প্রবুদ্ধ মিত্রের গল্প: খালাস

প্রবুদ্ধ মিত্রের গল্প: খালাস

লাইন পেরিয়ে মাল খালাস করাই এ অঞ্চলে দস্তুর।

তাই ভরা পেট নিয়ে, ‘পোয়াতি’ মেয়েছেলেরা লুকোচুরি খেলে সীমান্তে। দারোগাদের সঙ্গে ভাব জমায়। শরীর ‘সার্চ’ করায় আপত্তি করেনা। তবেই  পার হওয়ার গেট পাস জোটে। 

 এরা সকলে জানে এই পলি পড়ে যাওয়া ভাগীরথীর চরে একেঁ বেঁকে এক অদৃশ্য সাপের চলন আছে। কী আশ্চর্য ঘটনা। সাপ অথচ অদৃশ্য।

 ফুলমণি, যে বারো মাসের বেশিরভাগই  ভরা পেটের পোয়াতি, চরের ওপাশে প্রায়ই যেতে হয় তাকে। বার বার তার পরিচয় বদলায়। সে নববধূ হয়। অথবা, বিধবা বা সন্তানসম্ভবা।

ফুলমণি যে কারবারে আছে তা’তে যেমন নগদ পয়সা আছে তেমনি বিপদও আছে। 

‘ শালা মাল কামাবে আর রিস্ক নেবে না তা হয় নাকি ?’ ওস্তাদ বলেছিল। 

‘রিস্ক’ তো থাকবেই। এটা তো বর্ডারের সব মানুষের থাকবে। এ অঞ্চলে জীবিকার এই মজা। ফুলমণি’র মধ্যে জেদ আছে। কাজ হাতে নিয়ে তা ঠিক সময়ে তুলে দেবার চেষ্টায় কোনো খামতি নেই। বরাবর সে এমনই। 

কিন্তু কাজ করতে করতে কতবার যে সাপের অস্তিত্ব বুঝতে না পেরে বিপদে পড়েছে সে তা এখন হয়তো তার সবটা মনে নেই। থানার রেকর্ড ঘাঁটলে হদিশ পাওয়া যেতে পারে। ধরা পড়লে ফোর্সের মুখে এমনিতেই লাগাম থাকেনা। মহিলা বলে কোনো ছাড় নেই। ওপারের ক্যাম্পে তাকে আঙুল দিয়ে অশ্লীল  ইঙ্গিত করা হয়েছিল।

– চুতমারানী পেট হওনের লগে আইস ? 

সাত বছর আগে বর্ষা শেষের এক বিকেল। সাবিনা নদীর পাড়ে বসে ফুলে ওঠা জলের ওপর সুর্যাস্তের শেষ গোলাপী কিরণের আভায় মুগ্ধ হয়ে বসেছিল। ওর মুখের ওপর আবছা পড়ছিল সুর্যাস্তের প্রতিফলন। কি ভাবছিল সাবিনা তা বোঝা যাচ্ছিল না। শুধু মাথার সিঁথি থেকে কপাল বেয়ে চিবুক অবধি নেমে এসেছিল জলের ওপর আলোর খেলার মৃদু আভাস। চোখে মুখে উদ্বেগ। এমনই কারবার ওর বাপের যে, দিনরাত পুলিশের ঝামেলা লেগেই আছে। সাবিনা বাড়ি বা বাড়ির বাইরে যেখানেই থাকুক সারাদিন তার নজর থাকে বাপের খবরে। লাইনে পয়সা আছে, এটা সে একটু বড়ো হতেই বুঝে গেছে। আর আছে রিস্ক।

সাবিনা জলের ওপর আলোর আঁকিবুকি দেখতে দেখতে নিজের শরীরের ছায়া দেখতো। বয়স যেন উল্টো দিক থেকে আসা ঢেউ এর মতো। যা এসে পড়লে মাথা নীচু করে তা’তে সিক্ত হতে হয়। জলের ওপর কোনো খবরদারি চলেনা। বয়সের ওপরেও না। সাবিনা এদেশের এক কিশোরী। যে জল দেখতে দেখতে তার এক একটা বিকেল পার হয়ে গেছে সেই জলেই যে দূষণের মতো মিশে আছে এদেশের মাল অন্য দেশে চালান দেওয়ার ধান্দা। জল মানে হাঁটু জল। নদীর এদিকটায় চরা পড়ে যাওয়ায় জলের কোনো ভয়ঙ্কর হুঁশিয়ারি নেই। 

হাঁটু জল হওয়ায় সকলের পারাপারের অবাধ ব্যবস্থা। মানুষ, গরুবাছুর এবং আরো অন্য কিছু। সূর্যাস্তের পর নদীর জলে ছায়া দীর্ঘ হয়। মানুষের মধ্যে থেকেই আর এক মানুষ বেরিয়ে আসে। সেইসব লোকজনের ভিড়ে কত যে পরিচিতরা মিশে থাকে, তা দেখে নিজেই অবাক হতো চোদ্দ বছর বয়সে। একদিন সন্ধে নেমে আসার মুহুর্তে সাবিনা নদীর ধার থেকে ফেরার পথে চমকে উঠেছিল। মুখে গামছা বেঁধে এক মাঝবয়সী পুরুষ পাশ থেকে তার হাতটা চেপে ধরতেই সে চমকে উঠেছিল। তার হাত ধরে নদীর দিকে হাঁটছিল লোকটি। বেশ কিছুক্ষণ আগে সূর্যাস্ত হয়েছে। দ্রুত বদল হচ্ছে আকাশের রং। অন্ধকারের ঘনত্ব বুঝে একটু আগের চেনা মুখগুলো ক্রমশ অচেনা হয়ে যায় এসময়ে। নদীর পাড় ধরে লোকজনের চলাফেরা সন্দেহজনক হয়। তাই,সন্ধে নামতেই ঘরে ফেরার তাড়া। সাবিনা ঠিক সময়েই ফেরার পথ ধরেছিল। ফেরার হুকুম আছে ঘরের। তখন তার বয়স যে বিপজ্জনক।

হাতটা চেপে ধরে তাকে জলের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল যে লোকটি,তার মুখটা গামছামোড়া থাকলেও হাতের তালুর চাপটা ভীষণ চেনা লাগল। ভয়ে চিৎকার করার ঠিক আগেই সে শুনল-

– চল সাবু, পা চালা। বড় হচ্ছিস। কাম ধান্দা জানতি হবে না ?

শুনে চমকে গেল সাবিনা। একবার মুখ তুলে শান্ত ভাবে দেখল মুখ ঢাকা লোকটিকে। 

– ইদিকটার সবটা বুঝে লিয়ে রাখ। পড়ালিখার শেষে কামে লাগবে..

পৃথিবীর সব আব্বাজানের কাজই তো বিটা বিটি কে এই মস্ত উপদেশটা সময় মতো দিয়ে রাখা।

মইদুলও একই ভাবে দায়িত্ববান বাপ হতে চেয়েছিল সুর্যাস্তের মতো একটা শুভ মুহুর্তে। পরম মমতায় ধরে রাখা তালুতে নিজের মেয়ের হাত ধরে গোড়ালির ওপর জল ঠেলে ওপারে যাবার চেষ্টার মধ্যে সেদিন কোনো পাপবোধ ছিলনা মইদুলের। 

জলের মাঝে সাপের মত সেই অদৃশ্য বর্ডার লাইন পেরনোর সময় সাবিনারও এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছিল। ঐ নিস্তরঙ্গ সাপের পিঠ মাড়িয়ে যাওয়ার, লাইনের ওপারে ‘প্রয়োজনীয়’ মাল পৌঁছে দেবার মাঝে যে নানা ঝঞ্ঝাট ম্যানেজ করার থাকে তা সেদিন তাকে জানানো হয়নি। কিন্তু, কাজ শেষে এক শান্তি নেমে আসে ঘরে ফিরে। গভীর রাতে সেই শান্তির স্পষ্ট ছাপ সে তার আব্বার মুখে ফুটে উঠতে দেখেছিল প্রথম দিন। যার মানে নিজের কাজও হল, বিটিকে লাইনটা একটু চিনিয়ে দেওয়াও হল। মেয়েমানুষদের ‘ডিমান্ড’ আছে এই পাচার কারবারে। কিন্তু, সব দিন যে সমান যায় না এটা অন্তত তার বাপ প্রথম দিন তাকে না বললেও সে জানতো। ছোটবেলা থেকেই নিজের আব্বা ছাড়াও গ্রামের সবাইকে দেখে দেখে সে অভ্যস্ত। 

আজ কোনো কারণে নসীব ভালো ছিল। সাবিনা ও তার বাপ মইদুলের। কাল থাকবে কিনা জানা নেই।

সেই ছিল তার লাইনে নামার প্রথম দিন। বাপের সঙ্গে ছিল কাপড়ের গাঁটরি। তার ভেতরে কোন রহস্য লুকিয়ে আছে তা জানতে চাওয়া যে গুরুজনকে অসম্মান বা বাপের লজ্জার কাপড়টা টেনে নামিয়ে দেওয়া তা দশ ক্লাসে পড়া সাবিনা বুঝেছিল। তাই চুপচাপ সে নিজেকে মানানসই করতে চেয়েছিল পয়লা দফাতেই। সে জানত দশ ক্লাস অবধি লেখাপড়া তাদের পরিবারে অনেকটা। ফলে,আব্বা আর এগোবে না। সেও জানে এর পরে কী। তাই তার চোখ কান কখন কোথায় খোলা রাখতে হবে সেটা অন্ধকারের মধ্যেই সে বুঝতে চেষ্টা করেছিল। 

দু পারেই ছাউনির মধ্যে যার ডিউটি চলে তার নজরে থাকে সবকিছু। তাই পয়লা কাজ হল তাকে এবং তার ছোট সাবদের হাত করা। এ কাজে আব্বার দলবলের পাকা মাথা। সে লক্ষ করেছিল জলের মধ্যে যার সঙ্গেই আব্বার দেখা হচ্ছে তার কাছে দুটো সাফাই গাইতে হচ্ছে। এক, দুর্বোধ্য এক সাংকেতিক ভাষায় আব্বা তার হাত ধরে একটার পর একটা ‘চেক পয়েন্ট’ পার হচ্ছিল। যার সহজ মানে, আমার সব ব্যবস্থা করা আছে, অতএব পথ ছেড়ে দাও। 

দুই, তার সঙ্গে চলা মেয়েটি তারই। যার ‘পালিশ’ চালু হল সবে তারই তত্বাবধানে। শিক্ষানবীশের ট্রেনিংটা যে ‘পালিশ’, তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি তার। এ লাইনই তার ভবিষ্যত, সুতরাং রাস্তা ছাড়ো।

প্রথম দিনের শেষে কি শিখল সাবু,তা যাচাই করা দায়িত্বশীল বাপের কর্তব্য। মইদুল মেয়েকে বলল, 

– কেমন বুঝলি রে বিটি ?

– তুমি তো লাইন কিলিয়ার রেখেছিলে আজ। তাই কিছু বুঝলাম না। শুধু বুঝেছি নম্বর ধরে ধরে সব ম্যানেজ করতে হয়।

– ঠিক বলেছিস। খরচা আছে রে। নীচের নম্বর থেকে ওপর নম্বরে উঠতে হয়। গ্যাপ হলেই কেস খেতে হবে।

কপালের ঠিক মাঝখানে তর্জনী ও মধ্যমা ছুঁইয়ে মইদুল যখন একথা বলছে তখন তার মুখে একটা হালকা হাসি ছিল। সে হাসির মানে যে অবিশ্বাস, সে হাসির অন্য অর্থ যে ঘোর অনিশ্চয়তা তা চোদ্দ বছরের কিশোরী সাবিনা ধরতে না পারলেও পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা তার মা ঠিক ধরতে পেরেছিল। এত বছর একসঙ্গে থেকে মইদুলের সেই অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে চলতে থাকা সংসারের হিসেবের খবর শাকিলা’র থেকে ভালো আর কে বুঝবে ? 

নিজেদের নসীবের এরকম কত পাল্টি যে দেখতে হয়েছে তাকে সে আর কজন জানে। এই তো কবছর আগের কথা। কদিন মইদুলকে হাসিখুশি দেখেছিল শাকিলা। মনে হয়েছিল দিন ফিরছে। সাবু তখন ছোট। ছ বছর বয়স। তার পাশে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল। মাঝ রাতে দরজায় জোরালো ধাক্কায় তার ঘুম ভেঙে যায়। হুড়মুড় করে পুলিশ ঢুকে পড়তেই সে দেখেছিল, অসহায় বিপন্ন স্বামী মইদুলকে।

আর সাবু শুধু দেখেছিল মা চোখে কাপড় চাপা দিয়ে কাঁদছে। কারা যেন তার বাপকে ধরে নিয়ে গেছে। পুলিশ, বর্ডার ফোর্স, দালাল একসঙ্গে হামলা করে গেছে। গরু পাচারের মিথ্যে কেস দিয়েছে। সে তো তার আব্বাকে অনেক কিছু নিয়ে আনাগোনা করতে দেখেছে ঐ ছোট বয়সেও। কিন্তু, গরু পাচার ? তাও ঐ সাপের মতো আঁকাবাঁকা অদৃশ্য লাইন ডিঙিয়ে ওপারে ? না, কক্ষনো দেখেনি। মায়ের কান্না আর নিজের অজানা ভয় মিলিয়ে রাত আর একটু গড়াতেই দূরে কোথাও আজানের শব্দ কানে ভেসে এসেছিল। 

আজ এতদিন পরে আবার তা মনে পড়ছে। তার প্রথম দিনে আব্বার মুখে এই যে তৃপ্তির হাসি তা আবার যদি রাত পেরোলেই ধাক্কা খায় ?

 

দুই.

 শরীরে কিছু বহন করলে শরীর ভারী হয়। সেই ভার অন্য পারে যখন খালাস হয় তখন কাজটা ঠিকঠাক শেষ হয়। খবর হয়ে যায়, ‘মাল হ্যান্ডওভার’!

ফুলমণি লাইনে করিৎকর্মা হয়েছে অনেক ঘাট পেরিয়ে এসে। চব্বিশ বছর বয়স হলেও এখনো তার সংসার হওয়া বাকি আছে। হলে কি হবে তা পরের কথা। সে বাপের থেকে জেনেছিল, লাইনের ওপারে দু কিমি দূরে যে হাট বসে তা’তে গেট পাস নিয়ে গিয়ে বেচাকেনা করায় কোনো পাপ নেই। এপারের জিনিস যেমন ওপারে যায়, ওপারের জিনিসও এপারে আসে। কিন্তু,‘লাইন’ মানে তো বর্ডার। তাকে চোখে দেখা যায় না। শুধু পিলার দেখে বুঝতে হয়। জমিতে পিলার দেখা গেলেও জলে তা অদৃশ্য। তাদের গ্রামের বাড়ির উল্টো দিকে হাবুল চাচার উঠোন। দুয়ের মাঝখানে একটা সাদা পিলারের গায়ে নম্বর লেখা আছে। পিলারের একদিকে মানে তাদের দিকটায় ইংরেজিতে লেখা ‘আই এন ডি’। কারণ, তাদের বাড়ি ইন্ডিয়ায়। আর হাবুল চাচাদের দিকে বাংলায় লেখা ‘বাংলা’। হাবুল চাচার বাড়ি যে বাংলাদেশে। একই গ্রামে এরকম দুর্বোধ্য সাপের মতন অদৃশ্য রেখার ব্যাপারটা সে ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে। 

এ তো গেল জমির মধ্যেকার সাপের গল্প। কিন্তু, জলে তো তেমন কিছুই নেই। জলের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে পানিতে পৌঁছে যাওয়া যায় বা পানি থেকে জলে তা প্রথম দিন থেকেই ফুলমণি’র মাথায় ঢোকেনি। কিন্তু ওটা পেরনো নিয়েই সব ঝামেলা। পাসপোর্ট আর কজন করতে পেরেছে। যা কিছু কাম ধান্দা সব সারতে হয় ভোটার কার্ড বর্ডার ফোর্সের কাছে জমা রেখে। তা ছাড়াও লাগে বর্ডার পেরনোর জন্য দালালদের ‘জলপানি’। দালালদের হাতেই জীবন বাঁধা পড়ে আছে শয়ে শয়ে পরিবারের। বর্ডার এলাকায় বাস করে কে আর চায় কুমিরের সঙ্গে টক্কর।

তা যতটা ছাপোষা শুনতে লাগে, ‘গেট পাস’ কিন্তু অত সহজ নয়। ফুলমণিরা বাপের আমল থেকেই তা জানে।

‘পাচার’ খুব গোপন জিনিস। বাইরে খবর হয়না। গরু, মেয়েমানুষ, নেশার ওষুধ সব চলে। মাসের অধিকাংশ দিন ঠিক থাকলেও মাঝে মধ্যে ‘ডিল’ অজানা কারণে টাল খেয়ে যায়। তখন কার ঘাড়ের মাথা কার ঘাড়ে  ‘সান্টিং’ হবে তা দালাল আর পুলিশ মিলে ঠিক করে দেয়। একের পর এক ফল্স কেস খেতে হয় ফুলমণির বাপেদের। দু পারেই অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে বর্ডারের হাবিলদাররা। 

ফুলমণি যখন প্রথমবার ধরা পড়ে তখনো সে ‘ফুলমণি’ হয়নি। সে তখন ছিল সাবিনা। আব্বার হাত ধরে ওপারের হাটে যাবার সময় ধরা পড়ে তারা। এক অজ্ঞাত কারণে মইদুলের ওপর কারা যেন হিসেব মিটিয়ে নিল। সাবিনাকে সে পাচার করছে, এই ছিল মইদুলের বিরুদ্ধে কেস ! নিখুঁত ছকে মইদুলের জেল হয়। অনেক পরে সাবিনার মুক্তি সম্ভব ছিল না যদি না তার পরিচয় বদলাত। সাবিনা ফুলমণি হতেই তৈরি হল নতুন ভোটার কার্ড। ‘ওস্তাদের’ নজরবন্দি হল সে। যে ওস্তাদ তার শরীরের দখল নিয়েছে মাল পারাপার করতে।

ওস্তাদের হেফাজতে থাকা বেআইনি সিরাপের হাজার হাজার বোতল প্রতিদিন বর্ডার পেরিয়ে যাচ্ছে পেটে বাঁধা চটের বস্তায়। তাই নিখুঁত পোষাক আর মেকআপে বছরভর ফুলমণি পোয়াতি থেকেই যায়।

সাবিনা ওরফে ফুলমণি পেটে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল নেশার সিরাপ। সাপের লাইন পেরোতে গিয়েই রাতে ধরা পড়ে বর্ডার ফোর্সের হাতে। পুলিশ এল। সব মাল ‘সিজ’ করল পুলিশ। মাল সমেত সে লোকাল থানায় ‘হ্যাণ্ডওভার’ হয়ে গেল। কেন এমন হল ? কোনো কারণে ‘ডিলে’ গণ্ডগোল ছিল হয়তো। তাই সে রাতে ফুলমণি ধরা পড়ে। জেরায় সে জানায় সবই হয়েছে ‘ওস্তাদের‘ নির্দেশে। এতে তার ওপর আক্রোশ আরো বেড়ে যায়। রাত ভোর হবার আগেই লাঠির ঘায়ে তার পেট থেকে খসে পড়ে নেশার  তরল ওষুধ। থানায় চালান হয় ফুলমণি। কেন সে ধরা পড়লো সে রাতে ? নিজেকে বারবার প্রশ্ন করে সে যা জানতে পারে তা হল আব্বার মিথ্যা জেল আর তার অবৈধ পাচারে অনিচ্ছা সত্বেও জড়িয়ে পড়ায় হতাশ হয়ে লাইন ছাড়ার ইচ্ছে। ওস্তাদের যা পছন্দ ছিলনা।

 ফুলমণির বারবার পেট হওয়া আর তা খালাস হওয়ার মধ্যে ওপারে সিরাপের নেশা প্রবল হয়েছে তদ্দিনে। যাতে তার অবদান অনেক। 

এক অদৃশ্য সীমান্ত ডিঙিয়ে দু পারে বহুত মাল পারাপার হচ্ছে রোজ। মেঘ, বৃষ্টি, বাতাস যখন লাইন পেরোয়, ভাষা ও ভাটিয়ালি গান যখন লাইন পেরোয়, ভালোবাসা যখন লাইন পেরোয় তখন কোনো সীমান্ত বাধার ধার ধারে না। শুধু কখনো কখনো ফুলমণি পেরোলেই সেই অদৃশ্য সাপ জেগে ওঠে। এটাই তার আপশোষ। বন্দি ফুলমণি মাঝে মাঝে এসব ভাবে। 

এর মধ্যেই এক রাতের অন্ধকারে বন্দি অবস্থাতে সে জানতে পারল তার শরীর ‘সার্চ’ হবে। কারণ, পুলিশের সন্দেহ আছে। কেন হবে তা ? বন্দির তো কোনো আলাদা জীবিকা হয়না। তার শরীরের কোথাও কোনো লুকোনো মাল থাকতে পারে না পাচারের জন্য। তাও সার্চ কেন সে গলায় আওয়াজ তুলে সে জানতে চাইল। জবাবের বদলে পুলিশ লকআপে তার চোখ বেঁধে দেওয়া হল। সে নাকি আজ রাতেই ছাড়া পাবে, এমনই গুঞ্জন তার কানে আসে। তাই বোধহয় এক অন্ধকার কুঠুরি থেকে আর এক অন্ধকার কুঠুরিতে তাকে নিয়ে যাওয়া হল। থানা না থানার বাইরে, কোনো চোখ বাঁধা বন্দিই তা যেমন বুঝতে পারেনা, ফুলমণিও বোঝেনি।

 এক বা একাধিক হাত, একাধিক অচেনা গলার আওয়াজে তার শরীরের তল্লাশি শুরু হল। সে চিৎকার করতে পারেনা। কারণ, তার মুখে কাপড় বাঁধা। শুধু নানা শব্দের ভিড়ে তার গোঙানি স্পষ্ট হয়। সে হাত ছুঁড়ে বাধা দিতে পারে না কারণ, তার হাত বাঁধা ছিল। এভাবে সারারাত সে এক পাশবিক ‘তল্লাশি’র স্বীকার হল। 

কিছুদিনের মধ্যেই সে অবাক হল যখন সে জানল সে সত্যিই ছাড়া পাবে। ছাড়া পাওয়ার কারণ বুঝতে তার অসুবিধে হয়নি। সে বুঝতে পারল তার শরীর একটু একটু করে ভারি হচ্ছে। তার ঘৃণায় তারই শরীরে বেড়ে উঠছে এক ‘মাল’ ! যা সে চায়নি তা ই তাকে মাসের পর মাস বহন করতে হবে। তাকে সে কোথায় চালান করবে ? আব্বার কাছে জানতে যাবে না এ নিয়ে। কারণ,মইদুল ছাড়া পেয়ে আগেই ফিরে গেছে তার পুরোন রাজমিস্ত্রি লাইনে। আম্মাকেও জানাবে কি করে ? সে যে এখনো আইবুড়ো যুবতী।

অনেক বছর আগের এক সন্ধের কথা তার মনে পড়ে নদীর ধারে বসে। সেদিনও এমন শরতের বিকেল ছিল। আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ সীমানার বাধা অনায়াসে ডিঙিয়ে ওপারে যাচ্ছিল। আজও যেমন যাচ্ছে, নিঃশব্দে। সেদিনের মতো আজও সন্ধে নামার সময় তার মনে পড়ে গেল তার কাজ আছে। 

ভরা পেট নিয়ে সে নদীর জলে নেমে হাঁটতে লাগল সাপের মতো লাইনের দিকে। সে জানে তার কাছে কোনো কাগজ নেই। সে জানে জল আর পানির বিভেদ রেখা পেরোতে গেলেই তার বিপদ আছে। তবু সে এগোতে থাকে। ভারী শরীরে তার হাঁটতে কষ্ট হয়। কোনো চাপা উত্তেজনা নেই। চারিদিক শুনশান। শুধু একরাশ ঘৃণা ছাড়া তার আর কিছুই বহন করার নেই। সে তবু এগোয় কারণ, তার কাজ আছে। তার শরীর বোঝাই মাল সে ক’মাস ধরে বহন করে চলেছে। সে তা নিয়ে ওপারে যাবে। এক দেশের ‘মাল’ অন্য দেশে চালান করবে বলে।

কিন্তু,একটু পরেই সন্ধের অন্ধকারে সে ধরা পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ছাউনির আড়ালে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে। ফুলমণি বাধা দেয়নি,যেমন দেয় অন্যান্যবার। যথারীতি তার ওপর নানান ‘ডিগ্রি’ নেমে আসে। ফুলমণি কারুর উদ্দেশ্যে উপরে তাকায়নি। যেমন প্রতিবার তার প্রার্থনা থাকে দু হাত বুকের দু পাশে নিয়ে চোখ ওপরতলার দিকে রেখে। এলোপাথাড়ি বুটের লাথি এগিয়ে এলো তার পেটের দিকে। এ যেন হওয়ার ছিল। সঙ্গে আসে কান গরম করা ক্যাম্পের ভাষা-

– শালা মাদারচোদ, রেন্ডি কা আওলাদ। কাপড়া নিকাল। মাল দিখা।

একটু পরেই রাতের নৈঃশব্দ্য চরাচর জুড়ে নেমে আসে। ঠিক তার এখনকার জীবনের মতো। বুটের লাথির ঘায়ে ততক্ষণে ‘মাল’ খালাস হতে শুরু করেছে। তার পা বেয়ে মেঝেতে তাজা রক্ত বেরিয়ে আসছে। অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যেও ফুলমণি ওরফে সাবিনার মুখে মৃদু হাসি। সে হাসি তৃপ্তির। তার কাজ শেষ হওয়ার তৃপ্তি। কারণ, ক’মাসের ‘মাল’ খালাস হয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে সীমান্ত লাইনের দিকে। তাজা রক্ত গড়াতে থাকে ঐ দিকে..। যা লাইন পেরোবে না এপার ওপারের মাঝে স্থির হয়ে যাবে, কেউ জানেনা।

অদৃশ্য সেই লাইনের দিকে গড়িয়ে চলে। সাপের মতো যার চলন।

প্রবুদ্ধ মিত্র

প্রবুদ্ধ মিত্র

গল্পকার।
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *