জয়া মিত্র’ এর গল্প যাত্রা

ঘুম ভেঙে গিয়েও খানিকক্ষণ চোখ মেলেন না। সাগরময়ী।
ঘুমের যে কখন শেষ আর কখন পুরোপুরি জেগে ওঠা শুরু চোখ বন্ধ রেখেই আজকাল সেটা যেন
একটু একটু করে বুঝতে পারেন। চোখ মেলিলেই বা কি! চারপাশেই তো অন্ধকার এখনও। মশারির
বাইরে বা হাতে খোলা জানলার নিচে বড় বাতাবি লেবুর গাছটায় ফুলের গন্ধ ইদানীং কমে
এসেছে। ফুল ঝরে গিয়ে জালি পড়তে শুরু করেছে বোধহয়। অন্ধকারেরও তো রকমফের আছে।
এখন আর রাত্তিরের অন্ধকার নয়
, ঘুম
ভেঙেছে মানেই রাত ফুরিয়ে এসেছে। গাছে গাছে এবার পাখিদের জেগে ওঠার সময় হবে। সেই
যে ডাকা পাখি না ছাড়ে বাসা
, খনা
বলেন সে হল উষা
, এখন
সেই উষা আসবার সময়। অন্যদিনে এ সময়ে অন্ধকারের ভিতর দিয়েই রাত্রিশেষের হালকা
বাতাসের স্রোত বয়। আজ যেন একটু দমচাপা লাগছে। এখন কি তার শুয়ে থাকার সময়!
গোপালকে জাগরণ দিতে হত
, শয়ন
তুলে নতুন পোষাক পরানো চন্দন দেওয়া
, তারও আগে নিজের মান। উঠোনের অন্ধকারে শাদা শাড়িটি মেলে দিলেই যেন
অন্ধকার একটু কম হয়ে যেত। তারপর সেই অন্ধকারের ভিতর থেকে টুলটুল করে তাকিয়ে থাকা
ফুলের কলিগুলি
, টগর, গন্ধরাজ, গাছের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা
বড়শির ডগায় চাপা
, গুলঞ্চ।
আর একটু পরে ভোরের প্রথম আভাটুকু গায়ে মেখে নিয়ে ফুটে উঠবে স্থলপদ্ম
, বাগানের পুবদিকের গাছটি থেকেই যেন
আলো ছড়িয়ে পড়বে উঠোন জুড়ে
, আর
শরতের মেঘ উড়ান নিতে না নিতে ফুটতে শুরু করত। শিউলি অম্রাণের শেষ পর্যন্ত। আহা
, সেই গন্ধের যে টান! মাটির দিকে,অন্ধকারের মধ্যে গাছের তলায়
বিছিয়ে থাকত বাশি রাশি ফুল
, সেই
সব ফুল দিয়ে আসন সাজাতে
, চন্দন
ঘষতে গুনগুন গান গাওয়া
, গোপালকেই
তো জাগান
, সাজান। তারই মধ্যে কখন আলো
ফুটতে শুরু করত। আর বিছানা ছেড়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে তামার ঘটতে রাখা এক ঘটি
জল ঢাকাঢ়ক করে খেয়ে সেই মানুষটি উঠোনে পূবমুখো হয়ে বসতেন। একটি নিচু জলচৌকির
ওপর আসনপিড়ি
,
হাতের
তানপুরোটি একবার দুবার সুর ছাড়ত আর কী ভরাট গলা! অবাক হয়ে আড়চোখে মানুষটার দিকে
দেখতে দেখতে এক-একদিন সাগরময়ীর মনে হয়েছে
, ওই বুকের ভিতর থেকে ওঠা গমগমে
আওয়াজের ধ্বনি ধরেই যেন সূৰ্য উঠে এল। কোনদিন কি বলেছেন সেকথা! ভয়ে মাটিতে মিশে
থাকতেন না নিজের থেকে সাতাশ বছরের বড় স্বামীর সামনে! দশটায় ভাত খেয়ে তিনি অফিস
চলে গেলে তবে যেন বাড়িতে একটু খোলামেলা হতে পারতেন সাগরময়ী।
আজ কেন এখনও অন্ধকার একটুও হালকা হল না? তবে কি সত্যি এখনও মাঝরাত্রি? যেন অনুভব করেন জলতেষ্টা পেয়েছে
তার। একটু দূরের খাটে ছেলে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু তাকে কি ডাকা যায়
? যাক,একটু পরে হয়ত নিজেই জেগে উঠবে। এই
হাতপা শরীর সব এমন অচল হল
, কে
বা জানত এমন হবে! যাদের বেী করে ঘরে এনেছিলেন
,তাদের কোলে যারা জন্ম নিয়েছিল তারা
কতজন চলে গেল চিরকালের মত। কতজন এতদূরে চলে গেছে যে তারাও যেন চিরকালের মত
ষাট
ষাট কি কথা ভাবলেন
, যে
যেখানে আছে ভালো থাক
, দীর্ঘায়ু
হোক
শুধু
তিনিই কেন যেতে পারেন না! আর কতদিন এই পারের কিনারায় বসে অন্যদের চলে যেতে
দেখবেন! নড়াচড়া করার ক্ষমতা
, দুচোখ
মেলে চেয়ে দেখার ক্ষমতা
, তাও
যে গোপাল নিয়ে নিল-তবে গোপাল তাঁকে কেন নেয় না
? তিনি যে আর একা থাকতে পারেন না একথা
কাকে বা বলবেন। কতবার কত শিশুর মুখে গোপাল এসে দেখা দিয়েছে
,তাঁর কোলে খেলা করেছে। কত মানুষজন
কত কাজ ছিল সংসারময়। সাতাশ বছরের বড় স্বামীর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী হয়ে তিনি
সংসারে এসেছিলেন
,চোদ্দ
বছর বয়সে। তাতেই তার বাবাকে আত্মীয় পরিজন কত গঞ্জনা দিত।
এত বড় পাহাড়ের মত মেয়ে বুকের উপর বসা, দুবেলা গলা দিয়া ভাত নামে ক্যামনে? বাবার বড় আদরের মেয়ে ছিলেন সাগর।
একটি মাত্র মেয়ে
, অনেকগুলি
ছেলের পিঠে। লোকে বলত অমুকের মাইয়ারে মাথায় রাখলে উকুনে খায়
, মাটিতে রাখলে পিঁপড়ায় খায়। কোন
শাশুড়ি জানি কপালে নাচতে আছে।
না, শাশুড়ি
ননদের ভরা সংসার পাননি। তিনি। নতুন সংসারে কতদিন পর্যন্ত তিনি একা মেয়ে। একটা কাজ
যে শিখিয়ে দেবে
, সাহায্য
হবে
, হাতে গরম ফ্যান পড়ে গেলে
কি শিলে আঙুল ছেচে গেলে একটা আহা করার কেউ ছিল না। এও সত্যি
, অপমান-নির্যাতনও কখনও সহ্য করতে
হয়নি তাঁকে সে সংসারে। স্বামী বড় শাস্ত মানুষ ছিলেন। সংসারটি শাস্ত ছিল। মনে
কষ্ট কি পাননি
? মনের
কষ্ট ছাড়া নারীজন্ম কবে যায়
? জলের
দেশের মেয়ে তিনি
, বিয়ের
পর স্বামীর সঙ্গে আসবার সময় নৌকায় বসেই জিগেস করেছিলেন
, খোকার নাম কি ? আগে জেনেছিলেন অন্যের ফেলে যাওয়া
সংসারে ঢুকতে যাচ্ছেন তিনি। কচি ছেলে মানুষটি। একবার প্রশ্নে উত্তর না পেয়ে
ভেবেছিলেন নদীর শব্দে
, দাঁড়ের
শব্দে শুনতে পান নি। স্বামী। দ্বিতীয়বার জিগেস করতে শুনেছিলেন-খোকা না
, খোকারা। তিন ছেলে এক মেয়ে তোমার। চমকে
ওঠে নি। বুকের ভিতর
? কষ্ট
হয়নি খুব
?
জানতেন না ঠিক
কিসের কষ্ট কিন্তু তবু মনে হয়েছিল মা-বাবা কি সব জেনে তার কাছে লুকোলেন
? মা-বাবা কি জানেন না ? কোন অজানা দেশের সেই অচেনা সংসারের
ভয়ে আবার তার বুকের মধ্যে কেঁপে উঠেছিল।
অঘোরনাথের বড় ছেলে সাগরময়ীর চেয়ে চারবছরের বড় ছিল, মেজ দুবছরের। তারপর একটি মেয়ে, তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। সে
সাগরময়ীর সমবয়সী। তাকে সাগরময়ী দেখেছেন অনেক পরে। সবচেয়ে ছোট যে ছেলে
, মাধব, তার বয়স আট। তারই মা হয়ে আসবার
কথা শুনেছিলেন বিয়ের আগে। প্রথম কিছুদিন ছেলেরা আড়ষ্ট ছিল
, মা বলে ডাকত না। খোকা তো ডাকতই না।
সে ছোট ছিল
,
সে তো সংসারে
আইনকানুন জানত না
, সে
তার মাকে চিনত। প্ৰায় মাসখানেক কি তারও বেশি সে ডাকত
এই অই বলে।
তার বাবা বারেবারে জেদ করতেন-
অই কি। মা কওসে বাবার সাম্যমাসামনি আসত না। বড় দুই ছেলে পারতপক্ষে চুকত না
ভিতরবাড়িতে
চুপ করে খেয়ে ওঠা ছাড়া তাদের সঙ্গে আর বড় সম্পর্ক ছিল না। একসময়ে
ধীরে ধীরে সেইসব ভয় কষ্ট লজ্জা কিছু কেটে গেল কিছু সহজ হয়ে গেল। তবু আজও মনে আছে
অতো বড় বড় ছেলেদের সামনে তাদের বাবার স্ত্রী হয়ে আসার লজা। খুব জ্বর। কোনরকমে
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দাওয়ায় শুয়ে পড়ে মনে হচ্ছিল বন্ধ চোখের চারদিকে যেন লাল
কি ঘুরছে। আর সেই জুরের সময়ই বড় ছেলে বিষ্ণুপদর সেবায় অনেকখানি আশ্রয় আর
নির্ভয় পেলেন সংসারে।
দুবছরের মাথায় বিষ্ণুপদীর বিয়ে
দিলেন। সৌরভী সংসারে এল। শাশুড়ি বৌ দুই সঙ্গিনী হয়েছিলেন। দুপুরবেলা ব্যাপছেলেরা
যে যার কাজে গেলে দুজনে নিশ্চিন্তমনে খিড়িকীবাগানের আমগাছে উঠেছেন
, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাঁতার কেটেছেন
পুকুরে। তিনি তো পণ্ডিতের মেয়ে
, সৌরভীর
বাবা কাছারিতে কাজ করতেন-অনেক ভালো ভালো জিনিস রাঁধতে জানত সৌরভী
তার বাবা নিজের জামাইকেও
কাজ ধরিয়েছিলেন সদর কাছারিতে। কিন্তু একটুও গুমোর ছিল না সৌরভীর। বড় হাসিখুশি
মেয়ে ছিল। তবু একটা লজ্জার কথা খুব ভিতরে কোথায় যে কষ্ট দিত-যখন প্রায় একই সঙ্গে
গর্ভিণী হতেন দুজনে। সৌরভী যে ছেলের বৌ
সেই ছেলের সামনে মাকেও যখন ভারী
শরীর নিয়ে চলাফেরা করতে হয় বড় লজ্জা হত। অথচ পুরুষমানুষরা কেন বোঝে না
? তাদের লজ্জা হত না, তারাও তো বাবা আর ছেলে ? কিন্তু এমন তো হতেই। বিষ্ণু তো
সাগরময়ীর পেটের ছেলে ছিল না
, গর্ভজাত
পুত্রের বৌ আর শাশুড়ি একই সময়ে আতুড়ঘরে থাকাই কি কম হত তখন ! কিন্তু প্রতিবারই
তো যে আসে সে একটি শিশু । আহা বুক জুড়িয়ে যেত। বিস্ময়ের যেন আর সীমা পরিসীমা
থাকত না। আর কত না আনন্দ। তবু তো সবাই থাকত না তারা। অত কষ্ট অত যন্ত্রণা দিয়ে
যদি দিতেন ঠাকুর তবে কেন ফিরিয়ে নিতেন আরও যন্ত্রণা দিয়ে
? দ্বিতীয়বার গর্ভে যমজ। ছেলে ছিল
তার। জন্মের পর চারদিন মাত্র বেঁচেছিল তারা। কত বয়স ছিল তখন সাগরের
? আঠারো কি উনিশ। বুকে ভরাট দুধেব
যন্ত্রণায় আর খালি কোলের শোকে পাগল হয়ে গেছিলেন। জোরে কঁদতে পারতেন না
, দাওয়ার খুঁটিতে মাথা ঠুকে ঠুকে
কপালে কালশিরা পড়ে গিয়েছিল। তাঁকে দু
হাতে জড়িয়ে ধরে ও মা—” বলে
সৌরভীও কাদত।
তাই কি একবার? কানু গেল ছবছর বয়সে। কী যে হয়েছিল! জুর চলল। একটানা, খাওয়া বন্ধ। কষ্টিপাথরের মত ছেলে
পাঙাশাপােনা হয়ে গেল। কালো ঝিকমিকে চোখ যেন মরা মাছের মত। থাকবে না বলেই বুঝি আতে
রূপ নিয়ে এসেছিল। পাথরকাটা যেমন ঠাকুরটি। মিটমিটি হাসি
,মুখখানি ঘিরে থুপি থুপি চুল। সেই
ছেলে চোখের সামনে কোলের ওপর একটু একটু করে শুকিয়ে গেল
,কবিরাজের ওষুধে কোন কাজ হল না।
যাবার দিন সকালে জুরের মধ্যে হঠাৎ চোখ মেলে সন্দেশ খেতে চেয়েছিল কানু
,মা,আমারে একখানা সন্দেশ দিবা?
কবিরাজ রাজি হননি, বলেছিলেন না খাওয়া দুর্বল নাড়ি
অতোটা পারবে না। দু-একদিন সবুর করতে। সবুর করার সময় ছিল না। কানুর। সারাজীবনে আর
সন্দেশ
ছোননিসাগরময়ী। কিন্তু সে তো
পরে। সেদিন
?
তখনি ? যখন হারিকেনের আলো নিয়ে সরঞ্জাম
নিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছিল সবাই আর দরজার বাইরে থেকে অঘোরনাথ বলেছিলেন
,সাগরবৌ,দিয়ে দাও। কারে ধরে আছ? সে ত নাই-
ও তো মাটি। মাটির জিনিস মাটিরে ফিরায়া দাও।
যে শরীরে রাখে আর শরীর ছিড়ে মাটিতে নামিয়ে দেয়। তার
বুক ছিড়ে যাবে না
? মাটির
কোথায়
? মাটিকে তো আমি দিয়েছি।
মাটি তো তৈরি করেনি ওকে
, আমি
করেছি। পুরুষে কি জানে
!
সেই তো তখনই দীক্ষা নেওয়ালেন অঘোরনাথ। গোপাল মন্ত্র
কানে দিয়ে গুরু কষ্টিপাথরের এই বালগোপালকে দিয়ে গেলেন। বলেছিলেন-এই তোমার ছেলে
,একে কোলে রাখো,এর সেবা করো। এর জন্ম নাই, মরণাও নাই-এ এক-একবার লুকায় আবার
ধরা দেয়
, ওই তার লীলা ।
সেই গোপালকে বুকে আঁকড়ে ধরা,নিজের সব দুঃখকষ্ট গোপালের ওই পা
দুটিতে সঁপে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা-কত বছর হল আজ
? সত্তর বছর ? নাঃ,ওই যে পাশের ঘাটে ঘুমোচ্ছে রাধু
তারই তো সত্তর হয়ে গেল। রাধু তাঁর গর্ভজাত চুতীর্থ সন্তান। তাহলে পচাত্তর বছর
? নাকি সমস্ত জীবন ধরেই দিয়ে আসছেন ? কতদিন ধরে বা চলছে। এই জীবন? রাধু উঠলে, আজ একবার শুধোবেন কত বয়স হল তার? লজ্জা হয় জিগেস করতে। ছোটরা সব চলে
যাচ্ছে একে একে। এই তো গতবছর বুঝি নাকি তার আগের বছর পুজোর সময় কলকাতা থেকে
নাতি-নাতবেী তাদের ছেলেমেয়েরা এসেছিল
,পাশের ঘরে গল্প করেছিল, সুন্দরদাদারও তো বয়স হচ্ছে, এবার উনি থাকতে থাকতে যদি
সুন্দরদাদাও চলে যান-কি হবে! শুনতে চাননি। সাগরময়ী
, তবু গোপাল শোনাও কেন ? আমি যে এত ডাকি তবু যে আমারে নাও
না। তাইলে আমি কি করি! রাধু সংসার করল না। সেই কোনকালে বিয়ের তিন না চার বছর পরে
সুন্দরবউ মরল
,
আর সংসার করল
না। রাধু। মা সাগরময়ীকে নিয়ে কত দেশ দেখাল
, কত তীর্থ ঘোরাল, তারপর আবার সেই নিজের ভিটেয় ফেরা।
উঠোনের পুব-দক্ষিণ কোণ জুড়ে বিশাল স্বর্ণচাঁপার গাছ
, এখনও কি আছে? কতদিন যেতে পারেন না উঠে। কতদিন
দেখেননি। ওই স্বর্ণচাঁপার গন্ধ অনেক বছর যেন সহ্য করতে পারতেন না। অন্ধকারে ফুল তুলতেন
বলে কতবার সাবধান করেছেন অঘোরনাথ আর সেই মানুষকে খোলা সকালবেলায় সাপে দংশন করল ওই
স্বর্ণচাঁপার নিচে । আটটি ছেলে-মেয়ে পেটে ধরে বিয়ের চোদ্দ বছরের মাথায় সব শেষ ।
কতকাল গেল তারপরে। সে যেন অন্য কোন জন্মের এক সাগর। সেই তখন থেকে বড়খোকা সংসারের
হাল ধরল। আর সৌরভী-সংসারের আঁচটুকুও লাগতে দেয়নি তার গায়ে। যতটুকু পারেন আঁচ
তিনি নিজে লাগিয়েছেন। মাথার সব চুল ফেলে দিলেন
, একাদশী পূর্ণিমা অমাবস্যা, বৈশাখে গাছকে জলের সেবা করা, কার্তিক মাসে ব্রত রেখে এক সিদ্ধ
ভাত খাওয়া
,
মেঝেতে
শোয়া-যে যা নিয়ম বলেছে সব ধরেছেন
, পালন করেছেন। কোন ব্ৰতফল পাবার লোভে নয়। কেবল পালন করে যাবার জন্যই
শরীরকে কষ্ট দিয়েই কি শোক ভুলে থাকার চেষ্টা করে মানুষ
? আনন্দেও তো থেকেছেন। অঘোরনাথ যাবার
পর যখন মাথা তুলে বসতে পারলেন তখন থেকে একটি তো তার জন্যই নির্ধারিত করেছিল
সংসার-বাচ্চাদেব নিয়ে থাকা নিজের ছোট ছেলে মধুসূদনের তখন দু
বছরও
পুরো হয়নি। তার ওপরে নিধু তার ওপর সর্বজয়া। সৌরভীর পাঁচটি। ততদিনে মেজ বৌ ও তিন
ছেলের মা। সেই মানুষের ধরানো পাথরের গোপাল আর এই সব চঞ্চল বালগোপালদের নিয়ে দিন
কেটেছে। দিনে দিনে ছোটরা বড় হয়েছে
, আবার নতুন নতুনরা এসেছে। শুধু কি নিজের ঘরের ? পাড়ার আর পাঁচটা ঘরেরগুলি আসেনি ? বুলনের দিনে আনন্দ করেননি। সব ললিতা
বিশাখা সুবল সখা সাজিয়ে
? প্রতি
পূর্ণিমায় এলাচদানা এনে দিয়েছে বড়খোকা। কত আনন্দ ওই উঠোনেই আবাব হয়েছে। দুঃখ
কি আর জায়গায় থাকে
? দুঃখ
চলে যায়। সুখও কি জায়গায় থাকে
? সুখও
যায়। দুঃখ যেমন জায়গা ছেড়ে গিয়ে মনে বাসা নেয় সুখ নেয় না কেন
? কালাজুরে মধু-গেল। তিনি কেন সৌরভীও
কি পারল রাখতে
? বুকের
দুধ দিয়ে তো বড়ো করেছিল সৌরভী। এই দোতলা উঠল। ওই উঠোনেই বৌছত্তরের আল্পনার ওপর
দিয়ে এসে ছেলের বেীরা দুধ-আলতা ভরা থালায় দাঁড়াল একে একে। বিজয়া সর্বজয়া দুই
মেয়ে গেল ওই উঠোন থেকে। উঠোনের কি দোষ
? সৌরভীর চুল পাকল, মেজবৌ
নয়নতারার চিকণ চেহারায় ভাজ পড়ল। তখন কত বয়েস হয়েছিল সাগরময়ীর যখন সৌরভী গেল
? সৌরভী আগে গেল না। সুন্দরবউ? অনেকদিন আগেকার কথা তো বেশ মনে আছে, পরের কথাগুলি এমন ভুল হয়ে যায় কেন
? তালগোল পাকিয়ে যায়। অথচ
সবকিছুতে তো ভুল হত না কই। সৌরভীর বড় ছেলে অপুর্বর বৌ
,সাগরময়ীর বড় নাত বৌ, কতদিন বাঁকা
করে বলত
, কন দেখি যে ভুইলা যান, বাজার থিক্য কি কি আনিছিল-সেইখান
কোনদিন ভোলতে দ্যাখলাম নাকি করে ভোলেন
? মনে মনে হিসেব থাকে না কে কোনটা ভালোবাসে,কার খুশিমুখ দেখার জন্য কোনটা
রাঁধবেন
? গোপালের ফুলজল সকালের ভোগ
দেবার পর সেই তো ছিল
ো কাজ। সৌরভী নয়নবৌ মাছের হেঁসেল তুলত। বাচ্চাদের দুধজাল
সিদ্ধাচালের ভাত মুসুরির ডাল। তা ছাড়া যা কিছু নিরামিষ ব্যঞ্জন সব তো রাঁধতেন সাগরময়ী।
অপূর্ব ভালোবাসত দুধলাউ
, নয়নবৌয়ের
ছেলেরা একটু মিষ্টির ভক্ত ছিল। শেষ পাতে একটুখানি পায়েস কি নারকেল সন্দেশ পেলে
খুশি। কে ভালোবাসত তিলবাটা দিয়ে চালতার টক
? কে যেন ? তার নিজের ছেলেরা তো সকলেই ভালোবাসত
মায়ের রান্না
, যার
যেটা বেশি পছন্দ। সারা গ্রীস্মকালটা তার হাতের কাসন্দ ছাড়া মুখে ভাত উঠিত না কারুর
আর নাতিনাতনিগুলি ? নিজের ভাত তো তিনগ্রাস, কিন্তু রাঁধতেন পিতলের বোগনোটার গলা
পর্যন্ত। সবকটি নিজেদের মাছখাওয়া জামাকাপড় ছেড়ে দরজার গোড়ায় গোলা হয়ে বসত
হাত বাড়িয়ে । এক একটি ব্যঞ্জনে ভাত মেখে নিজে এক গ্রাস মুখে দেওয়া আর বাকি
সবটুকু ওই এক একটি হাতে এক-একটি দলা। তাই কে আগে পাবে তার জন্য চাপা ঠেলা ঠেলি
নিজেদের মধ্যে।
কখন থেকে যে ধীরে ধীরে খালি হতে শুরু করল বাড়িঘর। অথচ
সংসার বাড়লে যেন জায়গা অকুলান না হয়। এইজন্যই না বড় জামাইয়ের পরামর্শে এত বড়
দোতলা তুলেছিল বড়খোকা মেজখোকা। হঠাৎ কি একটা অস্বস্তি হল সাগরময়ীর
, কি একটা ঠেলে উঠতে চাইল বুকের মধ্যে
থেকে। হ্যা মনে আছে টুকরো টুকরো কতো কথা
একবার কবে দুই নাতনি এসেছিল
নিজেদের ছেলেমেয়ে নিয়ে। তখনও বসে নিজে রান্না করতে পারতেন। কেবল তো নিজের আর
রাধুর
কীই বা রান্না! ওরা আসতে কতদিন পর
অনেক সময় ধরে ছেচকি ঘণ্ট তিলনারকেল বাটা করেছিলেন। খেতে বসে বড় খুশিমনে
ডেকেছিলেন পুতিনদের আর তারা এ মাগো
, তোমার এটো ওই চটকানো ভাত খাবো?
রাধু বকেছিল, কইছি না, দিনকাল
বদলাইছে। বোঝ না সোজ না
,ঝামেলা
পাকাও-
ঝামেলা তো পাকাতে চাননি। হ্যা মনে কষ্ট তো হয়েই ছিল।
কিন্তু গোপাল জানে কারো ওপর রাগ হয়নি তাঁর। রাধু আগেও বকেছিল
, এই যে শরীর পাত কইরা বড়ি আমসত্ত্ব
কাসিন্দ করতে বারণ করি
, কানে
লাও না
, এইগুলি খাইবো ক্যাডা ?
ক্যান আলাদা আলাদা শিশিতে যে রাখছি, সকলরে পাঠায়া দিবি এটু এটু কইরা।
কেমন ভাল খাইত সকলেহ
পাঠায়া
দিমু
, কই পাঠামু? বিজয়া থাকে আমেরিকায়, তার পোলার কাছে। সর্ব দিল্লিতেতার
বৌ মেমসাহেব
,
বড়বৌমা
বিছানায়
, নিধুর পোলাপান এইসব খায়
না। আর দুঃস্থ অম্বলের রুগী। আমেদাবাদ
, জম্মু, হায়দ্রাবাদএই সকল জায়গা কি কাছে যে পাঠামু?
নিধুর বড় ছেলে, মেজছেলের বিয়ে হয়ে গেছে। মেয়ের
ঘরের নাতিরাও বোধহয় এতদিনে বড় হল। কত বছর দেখেননি নিধুকে। মধু যাবার পর ওই সবার
ছোট ছিল। মায়ের কোল ঘেঁষে ছাড়া শুতো না কত বড় বয়স পর্যন্ত। অনেককাল হল নিধুর সব
সংসারসুদ্ধ কলকাতায়। ওর মুখটাও মনে পড়ে না স্পষ্ট। একবার সেখানে মাসখানেকের জন্য
গোপালসুদ্ধ সাগরময়ীকে রেখে আসবার কথা হয়েছিল। সে অনেকদিন
,তখনও নিধুর বড় ছেলে গৌতমের ঘরে
নাতি-নাতিন হয়নি। নাকি হয়েছিল
? ঠিক
মনে পড়ে না। কিন্তু তখনও রাধুর কলেজে কাজ ছিল। সেই কাজের জন্যই বুঝি একমাস বিলেত
যাবার কথা ছিল রাধুর। গৌতম কি নিধুর বড় ছেলে
? নাকি নিধুর উপরে বিধু-তার ? ভাবতে গেলে মাথা অস্থির করে, আরও বেশি মনে পড়ে না। কিন্তু সেবার
থাকা হয়নি কলকাতায়। নিধুর বৌ প্রথমদিনই বলল
,মা থাকলে তো খুবই ভালো হত। কিন্তু
মায়ের আবার যে আচার বিচার। আমার তো একটাই রান্নাঘর-
বাক্সের মত কিরকম যেন ওদের উনোন। ঘুটে কয়লা কিছু লাগে
না। সেগুলো টেবিলের ওপর বসিয়ে রান্না করে দেখেছিলেন সাগরময়ী। ভাতের হাঁড়ি
টেবিলে রেখে খায় আবার সেই টেবিলেই রেখে কাগজ পড়ে। তপতী ঠিক বলেছিল
, তিনি পারবেন না। তাঁর গোপালকে
রাখবার আলাদা ঘর চাই
, তিনি
নিজে হাতে শুদ্ধমত রান্না করে ভোগ দেন
, নিজে খান। নিধুরা চারজন মানুষ, চারটে ঘর। বন্ধু-বান্ধবরা আসে।
তাছাড়া
, মনে আছে নিধুর ছোট মেয়ে
বলেছিল
, ঘরের মধ্যে গোপালকে নিয়ে
থাকবে
, ঘরের মধ্যে রান্না করবে
বাসন ধোবে ঠাকুমা
, সবাই
দেখলে কি বলবে
?
তার সামনে বলেনি অবশ্য। কিন্তু তপতীর সাজানো ঘরদুয়োর বুঝেছিলেন
সাগরময়ী
,সত্যিই তো তার অনেক
আচারবিচার। কিন্ত সেই ছাব্বিশ-সাতাশ বছর বয়েস থেকে তিনি যে এই আচার বিচারই জেনে
এসেছেন কেবল। সেই আচার বিচার দিয়েই শোক ভোলা
,তাই দিয়েই গোপালকে ধরে রাখা। তখন
কি কেউ বলেছিল। অন্য কিছু করার কথা
? বরং যে যেখানে ছিল ওই আচার মেনে চলা,অতো কঠিন নিয়ম করার জন্যই তো ভালো
বলেছে
রাধু কি খাটে পাশ ফিরল? অন্ধকারের কি আর শেষ হবে না। আজ? তুলসির গন্ধ আসে নাকি? নাঃ এত ওপরে কোথায় তুলসির গন্ধ ? বড় ইচ্ছা হয় উঠে স্নান করতে।
উঠোনের অন্ধকারে কাপড় মেলে দিয়ে গাছগুলি হাতে করে ধরতে। কত দুপুর হলে তবে ওই
বারান্দায় জলচৌকি বসিয়ে গরমজলে স্নান করাবে সেই মেয়েটা। সে কোথা থেকে যেন আসে
, বিকেল হলে চলে যায়।
এত জলতেষ্টা কেন পাচ্ছে? যেন সমস্ত শরীরে জলতেষ্টা পায়। মা
মাগো
, হঠাৎ নিজেরই কিরকম অবাক
লাগে সাগরময়ীর। গোপালের বদলে মায়ের নাম কেন মুখে এল
? মনে আছে মায়ের মুখ ? মনে আছে নাকি মাকে? যার নাম ছিল স্বর্ণময়ী ? কিছু কি মনে পড়ে ঘোমটায় ঢাকা সেই
মুখের তের বছর বয়সের পর যে মুখ আর দেখেননি
? কবে নীলাচলে সমুদ্র দেখে এসে যে মা
মেয়ের নাম রেখে ছিল সাগর
,তার
কথা
?
খাটটা হালকা দুলে ওঠে। মশারি তার আপনি জায়গায় চার
খুঁটে বাঁধা রয়ে যায়
, তার
নীচ থেকে ভেসে খোলা জানলা দিয়ে আস্তে আস্তে উড়ে যায় খাট। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে
এসে ঘন বেগুনিরঙের প্রজাপতিরা সাদা চাদর ওড়ানো বিছানা বয়ে নিয়ে চলে। বাতাবি
ফুলের গন্ধ কচি তুলসির গন্ধেব সঙ্গে স্বর্ণচাঁপার গন্ধ এসে মিশতে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.