হামিরউদ্দিন মিদ্যার গল্প : জাহানারা বেগমের মুক্তি

জানালার রড ধরে বাইরে তাকাতেই গোরস্থান থেকে ডাক এল–আয়,আয়,আয়। জাহানারা বেগমের মন বলে–যায়,যায়,যায়। মৃত্যুর হাতছানি পেতেই শরীরের জোর বেড়ে গেল। প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে জানালার রড ধরে টান মারল,কিন্তু একটুও নড়ল না।

দুম করে দরজায় লাথি মারল জাহানারা,পেছন ফিরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল দূর্বল শরীরটা। সঁটুরে সঁটুরে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের জিনিসপত্র আছাড় মেরে তছনছ করল,তবুও শান্ত হল না।ঘরের তাকেতে হাতড়াতে লাগল,যদি পাওয়া যায় একশিশি তরল বিষ কিংবা ধারালো ছুরি একখানা!–চোখ বুজে ঘ্যাচ করে গলায় চালিয়ে দিলেই ছটফট করতে করতে নেতিয়ে পড়বে সতেজ দেহটা। কিন্তু ঘরের ভেতর মরার মতো কিছুই রাখেনি। তাই জাহানারা অভিশাপ দেয়–মর মর! তুরা পচে মর!জাহান্নামে যা!
পরনের শাড়িটা খুলে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে পড়ার চেষ্টা করেছিল জাহানারা। ঘরের মধ্যে বাঁধার মতো জায়গা খুঁজে পায়নি। কাঁথা বালিশগুলো টেনেটুনে ঘরের মাঝখানে জড়ো করে,তার উপর চেপে শাড়িটা পাকিয়ে ঢিলের মতো করে ঘরের মধুনির সঙ্গে বাঁধার জন্য যেই ছুড়েছে, অমনি বালিশটা স্যাড়াক করে পিছলে গেল। ধপাস করে পড়ল জাহানারা। কোমর নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে তিনদিন লাগল। সেই থেকে ভুল করেও আর ওই চেষ্টা করেনি। আচ্ছা,মুখে বালিশ চাপা দিয়ে চেষ্টা করে দেখলে হয় না? সেখপাড়ার নিয়ামুলের বোনটাকে তো বালিশ চাপা দিয়েই মেরেছিল শ্বশুরবাড়ির লোকেরা!কথাটা মনে হতেই জাহানারা চিৎ হয়ে শুয়ে দুই হাত দিয়ে মুখে চেপে ধরল বালিশটা। কিছুতেই ছাড়বে না,যতক্ষণ না ছটফট করতে করতে নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চেষ্টা বৃথা হল। দম ফুরিয়ে যেতেই এক ঝটকায় ছুড়ে ফেলল বালিশ। হাঃ হাঃ হাঃ করে প্রাণ ভরে শ্বাস নিল জাহানারা। আঃ কী শান্তি! মরব কেনে খামোকা?–কিন্তু এই ভাবনা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না জাহানারার মনে।
গোরস্থানের প্রাচীরের পাশ দিয়ে যে মোটা পগার,সেই পথে কত মানুষের আনাগোনা। সেখপাড়ার আকবর কাঁধে পলুই নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছে। জাহানারা ডাকল,আকবর! ও আকবর! লক্ষী বাপ আমার শুন এদিকে,দরজাটা একবার খুলে দে বাপ!
আকবর থমকে দাঁড়াল খানিক। তারপর দাঁত ফেড়ে হেসে চলে গেল নিজের গন্তব্যে। পথচলতি মানুষ দেখলেই জাহানারা দরজা খোলার জন্য কাকুতি-মিনতি করে। কেউ তাকে মরার সুযোগ করে দেয় না।তখন জাহানারা বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে। যে করেই হোক তাকে মরতে হবে। মরে মুক্তি চাই জাহানারা। এখন একটাই চিন্তা,সে মরবে।
তাহলে জাহানারা বেগমের হয়েছে কী? এই দুনিয়ায় থাকতে তার এত জ্বালা কীসের? আসলে জাহানারার যা হয়েছে তা কাউকে বোঝাতে পারছে না।বেঁচে থাকার মতো জোনাকি পরিমাণ আলোও খুঁজে পাচ্ছে না সে।যেদিকে তাকায় শুধু নিকষ কালো আঁধার!যা ঘটেছে, সংসারে যা ঘটছে তা মেনে নেওয়ার মতো নয়।মানুষটা বেঁচে থাকলে তো এমন হতনি!মরে যেতেই সংসারে মূল্য হারিয়েছে জাহানারার।কেউ তাকে গ্রাহ্য করে না।মেয়েটা ভাব করে বিয়ে করল,ওই ফেরেব্বাজ ছেলেটাকে।কতবার বলেছি গো,চাল নাই,চুলো নাই ওমন চোর ছ্যাঁচর ছেলের সাথে হেসে হেসে কথা বলিস না।তা আমার কথা কানে লিবেক কেনে!এখন বিয়ে করে শ্বশুরের ভিটেমাটিতে জেঁকে বসেছে। আর নিজের প্যাটের ছেলেটাই কী এমন গুনের!বিয়ে করে ঘরে বউ এনে মাকে পর করল।–ওদের দেখে শুনে জাহানারার পিত্তি ক্ষরে যায়।নিজের মনেই গজর গজর করে।
এখন সুগারের রোগী জাহানারা।যে মানুষটা তিন বেলা তিন থালা ভাত খেয়েছে পেটপুরে,শরীর ছিল ধুমসো মোষের মতো। সেই মানুষ এখন শুকিয়ে পাটকাঠি।ডাক্তারের নির্দেশ দুইকাপ ভাত,আর রাত্রে দুটো রুটি।মানুষ তা খেয়ে থাকতে পারে গা!ভাত-মুড়ি ছাড়া গরীবের আছে কী?আর ক’টা বছরই বা বাঁচব!খেয়ে খেয়েই বা বিদায় লিলাম।–এই ভেবে জাহানারা চুপি চুপি হেসেল ঘরে ঢুকে হাড়িতে হাত ভরে একথালা পান্তাভাত বেড়ে,পেঁয়াজ-লঙ্কা দিয়ে খেতে বসেছে,তো রজিনা দেখতে পেয়ে চিলের মতো ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়েছে মুখের সামনে থেকে।
হ্যাঁ গা,তুই কী খেয়ে খেয়েই শ্যাষ হবি?কতবার বলেছি এতো ভাত খাস না,খাস না,ডাক্তারের নিষেধ আছে।
জাহানারা মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল,হ্যাঁ,শুধু আমার বেলায় নিষেধ, আর তুরা মাগ-ভাতারে থালা থালা গিলবি!
হাবলাপেটির ভালো বলতে নাই গো!খা খা,তবে খেয়ে খেয়েই শ্যাষ হ।
তুরা শ্যাষ হ লো।তুদের প্যাটে পোকা হোক।তুদের ওলাবিবি ধরুক।
সফিকুলের বউটা পোয়াতি। আঁজিরতলায় বসে বঁটি দিয়ে সবজি কুটছিল।বঁটিটা শুইয়ে দিয়ে একবার ঘরের পানে তাকাল।মা মেয়ের গাল পাড়া দেখে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেল তার।সাত সকালে এমন চিলচিৎকার!লোকজন শুনলে কী বলবেক গো!আগুনের উপর পানি ঢালতে সফিকুলের বউ লদর-পদর করে কাছে গেল।
শুনো মা,তুমার ভালোর জন্যেই বলচে।বেশি ভাত খেয়েই তো একবার হাসপাতাল থেকে মরতে মরতে বেঁচে এলে। আবার শুরু করেছ!খেতে মন গেলে আমকে বলবে,হাড়িতে ওইভাবে হাত দাও না।
ওরে আমার হাড়ি ভাতারি লো!আর ঢল করতে হবেকনি তুকে।যা যা,আমার চোখের ছামু থেকে দূর হ তুরা।–বলেই নাকে কান্না জুড়ে দিল জাহানারা।ও আল্লা গো!একি রুগ দিলে তুমি?মুখের ভাতকে কেড়ে নিলে গা!আমাকে নজরে পড়েনি?–উপর আল্লার কাছে জাহানারার অভিযোগ। উপর আল্লা বধির।কথা শোনে না তার।তাই নিজের চেষ্টা নিজেই করে যাচ্ছে জাহানারা।
বাড়িটা গ্রামের শেষ মাথায়,মাঠের ধারে,পাশেই গোরস্থান।রশিদ সেখ যখন এখানে ঘর বেঁধেছিল,তখন গ্রামের মানুষ অবাক হয়েছিল খুব।
একি রশিদ!তুমি মাগ ছেলে লিয়ে ওই ঝোপ জঙ্গলে থাকবে কেমন করে?ঘর বাঁধার আর জায়গা পেলেনি?
রশিদ বলল,তাছাড়া তো আমার ঘর বাঁধার জায়গা নাই।বড়ভাই ভেন্ন হয়ে বাপের ভিটেটা নিল,আমাকেও নিজেরটা বুঝে লিতে হবেক তো।
সবই বুজলাম,তবু ভেবে দেখো।পাশেই গোরস্থান!
মাথার ওপর আল্লা আছে।তেনাকে খুশি রাখলে বালা-মসিবতের হাত থেকে রক্ষা করবেক।
তখনও গোরস্থানটা প্রাচীর দেওয়া হয়নি।ধারে ধারে ছিল তাল-খেজুরগাছের সারি।ভেতরে ঢাউস ঢাউস গাছ।দিনের বেলাতেই আঁধার ঘনিয়ে থাকত।আচমকা এমন করুণ সুরে পেঁচা ডেকে উঠত,পাশ দিয়ে পেরতে জোয়ান মরদেরও পিলে চমকে যেত।গ্রামের ইমাম সাহেবের কাছে পরামর্শ নিয়েছিল রশিদ।তিনি জানান,ডরের কিছু নাই রশিদ ভাই।খারাপ জিনিস গোরস্থানের ধারে-পাশেও ঘেঁষে না। বদ জিন-পরিরা থাকে অনেক দূরে।তবে দৌরাত্ম্য কর না ভাই,একটু মান্য করবে।
ইমাম সাহেবের কাছে আশ্বাস পেয়ে রশিদের বুকটা বেলুনের মতো ফুলে উঠল।আনন্দে গদগদ হয়ে জবাব দিল,না না জি,দৌরাত্ম্য কেনে করব গো!মোসলমান হয়ে গোরস্থানে দৌরাত্ম্য করব,জানে ভয়ডর নাই?
রশিদ সেই থেকেই রোজ ধুপ-মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে আসত গোরস্থানে। এতদিনের অভিজ্ঞতাতেও কোনো খারাপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি।রশিদের ইন্তেকালের পর ওসবের কেউ ধার ধারে না।তাই জাহানারার চিন্তা হয়,যাদের পাশে বসবাস, তারা নিশ্চয়ই রুষ্ট হয়েছে।তাই সংসারে এতো অশান্তি।নিজেই ধুপ-মোমবাতি জ্বালতে চাই জাহানারা।কিন্তু গোরস্থানে মেয়েমানুষের প্রবেশ নিষেধ। 
খাঁ খাঁ দুপুর।বাইরে রোদের তেজে সব কেমন ঝিমিয়ে আছে।থমথমে পরিবেশ। কুলগাছের শুকনো ডালে বসে ঘুঘু ডাকে।ঘুঘুর ঘু,ঘুঘুর ঘু।জাহানারা জানালা দিয়ে চেয়ে আছে।সামনে ধানখেত।আঁকড়গোড়ে,ভাড়ালগোড়ে,জিওলনালা হয়ে অনেকদূর তার বিস্তার।বা পাশ দিয়ে তাকালে প্রাচীরঘেরা গোরস্থান।গাছপালার নীচে ছায়া-শীতল দুনিয়া।মরা মাছের মতো ফ্যাকাসে দুটি চোখ নিয়ে জাহানারা চেয়ে থাকে সেই দুনিয়ার পানে।মৃত্যুর পর তো ওখানেই ঠাঁই।অথচ মানুষ এই সহজ কথাটা বুঝেও বুঝে না।জাহানারার মতে,সব দুনিয়া দুনিয়া করেই শ্যাষ হল গো!
গ্রামের কারও সঙ্গে যদি কখনো ঝগড়া হয়েছে,তো গালি দিত,তুরা নিব্বংশে যা।কব্বরের ভেতর যা।ওই গোরস্থান তুদের গিলে খাক।ভিটেতে ঘুঘু চরুক।–জাহানারার এখন মনে হয়, তাহলে কী কারও অভিশাপ লেগে গেল এই ভিটের ওপর!মানুষটার মরার বয়সই হয়নি গো!অথচ কী এক কাল রুগে ধরল,কেশে কেশে মুখে রক্ত উঠে মরল।বেঁচে থাকতে রুগধরা মানুষটার সঙ্গেই তো দুটো সুখের-দুঃখের কথা হত।কাশতে কাশতে যখন খুব জব্দ হয়ে যেত,কলজে ফাটব ফাটব অবস্থা,তখন যত রাগ ঝেড়ে ফেলত জাহানারার ওপর।শুধুতেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে ঝগড়া লাগত।দড়াদম পিঠে কিল- চাপড় মারত।ভ্যাক করে লাথি মারত জাহানারাকে।এখন একটা ঝগড়া করার,মারার লোকও নাই গো!মানুষটাকে গোরস্থানে গিলে খেলেক।এবার জাহানারার পালা,একে একে মেয়ে,ছেলে,বউ সবাইকে গিলে লিবেক। ভিটেতে ঘুঘু চরবেক।ঘুঘুর ঘু,ঘুঘুর ঘু।
সেই অঘটনটা ঘটার পর থেকেই জাহানারাকে ঘরের ভেতর আটকে রাখে।সেদিন রজিনা,বউমা দুমড়া গোড়েতে গা ধুতে গেছিল।সফিকুল,জামাই ওরা তখনও মাঠ থেকে ফেরেনি। এমন সুযোগ পেয়ে গোরস্থানের পুব কোণের ঢ্যাঙা বটগাছটা ডালপালা দুলিয়ে ডেকেছিল জাহানারাকে,আয়,আয়,আয়।নিমেষে মাথায় কী যে চেপে বসল!জাহানারা সঙ্গে সঙ্গে গোয়ালঘরে ঢুকে একটা দড়ি নিয়ে ছুটে চলে গেল বটগাছটার কাছে।গলায় ফাঁস দিয়ে বেঁধে ঝুলে পড়েছিল।কিন্তু বাধ সাধে মন্ডলপাড়ার রুমজানের ব্যাটা।মাঠ থেকে ঘাস কেটে মাথায় বস্তা নিয়ে ঘর ফিরছিল আয়নাল।প্রচন্ড রোদে আর গরমে মাথা ঝিমঝিম করছিল তার, আর চোখে ঝাপসা দেখছিল।গোরস্থানের কাছাকাছি আসতেই এক তাজ্জব দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।আচমকা দেখে একটা মেয়ে মানুষ হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে এসে প্রাচীরটা উড়ে পেরিয়ে গেল।বাতাসের জোর ঝাপটা লাগল চোখেমুখে।ঘাসের বস্তাটা মাথা থেকে ধপাস করে পড়ে গেল।কাস্তেটা বাগিয়ে ধরে,আয়নালও হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিল।এক ঝাপে প্রাচীর টপকে,তড়াক করে উঠে পড়ল গাছে।ঘ্যাচ করে কেটে দিল দড়িটা। থপাস করে পড়ে গেল সফিকুলের মা।নীচে পড়তেই অজ্ঞান হয়ে গেল জাহানারা।আয়নাল কোঁকিয়ে হাঁক পাড়ল জোরে।সেই ডাক শুনে ছুটে এল মানুষজন। চোখেমুখে পানির ছিঁটা দিতেই জাহানারার জ্ঞান ফিরল।মরণ তখন বটগাছ থেকে গুটগুট করে নেমে,মানুষের পায়ের তলা দিয়ে সুড়ুৎ করে গলে,হামা টেনে টেনে জাহানারার কানের কাছে হাজির হয়ে ফিসফিস করে বলেছিল,আজ হল না,আবার আসব কিন্তু!
সে যাত্রায় জাহানারার সুস্থ হতে সপ্তা খানেক লেগে যায়।কোমরে খেঁচকি লেগেছিল। সেই থেকেই অধিকাংশ সময় তাকে ঘরের ভেতর আটকে রাখে। যখন ঘরে মানুষজন থাকে,তখন দরজা খোলা থাকে।চোখে চোখে রাখে। কিন্তু গা ধুতে যাবার সময়,কিংবা রান্না করার সময়,যখন ঘরের মানুষগুলো নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত,তখন জাহানারাকে কায়দা করে ঘরের ভেতর পুরে দরজায় শিকল তুলে দেয়।সবাই বুঝে গেছে ফাঁকা পেলেই একটা অঘটন ঘটিয়ে দেবে।জাহানারা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলে,আমাকে তুরা কেউ বাঁচাতে লারবি।আমি মরব,নির্ঘাত মরব!
বিকালে পাড়ার মেয়েরা তালাই কাঁথা নিয়ে ঘুরতে আসে।রজিনা,বউমা ওরা সবাই মজলিশ বসায় আঁজিরতলায়।তালাই বুনতে বুনতে,কাঁথা সেলাই করতে করতে চলে নানারকম গল্প। দরজা খোলা থাকে তখন।জাহানারা ওদের কাছে গিয়ে বসতেই কথার প্রসঙ্গ পালটে দেয়।পাড়ার মেয়েরা আর বেশিক্ষণ বসে না,ঘরের কাজ মনে পড়ে যায়।সেজন্য জাহানারা আর বসে না ওদের কাছে। ঘরের ভেতরেই থাকে।একটা কথা বলার মতো মানুষও খুঁজে পায় না।এ পৃথিবীতে জাহানারা বড়ই একা। 
বউমা খালাস হতে গেছিল বাপের ঘরে।এই দুইমাসেও জাহানারা মরতে পারেনি। মরার জন্যে যে সামান্য যোগ্যতার দরকার, সেটুকুও জাহানারাকে দেয়নি আল্লা।বউমা আজ ছেলে কোলে ঘরে ফিরেছে। সফিকুল আনতে গেছিল।
সকাল থেকেই মনটা কেমন উড়ু উড়ু করছে জাহানারার।কী জানি এক দারুন আনন্দ!জানালা দিয়ে চেয়ে দেখে,গোরস্থানের শিরীষ গাছগুলোই কত ফুল ফুটেছে!শিরীষ ফুলের মনমাতানো সুগন্ধটা ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে।প্রাণভরে শ্বাস নিল জাহানারা।আগেও দেখেছে,কিন্তু ভালো লাগেনি। আজ সব কেমন ওলটপালট। হলুদ রঙা পাখিটা এগাছ থেকে ওগাছে ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল,বউ কথা কও,বউ কথা কও।শন শন শব্দ করে বাতাস বইছে ধানখেতের ওপর দিয়ে, সবুজ চিকন পাতাগুলো কোমর দুলিয়ে নাচছে।একটা রঙিন প্রজাপতি ডানা মেলে উড়ে গেল জাহানারার নাক ঘেঁষে।প্রজাপতির ডানার মৃদু বাতাসটুকুও অনুভব করল জাহানারা।
পাড়ার মেয়েরা দল বেঁধে দেখতে আসছে সফিকুলের ব্যাটাকে।দরজাটা খোলা আছে,তবুও জাহানারা বেরয়নি।ঘরের ভেতর একটা জানালা আছে,ফাঁকে তো সেটা নেই!
সফিকুল হঠাৎ জাহানারার পেছনে এসে দাঁড়াল।বলল,কী গো মা!আমার ব্যাটাকে দেখবিনি?
জাহানারার মনটা ভরে উঠল।ছেলেটা এমন করে মা বলে কতদিন যে ডাকেনি!সুড়সুড় করে ঘরের বাইরে বেরল।পিঁড়েতে তালাই বিছিয়ে, নরম কাঁথার ওপর শোয়ানো আছে ফুটফুটে একটা ছেলে।জাহানারা কাছে গিয়ে দাঁড়াল।ড্যাবড্যাব করে চেয়ে দেখল সফিকুলের ব্যাটাকে।সেই চোখ,সেই নাক,মুখের আদলটা একই।মানুষটাই ফিরে এসেছে যেন।
পাড়ার মেয়েরা বলল,একি গো ভাবি!তুমি ঘরের ভেতর ঢুকে বসেছিলে?আর এদিকে যে তুমার নাতি দাদির কোলে চাপার জন্য ছটফট করছে গো! দেখ-অ,দেখ-অ কেমন হাত বাড়াচ্ছে দেখ-অ।
জাহানারা আর আবেগ ধরে রাখতে পারল না।কই দেখি,দেখি।আমার মরদটাকে কোলে লিই।__বলে দুই হাত দিয়ে আলতো করে তুলে নিল কোলে।কী আশ্চর্য!অচেনা মানুষের কোলে চেপেও ছেলেটা কাঁদে না।জাহানারা দোল খাওয়ালো–
ঘু-ঘু-চি
পা-পু-চি।
ছেলে কই?
মাছ ধরতে গেছে।
মাছ কই?
চিলে নিয়েছে।
চিল কই?
ছোঁ-ও-ও– বলে দুই হাত দিয়ে মাথার ওপরে তুলে ধরতেই সফিকুলের ব্যাটা খিলখিল করে হেসে উঠল।সেই হাসিতেই জাহানারা খুঁজে পেল মুক্তির স্বাদ!

13 thoughts on “হামিরউদ্দিন মিদ্যার গল্প : জাহানারা বেগমের মুক্তি

  • October 29, 2018 at 6:00 am
    Permalink

    মিষ্টি একটা সমাপ্তি।

    Reply
  • October 29, 2018 at 6:02 am
    Permalink

    দারুণ! হামির দা গল্পটা আমার খুব ভালো লেগেছে।

    Reply
  • October 29, 2018 at 3:11 pm
    Permalink

    শুরুতে বিষণ্ণতা থাকলেও শেষে ঝিলমিল আনন্দ ভারী! এই তো বাঁচার ছুতো। জীবনই জীবন টানে।খুব সুন্দর বর্ণনা। শেষের সিকোয়েন্সে শিরিষ গাছের ফুল, হলুদ পাখি চোখ ভরে দেখার বর্ণনা যেন জীবনের হাতছানি। দৃশ্যান্তরে সাবলীল যাওয়া আসা ভালো লেগেছে। অভিনন্দন।

    Reply
    • October 30, 2018 at 1:17 am
      Permalink

      ধন্যবাদ আপনাকে,গল্পটি পড়ে এত সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য।

      Reply
  • October 30, 2018 at 4:39 am
    Permalink

    প্রকৃতির স্বাদ নিতে পাড়লেই ভালোলাগে আপন জনদের, বাঁচাতে ইচ্ছাকরে!!!

    Reply
  • October 30, 2018 at 5:09 am
    Permalink

    বেশ ভালো লাগলো। বাংলার গ্রাম, গ্রামের হৃৎস্পন্দন তোমার গল্পে সুন্দরভাবে উঠে আসে। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ , মুস্তাফা সিরাজ, আবুল বাশারের সার্থক উত্তরসূরি হয়ে উঠতে পারো তুমি। অনেক শুভকামনা তোমার জন্য।

    Reply
  • October 30, 2018 at 5:23 pm
    Permalink

    খুব ভালো লিখেছে হামির। আমার আন্তরিক শুভকামনা রইল। এভাবে এগিয়ে যাও হামির। গল্পের জগৎ যেন তোমার নীরব রঙিন পাখনার মৃদু সুরভিত আন্দোলন পেয়ে তৃপ্ত হয়।

    Reply
  • November 1, 2018 at 3:03 pm
    Permalink

    দারুণ একটা সমাপ্তি! মৃত্যুর ঘ্রাণ দিয়ে শুরু হলেও শেষমেশ জীবনকে নতুন করে বাঁচার আশ্বাস পেলো জাহানারা। ভালো লাগলো গল্পটা। নিরন্তর শুভকামনা জানাই লেখককে।

    Reply
  • November 1, 2018 at 7:31 pm
    Permalink

    দারুন।

    Reply
  • November 3, 2018 at 5:33 am
    Permalink

    খুব ভালো লাগল ভাই। বিষন্নতার উঠোন পেরিয়ে শেষে যে আলো জ্বলে উঠল ওখানেই গল্প নতুন মাত্রা পেল।

    Reply
  • November 5, 2018 at 4:19 am
    Permalink

    matir gondho khuje pelam. mon vore gelo.

    Reply
  • November 27, 2018 at 6:07 pm
    Permalink

    দারুন…অনবদ্য

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=