নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী’র ভুতের গল্প : পোর্ট্রেট

মধুশ্রীর সঙ্গে আমার যখন আলাপ হয়েছিল, তখন আমি বাইশ বছরের তরুণ। সদ্য কলেজ পাশ করেছি। আঁকার দারুণ ঝোঁক।
বিশেষতঃ পোট্রেট আঁকতেই ভালোবাসি। আর্ট কলেজে আমি তখনও ঢুকিনি। তবে ছোট থেকেই দেখে দেখে ছবি আঁকার ভীষণ আগ্রহ ছিল। মধুশ্রী তখন বাংলা সিনেমা জগতের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। আমার মধুশ্রীকে ভালোলাগতো। ওর অভিনয়, ওর বাচন ভঙ্গী সবই আমাকে আকর্ষণ করতো।

একদিন মধুশ্রীর ছবি দেখে দেখে ওর একটা পোট্রেট এঁকে ফেললাম। আমার সহপাঠী এক বন্ধু তখন চিত্র সাংবাদিক। তার মাধ্যমে আমি মধুশ্রীর ফোন নম্বরও জোগাড় করে ফেললাম। ইচ্ছে ছিল আমার আঁকাটা মধুশ্রীকে উপহার দেব। 
একদিন সাহস করে ফোন করলাম বিখ্যাত অভিনেত্রী মধুশ্রী সিনহাকে। মধুশ্রী আমার সঙ্গে শুধু যে কথা বললো তাই নয়, এমনকী আমার আঁকাটা দেখতেও চাইলো। আমি তো আনন্দে একেবারে অভিভূত হয়ে পড়লাম। এক রবিবারের বিকেলে মধুশ্রীর কথা মতো ওর বাড়িতে গেলাম।
পৌঁছে দেখলাম, ওর কলকাতার বিশাল বাড়িতে মধুশ্রী ছাড়া আর কেউ নেই। ওর সেক্রেটারী কী এক দরকারে ওর স্বামীর সঙ্গে কোথায় যেন গেছে। বাড়িতে সবসময়ের চাকরটাকেও মধুশ্রী ছুটি দিয়েছে। আমার আঁকা পোট্রেটটা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে মধুশ্রী বললো,
আমি কি এত গম্ভীর নাকি? বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো। আমি অবাক হয়ে মধুশ্রীকে দেখছিলাম। ঈশ্বরের অপরূপ এক সৃষ্টি! এমন রূপ যে কোনও মানুষের হতে পারে সামনে থেকে না দেখলে বোঝা যায় না। 
বিবশ গলায় বলে উঠলাম, না মানে আপনি দেখছি ছবির থেকেও অনেক বেশি সুন্দর!
আবার প্রবল হাসিতে লুটিয়ে পড়লো মধুশ্রী। বললো,
তাহলে আমার ছবিটা এবার এঁকে ফেলো! আমার বিস্মিত মুখের দিকে চেয়ে তরল গলায় মধুশ্রী আবার বললো, 
আমি কিন্তু তোমাকে বেশি সময় দেব না। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। আমি আবার কোথাও একটানা বসে থাকতে পারিনা। তাছাড়া বিকেলে বাড়িতে থাকলে একটু স্কচ না খেয়ে একদম পারিনা। আমার মাথাটাও খুব ধরেছে। যদি রাজী থাকো, আমি তোমার সামনে এখন একটু ড্রিঙ্ক করবো। আমি আর কী বলবো, হাঁ করে মধুশ্রীকেই দেখছিলাম। 
একটা ক্রিস্টালের সুদৃশ্য গ্লাসে স্কচ ঢেলে আনলো মধুশ্রী। আমি দ্রুত হাতে মধুশ্রীর ছবি আঁকতে লাগলাম।
সেই শুরু। তারপর থেকে প্রায়ই ওর ডাকে ওর বাড়ি যেতে লাগলাম। না গিয়ে থাকতেও পারতাম না। মধুশ্রী আশ্চর্যভাবে আমাকে আকর্ষণ করতো। একটু একটু নেশা করাও ধরলাম। কাহাতক আর বসে বসে দেখা যায়! আমি যেন এক অদৃশ্য চোরাবালির টানে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। 
কয়েক মাসের মধ্যেই আমি ওর অসংখ্য ছবি এঁকেছিলাম। বিভিন্ন ভঙ্গীতে এবং বিভিন্ন ভাবে। সেই ছবিগুলোর মধ্যে অনেকগুলো আবার ন্যুড। হ্যাঁ, এটাও ওরই অনুরোধ ছিল। আমি একেবারে সর্বনাশের অতলে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। দুপুরবেলাতে মাঝে মাঝেই আমরা মিলিত হই। প্রত্যেকবার মিলিত হওয়ার পরেই মধুশ্রী কাঁদতো। 
কেন? আমি তা কোনও দিনই জানতে চাইনি। ওর রূপ দেখে আমি কেমন আচ্ছন্ন হয়ে যেতাম। প্রশ্ন করবো কী! নিজেকেই হারিয়ে ফেলতাম। ওর বয়স তখন আমার চেয়ে বেশ কয়েক বছর বেশি। মনে হয় আঠাশ কি উনত্রিশ হবে, আর আমি মাত্র বাইশ বছরের। মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম মধুশ্রী মনে হয় বিবাহিত জীবনে খুব অসুখী। কী হবে মিছিমিছি প্রশ্ন করে? আমি তখন সুখের নেশায় মশগুল। কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায়? 
মধুশ্রী বিবাহিত, তবুও নিজেকে ওর কাছ থেকে কিছুতেই সরিয়ে আনতে পারলাম না। ওর শোবার ঘরেই আমি আমার আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে যাই। ছবি আঁকা ছাড়াও সেই ঘর আমাদের বহুদিনের মিলনের সাক্ষী হয়ে রইলো। 
একদিন সহসা ঘটলো ছন্দ পতন। হঠাৎ সেইদিন সন্ধ্যাবেলায় মধুশ্রীর স্বামী ফিরে এলেন। আমি তাড়াতাড়ি নিজের আঁকার জিনিস গুছিয়ে বেরিয়ে যেতে গেলাম। মধুশ্রীর স্বামী আমার ঘাড়ে হাত রাখলেন। তার চেহারা পালোয়ানদের মতো। চোখগুলো লাল। 
তাহলে আপনিই মধুর নতুন শিকার?
কী যা তা বলছেন!
যা তা নয়। আপনাকেও দুদিন বাদেই মধু ছুঁড়ে ফেলে দেবে। নতুন নতুন পুরুষের শরীর ছাড়া ওর চলে না। আমাকেও যেমন এখন সরিয়ে দিয়েছে।
আমি ঘাড় থেকে লোকটার হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিতে গেলাম। পারলাম না। কারণ আমিও সেদিন আকন্ঠ স্কচ খেয়ে ছিলাম। আমার পা টলছিল। ভদ্রলোক আমাকে একটানে শূন্যে উঠিয়ে সামনে ছুঁড়ে দিলেন। মধুশ্রী হাহাকার করে উঠলো। আমি ঘরের দরজার চৌকাঠের উপর উপুড় হয়ে পড়ে গেলাম। মাথা ফেটে গেছিল। রক্ত পড়ছিল হু হু করে। আমার হাতে পোট্রেটের কার্টিজগুলো ধরা ছিল। সেখানে মধুশ্রীর অনেকগুলো ন্যুড বডির স্কেচ করা আছে। ধরা পড়ে গেলে চরম বিপদ! আমি আর দাঁড়ালাম না। তখনই ওই পায়ে ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। তারপর থেকে আজ দীর্ঘ কুড়ি বছর মধুশ্রীর বাড়িতে যাইনি। মধুশ্রীও আর ডাকেনি।
আমি এখনকার একজন প্রতিষ্ঠিত চিত্রশিল্পী। হঠাৎ আজ সকালবেলা আমার মোবাইলে একটা ফোন এল। মধুশ্রীর ফোন। আমাকে মধুশ্রী ওর বাড়িতে নিমন্ত্রণ করলো। এখন বহু জায়গাতেই নিমন্ত্রণ পাই, তবে মধুশ্রী একজন লেজেন্ড। বছর দশেক আগে হঠাৎ একটা সিনেমার কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় সে ছেড়ে দেয়। ইন্ডাস্ট্রিতে খবর ছিল, মধুশ্রী অসুস্থ। তারপর থেকেই আশ্চর্যভাবে সে সবার চোখের আড়ালে থাকতে শুরু করেছে।
এই দশ বছরে মধুশ্রী একবারও কোনও ভাবেই সেই আড়াল ছেড়ে আর বের হয়নি। কৌতূহলী অনুরাগীরা ভীড় জমিয়েছে তার বাড়ির সামনে। মধুশ্রীর সেক্রেটারী সবিনয়ে তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন। সাংবাদিক থেকে উঠতি নায়িকা প্রত্যেকেই মধুশ্রীর এই আড়ালে থাকা নিয়ে বাজারে নানা গসিপ ছড়িয়েছে, কিন্তু আসল সত্যিটা যে কী, তা কেউ সঠিক জানে না। আমি কলেজ পাশ করে আর্ট কলেজে ঢুকলাম, এবং যখন আর্টিস্ট হিসেবে বেশ প্রতিষ্ঠা পেলাম, তখন মধুশ্রী অজ্ঞাতবাসে চলে গেছে। আমারও সেই সময় খুব কৌতূহল হয়েছিল। তবে জানার কোনও উপায় ছিল না। আর আজ হঠাৎ মধুশ্রীর বাড়ি থেকেই নিমন্ত্রণ! ভাবতেও আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
যাওয়ার দিন সকালেই হঠাৎ আবার একটা ফোন পেলাম। ফোনের অপর প্রান্তে একজন মহিলার গলা।
হ্যালো কে বলছেন? ও প্রান্ত থেকে একজন চাপা গলায় বললেন,
আমি মধুশ্রী বলছি। আমি অবাক হয়ে গেলাম। মধুশ্রীর কন্ঠস্বর অন্যরকম মনে হলো। আমি নিজে বহুবার তার গলা শুনেছি। তা অত্যন্ত সুলোলিত বললেও কম বলা হবে। আমি বিস্ময় চেপে রাখতে পারলাম না, বললাম,
আপনিই মধুশ্রী ম্যাডাম?
হ্যাঁ আমিই মধুশ্রী। আপনাকে একটু কষ্ট করে আমার বীরভূমের বাড়িতে আসতে হবে। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। বেশিক্ষণ সময় লাগবে না। আপনি দয়া করে এই কষ্টটুকু করলে আমি বাধিত হবো।
আপনি আমাকে ডাকছেন কেন? এতদিন পর? মানে কোনও দরকারে নিশ্চয়, কি প্রয়োজন যদি একবার বলেন!
আপনাকে কয়েকটা দিন আমার বাড়িতে থাকতে হবে। আমার একটি পোট্রেট আঁকতে হবে। এই কাজের জন্য আপনার উপযুক্ত পারিশ্রমিকের চেয়েও বেশি দেব আমি। আপনি কি আগ্রহী?
একমুহূর্ত ভেবে নিলাম আমি। এই মুহূর্তে আমার খুব একটা কাজের চাপ নেই। অর্থ উপার্জনের চেয়েও যেটা আমাকে আকর্ষণ করছে, তা হলো মধুশ্রীর ইতিহাস। এখন কেমন আছে সে? তার সেই ভয়ানক বদ মেজাজী বরের কী খবর? সবটাই জানার জন্য তীব্র কৌতূহল হচ্ছে। মোটমাট এই মধ্য চল্লিশেও মধুশ্রী আমাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করছে। মধুশ্রী আমাকে ফোনে আপনি সম্বোধন করছে? এমন তো আগে ও বলতো না? অবশ্য আমাদের আগের সম্পর্কের উপর এখন দীর্ঘ সময়ের পলি জমেছে। বললাম,
হ্যাঁ আমি যেতে চাই। মধুশ্রীর গলায় সামান্য হাসির রেশ ফুটে উঠলো।
বেশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা গাড়ি আপনার বাড়ির সামনে যাচ্ছে। ওটাতে উঠে পড়বেন। ড্রাইভার আপনাকে আমার বাড়িতে নিয়ে আসবে। তৈরি থাকবেন।
আমি যে গাড়িতে এখন বসে আছি, তা একটা বহু পুরনো অ্যামবাসেডর। গাড়ির রঙ বিবর্ণ এবং গাড়িটিরও হাল সেইরকম। ড্রাইভার আমাকে গাড়িতে তোলার পর একবারও আমার দিকে ফিরে তাকায়নি। আমিও তার মুখ ভালো করে দেখতে পাইনি। তার মুখ জোড়া একটা টুপি। গাড়ি অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে চলেছে। চলার সময় গাড়ির কল কব্জায় এমন লকরঝকর শব্দ হচ্ছে যে, প্রতি মুহূর্তেই আমার মনে হচ্ছে এই গাড়ি এখনই থেমে যাবে, কিন্তু আমাকে ভুল প্রমাণ করে গাড়ি ঘন্টায় প্রায় একশো কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে। তীব্র হাওয়ায় আমার চুল এলোমেলো হয়ে গেল। মাথায় ধুলোবালি কিচকিচ করছে। বাড়ি থেকে যখন বেরিয়েছি, তখন প্রায় দুপুর। এখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। গাড়ি এক ধূ ধূ মাঠের উপর দিয়ে চলেছে। পানাগড় এক্সপ্রেসওয়ে পার হওয়ার পর এমন মাঠ আমি আগে কখনও দেখিনি। ড্রাইভারও একটাও শব্দ করছে না। এত জোরে চললে এতখানি সময়ও লাগার কথা নয়। আমি কোথায় যাচ্ছি, কিছুই বুঝতে পারছি না। কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। বললাম,
আপনার নাম কী?
উত্তর নেই।
আপনার বাড়ি কোথায়?
উত্তর নেই। 
আচ্ছা আমরা কোথায় যাচ্ছি? মানে বীরভূমের কোন জায়গায়?
এবারও উত্তর পেলাম না। পাগল নাকি লোকটা? ওর মালকিনও তো একটা পাগল! নিজেকে হঠাৎ করে সব কিছু থেকে সরিয়ে নিয়েছে! এতবছর পরে হঠাৎ কোন ধ্যাড়ধ্যাড়ে গোবিন্দপুরে আবার দেখা করতে চাইছে। আমার এখানে আসা একদম উচিৎ হয়নি। এই যে শুনছেন?
লোকটার উত্তর না দেওয়াতে, আমার মনে হলো ফোনে একবার গুগল ম্যাপ থেকে লোকেশান সার্চ করি। আমি নেট অন করে লোকেশানের বাটনে ক্লিক করলাম। ফোনের স্ক্রীনে কিছুই দেখতে পেলাম না। নেট কানেকশানও হলো না। আবছা অন্ধকারে সেই অদ্ভুত চালক ঝড়ের বেগে কেবল গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগলো। এরকম ভাবে আরও কিছুক্ষণ চললে আমি হয়তো পাগল হয়ে যেতাম। এখন চারিদিকে গভীর রাত নেমেছে। গাড়িটা একটা প্রবল ঝাঁকুনী দিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। আমি তাকিয়ে দেখলাম একটা বিরাট বড় মাঠের মাঝখানে গাড়ি দাঁড়িয়ে গেছে।
আমি সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। সামনে একটা পুরনো আমলের বিরাট বড় বাড়ি দেখতে পেলাম। বাড়ির ভেতর ম্লান আলো জ্বলছে। চারিদিকে কেবল ঘন এবং জমাট অন্ধকার। কোথাও এতটুকু আলো নেই, এক আপার শান্তিমগ্ন পরিবেশ। কোথাও কোনও জনবসতিও নেই। এই জায়গার নাম কি? বাড়িটা এতক্ষণ দেখতেই পাইনি। আমার এবার কেমন গা ছমছম করে উঠলো।
গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো মধুশ্রী। আমি ওকে দেখে পলক ফেলতেও ভুলে গেলাম। সেই আমার কুড়ি বছর আগের দেখা মধুশ্রী! বয়স এতটুকু ছুঁতেও পারেনি ওকে। আমি আবিষ্টের মতো ওকে দেখে এগিয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটাও সামনের স্পট লাইট জ্বেলে এক নিমেষে কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। ম্লান লালচে আলো গায়ে মেখে আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলো এক অপরূপা অলৌকিক নারী। বয়স যার শরীরে এতটুকু থাবা বসায়নি।
মদির গলায় মধুশ্রী বললো,
এ বাড়িতে এখন কেউ নেই! কেবল আমি আর তুমি! আবার আমাকে তুমি সম্বোধন করছে মধুশ্রী। ও এগিয়ে এসে আমার হাত ধরলো। সে হাত অবিশ্বাস্য ঠাণ্ডা। আমার সমস্ত শরীরে শিহরণ খেলে গেল। আমরা একের পর এক ঘর পেরিয়ে যেতে লাগলাম। ঘর আর লম্বা লম্বা বারান্দা। খড়খড়ি লাগানো জানলা। সব মিলিয়ে বাড়িটাতে কেমন যেন বহুদিনের পুরনো এক আমেজ। বেশিরভাগ ঘরই বন্ধ। কেমন একটা ভ্যাপসা আর গুমোট গন্ধ পাচ্ছিলাম। একতলার গোলকধাঁধায় অনেক্ষণ ঘোরার পর আমরা দোতলায় উঠে এলাম। একী! এ যে নিকষ কালো অন্ধকার! আমি ভয়ার্ত গলায় বললাম আলো জ্বালাওনি কেন?
খিলখিল করে হেসে উঠলো মধুশ্রী। ভয় করছে? আমাকে দেখে তুমি ভয় পেয়েছো?
না, মানে ভয় নয়। তুমি একদম আগের মতোই আছো!
হি হি করে হেসে উঠলো মধুশ্রী। সে হাসি আর থামতেই চায় না। তুমিও তো একই রকম আছো। একদম যেমন তোমাকে কুড়ি বছর আগে দেখেছিলাম, ঠিক তেমন।
আমি? কোথায়? আমার তো চুল পেকেছে, চেহারায় মেদ জমেছে। এই বিয়াল্লিশ বছর বয়সে যেমন হয় গড় বাঙালিদের। বলতে বলতে আমি অন্ধকারে একটা হোঁচট খেলাম।
মধুশ্রী হাসতেই থাকে। তারপর আমাকে একটা ঘরে টানতে টানতে নিয়ে আসে। একমাত্র এই ঘরটাতেই একটা মৃদু আলো জ্বলছে। একটা বিরাট পালঙ্ক আছে ঘর জুড়ে। তাতে ধবধবে সাদা চাদর বিছানো। ঘরের একদিকে একটা ওয়ালকেস। তাতে কারুকার্য করা বেলজিয়ান গ্লাসের আয়না। আয়নার সামনেই মৃদু আলোটা জ্বলছে। আমি ঘরের চারদিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম। ঘরের একপাশে স্ট্যান্ডের উপর একটা আঁকার ক্যানভাসও আছে, এবং তাতে সাদা কার্টিজ লাগিয়ে একেবারে রেডি করা। 
কেমন লাগছে এই ঘর?
অবিশ্বাস্য সুন্দর!
যাক! তোমার পছন্দ হয়েছে তাহলে?
আমি অবাক হয়ে গেলাম। এতদিন পর আমার পছন্দে আর কী যায় আসে? কথাটা মুখে বললাম না। মধুশ্রী আমার কাছে এগিয়ে এল। আমি ওর গায়ের সুগন্ধ পাচ্ছিলাম। ও বলতে লাগলো,
আমি অনেকদিন ধরে কল্পনায় এই ঘর সাজিয়েছি। আজ তোমাকেও এখানে ডেকে নিলাম। আমি জানি তুমি এখনও বিয়ে করোনি। কেন বিয়ে করলে না রূপঙ্কর?
আমি তোতলাতে থাকি। আমি বিয়ে করিনি, কারণ আমি কাউকে ঠকাতে চাইনি। মধুশ্রীই আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ নারী। তবে মুখ ফুটে সে কথা ওকে আর বলতে পারলাম না। বললাম,
এতদিন পরে ওসব কথা বাদ দাও।
তখন থেকে শুধু এতদিন এতদিন করে যাচ্ছ কেন বলো তো? দেখছো না কিছুই বদলায়নি! না তুমি, না আমি। আমরা দুজনেই একই আছি রূপঙ্কর! এসো! তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না তো, নিজের চোখেই দেখে যাও।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি সামনের বেলজিয়ান গ্লাসের দিকে। কী অপূর্ব দেখতে লাগছে আমাকে! ঠিক যেন রাজপুত্র! আর মধুশ্রীও তেমন সুন্দর। আমি পলক ফেলতেও ভুলে গেলাম। মধুশ্রী আমাকে জড়িয়ে ধরলো। গাঢ় গলায় বললো,
আর অপেক্ষা করতে পারছি না। এবার এসো! মধুশ্রীর চোখে সন্মোহন। ও আমাকে জাপটে ধরে বিছানায় নিয়ে এল। দুধ সাদা বিছানার চাদর। সামনে অপরূপা কামনার্ত নারী, তবুও কেমন সব বেসুরো আর ভয়াবহ লাগছে আমার। মধুশ্রী এ কোথায় নিয়ে এসেছে আমাকে? কী চায়? কেবল আমার শরীর? আমার গা গুলিয়ে উঠলো। 
নাও ছবি আঁকো, আমার ছবি আঁকো তুমি। এটাই এখন তোমার একমাত্র কাজ। মধুশ্রী ওর শরীর থেকে পোশাক খুলে ফেলতে লাগলো। হঠাৎ সব কিছু বদলে যেতে লাগলো। এ আমি কী দেখছি?
একী! বীভৎস দৃশ্য! আমি শিউরে উঠলাম। মধুশ্রীর সমস্ত শরীরে অসংখ্য দগদগে ক্ষত। পুড়ে শরীটা একেবারে যেন ঝলসে গেছে। মুখের মধ্যে চোখ দুটো একেবারে নেই। গলে গেছে। আমি চিৎকার করে উঠলাম বাঁচাও! বাঁচাও! ওকে সরিয়ে কোনও রকমে উঠে দৌড়াতে শুরু করলাম। সাপের মতো হিসহিসে গলায় চেঁচিয়ে উঠলো মধুশ্রী,
কোথায় যাবে? এখান থেকে তোমারও মুক্তি নেই। যেমন আজও আমারও মুক্তি হয়নি। আমার নাম যশ সহ্য করতে পারলো না আমার বর। একদিন আমার সেক্রেটারীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমার স্বামী আমার সমস্ত শরীরে অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছিল। আমি বাঁচার জন্য সেদিন তীব্র চীৎকার করেছিলাম। কেউ আমাকে এতটুকুও সাহায্য করেনি বরং আমার সেক্রেটারী এসে আমার পোড়া ঝলসানো মুখের ভেতর সেদিন কাপড় গুঁজে দিয়েছিল, যাতে আওয়াজ বাইরে না যায়। আমি সারাদিন অসহ্য কষ্ট পেয়ে রাতের দিকে মারা গেলাম। 
তারপর রাতারাতি আমার শরীরটা আমারই গাড়িতে একটা বাক্স বন্দী করে আমার একান্ত অনুগত ড্রাইভার শিবুকে দিয়ে বীরভূমে আমার পৈতৃক বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। রাস্তায় গাড়িতে আগুন লেগে গেল। আমার দেহ সহ শিবু এবং আমার গাড়িটাও পুড়ে ঝলসে গেল। ওরা গাড়িতে কী সব গণ্ডগোল করে রেখেছিল।
তারপর ওরা রটিয়ে দিয়েছিল আমি আর কারুর সঙ্গে দেখা করতে চাই না। আচ্ছা! তোমার একবারও মনে হয়নি, যে আমার কোনও বিপদ হতে পারে? আমার পরিবার পরিজন, বাবা মা কেউ বেঁচে নেই বলে কেউ আমার খোঁজটুকুও করেনি। পুলিশও কেস ফাইল না হওয়ায়, কোনও তদন্ত করেনি। তুমি আমার কথা একবারও ভাবোনি কেন বলোতো? যদি তুমি খোঁজ করতে সব কিছু জানাজানি হয়ে যেত। অথচ তুমি একবারও এলে না! 
তোমাকে কিন্তু আমি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তোমার ভালোবাসা পেয়ে আমি ধন্য হয়ে গেছিলাম। আমার বর সব সময় আমাকে শারীরিক নির্যাতন করতো। তোমার কাছেই আমি একমাত্র প্রকৃত ভালোবাসা আর মর্যাদা পেয়েছিলাম। তাই তুমি আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেলেও আমি তোমাকে কোনওদিন ভুলিনি। ভুলতে পারিনি। 
কত বছরের চেষ্টায় মনের সব ভালোলাগা আর কল্পনার মাধুরী মিশিয়ে এই বাসর আমি তোমার জন্য সাজিয়েছি। এতদিনে তুমি আমার কাছে আসার সময় পেলে! একী! তুমি এখনও আমাকে ভয় পাচ্ছো? আমি মৃত মানুষ বলে? তুমিও কি জীবিত নাকি? মনে করে দেখো তো কয়েক দিন আগে ঠিক কী হয়েছিল?
হ্যাঁ আমার এবার মনে পড়ে যাচ্ছে। আমার শরীরটা কয়েকদিন ধরে খুব দুর্বল লাগতো। ডাক্তার চেক আপ করাতে আমার হার্টের অসুখ ধরা পড়েছিল। এক সান্ধ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গিয়ে আমি মাথা ঘুরে পড়েও গেছিলাম। তারপর —– হ্যাঁ, তারপরের কোনও ঘটনা আমার আর মনে পড়ছে না। মনে হয় তারপরেই আমি মধুশ্রীর ফোন পেয়েছিলাম। মধুশ্রী হাসছে,
আমি তোমাকে এখানে তাই তো এবার ডেকে নিলাম। আজ তোমার ভাইপোরা তোমার শ্রাদ্ধের আয়োজন করছে, ওই দেখো!
আমার শরীরটা এবার হালকা হয়ে গেল। আমি ভেসে যেতে লাগলাম অনেক দূরে। দেখতে পেলাম আমার বাড়িতে চলছে শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান, সামনেই আছে আমার একটা স্টিল ফটো, যা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে, আর আমার ফটোতে ঝুলছে একটা টাটকা রজনীগন্ধার মালা।

2 thoughts on “নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তী’র ভুতের গল্প : পোর্ট্রেট

  • September 20, 2018 at 3:25 pm
    Permalink

    খুব ভালো লাগলো। আপনার গল্পের বুনন সত্যিই প্রশংসনীয়।

    Reply
  • September 22, 2018 at 3:51 pm
    Permalink

    অনেক দিন পর পড়লাম দিদি আপনার গল্প। খুব ভালো লাগলো। আমাদের এরকমই উপহার দিতে থাকুন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=