নাইয়ার মাসুদের গল্প : হাওয়া নিশান

নাইয়ার মাসুদের গল্প : হাওয়া নিশান

খানিকটা মাছের মতো দেখতে, আবার খানিকটা পাখির মতো দেখতে হাওয়া নিশানটা আমাদের বাড়ির ছাদে ছিল আমার বাবার মৃত্যু অবধি। ওটা একসময় সত্যিসত্যিই বাতাসের দিক বলে দিত। ওটা যখন ওর কার্যকারিতা হারিয়েও ফেলেছিল, তখন প্রায়ই বাবাকে জিজ্ঞেস করা হতো, এখনো কেন ওটা রয়ে গেছে আমাদের ছাদে! কেন নামিয়ে ফেলা হচ্ছে না? বাবা বলতো, ওর থাকার জায়গাই তো ওখানে। ছাদে না থাকলে ওটা আর কোথায়ই বা থাকবে! বলতো, আর এই হাওয়া নিশানটাই তো আমাদের বাড়ির চিহ্ন। যারা বাতাসের দিকটা জানতে চাইতো, ওদেরকে তো একটা সময়ে এটা সাহায্য করতো।

 

হ্যাঁ, সেটাও সত্য। তবে আমার কাছে বিষয়টা সেরকম নয়। ঘুড়ি উড়াতে ভালোবাসতাম আমি। আমার কাছে কিন্তু ওই হাওয়া নিশানের কোনো দরকারই মনে হয়নি কখনো। দিনের বেলায় ছাদে গিয়ে আকাশের উড়ন্ত ঘুড়িগুলোর দিকে তাকালেই আমি বলে দিতে পারতাম, বাতাস এখন কোন্‌দিক থেকে কোন্‌দিকে বইছে। রঙিন সেই ঘুড়িগুলো কাছে উড়ুক, কিংবা দূরে, আমি বাতাসের সব খবরাখবর বুঝে নিতে পারতাম, যেটা হাওয়া নিশান পারতো না। বাতাসটা মৃদু না কি উত্তাল, সে খবর তো ওই হাওয়া নিশান দিতে পারে না! তবে সন্ধ্যের পরে আকাশ যখন আলো হারাতো, ঘুড়িরা মাটিতে নেমে আসতো, তখন অবশ্য সেই হাওয়া নিশানটা কাজে লাগতো। কিন্তুঅন্ধকারে আমি যখন ঘুড়ি ওড়াবো না, তখন আর আমার হাওয়ার দিক কিংবা গতির খবর জেনে কাজই বা কী? আর রাতের অন্ধকারে তো এমনিতেই ওই যন্ত্রটা দেখা যায় না।

 

মাঝেমধ্যে ঘুড়ির দিক থেকে চোখ সরিয়ে এক মুহূর্ত নিশানটার দিকে তাকাতাম, বুঝতে চেষ্টা করতাম, ওটা ঠিকঠাক দিক নির্দেশনা দিচ্ছে কি না! কখনো গ্রীষ্মের দুপুরে ঘুড়ি অনেক উপরে উঠে শূন্যে প্রায় থির হয়ে থাকতো। অতি ধীরে সরতো। আমি তখন হাওয়া নিশানটার দিকে তাকিয়ে বুঝতাম বাতাস কোন্‌দিকে বইছে; ওটাও তখন খুব ধীরে উত্তরে বা দক্ষিণ দিকে নড়েচড়ে একটা দিকে থেমে থাকতো। বিষয়টা ভালো করে বুঝে নিতে কখনো কখনো ওটার খুব কাছে গিয়ে দেখতাম আমি।

 

একদিন প্রথমবারের মতো শুনলাম নিশানটা কীরকম একটা আওয়াজ করলো। কাছে যেতেই আর শুনতে পেলাম না। দীর্ঘক্ষণ ওটার দিকে তাকিয়ে রইলাম, খুব কাছে গিয়ে। দূর থেকে ওকে দেখতে খানিকটা মাছের মতো, খানিকটা পাখির মতো মনে হলেও, কাছে গিয়ে দেখলে ওটাকে আর তখন পাখির মতো লাগে না। পুরোটাই মাছের মতো দেখতে লাগে; যেন ওর কারিগর ওটা বানিয়েছে সেভাবে যে মাছটা খুব উদ্দীপনা নিয়ে পাড়ের দিকে যাচ্ছে, একটা পাখি যেমন বৃক্ষশাখায় উড়ে গিয়ে বসে। হাওয়া নিশানটার পাশ আর লেজটা মাছের পাখনার মতো হলেও দূর থেকে ওকে দেখতে লাগে পাখির ডানার মতো। নিশানটার কাজ যেহেতু বাতাসের সাথে, তাই পাখির ডানার মতো লাগাটাই বেশি যৌক্তিক ছিল হয়তো। আর দূর থেকে ওটাকে দেখতে অনেক নিপুন, তন্বী দেখালেও কাছে যেতেই সেটা হয়ে ওঠে কেমন, ভারী, জবুথবু, বড়োসরো একটা কিছু। তবে এটা এভাবে বানানো হতো কারণ অশান্ত বাতাসের দিক নির্ণয় করে দেবার কাজটা তো হালকা নয়!

 

অনেকক্ষণ নিশানটার দিকে তাকিয়ে থাকবার পর মনে হতে থাকলো এটা মাছের আকৃতিরই। কিন্তু আবার ভাবনার দোলাচলে এটাও ভাবতে শুরু করলাম, পাখির মতো হলেই এটা ভালো লাগছে বেশি। আকাশের ঘুড়িগুলোর দিকেও একবার তাকালাম, ওরা যেদিক পানে ছুটছিল, হাওয়া নিশানটাও সেদিকেই দেখলাম ঘুরে আছে। হঠাৎ বাতাস জোরে বইতে শুরু করলো আর ঘুড়িগুলো দিক পরিবর্তন করলো। তক্ষুনি আমি আবার নিশানটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে আগের দিকটাই নির্দেশ করছে। আমি কাছে গিয়ে জোর করে পাখাটা বাতাসের দিকে ঘুরিয়ে দিতেই ওটা আবার সেই আওয়াজ করতে শুরু করলো। আমি কিছুতেই বের করতে পারলাম না, ওটার ঠিক কোন্‌ অংশটা এমন নির্দয়ভাবে আওয়াজ করছে। আমার সব মনযোগ তখন ওই আওয়াজটার দিকে। ওটা ধীরে ধীরে আমার কানে সয়ে যাচ্ছিল। আর মনে হতে লাগলো এই আওয়াজটা আমি আগে কোথাও একটা শুনেছি। যাই হোক, একটু পরে পাখাটা বাতাসের সঠিক দিকটা চিনে নিয়ে সেদিকেই ফিরলো নিজে নিজে, আর আওয়াজটাও হারিয়ে গেল।

 

কিছুদিন পরে আমার মনে হলো বাবাকে একবার বলা উচিত যে হাওয়া নিশানটা সঠিক ভাবে কাজ করছে না। এর আগে পর্যন্ত হয়তো করতো, কিন্তু এখন আর করছে না। আমি খেয়াল করতে শুরু করলাম, আকাশের ঘুড়িটা বাতাসের যেদিকে সরছে বাতাসের দিকের সাথে মিলিয়ে, নিশানটা অন্যদিকে তাক করে আছে তার তীরটা। সেটা বাতাসের গতি আর দিকের দিকে ফিরতে ফিরতেই বাতাস আবার অন্যদিকে ঘুরে বইতে শুরু করলো। এমনও হতে থাকলো, নিশানটার তীর যেদিকে থমকে থাকে বাতাস ততক্ষণে অন্যদিকে ঘুরে আবার তীরের দিকটাই অনুসরণ করছে। মাঝেমধে ভ্রম হয়, তীরটা বাতাসের পিছুপিছু দিকবদল করছে না কি, বাতাসই সেই নিশানের তীর কিংবা পাখাকে অনুসরণ করে বইছে! আর এটা দেখতে দেখতে সবচেয়ে অদ্ভুত ভাবনা যেটা আমাকে ভর করলো তা হলো, নিশানটা কেবল নিজেই ভুল দিক দেখাচ্ছে তা নয়, ওটা বাতাসকেও যেন ঘুরিয়ে নিচ্ছে সেই ভুল দিকের দিকে! অদ্ভুত!

 

অবশেষে একদিন নিশানটা একদিকে ফিরে থেমেই গেল। সে আর বাতাসের সাথেসাথে নড়ে না। সরে না। গরমকালও চলে এলো, দমকা বাতাস, ঘুড়ি ওড়ানো আপাতত বন্ধ হয়ে গেল। বাতাসের তপ্তভাব আমার গায়ে এসে লাগতে থাকলো; এত প্রবল যে ওই গরমভাব থেকেই বাতাসের গতিপ্রকৃতি আঁচ করতে পারলাম। আমি করলাম কী, দৌড়ে নিচে নেমে একটা কাগজ নিলাম, তারপর বাতিল জিনিসের বাক্স থেকে ভাঙা মাটির পাত্রের একটা টুকরো নিলাম। দৌড়ে আবার ছাদে গিয়ে কাগজটাকে ছিড়ে গোলাকার  কয়েকটুকরো করলাম। ওটাকে আমি বলি, ‘টিক্কাল’। এবার  মাটির ভাঙাটুকরোটাকে টিক্কাল দিয়ে মুড়িয়ে, দলা পাকিয়ে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলাম। কিছুদূর যাবার পরে ছেঁড়া কাগজগুলো উড়ে এখানেসেখানে ছড়িয়ে পড়লো আর মাটির টুকরোটা মাটিতে এসে পড়লো। মাটিতে পড়লো মানে ওই হাওয়া নিশানের এক প্রান্তে গিয়ে বাড়ি খেলো। একটা গমগম করে শূন্যতার প্রতিধ্বনির মতো শোনালো। আমি গিয়ে নিশানটার গায়ে হাত বুলাতে থাকলাম যেখানে মাটির টুকরোটা আঘাত করেছিল; যেভাবে ছোট বাচ্চাকে বা পোষা প্রাণীকে আমরা আদর করি। এবার টিক্কালগুলোর দিকে তাকাতেই দেখি ওরা বাতাসে উড়তে শুরু করেছে, পশ্চিম থেকে পূবে।, উপরের দিকে উড়ে যাচ্ছে, ছাদের সীমানা ছাড়িয়ে উপরে, অনেক উপরে।

 

হাওয়া নিশানটার দিকে তখন তাকিয়ে দেখি ওটা স্থির হয়ে আছে, বাতাসের উল্টোদিকে ঘুরে। কাছে গিয়ে নিশানটা হাত দিয়ে ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করলাম বাতাসের দিকে। কিন্তু নড়ানোই গেল না। ওটা আটকে রইলো একজায়গায়। আমি যতই জোরাজুরি করলাম, ওটা সরলো তো না-ই, সাথে সেই আওয়াজটা শুরু করলো। মনে হলো, এত জোরজবরদস্তি করলে নিশানটা আমি ভেঙে ফেলবো অথবা ওটা নিজেই ভেঙে যাবে। নিশানটা ছেড়ে দিয়ে একটু দূরে এসে দাঁড়াতেই শুনলাম একটা মেয়ের কণ্ঠ।

‘কী হলো? এটা কেন ভেঙে গেল?’

 

একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের বাড়িঘেঁষা আরেকটি বাড়ির ছাদে, ওর গায়ে ফিনফিনে স্বচ্ছ একটা দোপাট্টা ঝুলছিল। একে আগেও দেখেছি। আমাদের প্রতিবেশি বাড়িগুলোর ছাদে বেশ কয়েকটা মেয়ে বিকেলের দিকে উঠতো। নিজেরা নিজেরা চাপাগলায় গল্প করতো। কখনো এই মেয়েটার বাড়ির ছাদে ওর বান্ধবীদের নিয়েও উঠতে দেখেছি। তখন হাসাহাসি করতো সশব্দে। আমাদের হাওয়া নিশানটা দেখিয়ে কী সব বলাবলি করতো। তখন অবশ্য আমার ওদের দিকে খেয়াল ছিল না অতো, কারণ আমি তখন ঘুড়ি ওড়ানোতেই মশগুল থাকতাম। তবে ওদের এই হই-হট্টগোল কানে আসতো; সন্ধ্যের মুখে আমাদের বাড়ির পাঁচিলে পাখিরা ফিরে যেভাবে ডাকাডাকি করতো, ওরাও ওরকম হাসাহাসি, ডাকাডাকি, বলাবলি করতো।

তবে সেদিন অন্য মেয়েরা ছিল না। এই মেয়েটিই একা ছাদে দাঁড়িয়েছিল, শুষ্ক, বিবর্ণ এই ভরদুপুরে। সে আমাদের হাওয়া নিশানটার দিকে তাকিয়ে এমনভাবে আবার জিজ্ঞেস করলো যে, উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যাবো, সেটাও পারিনি আমি।

 

‘ভেঙে গেছে?’

‘না। কাজ করছে তো।‘ বললাম আমি।

‘কিন্তু… বাতাস তো…’ সে তার দোপাট্টার দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। বাতাস উল্টোদিকে বইছে।‘ ওর কথা শেষ হবার আগেই বললাম।

খানিকক্ষণ হাওয়া নিশানটার দিকে তাকিয়ে সে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল তখন ওদের ছাদ থেকে।

 

আমি আবারো ভাবলাম, এবার বাবাকে বলতেই হবে যে ওটা আর কাজ করছে না। আরেক মনে ভাবলাম, আরো কিছুদিন দেখি, তারপর বলবো। প্রতিদিন ছাদে উঠে আর খেয়াল করে দেখতাম, ওটার নিশানাটা একদিকেই স্থির হয়ে থাকে। এরপর নিয়ম করে ভোরবেলায় ছাদে যেতাম, যখন সূর্যের তাপে বাতাস অতটা গরম হয়ে ওঠেনি। তখনও দেখতাম ওটা স্থির হয়ে আছে। একবার হলো কী, আমার মনে হলো-কোনো একটা উৎসবের সময়ে, ছাদে আকাশভর্তি ঘুড়িরা উড়ছে, আশেপাশের মানুষের আওয়াজ… বাতাসও জোরে বইতে শুরু করলো। হঠাৎই আমাদের হাওয়া নিশানটার দিকে তাকিয়ে দেখি, ওটাও ঘুড়ির সাথে তাল মিলিয়ে সেদিকে একটু একটু ঘুরছে। ঘুড়িগুলো ডানদিকে সরছিল। হাওয়া নিশানটাও। আমি বসে পড়লাম, একটু এগিয়ে হাওয়া নিশানটার পাশে। হঠাৎ গরম হাওয়া বইতে শুরু করলো। আমার গায়ে এসে লাগছিল। তাকিয়ে দেখলাম ওটা আর নড়ছে না। আকাশে তাকিয়ে দেখি, একটা ঘুড়িও নেই। অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে, বাতাস পশ্চিম থেকে পুবদিকে বইছিল, জোরেজোরে। কিন্তু এখন সব স্তব্ধ! নিশানটা থমকে আছে, আটকে আছে একই জায়গায়! রহস্যময়ভাবে। তপ্ত দমকা বাতাস এসে আছড়ে পড়ছিল ছাদের মেঝেতে, পাথরের মূর্তিকেও যেন সরিয়ে দিতে পারবে এমন।

 

আর দেরি না করেই আমি দৌড়ে নিচে নেমে এলাম, বাবাকে এক্ষুনি সংবাদটা দিতে হবে। হাওয়া নিশানটা ভেঙে যাবে- এই সংবাদটা দেবার মধ্যে আমার একটা উত্তেজনা কাজ করছিল। উত্তেজনা, উচ্ছ্বাস- শিশুরা সকলের আগে জেনে গিয়ে সকলের আগে কাউকে খবর পৌঁছানোর একটা উচ্ছ্বাস তাদের মধ্যে কাজ করে, এমন কি সেটা যদি খারাপ খবর-ও হয়। সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে আমার মনে পড়লো, স্বপ্নের মধ্যে যখন এই নিশানটা দেখতাম- কেমন একটা রাগ হতো আমার। কিন্তু ঘুম ভাঙার পরে কিছুতেই আর রাগের কারণটা মনে করতে পারতাম না।

 

বাবা তখন বাড়ির বাইরের দিকে একটা আলাদা ঘরে বিশ্রাম করছিলবেতেরচেয়ারেহেলানদিয়েশুয়ে ; আমরা ওটাকে বলতাম অভ্যর্থনা ঘর। । বাবা আজকাল এই বাইরের ঘরেই দিনরাত থাকেন। আগে মাঝেমধ্যে এসে বসতেন, যখন কাজকর্মের জন্য অন্য লোকেরা দেখা করতে আসতো। এখন কেউ না এলেও তিনি ওখানে থাকেন আর মা-ই একমাত্র তাকে সঙ্গ দেয়। রোদ্দুরের মধ্যে উঠোন পেরিয়ে ওই ঘরটায় ঢুকতেই সব অন্ধকার দেখলাম। খুব উত্তেজিত স্বরে অকেজো হাওয়া নিশানটার কথা বলতে বলতেই ঘরে ঢুকেছিলাম। ওখানে মা ছিল, খেয়াল করিনি আমি। চোখে অন্ধকারটা সয়ে আসতেই দেখি মা বসে আছে আর আঙুলটা  তার ঠোঁটের কাছে নিয়ে আমাকে চুপ করতে বলছে। কিন্তু ততক্ষণে আমার যা বলবার ছিল বলা হয়ে গেছে। তাকিয়ে দেখি বাবা গায়ে চাদরটা টেনে হেলানচেয়ারটায় পুরোপুরি শরীরটা এলিয়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছেন।

 

আমি চুপ হয়ে গেলাম। তবু মা আবারো বললো, ‘ঘুমোনোর সময়ে তার একটু কষ্ট হচ্ছিলো।‘

‘কী হয়েছে? কী ভেঙেছে?’ এরমধ্যেই বাবার গলা শুনতে পেলাম।

‘তোমার বাবা ঘুমোচ্ছেন।‘ আবারো বললো মা।

মা আর আমি খেয়াল করে তাকিয়ে দেখলাম বাবা তখনো তন্দ্রাচ্ছন্ন, তার চোখ বোজা।

‘তুমি কি ব্যস্ত এখন?’ মা বললো আমাকে।

আমি যে জগতে সারাক্ষণ বাস করি, সেই ঘুড়ি ওড়ানোর মরশুম শেষ। আমার তো অন্য কাজ তেমন নেই।

‘না। আমার কোনো কাজ নেই।‘ মাকে বললাম।

‘তাহলে তোমার বাবার কাছে খানিকক্ষণ বসো। আমি আসছি।‘

বাবার কাছে আমি বসলাম। মা উঠে যেতে যেতেই আবার একটু ফিরে এলো। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, ‘ওটা কি সত্যিই ভেঙে গেছে?’

 

আমি মাথাটা একটু নাড়তেই দেখি বাবা পাশ ফিরতে চেষ্টা করছে। নিজে নিজে পাশ ফিরতে কষ্ট হচ্ছে। তার চোখ দুটো একবার খুলছে, একবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মা নিচু হয়ে ধরে পাশ ফিরিয়ে দিল। আর যেতে যেতে আবার বললো, ‘ওটা ভেঙে গেছে, এখন তোমার বাবাকে বোলো না।‘

 

বাবার দিকে তাকিয়ে বসে থাকলাম আমি। একটু পরেই দেখি বাবা চোখ বোজা অবস্থায় বলে উঠলেন,

‘ওটা কবে থেকে কাজ করা বন্ধ করলো?’

 

বাবা কি ঘুমের মধ্যে কথা বললো- এটা ভাবতেই ভাবতেই দেখি বাবা চোখটা একটু খুললো, তখনো তন্দ্রায়। পাশ ফেরবার চেষ্টা করলো। আমি উঠাতে যেতেই বললো,

‘তুমি পারবে না। তোমার মা আসুক।‘

‘মাকে ডেকে আনি?’

‘না। সে একটু পরেই চলে আসবে। ওটা কখন ভেঙেছে?’

আমার মনে হলো সমস্তটা বাবাকে খুলে বলা দরকার। আর আমি খুব উৎসাহী ভঙ্গীতে বলতে শুরু করলাম- কবে থেকে, কিভাবে ওটা ভুলভাল দিক দেখাতে শুরু করেছিল। আমি বলবার আগেই বাবা জিজ্ঞেস করলো,

‘তুমি কি ওটা সারাবার চেষ্টা করেছিলে?’

 

সরাসরি অস্বীকার করলাম আমি। বাবা আধখোলা চোখে আমাকে দেখলো; আমি বুঝতে পারলাম, তিনি আমার কথা বিশ্বাস করেনি। দোষীভাব ঢাকতে আমি আরো কয়েকটা মিথ্যে বলতে থাকলাম। বাবা বললো, ‘শোনো, কোনো মিস্ত্রি এনে ওটা সারাইয়ের চেষ্টা কোরো না। আর তোমার মাকেও বোলো না।‘

বাবা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু দরজায় মায়ের পায়ের আওয়াজ শুনে থেমে গেল। মা খাবার আনতে গিয়েছিল বাবার জন্য। মা কাছে এসে চেয়ারে বসবার আগেই আমার হাতটা চাপ দিয়ে ফিসফিস করে বাবা আবার বললো, ‘কাউকে বোলো না যেন।‘

 

পরদিন বাইরের ঘরটায় আশেপাশের  অনেক লোকজন আসা শুরু হলো। আর সকলেই বাবাকে বলতে এলো যে, আমাদের ছাদের হাওয়া নিশানটা কাজ করছে না।

 

আগেই বলেছিলাম, অনেক মানুষই বাবা সাথে দেখা করতে আসতো। তাদের কাউকে আমি ভালো চিনি, কাউকে চিনি না। এবার যারা এসেছে, তাদের সাথে কিছু অচেনা মুখও আছে। আমি হয়তো আগে একবার বা দু’বার দেখেছিলাম। এরা প্রায় সবাই আমাদের প্রতিবেশি। আমি যখন ঘুড়ি উড়াতে ছাদে উঠতাম, এদেরকে প্রায়ই আমি ছাদে দাঁড়িয়ে থাকতে বা ঘুরতে দেখেছি। তখন তারা ঘরের পোশাকে থাকতো। কিন্তু যখন বাবার সাথে দেখা করতে আসতো, এক্কেবারে ফিটফাট পোশাকে আসতো, যেন কোনো পার্টিতে এসেছে। বাবা যখন এই বাইরের ঘরটাতে পাকাপাকিভাবে থাকা শুরু করেনি, তখন মানুষজন আসবে শুনলে ঘরের পোশাক ছেড়ে বাইরের পোশাক পরে এসে এখানে বসতো, ওদের সাথে কথা বলতো। কিন্তু এখন আর সেটা করে না। গায়ে যা পরা থাকে তার ওপরে চাদরটা কাঁধ পর্যন্ত টেনে ওদের সাথে আলাপ করে।

 

মাঝেমধ্যে আমি এসব অভ্যাগতদেরকে বাবার এই ঘরটা পর্যন্ত পথ দেখিয়ে এনে বসাতাম। কখনো মা আমাকে দিয়ে নাস্তা, ফলের রস ট্রেতে সাজিয়ে পাঠাতেন অতিথিদের জন্য। আমি সেইটুকু সময়ের মধ্যে তাদেরকে দেখতাম, ওদের আলাপ আলোচনা শুনতাম। কিছুটা বুঝতাম। কিছুটা বুঝতাম না। বেশিক্ষণ সময় ধরে এ ঘরে থাকতামও না আমি। তারা বাবাকে কেন্দ্রে রেখে কী সব বলতো, জোরে জোরে হাসতো। আমি ঢুকলেই তারা খানিকটা চুপ হয়ে যেত। চাপা গলায় কথা বলতো। আমি দ্রুত ঘরটা ছেড়ে বেরিয়ে যেতাম, এটা বুঝতে পেরে।

 

সেদিন আমি ওইসব মানুষদের জন্য নাস্তা নিয়ে ঢুকতেই ওরা সকলে আমাকে দেখে কেমন চুপ হয়ে গেল, খুব মনযোগের সাথে আমাকে দেখতে লাগলো। খুব বিরক্ত লেগে উঠলো আমার, নিজেকে কেন যেন অপরাধী মনে হচ্ছিল। কিন্তু তারা সকলে হাসিমুখেই আমাকে দেখছিল। স্নেহভরা দৃষ্টিতে, বড়রা যেভাবে ছোট ছেলেমেদের দিকে তাকায়, সেভাবে। ওদের একজন হঠাৎ বলে উঠলো, ‘আচ্ছা, তোমাদের বাড়ির ছাদে যে হাওয়া নিশানটা আছে, যেটা বাতাসের দিক বলে দেয়…’

ওর কথা শেষ না হতেই আমি বললাম, “ওটা ভেঙে গেছে।‘

বলেই আমি কেমন বিব্রতবোধ করলাম। কিন্তু বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি হাসছেন আর আমাকে বললেন, ‘ওদেরকে সব বলো, কী হয়েছে ওটার।‘ 

‘হ্যাঁ। বলো, বলো, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।‘ ওদের একজন বললো।

সবই বললাম আমি ওদেরকে, বাবাকে যা যা বলেছি। শুধু আমি যে নিজ হাতে ওটার দিকটা ঠিক দিকে বদলে দেবার  জন্য জোর খাটিয়েছি, সেটা বলিনি।

 

শুনে সকলেই অনেকক্ষণ নীরব থাকলো, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের মুখের হাসিটা মেলালো। এরপর একজন বললো বাবাকে, “এজন্যই বলছি, ওট্টা এখন সরিয়ে ফেলবার সময় হয়েছে।“

উত্তরে বাবা ওদেরকে আবারো তাই-ই বললো যা আগেও বলেছে। শুনতে শুনতে আমি খাবারের খালি ট্রে-টা নিয়ে বেরিয়ে এলাম। এরপরে বেশ ক’দিন আমাদের ঘরে এই হাওয়া নিশান নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলাপ হতে থাকলো। হাওয়া নিশান শব্দটা আমার কানে অনেকবার এলো। তারপর এই আলাপটা কমে এলো ধীরে ধীরে। এই বিষয়ে কথা বলবার জন্য আগত মানুষের সংখ্যাও এক্কেবারে কমে আসতে থাকলো। শীত না শেষ হতেই একজন দু’জনে নেমে এলো কমতে কমতে। কেউ আর হাওয়া নিশান নিয়ে কথা বলাটা দরকার মনে করছিল না। শেষ পর্যন্ত একজন প্রতিবেশিই নিয়মিত আসতো, তাও তিনি একা আসতে পারতো না।একজন সাহায্যকারী ছেলেতাকে ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে আসতো আমাদের বাড়িতে, আবার ফিরিয়ে নিয়ে যেত।

 

একদিন শুনতে পেলাম লোকটা এসে ওই নিশানের বিষয়ে আবার জানতে চাইলো। বাবা তার প্রশ্নের উত্তরে সেই একই ব্যাখ্যা দিল। সেই প্রথমবার বড়দের আলাপের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠলাম আমি,

‘আচ্ছা, ওটা কি আবার সারিয়ে নেয়া যায় না?’

‘কে এটা ঠিক করবে?’ বাবা বললো হতাশার স্বরে।

‘ একমাত্র সে-ই এটাকে সারাতে পারবে, যে এটা তৈরি করেছিল।‘ আরো হতাশা গলায় নিয়ে প্রতিবেশি লোকটা বললো।

তার হাতটা ধরে ঝাঁকিয়ে বাবা বললো, ‘হ্যাঁ। অন্য কেউ এটা ধরলে আরো নষ্ট করে ফেলবে।‘

বাবার কথায় সায় লোকটাও মাথা নাড়তে থাকলো। তারপরেই দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ। একটু পরে তার বাড়ির ছেলেটা এসে তাকে নিয়ে গেল।

‘আচ্ছা, এই ব্যাপারটা মাথা থেকে সরিয়ে তুমি তোমার মায়ের দিকে একটু সময় দাও। সে তো আমার সেবা করতে করতে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে।“ লোকটা যেতেই আমাকেই বললো বাবা।

 

ঠিক তখুনি দেখি মা ঢুকলো ঘরে। তিনি হয়তো লোকটা চলে যাবার অপেক্ষা করছিল। হাতে একটা ব্রঞ্জের তৈরী পাত্রে আগুনের গোলা, দোপাট্টা দিয়ে ঢেকে নিয়ে বাবার পাশে এনে রাখলো। মেঝেতে। সারা ঘর একটা সুগন্ধে ভরে উঠলো। কেমন উষ্ণ আর শান্তিময় পরিবেশ। বাবা মায়ের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে বললো, ‘সব কাজ তোমাকেই করতে হয়? আর কেউ নেই ঘরে সাহায্য করবার জন্য?’

কথার কোনো উত্তর না দিয়ে গায়ের চাদরটা তুলে ভাঁজ করতে শুরু করলো মা।

 

বাবার কাজগুলো করে দেবার জন্য অন্য মানুষও ছিল আমাদের বাড়িতে। কিন্তু মা নিজেই সবকিছু করতো, কোনোরকম অভিযোগ ছাড়াই। তাই আমাদের কখনো মনে হয়নি যে, তিনি এভাবে নিজেকে ক্ষয় করে ফেলছেন। একদিন সকালবেলা মা আর বিছানা থেকে উঠলো না। বিকেলবেলা তার মৃতদেহ ঘিরে বসে ছিল ঘরের মানুষেরা, আত্মীয়রা, কাছের-দূরের। সেদিন সারাদিন অন্য মানুষেরাই সব কাজগুলো করে দিয়েছিল বাবার। মায়ের কথা বাবা সারাদিনে একবারও জিজ্ঞেস করেনি। সন্ধ্যেবেলা শুধু স্বগতোক্তির মতো বলে উঠলেন, ‘আমি এটা আগে থেকেই দেখতে পেয়েছিলাম।‘

 

এরপরে বেশ অনেকদিন তিনি কারো সাথেই কথা বলতেন না। বাড়ির মানুষেরা তার পরিচর্যা করতো, বাইরের মানুষেরাও কেউ তখন তার কাছে আসতো না। এমন কি মা মারা যাবার পরেও মানুষজন তেমন আসেনি বাড়িতে। বা হয়তো অল্প ক’জন এসেছিল, আমি জানতাম না। আমি আর বাড়ির কিছু মানুষই তাকে ঘিরে থাকতাম তখন; আমি তার ঘরে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতাম দীর্ঘক্ষণ। একদিন সন্ধ্যেবেলায় যখন আমাদের উঠোনের আঙুরগাছগুলোতে পাখি ডাকাডাকি করছিল, অভ্যর্থনা ঘরটায় গেলাম আমি। ওই একটামাত্র মানুষ যে একাই এসে বাবার সাথে আলাপ করতো, তাকে দেখলাম বসে আছে চেয়ারে। কোনো কথা বলছে না, চেয়ার টেনে বাবার সামনে বসে আছে। অনেকদিন পরে তাকে দেখে আমি চিনলাম, কিন্তু কতদিন পরে এলো, সেটা মনে করতে পারলাম না। লোকটার সাথে তার সাহায্যকারী ছেলেটাও ছিল। আগে যেমন ফিটফাট পোশাকে আসতেন তিনি, সেদিন সেরকম আসেননি। ঘরের পোশাকে  এসেছিলেন। আগে তার বাড়ির ছাদে বিকেলে যেমন সাধাসিধে, গায়ে একটা চাদর জড়ানো দেখতাম, সেদিনও ওরকমটাই মনে হচ্ছিল দেখে।

 

বাবা এবং তিনি দুজনেই একদম নিঃশব্দে বসে ছিল। কেউ কোনো কথা বলছিল না, পরস্পরের উপস্থিতিও দুজন অনুভব করছিল না। আর এদিকে আমিও চুপ করে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম ওদের সামনে। বাবার চেয়ারের কাছটায় দাঁড়িয়ে খুব মনযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকলাম দুজনের দিকে- মনে হলো নীরব থেকেও যেন দুজন মনে মনে আলাপ করছে। লোকটা অনবরত নড়াচড়া করছিল, চেয়ারটা দোলাচ্ছিল আর হাত দুটো শূন্যে এমনভাবে নাড়াচ্ছিল যেন মাছি সরাচ্ছে। আমি আরো কাছে গিয়ে ওদের মুখের দিয়ে তাকিয়ে বুঝতে চাইলাম, ওরা কি হাওয়া নিশানটা নিয়ে কিছু ভাবছে? আমার ভাবনাই সঠিক হলো। হঠাতই বাবা বলে উঠলো, ‘কাজে আসছে না? একেবারেই বিকল হয়ে গেল? কাউকেই দিক দেখাতে পারছে না তাহলে?’

লোকটা সায় দিয়ে মাথা নাড়তে থাকলো। একটু পরে তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল ছেলেটা। লোকটাকে দুহাতে ধরে নিতে ছেলেটার কষ্টই হচ্ছিল, একবার দুবার সে নিজেও পা হড়কে পড়ে যাচ্ছিল।

 

বর্ষা ঋতুও শেষ হয়ে এলো। বাড়ির সকলে আমরা বুঝতে পারছিলাম, বাবার আয়ুও ফুরিয়ে আসছে। সকলে মিলে তাকে আরো খেয়াল রাখতে শুরু করলো। যে যখনই তার কাছে যেত কোনো কাজ করে দিতে, বাবা তাকে  খুশি হয়ে আশীর্বাদ করে দিত। আমিও তখন দিনের বেশিরভাগটাই বাবার ওই ঘরে কাটাতাম। দেখতাম বাবা কী একটা ভাবছে সারাক্ষণ। কখনো চোখ বন্ধ, কখনো তার চোখ দুটো আধখোলা, সামনে তাকিয়ে আছে… কিন্তু কিছুই যেন দেখছে না। আমার মনে হতে লাগলো, বাবা সারাটা সময় মাকে ভাবছে, আবার কখনো আমাদের ছাদের ওই হাওয়া নিশানটার কথা ভাবছে। কিন্তু তার শারীরীক অবস্থা এত দ্রুতই খারাপ হয়ে গেল যে, আমি তখন বাবা কী ভাবছে এইসব ভাবনার বিষয়গুলো সব ভুলে গেলাম।

 

আকাশে কোনো মেঘ ছিল না সেদিন। মাঝেমাঝে তবু একটু করে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। সবাই মনে করলো আর বৃষ্টি আসবে না। ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ আকাশে, আলো নেই তেমন। আমি বাবার পাশে বসে ছিলাম। বাবা চেয়ারটায় বসা। ঘরটা দিনেরবেলাতেও অন্ধকার থাকতো, রাতে তো আরো। কিন্তু সেদিন হঠাৎ কোথা থেকে এক ঝলক আলো এসে ঘরটা কেমন আলোকিত লাগছিল। আলো আর আঁধারে মিলেমিশে কেমন একটা পরিবেশ! ছোটবেলায় এরকম আলোআঁধারি আমাকে কেমন একটা রহস্যের আমেজ দিত। কিন্তু সে রাতে মনে হচ্ছিল, আলো আর অন্ধকারের একটা লড়াই চলছে। বাবার চেয়ারটায় শুয়ে পড়লেন; আমার মনে হলো, বাবা যেন মৃত্যুর যন্ত্রণাদায়ক গ্রাসের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছেন। ধীরে ধীরে। হঠাৎ শুনলাম, বাবার গলা।

 

“কে ওখানে? উপরে?”

আমি নিচু হয়ে তার মুখের কাছে গিয়ে বললাম, ‘কোথায়? কোনখানে? কোন্‌ উপরে?’

‘ছাদে। ওখানে কে কথা বলছে?’ বাবা বললো।

কান খাড়া করে আমি শুনতে চেষ্টা করলাম শব্দ কোথা থেকে আসছে। কোথাও কাউকে দেখতে পেলাম না। বাজ পড়ার আওয়াজ একটু পরপর মিলিয়ে যাচ্ছিল। এবার হালকা করে শুনলাম, কোনো বৃদ্ধ মানুষের স্বর কানে আসলো। গোঙানির মতো করে কিছু বলছে মনে হলো। কিন্তু সেই স্বর ছাদের দিক থেকে বা আশপাশে মনে হলো না। আবারো খেয়াল করে শুনতে চেষ্টা করলাম।

 

এবার হঠাৎ মনে হলো, এই আওয়াজটা তো আমি শুনেছি হাওয়া নিশানটার কাছে। যখন ওটা দিক পরিবর্তন করতো বাতাসের সাথে তখন; কিংবা আমি যখন জোর কতে নিশানটাকে ঘোরাতে চাইতাম, তখন ওটা এভাবে অদ্ভুত একটা আওয়াজ করে উঠতো। এই আওয়াজটা।

 

বাবা খুব খেয়াল করে আওয়াজটা শুনতে চেষ্টা করলো। বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজের মধ্যে সেই আওয়াজটা হারিয়ে যাচ্ছিল। আমি বললাম, ‘একবার উপরে গিয়ে দেখে আসি ব্যাপারটা কী?”

বাবা নিরুত্তর। আমি দৌড়ে বেরিয়ে, উঠোন পেরিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে ছাদে গিয়ে হাওয়া নিশানটাকে দেখতে লাগলাম। বিদ্যুতের আলোয় একটু পরপর ওটা দেখা যাচ্ছিল, দেখতে একদম রূপালি কোনো ঐশ্বর্যময় বস্তুর মতো লাগছিল। আরেকটু কাছে গিয়ে দেখলাম ওটা সে আগের মতো একদিকে স্থির আটকে আছে, এবং সেই দিকটা কেমন রহস্যময়। ওটা নড়ছেও না। কোনো আওয়াজও করছিল না। কাছে গিয়ে বারবার তাকাতে গিয়ে খেয়াল করলাম আমাদের ঠিক পাশের বাড়ির ছাদে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে অন্ধকারে। আর বিদ্যুতের চমকে তার মুখটাও আলোয় উদ্ভাসিত হচ্ছিল বারবার।

 

কোনো একজন বয়সী নারী, বয়সের পড়ন্ত বেলায় এসে পৌঁছেছে; এরকম একজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল পাশের ছাদে। এর বাইরে আর কিছু আন্দাজ করতে পারিনি আমি। অবশেষে মনে করতে পারলাম, এরকম একজন নারী তার অন্য নারী বন্ধুদের নিয়ে কখনো তাদের ছাদে এসে দাঁড়াতো। কখনো একাও দাঁড়াতো। প্রৌঢ় নারীটি এই অন্ধকার রাতে ছাদে দাঁড়িয়ে আমাদের হাওয়া নিশানটাই দেখছিল, এবং নিশ্চয়ই সাথে আমাকেও দেখতে পাচ্ছিল। আমি যেন তাকে দেখতে পাইনি, এমন ভান করে সিঁড়ি বেয়ে ছাদ থেকে নেমে এলাম।

 

ঘরে ঢুকে দেখি বাবা তখনও সেরকম শুয়ে আছে। আমাকে দেখেই নিচুস্বরে জিজ্ঞেস করলো,

‘কাউকে দেখলে সেখানে?’

বাবাকে বললাম, “না, হাওয়া নিশানটাই শুধু দেখলাম। একইদিকে স্থির হয়ে আছে ওর নিশানটা। কোনো আওয়াজও করছে না।“

বাবা শুনে অনেকক্ষণ একপাশ ফিরে শুয়েই রইলেন। মুখে কিছুই বললেন না। এরকম বেশ খানিকক্ষণ কাটানোর পরে আমি যখন ধরেই নিয়েছিলাম, বাবা বোধহয় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে; ঠিক তক্ষুনি তিনি বড় একটা শ্বাস ফেলে বললে উঠলো, “নিশ্চিত কোরো যে, হাওয়া নিশানটা নামিয়ে ফেলা হয়েছে।“

 

এটা বলেই বাবা আরেকটা শ্বাস নিলেন বড়ো করে। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম আমি। বিদ্যুৎ চমকানো কমে এলেও বজ্রপাতের আওয়াজ বেড়ে গেল দূরের আকাশে। ঘরের আবছায়া আলোয় বাবার মুখটা দেখলাম আমি। তিনি যেন গভীর ঘুমের রাজ্যে চলে যাচ্ছিলেন। তার বুকের ওপর যে চাদরটা দিয়ে ঢাকা ছিল, বাবার শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে সেটাও দুলে দুলে ওঠানামা করছিল।

 

আমরা সকলেই ভেতরে ভেতরে বুঝতে পারলাম, বাবা আর বেশিদিন বাঁচবেন না। তার কথাবার্তাও কমে এল একেবারে শূন্যের কোঠায়। আমরা, যারা তার সেবাযত্ন করতাম তাদেরকে বারবার কৃতজ্ঞতা জানাতো বাবা, আর বলতো, ‘তোমাদেরকে আমি খুব কষ্ট দিচ্ছি। এটার জন্য দুঃখিত আমি।‘ কিন্তু সেই দিনগুলোতে বাবা কেন যেন আমাদের ওই হাওয়া নিশানটার কথা আর একবারও বলেনি। এমন কি আমার মায়ের কথাও না। এটা আমাকে খুব বিস্মিত করেছিল। তবে যেদিন তিনি অনন্তের দিকে যাত্রা করলো, সেদিন শুধু একবার মায়ের পুরো নামটা উচ্চারণ করলো, এবং কার মেয়ে সেটা সহ বলল, ‘কন্যা…’! এরপরে আর কিছু যোগ করবার আগেই বাবা মারা গেল।

 

বাবা বিদায় নেবার পরের দিনগুলোয়  আমি অন্য কাজে নিজেকে ব্যস্ত করে ফেললাম। আরো অন্য সব পরিবর্তনও একে একে ঘটতে শুরু করলো। আমাদের বাড়ির আশেপাশের কয়েকটা বাড়ির নির্মাণ কাজ শুরু হলো। বাড়িগুলোর উপরের দিকের তলা উঠতে লাগলো। এমনভাবে বাড়িগুলো আকাশমুখি হতে লাগলো যে আমাদের বাড়িটার ছাদের হাওয়া নিশানটা আর দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল না। ঢেকে গেল। একদিন আমি কাজ সেরে বাড়ির দিকে ফিরতে ফিরতে রাস্তা থেকে খেয়াল করলাম বিষয়টা। ছাদ আর ছাদের নিশানটা ঢেকে গেছে ওইসব বাড়ির কারণে। আমি এদিক-ওদিকে গিয়ে বিভিন্নভাবে ওটা দেখতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই আর দৃষ্টির সীমানায় থাকলো না হাওয়া নিশানটা।

 

রাস্ত থেকে কোনোভাবেই দেখতে না পেয়ে আমি বাড়ি ফিরে সোজা ছাদে গেলাম। ওটার কাছে গিয়ে তাকিয়ে রইলাম। সেই একইভাবে উল্টোপাল্টা দিকে স্থির হয়ে আটকে আছে নিশানটা। বাতাসের দিকের সাথে কোনো সংযোগই নেই। আগের চেয়ে কোথাও একটুও নড়েনি। কেমন জংধরা, জবুথবু চেহারা তখন হাওয়া নিশানটার। সেদিনের বিদ্যুৎ চমকানোর আলোয় যেমন ঝিলিক মারছিল, সেরকমটা একেবারেই লাগলো না। তবে সেই মুহূর্তে সেদিনের রাতের চেয়েও বেশি আকর্ষণ করলো আমাকে ওটা।

 

পরদিন মিস্তিরি এসে হাওয়া নিশানটা সারাবার জন্য কাজ শুরু করলো। ওর পাখাটা টেনে খুলে নিচে নামিয়ে কাজে হাত দিল কিন্তু পরে ওটা আর কিছুতেই জোড়া লাগাতে পারছিল না। অনেক চেষ্টা করছিল সে। আমি গিয়ে বললাম, ‘জোড়া লাগানোর আর কোনো প্রয়োজন নেই।‘ মিস্তিরি এবার আশ্বস্ত হলো আমার কথাটা শুনে। সে খুলে নেওয়া সব অংশগুলো এক জায়গায় করে মূল প্ল্যাটফর্মের উপরে গোছাতে থাকলো। আর হাওয়া নিশানের শরীরটা কেমন ঢিলেঢালা হয়ে নড়বড় করতে লাগলো। মিস্তিরি আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো, ‘তোমার মনে কী আছে, এগুলো কোথায় রাখবে?’

 

আমি অতশত চিন্তাভাবনা না করেই উত্তর দিলাম, “কোনো উচু শেল্‌ফে বা বড়ো কোনো ট্রাংকে রাখতে পারো।‘

‘এইসব ভাঙ্গা টুকরোগুলো এর আশেপাশেই রাখতে পারি।‘ একটু থেমে সে আবার বললো, ‘আমার একটা পরামর্শ আছে এটা নিয়ে…’

আমি ওর পরামর্শটা মেনে নিলাম।

 

আমার বাবার সাথে দেখা করতে যত মানুষ আসতো, আমার কাছে অত মানুষ আসে না। অল্প ক’জন যারা আসে তারাও সেইসব আগের মানুষ নয়। তারা কোনো একটা দরকার পড়লে, বা কিছু জিজ্ঞাসা করবার থাকলে তখনই কেবল আসে বাড়িতে। ওরা এসে যখন বাইরেরঅভ্যর্থনা ঘরটায় বসে কথাবার্তা বলে, তখন একটা বিস্ময়ভরা চোখে ঘরের কোণটায় তাকায়। অন্তত একবার হলেও। একটা অদ্ভুত দেখতে মাছ ওর ফুলকোয় ভর করে আছে- এমন একটা জিনিস রাখা ছিল এ ঘরের কোণটায়। ওর মাথা আর লেজটা ফুলকো থেকে একদম সমান উচ্চতায় বানানো হয়েছিল। মানুষেরা তাকালেই প্রথমে মনে হয়, এটা একটা পাখি, যার সম্বন্ধ বাতাসের সাথে। এটাকে সবাই মনে করে, একটা ঘর সাজানোর জিনিস, তাই কেন এটা এভাবে বানানো হয়েছে, জানতে চায় না কেউ। আমিও তাদেরকে কখনো বলি না, এটা আমাদের সেই হাওয়া নিশান, যা আজকে বিকল।

নাইয়ার মাসুদ

নাইয়ার মাসুদ

নাইয়ার মাসুদ ভারতীয় উর্দুভাষী লেখক। জন্ম লখনোউ-এ, (১৯৩৬- ২৪ জুলাই ২০১৭) মূলত তিনি ছোট গল্প লেখেন, অনুবাদ করেছেনকাফকার রচনাবলী। ২০০১ সালে তিনি উর্দু সাহিত্যের জন্য সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন এবং ২০০৭ এ পেয়েছেন সরস্বতী সম্মান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *