দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ ছবিতে চ্যাপলিনের শেষ ভাষণ


অনুবাদ : এমদাদ রহমান
দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’, চার্লি চ্যাপলিনের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র, নির্মিত হয়েছিল ১৯৪০ সালে, ছবিটি আখ্যায়িত হয় নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদী ছবি হিসেবে। মূলত স্যাটায়ার। চ্যাপলিনের স্যাটায়ারের লক্ষ্যে পরিণত হন জার্মান একনায়ক হিটলার। এই ছবিটির আগের, অর্থাৎ, তার সেই নির্বাক ছবিগুলিতে ছিল দারিদ্র্যপীড়িত ভবঘুরেদের হতাশা, দুর্দশা, গ্রেফতারবরণ, জেল, পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি, ঠাট্টা, হাস্যরস, বিদ্রুপ। এক কথায়- পুরোটাই স্যাটায়ার। তবে, ছবিগুলোতে রাজনৈতিক বক্তব্য তেমন একটা ছিল না।
অনূদিত লেখাটি চ্যাপলিন অভিনীত বিখ্যাত ছবি ‘দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’-এর একদম শেষের দৃশ্য; যা মূলত একটা ভাষণ; আর সেই ভাষণটি ছিল মানুষ হিসেবে আমাদের যে জীবনটিকে যাপন করার কথা ছিল আমরা যেন সেই জীবনের পটভূমিতে এসে দাঁড়াই- তার আহ্বান। জীবনের মৌল ভিত্তিটিকে খুঁজে বের করার এক অমোঘ আহ্বান ছিল চ্যাপলিনের সেই ভাষণটি।
…………………………………………………………………………………………………………………………..
আমি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েই বলছি, না, আমি এখানে সম্রাট হতে আসিনি, আর এটা আমার অভিপ্রায়ও নয়। আমি কাউকে শাসনের ইচ্ছা পোষণ করি না কিংবা ক্ষমতাবলে কাউকে আমার আজ্ঞাবহও করতে চাই না। আমি আমার সাধ্যমতো সবার পাশে দাঁড়াতে চাই, সে ইহুদি হোক কিংবা অন্য জাতের- শাদা কিংবা কালো মানুষ। আমরা তো প্রত্যেকেই প্রত্যেকের পাশে দাঁড়াতে চাই। এই দাঁড়াতে চাওয়াটাই হচ্ছে প্রকৃত মানুষের পরিচয়। মানুষ তো ঠিক এরকম একটা জীবনকেই যাপন করবে। আমরা পরস্পরের আনন্দের জন্যই বেঁচে থাকব, কারও শোচনীয় দুর্গতিতে নয়। আমরা আর কাউকেই ঘৃণা করতে চাই না, আর, হ্যাঁ, আমরা আর কাউকে অবজ্ঞা কিংবা উপহাসও করব না। এই পৃথিবী তার সন্তানদের জন্য এক বিশাল আশ্রয়, এই মাটিপৃথিবীর উর্বরাশক্তিও অনেক বেশি। সে তার সন্তানদের জন্য অফুরন্ত প্রাণশক্তি নিয়ে অপেক্ষা করে, আর সে নিজেকে উন্মুক্ত করে রেখেছে সকলের জন্য। জীবনকে যাপনের পন্থাগুলি আমাদের জন্য কী মুক্তই না ছিল, আর কী সৌন্দর্যময়; কিন্তু আমরা, সেই সুন্দর মুক্ত পথগুলি হারিয়ে বিলুপ্তির স্মৃতিতে ভুগছি। 
লোভ আর লালসা মানুষের আত্মাকে বিষিয়ে ফেলেছে। পরস্পরের প্রতি আমাদের ঘৃণা এই পৃথিবীতে স্থানে স্থানে ব্যারিকেড তৈরি করেছে, জন্ম দিয়েছে এমন এক অসাম্য অবস্থার, যার কারণে আজ আমরা পতিত হয়েছি দুর্দশায়, মেতে উঠেছি নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে খুনোখুনিতে। 
হ্যাঁ, আমরা গতির অভাবনীয় বিকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছি কিন্তু আমরাই আমাদেরকে প্রতি পদে অবরুদ্ধ করে রেখেছি। আমাদের বানানো যন্ত্রপাতিগুলি কোথায় আমাদেরকে ঐশ্বর্যশালী করবে, তা না, তারা যেন তাদের সেই উদ্দেশ্যই হারিয়ে ফেলছে। আমাদের অর্জিত জ্ঞান আমাদেরকেই করে ফেলছে নৈরাশ্যবাদী। আমরা নিজেরাই নিজেদের সঙ্গে চালাকি করছি, যা হয়ে যাচ্ছে কঠিন আর নির্দয়। আমরা ভাবছি অনেক বেশি কিন্তু দিনে দিনে আমরা যেন আমাদের অনুভূতি আর স্পর্শকাতরতা হারিয়ে ফেলছি। ভাবনাগুলিকে আমরা হৃদয়ে অনুভব করছি না। যন্ত্রপাতির কৃতকৌশলের চেয়েও এখন জরুরি হলো মানবতার জয়যাত্রা। চালাকি আর চাতুরীর চেয়েও আমাদের জন্য উদারতা এবং সুহৃদয়তা জরুরি। আজকের দিনে এই বিষয়গুলি ছাড়া আমাদের জীবন হয়ে পড়বে সহিংস, আর তাতে মানবজাতি হানাহানিতে মত্ত হয়ে বিলুপ্তই হয়ে যাবে। 
উড়োজাহাজ এবং বেতারতরঙ্গ আমাদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এই আশ্চর্য আবিষ্কারগুলি মানুষের কল্যাণের জন্য যেন উচ্চকণ্ঠে আহ্বান করছে, বিশ্বভ্রাতৃত্বের জন্য মুখর হয়ে উঠেছে- আমরা যেন একে অন্যের হাতে হাত রেখে ঐক্যবদ্ধ হই। এই এখনই আমার কণ্ঠ তরঙ্গায়িত হয়ে কয়েক মিলিয়ন মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, হ্যাঁ, মিলিয়ন মিলিয়ন নারী, পুরুষ এবং ছোট্ট শিশুদের কাছে, যারা ইতোমধ্যেই গভীর হতাশায় নিমজ্জিত, যারা একটি ব্যবস্থার ভিকটিমে পরিণত হয়েছে, সেই ব্যবস্থা- মানুষকে যা নির্যাতন করছে। নিরাপরাধ মানুষ আজ কয়েদখানায় বন্দি। 
হ্যাঁ, আমি তাদেরকেই বলছি, এই মুহূর্তে আমার কথা যারা শুনছেন- আর হতাশা নয়। একদিন সমস্ত ঘৃণার অবসান হবে। মানুষের লোভ আর লালসার মানসিকতায় পরিবর্তন আসবে। মানুষ আজ যে দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, যে লোভ, যে লালসা তার আত্মাকে আকীর্ণ করে রেখেছে, কলুষিত করেছে, এসব মানুষেরই তিক্ত অভিজ্ঞতার এক সমন্বয় আর এ কারণেই আমরা আজ মানবতার আগ্রগতি সম্পর্কে ভীত, সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছি। মানুষ এখন ঘৃণা করতে ভুলে যাবে আর ভুলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর একনায়কদেরও মৃত্যু হবে। একনায়কেরা যে-ক্ষমতাটি জনতার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল, সেই ক্ষমতা আবারও জনতার হাতে ফিরে আসবে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর কেউই তার স্বাধীনতা কেড়ে নিবে না। 
সৈনিকগণ! নিজেদেরকে পাশবিক শক্তির কাছে বিকিয়ে দিও না, যারা তোমাদেরকে- তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে; যারা তোমাদেরকে ক্রীতদাসে পরিণত করে, তোমাদেরকে দিয়ে রেজিমেন্ট গড়ে তোলে; তোমাদেরকে বলে দেয়- তোমরা কী করবে, কী চিন্তা করবে, কী অনুভব করবে! তোমাদেরকে দিয়ে তারা কুচকাওয়াজ করায়, এমনকি তারা তোমাদের খাদ্যও নির্দিষ্ট করে দেয়, তোমাদেরকে গৃহপালিত পশুর মতো গণ্য করে আর মনে করে- তোমরা হলে যুদ্ধের ময়দানে তুচ্ছ, অপচয়যোগ্য এক একজন সৈনিক। এসব অপ্রকৃতস্থ বন্য লোকদের কাছে নিজেদেরকে সঁপে দিও না; তারা এখন যন্ত্রের মানুষ, তাঁদের মন ও হৃদয় এখন যন্ত্রের দখলে। কিন্তু তোমরা তো যন্ত্রও নও, গৃহপালিত পশুও নও- মানুষ। এখনও মানুষের জন্য তোমাদের হৃদয়ে প্রেম আছে! তোমরা কখনওই কাউকে ঘৃণা করো না। ঘৃণা করবে তারাই যারা ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত ছিল, এবং যারা অপ্রকৃতিস্থ। সৈনিকগণ! দাসত্বের জন্য আর যুদ্ধ করো না। যুদ্ধ হোক মুক্তির। 
সন্ত লুক-এর সপ্তদশ অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ আছে- ঈশ্বরের দেশ আর কোথাও নয়, মানুষের ভিতর। সেই মানুষ কোনও একজন বিশেষ মানুষ নয়, বিশেষ কোনও গোষ্ঠীও নয়, সেই মানুষ- সম্মিলিত মানুষ। সকল মানুষ। তোমার ভিতরে। তোমাদের সকলের ভিতরে। তোমরা। তোমরাই সেই জনতা যাদের আছে এক আশ্চর্য ক্ষমতা, যে-ক্ষমতার দ্বারা মানুষ কলকারখানা গড়ে তোলে, আর আছে সেই ক্ষমতা যার মাধ্যমে মানুষ সুখী হবার উপায়গুলিকে আবিষ্কার করে। তোমরা তো সেই মানুষ, যাদের আছে এই জীবনটিকে মুক্ত আর সৌন্দর্যময় করার ক্ষমতা; আর সেই ক্ষমতা যার মাধ্যমে এই জীবনটিকে করে তোলা যায় এক বিস্ময়কর অভিযাত্রা। 
তাহলে চলো, গণতন্ত্রের নামে শপথ করে, এবার আমরা সেই ক্ষমতাটিকে ব্যবহার করি। তাহলে চলো, আমরা সবাই একতাবদ্ধ হই। নতুন এক বিশ্ব গড়ে তুলতে যুদ্ধ করি যে বিশ্ব হবে এমন এক প্রীতিপূর্ণ বিশ্ব যে মানুষকে কাজের সুযোগ করে দেবে। তারুণ্যকে দিবে একটা ভবিষ্যৎ আর বয়স্কদের দেবে নিরাপত্তা। আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে এসব দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েই কিন্তু নির্দয় বন্য লোকগুলি ক্ষমতায় আরোহণ করেছিল, কিন্তু পরে প্রতারণা করেছে, মিথ্যা বলেছে। তারা কথা রাখেনি, কথা রাখবেও না। 
একনায়ক সমস্ত কিছুর অধিরাজ হয়ে বসে আছে আর জনতাকে করেছে ক্রীতদাস। তাহলে চলো, সেই প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণ করতে তৎপর হই। বিশ্বকে মুক্ত করতে যুদ্ধ করি। বাধা দেবার দেয়ালগুলি ধ্বংস করি। লোভ-লালসা আর অসহিষ্ণুতার অবসান করি। গড়ে তুলি এক যৌক্তিক বিশ্ব যেখানে মানুষের সকল আনন্দের প্রধান উৎস হবে বিজ্ঞান ও প্রগতি। সৈন্যগণ! এসো। এক হই- জনতন্ত্রের নামে।

অনুবাদক
এমদাদ রহমান

2 thoughts on “দ্য গ্রেট ডিক্টেটর’ ছবিতে চ্যাপলিনের শেষ ভাষণ

  • September 5, 2017 at 12:13 pm
    Permalink

    great! very relevant till today!

    Reply
  • September 6, 2017 at 4:17 pm
    Permalink

    দারুণ এমদাদভাই, সিনেমাটি আমার খুব প্রিয়। পড়ে খুব ভালো লাগলো। চলুক আরো

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=