মৃন্ময় চক্রবর্তী’র গল্প : এক মুক্তিযোদ্ধার গল্প

এক মুক্তিযোদ্ধার গল্প
 মৃন্ময় চক্রবর্তী
নারানের চায়ের দোকানে
তখন প্রায়ই যেতাম। চায়ের নেশা আমার কোনোদিনই ছিল না
, কিন্তু আড্ডার নেশা ছিল ভয়ানক।বন্ধুরা আসত ওখানে, খোশগল্পে সময় কাটত আমাদের। এমনই এক দিনে আলাপ হয়েছিল দাদুর সঙ্গে। তাঁর নাম আজ
আর মনে নেই। তাঁকে দাদু বলে ডেকেই আলাপ জমিয়েছিলাম। বাংলাদেশের মানুষ ছিলেন ভদ্রলোক।
নিজেই বলেছিলেন তাঁর বয়স আশি ছুঁয়েছে। কালো মাঝারি উচ্চতার শক্তসমর্থ মানুষ। হঠাৎ দেখলে
ষাটের বেশী বয়স বলে মনেই হবে না। বাংলাদেশের মানুষ দেখলে আমার বরাবরই আলাপ করতে ইচ্ছে
জাগে। কে জানে হয়তো পূর্বপুরুষের দেশের প্রতি রক্তে কোথাও একটা অদৃশ্য টান রয়ে গেছে।

ভদ্রলোক বরিশালীয়া টানে কারো সঙ্গে কথা বলছিলেন উচ্চস্বরে।
আমি আলাপ করেছিলাম যেচে। মানুষটি অত্যন্ত সরল ও আন্তরিক। খুব দ্রুতই আমাকে আপন করে
নিলেন। আমি সুযোগ বুঝে জায়গা মত টোকা দিতেই খোলা দরজা দিয়ে বাতাস ঢোকার মত তাঁর কথা
ঝরে পড়তে লাগল অনর্গল।
দাদু বাংলাদেশের বরিশালের নিম্নবর্গের কৃষিজীবী পরিবারের মানুষ। তাঁর গ্রামটি নাকি ছবির মত সুন্দর।
বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া কোন এক নদীতে দাদু মাছ ধরতেন।
টাটকা ইলিশ দ্যাখসো? দেহ নাই। আমি নদী থ্যাইক্যা কত তুলসি।
এক্কেরে ছডফডায়া উডান কাঁপায়
, হা হা!” দাদুর চোখ উজ্জ্বল হয়ে
উঠত দেশের গল্প করতে করতে, “আমার বাড়ি বড় সোন্দার আসিলো ভাইরে
, বড় সোন্দার। চার পাশে সুফারি বন। কলার বন, কাঁডাল গাছ, আমের গাছ। কি মিঠা কি মিঠা রে সেই আম ভাই, কি কমু
তোরে!”
দাদু সেই দেশ ছেড়ে এসেছিলেন।
যে দেশের কথা বলতে গিয়ে তাঁর প্রবীণ চোখ টলমল করে ওঠে।
দাদু মুক্তিযুদ্ধে যোগ
দিয়েছিলেন। “হগগলেই এই দ্যাশে আইসা মিছা গল্প মারে। আমি মিছা কইনা রে ভাই
, দেখ।” – দাদুর হাতে দুটো আঙুল ছিল না। গ্রেনেড
ছুঁড়তে গিয়ে উড়ে গিয়েছিল। দাদু পাক মিলিটারির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন। তাঁর কাছে
সযত্নে রাখা পেপার কাটিং
, ফটোগ্রাফ দেখেছিলাম তাঁর বাড়িতে গিয়ে।
খুব নাছোড়বান্দা হয়ে
ধরেছিলেন একদিন
, তাঁর বাড়িতে যাবার জন্য। মাঠের মধ্যে যে নতুন বসতি
গড়ে উঠেছে
, সেখানেই একটা ছোট্ট বেড়ার ঘর। একচিলতে উঠোনে সন্ধ্যামণি, টগর ফুলের গাছ। একপাশে তুলসীমঞ্চ, মনসাসিজের বেদী করা।
দাদুর স্ত্রী বেঁচে ছিলেন
না। বড় ছেলের বউ আর নাতি সম্প্রতি আলাদা হয়ে পাশেই দরমার ঘর তুলেছে। তিনি ছোট ছেলের
কাছেই থাকতেন
, বড় বউয়ের বড় কষ্টের সংসার। ঘরে খাটের বদলে বাঁশের
মাচা। কোনো আসবাব নেই
, একটা টিনের তোরঙ্গ ছাড়া। সর্বত্র গভীর
অভাবের দাগ।
ছোট ছেলের বৌ, চা আর
নাড়ু দিয়ে আপ্যায়ন করেছিল মনে আছে। ভাবছিলাম এ কেমন পরিণতি একজন স্বদেশ যোদ্ধার।
আরো কিছু জানা বাকি ছিল।
সেদিন দাদুর কাছে শুনেছিলাম। বাকি রয়ে যাওয়া একান্ত দুঃখ যন্ত্রণার ইতিবৃত্ত।
দাদু বড় বেদনায় স্বদেশ
ত্যাগ করেছিলেন। “নইলে তগো মরা দ্যাশে কেডা থাহে ক দেহি ভাই। এ দ্যাশে বড় খাওনের
কষ্ট।”এরশাদের আমলে তাঁর গ্রামে দাঙ্গা হয়। এই একতরফা হামলাকে কি “দাঙ্গা”
বলা যেতে পারে! পুরো গ্রাম লুট হয়। অধিকাংশ বাড়ি জ্বলে। যত মেয়ে-বৌ ছিল গ্রামে প্রায়
প্রত্যেকেই ধর্ষিতা হ
। অনেক যুবতী মেয়েকে হামলাকারীরা তুলে নিয়ে যায়। তার মধ্যে দাদুর একমাত্র মেয়েও
ছিল। দাদু তাকে খুঁজে পাননি। তিনি বহুবার এই একই গল্প আমাকে শুনিয়েছেন। আমিও বিমূঢ়
হয়ে শুনেছি তাঁর আখ্যান।
তবু দাদু এদেশের খবরের
চেয়ে বেশী রাখতেন বাংলাদেশের খবর। তাঁর একমাত্র সঙ্গী রেডিয়োটার চ্যানেলের নব সবসময়
খুলনা রেডিয়োয় স্থির থাকতে দেখেছি যখনই দেখা হয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করতাম
, “কি আবার দ্যাশে ফিরবেন নাকি, বাংলাদেশের খবর এত শোনেন যে?”
আচমকাই অন্যমনস্ক বৃদ্ধ বলে উঠতেন
, “তুই কি বুজবি রে ছ্যামড়া?”
দেশের প্রতি এই গভীর
টান যাকে কখনো দেশ ছাড়তে হয়নি তার পক্ষে বোঝা কঠিন। কিন্তু একটা বিষয় আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য
করতাম
,
মেয়ের কথা জানতে চাইলেই আর কথা বলতে চাইতেন না। যাই, কাজ আছে, এসব বলে উঠে যেতেন।
দাদুর কথা মনে ছিল না
ইদানিং
,
কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম খুবই। বহুদিন হয়ে গেল নারানের চায়ের
দোকানে যাইনি। রাস্তায় দেখা হলে বন্ধুরা অনুযোগ করে। কিন্তু বড় নিরুপায় আমি। আজ সকালে
বাজার করতে গিয়ে আচমকা এক পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা। ভদ্রলোক চায়ের দোকানে এখনো আসেন।
বললেন
,
খবর শুনেছেন?” আমি ঘাড় নেড়ে জিজ্ঞাসা করলাম,
“কোন খবরের কথা বলছেন
?” “আপনিতো অনেকদিন ওদিকে
আসেন না
, দেখাও হয় না। কাল শেষ রাতে সেই ভদ্রলোক মারা গেছেন, শুনলাম একটু আগে।” আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। কার কথা বলছেন ইনি? প্রশ্ন করার আগেই উনি বললেন, “ওই যে বয়স্ক বাঙাল লোকটা, আরে আপনি যাকে দাদু বলতেন।”
খবরটা শুনে মনটা বড় খারাপ
হয়ে গেল। বাজার করা বাদ
দিয়ে, কিছু ফুল কিনে উলটো দিকে হাঁটা ধরলাম। অটোস্ট্যান্ডে সাতসকালেই লাইন। এত মানুষ
পাঁচ সাত বছর আগেও ছিল না। এখন সর্বত্র ভিড় আর লাইনে জীবন জেরবার। যাইহোক অটোর সংখ্যা
বেশী থাকায় বেশীক্ষণ দাঁড়াতে হল না। দশ মিনিটের মধ্যেই বাঁশপোতা এসে গেলাম। এখান থেকে
খানিক পথ হেঁটে মাঠের মধ্যে হঠাৎ কলোনি। বাংলাদেশী উদ্বাস্তুদের পাড়া। পুরোটাই খাস
এলাকা। তবু জমির হাতবদল বেআইনী বিক্রিবাটা চলে এখানে। নেতা খায়
, দাদা-মস্তান খায় নানা অছিলায়। বড় কষ্টে আছে এরা।
ইস্, কাকতালীয় ভাবে যদি
খবরটা না পেতাম তবে শেষ দেখাও হত না। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল
, মাঝখানে কয়েক বছর দাদুর কোনো খোঁজ নিইনি। দাদুর ক্যানসার হয়েছিল তাও জানতাম না।
জানলে
হয়ত এর তার কাছে হাত পেতে কিছু সাহায্য করতে পারতাম!
দাদুর বড় ছেলেকে রাজাকাররা
খুন করেছিল। খুন হওয়া ছেলের বউ ছেলেকে তাঁকেই জন খেটে প্রতিপালন করতে হয়েছে। এখন নাতিটা
বড় হয়েছে
, সে জনমজুর খাটে। যে বৌমা ঘরের বাইরে জীবনে পা রাখেনি তাকেও বাঁচার তাগিদে বাবুর বাড়ি
কাজ করতে হয়। ছোট ছেলেও অনেকদিন টেনেছে সংসার। কিন্তু এই কঠিন বাজারে এতবড় সংসার টানা
মুখের কথা নয়।
ভাবলাম দাদুর চিকিৎসার
খরচ টানতে নিশ্চই ওরা নিদারুণ কষ্ট করেছে। আম-কাঁঠাল-ধান-মাছের দেশের এই মানুষগুলো
শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য কিভাবে লড়াই করে যাচ্ছে, এদের না দেখলে টের পাওয়া যায় না।
তখনও দেহ শ্মশানযাত্রার
জন্য প্রস্তুত হয়নি। বাড়িতে মৃদু কান্নার রোল। বেশীটাই নীরবতা।
পাড়া প্রতিবেশীরা উঠোনে
ভিড় করে আছে। ভিড় ঠেলে গিয়ে আমি ফুল দিলাম দাদুর পায়ে। প্রণাম করলাম। দাদুর ছোটছেলে
এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে খানিক কাঁদল
, বলল, “দাদা আর একদিন আগে আসতে পারলেন না? বাবা রোজ আপনের কথা বলতেন।”কি
বলব
,
কি জবাব দেব, দাদুর দিকে তাকিয়ে নীরব হয়ে থাকলাম। কত রোগা হয়ে গেছিলেন মানুষটা, আহারে। একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিসংগ্রামীর এই অসহায় মৃত্যু আমার চোখকে সজল করে তুলল।
দাদুর পায়ের কাছে একটি
মহিলা মাটিতে পড়ে হাপুস নয়নে কাঁদছিল। ভালো করে দেখতে পাচ্ছিলাম না। কয়েকজন ওকে ধরে
তুলতেই মুখটা দেখতে পেলাম। আরে একে তো চিনি আমি
, আমার পাড়াতেই ভাড়া থাকে। আমার মায়ের কাছে আসে, গল্প করে। খুব দুঃখী। মার মারফৎ এর গল্প আমি শুনেছি
বাংলাদেশী মেয়ে, মেয়ে বলা যায় না এখন। কারণ, তার মেয়েই এখন বেশ বড়। সীমান্ত পার হয়ে একলা চলে এসেছিল। ওদের গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছিল
নব্যরাজাকাররা। কমবয়সী মেয়েদের তুলে নিয়ে গিয়ে
ধর্ষণ করে মেরে ফেলে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে এই মেয়েটিও ছিল। সারারাত পাটখেতে পড়েছিল
অজ্ঞান হয়ে। ওরা মরে গেছে ভেবে ফেলে রেখে যাবার পর ওর জ্ঞান ফিরে আসে। তারপর সে বহু
পথ পাড়ি দিয়ে বিদেশ-বিভুঁই ভারতে চলে আসে। সে এক করুণ
,মর্মস্পর্শী কাহিনী।
এই করুণ কাহিনীর শেষ
হল না তার জীবনে। স্বদেশ ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে এসে
সে আশ্রয় নিয়েছিল এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেই আত্মীয় বেশীদিন রাখতে চায়নি। ফলে কাজ খুঁজে
কলকাতায় চলে আসতে হয়েছিল। সহায় সম্বলহীনা এক নারীর পক্ষে এই জীবন যে কি পরিমাণ কঠিন
তা অনুমান করা শক্ত। আশ্রয় হিসেবে যে খুঁটি সে ধরেছিল
, সে ছিল এক এদেশি লুচ্চা মাতাল। ফলে অচিরেই ঘুচে গিয়েছিল তার সংসারের সাধ। লম্পটটি আবার একটা বিয়ে করে ভেগে গেল। আর তার
জন্ম দেওয়া শিশুকন্যা
টি নিয়ে একলা এই নারী পড়ে গেল অথৈ জলে।
কিন্তু মেয়েটি এখানে
কেন
?
 সে কি দাদুর কোনো আত্মীয়া?
আমি দাদুর ছেলেকে হাতছানি দিয়ে ডাকলাম। সে কাছে আসতেই মেয়েটিকে
দেখিয়ে কানে কানে জিজ্ঞাসা করলাম
, মেয়েটি তোমাদের কে হয়? আমার খুব কৌতুহল জেগে উঠেছিল। কিন্তু দাদুর ছেলে নীরব হয়েই রইল। আমি আবার বললাম, কে এই মেয়ে বলো, আমাকে কি ভরসা করতে পারছ না? সে মাটির
দিকে তাকিয়ে বলল
, “কি যে বলেন দাদা, আপনাকে ভরসা করতে পারব না! বাবা নিশ্চই আপনাকে আমার হারিয়ে যাওয়া দিদির কথা বলেছিল
– এ
আমার সেই দিদি।” আমার কেমন যেন গুলিয়ে গেল সব। আমি বললাম, “কিন্তু দাদু যে বলেছিলেন মেয়ে মারা গেছে।” সে আমার দিকে তাকাল। দেখি তার চোখ
জলে ভরে উঠেছে। “এছাড়া কি আর বলবেন বলুন
, আসলে বাবা চাইতেন মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে, কিন্তু পারতেন না। এই
সমাজ বড় বেয়াদব জিনিস দাদা।
কাছে থাকলে তারা আঙুল দেখিয়ে তাকে অপবাদ দিতবাবা দিদির জন্য কাঁদতেন জানেন। গোপনে যোগাযোগ রাখতেন, সাহায্য করতেন। চেষ্টা করেছিলেন আবার একটা বিয়ে দেবার
আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে
রইলাম। হরিধ্বনি উঠল
, শ্মশানযাত্রার সব প্রস্তুতি শেষ। আমি
মাথা নিচু করে শেষবারের মত প্রণাম জানাতে গিয়ে দেখলাম
, দাদুর চোখ দুটো খোলা, তুলসী পাতায় অতবড় খোলা চোখ ঢাকা পড়েনি।
পাঠক এই অবধি পড়ে নিশ্চই
আমাকে দোষারোপ করবেন
, কারণ আমি দাদুর মত একজন দেশপ্রেমিক, মুক্তিযোদ্ধার নাম মনে রাখতে পারিনি। যদি মনে রাখা যেত তবে ইতিহাসে তাঁর নামটা
সম্মানের আসনে ঠাঁই পেতে পারত
নিশ্চই বইয়ের পাতায় নাম হয়তবা উঠতে পারত। আমি এজন্য যারপরনাই লজ্জিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী।
কিন্তু আপনারা এমন অসংখ্য
মানুষ পাবেন যাদের জীবন দাদুর মতই একই প্রবাহে মিশেছে। সেই ১৯৪৭ থেকে শুরু হয়েছে যে
যাত্রা তা তো আজো শেষ হয়নি।

এবার নতুন কোনো মানুষের
সন্ধান হয়তো আপনিই
নিজেই পেয়ে যাবেন পাঠক। দাদুর সঙ্গে যাঁর
অনিবার্য মিল রয়েছে। পরের কাহিনীতে যাঁর নাম আর
কিছুতেই হারিয়ে যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=