শীত বস্ত্র। মুহাঃ গিয়াস উদ্দিন রনি

 

রফিক সাহেব আর রুবিনা খানমের একমাত্র আদরের সন্তান মারিয়া। এই মারিয়াই তাদের সকল আশা ভরসার কেন্দ্র-বিন্দু। মারিয়া ব্যতীত যেন তাদের জীবন ধুঁ ধুঁ মরুভূমি। মারিয়া সবেমাত্র চতুর্থ শ্রেণীতে উঠেছে। ওর বয়স অল্প হলে কী হবে? ও কিন্তু ভীষণ চালাক এবং চঞ্চল এক মেয়ে। একদিন রাত্রিবেলা মারিয়া তার বাবার সাথে চাঁদ দেখতে বেরিয়েছে। কিন্তু তার ভীষণ ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। সে বিষয়টি তার বাবাকে জানালো। তখন তার বাবা বলল, এখন শীতকাল আসছে তো তাই,,,। চল ঘরে চলে যাই। এরপর ওরা ঘরে চলে গেলো। পরের দিন ও যখন স্কুলে যখন স্কুলে যাচ্ছিল, তখনো ওর ঠান্ডা লাগছিল। তাই সে শীতের পোষাক পরিধান করেই স্কুলে গেল। রীতি মতো ওর ক্লাস চলছিল। ও বেশ মনোযোগের সাথেই ক্লাস করছিল। কিন্তু হঠাৎ ওর চোখ দুটো জানালার দিকে আটকে গেল। ও গভীর মনোযোগের সাথে কী যেন দেখছিল। কয়েকবার শিক্ষকের ডাকে ওর মনোযোগের ঘোর কাটে। শিক্ষক ওকে ক্লাসে মনোযোগী হওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু ও কিছুতেই ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছিলনা । ও আবার নজর করল জানালার দিকে। কিছুক্ষণ ও বুঝতে পারল যে, এখানে ওর সম বয়সী এক মেয়ে রাস্তা থেকে বোতল কুড়াচ্ছে। প্রচন্ড শীতে ও কাঁপছিলো। কিন্তু ওর গায়ে কোনো শীতের পোষাক ছিলোনা। মারিয়ার যখন স্কুল ছুটি হয়, তখন ও কিছুক্ষণ মেয়েটির খোঁজ করেছিলো কিন্তু পায়নি। তাই সে মন খারাপ করে বাড়িতে চলে গেলো। পরেরদিনও মারিয়া শীতের পোষাক পরিধান করেই স্কুলে এসেছিলো। সে আজকেও গতকালের ছোট্ট মেয়েটিকে একই অবস্থায় একই কার্যে লিপ্ত অবস্থায় দেখতে পায়। মনে মনে ঠিক করে যে, আজকে যে করেই হোক মেয়েটির সাথে কথা বলবেই। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। আজকে সে অনেক চেষ্টায় মেয়েটির দেখা পেলো। সে নামটির নাম জিজ্ঞেস করলে মেয়েটি উত্তর দেয়, তার নাম মিনা। তার সার্বিক অবস্থা মারিয়া মিনাকে জিজ্ঞেস করে। মিনা বলল, কয়েক মাস আগে ওর বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। ওর বাবা একজন গাড়ি চালক ছিলন। ওর বাবার মৃত্যুর পর থেকেই ওদের দুর্দশা শুরু। ওর মা মানুষের কাজ করে যা পায় আর ও বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করে। এ থেকে যা পায় তা দিয়ে তা কোনো মতে ওদের সংসার চলে। মিনার আর পড়ালেখার সুযোগ হয় না। আর শীতের কাপড় কেনা, সে তো গুড়ে বালি। মিনার এ দুরবস্থার কথা জানতে পেরে মারিয়া ভীষণ কষ্ট পায়। সে ভাবে মিনার জন্য যেভাবেই হোক একটা শীতের কাপড়ের ব্যবস্থা করতেই হবে। তাই সে বাড়ি বাবার কাছে বায়না ধরে তাকে নতুন দুইটা শীতের জামা কিনে দিতে হবে। একমাত্র সন্তানের আবদার রাখতে বাবা তাকে দুইটা নতুন শীতের কাপড় কিনে দেয়। এতে মারিয়া দেরি না করে পরেরদিনই একটা জামা মিনার জন্য নিয়ে যায় এবং তাকে উপহার দেয়। এতে মিনা ভীষণ খুশি হয়। কিন্তু বিপত্ত বাঁধল তখন, যখন ও বাড়িতে যায়। ওর মা ওর আরেকটা জামার খোঁজ করে। কিন্তু ও ভয়ে মাকে কিছুই বলেনা। পরে ওর বাবা অফিস থেকে আসলে বাবাকে সব খুলে বলে। মেয়ের এ সমস্ত কান্ড-কারখানা দেখে গর্বে বাবার মুখটা ভরে যায়। তখন বাবা খুশি হয়ে বললেন, সাবাস মা মনি। তুমি অসাধারণ ভালো একটা কাজ করেছ। তোমার থেকে আমাদের সকলেরই শিক্ষা নেয়া উচিত। আমরা যদি গরিব দুঃখীর পাশে না দাঁড়াই, তাহলে দাঁড়াবে কে? বাবার এমন মন্তব্য শুনে মারিয়ার মনটা খুশিতে ভরে উঠে। সে ভবিষ্যতে এভাবেই মানুষের পাশে দাঁড়াবে বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা পোষণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *