অদিতার আঁধার : দশম পর্ব

দুহাজার বছর পরে পৃথিবীতে আলাদা কোনো দেশ নেই। মানুষের মৃত্যু হলে তার কপি-করা মস্তিষ্ক পুনরায় দেহে বসানো হয়। প্রফেসর বিষাণের গবেষণা মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াকে সাফল্যমণ্ডিত করেছিল। কিন্তু লোহিতক সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করে এই পদ্ধতি প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে। বিষাণ ও অদিতার দশ বছরের সন্তান সেনভা একশ বছর আগে হারিয়ে যায় চাঁদে। সেনভার কপি-করা মস্তিষ্ক ব্যবহার করে নতুন দেহে আর এক সেনভাকে সৃষ্টি করা হয়, কিন্তু সন্তান হিসেবে নতুন সেনভাকে পুরোপুরিভাবে বিষাণ ও অদিতা গ্রহণ করতে পারে না। এই পর্বে দুই গোয়েন্দার সঙ্গে বিষাণের কথোপকথনে লোহিতক নেতা অশিরের পরিচয় উন্মোচন ও চাঁদে সেনভার হারিয়ে যাবার রহস্যের সমাধান। 
________________________________________________

অদিতার আঁধার দশম পর্ব 


ত্রিমাত্রিক ছবিটি টেবিলের ওপরে ঘোরে। সেনভার ছবি। বিষাণ আর্তনাদ করে ওঠে, “এই ছবি ঠিক ছবি নয়, এই ছবি ভুল ছবি।” সেই আর্তনাদের অসাহয়ত্ব নাকোটা ও আলহেনাকে বিচলিত করে। সেনভার মুখটা টেবিলের ওপর ঘুরতে ঘুরতে শেষাবধি স্থির হয়ে যায়। নাকোটা তার হাত দিয়ে টেবিলের মাঝখানে রাখা বাক্সটার দিকে একটা ঈঙ্গিত করে, সেনভার ছবিটা নিভে যায়।
“সেনভা এখন আর্কটিক সাগরে, সে এখানে কী করে আসবে?” বিষাণের গলা অস্ফূট। 
“আপনি এত বিচলিত হবেন না, প্রফেসর,” আলহেনা বলে, “আমরা জানি সেনভা এখন উত্তর সাগরে আছে।” 
“তাহলে?” তাহলে কথাটা যতক্ষণ বিষাণের বলতে সময় নিল, সেই সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যেই তার মনে একটা সম্ভাবনার কথা জেগে উঠল — এটা কী সম্ভব? না এটা অসম্ভব একটা ব্যাপার। এটা হতে পারে না।
আলহেনা আর নাকোটা বিষাণকে সময় দেয়। তারা জানে বিষাণ নিজেই এই ধাঁধার অর্থোদ্ধার করতে পারবে। অবশেষে বিষাণ বলে, “চাঁদে তাহলে সেনভা হারায় নি, সে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে? না না, সেটা অসম্ভব, এই যুবক সেনভা হতে পারে না, অশির সেনভা হতে পারে না, এটা অন্য কেউ।” 
নাকোটা বা আলহেনা কেউই এর উত্তর দেয় না, তারা দুজনেই জানে বিষাণকে সময় দিতে হবে। প্রায় মিনিটখানেক পরে চেয়ার ছেড়ে আলহেনা উঠে একদিকের দেয়ালের কাছে যায়। আলহেনার হাতের নির্দেশে এবার দেয়ালে ফুটে ওঠে বিশালগড়ের ব্যস্ত রাস্তা। সেখানে ক্যামেরা জুম করে এক নারী মুখের ওপর, আমরা তাকে চিনি, সে হল মিরা, ডকটর বিনতার একজন হত্যাকারী। 
আলহেনা বলে, “এই যুবতীর নাম হল মিরা, বহুদিন হল সে আমাদের কম্পুটার ব্যবস্থায় আছে কারণ তার প্রাক্তন প্রেমিক লোহিতকের সদস্য ছিল। লোহিতকের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি মানুষকে আমরা চোখে চোখে রাখি, কিন্তু তাদের আটক করতে পারি না, হত্যা সন্ত্রাস এসবের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের প্রমাণ না পেলে আমরা কোনো পদক্ষেপ নিতে পারি না। মিরার প্রেমিকের খুব সন্দেহজনকভাবে মৃত্যু হয়, কিন্তু সেটাকে আমরা খুব একটা আমল দিতাম না যদি না ছেলেটির মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পরে মিরার ব্যবহারের পরিবর্তন আমরা লক্ষ না করতাম।” 
দেয়ালে ভেসে ওঠে সেই যুবকের ছবি। আলহেনা বলতে থাকে, “যুবকটির মস্তিষ্ক কপি করা হয় প্রায় তিন বছর আগে, লোহিতক গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগাযোগ এরপরে স্থাপিত হয়, মিরার সাথে পরিচয় হয় আরো পরে। তাই পুরোনো মস্তিষ্কের স্মৃতিতে এসব ঘটনা নেই। মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনের পরে স্বাভাবিকভাবেই লোহিতক আর মিরার সঙ্গে তার যে সম্পর্ক ছিল সেটা সে ভুলে যায়। কিন্তু আমাদের চোখে পড়ল মিরা তাকে যেন আর চিনতে চাইল না। এর আগে মিরা সম্পর্কে আমরা সেরকম কিছু ভাবি নি, কিন্তু তার প্রেমিকের মৃত্যু ও এরপরে তাকে না চেনার ভাব করা আমাদের মাঝে সন্দেহ জাগায়। আমরা সমস্ত তথ্য দিয়ে কম্পুটার সিমুলেশন করি। সিমুলেশন বলে সেই যুবকের মৃত্যুর পেছনে লোহিতকের হাত আছে।” 
বিষাণ বুঝতে পারে না মিরার সঙ্গে সেনভার কী সম্পর্ক, সে একটু অস্থির হয়ে ওঠে। আলহেনা বিষাণের অস্থিরতা বোঝে, কিন্তু তার আরো কিছু পূর্বকথা বলের আছে। সে বলে, “আমরা এরপরে মিরাকে চোখে চোখে রাখি। কয়েক দিনের মধ্যেই মিরাকে আমরা বিশালগড়ের একটা বাড়িতে আসা-যাওয়া করতে দেখি। সেই বাড়ি থেকেই একদিন সেনভা – বা যাকে এখন আমরা অশির বলে চিনি – তাকে বের হতে দেখি। দুঃখের বিষয় আমাদের হাতে যথেষ্ঠ প্রমাণ ছিল না তাকে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য, আপনি জানেন তো আমাদের নাগরিক সুরক্ষা আইন কেমন শক্তিশালী, বিশেষতঃ বিশালগড়ে। এমনকি লোহিতকের সদস্যদের যে আমরা নজরে রাখছি সেটা যদি সুরক্ষা কমিটি জানতে পারে তাহলে আমাদের সমস্ত গোয়েন্দা কার্যকলাপ বন্ধ করে দেবে। তবে ডকটর বিনতার হত্যাকাণ্ডের পরে মনে হয় আমাদের হাতে অনেক সাক্ষ্য এসেছে আইনতঃ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার।” 
বিষাণ আলহেনার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনে, কিন্তু সেই কথার মধ্যে চাঁদ থেকে সেনভা কী করে পৃথিবীতে এল, অথবা কেমন করে সেনভা অশিরে পরিণত হল সেই ব্যাখ্যা থাকে না। সে বলে, “কিন্তু অশির চাঁদে হারিয়ে যাওয়া সেনভা হতে পারে না।” 
এবার নাকোটা বলে, “প্রফেসর বিষাণ, আমরা অশিরের কোনো জীন-বা ডিএনএ-গত তথ্য সরাসরি বিশ্লেষণ করতে পারি নি, কিন্তু আমরা তার মুখাবয়ব ও চুলের রঙের বর্ণালী বিশ্লেষণ করে সেনভার সঙ্গে বলতে গেলে শতকরা ১০০ ভাগ মিল পেয়েছি।” 
“কিন্তু তাহলে সেনভা চাঁদ থেকে কেমন করে পৃথিবীতে ফিরে এল? আর চাঁদেই বা সে কেমন করে হারিয়ে গেল?” 
আলহেনা দেয়ালের ওপর হাত রাখে। দেয়াল জুড়ে ভেসে ওঠে চাঁদের বড় ছবি। সেই ছবির দিকে হাত তুলে আলহেনা বলে, “আপনি জানেন চাঁদের বুকে প্রায় ১০০টি স্টেশন আছে, মূলতঃ বিজ্ঞান গবেষণা ও পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ২০টি চাঁদের অপর পৃষ্ঠে, যাকে আমরা অন্ধকার দিক বলি, যেদিকটা আমাদের কখনই মুখ দেখায় না, সেদিকে অবস্থিত। সেগুলো পৃথিবীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে শুধুমাত্র চাঁদের কক্ষপথে বসানো কয়েকটি কৃত্রিম উপগ্রহ মাধ্যমে। অশির যে সেনভা হতে পারে এই ধারণাটা আমাদের মাথায় এলে আমরা আবার সেনভার পুরোনো ফাইল খুলি। নতুনভাবে কম্পুটার সিমুলেশন করা হয়, সেই সিমুলেশন বলে আপনারা – আপনি ও অদিতা সান – যেখানে ছিলেন তার পাশেই একটা খুবই প্রাচীন, প্রায় ১৭০০ বছরের পুরোনো স্টেশন ছিল মাটির নিচে। তখনো মহাজাগতিক বা কসমিক কণা থেকে মানুষের দেহকে বাঁচানো সহজ ছিল না। তাই মাটির নিচে প্রায় দশ-বারোটা স্টেশন চাঁদে করা হয়েছিল। এর মধ্যে পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপে যে বিরাট সামাজিক ও রাজনৈতিক দুর্যোগ দেখা দেয় তার ফলে চাঁদের সমস্ত প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়, ঐ স্টেশনগুলোর সব তথ্যই হারিয়ে যায়। শুধুমাত্র একটি সংগঠনের কাছে ঐ তথ্যগুলো ছিল। সেটা বলতে পারেন লোহিতকের পূর্বসূরী। আমরা শুধুমাত্র এটা আন্দাজ করছি, আমাদের সিমুলেশনও তাই বলছে। সেনভাকে ঐ সংগঠন তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক তরঙ্গ কম্পাঙ্ক ব্যবহার করে স্টেশনের বাইরে যেতে বাধ্য করে, তারপর স্টেশনের কাছেই মাটির নিচে যে পুরোনো বাসস্থান ছিল – যার নকশা তখনো অজানা ছিল আপনাদের কাছে – সেই জায়গায় তাকে নিয়ে রাখে। সেই বাসস্থান থেকে মাটির তলায় প্রায় শ খানেক কিলোমিটার সুড়ঙ্গ ছিল যাতে কিনা অনায়াসে একটি গাড়ি চলাচল করতে পারে।” 
দেয়ালের ভিডিওতে একটা সিমুলেশন ফুটে ওঠে – বালক সেনভা বায়ুচাপ-সম্বলিত পোষাক পড়ে চাঁদের স্টেশন থেকে বের হয়ে একটা পাথরের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায়। পরে সেই পাথরের পেছন দিকে দেখানো হয় একটা গর্ত যেখান দিয়ে সেনভা নিচে নেমে যায়। সেনভা গর্তে ঢুকে যাবার পরপরই একটা পাথর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নড়ে গর্তের মুখটা বন্ধ করে দেয়। চাঁদের মাটির তলার স্টেশনের সুড়ঙ্গ ফুটে ওঠে। সেখানে সেনভা যন্ত্রচালিতের মত একটা গাড়িতে ওঠে, গাড়িটি দুটো রেল লাইনের ওপরে বসানো। সেনভা উঠলে গাড়িটি চলতে শুরু করে ও সুড়ঙ্গের অপর প্রান্তে হারিয়ে যায়। 
বিষাণ আশ্চর্য হয়ে ভিডিওটি দেখে। চাঁদে মাটির নিচে স্টেশনের কথা সে শুনেছে, কিন্তু সেটা যে তার জীবনের সাথে এভাবে জড়াতে পারে সে ভাবে নি। কিন্তু সেনভাকে বেতার-তরঙ্গ দিয়ে প্রভাবিত করে স্টেশনের বাইরে নিয়ে যাবার কথাটা সে যেন বিশ্বাস করতে পারে না। ঐ সময়ে বেতার-তরঙ্গ দিয়ে কি মানুষের মস্তিষ্ককে পুরোপুরি আয়ত্তে আনা সম্ভব ছিল? এর মধ্যেই বিষাণের কপালের চামড়ার নিচে বসানো ফোন সঙ্কেত দেয় – ডকটর তারকার ফোন করছে। বিষাণ হাত তুলে আলহেনাকে থামতে বলে। ডকটর তারকার বলে, “ডকটর বিনতার চেতনা ফিরে এসেছে। কিন্তু আপনার এখানে একটু আসা প্রয়োজন।” বিষাণ বলে, “আমি আসছি কিছুক্ষণ পরেই।” 
বিনতার জ্ঞান ফিরে আসায় বিষাণ কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়, কিন্তু আলহেনা ও নাকোটার কাছ থেকে তার এখনো অনেক কিছু জানার আছে। একশ বছর আগে লোহিতক গোষ্ঠী বালক সেনভাকে অপহরণ করেছে, সেই সময়ই তারা এমন কিছু পরিকল্পনা করেছিল যা কিনা সুদূরপ্রসারী, অন্ততঃ একশ বছরের ভবিষ্যতে বিস্তৃত। বিষাণ বুঝতে পারে মস্তিষ্ক কপি করা ও প্রতিস্থাপনে তার বিশেষ ভূমিকার জন্যই সেনভাকে লোহিতক বেছে নিয়েছিল, তারা সেনভাকে নতুনভাবে গড়েছে, লোহিতকের দর্শনে বড় করেছে, অশির নাম দিয়েছে। সেই অশির আজ লোহিতকের নেতা। এটা এক ধরণের প্রতিহিংসা। অশির কি জানে না বিষাণ ও অদিতার সাথে তার সম্পর্ক, নাকি জেনেশুনেই সে এই পথে গেছে। হয়তো নতুন সেনভার অস্তিত্ব সে সহ্য করতে পারে নি। 
বিষাণ আলহেনা ও নাকোটাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “ডকটর বিনতার জ্ঞান ফিরেছে, আমাকে যেতে হবে। কিন্তু বুঝতেই পারছেন আপনাদের কাছ থেকে আমার অনেক কিছু জানার আছে। চাঁদ থেকে সেনভা বা অশিরকে পৃথিবীতে কেমন করে নিয়ে আসা হল অথবা এতদিন কেমন করে সে সমস্ত তথ্য-ব্যবস্থার বাইরে ছিল – এই সবকিছুই বড় রহস্য। লোহিতকের দর্শন সম্পর্কে আমি আগ্রহী হই নি, অথচ আমার কাজের বিপরীতে তাদের আদর্শিক অবস্থান সম্পর্কে আমি গত একশ বছর ধরেই জানি।”
আলহেনা দেয়ালে চাঁদের ছবি নিভিয়ে দিয়ে এসে চেয়ারে বসে। তারপর টেবিলের ওপরের সূক্ষ্ণ কারুকাজের দিকে তাকিয়ে কিছুটা আনমনা ভাবেই বলে, “লোহিতক আপনার কাজের উদ্দেশ্যতে বিশ্বাস করে না। তারা সমস্ত কপি-করা সংরক্ষিত মস্তিষ্ক ধ্বংস করে দিতে চায়। ১৬ বিলিয়ন থেকে গত দু হাজার বছরে আমাদের জনসংখ্যা দুই বিলিয়নে নেমেছে। এই সংখ্যাকে স্থিত করতে মানুষের আয়ু বাড়ানো জরুরী ছিল। একই সাথে দুর্ঘটনা-জনিত ট্র্যাজেডিকে চিরতরে দূর করার জন্য মস্তিষ্ককে কপি করে রাখার দরকার ছিল। পৃথিবীর মানুষ নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে গেছে। আমরা মনে করছি বর্তমান পৃথিবীর মানুষ মানুষ হিসাবে তার পরিচয়কে প্রাধাণ্য দিচ্ছে। কিন্তু এগুলোকে ধরে রাখতে কিছু কেন্দ্রীয় নীতি চালু রাখতে হচ্ছে, এর মধ্যে একটি হল একটি মানুষের আয়ু অন্ততঃ ২০০ বছর না হলে সে মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার থেকে অব্যাহতি পাবে না, অর্থাৎ সে মরতে পারবে না। আপনি জানেন বিশ্বব্যাপী যে গণভোট হয়েছে তাতে এই আইনটি পাশ হয়েছে। আগামী ২০ বছরের মধ্যে এটি পরিবর্তনের কোনো অবকাশ নেই, ২০ বছর পরের গণভোট হয়তো এটাকে বদলাবে। আমি যেটা বলতে চাইছিলাম একটা সুস্থির সুন্দর সমাজ গড়তে স্বাধীন চিন্তা দরকার, কিন্তু সেই চিন্তার বিকাশের জন্য আবার একটা সুস্থিত অবস্থার প্রয়োজন। লোহিতকের দাবি আমাদের বর্তমান স্থিতিকে পাল্টে দেবার দাবি, তারা জানে গণতান্ত্রিক উপায়ে এগোলে মানুষ তাদের ভোট দেবে না।” 
আলহেনার কথায় এক ধরণের আশাবাদিতা থাকে। আরব অন্তরীপের ধূসর বালিকণার মাঝে একটি শহরে সে বড় হয়েছে। উদারতা ও সহিষ্ণুতার যে শিক্ষা সে ছোটবেলায় পেয়েছে গোয়েন্দা কাজের জটিলতা ও কুটিলতার মাঝেও তার ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয় নি। 
বিষাণের চোখদুটো জড়িয়ে আসে, দুদিন জেগে থাকবার ক্লান্তিতে সে টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে তারপর নিজেকে সামলে নেয়। আলহেনা বলে, “আপনি একটু বিশ্রাম করুন। আমরা তো শহরেই আছি।” 
বিষাণ বলে, “কিন্তু সেনভাকে কে অপহরণ করল?”
আলহেনা আর নাকোটা এক অপরের দিকে তাকায়। তারপর নাকোটা বলে, “প্রফেসর আপনি তো এনাকে চেনেন?” নাকোটা টেবিলের ওপর রাখা বাক্সটার দিকে হাতের ইঙ্গিত করে, একটি বর্ষীয়ান পুরুষ মুখ ভেসে ওঠে। আবার বিষাণের আশ্চর্য হবার পালা, সে বলে, “প্রফেসর রাস্কো!” 
নাকোটা বলে, “হ্যাঁ, প্রফেসর রাস্কো। আপনার শিক্ষাগুরু, কিন্তু যিনি আপনার মস্তিষ্কের ওপর কাজের ঘোরতর বিরোধী ছিলেন।” 
বিষাণ নাকোটাকে বিশ্বাস করতে পারে না, বলে, “আপনি বলছেন রাস্কো সেভানকে অপহরণ করেছিল? এটা অসম্ভব। প্রফেসর রাস্কো আমাদের চাঁদে যাবার আগেই মারা গিয়েছিলেন।” 
নাকোটা তার ডান হাত কপালের ওপর রাখে। এই অনুসন্ধানে সে বহুদিন হল জড়িত, সে ধীরে ধীরে এক বিশাল ষড়যন্ত্রের জট উন্মোচন করেছে, যত সে এর ভেতর ঢুকেছে তত সে আশ্চর্য হয়েছে এর জটিলতায় আর মানব মনের বিচিত্রতায়। তার জন্মভূমি গ্রীনল্যান্ড এখন নাতিশীতোষ্ণ প্রাকৃতিক ভূস্বর্গ, সেখানকার মানুষের মনে এত জটিলতা নেই। নাকোটা বলে, “আমাদের মনে হয় প্রফেসর রাস্কো এখনো বেঁচে আছেন, কোথায় আছেন সেটা আমরা জানি না। কিন্তু আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস সেনভাকে অপহরণের জন্য উনিই সনাক্ত করেছিলেন।” 
প্রফেসর রাস্কো! না, এটা হতেই পারে না। বিষাণ ছিল রাস্কোর সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র, বিষাণের আদি সমস্ত গবেষণার নির্দেশক। রাস্কো ছিল পৃথিবীর অগ্রগণ্য মস্তিষ্ক গবেষক, নোবেল পুরস্কার পেয়েছিল, কিন্তু মস্তিষ্ক সংরক্ষণের ব্যাপারে ছিল ঘোরতর বিরোধী। বিষাণ যখন মস্তিষ্ক কপি করার গবেষণা দলে যোগ দিল রাস্কো ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিল, নানাভাবে বিষাণকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছিল, ব্যর্থ হয়ে বিষাণের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। বহুদিন পরে বিষাণ যেন শুনেছিল রাস্কো মারা গেছে, কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সে রাস্কোর হদিশ করতে পারে নি। 
নাকোটা বলে, “আমাদের যেটা মনে হয় সেটা হল রাস্কো দেখতে চেয়েছিলেন সেনভাকে অপহরণ করার পরে নতুন সেনভার সঙ্গে আপনাদের সম্বন্ধ কেমন হয়, তিনি জানতেন আপনারা নতুন সেনভাকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারবেন না। এটা একটা নিষ্ঠুর পরিহাস বলতে পারেন, কিন্তু রাস্কো ভেবেছেন তিনি একটা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছেন। আর আমাদের মন হয়, একশ বছর আগে, শুধুমাত্র প্রফেসর রাস্কোর পক্ষেই সম্ভব ছিল বেতার-তরঙ্গ ব্যবহার করে কোনো মানুষের মস্তিষ্ককে সম্পূর্ণভাবে প্রভাবিত করার।” 
মাথা ঝিম ঝিম করে বিষাণের। প্রফেসর রাস্কো – যার জন্য একসময় বিষাণ সবকিছু ত্যাগ করতে রাজী ছিল, ঘন্টার পর ঘন্টা, রাতের পর রাত জেগে গবেষণাগারে তারা কাজ করেছে, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখেছে। সারা পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক মহলে রাস্কো ও বিষাণের নাম মস্তিষ্ক গবেষণাকে নতুন স্তরে নিয়ে যাবার জন্য সুপরিচিত হয়েছে। রাস্কোর সঙ্গে তার শেষ দেখার কথা মনে করতে চায় বিষাণ, রাস্কো বলেছিল পৃথিবীর মানুষ নিজের মস্তিষ্ককে কপি করে বাঁচিয়ে রেখে সুখী হবে না। মস্তিষ্ককে কপি করা মানে আর একটা মানুষ সৃষ্টি করা। সেই মানুষের স্বপ্ন ও আত্মিক বোধ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিষাণ বলেছিল, এ হল মন্দের ভাল, মানুষ যদি মারাই যায় তার স্মৃতি ও বোধ নিয়ে আর একটি জীবন পৃথিবীর বুকে থাকবে, বলতে গেলে এই নতুন মানুষটির সঙ্গে পুরোনো মানুষটির কোনোই পার্থক্য হবে না। রাস্কো বিষাণের কথায় সায় দেয় নি, হয়তো হাতে নাতে তার কথা প্রমাণ করতে এরকম নিষ্ঠুর এক্সপেরিমেন্টের সাহায্য নিয়েছে, তার সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে সন্ত্রাসী সংগঠনের নির্মম নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে। 
ডকটর তারকার আবার ফোন করে। বিষাণকে দরকার। বিনতা জেগে উঠেছে, কিন্তু তার স্বপ্ন থেকে বের হতে পারছে না।


লেখক পরিচিতি
দীপেন ভট্টাচার্য
জন্ম ১৯৫৯। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল।
বিজ্ঞানী। গল্পকার।
মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইন্সটিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিয়ার) গামা রশ্মি জ্যোতির্বিদ হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক।
বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর প্রকাশিত বই : দিতার ঘড়ি, নিওলিথ স্বপ্ন, অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো, নক্ষত্রের ঝড়, বার্ট কোমেনের ডান হাত ও অন্যান্য কল্পকাহিনী। এছাড়া: বঙ্গীয় বদ্বীপের অতীত ও ভবিষ্যৎ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.