নাতালি সারোত’এর গল্প : কূটাভাস

অনুবাদ: আলম খোরশেদ

কী যে ভালবাসত সে তাঁর মত এমন বুড়ো ভদ্রলোকদের, যাঁর সঙ্গে কথা বলা যায়, যাঁরা এত বোঝেন, জীবনের সব অন্ধিসন্ধি জানেন, কত নামকরা লোকের সঙ্গে মিশেছেন তাঁরা। (সে জানে ফেলিক্স ফরে’র বন্ধু ছিল বুড়ো,এবং একবার তিনি সম্রাজ্ঞী ইউজেনির হাতে চুমুও খেয়েছিলেন।)

তো, তার বাবা মার সঙ্গে তিনি ডিনার খেতে এলে, যেন বা শিশু, শ্রদ্ধায় অবনত, (তিনি কত জ্ঞানী)
কিছুটা বিস্ময়ে অভিভূত, হতচকিতভাবে (তাঁর ভাবনাচিন্তার কথা শুনতে পাওয়াটা কী উপকারীই না হবে) সে অন্যদের আগেই বসার ঘরে যায় তাঁকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য।
কষ্টেসৃষ্টে উঠে দাড়িয়ে তিনি বলেন ’ও! তুমি, তা কেমন আছ? সবকিছু চলছে কেমন? আর কী করছ এখন? এ-বছর মজাদার কিছু করছ? আচ্ছা! তাহলে ইংল্যান্ডে ফিরে যাচ্ছ? সত্যি সত্যি? সত্যি সে ফিরে যচ্ছিল। দেশটাকে সে কী ভালই না বাসে। ইংরেজরা,যদি তাদের জানতে তুমি, তিনি তাকে বাধা দেন, ’ইংল্যান্ড .. শেক্সপীয়র না? হ্যাঁ, শেক্সপীয়র। ডিকেন্স,আমার মনে আছে,ভাল কথা,আমি যখন যুবক তখন ডিকেন্স অনুবাদ করে মজা পেতাম। থ্যাকারে। তুমি থ্যাকারে পড়েছ? থ্যা, থ্যা ..ওরা কি এভাবেই উচ্চারণ করে? হ্যাঁ? থ্যাকারে? এ-ভাবেই বলে ওরা?’ তিনি ওকে পাকড়াও করেন,বিশাল মুঠোতে তার প্রায় সবটুকু কব্জা করেন। সে তখন ছিটকে বেরিয়ে যেতে চায়,এলোমেলো ভাবে হুটোপুটি করে,বাচ্চাদের মত তার ছোট্ট পা শূন্যে ছুঁড়ে মারে এবং একই সঙ্গে মিষ্টি একটা হাসি মুখে ধরে রেখে বলে, হ্যাঁ,হ্যাঁ,আমার মনে হয় ঠিকই আছে। হ্যাঁ আপনার উচ্চারণ ভালই হয়েছে। সত্যি তো থ্যা.. থ্যা.. থ্যাকারে, হ্যাঁ ঠিক তাই। হ্যাঁ নিশ্চয়ই আমি ’ভ্যানিটি ফেয়ার’ পড়েছি। এটা তো তাঁরই লেখা।’ তিনি তা চেয়ে দেখেন।
তাকে একটু ঘুরিয়ে ধরেন যাতে আরও ভালো করে দেখা যায়। ‘ভ্যানিটি ফেয়ার? ভ্যানিটি ফেয়ার, তুমি নিশ্চিত? ভ্যানিটি ফেয়ার? তাঁরই লেখা?
মৃদুভাবে হলেও শরীর মোচড়ানো সে অব্যাহত রাখে। অবশ্য তখনও বিনম্র হাসিটুকু অটুট এবং সেই সঙ্গে উৎসুক প্রত্যাশা। তিনি তাকে জোরে, আরও জোরে চেপে ধরেন, ’তা কোন্ পথে যাবে তুমি? ডোভার হয়ে? নাকি ক্যালে দিয়ে? ডোভার? হ্যাঁ? ডোভার হয়ে? কী তাই? ডোভার?’
পালানর কোন পথ ছিলনা। তাঁকে থামাবার কোন উপায় নেই। এত পড়েছেন তিনি … এত জিনিস সর্ম্পকে এত কিছু ভেবেছেন তিনি, চাইলে কত মনোরমই না হতে পারেন। কিন্তু আজ বোধ হয় তাঁর একটা খারাপ দিন যাচ্ছে, কী বিচ্ছিরি মেজাজেই না আছেন তিনি। তিনি অবশ্য নির্দয়ভাবে,কোন ক্ষান্তি না দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন ..’ডোভার,ডোভার, ডোভার? হ্যাঁ? হ্যাঁ? ডোভার? থ্যাকারে? ইংল্যান্ড? ডিকেন্স, শেক্সপীয়র? হ্যাঁ হ্যাঁ ডোভার।’ আর সেও তাঁকে অখুশি করতে পারে এমন কোন আচমকা ভঙ্গি না করেও ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে, আর সম্ভ্রমভরে, মৃদু এবং কিছুটা ধরা গলায়, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ,ডোভার, সেই ভাল। আপনি নিশ্চয় এ-পথে প্রচুর ভ্রমণ করেছেন। নিশ্চয় ডোভার দিয়ে যাওয়া আসাই সুবিধা জনক। হ্যাঁ, ঠিক তাই ডোভার।’
তার বাবা মাকে আসতে দেখেই কেবল তিনি স্ববশে আসেন, তাঁর বাঁধন আগলা করে দেন, আর কিছুটা রক্তিম, কিঞ্চিত আলুথালু, তার সুন্দর পোশাক কিছুটা দোমড়ান,সে অবশেষে,তাঁকে অখুশি করতে ভয় না পেয়ে,পালিয়ে যেতে সাহস করে।
লেখক পরিচিতি
নাতালি সারোত: নাতালি সারোত-এর জন্ম রাশিয়ায় ১৯০২ সালে। শৈশবেই ফ্রান্সে আগমন। গত শতকের পাঁচের দশকে ফ্রান্সে যে ’নিউ নভেল’ আন্দোলন শুরু হয়, নাতালি তার অন্যতম প্রধান কষ্ঠস্বর। অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত উপস্হাপনা, বহুস্তর ভাষাভঙ্গি ও অনুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ সারোত-এর লেখনশৈলীর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হচ্ছে, ’The planetarium’ (১৯৫৯), ’The lie’ (১৯৬৭), ‘Between life & Death’, ইত্যাদি। অনূদিত গল্পটি তাঁর ‘Tropism’ (১৯৫৯) গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।    

3 thoughts on “নাতালি সারোত’এর গল্প : কূটাভাস

  • June 4, 2017 at 7:58 pm
    Permalink

    এই মন্তব্যটি একটি ব্লগ প্রশাসক দ্বারা মুছে ফেলা হয়েছে।

    Reply
  • June 4, 2017 at 7:59 pm
    Permalink

    নাতালি সারাতকে (Nathalie Saurrate) পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য ধন্যবাদ। গল্পটা মনোযোগ দিয়ে পড়ে ঘটনাটা বোধহয় বুঝতে পেরেছি, আপনার অনুবাদ সার্থক হয়েছে। গল্পপাঠের মূল পাতায় গল্পটাকে রাশিয়ার গল্প বলা হয়েছে, কিন্তু এটা কি রুশ দেশের গল্প? নাকি ফরাসী দেশের? ধন্যবাদ। দীপেন ভট্টাচার্য

    Reply
    • June 5, 2017 at 4:37 am
      Permalink

      ধন্যবাদ পাঠ এবং সহৃদয় মন্তব্যের জন্য। এটি স্পষ্টতই একটি ফরাসি গল্প। লেখক পরিচিতিতেই তো উল্লেখ রয়েছে যে তাঁর, “শৈশবেই ফ্রান্সে আগমন। গত শতকের পাঁচের দশকে ফ্রান্সে যে ’নিউ নভেল’ আন্দোলন শুরু হয়, নাতালি তার অন্যতম প্রধান কষ্ঠস্বর।” ‍তারপরও পত্রিকা কর্তৃপক্ষ কেন এই কাণ্ডটি করলেন তা আমার বোধগম্য নয়।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=