ফরাসী গল্প : অন্য স্ত্রী

মূল গল্প : কোলেট্টি

অনুবাদ- শারমিন শিমুল

(কোলেট্টি- ১৮৭৩ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। বিংশ শতকের প্রথম দিকে ফ্রান্সের অন্যতম সেরা লেখিকা তিনি। লিখেছেন পঞ্চাশটির মতো বই। ফ্রান্সের লা মনডে পত্রিকার জরিপে বিশ শতকের সেরা ১০০টি উপন্যাসের ভেতর তার “দ্যা টেনড্রিলস অব দ্যা ভাইন” বইটি রয়েছে। ইংরেজিতে তার লেখা খুব কমই অনুবাদ হয়েছে। তবে ইংরেজী ভাষাভাষীদের কাছে তিনি তার “গিগি” নভেলাটির জন্য সুপরিচিত। তার লেখার মূলে রয়েছে নারীবাদ এবং নারী সচেতনতা। শব্দ, বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ, ঘ্রাণ, রঙ- ব্যবহার করে তিনি ভালোবাসার আনন্দ এবং বেদনার

সাবলীল বর্ণনায় পাঠকের অনুভ’তিকে সহজেই জাগিয়ে তুলতে পারতেন। ১৯৫৪ সালে এই লেখিকা মৃত্যুবরণ করেন। )

“দু’জনের জন্য টেবিল? এইদিকে আসুন, মশিয়ে, মাদাম। জানালার পাশের একটা টেবিল এখনও খালি আছে। যদি আপনারা সাগরের দৃশ্য দেখতে পছন্দ করে তবে এখানে বসতে পারেন।”
অ্যালিস হেড ওয়েটারের পেছন পেছন এগুলো।
“ হ্যা অবশ্যই। এসো মার্ক, এখানে বসলে মনে হবে পানির ওপরে ভেসে থাকা কোন নৌকাতে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছি।”
মহিলার স্বামী স্ত্রীর হাত নিজের বাহুতে ভেতর নিয়ে তাকে ঠেকালেন। “আমরা ওখানটাতেই বেশি স্বাচ্ছদ্য বোধ করবো।”
“ওখানে? সব মানুষের মাঝখানে? তারচেয়ে বরং আমি….”
“অ্যালিস, প্লিজ।”
ভদ্রলোক তার হাতের বেষ্টনী এতো অর্থপূর্ণভাবে শক্ত করলেন যে অ্যালিস ঘুরে দাঁড়িয়ে বললো, “কী ব্যাপার?”
“শ্ শ্ শ….” , ভদ্রলোক নরম স্বরে বলে উঠে স্ত্রীর দিকে একাগ্রচিত্তে তাকালেন। তারপর তার হাত ধরে ঘরের মাঝখানের টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন।
“কী হয়েছে, মার্ক?”
“তোমাকে বলছি, প্রিয়তমা। প্রথমে খাবারের অর্ডারটা দিয়ে নেই। তুমি কি চিংড়ি খাবে? নাকি ডিম ভরা অ্যাসপিক?”
“তোমার ইচ্ছামতো অর্ডার দাও, আমার কোন সমস্যা নেই।”
ওরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলো। কাজের চাপে পরিশ্রান্ত ওয়েটারটি ওদের পাশে যেভাবে অতিরিক্ত ব্যস্ততায় বিচলিত হয়ে ঘেমে নেয়ে নড়াচড়া করছিল, তাতে মনে হচ্ছিল সে নাচছে। ওরা অর্ডার দিতে দেরী করায় তার মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছিল। 
“ তাহলে চিংড়িই খাই ”, মার্ক বললো। “তারপর বেকন আর ডিম। সাথে ঠা-া মুরগী আর রোমাইন সালাদ। ফ্রমেগ ব্লাঙ্ক? এখানকার স্পেশাল খাবার? আমরা ওই স্পেশাল খাবারওটাও নেবো। সবশেষে দুটো কড়া কফি। আমার শোফারও দুপুরের খাওয়া খাবে, দুটোর সময় আমরা আবার বের হবো। কি বললে, সিডার? না, ওসব আমি পছন্দ করি না। ড্রাই শ্যাম্পেন দাও।”
কথা শেষ করে ভদ্রলোক এমনভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন যেনো একটি বড়সড় আলমারি ঠেলে সরিয়েছেন। তারপর দুপুরের রঙহীন সাগর আর মুক্তোর মতো সাদা আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের স্ত্রীর প্রতি দৃষ্টি ফেললেন, পারদ রঙের ছোট্ট হ্যাটে তার স্ত্রীকে সুন্দরী দেখাচ্ছে, মাথার পেছনের বড় ওড়নাটা বাতাসে দুলছে।
“তোমাকে চমৎকার দেখাচ্ছে সোনা আমার। ভেবে দেখো, এই নীল পানির কারণে তোমার চোখ দ’ুটো সবুজ মনে হচ্ছে! তাছাড়া বেড়ানোর পর থেকে তোমার ওজন কিছুটা বেড়েছে…ওজন কিছুটা বাড়লে তোমাকে কিন্তু ভালোই লাগে, তবে এর চেয়ে বেশি বাড়াটা আবার খারাপ!”
মহিলা টেবিলে ঝুঁকে বসায় তার সুডৌল পিনোন্নত স্তনযুগল গর্বিতভাবে জেগে উঠলো।
“তুমি আমাকে জানালার পাশে বসতে দিলে না কেনো?”
মার্ক সেগুয়ে মিথ্যা বলার কোন চেষ্টাই কখনো করেন না। তাই তিনি অকপটে বললেন, “তুমি এমন একজনের পাশে বসতে যাচ্ছিলে যাকে আমি আগে থেকেই চিনি।”
“এমন কেউ যাকে আমি চিনি না?”
“আমার প্রাক্তন স্ত্রী।”
মহিলা কী বলবে ভেবে না পেয়ে বিস্ময়ে শুধু তার নীল চোখ বড় বড় করে তাকালো।
“তাতে কী হয়েছে সোনা? এভাবে দেখা হয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার আবারও ঘটবে। এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না।”
কথাগুলো অ্যালিসের দিকে ফিরে আসলো। এবং সে অবশ্যম্ভাবী প্রশ্নটা করলো। “ও কী তোমাকে দেখেছে? তুমি যে ওকে দেখেছো সেটা কি ও দেখতে পেয়েছে? তুমি কি আমাকে ইশারায় ওকে দেখিয়ে দিতে পারবে?”
“ ওদিকে এখন তাকিয়ো না, প্লিজ। ও নিশ্চয়ই আমাদের দেখছে…বাদামী চুলের মহিলা, কোন টুপি পরেনি, নিশ্চয়ই ও আমাদের হোটেলেই উঠেছে। একা বসে আছে, লাল রঙের কাপড় পরা বাচ্চাগুলোর পেছনে।”
“হ্যা, আমি দেখেছি।”
নিজের চওড়া কানার বিচ হ্যাটের তলা দিয়ে অ্যালিস মহিলাকে এক নজর দেখে নিলো। এই সেই মহিলা যে মাত্র পনেরো মাস আগেও ওর স্বামীর স্ত্রী ছিল।
“সামঞ্জস্যহীন, মার্ক বললো, “ওহ, বলতে গেলে…আমাদের বিয়ের পুরোটাই ছিল সামঞ্জস্যহীন! ভদ্রলোকের মতোই আমরা ডিভোর্স নিয়েছি। বলতে গেলে বন্ধুর মতোই, নীরবে, দ্রুত সব কাজ সমাধা হয়েছে। তারপর আমি তোমার প্রেমে পড়লাম। আর তুমিও সত্যি সত্যি আমাকে নিয়ে সুখী হতে চাইলে। আমাদের সুখের সাথে “দোষী পক্ষ” বা “ঘটনার বলি” এমন কারও জীবন জড়িত নেই, আমরা কতো ভাগ্যবান!”
সাদা পোশাকের মহিলাটি সিগারেট খাচ্ছিল। তার মসৃণ, সিল্কি চুলে সমুদ্রের আলো প্রতিফলিত হয়ে হোটলের নভোনীল সামিয়ানায় এসে পড়েছে। তার চোখ আধবোজা। অ্যালিস তার স্বামীর দিকে ও বললো, “ওর চোখ আমার মতোই নীল, এটা তুমি আমাকে আগে কখনোই বলোনি কেন?”
“আসলে, এটা নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি।”
রুটির ঝুড়ির দিকে অ্যালিসের বাড়ানো হাতে মার্ক চুমু খেলো। আনন্দে অ্যালিসের গালে লাল আভা ছড়িয়ে পড়লো। বিষণ্ন আর স্থূল হওয়ায় ওকে হয়তো খানিকটা মোটা দেখাচ্ছিল। কিন্তু ওর চোখ জুড়ে থাকা নীলের গভিরতা বার বার পাল্টে যাওয়ায় আর ঢেউ খেলানো সোনালি চুলের কারণে ওকে দেখতে কেমন হালকা-পাতলা মনে হচ্ছিল। ওকে খানিকটা আবেগীও লাগছিল। আবেগে ভর দিয়ে ও নিজের স্বামীর প্রতি পুরোপুরি কৃতজ্ঞ থাকার শপথ নিয়ে ফেললো। নিজের অজান্তেই নির্লজ্জভাবে ওর সমগ্র সত্ত্বায় চরম সুখানুভূতি সুস্পষ্ট হয়ে উঠলো।
ওরা দুজনেই মজা করে খেলো, পান করলো। দুজনেই ভাবলো অপরজন সাদা পোশাকের মহিলার কথা একেবারেই ভুলে গেছে। যাই হোক, অ্যালিস হঠাৎ করেই বেশ কবার জোরে জোরে হেসে উঠলো। নিজের আসন থেকে যাতে পড়ে যেতে না হয়, সেজন্য কাঁধ সোজা রেখে মাথা উঁচু করে মার্কও সতর্ক ভঙ্গিতে বসে রইলো। তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে কফির জন্য ওরা নীরবে অপেক্ষা করতে থাকলো। ওদের মাথার ওপরে অদৃশ্য সূর্যের প্রতিফলন যা নদীর মতো মনে হচ্ছিল, সেটি চোখ ধাঁধানো আলো ছড়িয়ে ক্রমশ সমূদ্র থেকে একটু একটু করে দূর সরে যাচ্ছিল।
“ও এখনো ওখানটাতে বসে আছে, জানো।” অ্যালিস ফিসফিস করে বললো।
“ওর কারণে তোমার কি অস্বস্তি হচ্ছে? অন্য কোথাও কফি খেতে চাও?”
“না, তার কোন দরকার নেই। ওরই বরং অস্বস্তি লাগার কথা। তাছাড়া, ওকে যদি তুমি ভালোমতো দেখতে পেতে তবে বুঝতে যে ওর কোন বিকার নেই। মনেই হচ্ছে না যে ও কোন দুঃসময় পার করছে…।”
“দেখার দরকার নেই। আমি জানি, ওকে দেখে সেরকমই মনে হয়।”
“ওহ্, ও কি সবসময়ই এমন ছিলো?” 
মার্ক নাকের ফুটো দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে ভ্রু কুঁচকে বললো, “সবসময়ই ছিলো কীনা জিজ্ঞেস করছো? নাহ্, সত্যি বলতে কি, ও কখনোই আমার সাথে সুখী ছিলো না।”
“ওহ্, সত্যি নাকি?”
“ডার্লিং, যেভাবে তুমি আমাকে প্রশ্রয় দাও তা সত্যি সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করে দেয়…ব্যাপারটা দারুণ…তুমি আমার দেবী…তুমি আমায় ভালোবাসো…তোমার চোখ দুটো দেখলে আমার গর্ব হয়। হ্যা, ওই চোখ দুটো…আর ও…আমি জানতামইনা কীভাবে ওকে সুখী করা যায়। জানতামনা, কীসে ও সুখী হবে।”
অ্যালিস খুবই বিরক্ত ভঙ্গিতে হাতপাখার বাতাস করতে করতে আড় চোখে মহিলার দিকে তাকালো। বেতের চেয়ারের পেছনে মাথা ঠেকিয়ে, চোখ দুটো আরামে অলসভাবে বুজে, সে সিগারেট টানছিল। “ও তাহলে খুবই জটিল একটা মানুষ!” 
মানুষজন এমনই, এরকম একটা ভঙ্গিতে শ্রাগ করলো।
খুশি মনে কাঁধ ঝাকিয়ে সে বললো, “একেবারে ঠিক কথাটা বলেছো। তবে তোমার কীইবা করার আছে বলো? যারা সবসময় অতৃপ্তিতে ভোগে তাদের জন্য তোমার দুঃখ লাগবেই। কিন্তু আমারা পরিতৃপ্ত…তাই না প্রিয়তমা?”
অ্যালিস কোন উত্তর দিলো না। স্বামীর অলক্ষ্যে সে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো, বরাবরের মতোই মার্কের চেহারা লাল; তার ঘন চুল সাদা সিল্কের ওপর এখানে সেখানে ছড়িয়ে আছে; এরপর ও, যতœ নিয়ে পরিষ্কার করা মার্কের খাটো হাতের দিকে তাকালো; এবং প্রথমবারের মতো সন্দিহান হয়ে নিজের মনে প্রশ্ন করলো, “ওর কাছ থেকে মহিলাটির আর কিইবা চাওয়ার থাকতে পারে?”
তারপর ওরা যখন বের হয়ে যাচ্ছে, মার্ক যখন বিল দিতে দিতে শোফার এবং রাস্তার খোঁজ খবর নিচ্ছে তখনও অ্যালিস হিংসা আর কৌতূহল নিয়ে সাদা পোশাকের মহিলাটির দিকে তাকিয়ে থাকলো, ওই অতৃপ্ত, জটিল, দাম্ভিক মহিলাটির দিকে…।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=