ফিটজেরাল্ডকে লেখা হেমিংওয়ের চিঠি

ফিটজেরাল্ডকে লেখা হেমিংওয়ের চিঠি

(অনুবাদঃ সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত)

তাঁর উপন্যাস Tender Is the Night প্রকাশিত হবার এক মাস পর লেখক এফ স্কট ফিটজেরাল্ড আরেক স্বনামধন্য লেখক-বন্ধু আরনেস্ট হেমিংওয়ে’কে অনুরোধ করেন উপন্যাসটি সম্পর্কে তাঁর নিরপেক্ষ মতামত জানাতে। Tender Is the Night উপন্যাসটি লেখা হয়েছে এই দুই লেখকেরই পরিচিত জেরাল্ড ও সারা মারফি নামের দু’টি মানুষের কথা মাথায় রেখে। কাহিনিতে চরিত্র দু’টি হচ্ছে যথাক্রমে নিক ও নিকোলে ডাইভার।

(সূত্রঃ আরনেস্ট হেমিংওয়ের সংকলিত পত্রাবলী, ১৯১৭ – ১৯৬১)

কি ওয়েস্ট,
২৮ মে, ১৯৩৪

প্রিয় স্কট,

তোমার লেখাটি আমি পছন্দ করেছি আবার তেমনভাবে করিওনি। প্রথমে খানিক মন্দ যাচ্ছিল না, সারা ও জেরাল্ড … হ্যাঁ, বেশ তো হচ্ছিল (দূর ছাই, বইটি আবার ডস নিয়ে গেছে, রেফারেন্স দিয়ে যে বলব তার জো নেই )। কিন্তু কোথায় ? খানিক পর থেকেই তুমি ওদের নিয়ে ছেঁদো কথা বলতে শুরু করলে। ওরা যা নয় ওদের তাই বানালে হে? দেখো স্কট, যদি তুমি বাস্তব চরিত্র নিয়ে গল্প লেখো আর অন্য বাপ-মা’র ছেলে-পুলে করে তাদের জন্ম দেওয়াও –তাহলে তাদের সত্যিকারে বাপ-মা কোথায় যাবে বলতে পারো? তুমি তোমার লেখার জন্য যাকে খুশি নিতেই পারো, কিন্তু ওদের দিয়ে যা নয় তা’ই করাতে পারো না। একজন মানুষকে ঠিক তার উল্টো মানুষ বানাতে পারো না। নতুন কিছু আবিষ্কার অতি উত্তম, কিন্তু তা বলে যা ঘটারই না, তাকে তুমি আবিষ্কার করে বসোনা।

কোন ঘটনাকে সাজানো বুলি দিয়ে না সাজিয়ে সোজাসুজি বলাই উত্তম।

ছিঃ ছিঃ, তুমি দেখছি বড্ড বেশি স্বাধীনতা নিয়েছ চরিত্রগুলি ফোটাতে। তুমি অনেকের চেয়েই ভালো লিখতে পারলেও এখানে তুমি তোমার প্রতিভার সদ্ব্যবহার করতে পারোনি, চুলোয় যাক্! ঈশ্বরের দোহাই স্কট, তুমি লেখো, কিন্তু সত্যি কথাটি লেখো, তাতে যদি কেউ আঘাত পায় পাক, তবু তুমি ঐ নির্বোধ সমঝোতাগুলো করে বোসো না। তুমি জেরাল্ড ও সারাকে দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছ, তাদের ব্যাপারে একটা বই তুমি লিখতেই পারো, এবং তা যদি যথার্থ হয় তাহলে এতে তাদেরও আপত্তি করার কিছু নেই।

তোমার মতো এত সুন্দর বর্ণনা’র ক্ষমতা প্রায় কারোরই নেই, যেমনটা তুমি করে এসেছ, কিন্তু লেখাটিতে তুমি তঞ্চকতা করেছ, যার কোন দরকার ছিল না।

আমি সবসময় এটা মনে করি যে তোমার চিন্তাশক্তি অতি দুর্বল। আচ্ছা, আচ্ছা আমরা স্বীকার করব যে তুমি চিন্তা করতে পারো । কিন্তু যখন তুমি কারো জীবনকাহিনী লিখবে তখন মনগড়া কথা না লিখে, ঘটনাগুলিকে ঠিক ঠিক তুলে ধরবে। দ্বিতীয়ত, বেশ কিছু কাল হল তুমি অন্যের কথা শোনা ছেড়ে দিয়েছ, শুধু নিজের করা প্রশ্নের উত্তর ছাড়া। তোমার মধ্যেও বিষয়বস্তু আছে, কিন্তু তা তেমন প্রয়োজনীয় নয়। এসব, অর্থাৎ এই শ্রবণে-অনিহা ব্যাপারটা লেখকদের বড় রসকশহীন কাঠখোট্টা করে তোলে (সব লেখককেই, তোমাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়)। চোখ-কান খোলা রেখেই চারপাশকে জানা যায়, কিন্তু তুমি চোখ খুলে রাখলেও কান রেখেছ বন্ধ ।

লেখাটি হয়ত আমি যতটা খারাপ বলছি, তার চাইতে ভাল। কিন্তু ততখানিও ভাল হয়নি, যতটা ভাল তুমি করতে পারতে।

যুদ্ধক্ষেত্রে ক্লসভিটস, বা অর্থবিদ্যা-মনোবিদ্যা এসব তুমি পড়তে পারো। কিন্তু এসব ছাইপাঁশ পড়ে তোমার লেখার কোনও উন্নতি সাধন হবে না। আমরা হচ্ছি সেইসব কসরতের খেলোয়াড়ের মত যারা মাঝে মাঝেই দারুণ উন্নত মানের খেলা দেখিয়ে থাকি, কিন্তু তা বলে তো সবাই খেলা দেখাতে পারবে না।

যিশুর দোহাই, তুমি লেখো। তা নিয়ে কে কি বলল, বা এটি একটি শীর্ষমানের রচনা হল কি না, তা নিয়ে মাথা ঘামিও না। এই আমি, এক পৃষ্ঠা সুপাঠ্য লিখি তো পরের নিরানব্বই পৃষ্ঠা এক্কেবারে রদ্দি লিখি। সেসব অপকর্মগুলো আমি ওয়েস্টপেপার-বাস্কেটে ফেলে দিই। তুমি ভাবছ যে তুমি যা তা সব লিখে পয়সা কামাবে, নিজের আর অন্যের জীবিকা নির্বাহের জন্যে। ঠিক আছে, তুমি যদি লেখো আর ভালোই লেখো তাহলে কিছু সুখপাঠ্য লেখা আমরাও পাবো (ইয়েলে যেমন বলে থাকি)। চিন্তাভাবনা না করে কেউ মাস্টারপিস লিখতে পারে না। যদি তুমি সেডিস-এর হাত থেকে পরিত্রাণ পাও, যারা তোমাকে প্রায় ধ্বংস করেছে তাদের জীবন থেকে বের করে দিতে পারো, এবং সর্বোপরি প্রশংসা ও সমালোচনা দুই’ই সমান ভাবে গ্রহণ করতে পারো তাহলেই মঙ্গল।

ব্যক্তিগত শোক-টোক ভুলে যাও। আমরা সকলেই প্রথমে ধাক্কা খাই। যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি আঘাত পাচ্ছ, ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি স্থিরভাবে লিখতেও পারবে না। যখন তুমি আঘাতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে তখন তুমি আর প্রতারণা করবে না। এরপর তুমি লেখার প্রতি একজন বিজ্ঞানীর মতোই বিশ্বস্ত থাকো –তা সে ঘটনা যত কঠিনই হোক আর তা তোমার চেনা-অচেনা যার সাথেই ঘটুক না কেন।

এবার যদি তুমি আমার ওপর ক্ষেপে যাও তাহলে আমি তোমায় দোষ দিতে পারি না। সত্যি ! লেখালেখির ব্যাপারে বা জীবন-মৃত্যু এইসব নিয়ে জ্ঞান দিতে যা লাগে না!

আমি তোমার সাথে দেখা করে কথা বলতে চাই, অবশ্যই তুমি যখন সাদা চোখে থাকবে, তখন। সেবার নিউ-ইয়র্কে তুমি কি যে ভয়ানক বিরক্তিকর হয়ে গিয়েছিলে যে আমরা কিছু করতেই পারলাম না। দেখো বো, তুমি-আমি, আমরা কেউই কোনও বিয়োগান্তক নাটকের চরিত্র নই। মোদ্দা কথা আমরা লেখক, লেখাই আমাদের কাজ। তোমার প্রথমেই প্রয়োজন ছিল নিজের কাজের ব্যাপারে শৃঙ্খলাপরায়ণ হওয়া, কিন্তু তার বদলে তুমি কি করলে ? না একটা বিয়ে করে বসলে। কাকে? না এমন একজনকে যে কি না তোমাকে হিংসে করে, রেষারেষি করে তোমায় শেষ করতে চায়। যদিও ব্যাপারটি অত সোজা নয়। জেল্ডা’কে যেবার প্রথম দেখি সেবার মনে হয়েছিল, সে আমার প্রেমে পাগল। কিন্তু তুমি সব এলোমেলো করে দিলে নিজে ওর প্রেমে পড়ে ওকে বিয়ে করে ফেলে । সত্যি তুমি অসাধারণ! কিন্তু জয়েস ও অন্যদের মত ততটা অসাধারণও আবার নও হে। স্কট সমস্ত ভাল লেখকরাই ঘুরে দাঁড়ায়। যখন তুমি নিজেকে ভাবতে বিশাল কিছু, তখনকার থেকে বরং আজকাল ভাল লেখো। গ্যাটসবি সম্বন্ধে আমার তেমন উচ্চ ধারণা ছিল না। তুমি আগের থেকে এখন ঢের ভাল লেখো। লেখার পরিণতির দিকে নজর না দিয়ে তোমার উচিত বাস্তবকে যথাযথ ভাবে তুলে ধরা।

যাও লেখো গিয়ে।

যাই হোক আমি তোমাকে ভীষণই পছন্দ করি। তোমার সাথে কথা বলার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। একসময় আমরা জমিয়ে আড্ডাও দিয়েছি। সেই ছেলেটিকে মনে আছে, যে নেলি প্রায় মরতে বসেছিল ? এবারের শীতে সে এখানে এসেছিল। ভাল ছেলে। ক্যানবি চেম্বারস। ডসের সাথে খুব ভাব হয়েছিল। এখন তো বেশ ভাল আছে। স্কটি, জেল্ডা সব কেমন আছে ? পলিন ওদের ভালবাসা জানাচ্ছে। আমরা ভালই একরকম । প্যাট্রিক’কে সঙ্গে নিয়ে ও সপ্তাহ দুয়েকের জন্য পীগোট যাচ্ছে। ফেরার সময় বাম্বি’কে নিয়ে আসবে। আমাদের দারুণ একটা নৌকো আছে। আমি একটা বড় লেখাতে হাত দিয়েছি। বেশ শক্ত।

তোমার চিরকালের বন্ধু

আরনেস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=