অর্ক চট্টোপাধ্যায়’এর গল্প : নিউটাউনের গল্পনা

যে অপেক্ষা করলেও আসবে, না করলেও আসবে, তার অপেক্ষা কেন করবো? নিউটাউন কলকাতা শহরের সম্প্রসারণ…কলকাতা শহরের অপেক্ষা… কলকাতা শহরের মৃত্যু। মৃত্যু অপেক্ষার ধার ধারে না, এমনিতেই আসে। আর একবার সে এসে পড়লে যতই অপেক্ষা কর না কেন, কেউ কখনো ফিরে আসে না। উচ্ছেদও খানিকটা সেরকম।
যে জায়গাটা এখন নিউটাউনের নামে নির্মীয়মান বহুতলে ভরে যাচ্ছে, সেখানে বছর কয়েক আগেও গরু চরত, বসত ছিল মানুষের। নগরায়নের পাকেচক্রে সে সব মানুষ এখন নির্বাসিত আর কেন্দ্রীয় অতি-ডান সরকারের জমানায় গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ হয়েছে। গরু চরাও কি নিষিদ্ধ? প্রশ্নটা অপেক্ষার…সম্প্রসারণের…মৃত্যুর। ভারতবর্ষে পুনর্বাসন বলে কিছু হয়না। উচ্ছেদ মানে কেবলই উত্খাত। সেটাও চাপিয়ে দেওয়া হয়, সে ডান হাত হোক আর বাঁ হাত। যে জমি-দখলের নামে ক্ষমতা বদল হল, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বাম বদলানো ডান সরকার দেখিয়ে দিল সরকার কখনো পবিত্র হতে পারে না। নোনাডাঙা এলাকায় জব্বর প্রতিবাদ করল উচ্ছেদের মুখোমুখি মানুষ। বার্ষিক গতিতে আবার সব ঠান্ডা। নিউটাউন এলাকার বাংলা নাম ‘রাজারহাট’ শুধু ইঙ্গিতময় হয়ে রইলো। ‘অপারেশন রাজারহাট’।

গবেষণার কাজে সিডনী থাকাকালীন আমি আরেক নিউ টাউন চিনেছি। কলকাতার নিউ টাউনের থেকে সে অবশ্য পুরোনো। শহরের অদূরে হলেও সম্প্রসারণ নয়, হয়ত শহরের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য এলাকা। হিপি, আর্টি ক্রাউডে ভরা নিউটাউন ট্রুলি কসমোপলিটান। নানা দেশের নানা লোক, রকমারি খাবার পাওয়া যায় এখানে। সিডনী শহরের সব থেকে বড় এবং বিখ্যাত কিছু বইয়ের দোকানও। ‘গুলস’ এদের মধ্যে অন্যতম। বিশাল এক গ্যারাজ স্পেসের ভেতর যত্রতত্র বই। ঢুকলে দোকান মনে হয়না। বই সাজানো নেই বলে সারাদিন লেগে যায় খুঁজে পেতে নিতে। সারি সারি বই, থরে থরে বই। পুরোনো সময়ের গন্ধে আর শব্দের ধূলোয় নাক-মুখ ভরে যায়। গ্যারাজের দোতলায় উঠলে পর পর নানা ধরণের লাল বই চোখে পড়ে। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, ট্রটস্কি ছাড়াও বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের দলিল-দস্তাবেজ। আমার নিউটাউনবাসী বন্ধুর মুখে শোনা, এই দোকানের মালিক ছিলেন সিডনীর এক বিখ্যাত ‘কমি’ (অস্ট্রেলিয়ায় কমিউনিস্ট নামটির এমন সারসংক্ষেপ প্রচলিত), এখন তার মেয়ে ‘গুলস’ চালান। ভদ্রলোকের মৃত্যু হয়েছিল এই দোকানেই, দু-তিন বছর আগে। মই থেকে পড়ে যান আর দুনিয়ার বই এসে তার ওপর পড়ে। এই পরিণতির গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল এই লাল বইগুলোই হয়ত পড়েছিল ওঁর ওপর, পিষে দিয়েছিল। একাধারে নিশ্চিত এবং অনিশ্চিত মৃত্যুর রূপ-রূপান্তর! অপেক্ষা করলেও আসবে, না করলেও আসবে। বইয়ের চাপে কি ওঁর শ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল? না, উনি ‘পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্ট’ ছিলেন না। মৃত্যু বলতে মনে পড়ল এই অসি নিউ টাউনের আরেক ক্লেম টু ফেম হল মিস হ্যাভিশামের কবর। চার্লস ডিকেন্সের ‘গ্রেট এক্সপেকটেশনস’ উপন্যাসের চরিত্রটি যে মহিলার আধারে রচিত সেই এলিজা নিউ টাউন সংলগ্ন চার্চইয়ার্ড সেমেটারীতে শায়িত। আমি সেই কবরখানায় গেলেও খুঁজে পাইনি তার কবর। হয়ত খুঁজতে চাইনি বলেই। ডিকেন্সিয়ান প্রেতের গ্রন্থস্মৃতিই যথেষ্ট।

কবর মানেই তো সম্প্রসারণ, অপেক্ষা, মৃত্যু।

সকল প্রেত অমর
আমিও এক প্রেত
————————-
সুতরাং আমিও অমর।

পাঠক ভাবছেন গল্প কই? শুধুই কি কালচারাল ডিটেইলিং? আরে গল্প তো জীবিত মানুষ লেখে। প্রেতেরা শুধু অবজার্ভ করে। যা দ্যাখে, তাই লেখে, তার ওপর গল্প চাপায় না। নিজের লিখনস্বরকে প্রেতকন্ঠ ভেবে যখন এমনতর মজা পাচ্ছি তখন নিউটাউনের কবরখানায় এক সাহেব ভিকিরীর দেখা মিললো। বৃদ্ধের হাতে বেশ কিছু কাগজ যাতে কবিতার মত করে কিসব যেন লেখা। তিনি বললেন কিছু টাকা দিলে বেশ কয়েকটা কবিতা আমায় দেবেন। আমি ওঁকে, কবি, পাগল না ভিকিরী কি বলব ঠিক করতে না পেরে টাকা দিয়ে কয়েক পাতা কবিতা সংগ্রহ করলাম। হাতের লেখা বড়ই দুর্বোধ্য। পাঠোদ্ধার করার চেষ্টা করতে করতে নিউ টাউনে পুরোনো সন্ধ্যা নামলো।

কবিদের পুনর্বাসন হয়না। উচ্ছেদ মানে কেবলই উত্খাত। আর প্রেতেরা বেপরোয়া। তারা পুনর্বাসন ছাড়াই ফিরে আসে, রাজারহাটের বিরোধী প্রজা হয়ে।

আমি প্রেতচক্ষুবলে দেখতে পাচ্ছি।

রাজারহাটের বহুতলের ছাদে গরু চরছে আর কৃষক সেখানে ফসল ফলাচ্ছে।

One thought on “অর্ক চট্টোপাধ্যায়’এর গল্প : নিউটাউনের গল্পনা

  • November 12, 2016 at 1:35 pm
    Permalink

    bhalo bolechis…….pret omor na hole ki ar bhoter er por adhaar card jonmo nito???

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=