শাহনাজ মুন্নী ‘র গল্প : মেয়ে মানুষের গোশত

‘বহুদিন আগে আমার বাপ-দাদার দেশে বাস করতে নূরালি জুড়ালি নামে দুই ভাই। তাদের পেশা ছিল ডাকাতি। জগতে হেন অপকর্ম নাই যা কিনা এই দুই ভাই না করত, আমাদের বাংড়ি গ্রাম তো আছেই, আশেপাশের দশ গেরামে দুই ভাইয়ের এতই দাপট আর এতই কুখ্যাতি ছিল যে, তাদের ভয়ে গাঁয়ের লোকজন একদম মুখচোরা বিড়ালের মতো চুপ মাইরা থাকত।
কাঁচা রাস্তায় তারা যখন জোর কদমে তেজি ঘোড়া দৌড়ায়া যাইত তখন তাদের ঘোড়ার খুরের আঘাতে সারা রাস্তা ধুলায় ঝাপসা হইয়া যাইত। লোকজন ভয়ে পলাইত। তো একদিন সেই দুই ভাই নিজেদের আস্তানায় বইসা আলাপ করতাছে। আলাপ করতে করতে নূরালি কইল,
‘ও ভাই জুড়ালি, জগতে এত কিছু খাইলাম, মেয়েমানুষের গোশত তো খাইয়া দেখলাম না।’
‘ঠিকই তো কইছস ভাই, মেয়েমানুষের গোশত খাইয়া দেখন লাগে।’ নূরালি সায় দেয়।’
ময়না যখন শরীর ম্যাসেজ করতে করতে তার গল্পের এই জায়গাটাতে আসত তখনই খিলখিল করে হাসতে শুরু করত রায়না।
পুলিশী জেরার মুখে থানা-হাজতের জানালাবিহীন প্রায়-অন্ধকার নোংরা মলিন ঘরের মেঝেতে জবুথবু হয়ে বসে হঠাৎ করে রায়নার খিলখিল হাসির শব্দটাই যেন শুনতে পাচ্ছিল ময়না। তার একটামাত্র চোখে রাজ্যের বিস্ময় আর ভয় নিয়ে সে পিটপিট করে তাকা্িচছল চারপাশে। ঠিক তখনই পুলিশের কাপড় পরা মোটাসোটা লোকটা হাতের লাঠিটা দিয়ে ময়নার পেটে একটা খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করল,
‘ওই মাগি, কইলি না খানকিটার কয়টা লাং আছিল?’
পুলিশটার হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে ময়নার তখন কেমন যেন নাড়িভুঁড়ি উলটে বমি আসার ভাব হয়, সেটা পুলিশের কুৎসিত চেহারা নাকি তার উচ্চারিত কথার কদর্যতা দেখে নাকি অকম্মাৎ পেটের মধ্যে লাঠির খোঁচা খাওয়ার জন্য তা সে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। ময়না ডানপাশে মুখ ঘুরিয়ে বমি করার মতো ওয়াক ওয়াক শব্দ করলে পুলিশের লোকটা খিকখিক করে হাসে, ‘এই মাগি, তুইও আবার পেট লাগাইছস নাকি?’
পুলিশটা হয়তো এ ধরনের কিংবা এর চেয়েও খারাপ আরও কিছু কথা বলত নয়তো আগের মতোই শরীরের কোথাও আরেকটা খোঁচা দিত যদিনা অন্য কেউ একজন এসে তাকে ডেকে নিয়ে যেত। হাজতের দরজায় বিরাট তালা ঝুলিয়ে পুলিশের লোকটা একটা বিশ্রী আর বীভৎস দৃষ্টি হেনে চলে গেলে ঠান্ডা নোংরা মেঝেতেই একটু সুস্থির হয়ে বসার অবকাশ পায় ময়না। কাল প্রায় মধ্যরাতে মানিকগঞ্জে তার খালাতো বোনের বাড়ি থেকে এক গাড়ি ভরতি পুলিশ গিয়ে সবাইকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে তাকে ধরে এনেছে। বাড়িতে অন্ধকার রাতে হঠাৎ এত লোক দেখে বোনের ছোট ছেলেটা ঘুম ভেঙে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল। ওদিকে বোন, বোন-জামাই এমনকি ময়না নিজেও কিছু বুঝতে না পেরে ঘুমভাঙা চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল।
নিজের নষ্ট হয়ে যাওয়া বাম চোখটা ডান হাত দিয়ে কচলায় ময়না, বছরদশেক বয়সে তার এই চোখটা নষ্ট হয়েছিল বসন্তে, সারামুখে নিঠুর বসন্ত নিজের উপস্থিতির চিহ্ন রেখে উপঢৌকন হিসেবে ময়নার একটা চোখ নিয়ে তবেই বিদায় নিয়েছিল। এক তো ঘোড়ামুখো চেহারা, তার ওপর বসন্তের নিষ্ঠুর কারুকাজ। ময়না আয়নায় তার নিজের চেহারা দেখতে নিজেই কেমন ভয় পেত, অন্যদেরও নিশ্চয়ই এমন কুৎসিত মুখ দেখতে ভালো লাগত না। শুধু রায়না আপা – এত সুন্দর একটা মানুষ – কেন জানি তাকে খুব পছন্দ করত।
রায়না আপার বন্ধু মণি ভাই প্রায়ই হাসতে হাসতে বলত-
‘রায়না, ডিয়ার তোমার পাশে এই পরিচারিকাটিকে দেখলে বিউটি অ্যান্ড দ্যা বিস্টে’র উপমাটাই আমার কেবল মনে পড়ে।’
ছোটবেলা থেকেই এ-বাড়ি ও-বাড়ি কাজ করে করে, ময়নার ভাষায়, এর ওর লাথি-গুঁতা খেয়ে শেষমেষ রায়নার কাছে এসেই ঠেকেছিল সে। তিনবেলা ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা বলেন, মুখের একটু আদর-সোহাগ বলেন, সামান্য কিছু যতœআত্তি বলেন কিংবা মনোযোগের ছিটেফোটা, তা যতখানিই হোক, রায়নার কাছ থেকে পেয়ে ময়না নামের কাজের ছেমড়িটা একেবারে বর্তে গিয়েছিল।
‘তোর নাম ময়না কে রাখল রে?’
রায়না আপা প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন, কিন্তু ময়না জানে এই প্রশ্নের উত্তর উনি আসলে শুনতে চাইতেন না। রায়না আপা শুনতে চাইতেন উদ্ভট সব গল্পগাথা, আর তার পছন্দ ছিল ম্যাসেজ, মানে গা হাত পা টেপা। প্রতিদিন সকালে গা ম্যাসেজ না করলে বিছানা থেকে উঠতেই পারতেন না উনি। ময়নার সরু রুগ্ন কিন্তু শক্ত রুক্ষ হাতে নিত্যকার এই ম্যাসেজটা দারুণ উপভোগ করত রায়না। পিঠ কোমর আর কাঁধের পেশির মাংসগুলো মুঠোয় নিয়ে আস্তে করে চাপড়, কখনো খুব সাবধানে আঙুল ঘুরিয়ে আস্তে আস্তে টিপে দেয়া খুবই পছন্দ ছিল রায়নার। ম্যাসেজের সময়টা আরামে চোখ বুজে পড়ে থাকতেন উনি, বলতেন-
‘আচ্ছা রে ময়না, নিজের হারানো সন্তান ফিরে পাওয়ার কোনো উপায় জানিস?’
‘জানি।’ ময়না অবলীলায় বলত, ‘অমাবশ্যার সময় রাতের মধ্যপ্রহরে উলঙ্গ অবস্থায় হারানো সন্তানের মাকে একা একা কবরস্থানে যাওয়া লাগবে। তারপর কোন শিশু মুর্দার নতুন কবরের মাটি, মনে করেন যে শিশু গত ৭ দিনের মধ্যে মারা গেছে তেমন নতুন কবরের এক খাবলা মাটি তুলে আনতে হবে, সেই মাটি মায়ের চোখের পানিতে ভিজায়া একট পুতুল বানাইতে হবে। সেই পুতুল শোবার ঘরে মায়ের শিয়রে রাখার ৭ দিনের মধ্যে হারানো সন্তান ফিরা আসবে, অবশ্য যদি সে বাইচ্চা থাকে।
রায়না আপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়তেন।
‘বেঁচে আছে কিনা কে জানে! আচ্ছা তিন মাসের একটা বাচ্চা মা ছাড়া কয়দিন বাঁচে রে?’
তখনই হয়তো টিট্ টিট্ করে মাথার কাছে টেলিফোন বাজত। রায়না আপার গলার স্বরে আহ্লাদী বিড়ালের মতো আওয়াজ শুনে ময়না বুঝত, ফোনটা বুলু ভাইয়ের। নুরু ভাই ফোন করলে রায়না আপার গলার স্বরটা শোনাত রাগী-রাগী। আবার রাজু ভাইয়ের সাথে যখন কথা বলত তখন তার গলা থেকে এমন আধো-আধো বোল বের হত, যেন একটা বাচ্চা মেয়ে কথা বলছে। 
এখন কি সকাল না দুুপুর হাজতের আলো-অঁধারিতে ঠিকমতা ঠাহর করতে পারে না ময়না। একটা মহিলা পুলিশ এসে হাজতের লোহার শিকের ওপাশে দাঁড়ায়। মুখের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে চোখে ব্যাপক কৌতুহল নিয়ে সে খানিকক্ষণ ময়নাকে দেখে। তারপর কিছু না বলেই সরে যায়। রায়না আপাও একবার একটা ফিল্মে এরকম কাপড় পরে মহিলা পুলিশ সেজে অভিনয় করেছিল, ময়নার মনে পড়ে। ওরকম কাঠখোট্টা একটা পোশাকেও কী যে সুন্দর লাগছিল আপাকে। আসলে রায়না আপার চেহারা আর শরীরটাই ছিল ওরকম। যা-ই পরতেন, যেভাবেই সাজতেন তাতেই তাকে অপূর্ব লাগত। আল্লাহ যখন তাকে তৈরি করেছিল তখন নিশ্চয়ই উনি খুব খোশমেজাজে ছিলেন আর আমাকে যখন বানাচ্ছিলেন তখন নিশ্চয়ই তাঁর মেজাজ খুব খারাপ ছিল, ময়না ভাবে। রায়না আপার কাছে আসা পুরুষ মানুষদের মধ্যে মেজাজ সবচেয়ে খারাপ ছিল দীপু ভাইয়ের। মদ খেয়ে এসে খুব চিৎকার চেঁচামেচি তো করতই, মারপিটও করত মাঝে মাঝে, একেকদিন মার খেয়ে রায়না আপার ঠোঁট কেটে, মাথা ফেটে রক্ত পর্যন্ত বেরুত।
‘বাথরুমে পড়ে কেটে গেছে’ নয়তো ‘মাথা ঘুরে সিঁড়িতে পড়ে গিয়েছিলাম’ এমন সব মিথ্যা কথা বলে লোকজনকে বুঝ দিতেন রায়না আপা। এত হাঙ্গামা, এত হুজ্জতির পরেও দীপু ভাইয়ের ওপর কোনো রাগ ছিল না আপার। বলত, যা-ই বলিস ময়না, এই একটা ছেলে যার ভেতর রাখঢাক নেই। যা বলার সরাসরি বলে, যা করার সরাসরি করে।’
আপা, এক কাজ কলেন, দীপু ভাই যে মদ খাবে তার সাথে আপনি কানি আঙুলের এক ফোঁটা রক্ত, একটুখানি থুথু আর এক চিমটি সিগারেটের ছাই মিশায়া একদিন খাওয়ান, দেখবেন তার মেজাজ-মর্র্জির কত পরিবর্তন হয়।’
ময়নার এই কথায় আবার খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ত রায়না আপা। বলত-
‘তোর যত উদ্ভট কথা!’
মাঝে মাঝে খুব মনমরা আর বিমর্ষ হয়ে থাকত আপা। তীব্র মাথা ব্যথায় ভুগতেন মাঝে মাঝে, সেই সময়টায় বাচ্চাদের মতো চিৎকার করে কাঁদতেন উনি। লাইট নিভিয়ে, জানালার পরদা টেনে ঘর অন্ধকার করে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকতেন। ময়না তখন হিম ঠান্ডা পানিতে লেবুর রস চিপে তাকে খাওয়াত। কখনো কখনো হালকাভাবে মাথা ম্যাসেজ করে দিত। এরকম সময় মাঝে মাঝে খুব উল্টাপাল্টা কথা বলতেন আপা। বলতেন-
‘তুই খামাখা কেন বেঁচে আছিস রে ময়না, জীবনের কোন সাধ-আহ্লাদটা তোর পুরা হইছে বল, আমার না হয় রূপ আছে, শরীর আছে, টাকা-পয়সা আছে, খ্যাতি আছে, তোর কী আছে বল! রূপ নাই, যৌবন নাই, কেউ তোরে বিয়া করে নাই, কোনো পুরুষের সাথে কোনোদিন ঘুমাস নাই, শইল্যের মজা পাস নাই, তোর বাঁইচা থাকার দরকারটা কী? তোর জীবনের মূল্যটাই বা কি?
‘নিজের জীবনের মুল্য নিয়ে কখনো কি ভেবেছে ময়না? এই যে এখনও ভালোমতো বেঁচে আছে, মায়ের মতো জোয়ান বয়সে বাচ্চা হতে গিয়ে কিংবা বাপের মতো গাড়িচাপা পড়ে মাথাটা থেঁতলে যে মরে যায়নি, সেটাই তো অনেক বেশি, শুধু বেঁচে থাকার আনন্দেই বেঁচে আছে সে।
‘আমার সাথে তোর জীবনটা বদলানো গেলে তোর বাইচ্চা থাকার আনন্দটা আমি একটু বুঝতামরে ময়না, বদলাবি? আমার সাথে তোর জীবনটা বদলাবি?’
রায়না আপা কাঁদতে কাঁদতে বলত।
ওরে বাবা, রায়না আপার সাথে জীবন-বদল, ভাবতেই ভয় লাগে। কত নামী-দামি মানুষের সাথে চলাফেরা আপার, কত কায়দা করে একে ওকে খুশি করে চলতে হয় তাকে, কত ছলচাতুরী আর কত লুকানো ছাপানোতে ভরা তার জীবন, এতকিছু যে আপা কীভাবে সামাল দিতে পারত, কে জানে?
ময়না ভাবে আর হঠাৎ করে তার খুব পানি পিপাসা পেয়ে যায়, সে দেয়াল ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়। হাজতের ছোট্ট পরিসরে হেঁটে হেঁটে একটু আড়মোড়া ভাঙার চেষ্টা করে। এখানে এই বিজনে কার কাছে পানি চাইবে সে? হাজতের শিকের সামনে সরু অন্ধকার করিডোরে কারও চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না। একা একা খুব খারাপ লাগতে শুরু করে তার। একা থাকাটা যে আসলেও খুব কষ্টের তা শেষ পর্যন্ত রায়না আপাও হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন।
‘এই জীবনটা আর ভাল্্ লাগে নারে ময়না!’ রায়না আপা প্রায়ই বলতেন। সেজন্যেই বোধ হয় শেষ পর্যন্ত সেজান ভাইকে বিয়ে করার জন্যে খেপে উঠেছিলেন রায়না আপা। শ্যামলা রঙের ক্লিন শেভ করা সেজান ভাইয়ের সুন্দর চেহারাটা মনে পড়ে ময়নার। কালো রঙের একটা বিরাট গাড়িতে চড়ে বীরের মতো সেজান ভাই আসত। চোখে থাকত কালো চশমা। হাবভাবে যেন রাজপুত্তুর। রায়না আপা বলত, ‘আমি বিয়ে করলেও তুই কিন্তু আমার সঙ্গেই থাকবি ময়না, আমি ছাড়া তোর আর আছেই বা কে আর যাবিই বা কোথায়?
তা তো ঠিকই, রায়না আপাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা তো চিন্তাই করতে পারে না ময়না। কিন্তু হায়, শেষ পর্যন্ত তাকে ছেড়ে তো যেতে হলই, রায়না আপা আজ কোথায়?’
ময়নার একটা চোখ পানিতে ভরে ওঠে। শেষ যেদিন আপার সাথে কথা হল সেদিনের কথাটা মনে পড়ে তার। রায়না আপা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে, ময়না দ্রুত অভ্যস্ত হাতে তার পিঠ ম্যাসেজ করে চলেছে, আরামে চোখ বুজে আছেন রায়না আপা, এরই মধ্যে জড়ানো কষ্ঠে বললেন, ‘তোর নূরালি জুড়ালি দুই ভাইয়ের গল্পটা শেষ করলি না ময়না? ওই যে ওরা মেয়েমানুষের গোশত খেয়ে দেখতে চেয়েছিল, সেই গল্পটা …’
রায়না আপার মসৃণ সাদা কাঁধ আর চিকন কোমল হাত যতœ করে টিপে দিতে দিতে অসমাপ্ত গল্পটা শেষ করেছিল ময়না। 
‘দুই ভাইয়ের যেই কথা সেই কাজ। পরদিন সকালেই তারা ঘোড়া নিয়ে বেরুলো মেয়েমানুষ শিকার করার জন্য। দেশের সবচে সুন্দর স্বাস্থ্যবান আর নিখুঁত মেয়েটিকেই তাদের চাই। বাংড়ি, হাইমের চর, মজলিশপুর, হরিণবেড় এমনি আরও আট-দশটা গ্রাম চষে ফেলল তারা, তারপর ওদের নজরে যে মেয়েটাকে সবচে সুন্দর মনে হল তাকে ধরে আনা হল। ভারি মায়ামায় সুন্দর চেহারার মেয়েটি। কী তার রূপ, টানাটানা চোখ, পাতলা ঠোঁট, নরম শরীর- কিন্তু এসবে কি আর ডাকাতরা ভোলে? নাকি তাদের মনে দয়ামায়া বলে কোন বস্তু আছে? মেয়েমানুষের গোশত খাওয়ার লোভে তারা তখন বেপরোয়া, পাগল, তারা তখন অন্ধ, বেপানান।
প্রকাশ্য দিবালোকে দুই ভাই মিলে গরু যেমন জবেহ্ করে কিংবা ধরো নিরীহ মুরগি যেমন করে নির্দ্বিধায় মানুষ কেটে ফেলে, তেমনি করে সেই সুন্দর মেয়েকে ধরে, হাত-পা বেঁধে তার গলায় ধারালো ছুরি চালিয়ে দেয় তারা। কিছুক্ষণ হাত-পা ছুড়ে ধড়ফড় করে সেই মেয়ে একসময় নিথর নির্জীব পড়ে থাকে। এবার ডাক পড়ে বাবুরচির। বড় নামকরা বাবুরচি সেই আইনাল মিয়া।
‘শোন’ নূরালি বলে, ‘এই মেয়ের মাংস রান্ধো, মাংস রানতে যত পদের মশলা লাগে সব দিবা, তোমার হাতে রান্ধনের যত কারসাজি অছে সব করবা, ঠিক আছে?’
আইনাল বাবুরচি আর কী করে, হুকুমের চাকর সে। মালিকেরা যে আদেশ দেবে সেই আদেশ তো আর সে অমান্য করতে পারে না, ইচ্ছ্ াকরলেও সে এখন পারে না মৃত মেয়েটার দেহে জীবন দিতে। ভয়ে-দুঃখে-লজ্জায়, কাঁপতে-কাঁপতে বাবুরচি তার সহকারীদের নিয়ে মরা পশু যেমন কাটে তেমন কইরা মেয়েটার প্রাণহীন শরীর টুকরা টুকরা কইরা কাটে। ধোয়। এক ধোয়া, দুই ধোয়া, তিন ধোয়া দেয়। তারপর জ্বলন্ত চুলার উপরে হাঁড়ি বসায়। নিয়মমতো হাঁড়িতে তেল দেয়, পেঁয়াজ দেয়, এক এক করে দেয় সমস্ত মশলা, তারপর যেমন কইরা রান্ধে অন্যসব পশুর মাংস ঠিক তেমন কইরা সে রানতে থাকে সুন্দরী নারীর শরীর, রানতে থাকে মেয়েমানুষের গোশত। বাবুরচিরা রান্ধে আর সুবাস বাইর হয়, সুবাসে মউমউ করে চারিদিক। যেমন সুন্দর হয় সেই সালুনের গন্ধ তেমনি তার রংও ধরে চমৎকার। 
নূরালি জুড়ালি দুই ভাই তাদের খাস কামরায় বইসা নিজেরা নিজেরা তাস-পাশা খেলে। হাসি-তামাশা করে। তাদের মনে আজ বেজায় ফুর্তি, একটু পরেই মেয়েমানুষের রান্না করা মাংস খাবে, সেই লোভে সেই আনন্দে তাদের জিহ্বা লকলক করে। 
এদিকে, পাকের ঘরে বইসা আগুনের তাপ ও মনের সন্তাপে ঘামে জবজব করে আইনাল বাবুরচি আর তার দলবল, আইনালের চোখ লাল, গলা গমগমে, সে তার সহকারীদের বলে-
‘ওই এক টুকরা মাংস মুখে দিয়া দ্যাখ, ঠিকমতো লবণ হইছে কি না।’
বাচুরচির এই কথায় অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলতে পারে না। তারা পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারপর- ‘কী বলেন ওস্তাদ, ওই কাম আমরারে দিয়া হইত না।’ 
বলে একে একে তিনজন সহকারীই লবণ চাখতে, চুলায় বসানো সালুনের স্বাদ চাখতে অস্বীকৃতি জানায়।
অবশেষে আইনাল বাবুরচি তার রান্নার সুনাম রাখতে নিজেই চামচ দিয়ে তুলে এক টুকরা গোশত মুখে দেয়। আর মুখে দিয়েই প্রচন্ড চমকে ওঠে সে। তার ৩০ বছরের বাবুরচি জীবনে, তার ৫০ বছরের মানবজনমে এত সুস্বাদু, এত মজাদার আর কোনো খাবারই কোনোদিন খায়নি আইনাল বাবুরচি।
‘হায়, হায়, ওই দুই পিশাচ ভাই, ওই দুই শয়তান যদি একবার এই গোশত খায় তবে তো জগতে কেয়ামত হয়ে যাবে, তারা অক্তে অক্তে মেয়েমানুষ ধইরা জবো করবে আর তার মাংস খাবে। তাদের দেখাদেখি অন্য পুরুষোও এইরকম খাওয়া শিখবে আর শেষ পর্যন্ত সবাই মিল্যা দুনিয়া থেকে নারীজাতির অস্তিত্ব বিলোপ করে ছাড়বে।
এসব ভেবে আইনাল বাবুরচির হঠাৎ খুব অস্থির লাগে। এদিকে, দুপুরের খাবারের সময় হয়ে যাচ্ছে। খুব দ্রুত একটা কিছু করতে হবে। বাবুরচির লাল চোখ আরও বেশি লাল হয়। এই অল্প সময়ের মধ্যে এই মাংস বদলায়া কুত্তা বা শুয়োরের মাংস রান্নাও সম্ভব না, সে ভাবে, খাবার দিতে দেরি হলে দস্যুগুলো তাকে জানেই মেরে ফেরবে আর যদি টের পায় মেয়েমানুষের বদলে …। আইনাল বাবুরচি তার সহকারীদের ডাক দেয়।
‘তাড়াতাড়ি একটা উপায় বাইর কর, যাতে সাপও মরে লাঠিও না ভাঙ্গে, ওই শয়তানগুলিরে এই গোশত কিছুতেই খাওয়ানো যাবে না।’
সহকারী তিনজনে তিন রকমের বুদ্ধি দেয়, কিন্তু কোনোটাই মনের মতো হয় না। এদিকে সময় দ্রুত ফুরাইতে থাকে। দুই ডাকাইত ভাইয়ের পেটে রাক্ষইসা খিদা মোচড় দিয়া উঠে। শেষ পর্যন্ত সহকারীদের একজনের দেয়া একটা বুদ্ধি মনে ধরে আইনাল বাচবুরচির। সহকারী বলে-
‘এক কাম করেন উস্তাদ, সালুনের স্বাদ নষ্ট কইরা দেন।’
‘কেমনে? কেমনে নষ্ট করি?’
আইনাল বাবুরচি বলেছিল, বলেছিল, কেননা রান্না তার কাছে একটা মহান শিল্পকর্ম, যে শিল্পকে স্বাদে গন্ধে বর্ণে অনন্য করে তোলার সাধনাই এতকাল ধরে করেছে সে। সহকারী বলেছিল, ‘তিতা, তিতা ঢাইলা দেন, ঝিম্ তিতা, তিতা ঢাললে সবকিছুর স্বাদ শেষ।’
সেইমতো আইনাল বাবুরচি নিজ হাতে পারেনি কিন্তু তার সহকারীরা, তারই সামনে সকলে মিলে নিমের তিতা, করলার তিতা, নিশিন্দার তিতা, নাইল্যার বীজের তিতা এমনি আরও যত তিতা হাতের কাছে পাইছে সব ঢাইলা দিছে সুস্বাদু সেই সালুনের পাতিলে। ঢাইলা ইচ্ছামত জাল দিছে।
দুপুরবেলা নূরালি জুড়ালি দুই ভাই দস্তরখানা পাইত্যা বড় আশা কইরা বসছে মেয়েমানুষের গোশত খাইতে। আইনাল বাবুরচি বড় বাটি ভইরা তাদের সামনে দিছে গোশতের সালুন। খুবই আগ্রহ কইরা সেই সালুনে মুখে দিয়া দুই ভাই উঠছে থু থু কইরা।
‘ছি ছি এটা কী? এত তিতা? এত বিস্বাদ? এইটা কোনো খাওনের চিজ হইল? থুঃ থু, ফালা, ফালায়া দে এইসব!’ দুই ভাই খাবার ফেলে চিৎকার করে ওঠে। 
এইভাবে আইনাল বাবুরচির কারণে রক্ষা পায় নারী জাতি।
ময়না যখন তার গল্প শেষ করে তখন রায়নার শরীর ম্যাসেজ করাও শেষ।
‘জবর একখান কিসসা শোনাইলিরে ময়না!’
রায়না আপা উঠে বসে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলেছিলেন। ‘কিন্তু মেয়ে মানুষের গোশত খাওয়ার লোভ এখনো পুরুষ মানুষের শেষ হয় নাই রে !’ 
হাজতের লোহার দরজায় তালা খোলার ধাতব শব্দ হয়। ময়নার কেমন ঝিমুনি এসে গিয়েছিল, শব্দ শুনে সে চমকে তাকায়। পুলিশের সেই লোকটা আবার হাজতের ভেতর ঢুকছে। তার সঙ্গে অন্য আরেকটা লোক। ময়নাকে দেখিয়ে পুলিশের লোকটা তার সঙ্গের লোকটিকে বলে-
‘জি স্যার, এর কথাই বলেছিলাম আপনাকে। এই মেয়েটাই রায়না ম্যাডামের বাড়িতে কাজ করত, একে রিমান্ডে নিয়ে ভালোমতো জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো রায়না হত্যা রহস্যের একটা কিনারা হতে পারে।’

3 thoughts on “শাহনাজ মুন্নী ‘র গল্প : মেয়ে মানুষের গোশত

  • February 11, 2018 at 4:14 am
    Permalink

    ভালো লিখেছেন মুন্নী। আমি বরাবরই আপনার লেখার মুগ্ধ পাঠক। আজও মুগ্ধ হলাম।

    Reply
  • April 11, 2022 at 12:51 pm
    Permalink

    গল্পের ভিতর গল্প মায়ের পেটের ভিতর অনাগত শিশুর মতন। পাঠে মুগ্ধ হলাম। অশেষ ধন্যবাদ।

    Reply
  • April 11, 2022 at 12:52 pm
    Permalink

    এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=