জর্জ অরওয়েলের গল্প : একটি হাতির অপমৃত্যু

অনুবাদ : মৌসুমী কাদের
[জর্জ অরওয়েল ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক,সাহিত্য সমালোচক,রাজনীতি বিশ্লেষক ও সাংবাদিক। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘দি রোড টু উইগ্যান পাইয়ার’, ‘হোমেজ টু ক্যাটালোনিয়া’, ‘এনিমাল ফার্ম’ ‘১৯৮৪’ ইত্যাদি। সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতি, যুদ্ধ ও শান্তির প্রেক্ষাপটে রচিত ‘১৯৮৪’ (নাইনটিন এইটি ফোর) জর্জ অরওয়েলের একটি অমর গ্রন্থ। তিনি আজীবন একদলীয় মতবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

ফ্যাসিবাদ, গণতন্ত্র,সমাজতন্ত্র ইত্যাদি ঘিরেই তার লেখকজীবন আবর্তিত হয়েছে, সাহিত্য সমালোচনাও করেছেন তিনি। তার ‘আমি কেন লিখি’ গদ্যটিও বিশ্বসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিয়েছে। ভাষাও যে মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রচার মাধ্যমও যে ভাষার বিকৃতি ঘটায় তিনি তা নিয়ে কথা বলতেন। সাহিত্যে ফ্যাসিবাদী চেতনা’র বিকাশের সহায়ক পন্থাগুলিকে তিনি উন্মোচন করেছিলেন। ‘একটি হাতির অপমৃত্যু’ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। বার্মায় অবস্থানকালে একজন সাদা মানুষ হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করে কিভাবে তিনি সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যের অন্তঃসারশূন্যতা ও নিরর্থকতা উপলব্ধি করেছিলেন তারই একটি অসাধারণ চিত্র ফুটে উঠেছে এই নিবন্ধটিতে। ১৯৩৬ সালের শেষের দিকে সাহিত্যিক পত্রিকা ‘নিউ রাইটিং’ এ এটি প্রথম প্রকাশিত হয় এবং ১৯৪৮ সালের ১২ অক্টোবর বিবিসি হোম সার্ভিস কর্তৃক প্রচারিত হয়। ১৯০৩ সালের ১৫ জুন ব্রিটিশ ভারতের বিহার রাজ্যের মথিহারিতে তার জন্ম। মৃত্যুবরণ করেন লন্ডনে ১৯৫০ এর ২১ জানুয়ারি। ]
বার্মার নিম্নাঞ্চলে (বর্তমান মিয়ানমার) মুলমেইনে চাকরি করবার সময় অনেকেই আমাকে ঘৃণা করত, সেটা ছিল আমার জীবনের একমাত্র সময় যখন আমি ঘৃণিত হবার মতো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিলাম। আমি ছিলাম ঐ শহরটির সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার, সেখানে, অত্যন্ত তুচ্ছ ও উদ্দেশ্যহীন হলেও একধরণের ইউরোপ-বিদ্বেষ প্রবল ছিল। যদিও রায়ট শুরু করার মতো স্পর্ধা কারো ছিল না কিন্তু যদি কোনো ইউরোপীয় নারী একা বাজার দিয়ে হেঁটে যেত তবে কেউ না কেউ সম্ভবত তার পোশাকে পানের পিক ফেলে দিত। পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার কারণেই আমি ছিলাম তাদের এক লক্ষ্যবস্তু, সময় পেলেই তারা আমার জন্য টোপ ফেলতো। ফুটবল খেলার সময় যখন কোনো ক্ষিপ্ত বার্মিজ আমাকে ল্যাং মারত, তখন বার্মিজ রেফারি অন্যদিকে তাকিয়ে না দেখার ভান করত, দর্শকরাও বিকট হাসিতে ফেটে পড়ত। এমনটা অনেকবার ঘটেছে। শেষে দুটি বিষয় আমার স্নায়ুচাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল; সর্বত্র দেখতে পাওয়া যুবকদের বিদ্রুপমাখা হলদেটে মুখ, নিরাপদ দূরত্বে থাকার পরও তাদের ছোঁড়া অপবাদ আর টিটকারি। সবচাইতে বদমাশ ছিল তরুণ বৌদ্ধ পুরোহিতরা। শহরে এরা সংখ্যায় কয়েক হাজারের মতো ছিল। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে ইউরোপীয়দের ব্যঙ্গ করা ছাড়া এদের কারোরই বোধহয় আর কোন কাজ ছিলনা।
এসব ছিল খুব অত্যন্ত বিরক্তিকর। অবশ্য ততদিনে আমিও সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম- সাম্রাজ্যবাদ একটা অশুভ জিনিষ। যত তাড়াতাড়ি আমি চাকরীতে ইস্তফা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবো ততই মঙ্গল। কারণ আদর্শগতভাবে এবং গোপনে আমি বার্মিজদের পক্ষে এবং অত্যাচারী ব্রিটিশদের বিপক্ষেই ছিলাম। চাকরিটাকে আমি এতটাই ঘৃণা করতাম যে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। এধরণের চাকরিতে সাম্রাজ্যবাদের নোংরা চিত্রগুলো খুব কাছ থেকে দেখা যায়। জেলখানার দুর্গন্ধযুক্ত খাঁচাগুলোতে গাদাগাদি করে থাকা হতভাগ্য কয়েদিদের ধূসর আতঙ্কিত মুখ; বেতের আঘাতে জর্জরিতদের ক্ষতবিক্ষত নিতম্ব-এসবই আমাকে অসহিষ্ণু অপরাধবোধে নিষ্পেষিত করছিল। কিন্তু আমি কোনোকিছুরই দিশা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
আমি একজন কুশিক্ষিত তরুণ ছিলাম। প্রাচ্যে কাজে আসা প্রত্যেক ইংরেজের ওপর যে নীরবতা চাপিয়ে দেয়া হতো তার মধ্যেই নিজের সমস্যাগুলো নিয়ে আমায় ভাবতে হতো। এমনকি আমি এটাও জানতাম না যে ব্রিটিশ রাজত্ব মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌছে গেছে, এবং আরও কম জানতাম যে বৃটিশ সাম্রাজ্য তার স্থান দখল করতে আসা নবীন সম্রাজ্যগুলোর চেয়ে আসলে অনেকগুণ ভাল ছিল। আমি শুধু জানতাম, যে সম্রাজ্যের হয়ে আমি কাজ করছি তার প্রতি ঘৃণা এবং যারা আমার চাকরি প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল তাদের প্রতি ক্রোধ এদুয়ের মধ্যেই আটকে ছিলাম। আমার মনের একাংশ ভাবত ব্রিটিশ রাজত্ব একটা অলঙ্ঘনীয় স্বৈরতন্ত্র, যুগ যুগ ধরে ভূমিলুন্ঠিত মানুষের কণ্ঠরোধ করে ছিল এরা; আবার অন্য অংশ ভাবতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দ হতে পারে কোনো বৌদ্ধ ভিক্ষুর অহম বেয়েনেটের আঘাতে গুড়িয়ে দেয়া। এটি সম্রাজ্যবাদ থেকে উৎসারিত একটি স্বাভবিক অনুভূতি;যেকোনো অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান অফিসারকে জিজ্ঞেস করুন,যদি কাউকে কাজের ফাঁকে খুঁজে পান।
ঘটনাটি খুব ছোট হলেও সাম্রাজ্যবাদের প্রকৃতি এবং স্বৈরাচার সরকারের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে এটি এমন একটা স্পষ্ট ধারণা দিল যা আমার আগে জানা ছিল না। একদিন খুব সকালে শহরের অন্য প্রান্তের পুলিশ স্টেশন থেকে সাব-ইন্সপেক্টর আমাকে টেলিফোন করে বললেন যে একটা হাতি স্থানীয় বাজার লন্ডভন্ড করছে। আমি যেন অনুগ্রহ করে সেখানে গিয়ে এ ব্যাপারে সাহায্য করি। আমি ঠিক জানতাম না, আমার ঠিক কি করার আছে, কিন্তু আমি দেখতে চাইছিলাম সেখানে কি ঘটছে এবং একটা বাচ্চা ঘোড়ায় চেপে রওনা হয়ে গেলাম। আমি আমার পুরনো ৪৪ উইনচেস্টার বন্দুকটা সঙ্গে নিলাম যা হাতি মারার জন্য একেবারেই যথেষ্ট নয়, কিন্তু ভেবেছিলাম এর শব্দটি অন্তত আতংক সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট হবে। পথে অনেক বার্মিজ আমাকে থামিয়ে দিয়ে হাতিটি কী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তার বর্ণনা দিচ্ছিল। এটা অবশ্যই কোন বুনো হাতি ছিল না,পোষমানা হাতিই হঠাৎ উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। ঋতু চলাকালীন সময়ে সব হাতিই ক্ষিপ্র হয়ে ওঠে বলে পোষমানা হাতিদেরও এসময়ে বেঁধে রাখা হয়, এই হাতিটাও বাঁধা ছিল। কিন্তু গতরাতে হাতিটা শিকল ভেঙে পালিয়ে যায়। ঠিক এ
দশায় হাতিটিকে নিয়ন্ত্রণের আনার একমাত্র ক্ষমতা যার আছে, সেই মাহুত তাকে ধরার জন্য বেরিয়েছিল; কিন্তু ভুল পথ নেবার কারণে সে এখনও হাতিটির কাছ থেকে বারো ঘণ্টা দূরত্বে; আর ঠিক এমন অবস্থায়ই সকাল বেলা হাতিটা আবার শহরে এসে হাজির হয়েছে।
বার্মিজদের কোন অস্ত্র ছিল না এবং তারা এর কাছে খুব অসহায় বোধ করছিল। হাতিটা ইতিমধ্যেই কারো বাঁশের কুঁড়েঘর ভেঙে ফেলেছে, একটা গরু মেরেছে, কিছু ফলের দোকান ভাঙচুর করে তার কিছু খেয়েও ফেলেছে। এছাড়াও মিউনিসিপ্যালের ময়লা গাড়িটা যখন পথে পড়ল, আর তার ড্রাইভার যখন ভয়ে লাফ দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল, তখন হাতিটা গাড়িটাকে উলটে ফেলে ভয়ানক হিংস্রতা দেখালো। বার্মিজ সাব-ইন্সপেক্টর তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ভারতীয় কনস্টেবলসহ তাদের এলাকায় আমার জন্য অপেক্ষা করছিল, যেখানে হাতিটাকে দেখা গেছে। এলাকাটির একেবারে ভগ্নদশা। একটা খাঁড়া পাহাড়ের ঢালের উপর খুবই নোংরা পরিবেশে তালপাতার ছাউনি দেয়া বাঁশের কতগুলো কুঁড়েঘর। আমার মনে আছে যে সকালটা ছিল মেঘলা ও গুমোট, ঠিক বৃষ্টির আগ মুহুর্তে যেমন হয়। ‘হাতিটি কোথায় গেছে’-সেটা জানতে চেয়ে আমরা আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করছিলাম এবং যথারীতি সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য পেতে ব্যর্থ হলাম। প্রাচ্যেই কেবল অপরিবর্তনীয়ভাবে এ বিষয়টি ঘটে, কোন ঘটনা দূর থেকে যথেষ্ট স্পষ্ট শোনা গেলেও যতই কাছে যাওয়া যায় ততই তা অস্পষ্ট হতে থাকে। কেউ বলছে হাতিটি এইদিকে গেছে, আবার কেউ বলছে ওদিকে। কেউ আবার হাতির কোন কথাই কোনদিন শোনেনি বলে দাবি করছে। আমি প্রায় বিশ্বাসই করে ফেলছিলাম যে পুরো ব্যাপারটাই একটা ডাহা মিথ্যে, কিন্তু ঠিক তখনই একটু দূরে আমরা প্রবল চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পেলাম। একটা পীড়াদায়ক চিৎকার!‘সরো, বাচ্চারা এখান থেকে সরে যাও! এক্ষুনি!’ এবং একজন বৃদ্ধা বাঁশের একটা কঞ্চি হাতে কুঁড়েঘরের কোনায় এসে দাঁড়ালো এবং তারপর হিংস্রভাবে ন্যাংটো বাচ্চাগুলোকে তাড়া করতে করতে বেড়িয়ে গেল। আরো কিছু মহিলা জিহ্বা নাড়িয়ে চিৎকার করতে করতে তাঁর পিছু নিল।
স্পষ্টতই বোঝা গেল যে বাচ্চারা এমন কিছু দেখে ফেলেছে যা তাদের মোটেও দেখা উচিত হয়নি। আমি কুঁড়েঘরটার চারপাশ ঘুরে দেখতে পেলাম একজন লোকের মৃতদেহ কাদামাটিতে পড়ে আছে। লোকটি ছিল ভারতীয়, দ্রাবিড় কুলি, প্রায় নগ্ন। খুব বেশিক্ষণ হয়নি তার মারা যাবার। আশেপাশের মানুষজন বললো, হাতিটা বাড়ির কোণায় হঠাৎ তার উপরে হামলে পড়ে, শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে ওর পিঠে পাড়া দিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলে। বর্ষাকাল বলে মাটিটা নরম ছিল, লোকটির মুখ ও শরীর প্রায় এক ফুট গভীর ও কয়েকগজ লম্বা একটা গর্ত সৃষ্টি করেছিল। লোকটি উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল, হাত দুটি ক্রুশবিদ্ধের মত, আর ঘাড়টি মচকে যাওয়ায় একপাশে কাত হয়ে পড়ে ছিল। তার মুখভর্তি কাঁদা,চোখদুটি বড় বড় করে খোলা আর বের হয়ে থাকা দাঁতগুলোতে অসহনীয় একটা মৃত্যুযন্ত্রণার ছাপ। (প্রসঙ্গত বলে রাখি, কখনও আমাকে বলতে আসবেন না যে মৃত মানুষদেরকে দেখতে প্রশান্ত লাগে। অধিকাংশই মৃতদেহই আমার কাছে নারকীয় লেগেছে।) হাতিটির পায়ের ঘষায় লোকটির পিঠের চামড়া পরিষ্কারভাবে উঠে গিয়েছিল, ঠিক যেমনটা মানুষ সূক্ষ্ণভাবে খরগোশের চামড়া ছাড়ায়। লাশটি দেখামাত্রই আমি সাথে থাকা একজন আর্দালিকে আমার এক বন্ধুর বাসায় হাতি মারার বন্দুক আনতে পাঠিয়ে দেই। ঘোড়াটিকেও আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলাম কারণ হাতির গন্ধ পেয়ে আতংকে সে তার পিঠ থেকে আমায় ফেলে দিক সেটা চাইনি।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আর্দালি পাচঁটি কার্তুজসহ একটা বন্দুক নিয়ে ফিরে এলো। এদিকে স্থানীয় কয়েকজন আমাদের জানাল- হাতিটাকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে একটা ধান ক্ষেতে দেখা গেছে। আমি যখন সামনে এগোতে শুরু করলাম তখন এলাকার সব মানুষ বাড়ি ছেড়ে দলে দলে আমাকে অনুসরণ করতে লাগলো। বন্ধুকটা দেখে ওরা সবাই উত্তেজিত হয়ে এই বলে চিৎকার করতে লাগলো যে আমি হাতিটাকে গুলি করতে যাচ্ছি। হাতিটা যখন ওদের বাড়িঘর লণ্ডভণ্ড করছিল তখনো কিন্তু ওরা এতটা আগ্রহ দেখায়নি, কিন্ত এখন হাতিটাকে গুলি করা হবে এই ভেবে ওদের উত্তেজনাটাই যেন আলাদা। ওদের কাছে এটা একটা মজার ঘটনা। তাছাড়া মাংসটাও তারা চাইছিল। ইংরেজদের ভিড় হলেও হয়ত এমনটাই হত। এটা আমাকে একধরণের অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। হাতিটাকে গুলি করার কোন অভিপ্রায় আমার ছিলনা, বন্দুকটা আনিয়েছিলাম প্রয়োজনে কেবল আত্মরক্ষা করব বলে, তাছাড়া কাউকে যদি পেছন থেকে এত মানুষের ভিড় অনুসরণ করে, তবে স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়তে বাধ্য। কাঁধের ওপর বন্দুক নিয়ে পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে গিয়ে নিজেকে বোকা বোকা লাগছিল, বোকা দেখাচ্ছিলও বটে, তার ওপর জুতোয় ধাক্কা দেয়া ধাবমান মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছিল। একদম নিচে এবং তারও ওপারে প্রায় এক হাজার গজ জুড়ে একটা কুঁড়েঘর ছাড়িয়ে পাকা একটা রাস্তা, পতিত ধানি জমিতে এখনো লাঙল পড়েনি বলে ঘন ঘাসের আগাছায় বর্ষার প্রথম জল জমে আছে। হাতিটা রাস্তা থেকে আট গজ দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, তার বামদিকটা আমাদের দিকে। সে মানুষের ভিড়ের দিকে একফোঁটাও ভ্রুক্ষেপ না করে গুচ্ছ গুচ্ছ ঘাস শুঁড় দিয়ে তুলে হাঁটু দিয়ে বাড়ি দিয়ে পরিষ্কার করে মুখে পুরছিল।
আমি রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে পড়ি। হাতিটাকে দেখামাত্রই নিশ্চিতভাবে মনে হলো-তাকে গুলি করা উচিত হবে না। একটা সক্ষম শ্রমিক হাতিকে গুলি করাটা খুব গুরুতর ব্যাপার, একটা বিশাল ব্যয়বহুল মেশিন ধ্বংস করার সাথেই কেবল এর তুলনা চলে। বিষয়টা এড়ানোর সুযোগ থাকলে এড়িয়েই যাওয়া উচিত। দূরে শান্তিপূর্ণভাবে খেতে থাকা হাতিটাকে একটা গরুর চেয়ে কোনো অংশেই বেশি বিপজ্জনক বলে মনে হচ্ছিল না। তখন আমি ভাবছিলাম, আর এখনও মনে হচ্ছে- ওর সেই ‘বাধ্যগত উন্মত্ততা’ ইতিমধ্যেই চলে গেছে; যে-কারণে মাহুত এসে তাকে ধরার আগ পর্যন্ত কাউকে ক্ষতি না করে সে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তাছাড়া, ওকে গুলি করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও আমার ছিল না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে কিছুক্ষণ নজরে রাখবো এটা নিশ্চিত হবার জন্য যে সে আবার হিংস্র হয়ে কিছু না করে ফেলে, তারপর বাড়ি ফিরে যাবো।
ঠিক সেই মুহূর্তেই পিছনে ফিরে আমাকে অনুসরণ করা মানুষের ভিড়ের দিকে তাকাই। এ ছিল একটা বিশাল জনতার ভিড়। অন্তত দুই হাজার মানুষ হবে যা প্রতি মুহুর্তেই বাড়ছিল। রাস্তার একটা বিশাল অংশ দুই দিক থেকেই তারা আটকে রেখেছিল। আমি দরিদ্র পোশাক-অবয়বের ওপরে থাকা হলদেটে মুখের সমুদ্রের দিকে তাকাই, সবাইকে মজা করার প্রত্যাশায় খুব উত্তেজিত ও খুশি দেখাচ্ছিল, এবং তারা নিশ্চিত ছিল যে হাতিটা শীঘ্রই গুলিবিদ্ধ হবে। তারা এমনভাবে আমাকে দেখছিলো যেন কোন যাদুকর ভেল্কি দেখাতে যাচ্ছে। তারা আমাকে পছন্দ করত না, কিন্তু সেই ঐন্দ্রজালিক বন্দুকটি হাতে থাকায় মুহূর্তের মধ্যেই আমি দেখার মতো কিছু একটা হয়ে উঠেছিলাম। হঠাৎই আমি অনুভব করলাম যে যা কিছুই হোক না কেন, হাতিটাকে আমার গুলি করতেই হবে। মানুষগুলো আমার কাছে এটাই প্রত্যাশা করছিল, আর আমাকে তা করতেই হতো; আমি অনুভব করতে পারছিলাম- দুই হাজার মানুষের প্রত্যাশার চাপ অপ্রতিরোধ্যভাবে আমাকে সামনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, বন্দুক হাতে নিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায়, প্রথমবারের মতন প্রাচ্যে সাদা মানুষদের আধিপত্যের অন্তঃসারশূন্যতা ও নিরর্থকতা উপলব্ধি করি। আমি সেখানে, বন্দুক হাতে একজন সাদা মানুষ, স্থানীয় নিরস্ত্র জনতার ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে, আপাতদৃষ্টিতে শান্তির জন্য মুখ্যচরিত্রে অভিনয়রত; কিন্তু বাস্তবে আমি একজন হাস্যকর পুতুল, যে পেছনের হলদেমুখী মানুষগুলোর ধাক্কা খেয়ে তাদের ইচ্ছেয় ইতস্তত ও দোদুল্যমান।
মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম- সাদা মানুষেরা যখন স্বৈরাচারে পরিণত হয় তখন সে নিজেই নিজের স্বাধীনতা ধ্বংস করে। সে পরিণত হয় এক অন্তঃসারশূন্য, মেকী, চিরন্তন এক ‘সাহেব’ ব্যক্তিত্বে। কারণ তার রাজত্বের শর্তই এই- সে তার জীবন ব্যয় করবে ‘স্থানীয়দের’ মুগ্ধ করতে, এবং সে কারণে প্রতিটি সংকটের সময় স্থানীয়রা যা তার কাছ থেকে আশা করবে তাকে সেটাই করতে হবে। সে একটি মুখোশ পরে থাকে,এবং ঠিক যেন মুখোশের রুপটিই ধারণ করে। হাতিটাকে গুলি করা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না। যখন বন্দুক আনতে পাঠিয়েছিলাম তখনই এই কাজের জন্য আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সাহেবকে সাহেবের মতোই আচরণ করতে হবে; তাকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার ভান ধরতে হবে, নিজেকে চিনতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট কাজ করতে হবে। এতদূর এসে, বন্দুক হাতে, দু-হাজার ধাবমান মানুষের অনুসরণ পেয়ে, তারপর পথভ্রষ্ট হয়ে যাব? কিছুই করবো না? সেটা অসম্ভব। সবাই আমাকে নিয়ে হাসবে। আমিসহ প্রাচ্যে অবস্থানরত প্রতিটি সাদা মানুষের জীবনই ছিল একটি দীর্ঘ সংগ্রাম, হাসির পাত্র হওয়ার জন্য এই জীবন নয়।
কিন্তু আমি হাতিটাকে গুলি করতে চাইনি। আমি দেখছিলাম হাতিটা নিমগ্ন ভঙ্গিতে হাঁটুতে বাড়ি দিয়ে ঘাসের গুচ্ছ ঝাড়ছে, যেমনটা হাতিদের স্বভাবেই দেখা যায়। আমার কাছে মনে হচ্ছিল হাতিটাকে গুলি করাটা হবে খুনের সমতুল্য। ঐ বয়সে পশুহত্যা নিয়ে আমার মধ্যে কোনধরণের খুঁতখুঁতে ভাব ছিল না, কিন্তু জীবনে কোনোদিন আমি হাতিকে গুলি করিনি বা কখনো করতেও চাইনি। (কেন যেন, পশু যত বিশাল দেখতে হয় তাকে হত্যা করতে তত বেশি খারাপ লাগে)। তাছাড়া পশুটার মালিকের ব্যাপারটাও বিবেচনার বিষয় ছিল। জীবিত অবস্থায় হাতিটার দাম অন্তত একশ পাউন্ড হতো; মৃত অবস্থায় হয়ত তার মূল্য কেবলই তার দাঁতের দামের সমান,সম্ভবত পাঁচ পাউন্ড। কিন্তু আমাকে দ্রুত কিছু একটা করতে হতো। চেহারায় অভিজ্ঞ কিছু বার্মিজের দিকে তাকালাম যারা আমরা পৌছুবার আগেই ওখানে ছিল। তাদের জিজ্ঞেস করলাম হাতিটা এতক্ষণ কেমন আচরণ করছিল। তারা সবাই একই কথা বললো, তাকে তার মত থাকতে দিলে সে কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপও করবে না, কিন্তু খুব বেশি কাছে গেলে হয়ত তেড়ে আসবে।
আমার কী করা উচিত ছিল তা আমার স্পষ্ট জানা ছিল। উচিত ছিল হাতিটার পঁচিশ গজের মধ্যে গিয়ে তার আচরণ লক্ষ্য করা। যদি সে তেড়ে আসে তবে আমি গুলি করতে পারি; কিন্তু সে যদি আমার দিকে ভ্রুক্ষেপই না করে, তবে মাহুত আসার আগ পর্যন্ত তাকে নিজের মতন থাকতে দেয়াটাই নিরাপদ। কিন্তু এটাও জানতাম যে আমি এমন কোন কাজই করতে যাচ্ছি না। বন্দুকের নিশানায় আমি বড্ড দূর্বল এবং সেখানকার মাটি এত নরম যে প্রতিটি ধাপেই পা ডেবে যাবে। যদি হাতিটা তেড়ে আসে আর আমার গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তাহলে নিশ্চিত- স্টিমরোলারের নিচে পড়া একটা ব্যাঙের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা যতটুকু, আমারও তাই হবে। তারপরও আমি কেবল নিজের চামড়া বাঁচানোর কথা ভাবছিলাম না, মাথায় ছিল পেছনের অতন্দ্র প্রহরীদের হলদে মুখগুলো। সেই মুহূর্তে জনতা যখন আমায় নজর রাখছে, আমি ঠিক ভীত ছিলাম না, যা একা থাকলে হয়ত মনে হতো। ‘স্থানীয়’দের সামনে একজন সাদা মানুষের ভীত হতে নেই, এবং একারণে, সে সাধারণত ভয় পায়ও না। আমার মাথায় একটাই চিন্তা ছিল,যদি কোন ভুল হয় তবে সেই দুই হাজার বার্মিজ আমাকে ধাওয়া খেতে, ধরা পড়তে, পদদলিত হতে এবং কম করে হলেও দন্তবিকশিত একজন ভয়াবহ মৃতদেহে পরিণত হতে দেখবে, ঠিক সেই পাহাড়ের উপরের ভারতীয়টার মতো। যদি সেটা ঘটে তাহলে খুব সম্ভবত তাদের মধ্যে কেউ কেউ হেসেও উঠবে। তা কক্ষনো হতে পারে না।
বিকল্প ছিল একটাই। কার্তুজগুলোকে আমি বন্দুকে ভরে নিখুঁত নিশানা পেতে রাস্তায় শুয়ে পড়ি। ভিড়ের মানুষগুলো স্থির হয়ে যায়, তাদের মধ্যে এক গভীর দুঃখ আর আনন্দের প্রকাশ দেখা যায়, অনেকটা থিয়েটারের পর্দা উঠতে দেখলে অগণিত মানুষের কন্ঠ থেকে যেমন শ্বাস নিসৃত হয়। সেরকম। শেষ পর্যন্ত তারা সেই আকাঙ্ক্ষিত মজাটুকু পেতে চলেছে। আমার হাতে ছিল একটা সুন্দর জার্মান রাইফেল যাতে ক্রুশ চিন্থিত দিক নির্দেশনাও ছিল। আমি তখন জানতামই না- কোনো হাতিকে মারতে হলে তার এক কানের গর্ত থেকে অন্য কানের গর্ত পর্যন্ত একটা রেখা কল্পনা করে সেই বরাবর গুলি করতে হয়। যেহেতু হাতিটা একপাশ হয়ে ছিল সেকারণে আমার উচিত ছিল সরাসরি তার কানের গর্ত বরাবর নিশানা ঠিক করা, কিন্তু আমি নিশানা করেছিলাম কানের কয়েক ইঞ্চি সামনে এটা ভেবে যে মাথাটা আরো সামনে হবে।
যখন আমি ট্রিগারে চাপ দিলাম, কোন শব্দই শুনতে পাইনি আমি বা কোন ধাক্কাও অনুভব করিনি-গুলি লক্ষ্যভেদ করবে বুঝলে কেউ হয়ত এটা অনুভব করেও না কিন্তু আমি কেবল ভীড় থেকে উঠে আসা সেই নারকীয় উল্লাসের শব্দই শুনতে পাচ্ছিলাম। তাৎক্ষনিকভাবে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে, কেউ হয়ত ভাববে, গুলিটা বন্দুক থেকে হাতি পর্যন্ত যাওয়ার সময়ে হাতিটার মধ্যে একটা ভয়ংকর পরিবর্তন এসেছে। হাতিটা একটু নড়েওনি বা পড়েও যায়নি, কিন্তু তার দেহের প্রতিটি রেখা পালটে গিয়েছিল। হঠাৎ তাকে অত্যন্ত পীড়িত, সংকুচিত ও বৃদ্ধ দেখাচ্ছিল, যেন গুলিটার প্রবল আঘাত তাকে ভূপতিত না করে একেবারে অসাড় করে দিয়েছে। শেষপর্যন্ত একটা দীর্ঘ সময়ের পর, পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে সে নিস্তেজ হাঁটু গেড়ে ঢলে পড়ল। তার মুখ থেকে লালা ঝরছিল। বার্ধক্যের সব জরা যেন ভর করেছিল তার ওপর। তখন তাকে কেউ হাজার বছর বয়েসীও ভাবতে পারতো। আমি তাকে আবার একই জায়গায়ই গুলি করি। দ্বিতীয়বার গুলিতেও সে ধরাশায়ী হয় না বরং বেহুদাই টলায়মান পায়ের ওপর ভর করে নুয়ে পড়া মাথা নিয়ে দুর্বলভাবে উঠে দাঁড়ায়। আমি তৃতীয়বারের মত গুলি করলাম। সেই গুলিতেই সে শেষ হয়ে গেল। তার পুরো দেহের ঝাঁকুনি এবং পায়ের সবটুকু শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার নিদারুণ যন্ত্রণা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু পড়ার আগেও সে একটু উঠে দাঁড়াচ্ছিল; তার পেছনের পা ঢলে পড়ার সময়েও তার শুঁড় গাছেদের মতন আকাশ ছুঁতে চাইছিল। হাতিটা প্রথম এবং শেষবারের মতো তীব্রস্বরে চিৎকার করল। এবং তারপর, ঢলে পড়ল সে, পেটের দিকটা আমার দিকে, এমনকি আমি যেখানে শুয়ে ছিলাম সেই মাটিটাও যেন কেঁপে উঠলো।
আমি উঠে দাঁড়াই। বার্মিজরা ততক্ষণে আমাকে ছাড়িয়ে কাদা মাড়িয়ে ছুটে যাচ্ছিল। হাতিটা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না সেটা নিশ্চিত ছিল, কিন্তু সে মারা যায়নি। ঘর্ঘর শব্দ করে সমান তালে শ্বাস ফেলছিল। তার বিরাট ঢিপির মতন পার্শ্বদেশটা যন্ত্রণায় কেঁপে উঠছিল। তাঁর মুখটা হা করা খোলা ছিল, দূর থেকেও খুব গভীরে দেখতে পাচ্ছিলাম-মুখের ফ্যাকাশে গোলাপী গহ্বর। তার মৃত্যুর জন্য আমি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে ছিলাম কিন্তু তার শ্বাস-প্রশ্বাস দূর্বল হয়নি। পরিশেষে তার হৃৎপিণ্ড বরাবর আরও দু’বার গুলি করলাম। তার শরীর থেকে বের হওয়া ঘন রক্তের স্রোত লাল গালিচার পেতে দিচ্ছিল, কিন্তু তখনো সে মরেনি। এমনকি গুলিটা যখন ওর গায়ে লাগলো তখন দেহটা একটুও কাঁপেনি, যন্ত্রনাপীড়িত শ্বাস-প্রশ্বাস তখনও অব্যাহত ছিল। সে ধীরগতিতে, প্রচণ্ড কষ্টে মারা যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে সে চলে যাচ্ছিল আমার থেকে বহুদূরে অন্য কোন জগতে যেখানে কোনো গুলিও তার আর ক্ষতি করতে পারবে না। আমি অনুভব করলাম যে এই পীড়াদায়ক শব্দটির অবসান ঘটাতেই হবে। নড়তে অক্ষম, মরতেও অক্ষম এই প্রকাণ্ড পশুটিকে ওখানে শুয়ে থাকতে দেখাটা, তাকে পুরোপুরি শেষ করতে না পারাটাও ছিল ভীষণ বেদনাদায়ক। আমি ছোট বন্দুকটা আনতে পাঠাই এবং গুলির পর গুলি চালাতে থাকি তার হৃৎপিণ্ডে ও গলার নিচে। কিন্তু উপর্যুপরি গুলির কোন প্রভাব তার মধ্যে পড়ছিল বলে মনে হল না। ঘড়ির টিকটিক শব্দের মতো তার শ্বাস-প্রশ্বাসটিই কেবল চলতে থাকলো। 
শেষপর্যন্ত আমি আর এটা নিতে পারছিলাম না বলে চলে গেলাম। পরে শুনেছিলাম- ওর মরতে আরো আধাঘণ্টা সময় লেগেছিল। আমি থাকা অবস্থায়ই বার্মিজরা দা এবং ঝুড়ি নিয়ে আসছিল এবং বিকেলের মধ্যেই ওর শরীর হাড় পর্যন্ত ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে বলে শুনেছি।
পরবর্তীতে, অবশ্যই, হাতিটার মৃত্যু নিয়ে সমালোচনার শেষ ছিল না। হাতির মালিকটা রেগে অগ্নিমূর্তি হয়েছিল, কিন্তু সে ছিল নিতান্তই এক ভারতীয় এবং কিচ্ছু করতে পারেনি। তাছাড়া, আইনত আমি সঠিক কাজটিই করেছি, উন্মত্ত হাতির মৃত্যুই হওয়া উচিত,যেমনটা হয় একটা পাগলা কুকুরের, যদি ওর মালিক ওকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। ইউরোপীয়দের মধ্যে এ নিয়ে মতপার্থক্য ছিল। বয়স্করা বলছিল আমি ঠিক কাজটিই করেছি, তরুণরা বলছিল সামান্য একজন কুলিকে মারার অপরাধে একটা হাতিকে গুলি করাটা লজ্জাজনক, কারণ হাতির মূল্য যেকোনো তুচ্ছ কোরিংগি কুলির চেয়ে ঢের বেশি। পরে সেই কুলির মৃত্যুতে খুশিই হয়েছিলাম; কারণ এটা আমাকে হাতিটি মারার জন্য আইনগত বৈধতা এবং পর্যাপ্ত অজুহাত দিয়েছিল। আমি প্রায়ই বিস্মিত হয়ে ভাবতাম- অন্যরা কেউ এটা ঠিক ধরতে পেরেছিল কি না যে এই কাজটা আমি করেছিলাম শুধুমাত্র বোকা হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য।
অনুবাদক : মৌসুমী কাদের

4 thoughts on “জর্জ অরওয়েলের গল্প : একটি হাতির অপমৃত্যু

  • October 24, 2017 at 4:55 am
    Permalink

    চমৎকার অনুবাদ।

    Reply
  • December 10, 2017 at 2:42 am
    Permalink

    "আমি প্রায়ই বিস্মিত হয়ে ভাবতাম- অন্যরা কেউ এটা ঠিক ধরতে পেরেছিল কি না যে এই কাজটা আমি করেছিলাম শুধুমাত্র বোকা হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য।" — মূল লেখকের এই শেষ কথাটাতে পুরো গল্পের মূল কথা। সেজন্য পুরো গল্পের মুলানুগ অনুবাদ না হলে এই শেষ কথার নির্যাস (মূল রহস্য বা গল্পের মজাটা) তে পাঠকের পৌঁছতে পারা সম্ভব না। গল্পটা কঠিন। এই কঠিন গল্পটার এক অসাধারণ অনুবাদ করেছেন অনুবাদক; যে কারণে গল্পের শেষাংশের এই অদ্ভুত মর্ম পাঠক সহজেই উপলব্ধি করতে পারে। হাতিটির অপ্রয়োজনীয় করুণ মৃত্যুতে কষ্ট হয়; আর সব ছাড়িয়ে একটা হাতির মৃত্যুর সাথে উপনিবেশিকতার অনঃসারশুন্যতা আর উপনিবেশ এর প্রতিনিধি, মূল লেখক এর অন্তরদ্বন্দ্বটা ধরতে পাড়ার এক অনিরবচনীয় অনুভূতি হয়। অনুবাদ সার্থক!

    Reply
  • March 2, 2019 at 2:18 pm
    Permalink

    দারুণ লাগল। তবে মুল গল্প 'Shooting an Elephant' এর অনুবাদ হিসেবে ' হাতি শিকার' নামটা আমার নিকট বেশি প্রাসাংগিক মনে হয়।

    Reply
  • March 2, 2019 at 2:28 pm
    Permalink

    এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.