালা পাতায় পাতায় ভারী হয়ে উঠত, তার তলায় বিছিয়ে দিত ঠাণ্ডা ছায়া। আবার কখনো তার হলদে হয়ে যাওয়া পাতারাগোটা জায়গা জুড়ে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকত। কাঠি কাঠি ডালপালার মাঝখান দিয়ে আসা রোদের কিরণের দিকে তাকিয়ে মনে হত গাছটা বোধহয় শুকিয়ে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তারপর একদিন সেইসব ডালে নূতন মঞ্জরী আসত, এবং কখনো কখনো গোটা গাছটা পাতা আসারও আগে ফুলে ফুলে ছেয়ে গিয়েরাঙা হয়ে উঠত।ধীরে ধীরে ফুলেরা অদৃশ্য হয়ে যেত আর তাদের জায়গায় সবুজ পাতারা এসে গাছ ভরে ফেলত।

একদিন আমি নিরাবরণ ডালগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি ঠিক কোথায় কোথায় নূতন অংকুররা প্রথম বের হয়ে আসবে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যেন আমার চোখের সামনেইকোন কোন ডালেরএখানে ওখানে হাল্কা সবুজরংয়ের বিন্দুর ফুটে ওঠা দেখতে পাচ্ছি। যখন ঐ সবুজ বিন্দুগুলোকেকাছে থেকে নজর করার জন্য বারান্দা থেকে নেমে গাছেরদিকে এগোচ্ছি, বাড়ির ওদিক থেকে একটা গোলমালের মত কিছু শুনতে পেলাম। পাশের দিকের দরজা দিয়ে অনেক লোক হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসে সদর দরজার দিকে ছুটে গেল। তাদের মধ্যে কয়েকজন আবার ফিরে এসে পাশের দরজাটা দিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। সেইদিনই প্রথম বাড়ির ভিতরে কি চলছে তাই নিয়ে আমার কোন কৌতূহল জেগেছিল,কিন্তু আমি শুধু চুপ করে বারান্দা আর গাছের মাঝামাঝি জায়গায় দাঁড়িয়ে পাশের দরজা দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে আসা-যাওয়া করা লোকদের দেখে গেলাম। প্রথম দিকে সবাই চুপচাপ ছিল, তারপর তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করতে শুরু করল। বহুবার আমার উপর তাদের নজর পড়েছে, কিন্তু কেউ আমায় কিছু বলেনি। বাড়ির ভিতরের হট্টগোল ক্রমাগত বেড়ে উঠছিল। শেষ পর্যন্ত পাশের দরজা দিয়ে এইমাত্রবের হয়ে আসা একজনকে থামালাম আমি। সে দোনামোনা করতে করতে আমায় হট্টগোলের কারণটা জানাল। বাইরের ঘরটিতে নিজের চেয়ারে বসে থাকা অবস্থাতেই মালিক মারা গেছেন।

আমি গাছের তলায় গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে পড়লাম। আমার মনে পড়ল যে সেদিন সকালেই আমি ওনাকে দেখেছিলাম। আমি যখন বাগানের সিঁড়ি ধরে নামছিলাম, বাইরের ঘরটি থেকে বের হয়েআমার কাছে এসেছিলেন উনি। সেখানে দঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ আমায় নানা রকম ক্ষত আর তাদের সারানোর উপায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। তারপর আমি বাগানে নেমে গিয়েছিলাম। আমি যখন নানা রকম পাতা আর ছালেরগোছা নিয়ে ফিরে আসছি আবার দেখি তিনি ঐ সিঁড়িগুলোর কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমায় আমার সাথের পাতা আর ছালগুলোর গুণ নিয়ে প্রশ্ন করলেন, ছদ্ম গুরুত্ব নিয়ে বললেন যে তার ইচ্ছে করে যদি তার একটা ক্ষত থাকত আর আমি সেটা সারিয়ে তুলতাম। তার শেষ কথাগুলো আমার কানে বাজছে, হাসতে হাসতে বলেছিলেন তিনি, ‘তবে, ক্ষতটাআমার পছন্দের হতে হবে।’

ঈশ্বর জানেন কেমন ক্ষত নিজের জন্য চেয়েছিলেন তিনি। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম আর তখন নাকে একটা পোড়া গন্ধ এসে লাগল। আমি সামনের দিকে মুখ তুলে তাকালাম। বারান্দাটা ধোঁয়ায় ভরে গেছে, কিন্তু আমি গাছতলাতেই দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি জানি, ঢাকনা খোলা পুরনো বাসনটায় যা ফুটছিল সেটাই উপচিয়ে পড়ে আগুনটাকে নিভিয়ে দিয়েছে।

এরপর অনেকদিন আমি আর বারান্দা থেকে নামিনি। বাড়িটায় ইতিমধ্যে প্রশান্তি ফিরে এসেছে। অভিমানী বাচ্চারা আবার বাগানে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে। কখনো কখনোআমার সাথে দু-চারটে কথাও বলছে। তাদের সাথে কথাবার্তা থেকেই আমি অনুমান করলাম, প্রথমদিন যে লোকটি বাইরের ঘরটি থেকে বেরিয়ে এসে আমায় সাথে করে ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনিই এখন এ বাড়ির মালিক।

একদিন নূতন মালিক একটি বাচ্চা ছেলেকে দিয়ে আমায় বাইরের ঘরে ডেকে পাঠালেন কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি ঘরটি ভিতর থেকে বন্ধ। আমি ফিরে এলাম। কয়েকদিন বাদে তিনি আবার আমায় ডেকে পাঠালেন এবং আবারও আমি দেখলাম, ঘরটি ভিতর থেকে বন্ধ। বেশ কয়েকবার এই কাণ্ড ঘটল। শেষে একদিন আমি ফিরে আসতে গিয়ে থেমে গেলাম আর দরজায় আস্তে করে টোকা দিলাম। দরজা খুলে গেল। আমার সামনে নূতন মালিক দাঁড়িয়ে আছেন।

‘ভিতরে আসুন’ আগের মালিকের চেয়ারটিতে বসে বললেন তিনি।

‘এর আগেও বেশ কয়েকবার এসেছি,’ ঘরে ঢুকতে ঢুকতেবললাম আমি, ‘কিন্তু দরজা …’

‘হ্যাঁ,’ বললেন তিনি, ‘আমি ওটা বন্ধ করে রাখি।’

আমি ঘরটায় চট করে একবার চোখ বুলিয়ে নিলাম। আমার ঠিক সামনেই দেয়ালে আগের মালিকের ছবি ঝুলছে। আর, বাসনগুলো সরিয়ে নেওয়ায় শিল্পসামগ্রীগুলোর মাঝে যে ফাঁকগুলো তৈরী হয়েছিল তারা এখনো সেই একই রকম আছে। আমি ছবিটির দিকে এগিয়ে গিয়ে ভাল করে দেখতে থাকলাম। ‘উনি সব সময় অনেক যত্ন নিয়ে আমাদের সবার দেখাশোনা করতেন’ বর্তমান মালিক বললেন। তারপর আমি যতক্ষণ ছবিটি দেখছিলাম অনেকটা সময় নিয়ে আগের মালিকের কথা বললেন তিনি। মাঝে মাঝেই বাসনগুলোর ফেলে যাওয়া শূণ্য জায়গাগুলোর দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল আমার।

শেষে এক সময় বললাম আমি, ‘উনি আমাকেও অনেক যত্ন নিয়ে দেখাশোনা করতেন।’

‘সেই জন্যই আপনাকে এখানে ডেকে পাঠিয়েছি আমি,’ বললেন তিনি। ‘ওনার আশা ছিল যে আপনি আর কোথাও চলে যাবেননা।’ একটু থামলেন তিনি, এবং তারপর যোগ করলেন, ‘আর আমিও সেটাই আশা করি।’

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর আমি বললাম, ‘যাবনা আমি,’ আর ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য পিছন ফিরলাম।

‘কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন আপনি এখানে বিশ্রাম নিন,’বলতে শুনলামতাকে। ‘আপনার সত্যিই বিশ্রাম নেওয়া খুব দরকার।’

ওনার গলার স্বরে কিছু একটা আছে বলে আমার মনে হল, আর তাই দরজায় পোঁছে থেমে গেলাম।

‘আমার এখানে কোন অসুবিধা হচ্ছে না,’উত্তর দিলাম আমি।

আমি যখন অনেকটা সময় নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছি, কিছু একটা বলতে চেয়ে তারপর দ্বিধা নিয়ে থেমে গেলেন তিনি। শেষে এক সময় চেয়ার ছেড়ে আমার কাছে উঠে এলেন।

‘এই ছন্নছাড়া বাগানটা আদৌ এই বাড়ির সাথে মানায়না,’ থেমে থেমে বললেন তিনি। ‘সবার ইচ্ছে ছিল এটাকে নূতন করে সাজিয়ে নিতে।  উনিও চেয়েছিলেন’–ছবিটার দিকে দেখালেন তিনি – ‘কিন্তু …’ একটু দ্বিধা করলেন তিনি, তারপর একটা দম নিয়ে বলে ফেললেন, ‘সত্যি কথা বলতে গেলে, এটাকে আদৌ কোন বাগান বলে মনে হয়না।’

‘সত্যি কথা বলতে গেলে, এটা আদৌ কোন বাগান নয়ও,’নরম গলায় বললাম আমি।

এরপর অনেকক্ষণ কোন কথা বলিনি আমি, তিনিও না। শেষে, একবার গলা খাঁকারি দিয়ে পরিষ্কার করে নিয়ে তিনি বললেন, ‘আপনার জন্য অনেক যত্ন নিতেন উনি।’

‘আপনি যদি দরজাটা একটুক্ষণের জন্যখুলে রাখেন …’দরজা দিয়ে বের হয়ে আসতে আসতে বললাম আমি।

বারান্দায় গিয়ে আমি সমস্ত বাসনগুলোকে জড়ো করলাম তারপর তাদের সাথে করে বাইরের ঘরে নিয়ে এলাম। নিজের চেয়ারে বসেছিলেন তিনি।

‘কিন্তু উনি ত আপনাকে এগুলো দিয়ে গিয়েছিলেন,’আমার দিকেমনোযোগ দিয়ে তাকিয়েথেকে বললেন তিনি।

‘খালি জায়গা ভাল দেখায় না,’ পাত্রগুলো জায়গামত ফিরিয়ে রাখতে রাখতে বললাম আমি। তিনি চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর আমি যখন কাজ শেষ করে দরজার দিকে ফিরে যাচ্ছি, তিনি বললেন ‘, এবার কিন্তু আপনার সত্যিই বিশ্রাম নেওয়া দরকার, আর উনি যেমন চেয়েছিলেন’ – আবার ছবিটার দিকে দেখালেন তিনি –‘এখানেই থাকা উচিত আপনার।’

আমি এখনবিশ্রামে থাকি। কিন্তু আমার কৌতুহলকে আমি পুরো প্রশ্রয় দিয়ে রেখেছি। এই বাড়িতে যা কিছু শ্বাস-প্রশ্বাস নেয় তাদের সম্পর্কে আরো বেশি বেশি করে আমি জানতে চাইছিআজকাল। প্রথম প্রথম বাড়ির বয়স্করা বিস্তারিতভাবে আমার প্রশ্নের উত্তর দিত। তারপর তাদের সন্দেহ হতে শুরু করে যেকোন প্রশ্ন করার পর সেটার উত্তর শুনতে বিশেষ আগ্রহী নই আমি বা উত্তর শোনার সাথে সাথেই সেটা আমি ভুলে গিয়েছি। পরে তারা নিঃসন্দেহ হয়ে যায় যে এমনকি তারা কোন উত্তর দেওয়ার আগেই আমি আমার নিজের প্রশ্নটাও ভুলে গিয়েছি। তাই আজকাল আর আমি এতে অবাক হইনা যে আমার কোন কিছু নিয়ে তাদের কোন প্রশ্ন করা তারা আর পছন্দ করেনা, এবং তাদের একজন ত একদিন ঝাঁজিয়েই উঠল, ‘বকবক করাটা তোমার একটা রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

বাচ্চাদের আর উঠোনে দেখতে পাওয়া যায়না। শুধু একটি বাচ্চা ছেলে মাঝে মাঝে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। আমি জানি এই ছেলেটিই এই বাড়ির পরবর্তী মালিক হবে। আমার সাথে সে খুব সহজ ভাবেই মেশে, কিন্তু যখনই আমি তাকে কোন প্রশ্ন করি সে এমনভাবে তার উত্তর দেয় যে সেটা নিয়ে আমি যদি সত্যিই ভাবতে বসি আমার মাথা ঘুলিয়ে যাবে, কিন্তু আমি ও নিয়ে মাথা ঘামাইনা, যদিও সে ভাবে আমি মাথা ঘামাচ্ছি। এই ছেলেটিই আমায় জানিয়েছিল যে নূতন বাগান বানানোর পরিকল্পনা হচ্ছে, যদিও এর কোন অর্থ খুঁজে পাইনি আমি। যা’ই হোক, এইমাত্র কি জিজ্ঞেস করেছি সে কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে আমি বাগানটির সমস্ত খুঁটিনাটি ফিরে ফিরে জানতে চাইতাম তার কাছে। শেষে একদিন পুরোপুরি থকে গিয়ে সে আমায় সেই পুরনো কথাটাই আবার বলল, ‘তুমি আমার সাথে এসে নিজের চোখেই একবার দেখে যাচ্ছনা কেন?’ আর তারপর আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বাড়িতে ঢুকে গেল।

বাড়িটিতে লোকজনের আসা-যাওয়া চলতেই থাকে আর ছেলেটি আমাকে তাদের সম্বন্ধে জানিয়ে যায়। কিন্তু জানানোর সময় সে ইচ্ছে করেইকিছুটাকথা চেপে যায় যাতে আমি তাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চলি, আর সে আমায় ক্রমাগত আধা-খ্যাঁচড়া উত্তর দিয়ে যেতে পারে।

একদিন সে ছুটতে ছুটতে আমার কাছে এসে বলল, ‘তোমার অতিথি এসে গেছে।’

‘আমার অতিথি?’

‘এইবার এই বারান্দাটা তোমার থেকে নিয়ে নেওয়া হবে।’

‘অতিথিটি নিয়ে নেবে?’

‘না, রুগীটি, অতিথিটি নয়।’

‘রুগী? কি রোগ হয়েছে তার?’

ছেলেটি তার ঠোঁটের উপর আঙ্গুল টিপে ধরল, হাতটা এমনভাবে সামনে পিছনে নাড়ালো যেন ‘না’ বলছে, আর আমার পরের প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করে থাকল। কিন্তু আমি তাকে আর একটা প্রশ্নও করলামনা।সে ভয়ের ভান করে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর হঠাৎ করে গলায়একই রকমমিথ্যে ভয়ের সুর এনে বলল, ‘পালাও, সে আসছে,’ আর তারপর লাফিয়ে উঠে পাশের দরজার ওপাশে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আমি দেখলাম, সত্যি-ই একজন লোক বাড়ির চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়েছেন এবং এরই মধ্যে গাছটা পর্যন্ত চলে এসেছেন, পিছন পিছন আসছেন মালিক এবং বাড়ির আরও কয়েকজন। তারা গাছটার নীচে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন। মালিক লোকটিকে কিছু বোঝাচ্ছিলেন। তারপর ধীর পায়ে তারা সবাই বারান্দার সামনে এসে দাঁড়ালেন। অতিথিটির চোখজোড়া জমিটা জরিপ করে নিচ্ছিল, যেন তিনি কিছু খুঁজছিলেন। ইচ্ছে করেই খুব আস্তে আস্তে এগোচ্ছিলেন তিনি, কিন্তু তাকে দেখে আদৌ অসুস্থ বলে মনে হলনা। আমার থেকে একটু দূরে এসে থেমে গেলেন তিনি। এমনকি এখনো তিনি আধখোলা চোখে মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন। মালিক তার দিকে সরে এসে বললেন, “এই বারান্দাটাই শুধু।”লোকটি বড় করে চোখ খুলে তাকালেন,  মাথাটা তুললেন, ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এক ঝলক দেখে নিলেন – বাড়ির চৌহদ্দি, গাছটি, পাশের দিকের দরজাটি, বারান্দা, এবং আমাকেআর তারপর চলে যাওয়ার জন্য মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। আমার মনে হল যেন তিনি যা কিছুর উপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে নিয়েছিলেন সেই সমস্তই মাত্র এক সেকেণ্ডের ব্যবধানে একবার তার চোখের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গিয়ে আবার ফিরে চলে এলো।

এখন তারা পাশের দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে যাচ্ছেন। তার চোখগুলো একটুক্ষণের জন্যও আমার মুখেরউপর স্থির হয়ে থাকেনি, তা সত্ত্বেও আমার মনে হল, আমি যেন এইমাত্র সরাসরি একটা ভুলভুলাইয়ার বাইরে এসে দাঁড়িয়েছি।

রোগীর সম্পর্কে আমার কৌতুহলী হওয়ারই কথা। ছেলেটি মাঝে মাঝেই আমার সাথে দেখা করে যেত আর নিজে থেকেই তার কথা তুলত, কিন্তু আমি যেহেতু জানতাম আমার কোন প্রশ্নেরই সে সোজাসুজি জবাব দেবেনা, আমি তাকে ঐ কথা ছাড়া অন্যান্য সব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করে যেতাম। শেষ পর্যন্ত সে অসুস্থ মানুষটিকে নিয়ে কথা বলাই বন্ধ করে দিল। কিন্তু সেটা আমার দ্বিধা আরোইবাড়িয়ে দিল; এতটাই যেএকদিন আমি নিজেই তাকেজিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেমন আছে তোমার রোগী?’

‘যে মেয়েটি তার দেখাশোনা করতে আসে, তুমি তাকেই জিজ্ঞাসা করছনা কেন?’ বলল সে, ‘ওত এই এলাকাতেও এসে ঘুরে যায়।’

‘এখানে?’

‘অনেকক্ষণ ধরেই ত গাছের নীচে বসে থাকে সে,’ বলল ছেলেটি, ‘মনে হয় আজকাল তুমি আর চোখে দেখনা ঠিক মতন।’

এখন আমার খেয়াল হল যে ঠিকই ত, কোন কোন দিন গাছটির নীচে আমি একটি মেয়েকে দেখেছি, কিন্তু আমি তাকে অতিথিদের কেউ বলে ভেবে নিয়েছিলাম।

‘মেয়েটি তা হলে ঐ অসুস্থ লোকটির দেখাশোনা করে?’

‘না, তোমার দেখাশোনা করে,’ বিরক্ত হয়ে বলল সে, আর উঠে পড়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল।

ঐ দিনই মেয়েটি যখন গাছের নীচে এসে বসল, আমি বারান্দা থেকে নেমে এলাম। সে আমায় দেখে আমার কুশল-মঙ্গল জিজ্ঞাসা করল। আমি তার কাছে এগিয়ে গেলাম। সে তড়িঘড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল আর আমি দ্রুত তাকে অসুস্থ লোকটির সম্পর্কে একটার পর একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম। কিন্তু তেমন কিছু খবর তার থেকে বার করতে পারলামনা আমি। সে নিজেও খুব অল্পই জানত, তবে যতটুকু জানত, সে আমায় তা জানিয়েছিল।

ওর কাছ থেকে যা জানলাম তা এই যে অনেক প্রজন্ম ধরে এই বাড়িতে যারা আছেন তাদের আর এই অসুস্থ মানুষটির পরিবার পরস্পর খুব ঘনিষ্ঠ। এই লোকটি বাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে গিয়েছিলেন। এই বাড়ির লোকেরা যখন তাকে খুঁজে পায়, এই মেয়েটি ছাড়া লোকটির পরিবারের আর কেউ বেঁচে ছিলনা। লোকটি কাউকে বলেননি কোথায় কোথায় তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন, কিন্তু এখন তিনি এই বাড়িতে থাকতে চেয়েছেন।

‘কি অসুখ হয়েছে ওনার?’ জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

‘উনি কোন কথা বলেননা,’ মেয়েটি জানাল।

‘গলায় কিছু হয়েছে ওনার?’

‘না, উনি নিজের থেকেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন।’

‘কেন?’

‘আমি জানিনা।’

‘তুমি ওনার কাছে জানতে চাওনি?’

‘কি লাভ? উনি ত কথা বলাটাই ছেড়ে দিয়েছেন, তাই না?’

বুঝলাম আমার প্রশ্নটার কোন অর্থ হয়না।

এরপর থেকে, যখনই সে এদিকে আসত, আমি বারান্দা থেকে নেমে আসতাম। সে আমার খোঁজখবর নিত আর আমি তার সাথে হরেক রকম গল্প করতে করতে লম্বা সময় কাটিয়ে দিতাম। তাকে নানাভাবে খুশি রাখার কাজটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম আমি। মাঝে মাঝে আমি তাকে অসুস্থ লোকটির সম্পর্কেও প্রশ্ন করতাম, অবশ্যই শেষে জুড়ে দিতাম, ‘আমি অন্ততঃ একবার ওনার সাথে দেখা করতে চাই।’

একদিন সে আমায় জানাল যে বাড়ির সকলে বিয়ের নিমন্ত্রণে বাইরে কোথাও গিয়েছে, এবং আমি চাইলে অসুস্থ লোকটির সাথে এখন দেখা করতে পারি।

আজ পর্যন্ত এ বাড়ির লোকেরা আমায় বাড়ির ভিতরে আসতে বলেনি। আমার হয়ত সত্যিই ভিতরে যাওয়া উচিত নয়। আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম আর তারপরমেয়েটির সাথে বাড়ির পাশের দিকের দরজাটি দিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। বাড়ির ভিতর নানা অংশ পার হয়ে এমন একটা অংশে এসে পড়লাম যেটার বেশিটাতেই কেঊ থাকেনা বলে মনে হল। একটা ঘরের খোলা দরজার সামনে এসে আমায় অপেক্ষা করতে বলে সে নিজে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল।

আমি দরজা থেকে রোগীকে দেখলাম। বিছানায় বসে ছিলেন তিনি আরমনে হচ্ছিল যেন তার চোখদুটো মেঝেতে কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ বাদে তিনি মাথা তুলে মেয়েটিকে দেখলেন এবং সে আমায় ভিতরে ঢুকতে ইশারা করল। একটু দ্বিধার পর ঢুকে পড়লাম আমি। রোগীর চোখগুলো আবার মেঝেতেকিছু খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে কিন্তু আমার কেমন যেন মনে হল, তিনি আসলে, আমাকে দেখছেন। শেষে এক সময় তিনি মাথা তুলে মুখটা আমার দিকেঘোরালেন।

আমরা চুপ করে, অনন্তকাল একে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমাদের মুখ দেখে কোন কৌতূহল বোঝার কোন উপায় ছিলনা।তার চোখ দুটিতে একটা তীব্রতা ছিল, একটা ঔজ্জ্বল্য, কিন্তু এই পুরো সময়টা ধরে একবারের জন্যও মনে হয়নি তারা অনুভূতিহীন ছিল। আমি নিশ্চিত নই তারা আমায় কিছু বলতে চাইছিল কিনা অথবা নিতান্তই আমায় দেখে যাচ্ছিল, কিন্তু আমার মনে হল আমরা একটা নিঃশব্দ বোঝাপড়ায় পৌঁছেছি। হঠাৎ করেই একটা ভয়ানক রকম হতাশার অনুভূতি আমায় আচ্ছন্ন করে ফেলল। এই বাড়িতে আসার পর এই প্রথম আমার এইরকম অভিজ্ঞতা হল। ঠিক এই সময়মেয়েটি আমার বাহুতে হাত রেখে আমায় ঘরের বাইরে বার করে নিয়ে এল।

বাইরে এসে তার সাথে কথা বলতে বলতেআমি বুঝতে পারলাম যে আমার কথা বলাটাআদপে আমার একটি অক্ষমতা এবং এই রোগীটি এমন একটি পথে আমার থেকে বহু যোজন দূরে এগিয়ে আছেন যে সেই পথের বিন্দু-বিসর্গ আমার জানা নেই।

আমার মনের ভিতর নানারকম হতাশার ঢেউআছড়ে পড়ে, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি  আমার কৌতূহলকেআগের মত কি তার থেকেও বড় হয়ে উঠতে দিই। এখানে যারা থাকে তারা আজো আমার প্রশ্নের পর প্রশ্নেতিতিবিরক্ত হয়ে ওঠে। আমি রোগীর দেখাশনা করা মেয়েটিকে নানা রকম মজার মজার গল্প শোনাই এবং অসুস্থ লোকটির শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ-খবর করি। কিন্তু যখন আমার মন হতাশায় ছেয়ে যায়, আমার মনে হয় যেন ঝর্ণার ধারার মত অতি ছোট ছোট হলুদ পাতার স্রোত আমার আর মেয়েটির মাঝে নেমে আসছে। যে ছেলেটি একদিন অবশ্যই এই বাড়ির মালিক হবে, আজকাল সেপ্রায় উবে যেতে থাকা ছায়া হয়ে গেছে। আর আমার বিশ্রামের জায়গার ছাদটা আমার মনে হয় যেন একেবারে আমার বুকের উপর নেমে এসেছে।

নাইয়ার মাসুদ

নাইয়ার মাসুদ

নাইয়ার মাসুদকে উর্দু ছোট গল্পের সামনের সারিরলেখকদের একজনবলা হয়।অসংখ্য পাণ্ডিত্যপূর্ণ বই আর অনুবাদ, যেমন কাফকার গল্পের উর্দু অনুবাদপ্রকাশ করেছেন তিনি।উর্দু সাহিত্যের জন্য ২০০১ সালে সাহিত্য আকাদেমী পুরস্কার পান। ২০০৭ সালে পান সরস্বতী সম্মান।অবসর নেওয়ার আগে পর্যন্ত লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্সি ভাষার অধ্যাপকের পদ অলংকৃত করেছিলেন তিনি।

মহম্মদ উমর মেনন

মহম্মদ উমর মেনন

মুহম্মদ উমর মেনন উয়িসকন্সিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু সাহিত্য ও ইসলামিক গবেষণার ইমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি একজন প্রথিতযশা সমালোচক, ছোট গল্প লেখক,এবং আধ ডজন উর্দু গল্প সংকলনের অনুবাদক ও সম্পাদক।

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী

কবি। গল্পকার। অনুবাদক।
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *