মোঃ রায়হান কাজী এর একগুচ্ছ কবিতা

১.

 

দীর্ঘশ্বাস বাড়ে তোমাতে

মোঃ রায়হান কাজী

—————————————-

সেদিন ছিল বসন্তের বিকাল,

চারিধারে বইছিল হাওয়া গুঞ্জনের।

এরি মাঝে তোমাকে খুঁজে নিয়েছিলাম

আমার পুরোটা দিয়ে হৃদ গভীরে।

 

সকলের মাঝে আতংক বিরাজ করে,

নতশির চুপ করে সবাই বাসায় বসে থাকে।

তারপর কেঁটে যায় কয়েকটা মাস আনমনে,

সারাক্ষণ তোমাকেই খুঁজি আমার মন মন্দিরে।

 

কাকে দেবো দোষ বলো এতসবের মাঝে,

অশ্রুজল মুছি জেনে না-জেনে তোমাকে ভালোবেসে।

যতসব পরে অহর্নিস অপমান করে,

শেষে তোমার কাছে জমে আমার নামে নালিশ।

 

কোনো এক কাক ভেজা ভোরে,

আবার আসি ছুটে তোমার চেনা প্রান্তরে।

তোমাকেই খুঁজে ফিরি আতংকের ভিড়ে,

বৈচিত্র্যময় এই শহরের অলিগলির ফাঁকে।

 

হঠাৎ লোকজনের মুখে বিবাহ নিয়ে কথাবার্তা শুনে,

হকচকিয়ে ওঠি রিকশার মধ্যে বসে থেকে।

কিসব বলছে লোকজন আমাকে নিয়ে?

মনের মাঝে হাজারো প্রশ্ন জাগে ভাবতে গিয়ে।

 

তোমার চরণের পদচারণায় মুখরিত হয় আমার হৃদয়,

মায়াভরা আঁখি জোড়া মেলে তাকিয়ে ছিলে তুমি আমার দিকে।

আমি বুঝতে পারিনি তুমিই আমার অপরিচিতা,

অপেক্ষার প্রহর গুনে আছো দাঁড়িয়ে এককোণে।

 

তারপর কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে,

আনমনে হেঁটে চলে গিয়েছিলাম অন্য দিকে।

বুঝতে পারিনি তোমার ওভাবে কাছে আসার মানে,

আক্ষেপটা লুকিয়ে আছে এখনো মনের মাঝে।

 

যখন বুঝতে পেরেছিলাম দুই দিবস পরে,

পাপড়িগুলো অন্ধকারের কালো জলে ফুটে।

সেই স্মৃতি ভেবে হারায় নিমিষে মেঘেদের ভিড়ে,

প্রাণ-সমুদ্রে ডুব দিয়ে খুঁজি গীত গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে।

 

২.তীব্র বিমুখতা

মোঃ রায়হান কাজী

————————–

কীসের বন্দনায় কন্ঠে উচ্চারিত হয় ধ্বনি,

কোন সে গান গাই মৃদুস্বরে অজান্তে।

অভিমান করিলাম আনিতে ধরিয়া,

ভুলিনি তো এসেছি ততবারই ফিরিয়া স্মরিয়া।

 

গাছে গাছে ফুল ফুটে ঊষার রজনীতে,

গন্ধে গন্ধে আকুল হয় অধীর আগ্রহে।

নব পুষ্পসাজে সূদুরে চাহিয়া তোমাকে,

তরীর তীর দরিয়া আগমনী গানের সাথে।

 

উন্মাদ বালক তুমি অলখের এই পথে,

ডেকেছে কী সে আমারে, রাখিবো সন্ধানে।

কবির চেতনায় বিশ্বাসী রচিয়া লইবো গীতি,

কন্ঠে মোর বন্দনা বাজে বুকের বামপাশে।

 

অর্ঘ্য বিরচন ঋতুর রজন ফুটেনি এখনো শাখে,

মাধবী কুঁড়ির গন্ধ নাহি মাখি পরম আবেশে।

উপেক্ষায় বাড়ছে তীব্র বিমুখতা মনের ব্যথা,

রিক্ত হস্তে দিগন্তের এপাড় থেকে ওপাড়ে।

 

স্নিগ্ধ আঁখি জোড়া খুলিয়া এ ধারাতে,

রচিবো কাব্য কথা সবকিছু মিলিয়ে।

তবুও লিখতে গেলে সবকিছু যাই ভুলিয়ে,

এলোমেলো কাব্যের কথায় পাগলপারা করে আমাকে।।

 

৩.বিজন প্রান্তের ধারে

মোঃ রায়হান কাজী

——————–

আমার বুক জুড়িয়া

তরঙ্গ ঝর ওঠে অহর্নিশি।

কাশফুলের সহিত মন ভাসে,

কোন সে হাওয়াতে এঁকেবেঁকে।

হৃদয়ে আজ নৃত্য ছুটে,

মেঘের আনাগোনা বাড়ে গগণে।

মৌন হারায় কোথায় জানিনা,

কার অন্তর করবো হরণ তা বুঝিনা?

হৃদ মাজারে ঝর তুলে অনবরতভাবে

প্রেমের কথা বলে মনপ্রাণ উজার করে।

 

ধরনীতে জলধারার কলস্বরে,

অপরিচিতাকে ডাকি নির্জনে।

ওরে প্রেম নদীতে উঠছে ঝর,

বইছে হাওয়া ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসে।

জানিনা আর ফিরবে কিনা,

দেখা হবে কী তোমার সাথে।

বিজন প্রান্তের ধারে

কমেছে তোমার আনাগোনা।

পল্লবদলে আষাঢ় ধারায়

বিরহ ওঠেছে হিয়ার মাঝে।

৪.গুঞ্জরতান অলককোণে

মোঃ রায়হান কাজী

———————–

গায়ে লাগে মন্দ মধুর হাওয়া,

দেখি নাই তরুণীর বাওয়া৷

ভেসে যেতে চায় মন ক্ষণে ক্ষণে,

দখিনা বাতাসের সাথে পুলকে ছুটিয়া।

ফেলে যেতে চায় মনপ্রাণ ছুড়িয়া,

সব চাওয়া পাওয়া একত্রে করিয়া।

ছিন্ন মেঘের আনাগোনা বাড়ে,

ঝর ঝর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে।

হাসিকান্নার সুরে আজি এই যন্ত্র,

জানিনা কী হলে হবে মন্ত্র।

 

শুভ্র পুষ্পের সহিত আলাপে,

তোমাকে দিবো ডালা বাঁধিয়ে।

আলো ঝলমলে ধৌত শ্যামল পরিবেশে,

নির্মল নীল পথে একসাথে চলাতে।

গুঞ্জরতান তুলিবে চরণমূলে,

হাসিঢালা মৃদু ঝংকারে।

ভাবনাগুলো সব অলককোণে,

অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে আঁধারে।

৫.তোমার প্রেমে পড়ে

মোঃ রায়হান কাজী

——————-

তোমার প্রেমে পড়ে,

হয়েছে আমার হৃদয় হরণ।

কোন সে মধুর আলসে হাওয়ায়,

বুকে হচ্ছে অমৃত ক্ষরণ।

সকালবেলা সূর্য হাসে,

পাতার গায়ে আলো নাচে।

মেঘেরা সব খেলা করে,

সোনার বরন আকাশ প্রাণে।

আলোছায়া এরি মাঝে,

নয়ন ভেসে যায় কোন সে টানে।

 

নিখিল এই জগৎ সংসারে,

লাগেনি তো তেমন কোনো কাজে।

মন মন্দিরে করি শুধু

তোমার আরাধনা এই পিঞ্জরে।

তবুও কেবল রই দুরে,

সাঁজ সকালে যখন বীণা বাজে।

 

৬.স্মৃতি কাতরতা

মোঃ রায়হান কাজী

———————

আজও মনে পরে সেদিনের কথা,

মমতাময়ী কন্ঠে যখন ডাকতো দাদু আমাকে।

আমিও যেতাম ছুটে এক দৌড়ে তার কাছে।

যখনি যেতাম তার কাছাকাছি,

স্নেহ বন্ধনে জড়িয়া ধরতেন আমার গাঁ খানি।

কারণে অকারণে মা যখন বকতো আমাকে,

দাদুর কোলে গিয়ে মুখ লোকাতাম,

ধূসররঙের কাপড়ের নিচে।

তিনি যখন খেতে বসতেন থালা নিয়ে,

আদুরী বিড়ালছানা বসতো তার পাশ ঘিরে।

মেও মেও শব্দে মুখরিত করতো,

পুরোটা ঘরের আনাচে কানাচে।

দাদুও তাকে খাওয়াতেন মন-প্রাণ উজাড় করে।

যখনি আসতো শীতের হিমেল হাওয়া।

তার সাথে আকড়ে রাখতেন বিড়ালটিকে,

শিমুল তুলার তৈরি লেপের আবরণ দিয়ে।

যখন যেতাম দাদুর কাছাকাছি,

বিড়ালটি ও আমার কাছে আসতো অনায়াসে।

যখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে,

আমার মনের মাঝখানে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে।

আমিও বসে থাকি মন খারাপ করে।

এভাবেই যখন কাটছিলো সাতদিন,

হঠাৎই শুনলাম সকালবেলা ,

দাদু আর নেই এ দুনিয়াতে।

কান্নায় ভারি হয়ে উঠলো পরিবেশ।

আমিও পাশে আনমনে দাঁড়িয়ে,

চোখ থেকে পানি পড়ছিল গড়িয়ে নিজের অজান্তে।

কিছুক্ষন পরে জড়হলো সবলোকজন আমাদের বাড়িতে।

ঘর থেকে বের করে রাখে নিথর দেহটা আমগাছটার নিছে।

কেউবা ছুটাছুটি করে, বড়োই পাতার গরম জল করবে বলে।

চালতা গাছের নিছে আয়োজন করে,

দাদুকে শেষ স্নান করাবে বলে।

স্নান করানো শেষ হলে,

মসজিদ থেকে আনা খাটিয়াতে রাখে সযতনে,

তাকে সাজাতে থাকে সাদা কাপড় আর সুরমা দিয়ে।

আমিও চেয়ে দেখি শেষবারের মতো অপলক দৃষ্টিতে।

যখন নিয়ে যাবে তাকে আপন বাড়িছাড়ি,

শেষবারের মতন মাতুন ওঠে পুরোটা বাড়ি জুড়ে।

জানাজা শেষে তাকে রেখে আসি না ফেরার দেশে,

কবরে শুয়েদেয় পরম আবেশে।

দাদুর সাথে অদৃশ্য হয়ে যায় বিড়ালটিও,

আমি তাকে খুঁজি সারাটাক্ষন জুড়ে।

খু্ঁজে নাহি পাই,উতলা হয়ে ওঠে মনখানি।

হঠাৎ একদিন দেখি,

দাদু যেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল।

বিড়ালটার নিথর দেহখানা সেখানে পড়ে আছে।

আমি ভাবতে থাকি, এ বুঝি মায়ার টান।

এ বুঝি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি প্রাণীর।

এ ভালোবাসা মানুষের প্রতি মানুষের কখনো দেখা যায় না।

ভাইয়া নিয়ে মাটি চাপা দেয় বিড়ালটি।

তারপর কেটে যায় কত বছর।

যখনি আসি বাড়িতে,

দাদুকে খোঁজেফিরি কল্পলোকে।

তার আছে যতসব স্মৃতি রেখা,

মনের মাঝে আড়াল করে রাখি সযত্নে।

 

৭.আষাঢ়ের দিনে

মোঃ রায়হান কাজী

——————-

আষাঢ় গগণে বাড়ছে মেঘেদের আনাগোনা,

আকাশ ছেয়ে আছে ঘন অন্ধকারে অবেলাতে।

অঝোরে ঝরছে বৃষ্টি বাতাস বেয়ে পুলকে দুলিয়া,

হৃদয় আমায় বেজে ওঠে পুরোনো স্মৃতি স্মরণ করিয়া।

 

বিস্তৃত মাঠঘাট জুড়িয়া বিদুৎ চমকায় আগুনে ঝলসিয়া,

নব তৃনদলে বাদলের সুর ভাসে মুক্ত পরিবেশে।

আবার এসেছে সবুজের আগমন বৃষ্টি ফোঁটার সাথে,

নতুন করে অরণ্য সাঁজে, এই কথা বলে মোর প্রাণ।

 

কৃষকের কন্ঠে প্রতিধ্বনিতে জেগেছে দেখ,

সংস্কৃতির আর পল্লীগীতির নিদর্শনের গান।

মাঠে গিয়েছে রাখাল কৃষক ফিরেছে কী তারা?

নাকি ঝরে আটকা পড়েছে মাঝপথে রহিয়াছে থমকিয়া।

 

গগণ জুড়িয়া শব্দের তীব্রতা বাড়ে পলকে,

হৃদয়ে মোর কম্পন লাগে ওঠি শিহরিয়া।

এই ভয়ে কোনঠাসা হয়ে লোকজন বসে আছে,

আজি নাহি আর বাহির হয় ঘর থেকে।

 

আষাঢ়ের দিনে নদীর দুকূল ভাসে জোয়ারের টানে,

মাঝির বুক কাঁপিয়া ওঠে থরথরিয়া ঢেউয়ের তালে।

ঘাটে যেতে পথ হয়েছে পিছল কাদামাখা,

না জানি পড়ি পা পিছলিয়া ভাঙ্গি হাঁড় তীরে গিয়া।

 

বেলা হতে শেষ নাহি আছে প্রহর আর বেশিরে,

তোরা আছিস কারা বাহিরে আয় ফিরে আয় ঘরেতে।

একটু পড়ে নামবে বুঝি ঝড় প্রকট আকারে দুমড়িয়ে,

উড়বে গাছপালা বৃষ্টির সাথে আষাঢ়ের হাওয়াতে।

 

৮.অপেক্ষায় রইলাম

মোঃ রায়হান কাজী

———————

আমার সমস্থ ভাবনা গুলোকে একত্রে করে,

শহরের রাস্তাগুলোতে হাঁটতে গিয়ে উপলব্ধি বাড়ে।

আত্মাকে স্পর্শ করে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে,

নিমজ্জিত হয়ে বোধশক্তি গভীর প্রাণে।

 

চিরচেনা গলির মোড়ে কিংবা হাটবাজারে,

লোকজনদের আনাগোনা বড্ড কম চোখে পড়ে।

আমার সমস্ত বোধ নতুন করে আবিষ্কার করি,

স্মৃতিবিজড়িত পুরাতন দিনগুলো ভেবে।

 

চেনা শব্দটি ক্রমাগত উচ্চারিত হয় আজ,

মনে মনে জানিনা কেনই বা মোহের মত করে,

শব্দটি বারবার ফিরে আসে অজানা মন্ত্রের মাঝে।

বুকের ভিতর আঁকড়ে ছিল যন্ত্রণাক্ত মন্ত্রটি যে।

 

মুগ্ধমূর্খচোখে ব্যর্থ ব্যক্তিদের মতো করে,

তাকিয়ে দেখি হঠাৎ ঝড়ে ধ্বংসাত্মক শহরটির দিকে।

যেন শূণ্যতায় বিরাজ করে আজ প্রতিটি প্রাণে,

জানা ভয়ে কোনঠাসা হয়ে আছে সবাই বাসাবাড়িতে।

 

অপেক্ষায় রইলাম জীবিত মৃতের এই খেলাকে নিয়ে,

ঝাপিয়ে আসবে একদিন ঠিকই জয়ধ্বনি সবার মাঝে।

আসবে আবার ফিরে রৌদ্রজ্জল দিন হাসিমুখে,

সবাই একসাথে এগিয়ে নিতে নড়বড়ে দেশটাকে।

৯.

শূন্য হৃদয়সভা

মোঃ রায়হান কাজী

——————————-

কোথায় রহিয়াছে সেই দীপ শিখা,

তাহলে কী সেথায় অন্বেষণ ভ্রমি লিখা।

কোথায় গেলে পাবো আলোর দেখা,

বিরহানলে জ্বলছে দ্বিগুণ হারে প্রদীপ শিখা।

ডাকছি তোরে প্রেমাভিসারে গগনবিহারীতে,

বেদনাদূত গাহিয়াছে গান নিশীথ অন্ধকারে।

নিবিড়রতর তিমির চোখ দুখানা উঠছে জলজল করে।

দৃষ্টি অগোচরে তাকিয়ে শুধু তোকেই খোঁজা।

দিচ্ছে হাওয়া গাছের ডাল-পালা জুড়ে,

সে সাথে বাউল গানের সুরে টানছি পথখানা।

 

শূন্য হৃদয়সভা জুড়িয়া আছে হাহাকার,

কবে তুলবে তুমি ঝংকার এই পথের মাঝে?

জীবন প্রাণে সহজ হবে চলাচল নির্জনে,

আপন করে তোমার নাম দরে তুলবো ধ্বনি।

এভাবেই মানিয়ে নিবো মুহুর্তগুলো একসাথে,

আপন করে হিয়ার নিকুঞ্জ পথে যাবো তুষি।

তোমার অরুণকিরণ রূপে পরিপূর্ণতায় সাঁজে,

নীরব পাঠকদের মন ভরে ওঠে জীবন সন্ধিক্ষণে।

আজি এ ক্ষণে ক্ষণে ভেসে যেতে চায় মন,

সবকিছু ফেলে ছিন্ন মেঘের আবরণে সুপ্ত নদীর তীরে।

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *