গুয়াদালুপে নেত্তেল’র গল্প : পার্সিফোন

মেক্সিকোর গল্প
অনুবাদ- জয়া চৌধুরী
———————————————————————————-

(নোট–পার্সিফোন= গ্রীক পুরাণ অনুসারে দেবতা জিউস ও কৃষির দেবী দিমিতিরের কন্যা, নরকের রানী।)


———————————————————————————-
ভেতরে ভেতরে একটা প্রশান্তি নিয়ে ঘুম ভাঙল, মনে হল যেন অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে সে। বহুদিনের মধ্যে ওটাই প্রথমবার যখন মাথা যন্ত্রণা হচ্ছিল না। রোববারের সকালটার সদ্ব্যবহার করতে এটা ওকে বিছানা থেকে জলদি টেনে তুলে দিল।
অনেকক্ষণ পরে সে মানুষটার মাকে ফোন করছিল। ওনার শরীর ভাল আছে কি না, বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে ওরকম কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা জলের মত ওসব পরীক্ষানিরীক্ষায় খরচ না করতে। কিন্তু প্রায় পরমুহূর্তেই , মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই খেয়াল করল যে সে একলা শুয়ে নেই, পাশে একটা মেয়েও বিছানার ওপাশে শুয়ে আছে মানুষটার সঙ্গে। তার দিকে পিঠ করে শুয়ে আছে, বালিশে মুখ লুকোনো, উলঙ্গ শরীর, পা দুটো ঝুলছে বিছানা থেকে। একটা জিনিষই বুঝতে পারল যে মেয়েটাকে সে চেনে না। চিন্তাটা গড়াতে না দিয়ে ঘর থেকে চিৎকার করে বেরিয়ে গেল।
প্যাসেজে একবার, অভিযোগ পালটা অভিযোগে ক্রুদ্ধ বেড়ালীর মত নানারকম প্রশ্ন ওর ওপরে আছড়ে পড়ল। কোনরকমে আলুথালু হয়ে প্যাসেজে হেঁটে এল, দরজার কাছে পড়ে থাকা খবরের কাগজটা তুলে নিল হাতে। কাগজটা না খুলেই রান্নাঘরের টেবিলের ওপর ফেলে রাখার আগে তারিখ আর শিরোনামগুলোয় চোখ বুলাল । সম্ভাব্য সবচেয়ে ভাল কাজ যা করতে পারে ও এখন তা হল শান্ত হতে। তারপর এককাপ কফি বানাতে, ঝুড়িতে পড়ে থাকা একটু শক্ত হয়ে যাওয়া রুটির ক’টুকরো কামড় দিতে। তারপর ওর শেষ কাজগুলোর কথা মনে করা। এরপর রেগে না গিয়ে মানুষটার বাবামায়ের বাড়িতে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় সে টেলিফোনে কি কি কথা বলেছিল সেকথা মনে করা। কোন ফাঁক ছিল না। আগের দিনটাও অব্যাখ্যাত কোন গিঁট ছাড়াই একটা অবিচ্ছিন্ন সুতোর মত ছিল। একটা ম্যাড়ম্যাড়ে রেখার মত, যেখানে তাদের কোন ঘর ছিল না, তার কোন অপ্রতিভতাও নয় অথবা সামান্যতম আলোও দুটো ছোট ছোট বুকের পর্দা সরিয়ে ওর কাছে ঢুকতে সাহস পেত না। 
হয়ত সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজ ছিল মেয়েটাকে ডেকে তোলা। তাকে দোষ দিয়ে কৈফিয়ত চাওয়া। পুরুষটিকে বলা যে কিছুদিন ধরে শরীরটা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। ওকে পরামর্শ দেবার চেষ্টা করা যাতে তাদের দেখা হওয়াটা একটু নতুন করে গড়ে তোলা যায়। কিন্তু সে সাহস পেল না। প্লেটের ওপরে রাখা বান্দেরিইয়া প্যাস্ট্রিটা শেষ না করেই একটা চুরুট ধরাল। তারপর কফির কাপে চুমুক দিয়ে যেতে থাকল। এত তেতো যেন ছোটখাটো একটা শাস্তি। সেই মুহূর্তের অকপটতা অপমানের ওপরে উজ্জ্বলতার একটা ছটা এনে দিল। একটা আলোচনা যেন তার ওপরে মিথ্যে অথবা সিনিসিজমের কোন রেশ রেখে যাওয়া… সর্বোপরি কোন মানুষ নিশ্চয়ই আশা করতে পারে না যে তার ঘুম ভাঙবে অজানা কোন বিছানায়। নিজের মনে বলে উঠল সে সবকিছুরই একটা শৃঙ্খলা থাকে, আর হয়ত সেকারণেই সেটা আবার ঠিক করে নেওয়া সম্ভব। ফোনকল আর অ্যাপয়ন্টমেন্ট গুলো যেগুলো এখন মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে সেগুলো নতুন করে ঠিক করা। যেগুলো এখন হোক কিংবা পরে নম্বরের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোর ছবিগুলো মনে পড়বে, কোনটা বাদ দেবে কোনটাই বা রাখবে। এক মুহূর্তের জন্য বাইরে বাড়িয়ে রাখা কনুইটা দেখল। বালিশের পাশে এলানো রোগা পাতলা হাত। ওর শরীরের স্মৃতি ততক্ষণে আবছা হয়ে এসেছিল, যেন মাত্র এক ঘন্টা আগেই সেটা ঘরে ফেলে রেখে আসেনি। তা যেন বছর পেরিয়ে যাওয়া কোন স্মৃতি। যাই হোক কোনওভাবে মেয়েটার মুখটা চেনা লাগল। ভাবনাটা আসা মাত্রই একটা ভয় জেঁকে বসল। 
বমি ভাবটা আবার ফিরে এল। আর সেইসঙ্গে মাথাধরাটাও। সপ্তাহের পর সপ্তাহ একটা বিশ্রী অস্বাচ্ছন্দ্যবোধ বয়ে বেড়াচ্ছিল সে, কিছু জানতে চায় না। বিশ্বাস করতে চাইছিল না মন। যেন বাস্তব তাকে হঠাত করে অভাবনীয় কোন দিক দেখিয়ে ফেলেছে। কোন মিথ্যে মুখ অথবা যেন পুরুষটি আর তার নেই। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে সকালটাকে দেখল। সামনের বেড়া টপকে একটা বেড়াল হেঁটে আসছে। পাঁচ বছর আগে শুরু হওয়া বিল্ডিংটা হয়েই চলেছে। দৃশ্যটাই ওর দম আটকে দিচ্ছিল। জানে না কবে থেকে অজানা কোনোও জায়গার কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছিল সে। কোন এক স্বর্গে, অন্য কোন গাছপালার ভেতরে অন্য কোন বেড়ায় অন্য কোন বেড়াল নিয়ে। এই ফারাকের ছাপটা এমনকী অফিসেও সঙ্গে সঙ্গে গেছিল। আর এখন এই মেয়েটা। ইচ্ছে করল ঘরে ফিরে যায়। পা টিপে টিপে ঢোকে ঘরে… আর কী সাহস! তার বিছানায় সন্ধ্যে করে ফেলা… কি অসম্ভব অসম্মান। কিন্তু খুব দ্রুত বুঝে গেল সেরকমটা সে পারবে না। কাউকে একটা ঘুষি মারার ক্ষমতাও ওর নেই। নিজেকে ছোবলহীন লাগছিল, অরক্ষিত, অন্যের করুণার ওপর নির্ভরশীল। তারপর সন্দেহ করতে শুরু করল যে মেয়েটা হয়ত তার বিছনায় শোয়ই নি। সন্দেহ দূর করতে গেলে এখনই ঘরটা পাহারা দেওয়া উচিত। আওয়াজ না করে চোরের মত নিজের বাড়ি ঢুকল। সারারাত অপেক্ষা করল চমক পাবার আশায়। মেয়েটা কি একাই কাজ করছিল নাকি ওকে কেউ পাঠিয়েছিল? ঘরের মধ্যে নিশ্চিত কোন প্রমাণ ফেলে যাবে কোন ব্যাগ, বস্তা, একটা ছদ্মবেশ, ঘরের মাঝখানে রাখা টেবিলের ওপরে ফেলে রাখা চাবির বাক্স। গোটা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল কিন্তু লাভ হল না। মাথা যন্ত্রণার কাছে হার মেনে কৌচে ধপ করে বসে পড়ল। কাছের কোন এক জায়গা থেকে সম্ভবত প্রতিবেশী কারো বাড়ি থেকে চার্লসটন সঙ্গীতের আওয়াজ ভেসে আসছিল। প্রায় স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। চোখ বুজল, মনে মনে নিজেকে নাচতে দেখছিল। যে মেয়্যেটাকে তার বিছানায় দেখেছিল দেখল সেও দেখাদেখি নাচছে, নিখুঁত ছন্দে। কোন নির্দেশ পালন করার বদলে মেয়েটা যেন যন্ত্রের কম্পাসকে চালনা করার নির্দেশ দিচ্ছিল। ভাবনাটা এত স্পষ্ট লাগছিল যে ও ভয় পেয়ে গেল। ঠিক করল উঠে পড়বে। তখন টেবিলে বসে ওই নকল ব্রেকফাস্ট খাবার ভান করে মানুষটার জন্য অপেক্ষা করতে রান্নাঘরে ফিরে গেল। সে যখন উঠবে জানবে তার কি করতে হবে। একমাত্র ওই পরিস্থিতিটা ওর অজানা ছিল নইলে তার আগের কারণগুলো সবই তো সে চিনত। সিদ্ধান্ত নিল মানুষটা যদি তাড়াতাড়ি ফিরে না আসে, আন্দাজ করা যাক আসবে, ওকে তাহলে এক প্লেট সিরিয়াল খেতে দেবে। ওকে “তুমি” বলেই সম্বোধন করবে। অন্তত” যতদূর সম্ভব চেষ্টা করবে ওরা। তার কাছে নামটা বলতে ভুলে যাওয়ার গর্হিত কাজটাকে লুকোনোর জন্য মানুষটা সম্ভবত কোনও উপাধি চাপিয়ে দেবে। 
এত চেষ্টা করছিল কেন? প্রায় এগারোটা বাজে। জানলা দিয়ে ঘর ভর্তি রোদ এসে পড়েছে। যদিও খুব চাইছিল সে, তবুও ট্র্যাজেডি বা অপরাধ সম্পর্কে কোন ইঙ্গিত না দিয়ে দেরী করার ব্যাখ্যাও দিতে পারছিল না। তার শরীর সুস্থ আছে কিংবা ঘুম ভালো হয়েছে ইত্যাদি কথা না বলে, কোন কারণ না দেখিয়ে বিছানা থেকে ওভাবে বেরিয়ে আসাটা অবিশ্বাস্য ছিল। কোন ভাবেই একথা অস্বীকার করা যাবে না যে গত রাতে তারা দুজনে একসঙ্গেই শুয়েছিল। ভোরের ঘনিষ্ঠতার সুযোগে কেন সে কারণ না জেনেই বেরিয়ে এল। কোথায় যেন একটা কল্পনা আর নিশ্চিন্ততার মিল ছিল। মন বা শরীর ভালো থাকা না থাকার চেয়েও বুকের দিক থেকে কিংবা পিঠের ওপরে ছড়ানো কালো চুলের দিক থেকেও মেয়েটার প্রতি ওর করুণার অনুভূতি হচ্ছিল। এখন সব সম্ভব ছিল। ভ্যাপসা গরম রোববারের সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য সে ওর গায়ে জামা চড়াতে পারত। নিজেকে জিজ্ঞেস করল ওরা নিজেরা তো অন্তত সুন্দর সময় কাটিয়েছিল। আঙুলের ডগায় লেগে থাকা রাতের চিহ্নটুকু শুঁকতে চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু চামড়ার গন্ধের বদলে একটা ভেজা ভেজা দুর্গন্ধ নাকে এল। বরাবর গন্ধটা নাকে এল তার বমি পায়। এ দফায় যাই হোক সামলাতে পারল নিজেকে। কলঘরে যেতে হল না। তখন ঠিক করল দরজা খুলবে।
ঘরে ঢুকল যখন মেয়েটা তখন আর বিছানায় ছিল না। কিন্তু বাতাসে একটা কিছু তার অস্তিত্বের কথা জানান দিচ্ছিল। বালিশের ওপর এক মুহূর্ত গা এলিয়ে দিল। খারাপ কিছু ঘটবার জন্য অপেক্ষা করছিল। সবার ওপরে নাছোড়বান্দা ওই গা বমি বমি করা দুর্গন্ধটা লেপটে ছিল। যেন রোগা রোগা লোভনীয় দুটো হাত যারা গোটা জীবন ধৈর্য ধরে তার জন্য অপেক্ষা করেছে, এখন ধীরে ধীরে নরম করে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। পুরুষটি বরাবর বিশ্বাস করেছে যে তাকে সে এমন এক জায়গায় নিয়ে চলেছে জায়গাটা খুব একটা দূরে নয়। বরং অবিশ্বাস্যরকম কাছে। এই রোববারের সকালে, একলা সেখানে তাকে নিয়ে আসার জন্য, যেখান থেকে কখনও পুরুষটি আর ফিরে আসে নি।

One thought on “গুয়াদালুপে নেত্তেল’র গল্প : পার্সিফোন

  • March 29, 2018 at 8:04 am
    Permalink

    যা বাবা এখানেই কোন কমেন্ট নেই। অথচ এখান থেকে পড়ার পরেই আমায় হোয়াটস আপে কমেন্ট এল ভাললাগার।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.