গার্বিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ’এর গল্প : যে মহিলা ছটায় এসেছিলেন

ভাষান্তর — সালেহা চৌধুরী 
সেই দোলানো দরজাটা আবার খুলে গেল। এ সময় হোসের রেস্তোরায় কেউ থাকে না। এখন কেবল ছয়টা বাজে। হোসে জানে সারে ছয়টার আগে এই রেস্তোরার নিয়মিত গ্রাহক আসতে শুরু করে না। ওর খরিদ্দার সব এত নিয়মানুবর্তী হয়তো দেখ গেল ছয়টা বাজতে না বাজতেই খুলে যায় সেই দরজা, দোলানো দরজা বা সুইংডোর ঠেলে এক একজন আসতে শুরু করে। একজন মহিলা প্রবেশ করে এখন। কোন কথা না বলে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বসে। তার দু ঠোঁটের মাঝখানে একটি সিগারেট যা এখনো জ্বালানো হয়নি। 
হ্যালো রাণী। ওকে দেখে বলে হোসে। তারপর কাউন্টাারের অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে একটা দাগ ধরা অংশ মুছে ফেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যেই আসুক এমনি ব্যস্ত হয়ে হোসে বলতে চায় তার কাজের কথা আর ব্যস্ততার কথা। এমনকি এই মহিলাকেও কাজ দেখাতে ব্যস্ত। যার সঙ্গে হোসের সম্পর্ক বেশ একটু অন্তরঙ্গ এখন। রেস্তোরার আসল মালিক মোটা ও কর্কশ চেহারার একজন। হাসি, ঠাট্টা ও আপ্যায়নের কাজটি যিনি হোসের হাতে দিয়ে দিয়েছেন। কঠোর পরিশ্রমীর হাতেই রয়ে গেছে এসব হাসি, তামাসার ব্যাপার গুলোও। কাউন্টারের অন্যদিক থেকে এবার হোসে কথা বলে — কি চাও তুমি আজ। 
প্রথমে আমি শেখাতে চাই তোমাকে সত্যিকারের ভদ্রলোক কি ভাবে হওয়া যায়। একটু টুলের মত আসনে বসেছে মহিলা কাউন্টারের টেবিলে কনুইএ ঠেস দিয়ে। মুখে তখনো না জ্বালানো সিগারেট। এমন করে দু ঠোঁটের মাঝখানে সিগারেট রেখেছে যেন এটা হোসের চোখে পড়ে। 
আমি তোমার সিগারেট লক্ষ্য করিনি। তাই বলছো?
আসলে এখনো তুমি সব কিছু ঠিকমত খেয়াল করতে শেখনি।
হোসে কাউন্টার মোছার কাপড় রেখে এগিয়ে যায় কাবার্ডের দিকে। পুরণো আলকাতরা ও ধুলো মাখা কাঠের গন্ধ সেখানে। হোসে সেখান থেকে একটা ম্যাচবাক্স নিয়ে ফিরে আসে। মহিলা একটু কাত হয়ে সিগারেট শুদ্ধো মুখ বাড়িয়ে দেয় হোসের দিকে। ওর ধুলো লাগা লোমশ হাতে জ্বলন্ত কাঠি। হোসে মহিলার এক রাশ চুল লক্ষ্য করে। কিছু শস্তা ভেসলিন মেখে সেই চুলকে বিন্যস্ত করেছে মহিলা। দেখা যায় ফুলফুল ব্রার নিচে মহিলার কাঁধ। হাত তুলতেই তার স্তনের বাঁক ও খাঁচ চোখে পড়ে। দু ঁেঠাটের মাঝখানে জ্বলছে সিগারেট। 
আজ রাতে তোমাকে বড় সুন্দর লাগছে রাণী। হোসে জানায়।
আজে বাজে কথা বাদ দাও দিকি। মহিলা বলে। — মনে করবে ওতেই সব পয়সা মেটাব আমি। 
আমি ঠিক তা বলছি না। তা আজকের দুপুরের লাঞ্চ কি তোমার মনের মত হয়নি? 
মহিলা সিগারেটের ভারী ধোঁওয়া টেনে নেয় ভেতরে। হাত আড়াআড়ি করে রাখে। কনুই তখনো কাউন্টারে। রেস্তোরার জানালা দিয়ে মহিলা বাইরে তাকিয়ে আছে। মুখটা করুণ আর বিষাদগ্রস্ত। ক্লান্তিকর জীবনে বিষাদ। 
আজ তোমাকে আমি খুব চমৎকার একটা স্টেক রান্না করে দেব। হোসে বলে।
আমার কাছে পয়সা নেই। মহিলা জানায়।
গত তিনমাস থেকে তোমার কাছে পয়সা নাই জেনেও তোমাকে প্রতি সন্ধ্যাতে আমি ভাল কিছু খেতে দেই। হোসে জানায়। 
তারপর রাস্তার দিকে গম্ভিরভাবে তাকিয়ে বলে — আজকের সন্ধ্যা আলাদা। 
প্রতিদিনের মতই আজকের সন্ধ্যা। প্রতিদিন ছয়টা বাজতে না বাজতেই তুমি আসো। এসে বল — আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে। বল একটা ক্ষুধার্ত কুকুরের মত। তারপর আমি তোমাকে কিছু খেতে দেই। কিন্তু আজকের সন্ধ্যায় একটা পার্থক্য আছে সেটা এই এসেই বলনি কি ভীষণ ক্ষুধার্ত তুমি। কেবল বলেছো আজকের দিন সব দিন থেকে আলাদা। 
আমি সত্যি কথা বলেছি। এই বলে মহিলা তাকিয়ে দেখে হোসে রেফ্রিজারেটর খুলে কি যেন পরীক্ষা করছে। মহিলা এক দুই সেকেন্ড বোধহয় হোসের সব কিছু পরীক্ষা করে নেয়। তারপর তাকায় কাবার্ডের উপরের ঘড়ির দিকে। এখন ছয়টা বেজে তিন মিনিট। 
সত্যিই হোসে আজকের দিনে পার্থক্য আছে। মুখের ধোঁওয়া ছেড়ে বেশ আবেগশূন্য গলায় বলে সেই মহিলা — আমি আজ ছটায় আসিনি তাইতেই আলাদা। 
এ কথা শুনে হোসে ঘড়ির দিকে তাকায়। 
আমি হাত কেটে ফেলে দেব যদি আমার ঘড়ি এক মিনিটও ¯ে¬øা হয়। 
ঠিক তা নয়। আমি আজ ছটায় আসিনি।
তুমি যখন এসেছ কেবল ছটা বাজার ঘন্টা শেষ হয়েছে। হোসে জানায়। 
এখানে এসেছি আমি ছটা বাজার পনেরো মিনিট আগে। বলে সেই মহিলা। 
হোসে এবার এগিয়ে এসে দাঁড়ায় সেই মহিলার সামনে। মহিলা ওর ডান চোখের পাতা আঙুলে চুলকায়। হোসে তার ফোলা লাল মুখ নিয়ে তাকায় মহিলার দিকে — আমার হাতে ফুঁ দাও। বলে হোসে হেসে। 
ক্লান্তি ও বিষাদে মহিলার মুখ কোমল। বলে — হোসে তোমার পাগলামি থামাও। ছয়মাস হলো আমি কোন মদ স্পর্শ করিনি। 
এমন কথা আর কাউকে বল। আমাকে নয়। মনে হয় আসার আগে দু তিন পাইন্ট টেনে এসেছো তুমি। 
কেবল দুই পেগ আমার এক বন্ধুর সঙ্গে। মহিলা এবার সঠিক কথা বলে। 
ও সেটা বল। এবার তোমাকে বোঝা যাচ্ছে। 
ওসব বোঝাবুঝির দরকার নেই। কিন্তু যেটা তোমাকে বুঝতে হবে তা এই এখানে আমি আজ পৌানে ছয়টায় এসেছি। মানে পনেরো মিনিট আগে। 
ঠিক আছে। এটাই যদি তুমি বলতে পছন্দ কর পনেরো মিনিট আগে এসেছো তাহলে তাই। কি এসে যায় পনেরো মিনিট আগে আর পরে?
এসে যায়। এই বলে মহিলা তার হাত লম্বা করে ছড়িয়ে দেয় কাউন্টারে — কেবল আমি চাই বলে নয়। এটাই ঠিক কথা। এখন চলে গেছে আরো কুড়ি মিনিট। 
ঠিক আছে রাণী। আমি আমার সারাদিন ও সারারাত তোমার জন্য ব্যয় করবো কেবল দেখতে তুমি কতটা সুখে আছো। কথা বলতে বলতে হোসে সারাক্ষনই কাউন্টারের জিনিস এদিক থেকে ওদিক করতে থাকে। ব্যস্ততা দেখায়। বলতে চায় যা তার কাজ সেখানে কোন গাফলতি নেই। বলে আবার হোসে — রাণী আমি তোমাকে সুখী দেখতে চাই। তুমি জান আমি তোমাকে কতটা ভালবাসি। এই কথা শুনে ঠান্ডা চোখে হোসের দিকে তাকিয়ে বলে সেই মহিলা — সত্যি নাকি? ইস কি একটা কথা বললে তুমি। তুমি কি মনে কর হোসে একশো মিলিয়ন দিলেই আমি তোমার সঙ্গে যাব? 
আমি এসব যাওয়া আর থাকার কথা বলছি না। তবে তোমার মুখ দেখে বুঝতে পেরেছি আজকের দুপুরের খাওয়া তোমার মত হয়নি। 
আমি বলছি হোসে মিলিয়ন পেসোস সাধলেও তোমার শরীরের চাপ কোন মেয়ে সহ্য করতে চাইবে না। 
এমন কথায় হোসের মুখ লাল হয়ে যায়। মহিলার দিকে পিঠ দিয়ে কাচের গ্ল-াশ মুছতে থাকে। 
এখন তোমাকে আমার অসহ্য লাগছে। এক কাজ কর। তোমার বরাদ্দ স্টেক খেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাও। 
আমার ক্ষুধাও পেয়েছে খুব। এই বলে জানালা দিয়ে ধূলিধুসরিত শহরের রাস্তা দেখে। জানালা দিয়ে। দেখে নানা সব লোকজন সেই রাস্তায়। এখন বেশ একটু নিস্তব্ধতা সারা রেস্তোরায়। কেবল হোসের কাজের শব্দ সেখানে। কাবার্ডে কি যেন করছে ও। তারপর হোসের দিকে তাকিয়ে বলে কোমল সুরে — তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালবাস পাপিলো? 
বাসি। শুস্ক গলায় বলে হোসে। মহিলার দিকে না তাকিয়ে বলে — খানিক আগে কি বলেছো তুমি জানো?
আমি বলেছি মিলিয়ন পেসোসের কথা। বলে মহিলা।
সেটা আমি ভুলে গেছি। বলে হোসে চট করে। 
তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালবাসো? মহিলা আবার প্রশ্ন করে। 
বাসি। বলে আবার হোসে।
এমনকি তুমি আমি যদি একসঙ্গে বিছানায় না যাই তারপরেও? 
এমন কথার পর মহিলার দিকে ফিরে তাকায় হোসে — আমি তোমাকে সত্যিই অনেক ভালবাসি। কিন্তু সেই কারণে বিছানায় যেতে হবে তার কোন মানে নেই। এই বলে মহিলার কাছে আসে হোসে। হোসে তাকিয়ে আছে মহিলার দিকে। তার শক্তিশালী হাত পড়ে আছে কাউন্টারে। মহিলার চোখে চোখ রেখে বলে হোসে — তোমাকে এত ভালবাসি রানী যার কারণে যে লোকটা প্রতিরাতে তোমার সঙ্গে বিছানায় যায় তাকে আমি খুন করতে পারি। এমন কথায় মহিলা এবার হতভম্ব। এরপর হোসের পানে মনোযোগীতায় তাকায়। একটু সমব্যথা ও ঠাট্টার ভঙ্গিতে চেয়ে আছে। তারপর একটু নীরবতা। খানিকপর শোনা যায় হাসির শব্দ — ও তুমি একটা ঈর্ষাপরায়ন মানুষ। ঠিক তাই, তুমি ভয়ানক ঈর্ষাপরায়ন। 
আবার হোসের মুখ লাল। যেন কোন একটা শিশু হঠাৎ করে বলে ফেলেছে তার জীবনের কোন গভীর সত্য। 
আজ বিকালে কোন কিছু তুমি ঠিকমত বুঝতে পারছো না রানী। এই বলে পুরণো কাপড়ে মুখ মোছে হোসে। বলে — হয়তো তোমার অপছন্দের জীবনই তোমাকে আজ বিকালে এমন করে তুলেছে। 
মহিলা তার মুখের রংটা বদলে ফেলেছে। হোসের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে — তাহলে তুমি আমার ব্যাপারে ইর্ষাপরায়ন নও? 
খানিকটা ঈর্ষাপরায়ন হয়তো। কিন্তু তুমি যা ভাবছো সেই কারণে নয়। হোসে ওর গলার কলারটা একটু ঢিলে করে। মুখ মোছে আবার হাতের শুকনো কাপড়ে। 
তাহলে কি জন্য? মহিলা আবার প্রশ্ন করে। 
আমি তোমাকে এত ভালবাসি তাই। চাই না এসব কর তুমি। 
কি চাও না? কি সব করি?
চাই না এক একদিন এক এক পুরুষের সঙ্গে বিছানায় যাও। 
সত্যিই কি তুমি সেই মানুষটাকে মেরে ফেলবে যে আমার সঙ্গে রাতে ঘুমোয়?
তা ফেলব। তোমার সঙ্গে যাবে বলে নয়। তোমার সঙ্গে গিয়েছিল বলে। 
ব্যাপার তো একই। বলে সেই মহিলা। 
কথা বোধহয় এবার একটা বিশেষ জায়গায় যেতে চায়। মহিলা কেমন কোমল, নরম, আবেগাচ্ছ্ন্ন, নেশার ভেতরে কথা বলছে। হোসের শান্ত, সুস্থ, সবল মুখের পাশে মহিলার মুখ জেগে আছে। হোসে তখন মহিলার কাছ থেকে নড়তে পারছে না। দাঁড়িয়ে আছে তার কাছে। 
আমি যা বলছি সেটা সত্যি। হোসে বলে।
তাই? হাত বাড়িয়ে হোসের কাজ করা শক্ত হাত স্পর্শ করতে চায় সেই মহিলা। মুখের সিগারেট সরিয়ে বলে — তুমি কি সত্যি সত্যি কাউকে খুন করতে পার? মানে একেবারে শেষ করতে পার?
পারি। এবং কেন পারি সেটা তো তোমাকে বলেছি। বেশ নাটকীয়তার গলায় বলে হোসে। এরপর মহিলার জোর হাসিটা অনেকটা ঠাট্টার মত শোনায়। বলে সেই মহিলা — কি ভয়ানক! কি ভয়ানক! হোসে তুমি দরকার হলে মেরে ফেলতে পার একজনকে? এই বিশাল বপুর, আপাত ধার্মিক হোসে যে কখনো খাবার খেলে দাম দিতে দেয় না সেই হোসে মেরে ফেলবে একজনকে। যে আমাকে মজার সব স্টেক ভেজে দেয়, মজার সব কথা বলে, তার ভেতরেও রয়ে গেছে এক খুনী? কি ভয়াবহ ব্যাপার হোসে। ভাবতেই আমার ভয় লাগছে। 
এবার হোসে মহিলাকে ঠিকমত বুঝতে পারে না। বুঝতে পারে আজ সন্ধ্যায় কোথায় একটা গোলমাল। একটু হতভম্ব এবং একটু রাগও হয় তার। মহিলা যখন জোরে হাসে ওর মনে হয় এবার সে প্রতারিত। মেয়েটা কেবল তাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে — তুমি আজ সন্ধ্যায় একটা বোকা মাতাল মেয়ের মত কথা বলছো। আজ আর খাবার দরকার নেই। ঘরে গিয়ে বিশ্রাম কর। না হলে ঘুমাও। হোসে বলে।
এবার হাসি থামিয়ে মহিলা গুরুগম্ভির হয়ে ওঠে। একটু বেদনার্ত দেখায় তাকে। কাউন্টারে কনুই রেখে ঝুঁকে পড়ে। মহিলা লক্ষ্য করে হোসে রেফ্রিজারেটর খুলে সেখান থেকে কোন একটা কিছু বের করতে চেয়ে আবার বন্ধ করছে। এবার সে কাউন্টারের অন্য দিকে চলে যায়। হোসে এবার কাচের গ্ল¬াশ ঝকঝকে করছে। যেমন সে প্রথমে করছিল। এবারে মহিলা তার কণ্ঠস্বরে কোমলতা এনে বলে — তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালবাস পাপিলো? তারপর আবার ডাকে — হোসে! হোসে ওর দিকে তাকায় না। 
বাড়ি যাও। ঘুমোয়। আর ঘুমের আগে ভালমত গোসলটা সেরে নিও। যেন তোমার শরীর থেকে সবকিছু ধুয়ে মুছে যায়। 
সত্যি বলছি হোসে। আমি কিন্তু মাতাল নই। 
তাহলে আজ তুমি কোন কারণে বোকা মেয়ে হয়েছ। 
তুমি একটু আমার কাছে আসো দেখি। তোমার সঙ্গে আমার কথা বলতেই হবে। মহিলা বলে।
বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলে মেয়েটার খুব কাছে আসে হোসে। এটা ওটা টপকিয়ে, খুব দ্রুত। 
এবার আমার আরো কাছে আস। মহিলা বলে। 
লোকটি এবার মহিলার সামনে দাঁড়ায়। ও ঝুঁকে হোসের চুল ধরে নিজের দিকে আকর্ষণ করে। কিন্তু চুলের গোছা ধরেছে অত্যন্ত কোমল করে। 
তাহলে আবার বল তুমি যা বলেছিলে। 
কোনটা? কোন কথা শুনতে চাও তুমি?
তুমি আমার জন্য একজনকে খুন করবে। যে মানুষটি আমার সঙ্গে বিছানায় যাবে তাকে।
অবশ্যই রাণী। তোমার সঙ্গে যে বিছানায় যাবে তাকেই খুন করবো আমি। 
তার মানে যদি কোন কারণে আমি একজনকে খুন করি তুমি আমাকে ডিফেন্ড করবে এইতো? বেশ ছলাকলার সঙ্গে হোসের চুল ধরে নাড়া দিয়ে বলে সেই মহিলা। 
সেটা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। তুমি যেমন করে বলছো কাজটা কি তত সহজ? 
যদি পুলিস আসে সে তোমার কথা তখন বিশ্বাস করবে আমারটা নয়। 
হোসের হাসি হয়তো বলছে এমন সব কথায় ও এখন সন্মানিত বোধ করছে। সে খুশীও হয়েছে। এবার মহিলার দিকে বলে — আমি বেট রেখে বলতে পারি জীবনেও তুমি কখনো মিথ্যে বলনি তাই না হোসে? 
এইভাবে কথা বলে একটা কিছু পাওয়া মুশকিল মনে রেখ। 
আমি জানি পুলিস তোমার এক কথাতেই সব বিশ্বাস করে ফেলবে। আর সে দ্বিতীয় প্রশ্ন করবে না। 
হোসের হাতের মুঠি এবার কি ভাবতে ভাবতে ধীরে ধীরে কাউন্টারে আঘাত করে। ঠিক কি বলা যায় বুঝতে পারে না। মহিলা আবার পথের দিকে তাকায়। মহিলা ঘড়ির দিকে তাকায়। এবং সে বুঝতে পারে আর কোন ক্রেতা আসার আগেই ভালমত সবকথা শেষ করে ফেলা উচিত। 
তুমি কি আমার জন্য একটু মিথ্যে বলবে হোসে?
মহিলার দিকে এবার তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকায় হোসে। যেন কোন একটা ব্যাপার বুঝেও ঠিক বুঝতে পারছে না। কিন্তু এসব কথাতো এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে ফেলে দেওয়ার মত। এমন একটা ভাবনায় হোসে চুপ করে থাকে। তবু কেন যেন একটু ভীত বোধ করে। বলে — কিসের মধ্যে পড়েছো তুমি রাণী? হাত গুটিয়ে আবার সে কাউন্টারে ভর দিয়ে দাঁড়ায়। হোসের এ্যামোনিয়া মেশানো নিঃশ্বাস এবার মহিলার নাকে লাগে। বলে হোসে — না আমি রীতিমত সিরিয়াসলি জিজ্ঞাসা করছি তোমাকে কিসের মধ্যে পড়েছো তুমি বল? মহিলা মাথা ঘুরিয়ে নেয়। বলে — কোন কিছুর মধ্যে না। এই একটু মজা করবার জন্য বলছি। এই বলে আবার হোসের দিকে তাকিয়ে বলে — মনে হয় কাউকেই তোমাকে খুন করতে হবে না। 
আমিও সত্যি সত্যি কাউকে খুন করতে চাইছি না।
না কাউকে মরতে হবে না। কারণ কেউ আর আমার সঙ্গে বিছানায় যায় না। 
ও তাই নাকি। হোসে বলে — এবারে মনে হচ্ছে তুমি একটু সহজ করে কথা বলছো। আমি মনে মনে ভেবেছি তোমার এসব বিষয় নিয়ে ভাবনা চিন্তা করবার কিছু নেই। 
থ্যাংকু হোসে। কারণ হলো কি জান আমি নিজেই কারো সঙ্গে বিছানায় যেতে চাই না। 
ও আবার তুমি আমার সব গোলমাল করে দিচ্ছ। এবার একটু অধৈর্য মনে হয় তাকে। 
আমি তোমার কোন কিছু গোলমাল করে দিচ্ছি না। এই বলে মহিলা হাত প্রসারিত করে। মনে হয় যে দুটো স্তন জামার ভেতর তা আর এখন মোটেই সুডৌল নয়। 
আগামীকাল আমি চলে যাচ্ছি হোসে। আমি প্রতিজ্ঞা করছি ফিরে এসে আর কখনো তোমাকে বিরক্ত করবো না। 
কখন তুমি আমাকে এমন দয়া দেখাবে বলে ঠিক করেছো?
এই ধর মিনিট খানেক আগে। ঠিক এক মিনিট আগেই মনে হয়েছে এ একটা বাজে খেলা। 
এবার হোসে পুরণো একটা কাপড় কাউন্টার থেকে তুলে নিয়ে গ্লাশ  মুছতে থাকে। এবার সে মহিলার দিকে না তাকিয়ে কথা বলে — তুমি সব কিছু যে ভাবে কর তা একটা বাজে খেলাই বটে। এ তোমার অনেক আগেই জানা উচিত ছিল। 
আমি অনেককাল থেকে জানি এটা ভাল জিনিস নয়। কিন্তু সে ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম এই ধর মিনিট খানেক আগে। মানুষ আমাকে অনেকসময় বমি করিয়ে ছাড়ে।
হোসে হেসে ওঠে। সে কাজ থেকে মাথা তুলে মেয়েটাকে দেখতে চায়। হাসছে তখনো। কিন্তু হাসিটাই সব নয় কেমন দিশেহারার মত কথা বলছে মেয়েটা। কাঁধটা একপাশে একটু উঁচু করে। সিটে বসে কখনো আপনমনে ঘুরছে। চুপ হয়ে আছে এরপর? যেন হঠৎ শরৎ এস ভর করেছে ওর শরীরে। 
তোমার কি এমন বিষয়ে কোন ধারণা আছে? ধর একটা মেয়ে কোন একজন পুরুষের সঙ্গে বিছানায় গেল। তারপর এমন বীতশ্রদ্ধ দেখলে লোকটাকে খুন করতে পারবে। তারপর যত পুরুষকে দেখে সেই বিছানায় যাওয়ার বীতশ্রদ্ধ ভাবটা তার যায় না। 
আচ্ছা তোমার এতসব ভাবনার কি কোন কারণ আছে? এত কিছু ভাবছো যে কেন বুঝতেও পারছি না। এবার মনে হয় হোসের গলায় করুণা। 
কি হবে যদি আমি বলি যখন লোকটা সঙ্গম শেষ করে কাপড় পরছে আমার মনে হযেছিল লোকটার গায়ে বমি করে দেই। আর তখন আমি ভাবছি এই লোক? এই লোকটার সঙ্গে আমি এতটা সময় কাটালাম? তখন ভাবছে একজন নারী পৃথিবীর এমন কোনও সাবান আছে কোথায় যা দিয়ে সেই সময়টাকে ধুয়ে মুছে ফেলা যায়। 
সবকিছু সময়ে মুছে যায় রাণী। সব কিছুকে ধুয়ে মুছে পরিস্কারও করা যায়। কাউন্টার ঝকঝকে করতে করতে হোসে বলে — এই কারণে কাউকে মেরে ফেলতে হবে না। তাকে কেবল চলে যেতে দিতে হবে।
মহিলা কথা বলেই চলেছে। তার গলার স্বর তেমনি আবেগের স্রোতে মাখা। ভরপুর কি সব চিন্তায় — কি হয় হোসে যদি মহিলা বলে তোমাকে দেখলে আমার বমি আসে। বলার পরেও লোকটা তাকে আবার অধিকার করতে চায়। চুমু খেতে চায়। থিকথিকে সব কান্ড করতে চায়। কি হয়—-
যার রুচি আছে সে এমন কাজ করতে পারে না রানী। হোসে বলে।
যদি করে তাহলে কি হয়? মহিলা প্রায় দম বন্ধ করে এমন একটা প্রশ্ন করে হোসেকে। লোকটি যদি এমন করে তাহলে বুঝতে হবে ওর কাছে তোমার এই মনোভাবের সত্যতা স্বীকারের নিয়ম নেই।
বমি বমি ভাবের জন্য, থিকথিকে স্মৃতির জন্য লোকটার গায়ে যদি চাকু ঢুকিয়ে দেয় সেই নারী তাহলে কি হয়?
কি সব ভয়ানক কথা বলছো তুমি। আমার মনে হয় না কেউ এমন করতে পারে।
ভালো কথা যদি করে ফেলে। ধরে নাও করেছে।
ঠিক যতটা খারাপ করে তুমি বলছো ঘটনা কি ততটা খারাপ? হোসে কাউন্টারের ঝাড়াপোছার কাজে আবার মনোসংযোগ করে। মনে হয় যথেষ্ট হয়েছে এসব শুনতে ওর আর ভাল লাগছে না। 
টেবিলের উপর মুঠির গিট দিয়ে আঘাত করবার এই মহিলাকে লাগছে অন্যমত। ঠিক আগেরমত নয়। বলে — তুমি নিজে একটা অসভ্য মানুষ হোসে। তুমি মেয়েদের সবকিছু বুঝতে পারবে আমি ভাবিনি। হোসের জামার হাতা ধরে নিজের দিকে টানে। বলে — ঠিক করে বল হোসে মেয়েটা তাকে মারবে না মারবে না। 
বলে আবার — আর যদি সত্যিই এমন হয় সেকি বলতে পারবে না কেবল নিজেকে রক্ষা করতে সে এমন করেছে। হোসে বেশ একটু গরম চোখে তাকায় মেয়েটার দিকে। 
অনেকটা। এই বলে সে এমন করে চোখ টেপে মনে হয় বলতে চায় ঠিক আছে তোমার সাথে আমি একমত। যেন এসব বলতে বলতে একপ্রকার সমঝোতায় এসেছে তারা। গরুগম্ভির মহিলা এবার হোসের সার্টের হাতা ছেড়ে দেয়। 
আর এমনই কোন কারণে একজনকে কি তুমি রক্ষা করতে চাইবে হোসে? একজন মহিলাকে। 
নির্ভর করছে —-। বলে হোসে। 
কিসের উপর নির্ভর করেছে। মহিলা প্রশ্ন করে — তুমি যদি আমাকে ভীষন ভালবাসো। কেবল ভালবাসার জন্য ভালবাসো যেমন তুমি বলেছো কেবল বিছানায় যেতে নয়। তাহলে? 
ঠিক আছে রানী। তুমি যা বলছো তাই হবে। বিরক্তির সময়টা একসময় পার হয়ে যায়। হোসে এখন শান্তভাবে কাজ করছে। হোসে আবার চলে যায় কাউন্টারের অন্য দিকে। ঘড়িতে তাকায়। দেখতে পায় সারে ছয়টা বাজতে দেরী নেই। 
জানালার রাস্তার দিকে তাকিয়ে খুব জোরে জোরে গ্লাশ মুছতে শুরু করেছে। জানে খানিকপরেই খদ্দের আসতে শুরু করবে। মহিলা নিজের সিটে বসে চুপ করে হোসের কাজ দেখছে। কি ভাবছে তন্ময় হয়ে। কি এক বিষাদে ডুবে দেখছে হোসের কাজ। 
মনে হয় হোসে একটা বাতির মত। যে বাতি এইতো একটু পরে নিভে যাবে। বাতিটাই কি এখন হোসে নয়। অকস্মাৎ প্রতিক্রিয়াহীন ভাবে ঐ্রকান্তিক বশ্বতাস্বীকার করে যখন কোন একজন মহিলা তেমনি গলায় ডাক দেয় — হোসে! হোসে মহিলার পানে তাকায়। একটা ভোঁতা, মন খারাপের অনুভূতিতে। বোকা মেয়েটা কেমন ষাঁড়ের মত নির্বোধ ভঙ্গিতে বসে। মহিলার কথা শুনবার জন্য ওর পানে চেয়ে দেখে। কেবল কথা শুনবার জন্য ঠিক নয় জানবার জন্য ওইখানে এখনো সেই মহিলা বসে আছে কিনা। মহিলাকে রক্ষা করতে হবে এমন কোন মহান কথা সে ভাবছে না। একটু খেলার অংশ এই তাকানোয়। 
আমি বললাম কাল চলে যাব। এ কথার পরওতো তুমি কিছু বললে না। বলে সেই মহিলা।
তা ঠিক। তুমি কিন্তু বলনি কোথায় যাবে।
এই ওইখানে কোথাও। যেখানে কোন পুরুষ আমাকে বলবে না তার সঙ্গে ঘুমোতে যেতে। মহিলা বলে। হোসে হাসে।
সত্যিই তুমি যাবে নাকি? বা যাচ্ছো? হোসের গলার সুর বদল হয়েছে। ও জেনে গেছে এই পৃথিবীর অনেক প্রকার নিয়ম আছে। 
সেতো তোমার উপর নির্ভর করছে হোসে। যদি তুমি আমার কথামত বল কখন আমি এখানে এসেছি আজ তাহলে আমার জীবনে কোন জটিলতা আসবে না। আমি চলে যেতে পারব। আর এরপর তোমাকেও বিরক্ত করবো না। তারপর একটু থেমে মহিলা বলে — কি আমার কথা তোমার পছন্দ হয়?
হোসে সন্মতিসূচক ঘাড় নাড়ে। মহিলা মাথা কাত করে তাকায় হোসের দিকে। বলে — যদি একদিন আমি ফিরে আসি এবং দেখি আমার সিটে বসে কোন এক নারী তোমার সঙ্গে কথা বলছে তখন কিন্তু আমি সত্যিই ইর্ষান্বিত হব তা জানো তো হোসে? 
যদি তুমি সত্যিই ফিরে আস তাহলে আমার জন্য একটা জিনিস তোমাকে আনতে হবে? 
আমি প্রতিজ্ঞা করছি তোমার জন্য একটা পোষা ভাল্লুক নিয়ে আসব আমি। এবার হোসে কাবার্ড মুছবার কাজে দূরে সরে যায়। ফলে দুজনের মধ্যে একটু ব্যবধান সৃষ্টি হয়। আর যখন হোসে হাতটা তোলে মনে হয় কোন একটা অদৃশ্য দেয়াল মুছছে হোসে। মহিলার হাসিতে একটু নিবিড়তা, হোসেকে ভোলানোর মত কোন ইচ্ছা। গ্লাশ মুছতে মুছতে বলে — বল আর কি বলতে চাও? 
তাহলে সত্যি সত্যি কেউ যদি তোমাকে জিজ্ঞাসা করে কখন এসেছে আমি বলবে তো ঠিক পৌনে ছটায়। 
কেন বলব? এবার হোসে এমন ভাব করে এতক্ষণ ধরে বলা মহিলার কোন কথাই সে শোনেনি। 
কেন বলবে সেটা কিন্তু বড় নয়। বলবে আমি তোমাকে বলতে বলছি বলে। 
প্রথম খরিদ্দার এসে সুইংডোর ঠেলে। সে বসেছে কাউন্টারের অন্যদিকে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে সময় ঠিক সারে ছয়টা। 
ঠিক আছে রাণী। তুমি যা বলতে বলবে সেটাই আমি বলবো।
বেশ। এবার তাহলে তুমি আমার জন্য স্টেক রাঁধতে শুরু কর। 
লোকটি এবার একটু হেসে রিফ্রিজারেটর খোলে। একটি প্লে¬ট বের করে তার উপরে মাংসের টুকরো রাখে। তারপর চুলো ধরায়। 
বিদায়বেলায় একটা চমৎকার স্টেক রেঁধে খাওয়াই আমি তোমাকে। 
ধন্যবাদ পাপিলো। মহিলা হেসে উত্তর করে। তার মুখ চিন্তান্বিত দেখায়। মনে হয় কোন এক গোপন জগতের লোকজন নিয়ে সে এখন কারবার করছে। কাঁচা মাংস ভাজার শব্দ শোনা যায়। ভাজার সুস্বাদু গন্ধে রেস্তোরা এবার পরিপূর্ন। ঠিক যতটা সময় ধরে ভাজলে স্টেক সুস্বাদু হয় ঠিক ততটা সময় ধরেই ভাজে হোসে। মহিলা ¯তব্ধ হয়ে বসে আছে। তন্ময় হয়ে কি দেখছে। তারপর মাথা তোলে। চোখের পাতা কেঁপে ওঠে। মনে হয় মুহূর্তের মৃত্যু থেকে সে জেগে উঠেছে। দেখে হোসে চুলোর আগুনের পাশে, আগুনের মতই উজ্জ্বল। 
পাপিলো!
কি বলছো?
কি ভাবছো তুমি?
আমি ভাবছি খাওয়ার সময় তুমি বিয়ার পাবে কিনা সে কথা। 
তা পাব। বলে সেই মহিলা। কিন্তু আমি চাইছি আমার বিদায় বেলার উপহার। 
চুলোর ওপার থেকে হোসে তাকায় ওর দিকে। বলে — কতবার বলতে হবে আমি দেব। তুমি কি বিশেষ কিছু চাও? 
চাই। বলে সেই মহিলা।
কি চাও তুমি?
হোসে তখন একবার ঘড়ির দিকে তাকায়। তারপর আর একবার সেই সব খরিদ্দারের দিকে। চুপ করে কোনে বসে আছে মহিলা। কিছু আদেশ করেনি কি সে চায়। হোসে সেখান থেকে চোখ ফেরাতে ফেরাতে বলে — সত্যি আমি বুঝতে পারছি না রাণী কি চাও তুমি। 
ইস এত বোকা সাজতে হবে না হোসে। শুধু মনে রাখবে আজ এখানে আমি এসেছি ঠিক সারে পাঁচটায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.