“বড় ছেলের আর্তনাদ” তারেক আল মুনতাছির

একটা সংসারে পরিবারের বড় ছেলে হওয়াটা আসলে অনেক বড় একটা অপরাধের ন্যায়, আর সেই সংসারটা যদি হয় একটা মধ্যবিত্ত পরিবার তাহলে তো আরো মারত্মক। আসলে বড় হয়ে জন্ম নেওয়াটা নিজের উপর নির্ভর করে না, এটা সম্পূর্ণ সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। তাই একে অপরাধ বলাটা ঠিক হবে, তবে আমি বলতে চাই এটা অনেক বেশী কষ্টের বা চ্যালেঞ্জিং। সত্যিকার অর্থেই পরিবারে একটা বড় ছেলে হয়ে আসার পিছনের অনেক বেশি কষ্ট লুকিয়ে থাকে। হয়তো বা আমার কাছে যেগুলো কষ্টকর মনে হবে অন্যের কাছে সেগুলোর ব্যাখ্যা অর্থহীন। কিন্তু আমার কাছে অনেক ছোট ছোট বিষয় গুলোও অনেক বেশি অনুভুতি নিয়ে খেলা করে।

 

ঘরের বড় সন্তান হিসাবে সবসময় সব বিষয়ে নিজের স্বার্থটায় ছাড় দেওয়া লাগে, প্রথমে ছোটদের কথা বিবেচনা করে পরে নিজেরটা ভাবতে হয়। হ্যাঁ এটা অনেক সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু অনেক সময় নিজের এই প্রাপ্তি আর অপূর্ণতার খেলার ছলে নিজের স্বপ্ন গুলোই অপূর্ণ থেকে যায়। আর কোন এক সময় সেই স্বপ্ন গুলো মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়, হারিয়ে যায় শুধুমাত্র কল্পনার জগতে। বাবা-মার প্রথম সন্তান হিসাবে সব সময় নিজের উপর একটা বাড়তি চাপ থাকে, হয়তো কারো উপর সেটা পারিবারিক ভাবে কারো বা আবার নিজের মানুষিকতা থেকে সৃষ্ট। সবসময় নিজেকে আড়াল করে রাখতে হয় অন্যদের থেকে, নিজের সম্পর্কে কাউকে বুঝতে দেওয়া যাবে না এরকম মনভাব নিয়ে। আসলে সত্যি বলতে কেউ বুঝার চেষ্টাটাও করে না, কারণ সবার কাছে একটাই মনভাব… সে তো সবার বড় নিজেরটা নিজেই পোষিয়ে নিবে, সবার বড় তো একটু বুঝতে হবে… এরকম টাইপ।

 

কিন্তু এই বুঝা আর পোষিয়ে নেওয়ার মাঝখানে আমাকে কেউ কখনো দেখতে চায় না, কেউ কখনো আমাকে জিজ্ঞেস করে না আমি কি চাই, আমার কি কিছু অপূর্ণতা আছে কিনা। বরং আমার উপর দেওয়া হয় চাপ, একটু অতিরিক্ত চাপ, যা মাঝেমাঝে আমার সহ্য সীমা অতিক্রম করে কিন্তু এরপরেও আমাকে নিরব থাকতে হয়, আমার জন্য না বরং আমার পরিবারের জন্য নিরব থাকতে হয়।

 

খাওয়ার টেবিলে বসে বাবা যখন বলেন, “অমুকের ছেলেটা শুনেছি কি একটা কোম্পানিতে কাজ ধরেছে মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতন, তমুকের ছেলেটা কয়েকটা টিউশনি করে নিজের হাত খরচের টাকা জোগাড় করে বাবার হাতেও কিছু টাকা দিতে পারে। অন্য আরেকজনের ছেলের নতুন ব্যবসা খোলেছে। আর আমার ছেলেটার মানিব্যাগটাই খালি থাকে আমি পকেট মানির টাকা না দিলে, চুল কাটা থেকে শুরু করে মোবাইলের রিচার্জের টাকাটা পর্যন্ত আমাকে দিতে হয়। ঘরের বড় ছেলে কিন্তু পরিবার সম্পর্কে একটুও চিন্তাভাবনা নেই নিজের ভিতরে, আগেরটা এরকম হলে পিছনের গুলো কি রকম হবে? হালের বলদ প্রথমটা যেদিকে যায় পিছনের গুলোও সেদিকে হাঁটে!” এসব কথা শুনে মুখ দিয়ে খাবারটা ঢুকাতে অনেক বেশি কষ্ট হয়, তবুও খেতে হয় কারণ টেবিল থেকে উটে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই, আর কোথায়’ইবা যাব? কি সামর্থ আছে আমার? এক বেলা না খেয়ে থাকবো, দুই বেলা পারবো, কিন্তু তৃতীয় বেলায় যখন পেটে খিদে লাগবে এই টেবিলেই যে আমাকে ফিরে আসতে হবে। এসব শুনার পরেও আমাকে এই টেবিলে বসেই খেতে হয়।

 

অতঃপর বাবা উটে যাওয়ার পরে যখন মা বলে উটেন, “তর বাবা এতকিছু বলে তুই কিছু একটা করিস না কেন? তাহলে তো আর বাবার এত কথা শুনতে হত না।” তার সাথে সাথে হয়ে ছোট বোনটা যখন বলে, “ইন্টার পাস করেছো ৩-৪ বছর হয়ে গেছে, না ভালো করে লেখাপড়ায় আছো আর না কোন একটা কাজ করছো, ঘুরেঘুরে এসে খেতে বস, একটুও লজ্জাবোধ করে না তোমার এই যে বাবা এত কথা বলেন?” সত্যি বলতে এসব কথা শুনে নিজের কাছে কতটা লজ্জা লাগে আর অপমানিত বোধ হয় আফসুস তা যদি কাউকে বুঝাতে সক্ষম হতাম! কিন্তু আমি কিভাবে তাদের বুঝাবো অমুকের ছেলেটাকে চাকরিটা দিয়েছেন অমুক নিজেই, লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে মাত্র কয়েক হাজার টাকা বেতনের এই চাকরিটার জন্য! তমুকের ছেলেটা টিউশনি করতে পারে কারণ তার মাথায় সে মেধা আছে, উপরওয়ালা তাকে সে মেধাটা দিয়েই পাঠিয়েছেন, আমাকে দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো সম্ভব না, আমার মাথা সেটা নিতে পারে না, কিছু মানুষকে দিয়ে কিছু কাজ হয় না আর আমিও তেমনই! আর অন্যজন যার ছেলে ব্যবসা করছে তার ব্যবসার টাকাটা তাকে কে দিয়েছে সেটা একটু খোঁজ নিয়ে দেখো।

 

আমি এক মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, যার বাবার না আছে বিশাল সম্পত্তি আর না আছে বড় কোন ব্যাংক ব্যালেন্স। তাই আমাকে দিয়ে না আমার পরিবারের কোন স্বপ্ন পূরণ সম্ভব আর না আমার নিজের কোন চাওয়া-পাওয়ার আক্ষেপ মেটানো সম্ভব। একই সঙ্গে মধ্যবিত্তরা এমন এক শ্রেণীর মানুষ যারা না পারে নিচু শ্রেণীর মানুষের সাথে কাঁদে কাঁদ মিলিয়ে চলতে আবার তাদেরকে সমাজের উচ্চ শ্রেণীর মানুষদের সাথেও উটা-বসা করতে হয়। এই নিচু আর উচু শ্রেণীর মাঝখানে পড়ে তুমি পিসে চ্যাপটা হয়ে গেলেও কোন সমস্যা নেই। তার উপর আমি আবার পরিবারের বড় সন্তান, আমার উপর একটু বাড়তি দায়-দায়িত্ব! কয়দিন পর বাবার আর কাজ করার মত সামর্থ থাকবে না, বোনটা বড় হয়ে যাচ্ছে, ছোট ভাই গুলোর লেখাপড়া চালিয়ে নিতে হবে, নিজের বয়সটাও দেখতে দেখতে কিছুদিনের মধ্যে ত্রিশের কোটায় পা রাখবে, মায়ের এখনই যা অবস্থা বোনটার বিয়ে দিয়ে দিলে একা চলা তার পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে পড়বে… হ্যাঁ এতকিছুর চিন্তা আছে আমার মাথায়, কিন্তু এরপরেও সময়ে অসময়ে আমাকে বারবার বলা হয় আমার মাথায় পরিবার সম্পর্কে কোন চিন্তা নাই, আমার নিজের ভবিষৎ পরিবারের অন্যান্যদের ভবিষৎ নিয়ে আমার মাথায় কোন ভাবনাই নাই, আমি একটা নাকি ‘ব ল দ।

 

হ্যাঁ, আমি একটা ‘ব ল দ’, আমি ‘ব ল দ’ কারণ এই সবকিছু বুঝেও আমার করার মত কিছু নেই, তাদের প্রতিটা কথার জবাব দেওয়ার সাহস বা সামর্থ কোনটাই আমার নেই, আমি ‘ব ল দ’ কারণ আমি পৃথিবীর বাস্তবতা বুঝি, পৃথিবীর বাস্তবতা বুঝেও আমাকে অবুঝের মত থাকতে হয়, আমি ‘ব ল দ’ কারণ আমি ‘বড়’, আমি ‘ব ল দ’ কারন আমি ‘লেজি’, আমি ‘ব ল দ’ কারন আমি ‘দায়িত্বহীন’!সবাই এমন টা মনেকরলেও যে অামি কতটা দায়িত্ববান সেটা আমি বড় ছেলেই জানি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *