কেইট শোপেনের গল্পঃ এক জোড়া রেশমি মোজা

ভাষান্তরঃ শরিফুল ইসলাম

ক্ষুদ্রকায় মিসেস সমারস একদিন পনেরো ডলারের এক আকস্মিক মালিক হিসেবে নিজেকে আবিষ্কার করলেন। তাঁর কাছে এই পনেরো ডলারই একটা মোটা অঙ্কের টাকা মনে হল। আর টাকাটা তাঁর পুরনো জীর্ণ পার্সটাকে যেভাবে ঠেসে স্ফীত করে তুলেছিল, সেটা দেখে তিনি এক ধরনের গৌরব অনুভব করলেন, যে অনুভূতি তিনি বহু বছর উপভোগ করেনি।

বিনিয়োগের চিন্তাটা তাঁর মনকে প্রবলভাবে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছিল। পুরো এক অথবা দুই দিন তিনি আপাতদৃষ্টিতে একটা স্বপ্নের জগতে হাঁটাচলা করেছিলেন, তিনি সম্পূর্ণ ডুবে গিয়েছিলেন জল্পনায় আর হিসাব- নিকাশে। তাড়াহুড়ো করে হঠাৎ কোন কিছু করে ফেলার ইচ্ছা তাঁর ছিল না, তিনি এমন কিছু করতে চাননি যার জন্যে পরে তাঁকে অনুশোচনায় ভুগতে হবে। কিন্তু মধ্যরাতের স্তব্ধ সময় গুলোতে তিনি শুয়ে জেগে থাকতেন। জেগে জেগে মনের মধ্যে আবর্তিত অভিসন্ধি আঁটতেন আর তাঁর মনে হত এই সব পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তিনি টাকাটার সঠিক এবং সুদূরবর্তী ব্যবহারের একটা পরিষ্কার পথ দেখতে পেয়েছেন।

সাধারণত যে দামে জেনির জন্যে জুতো কেনা হয় তার সাথে দু-এক ডলার যোগ করলে আরও স্থায়ী টেকসই এক জোড়া জুতো পাওয়া যাবে। তিনি অবশ্যই কিনবেন এবং তিনি তাঁর ছেলে, জেনি আর ম্যাগের জামার জন্যে বেশ কয়েক গজ কাপড়ও কিনবেন। তিনি মনস্থ করলেন পুরনো জামা গুলোকে দক্ষ হাতে তালি দিয়ে দেবেন। ম্যাগের জন্যে আরেকটা গাউন কেনা দরকার। তিনি দোকানের জানালায় কিছু সুলভ মূল্যের সুন্দর কাপড়ের নকশা দেখেছেন। ছেলে মেয়েদের জামা বানানোর পরেও নতুন মোজার জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ কাপড় রয়ে যাবে — আলাদা দুই জোড়া — আর কত গুলো রিফুকর্ম যে বেঁচে যাবে! তিনি ছেলেদের জন্যে কয়েকটা মাথার ক্যাপ কিনবেন আর মেয়েদের জন্যে কিনবেন সেইলর-হ্যাট। তাঁর ছোট্ট এই পরিবারটাকে জীবনে একবারের জন্যে অভিনব, পরিচ্ছন্ন আর নতুন ঝকঝকে অবস্থায় দেখার কল্পিত দৃশ্যটা তাঁকে উত্তেজিত আর অস্থির করে তুলল, তাঁকে জাগিয়ে তুলল প্রত্যাশায়।

প্রতিবেশীরা মাঝে মাঝেই নির্দিষ্ট একটা “ভালো সময়” এর কথা বলত, যা মিসেস সমারস মি. সমারসকে বিয়ে করার চিন্তাটা মাথায় আসার আগে থেকেই জানতেন। তিনি এমন ধরনের কোন অসুস্থ অতীত চিন্তায় নিজেকে প্রশ্রয় দিলেন না। অতীতের চিন্তায় নষ্ট করার মত কোন সময় তাঁর ছিল না, তাঁর হাতে একটা সেকেন্ডও ছিল না। বর্তমানের প্রয়োজন গুলো তাঁর মস্তিষ্কের কোষে কোষে সর্বদা আলোড়ন সৃষ্টি করতো। কল্পিত ভবিষ্যৎ দৃশ্যের একটা ক্ষীণ, আবছা দৈত্যমানব মাঝে মাঝে তাঁকে আতঙ্কিত করে তুলত, কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেই পরের দিনের সকালটা আর কখনই আসত না।

দর কষাকষির যে কি মূল্য তা মিসেস সমারসের চেয়ে ভালো আর কেউ জানত না; যিনি কিনা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে ইঞ্চি ইঞ্চি করে তাঁর আকাঙ্ক্ষিত জিনিসটাকে সর্ব নিম্ন দরে কেনার পথে এগিয়ে যেতে পারতেন। তিনি প্রয়োজনে কনুই দিয়ে ঠেলে তাঁর নিজের রাস্তা বের করে নিতেন; তিনি শিখেছিলেন কিভাবে একটা পণ্যকে আঁকড়ে ধরে থাকতে হয়। তিনি অধ্যাবসায় আর দৃঢ় সংকল্পের সাথে পণ্যটার পিছনে লেগে থাকতেন যতক্ষণ না দোকানী ঘুরে আবার তাঁর কাছে ফিরে আসতো। এতে ঠিক কতটা সময় লাগত সে ব্যাপারে তাঁর কোন মাথা ব্যাথা ছিল না।

কিন্তু সেদিন তিনি একটু দুর্বল আর ক্লান্ত অনুভব করছিলেন। মধ্যাহ্নভোজনে তিনি খুবই হালকা খাবার খেয়েছেন— না! মধ্যাহ্নভোজের কথা ভাবতে গিয়ে তাঁর মনে পড়ল, বাচ্চাদের খাওয়ানো আর সবকিছু ঠিকঠাক করা আর নিজেকে কেনাকাটার যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করতে গিয়ে তিনি দুপুরে খাওয়ার কথা সে বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলেন!

তিনি তুলনামূলক জনশূন্য একটা কাউনটারের সামনের একটা ঘূর্ণায়মান টুলের উপর বসে পড়লেন। সেখানে বসে তিনি কাপড়ের দোকানের ভিড়টাকে ঠেলে নিজে অবস্থান নেওয়ার শক্তি ও সাহস সঞ্চয়ের চেষ্টা করলেন। হঠাৎ একটা নিস্তেজ শিথিল অনুভূতি তাঁর পুরো শরীরে বয়ে গেল এবং তিনি উদ্দেশ্যহীন ভাবে তাঁর হাত দুটো ফেলে রাখলেন কাউনটারের উপর। তাঁর হাতে কোন দস্তানা ছিল না। ধীরে কিছুক্ষণ পর একটা নির্দিষ্ট মাত্রার অনুভূতিতে তিনি টের পান তাঁর হাত দুটো খুব শীতল এবং ছুঁতে খুব আরাম এমন কিছু একটাকে স্পর্শ করল। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখতে পান হাত দুটো রেশমি মোজার একটা স্তূপের উপর শায়িত। পাশেই একটা প্ল্যাকার্ড দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে মোজা গুলো বিশেষ ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে — দাম কমে দুই ডলার পঞ্চাশ সেন্ট থেকে এক ডলার আটানব্বই সেন্টে নেমে এসেছে; এবং কাউনটারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যুবতী তাঁর কাছে জানতে চাইল যে তিনি তাদের রেশমি হোসিয়ারির সারিটা যাচাই করে দেখতে চান কি না। তিনি মুচকি হাসেন, এমন ভাবে হাসেন যেন তাঁকে কেউ একটা হীরার মুকুট শেষবারের জন্যে পরিদর্শন করতে বলছে যেহেতু এটা কেনার জন্য তিনি ইতিমধ্যেই বদ্ধপরিকর। কিন্তু তিনি কোন দিকে না গিয়ে দুই হাত দিয়ে উজ্জ্বল বিলাসবহুল পণ্য গুলোর নরম অনুভূতিটা উপভোগ করতে লাগলেন, চোখের কাছে তুলে ধরে দেখতে লাগলেন তাদের চিকচিকে রঙটা, উপভোগ করতে লাগলেন তাঁর আঙ্গুলের চিপা দিয়ে সাপের মত তাদের পিছলে পড়ার অনুভূতিটা।

তাঁর বিবর্ণ গাল দুটো হঠাৎ করেই একটা অস্বাভাবিক লাল বর্ণ ধারণ করল। তিনি মেয়েটির দিকে তাকান।

“এগুলোর মধ্যে সাড়ে আট সাইজের কোন মোজা হবে?”

সাড়ে আট সাইজের অনেক গুলোই ছিল। আসলে, অন্য যে কোন সাইজের চেয়ে সাড়ে আট সাইজটাই বরং বেশী ছিল। এখানে ছিল হালকা নীল রঙ্গের একটা জোড়া; ওখানে ছিল কিছু ল্যাভেন্ডার রঙ্গের, কিছু ছিল পুরোপুরি কালো আর কিছু তামাটে আর ধূসর রঙ্গের মাত্রা ওয়ালা। মিসেস সমারস একটা কালো জোড়া বেছে নেন এবং জোড়াটার দিকে দীর্ঘক্ষণ মনযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকেন। তিনি মোজার বুননটা পরখ করে দেখার ভান করছিলেন, আর দোকানের কর্মচারী নিশ্চিত করে যে তাঁর হাতেরটা উন্নতমানের।

“এক ডলার আটানব্বই সেন্ট।“ সে ঘোরের মধ্যে উচ্চস্বরে বলে উঠলো। “আচ্ছা, আমি এই জোড়াটা নেব।” তিনি মেয়েটিকে পাঁচ ডলারের একটা বিল ধরিয়ে দিয়ে অবশিষ্ট খুচরা টাকা আর পার্সেলের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকেন। পার্সেলটা কত ছোট ছিল! মনে হল এটা তাঁর পুরনো জীর্ণ শপিং ব্যাগের গভীরতায় একবারে হারিয়ে গেল।

এরপর মিসেস সমারস বিক্রয় কাউনটারের দিকে আর গেলেন না। একটা এলিভেটরে উঠে পড়েন। এলিভেটরটা তাঁকে উপরের তলায় মহিলাদের ওয়েটিং রুম এলাকায় নিয়ে গেল। এখানে, একটা নির্জন কোনায়, তিনি কটনের মোজা গুলো খুলে সদ্য কেনা নতুন রেশমি মোজা জোড়া পড়ে নিলেন। তাঁর মানসিক কার্যধারায় কোন সূক্ষ্ম বোধশক্তি কাজ করছিল না, অথবা তিনি নিজের উপর কোন প্রকার যুক্তিও প্রয়োগ করছিলেন না, নিজের সন্তুষ্টির জন্যে তিনি যা করছেন তার বিরুদ্ধে কোন ব্যাখ্যাও তিনি দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন না। তিনি একবারেই কিছু ভাবছিলেন না। মনে হল তিনি কিছু সময়ের জন্যে তাঁর শ্রমশীল, অবসাদময় সকল কাজকর্ম থেকে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, আর একটা যান্ত্রিক ঝোঁকের তাড়নায় তিনি তাঁর সকল দায়দায়িত্ব থেকে একটু ছুটি নিয়েছিলেন।

তাঁর শরীরের চামড়ায় কাঁচা রেশমের স্পর্শের অনুভূতিটা কত ভালো লেগেছিল! মনে হচ্ছিল যেন তিনি এক নরম গদিতে শুয়ে আছেন এবং কিছু সময়ের জন্যে এই বিলাসিতা তিনি উপভোগ করলেন। এটা তিনি খুবই অল্প সময়ের জন্যে করলেন। এরপরই তিনি তাঁর জুতো পরিবর্তন করেন এবং কটনের মোজা গুলো পেঁচিয়ে তাঁর ব্যাগের ভিতরে ছুঁড়ে ফেলেন। তারপর সোজা চলে যান জুতোর ডিপার্টমেন্টে, একটা সিটে বসে পড়েন পা মেপে জুতা কেনার জন্যে।

মিসেস সমারস ছিলেন খুব খুঁতখুঁতে। দোকানের কর্মচারী কিছুতেই তাঁর মোজার সাথে মিলিয়ে জুতা বের করে দিতে পারল না, খুব সহজে সন্তুষ্ট হওয়ার মত মহিলা তো তিনি নন। তিনি তাঁর স্কার্ট একটু তুলে ধরেই রাখেন এবং একদিকে তাঁর পা ঘুরিয়ে রাখেন আর অন্যদিকে মাথা। তাঁর নজরে পড়ে পালিশ করা, সরু মাথা ওয়ালা বুট গুলোর দিকে। তাঁর পা আর গোড়ালিটাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। তাঁর বিশ্বাস হচ্ছিল না যে এই পা দুটো তাঁর নিজের এবং তারা তাঁর শরীরের একটা অংশ। তিনি উন্নতমানের জাঁকালো ফিটিং এর এক জোড়া জুতা চান, যে যুবক তাঁকে জুতা দেখাচ্ছিল তাকে তিনি বলেন এবং তিনি যুবকটিকে এও বলেন যে দুই এক ডলার বেশী লাগলেও জুতো জোড়া কিনতে তাঁর আপত্তি নেই, যদি সে গুলো তাঁর মনের মত হয়।

অনেক দিন হয়ে গিয়েছিল মিসেস সমারস শেষ কোন জুতসই দস্তানা হাতে পড়েছেন। দুর্লভ কোন উপলক্ষে যখনই তিনি কোন দস্তানা কিনেছেন সেগুলি সবসময়ে ছিল দর কষাকষিতে কেনা, আর এতই সস্তা দরের ছিল যে ওগুলি হাতে ফিট হবে এমন চিন্তা করাটা ছিল পুরোপুরি নির্বুদ্ধিতার লক্ষণ।

এখন তিনি দস্তানার কাউনটারে একটা গদির উপর তাঁর কনুই দুটোকে বিশ্রাম দিচ্ছিলেন, আর একটা সুন্দর, মনোরম ছোট্ট প্রাণী, কমনীয় আর স্পর্শকাতর, একটা লম্বা হাতের “বাচ্চা”কে টেনে মিসেস সমারসের উপর নিয়ে আসে। তিনি বাচ্চাটির কব্জির উপরে হাত বুলিয়ে দেন এবং বেশ পরিপাটি করে লাগিয়ে দেন তার বোতাম। দুজনেই এক অথবা দুই সেকেন্ডের জন্যে ছোট্ট সুসঙ্গত দস্তানা পরিহিত হাতের প্রশংসার গভীরতায় হারিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু টাকা খরচ করার তো আরও অনেক জায়গা ছিল।

রাস্তা থেকে কয়েক কদম নিচে একটা দোকানের জানালায় বেশ কিছু বই আর ম্যাগাজিন স্তূপ করে রাখা ছিল। মিসেস সমারস সেখান থেকে চড়া মূল্যের দুটো ম্যাগাজিন কিনে ফেলেন, যেন তিনি তাঁর অবসর দিন গুলিতে অন্যান্য আনন্দদায়ক জিনিসের পাশাপাশি ম্যাগাজিন পড়তেও অভ্যস্ত। কোন মোড়ক ছাড়াই তিনি ম্যাগাজিন দুটো হাতে রাখেন। পাশাপাশি তিনি রাস্তার ক্রসিং এ নিজের স্কার্ট খানিক তুলে ধরে রাখছিলেন। তাঁর সদ্য কেনা মোজা, বুট জুতা আর হাতের সুসঙ্গত দস্তানা যেন তাঁর মনের বিয়ারিং এর মারভেল হিসেবে কাজ করল — তারা তাঁর মধ্যে এক ধরনের নিশ্চয়তার অনুভূতি জাগ্রত করে, তিনি নিজেকে সুবেশী মানুষের ভিড়ের অন্তর্ভুক্ত একজন মনে করেন।

তিনি খুব ক্ষুধার্ত ছিলেন। অন্য সময় হলে বাড়ি পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত ক্ষুধাটা তিনি চেপে ধরে রাখতেন। বাড়ি পৌঁছে নিজের জন্যে এক কাপ চা বানাতেন আর খাবার যা কিছু আছে তাই দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ করতেন। কিন্তু এখন যে ঝোঁক তাঁকে চালিত করছিল, তা তাঁর মাথায় এ ধরনের কোন চিন্তাই প্রশ্রয় দিল না।

পাশের কর্নারেই একটা রেস্টুরেন্ট ছিল। তিনি কখনই দরজা দিয়ে এর ভিতরে প্রবেশ করেনি; বাইরে থেকে মাঝে মাঝে তিনি আবছা ভাবে দেখতেন কিছু দাগহীন রেশমি কারুকাজ, উজ্জ্বল কাঁচের ঝলকানি আর মৃদু পায়ে ওয়েটাররা খাবার পরিবেশন করছে কেতাদুরস্থ মানুষদের।

যখন তিনি ভিতরে প্রবেশ করেন, তাঁর উপস্থিতি কোন চমক সৃষ্টি করল না, কেউই তাঁর দিকে কোন মনযোগও দিল না, তিনি কিছুটা ভয় পেয়ে যান। তিনি একটা ছোট্ট টেবিলে একা বসার পরেই একজন ভদ্র ওয়েটার এসে অর্ডার নিতে চাইল। তিনি অতি প্রাচুর্যের কোনো খাবার অর্ডার না করে; ব্যাকুল ভাবে শুধু একটা সুন্দর ও মজাদার খাবার চান — এক ডজন ব্লু-পয়েন্ট, শাকের সাথে একটা প্লাম চপ, মিষ্টি কিছু একটা — আইসক্রিম জাতীয় কিছু, যেমন, এক গ্লাস রাইন ওয়াইন, এবং সর্বোপরি এক গ্লাস ছোট ব্ল্যাক কফি।

যখন খাবার পরিবেশনের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন, তখন তিনি হাতের দস্তানা গুলো অলস ভাবে খুলে পাশে রেখে দিলেন। তিনি একটি ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে পাতা গুলোতে চোখ বুলাতে থাকেন, তাঁর ছুরির ভোতা প্রান্ত দিয়ে ম্যগাজিনের পাতা গুলো কাটেন। জায়গাটা ছিল খুব মনোরম। রেশমের কারুকাজ গুলো একটু বেশীই পরিষ্কার ছিল যতটা না জানালা দিয়ে দেখা যেত, আর কাঁচ গুলো ছিল আরও ঝলমলে। সেখানে বেশ কয়েকজন নম্র ভদ্র পুরুষ ও মহিলা ছিল, যারা তাঁকে খেয়াল করেনি, তিনি নিজের মত করে একটা ছোট্ট টেবিলে বসে লাঞ্চ করছিলেন। একটা মৃদু, মনোমুগ্ধকর মিউজিকের সুর কানে আসছিল, আর জানালা দিয়ে একটা মৃদু মন্দ বাতাস বইছিল। তিনি খাবারে একটা কামড় বসান, ম্যাগাজিনের একটা অথবা দুটো শব্দ পড়েন, ওয়াইনের গ্লাসে একটা চুমুক দিল এবং তাঁর নতুন রেশমি মোজার ভিতরে পায়ের আঙ্গুল গুলো নাড়তে থাকেন। খাবার দামটা কোন পার্থক্য তৈরি করল না। তিনি টাকাটা গুনে ওয়েটারের হাতে দিলেন, একটা অতিরিক্ত কয়েন ট্রেতে রেখে দিলেন, ফলস্বরূপ ওয়েটার তাঁর সামনে এমন ভাবে মাথা নোয়াল যেন তিনি রাজবংশীয় কোন রাজকুমারী।

তাঁর পার্সে তখনো কিছু টাকা অবশিষ্ট রয়ে গেল এবং তার পরবর্তী প্রলোভনটা একটা ম্যাটিনি-শো এর পোস্টারের রূপে তাঁর মনে উদিত হল।

যখন তিনি থিয়েটারে প্রবেশ করল তখন একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল, নাটক ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছিল আর পুরো ঘরটা তাঁর কাছে বস্তাবন্দী মনে হল। কিন্তু এখানে সেখানে খালি সিট পড়েছিল, তাদের মধ্য থেকে কোন একটায় তিনি বসে পড়েন, তাঁর দু’পাশে ছিল অতি সুন্দর পোশাক পরিহিত মহিলারা, যারা সেখানে গিয়েছিল সময় কাটাতে, ক্যান্ডি খেতে আর তাঁদের জাঁকালো রুচিহীন বেশভূষা দেখাতে। আরও অনেকে ছিল যারা শুধুই নাটক আর অভিনয় উপভোগ করতে গিয়েছিল। এটা নিরাপদে বলা যায় সেখানে এমন কেউ উপস্থিত ছিল না যে মিসেস সমারসের অঙ্গভঙ্গিকে পুরোপুরি সহ্য করতে পেরেছিল। তিনি পুরো জায়গাটা — অভিনেতা, মঞ্চ, আর মানুষজন সবাইকে একটা গভীর আবেগে জড়িয়ে ফেললেন, ডুবে গেলেন এবং উপভোগ করলেন। তিনি হাসির দৃশ্যে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন এবং কাঁদলেন— তিনি আর রুচিহীন মহিলাটা দুঃখের দৃশ্যে কেঁদে উঠেছিলেন। বিষয়টা নিয়ে তাঁরা একটু আধটু কথাও বলেছিলেন। রুচিহীন মহিলাটি তাঁর চোখ মুছলেন এবং একটা চারকোণা লেসে নাকের সর্দি মুছলেন, ক্ষুদ্রাকায় মিসেস সমারসকে তাঁর ক্যান্ডি বক্সটা এগিয়ে দিলেন।

নাটক শেষ হয়ে গেল, মিউজিক থেমে গেল, মানুষজন সব বেরিয়ে গেল। যেন একটা স্বপ্নের সমাপ্তি হল। সবাই এদিক ওদিক ছড়িয়ে পড়ল। মিসেস সমারস এক কোনায় গিয়ে দাঁড়ান এবং গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

গাড়িতে তাঁর বিপরীতে একটা তীক্ষ্ণ চোখের অধিকারী লোক বসেছিল। মনে হল লোকটার কাছে তাঁর ছোট্ট, বিবর্ণ মুখটা ভালো লেগেছে। লোকটা তাঁর মুখে কি দেখেছিল সে অর্থ উদ্ধার করতে গিয়ে বেচারা বিমুঢ় হয়ে পড়লেন। সত্যিকার অর্থে, সে আসলে কিছুই দেখেনি — যতক্ষণ না সে মায়াবী ইন্দ্রজালটা কাটিয়ে নিজের ভিতরের একটা তীব্র আকাঙ্ক্ষা উদ্ঘাটিত করল। লোকটা তীব্র ভাবে চাইল, এই গাড়িটা যেন আর কক্ষনো কোথাও না থামে, যেন চলতেই থাকে, তাঁকে নিয়ে অনন্তকাল।

মূলঃ এ পেয়ার অব সিল্ক স্টকিংস — কেইট শোপেন

লেখক পরিচিতিঃ কেইট শোপেন এর অপর নাম ক্যাথরিন অ’ফ্ল্যাহারতি। শোপেন একজন অ্যামেরিকান ছোট গল্পকার এবং উপন্যাসিক। বর্তমানে তাঁকে মনে করা হয়, তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর নারীবাদী লেখকদের একজন অগ্রদূত। ১৮৯২ সাল থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছোট ও বড় উভয়ের জন্যে গল্প লিখেছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য লেখনীর মধ্যে রয়েছে দুটি ছোট গল্পের সংকলনঃ বেয়ো ফোক (১৮৯৪) এবং অ্যা নাইট ইন অ্যাকেডাই (১৮৯৭)। শোপেন উপন্যাসও লিখেছিলেন দুটিঃ এট ফল্ট (১৮৯০) এবং দ্যা এওয়েকেনিং (১৮৯৯)। তাঁর মৃত্যুর এক দশকের মধ্যে তিনি তাঁর সময়ের একজন সেরা লেখিকা হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর বাবা থমাস অ’ফ্ল্যাহারতি ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তাঁর মা এলিজা ফেরিস ফ্রেঞ্চ কমিউনিটির একজন সদস্য ছিলেন। শোপেন ১৮৭০ সালের ৮ই জুন মিসউরিতে অস্কার শোপেনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শোপেনের জন্ম ১৮৫০ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি এবং তিনি ১৯০৪ সালের ২২শে আগস্ট সেন্ট লুইসে মৃত্যুবরণ করেন।

অনুবাদক পরিচিতি
শরিফুল ইসলাম
জন্মস্থানঃ রংপুর
বর্তমান আবাসঃ ঢাকা
লেখালেখিঃ প্রবন্ধ, ছোট গল্প, গল্প ও কবিতা অনুবাদ।

প্রকাশনাঃ যৌথ প্রকাশনা “স্বপ্ন দিয়ে বোনা”, পত্রিকা সমকালঃ ২৫ শে মার্চ ২০১৬, বাংলামেইল২৪ঃ ৩০ শে মার্চ ২০১৬

ইমেইলঃ shariful7412@gmail.com

One thought on “কেইট শোপেনের গল্পঃ এক জোড়া রেশমি মোজা

  • June 28, 2016 at 5:07 am
    Permalink

    বাক্য সরল। গল্পের সঙ্গে টেনে নিয়ে চলা সুন্দর। অন্তর দর্শণ গভীর-সহজ।
    চরিত্রানুগ নটভূমি-মাত্রিক শব্দ (যদিও অনুবাদ ) যথাসম্ভব ব্যবহৃত হলে পড়ুয়া বুঝি বেশি আবেশিত হতেন ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=