একজন স্বাভাবিক মানুষ

মূল গল্প :  অ্যাডাম ও’ফেলন প্রাইস
অনুবাদ : রঞ্জনা ব্যানার্জী 
———————————————————————-
 লেখক পরিচিতি : অ্যাডাম ও’ফেলন প্রাইসের জন্ম মার্কিন দেশের লস এঞ্জেলসে। বড় হয়েছেন নেদারল্যান্ড, সউদি আরব ও টেনাসিতে।কর্ণেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  MFA ডিগ্রী গ্রহণ করেন। তিনি Narrative Magazine, The Iowa Review, Glimmer Train, EPOCH, The Paris Review পত্রিকায় লেখেন। তার উপন্যাসের নাম The Grand Tour।
———————————————————————-
ওকলাহামাতেই ঝামেলার শুরু। গাড়িটা তীব্রভাবে কাঁপছিল, সাথে পাল্লা দিয়ে চলছিল পাশে বসা মানসনের একটানা আর্তনাদ। মানসন, অ্যালেক্সের পোষা কুকুর। অস্ট্রেলিয়ান শেপার্ড। সব মিলিয়ে অ্যালেক্সের মেজাজ যাচ্ছেতাই খিচড়ে গিয়েছিল। গাড়িটাকে ডানপাশে সরাতে সরাতে ও অবিরাম অভিসম্পাত করছিল সব্বাইকে;  নিজেকে তো বটেই, নর্থ ক্যারোলাইনার সেই পুরোনো গাড়ির দোকানের দু’নম্বরী সেইলসম্যানটাকেও, যে এই ভ্যানটা ওকে গছিয়েছে , এরপর হাইওয়ের এই একলা রাস্তাটা যেখানে গাড়িটা বিগড়ালো, চল্লিশ মাইল দূরে ফেলে আসা সার্ভিস স্টেশনের স্মৃতিকে, এমনকি আটত্রিশ বছর আগে ওকে গর্ভে ধারণ করার জন্যে নিজের  মাকেও ছাড়েনি ও। সমগ্র মানব জাতির পিন্ডি চটকিয়েও ওর রাগ কমছিল না। নিয়তি এবং আকাশের  ওপারে সুতোয় নাচাচ্ছে যে ঈশ্বর, তাঁকেও আভিশাপে ছিবড়ে বানালো। গাড়ির সামনের বনেট থেকে গলগল করে ধোঁয়া বেরুচ্ছিল। খোলা জানালা দিয়ে সেই ধোঁয়া আঁকশির মত পেঁচিয়ে ঢুকছিল ভেতরে। তাড়াহুড়ো করে জানালার কাচ তুলতে গিয়ে এমনই জোরে চাপ দিল যে হাতলটাই খুলে চলে এসেছিল ওর হাতে। গাড়িটা ঝাঁকুনি দিয়ে শেষমেশ থেমেছিল। ইঞ্জিন বন্ধ করেই ও ছুটে ওপাশের দরজা খুলে মানসনকে বার করলো 
আগে। মুক্ত মানসন এক লাফে রাস্তার পাশের ভুট্টাখেতে মিলিয়ে গিয়েছিল! 
মানসনের পেছনে ছুটতে গিয়েও নিজেকে সামলেছিল ও । এই কুকুর এর আগেও বার কয়েক এমন ছুট লাগিয়ে নিজের গরজেই ফিরেছে। ‘তড়বড় নয় আগের কাজ আগে,’ গাড়ির বনেটের কাছে যেতে যেতে নিজেকে স্তোক দিয়েছিল অ্যালেক্স। বনেটটা তুলতেই ভক করে ঝাঁঝাঁলো ধোঁয়া সোজা ঘুষে গিয়েছিল মুখের ভেতরে। মিনিটখানেক লেগেছিল কাশির গমক থামাতে। ইঞ্জিন থেকে আগুনের হল্কা বেরুচ্ছিলো যেন! বিজ্ঞ ম্যাকানিকের মত দু’হাত ছড়িয়ে তাতানো ইঞ্জিনটা জরীপ করছিল অ্যালেক্স;(এই ভঙ্গিটার কোন মানে আছে কি? ও হয়তো ভাবছিলো হাইওয়েতে খোলা বনেটে উবু হওয়া একলা যাত্রী দেখে দয়াপরবশ হয়ে কেউ গাড়ি থামাবে। সে গুড়ে বালি, হাইওয়ে আজ জনযানহীন।) 
সত্যি বলতে কি গাড়ির নাটবল্টুর কিছুই বোঝে না ও; বুঝলে এই রদ্দিমালটা কিনতো না। এমনকি এক্কেবারে আনাড়ি যে কেউই এই গাড়ি কেনার আগে দু’বার ভাবতো। পুদিনা পাতার মত সবুজ রঙের এই ‘ফোর্ড ইকোনোলাইন’ ভ্যানটার সুলভে বিক্রির জন্যে দাম ধরা হয়েছিল মাত্র ৬০০ ডলার! তাও বিক্রি হয়নি! অবশ্য এটা সত্যি যে এমন একটা ভ্যানের প্রয়োজন ছিল ওর। হতে পারে দামটা সাধ্যের মধ্যে হওয়াতেই সাতপাঁচ না ভেবেই টোপটা ও গিলেছিল । তবে ওর দর্শন হলো স্বভাবসিদ্ধ সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা রেখে চলা এবং এ পৃথিবী ওর চলার পথে যে আয়োজন রেখেছে তাকেই প্রাপ্য বলে গ্রহণ করা। অতঃপর যা গ্রহণ করা হ’লো তার ওপর আস্থা রেখে জীবনের সহজ টানেই এগিয়ে যাওয়া। মাঝে মাঝে আজকের মত পরিস্থিতিগুলোতে ওর এই স্বতঃস্ফূর্ত দর্শনের বেশ পরীক্ষা হয়ে যায়! ও এখনো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সেই চতুর সেইলসম্যানের বুড়ো আঙুলের তেজী ওঠানামা। অসীম দ্রুততায় বান্ডিলের নোট গোনা শেষ করে গাড়ির চাবিটা ওকে গছিয়ে দিয়েছিল লোকটা। দোকানের মাথার ওপরে সেই লালকমলা বেলুন পাপেটটা বাতাসে কিলবিল করে পাক খেয়ে খেয়ে হাসছিল তখন। 
ভ্যানের পেছন থেকে জ্যাকেটটা ফের বার করলো ও। অক্টোবরের মাঝামাঝি। দিনের বেলা বেশ গরমই ছিল। এখন সূর্য ঢলছে দ্রুত আর হাওয়াটা ক্রমে ওমধরা বালিশ উলটে দেয়ার মতই তাপ হারাচ্ছে। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই এই বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে হিম নামবে। তখন? ও পকেট থেকে ওয়ালেটটা টেনে বের করলো, ওখানে ঠিক কত আছে ওর জানা। সর্বসাকুল্যে আঠারো ডলার। কোনমতে দুদিনের খাবারের ব্যবস্থা হতে পারে কিন্তু গাড়ি টো করা কিংবা লসএঞ্জেলেসে যাবার মত গ্যাসের খরচ কোনটাই হবে না। লসএঞ্জেলেসেই যাচ্ছে ও। 
ওখানকার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন এক গ্যালারিতে ওর প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। গাড়ির পেছনেই পেইন্টিংগুলো ডাঁই করা। সারা রাস্তায় ‘মম এ্যান্ড পপ’ স্টোরগুলো থেকে ও সুযোগ বুঝে বেশ ক’বার পেট্রোল সরিয়েছে । এইসব পারিবারিক মালিকানার দোকানে সারভ্যাইলেন্স ক্যামেরা থাকে না আর ক্রেতাও প্রায় নেই বললেই চলে। ছবি বিক্রি হলেই ফেরার পথে এই সব চুরির দায় মিটিয়ে দেবার একটা আবছা পরিকল্পনা মাথায় আছে ওর । একটা খামের পেছনে গ্যাস স্টেশন, টাউন, এক্সিট – যে সব জায়গায় ও এই কর্মটি করেছে সেগুলোর নাম টুকে রেখেছে। একটানা গাড়ি চালাতে চালাতে মনে মনে ও কল্পনার সুতো ছেড়েছে! টাকা হাতে পাওয়ার পরে সেইসব বয়েসী আরকানসানের অবাক চেহারা ভেবে ভেতরে পুলক অনুভব করেছিল। একশ ডলারের নোট সাথে ক্ষমা চেয়ে লেখা ছোট চিরকুট; ‘জনাব চুরি নয়,প্রয়োজনই বাধ্য করেছিল। আজ সুদসহ ফেরত দিলাম’। এমন ঘটনায় কারো কারো হয়তো মনুষ্যত্বের ওপর ফের বিশ্বাস ফিরবে হয়তোবা। 
কুকুরটার দেখা নেই এখনো। চোখ সরু করে ধুসর বেগুনি ভুট্টাখেতের ভেতরে নড়াচড়ার আভাস বোঝার চেষ্টা করলো অ্যালেক্স। মঞ্জরীর ভার নিয়ে লম্বা পাতাগুলো বাতাসে কাঁপছে তিরতির। ‘মানসন’! ডাকলো অ্যালেক্স। কোন সাড়া নেই। কুকুরটা যেন স্রেফ ভোজবাজির মত অন্য কোন লোকে মিলিয়ে গেছে। জ্যাকেটের জিপার টেনে রাস্তার ঢাল বেয়ে হুড়মুড়িয়ে নামলো খেতের ধারে। ভুট্টাখেতের এত কাছে এর আগে আসেনি ও। রাস্তার ওপর থেকে ঝাড়গুলোর ঘনসন্নিবেশ দেখে মনে হচ্ছিলো যেন দুর্ভেদ্য দেয়াল কিন্তু কাছে এসে ও দেখতে পেলো সারিগুলোর মাঝে সিঁথি কেটে চলাচলের পথ চলে গেছে সামনে। ওর এই অস্ট্রেলিয়ান শেপার্ডটির জন্য সুগম্য আয়োজন যেন! কাঁদামাটিতে মানসনের ছোট ছোট পায়ের ছাপ ফুটে আছে। সেই চিহ্ন ধরেই অ্যালেক্স এগোলো। 
‘মানসন! মান্নি!’ কোন আওয়াজ নেই কোথাও। হাঁটার সময় অ্যালেক্স মাঝেমাঝেই ঝাড়গুলোর মাথা ভেঙে দিচ্ছিলো। ফেরার সময় এরা পথের নিশানা হিসেবে কাজ করবে। এই ঘন ঝাড়ের ভেতর হারিয়ে যাবার আশঙ্কা অমূলক নয়। আর এই হারানোর মধ্যে কোন অশুভ ভাব না থাকলেও অচেনা কোন রাজ্যে প্রবেশের মত একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ আছে; এবং ঘন্টা খানেকের মধ্যেই সেই রোমাঞ্চকর ভাবনা যে জমে যাবার মতই সত্য হয়ে সামনে দাঁড়াবার পাঁয়তারা করছে তা কেবল ভবিতব্যই জানতো! হঠাৎ সামনে কোথাও মানসনের পরিচিত ঘেউঘেউ ডাক শুনতে পেল ও এবং আওয়াজ লক্ষ্য করে দ্রুত পা চালালো। 
ভুট্টার সারি এসে শেষ হয়েছে পরিপাটি ঘাসের সীমানা দেয়া চৌকোণো খোলা জায়গায়। অ্যালেক্সের চোখের সামনে ক্রমশ এক গৃহস্থ বাড়ির পেছনের বিশাল উঠোন মূর্ত হয়ে উঠলো। উঠোনের এক কোনে একটা চালাঘর। লোয়েস কিংবা ওয়ালমার্টের রেডিমেইড যে চালাঘরগুলো পাওয়া যায় সেগুলোর মতই। পাশেই মর্চে পড়া খুঁটির দুধারে টানটান করে কাপড়শুকানোর দড়ি আঁটকানো। আর অন্য কোনেই বুড়ো ওক গাছের উঁচুতে তাকিয়ে পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে মানসন একনাগাড়ে চেঁচাচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে অ্যালেক্সকে একঝলক দেখলো ও, আর মুহূর্তের জন্যে অ্যালেক্সের মনে হলো মানসন যেন গাছ ছেড়ে মানুষের মত ঘাস মাড়িয়ে দু’পায়ে ঘুরছে। অবশ্য মানসনকে এমন মানুষের অবয়বে কল্পনা করা অ্যালেক্সের জন্যে অস্বাভাবিক কিছু নয়। গ্যালারীর জন্যে আঁকা ছবিগুলোর প্রায় সবকটার বিষয়ই মানসন। কুকুর হিসেবে নয় মানুষের অবয়বে। গুরুতর কিংবা কিম্ভূত বিভিন্ন কাজে একনিষ্ঠ মানসন। সব শেষের ছবিটাতে মানসন পাংক-রক টি শার্র্ট পরে ওক্লি সানগ্লাসে দুচোখ ঢেকে দু চাকার সেগওয়ে স্কুটি চালাচ্ছে আর ওর মাঝের আঙুল দর্শকদের দিকে অশ্লীলভাবে তাক করা। 
‘মানসন, এদিকে এস’! ও ডাক পাড়ে। অমনি ওর কল্পনার সাথে মিল রাখতেই যেন মানসন মানুষের গলায় বলে ওঠে, ‘কে ওখানে?’ না কল্পনা নয় সত্যিকারের খামারিদের মতই গিংগহ্যাম ফ্লানেল আর ওভারঅল পরা বয়স্ক লোকটা বাড়ির পাশ থেকে হঠাৎ উদয় হলো যেন। হাতে সত্যিকারের শটগান, ‘নড়লেই গুলি’, লোকটা এগোতে এগোতে বলে। অ্যালেক্সের দুই হাত আপনাআপনিই কানের পাশে উঠে গেছে ততক্ষণে, ‘আমি বিশ্বাস করছি, আপনাকে’। 
ভদ্রলোক ওর কাছে চলে এসেছে, ‘কুকুরটাকে ডেকে নামাও। ওপরে বেড়াল আছে’। 
‘মানসন!’ অ্যালেক্সের ডাকে মানসন এবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও চার পায়েই হেঁটে আসে কাছে। লোকটা ওর বিশ ফুটের মধ্যেই। ওর পায়ে নাইকি জুতো জোড়ায় অ্যালেক্সের চোখ আঁটকে যায়। বড়ই বেমানান । বন্দুকটা ওর বুক বরাবর তাক করে আছেন তিনি, জোড়া নলের ফাঁকা গহ্বর থেকে নির্দিধায় যে কোন সময় মৃত্যু লাফ দিতে পারে । 
-‘এখানে কী?’ 
-‘আমার কুকুরটার খোঁজে এসেছিলাম’ 
-‘আমার শস্যক্ষেত মাড়িয়েই ঢুকে পড়লে! ’ 
-‘আসলে অতকিছু ভাবিনি’। 
-‘ ঠিক কী কারণে তোমার কথা বিশ্বাস করতে হবে আমাকে?’ 
-‘আমি জানি না। তবে আপনি তো কুকুরটাকে দেখলেনই’– অ্যালেক্সের গলায় অনুযোগ। 
লোকটা বন্দুকের নলটা এবার ওর মাথা বরাবর তোলে। 
-‘আমি আসলেই দুঃখিত। বিশ্বাস করুন কুকুরটার খোঁজেই এসেছিলাম। আমরা কি যেতে পারি?’ অ্যালেক্স 
ভদ্রলোককে মানানোর চেষ্টা করে। 
-‘কোথায়? আবার খেত মাড়িয়েই বেরুবে? 
-‘আমি তেমনই ভাবছি। ওদিকে সোজা গেলেই রাস্তা।’ 
-‘না ওটা মোটেও সোজা নয়। তুমি হারিয়ে যাবে’। 
ওরা দুজনই একইভাবে মিনিটখানেক ওখানে দাঁড়িয়ে রইলো। অ্যালেক্সের হঠাৎ ভীষণ হাসি পেতে লাগলো। 
বুড়োর হাতে বন্দুক, একটু এদিক ওদিক হলেই মাথার খুলি উড়ে যেতে পারে। এই মৃত্যু ভাবনা ওর হাসির ইচ্ছেকে আরও উস্কে দিলো যেন। অ্যালেক্স মুখের তালুতে জিভ ঠেকিয়ে সন্ধ্যার নিভু আলো মাপতে মাপতে ভয়ঙ্কর হাসিটা গলা দিয়ে ঠেলে নামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছিল । ও কি মরতে চায়? মাঝে মাঝে ওর মনে হয় ওর মরে যাওয়াই উচিত। পুর্বাপর ঘটনাগুলোর নিকেশ করলে এমনই মনে হবে। যেমন অবচেতনে ও ঠিকই জানতো যে ঝরঝরে গাড়িটা কোথাও না কোথাও বিগড়াবে কিংবা ভুট্টা খেতের ভেতরে হেঁটে কুকুর খুঁজতে আসার মত বাজে সিদ্ধান্ত নেয়া, সব বাদ দিলেও অন্তত এই মুহূর্তে এই বন্দুকের নলের সামনে ওর কি হাসা উচিত? 
এতদসত্ত্বেও ভুস করে হাসিটা বেরিয়েই পড়লো। লোকটা সাথে সাথে দু’পা এগিয়ে এলো সামনে আর অমনি চেম্বারে গুলি লক হওয়ার সেই কাচাংক আওয়াজ; এক্কেবারে টিভি বা সিনেমার কোন দৃশ্য যেন! ঘটনার আকস্মিকতায় মানসন ওদের চারপাশে চেঁচিয়ে ছুটতে লাগলো। অ্যালেক্স ঘাবড়ে গিয়ে পেছনে সরতেই হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল ঘাসে, ‘মাফ চাই। দয়া করুন। আমি আসলেই একটা বোকাচোঁদা!’ 
-‘নাম কী তোমার?’ 
-‘অ্যালেক্স। অ্যালেক্স পিয়ারসন। আমার সব কেমন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে আমি আসলেই বুঝতে পারছি না আপনি ঠিক কী চান? আপনি চান যে আমি এক্ষুনি চলে যাই। কিন্তু আপনার ক্ষেত মাড়িয়ে যাই সেটা চান না। আমার ভ্যান ওপারে। রাস্তায়। আর কি কোন পথ আছে ওপাশে যাওয়ার?’ 
-‘বাড়ির সামনের রাস্তা ঘুরে সোজা গেলে মাইল খানেক তারপর বামে বাঁক নিলেই ২১৮’। 
-‘কোথায়?’ অ্যালেক্সের সন্ত্রস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে উনি এবার হাল ছেড়ে দেন যেন । বন্দুকের নলটা কোমরের কাছে নামিয়ে জানতে চাইলেন, ‘এদিককার নও?’ 
-‘না নর্থ ক্যারোলাইনা’র। পশ্চিমে যাচ্ছিলাম। এখানে এসেই গাড়িটা বসে গেল’। 
-‘হুম। নর্থ ক্যারোলাইনার কথা জানিনা তবে এদিককার লোকেরা হুট করে কারো বাড়ির সীমানায় ঢুকে পড়ে না’। 
-‘আমি বুঝেছি। আমার শিক্ষা হয়েছে’। 
-‘ঠিক আছে। উঠে পড়। আমিই নিয়ে যাচ্ছি’। 
ভদ্রলোক উঠোন পেরিয়ে সটান গাড়ি বারান্দার দিকে হাঁটতে লাগলেন। আদ্যিকালের একটা পিক-আপ জিরোচ্ছে ওখানে। দেখেই বোঝা যায় এ গাড়ি একদা ওকলাহামার অধিবাসিদের তো বটেই তাদের মালসামালের ভারও বয়ে বেড়িয়েছে। 
ইঞ্জিন চালু করে তিনি জানালা দিয়ে ইশারায় তাড়া লাগালেন অ্যালেক্সকে। 
দ্বিধা ঝেড়ে মানসনকে পেছনে বসিয়ে অ্যালেক্স ওঁর পাশে বসলো। ড্রাইভওয়ে থেকে বের করে বাড়ির সামনেই নুড়ি বেছানো পথে নামলো ট্রাকটা । ভাবলেশহীন মুখে এবার তিনি তাঁর পরিচয় জানালেন, ‘আমি জন’ । 
-‘পরিচিত হয়ে খুশি হলাম’, আবার সেই প্রচন্ড হাসির দমক পাক খেয়ে উঠছে ওর গলা বেয়ে। জানালা 
দিয়ে তাকিয়ে হাসি চাপে ও, ‘আমার অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্যে আবারো আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি’। 
-‘আজকাল কে সাধু কে চোর বোঝা দুস্কর,’ জন তাঁর মাছের মত নির্লিপ্ততায় নিজের সাথেই কথা বলছেন যেন। অ্যালেক্স টের পায় তাঁর এই নির্লিপতায় কোথাও যেন সহানুভূতি ছুঁয়ে আছে। 
-‘আসলেই যা দিন পড়েছে!’ অ্যালেক্স সহজ হবার চেষ্টা করে। 
-‘এই তো সেদিন, ছমাস আগে, বাড়ি ফিরে দেখি যেন ধ্বংসযজ্ঞ! সব নিয়ে গেছে। নেশাখোরদের কাজই হবে’। 
মাইলখানেক যেতেই সেই অপরিসর হাইওয়েতে ঢুকে পড়লো ওরা আর মিনিট দশেকের মধ্যেই উলটো রাস্তায় পুদিনা-পাতার সবুজ নিয়ে ওর অসহায় ভ্যানটা দৃষ্টিসীমার মধ্যে উদয় হলো। খামারী জন বেশ দক্ষতায় ফাঁকা রাস্তার সুযোগে ইউটার্ন নিয়েই এক্কেবারে ভ্যানটার পেছনেই পিক আপটা দাঁড় করালেন। গাড়ি থেকে নেমেই খোলা হুডের কভার তুলে মাথা নুয়ে অ্যালেক্সের ভ্যানটা জরীপ করলেন কিছুক্ষণ। 
-‘ইঞ্জিনের তো দফা শেষ। সব জ্বলে গেছে’। 
অ্যালেক্স মাথা নাড়ে, ‘জানি। কী যে করি!’ 
-‘কী আবার? নতুন গাড়ি কিনতে হবে। এটা আর চলছে না’। 
-‘তা বিলকুল বুঝতে পেরেছি,’ অ্যালেক্স মানসনের খাবারের বাটিটা ভর্তি করে পেছনের টায়ারের কাছে নামিয়ে রাখে। মানসন ওদের দুজনের ওপরে চোখ রেখে আওয়াজ তুলে ওর খাবার চাখতে লাগলো। 
-‘তো কী করবে ভাবছ?’ জন জানতে চাইলেন। 
-‘ভাবছি শহরে পৌঁছানোর জন্যে কাউকে থামিয়ে রাইড নেবো’ 
-‘কোন শহর? এডিসন? এডিসন এখান থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে। আর থামাবে কাকে?’ রাস্তায় চোখ রেখে জানতে চান জন। 
আসলেই তো। অ্যালেক্স কাকে থামাবে? পেট্রোল চুরির পরে নজরদারী এড়াতে ও কোন সোজা পথ নেয়নি। ঘুরে ঘুরে ফাঁকা রাস্তা ধরে চলেছিল। মূল রাস্তা থেকে দেখা যায়না এমন সব লুকোনো বিকল্প রাস্তা ঘুরে গাড়ি চালাচ্ছিল। পথে কেবল একটাই টোল পড়া ঝরঝরে পুরনো গাড়ি পার হয়েছিল, ওটার পেছনের বডিতে মরচে ধরে প্রায় ধ্বসে গেছে। এছাড়া আর কিছুই চোখে পড়েনি। 
-‘এখানেই আজকের রাতটা কাটিয়ে দেব। সকালে ঠান্ডা মাথায় ভাববো। আপনাকে লিফটের জন্যে অশেষ ধন্যবাদ’। 
-‘আসলে আধঘন্টার মধ্যে আমার বাড়িতে রাতের খাবার নিয়ে আমার ভাইজি আসবে, নইলে আমিই 
তোমাকে পৌঁছে দিতাম’। 
-‘এটা কোন বড় ব্যাপার না’, অ্যালেক্স আশ্বস্ত করে। 
ভদ্রলোক সুনসান রাস্তাটার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকেন যেন উনি ওদের দিকে অগ্রসর কোন গাড়ির ছায়া দেখতে পেয়েছেন। ওঁর রোদে পোড়া মুখটা অবশ্য আগের মতই অভিব্যক্তিহীন, মনে হয় যেন কোন তরুণের মুখে বয়েসী লোকের মুখোশ আঁটা। ওর দড়িপাকানো পেশীবহুল পুরু বাহুতে তারুণ্য থেমে আছে। 
-‘এক কাজ কর, তুমি বরং আমার বাড়িতেই আজ রাতটা কাটিয়ে দাও। খাওয়া দাওয়া করে বিশ্রাম 
নাও।কাল কিছু একটা উপায় বের করা যাবে। আমিও একটু খোঁজখবর করি। এদিককার কেউ কাল 
ওদিকে যেতেও পারে, কেউ তোমার সাথে থাকলে গাড়ির ম্যাকানিকেরাও ভরসা করবে’। 
-‘বাহ্‌ ! অসাধারণ! কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব!’ অ্যালেক্স গদগদ হয়। 
ও ভালো করেই জানে যে কেউ সাথে যাক বা না যাক তাতে কিছুই যায় আসে না যদি না কেউ সেখানে 
বিনে পয়সায় গাড়ি বিতরন করে থাকে। যাই হোক তাও তো আজ রাতের ব্যবস্থা হলো! ওর মনে বেশ 
সন্তোষ জাগছে কীভাবে ওর দুর্যোগের স্বতঃস্ফূর্ত সমাধান মিলে যাচ্ছে প্রকৃতির ইচ্ছাতেই! আগামীকালের সূর্য হয়তো নতুন কিছু রেখেছে ওর জন্যে। 
ভ্যান থেকে ওর ব্যাগটা ওঠাতেই জন জানতে চাইলেন , ‘কী ওখানে?’ 
-‘পেইন্টিং’। খামারী এবার ওর দিকে ঘুরে তাকালেন, 
-‘আসলে আমার ছবির প্রদর্শনী আছে ক্যালেফোর্নিয়ায়। আশা করছি কিছু ছবি বিক্রি হবে’। 
ভদ্রলোকের দৃষ্টিতে সেই একই শূন্যতা থেমে আছে যেন। অ্যালেক্সের মনে হলো উনি হয়তো পেইন্টিং কিংবা ক্যালিফোর্নিয়া এ’দুটোর কোনটারই নাম শোনেননি কখনো। 
ঠিক তখনই জন বলে উঠলেন, ‘আমার স্ত্রী ছবি আঁকতেন।বেশির ভাগই প্রকৃতির। মাঠ, ফুল এসব। একই গাঁদাফুল না হলেও কুড়িবার এঁকেছে সে। আমি একই জিনিস এতবার আঁকার কোন যুক্তি বুঝিনি, কিন্তু সে ভালোবাসতো’। 
-‘চমৎকার’! 
-‘হুম’ 
-‘আচ্ছা আপনি চান? আমার পেইন্টিং’? 
-‘কেন’? 
-‘আমার জন্যে আপনি এত করলেন! এই মুহূর্তে আসলে পেইন্টিং ছাড়া আর কিছু নেই আমার কাছে যা দিয়ে আপনার ঋণ শোধ করতে পারি’। 
জন কাঁধ ঝাঁকালেন, মনে হলো এ ব্যবস্থায় তাঁর আপত্তি নেই কোন। অ্যালেক্স ভ্যানের গায়ে ঠেস দিয়ে একটা ছবি বেছে বের করলো জনের জন্যে। স্যুট পরা মানসন । হাতে ব্রিফকেইস। বিষণ্ন মুখে অফিসের বিল্ডিঙে ঢুকছে। এই ছবিটা নির্ঘাত পছন্দ হবে জনের। ছবির কোণে এ্যালেক্সের স্বাক্ষর করা। জন মাথা ঝুঁকিয়ে নিলেন ছবিটা। বললেন, ‘ তোমার কাছে লুকোবো না আসলে এসব ছবিটবি আমার জিনিস নয়’ ।
-ওহ্‌! আপনাকে নিতেই হবে এমন কোনো চাপ নেই কিন্তু! 
-লী এ্যান পছন্দ করতে পারে। 
-লী এ্যান? 
-আমার ভাইঝি। বললাম না লী এ্যান আর ওর ছেলে আসবে সাপারে। 
ট্রাকের পেছনে পেইন্টিংটা ঢুকিয়ে জন দরজা আঁটকে বললেন, ‘গাঁদা ফুলের ঝাড় থেকে এটা ভালো এইটুকুন নিশ্চিত বলতে পারি’। 
রাতের খাবারটা ঠিক তেমনই যেমনটি ওকলাহামার কোন এক খামারী জনের খামারবাড়িতে কল্পনা করা সম্ভব; ফ্রাইড চিকেন, মটরশুঁটি, মাখনে মাখানো আলু, রোল আর আইস-টি। ভাইজি লী এ্যান সব রেঁধেই এনেছে। জানা গেল জনের বউ বছরের শুরুতে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। সেই থেকে জনের নিকট আত্মীয়রা এখনো জনের খেয়াল রাখছে, ওঁর আপত্তি সত্ত্বেও পালা করে প্রায়শই খাবার পাঠাচ্ছে। লী এ্যান বেশ আকর্ষনীয়। মিডওয়েস্টার্নারদের মতই হাসিখুশি সহজ। অবশ্য আসলেই তা কিনা কে জানে? ওর বয়েস পঁয়ত্রিশের এদিকে অথবা পঁচিশের ওপারে যে কোনটাই হতে পারে। তবে ওর চলা ফেরাতে কোথাও একটা ক্লান্তির ভাব জড়িয়ে আছে। ওর পাঁচ বছরের ছেলেটার নাম জেমী, অসম্ভব দুষ্টু! সারাটাক্ষণ মানসনকে এঘর থেকে ও ঘরে তাড়িয়ে বেড়ালো।জন পেইন্টিংটা খুব নিরাসক্তভাবে লী এ্যানের হাতে দিল। লী এ্যান খেতে খেতে রান্নাঘরের সাইডবোর্ডে হেলান দিয়ে রাখা ছবিটাকে বেশ খুঁটিয়ে দেখছিল। 
‘ কী সুন্দর! আচ্ছা এই ভাবনাগুলো কীভাবে পান আপনি?’ 
-‘কী জানি। হয়তো পশুদের ভালোবাসি বলেই এমন কল্পনা করি’। 
-‘আমিও। আমাদের দুটো বেড়াল আর একটা গিনিপিগ আছে?’ 
-‘আমাদের মানে?’ 
-‘আমার আর জেমীর। বিল, ওর বাবা এখনো আফগানিস্তানে। আরও চার মাস থাকবে’। 
জন চোখ সরু করে তাকালেন ভাইঝির দিকে, তারপর অ্যালেক্সের দিকে ফিরে বললেন, ‘বিল পেশায় কন্ট্রাকটার। ওর ইচ্ছে মতই যায় আর আসে’। 
-‘এটা তুমি ঠিক বললে না কাকু। টাকাপয়সা তো ঠিকঠাক পাঠায়’,লী এ্যান আপত্তি জানায়। 
-‘পরের বার যদি ও না বলেকয়ে উধাও হয় তবে’, জন ওর প্লেটের মটরশুটির দিকে ঝুঁকলেন, ‘বন্দুকের পুরো লোড আমি ওর ওপরেই শেষ করবো’। 
লী এ্যান এ্যালেক্সের দিকে ঘুরে প্রসঙ্গ পাল্টায়, 
-‘তো আপনি লস এঞ্জেলেস থেকে আসছেন?’ 
– ‘না। এ্যাশভিল, নর্থ ক্যারোলাইনা। লস এঞ্জেলেসে যাচ্ছি’। 
-‘প্রদর্শনীতে?’ 
-‘ঠিক’ 
– ‘দারুণ! আপনার সাথে কীভাবে ওদের যোগাযোগ হলো?’ 
– ‘আহ্‌ সে এক লম্বা কাহিনী! আমার শহর এ্যাশভিলের একটা গ্যালারি আমার ছবিও মাঝে মাঝে ওদের সংগ্রহশালায় রাখে। গ্যালারীর মালিক মহিলার সাথে ‘ভ্যানিস বিচে’র এই ভদ্রলোকের যোগাযোগ হয়। তিনি আমার ছবি পছন্দ করেন এবং তাঁর গ্যালারীতে আমার আঁকা ছবিগুলো প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে চান । আমার সব পেইন্টিং বাড়ি থেকে বয়ে আনার জন্যেই আমাকে ভ্যানটা কিনতে হয়েছিল’। 
-‘আপনি ওখানে কী কাজ করেন? মানে পেশা।’ 
এটা একটা ভালো প্রশ্ন যার উত্তর অনেকভাবেই দেয়া যায়। অ্যালেক্সের প্রথমেই মনে হলো বলে ‘তেমন কিছু না’। সত্য হলেও এই উত্তর স্বস্তিকর নয় । ‘রঙ করি’ বলা যেতে পারে তবে উপার্জনের কথা ধরলে ‘লোকজনের বাড়িঘর রঙ করি’ বলাটাই অধিক গ্রহণযোগ্য হবে। ও মন থেকে যা বলতে চায় তা হলো, ‘নিজের জীবন যাপন করি’। এই উত্তর কৌতুকের মত শোনালেও এটাই সত্য। সাত বছর আগের ‘বিয়ে’ নামের সেই ভয়ানক ঘটনা, প্রাপ্তবয়েসের আরোপিত দায় এবং দায়িত্বের ভার নিয়ে তলিয়ে যাওয়া সেই সময়ের পরে অ্যালেক্স নিজের গন্ডিকে ক্রমশ গুটিয়েছে। কুকুর মানসন আর নর্থ এ্যাশভিলের জঙ্গলে ওর সেই ছোট্ট বাড়ি, ওর পেইন্টিং আর পেট চালাতে যখন যে কাজ পাওয়া যায় সেই কাজ। এমন জীবন যাপনের প্রেরণা এসেছে অনেক কাল আগে শোনা একটা গান থেকে। এক স্বাভাবিক মানুষের জীবনের চালচিত্র নিয়ে বাঁধা সেই গান। মগজে গেঁথে থাকা সেই মানুষের ছাঁচেই ও ক্রমশ নিজেকে পাল্‌টেছে । 
ওর মতে একজন স্বাভাবিক মানুষ আড়ম্বরহীন জীবন যাপন করবে। সে তার সহজাত প্রবৃত্তির ওপর ভরসা করে এই পৃথিবীতে চলবে ফিরবে, ঝুঁকি নেবে এবং সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে, ঠিক যেভাবে বাঁধনমুক্ত প্রাণিরা জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। খানিক আগে মানসন যেমন ছুট লাগিয়েছিল ভুট্টাখেতের অরণ্যে, ঠিক তেমনই স্বাভাবিক মানুষও যা মন চায় তাই-ই করবে। কারণ ও জানে যা করছে সেটাই সঠিক। কারণ ও স্বাধীন। 
-‘বাড়ি ঘর রঙ করি’, ও শেষমেশ বললো, ‘এবং ছবিও’। 
লী এ্যান মাথা নাড়লো আর অ্যালেক্স ফুলছাপ ব্লাউজের ভেতরে ওর স্তনযুগল দেখতে কেমন হতে পারে তা কল্পনায় আনার চেষ্টা করতে লাগলো । ওর বুকটায় কেমন একটা ঘন ভাব, যেন জোর করে সব টেনেটুনে কেউ ভরে দিয়েছে ভেতরে। বাঁধন খুললেই সকৌতুকে লাফিয়ে নামবে সামনে। 
-‘মুরগীটা দারুণ ছিল’ ও বললো। ফ্রাইড চিকেনটা আসলেই তোফা হয়েছিল। 
-‘ধন্যবাদ’। লী এ্যান জবাব দিল। 
মুরগীতে প্যাপরিকা দেয়া হয়েছিল কি? প্রশ্নটা করার আগেই অন্য ঘর থেকে আর্তনাদ করে উঠলো কেউ। ওরা সবাই একসাথে ছুটে গেল পাশের বসবার ঘরে।সাদামাটা মিউজিয়ামের মত বসার ঘরটার ঠিক মাঝখানে বসে জেমী! নিজের রক্তাক্ত হাতটা চেপে ধরে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। এমনভাবে ফোঁপাচ্ছে যেন নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে ওর। পাশেই মাথা গুঁজে অপরাধীর মত বসে আছে মানসন। 
-‘ মা ন স ন !!!’ চিৎকার করে ডাকলো অ্যালেক্স। 
-‘শপথ করে বলছি আজ পর্যন্ত মানে যতদিন ধরে আমি ওকে জানি,পুষছি, ও কখনো কাউকে কামড়ায়নি’। 
লী এ্যান জেমীর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ওর লাল টুকটুকে মুখটা নিজের কাছে টেনে মৃদু স্বরে একনাগাড়ে ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। জন দ্রুত বেরিয়ে গেল এবং পরক্ষণেই একটুকরো দড়ি হাতে ফিরে এলো। 
-‘ওকে বাঁধো’ 
-‘বাঁধবো?’ 
-‘কাপড় শোকানোর তারের খুঁটিতে বেঁধে এসো।‘ 
-‘আমি জানি না’ 
-‘জানি না মানে? ও এইমাত্র বাচ্চাটাকে কামড়ালো। আমি ওকে আমার বাড়ির ভেতরে দেখতে চাই না। এটা জানুয়ারি না এক রাত বাইরে থাকলে কিচ্ছু হবে না’। 
অ্যালেক্স মানসনকে কলার ধরে সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির পেছনের সেই উঠোনে নিয়ে এলো। কাপড় শোকানোর খুঁটিগুলোর একটাতে ওকে বাঁধলো। মাঠের ওপরের বিশাল আকাশটা গাঢ় কালিতে ঢাকা! মানসন কুঁইকুঁই করে কাঁদছিল। অ্যালেক্স নিচু হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলো। ‘আমি জানি তোমার কোন দোষ নেই। শয়তান বাচ্চাটা তোমাকে লাগাতার জ্বালাচ্ছিল। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসছি’। 
অ্যালেক্স ভেতরে ঢুকে দেখতে পেল লী এ্যান নিচের বড় বাথরুমের টাবে জল ভরে জেমীর বাহুর রক্ত পরিস্কার করছে । হালকা গোলাপি রঙের জল ঘুরে ঘুরে নামছে টাবের ড্রেন দিয়ে। ওর ক্ষতটা এখন দেখা যাচ্ছে। ছোট্ট একটুরো মাংস খন্ড ঝুলছে কনুইয়ের পাশে, দুধারে মানসনের দাঁতের চিহ্ন। বাচ্চাটার কান্না বন্ধ হয়েছে তবে ফোঁপাচ্ছে অথবা ঘটনার আকস্মিকতার ঘোরে আছে। লী এ্যান বললো, ‘আমার মনে হয় আমাদের হাসপাতালে যাওয়া উচিত’। 
‘তাই!!’ 
‘ওর সেলাই লাগবে’ 
‘হায় ঈশ্বর! আমি এই সবকিছুর জন্যে আসলেই দুঃখিত। আমি যাব তোমাদের সাথে। তোমাকে সঙ্গ দেব’। 
‘কোন দরকার নেই যদিও’। কিন্তু অ্যালেক্স ওর দৃষ্টিতে প্রসন্নতার আভাস পড়তে পারলো। জেমীর কনুইয়ে টাওয়েল পেঁচিয়ে লী এ্যান ওকে রান্নাঘরে নিয়ে এলো। ওখানে জন যন্ত্রের মত নিজের প্লেটের আধ খাওয়া খাবার শেষ করছেন তখনো। অ্যালেক্সের মনে হলো খামারীদের স্বভাবই এমন, ওরা খাবারের অপচয় করেনা। লী এ্যান ওর কাকাকে জানালো যে ওরা জেমীকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছে। জন এমনভাবে মাথা নাড়লেন যেন নিজেকেই আশ্বস্ত করছেন। ‘তুমি ফিরে কুকুরটাকে খুলে দিও। আমি ঘুমিয়ে পড়বো’। 
‘ধন্যবাদ আঙ্কেল জন’। 
জন অ্যালেক্সকে অগ্রাহ্য করে বিধ্বস্ত বাচ্চাটাকে বললেন, ‘তুমি ঠিক হয়ে যাবে’। এর পরে লী এ্যানকে বললেন, ‘তোমার শিল্পকর্মটা নিয়ে যাও’। 
লী এ্যান পেইন্টিং টা তুলে নিতে নিতে আবার বললো, ‘কী দারুণ!’ 
হাসপাতালটা এডিসনে। প্রায় এক ঘন্টা লাগলো পৌঁছাতে। ম্যাড়ম্যাড়ে বিষন্ন বিল্ডিংটা যেন স্বাস্থ্যসেবা নয় কর্মচারী আর ফাস্টফুড রেস্তোরাঁ গুলোকে পৃষ্ঠপোষকতার জন্যেই ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। ওয়েটিং রুমে কোন জনমানুষ নেই। কোণে একটা টিভি। তাতে মাঝে মাঝে কমলা আলোয় বেইসবল গেইমের শেষ স্কোর ঝলসে উঠছে। সব শেষ করে যখন ওরা ফেরার পথ ধরলো তখন ঘড়িতে প্রায় রাত এগারো। জেমীকে পাঁচটা সেলাই আর ব্যথানাশক দেয়া হয়েছে। পেছনের সিটে ওর মৃদু নাকডাকার আওয়াজ তালে তালে বাড়ছে কমছে। গাড়িটা অগুন্তি মাঠ পেরিয়ে রাতের নীল অন্ধকারকে ভেদ করে আরও গাঢ় অন্ধকারের দিকে চলছিল বেগে। ওরা কেউই তেমন কথা বলছিল না। লী এ্যানের গা থেকে হাল্কা গোলাপের সৌরভ ওর ঘামের গন্ধকে ছাপিয়ে নাকে আসছে, একটা পরিশ্রান্ত দিন প্রশান্তি নিয়েই শেষ হওয়ার মৃদু রেশ যেন। সুবাসটা এর মালিকের মতই স্নিগ্ধ আর আন্তরিক। লী এ্যান রেডিওতে কোন এক কান্ট্রি মিউজিক স্টেশন ধরেছিল। সেটা মাঝে মাঝে মিলিয়ে যাচ্ছিলো। একের পরে এক অতিনাটকীয় উঁচু সপ্তকের ব্যালাড বাজছিল সেখানে। ‘জেসাস টেইক দ্য হুইল’ 
-‘দুঃখিত’ 
-‘আহা আপনার কোন দোষ নেই’। 
-‘আমারই দোষ। কারণ কুকুরটা আমারই’। 
-‘আমি নিশ্চিত জেমী ওকে বিরক্ত করছিলো। জেমী একদম ওর বাবার মতই’। 
বাক্যের শেষ অংশটুকু রহস্যে রেখেই ও গাড়িটা ডানে ঘোরালো। আর ঠিক সামনেই নুড়িবিছানো পথের শেষ মাথায় সাদা ছোট বাড়িটার সামনে থামলো ওদের গাড়ি। ‘আমি ওকে বিছানায় রেখে আসি তারপর আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি’। 
-‘ঠিক আছে’। 
-‘আসলে আপনি চাইলে যাওয়ার আগে আমরা একটা ড্রিংকও নিতে পারি’। 
-‘ঠিক আছে’।
বাড়িটা আগোছালো। বোঁটকা একটা গন্ধ ঘুরে বেড়াচ্ছে ভেতরে। আলোটা না বাড়িয়েই লী এ্যান খুব দ্রুত ওকে ভেতরে নিয়ে গেল। এরপর ওকে হলে অপেক্ষায় রেখে জেমীকে নিয়ে ভেতরে গেল। অ্যালেক্স যেখানে দাঁড়িয়ে সেই ঘরটার মেঝে লিনোলিয়ামের। দেয়ালে কাঠের প্যানেলে করা। তাতে একটা চোকৌনো বাঁধাই করা সুচিকর্ম। বরফে ঢাকা পাহাড় চূড়ায় সূর্‍্যোদয়ের ছবি। লী এ্যানের কাছে এই ছবিটার কী বিশেষ কোন অর্থ আছে? অ্যালেক্সের কৌতুহল জাগে। এই জায়গাটা কি ওর স্বপ্নের কোন জায়গা যেখানে ও যেতে চেয়েছিল অথবা এও হতে পারে যে ও ওখানে গিয়েছিল কখনো এমন ভাবতে ভালোবাসে? যখন কোন বিষয় অতীত হয় তখন কোথাও থাকার স্মৃতি অথবা কল্পনায় সেই জায়গায় থেকেছিলাম এমন ভাবনায় কোন তফাৎ থাকে কি? থাকে। ও নিজেই নিজের সাথে তর্কে মাতে। হয় কল্পনা কর নতুবা সুখের বিনিময়ে ভ্রমের সাথে সমঝোতা কর। দু বছর আগে ওর শেষ চিকিৎসক বলেছিলেন, ভ্রম সে যতই মধুরই হোক তা দিয়ে কোন ভাবেই জীবন চলে না। 
ছবিটার ক্রমশ বিষন্নতার মেঘ ছড়াচ্ছিলো ওর মনে। লী এ্যান ফিরতেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো ও এবং লী এ্যানের পিছু পিছু পেছনের ঢাকা বারান্দায় এলো ওরা। চারপাশে তারের ঘেরা দেয়া বারান্দাটায় জিনিসপত্রে ঠাঁসা। মনে হচ্ছে জায়গাটা কোন সেকেন্ডহ্যান্ড মার্কেটের বিক্রি শেষে পরে থাকা অবশিষ্ট মালসামালের গুদাম যেন। কী নেই! বাচ্চাদের বাই-সাইকেল, ফ্লোর ল্যাম্প, জং ধরা হিবাচি চুলো, এক বাক্স ছাতাপড়া বই, আরো কত কী! লী এ্যান আবার ভেতরে গেল এবং হাতে মদের বোতল আর গ্লাস নিয়ে এমন হুড়মুড়িয়ে ফিরলো যেন ওর না থাকার সু্যোগে অ্যালেক্স এই ঘুটঘুটে রাতে গায়েব হয়ে যাবে কোথাও। অ্যালেক্সের যাওয়ার মত আদৌ কোন জায়গা আছে কি এই মুহূর্তে? 
ওরা দু জনেই প্রথমে একটা করে বড় গ্লাস পান করলো, একটু পরে আরো এক গ্লাস। অ্যালেক্স লী এ্যানের কাছে জানতে চাইলো ঠিক কতদিন ধরে এই এলাকায় বাস করছে সে। ব্যাক ইয়ার্ডের লাইটের আলো ঘাসের বুকে তেরছা ছায়া ফেলে ধূসর আয়তক্ষেত্র তৈরি করেছে। একভাবে সেদিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলো লী এ্যান। ধীরে ধীরে বললো, ‘আমি আসলে ভীষণ একা’। 
ওরা পরস্পরকে চুমু খেল এবং লী এ্যান ওকে শোবার ঘরে নিয়ে এলো। সামনের ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় দু’জনের আলিঙ্গনাবদ্ধ প্রতিবিম্বের দিকে চোখ গেল অ্যালেক্সের। লী এ্যানের পিঠ জুড়ে বাদামী তিল ছড়ানো, চোখ গেল ওর নিজের দিকেও। ওর হাল্কা নীল চোখ জোড়া ঘন দাড়িভরা মুখের ওপর থেকে ওর দিকে পলক ফেললো। ওর এই দাড়ি ওর সুদর্শন চেহারার আংশিক ঢেকে রেখেছে। আসলে ওর এই সৌম্যদর্শণ মুখটাও নিজের পথে নিজের মতে চলার আরেক সহজ অনুষঙ্গ । সবাই ওর মত করে বাঁচতে পারে না। চাইলেও না। বেশিরভাগ মানুষেরই এমন কৃচ্ছ্রতাসাধনের দম থাকে না। ওর ছেলেবেলার বন্ধুদের প্রায় সবাই চাকরি, সংসার, বাচ্চাকাচ্চার থোর-বড়ি- খাড়ার জীবনে থিতু হয়ে গেছে। ওরা নিজেদের ফেলে আসা বাঁধনছাড়া সেইসব দিনের স্মৃতিচারণ করারও চেষ্টা করে না। 
একসময় ওরা বিছানায় এলো। লী এ্যান ওর ওপরে সওয়ার হলো। অ্যালেক্সের মনে হচ্ছিলো সঙ্গম নয় বিশাল এক প্রাণি যেন তার নিজের একাকীত্বকে প্রতিরোধ করতে আর্তনাদ করছে। ওদের এই শরীরী মিলনকে ওর কাছে একবারও ব্যাভিচার বলে মনে হচ্ছে না বরং মনে হচ্ছে এই ঘটনা লী এ্যানের জন্যে আবশ্যিক ছিল, আর ওর জন্যে সুখকর, যথাযথ এবং সতঃস্ফূর্ত মুহূর্ত। চুড়ান্ত সময়ে ওরা একসঙ্গেই এলো এবং লী এ্যান গড়িয়ে পাশ থেকে নেমে গেলো। অ্যালেক্সকে বিছানাতেই থাকতে বলে ও জেমীকে দেখতে গেল ভেতরের ঘরে। লী এ্যান চলে যেতেই অ্যালেক্সের মনে হলো এটা যেন ওর নিজের জীবন; লী এ্যান ওরই সঙ্গী, ঐ বাচ্চাটা, এই বাড়ি কিংবা গাড়ি সবই ওর। পরক্ষণেই মনে হলো যে জীবন ও যাপন করছে তাতে পদে পদে বিপত্তি হলেও অন্য জীবনের ভাবনাটা ওর জন্যে মোটেও স্বস্তিকর নয়, বলা যায় অসম্ভবই । সারাক্ষণ নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে জীবনযাপন করাটা কোন জীবনই নয়। 
খানিক পরেই লী এ্যান সেই পেইন্টিংটা নিয়ে ফিরলো – মানসন এবং তার ব্রিফকেইস। অ্যালেক্সের ভেতরটা অপরাধবোধে কেঁপে উঠলো, মনে পড়ে গেল দড়িতে বাঁধা মানসন এখনো সেই উঠোনে ওর প্রতিক্ষায়! জানালার পাশে দেয়ালে গাঁথা পেরেকটাতে লী এ্যান ছবিটা ঝুলিয়ে দিল।‘ ব্যস্‌ ’ বিছানায় ফের উঠতে উঠতে বললো ও, ‘ ছবিটা তোমাকে মনে করাবে’। 
-‘কী যেন নাম ওর? বিল? সে জানতে চাইবে না এটা কোত্থেকে এলো?’ 
-‘বিল ফিরছে না আর’। লী এ্যান নিজের দিকটাতে মাথা তুলে আধশোয়া হয়ে বললো। ওর বাহু আর মাথার মাঝখানে বালিশ। ওর কোমল স্তনজোড়ায় একটা অদ্ভুত নির্দোষ ভাব জড়িয়ে আছে ; ওর স্বীকারোক্তির মতই যেন ওরা ওর শরীর থেকে উপচে পড়ছে! 
-‘তুমি কীভাবে জানলে?’ 
-ও এবার যাবার সময় বলে গেছে। ওর একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, বার্লিনে। জার্মানীতে। একটা ‘পরিস্থিতি’—এমনই বলেছে। আমি কাউকে বলিনি। কেবল তোমাকে বললাম’ । 
-‘আমাকে কেন?’ 
-‘কারণ আমি তোমাকে চিনি না।’ 
ওরা চুপচাপ পাশাপাশি শুয়ে রইলো। 
-‘আমিও একসময় বিবাহিত ছিলাম,’ নিস্তব্ধতা কাটিয়ে জানালো অ্যালেক্স । 
-‘তাই? কী হয়েছিল?’ 
-‘ও একটা ফার্মাসির আঞ্চলিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতো। আর আমি আমাদের লগ্নীকরা সম্পত্তিগুলির সংস্কার করে বিক্রি করতাম। এই যেমন এইখানে একটু স্টেইনলেস স্টিল, ঐখানে রান্নাঘরের কাউন্টারে একটা মার্বেল টপ আর সাথে সাথেই প্রায় পরিত্যক্ত কন্ডো বাড়িগুলোর দাম আকাশ ছুঁতো। আমরা দু’জন মিলে ভালই টাকা বানাচ্ছিলাম আর একইসাথে ড্রাগের নেশায়ও ভরপুর মজেছিলাম। ঝগড়ার সময় নিজেদের আমরা ফালাফালা করে ফেলতাম। ভীষণ একটা অন্ধকার সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। শেষমেশ হাসপাতালেই ঠাঁই নিতে হয়। যখন ছাড়া পেলাম; তখন ও নেই আর। সব কিছু নিয়ে চলে গেছে। আমাদের সব সম্পত্তি সম্পদের দখল, সব’। 
-‘আহা! আমি দুঃখিত’ । 
-‘আমি নই। এই ঘটনা আমাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শিখিয়েছি, নিজের মত বাঁচতে শিখিয়েছে। আমি ছবি আঁকি আর আমার কুকুরটাই এখন সঙ্গী ব্যস্‌ এটাই যথেষ্ট’ । 
-‘তাই কি’? 
-‘আমার জন্যে তাইই। জীবন আমাকে স্বতঃস্ফূর্ততায় যেখানেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমি সেখানেই যাচ্ছি নির্ভার’। 
-‘তাতে কাজ হচ্ছে’? 
অ্যালেক্স লী এ্যানকে নিজের দিকে টেনে নিতে নিতে উত্তর দেয়, ‘খারাপ হচ্ছে না’। 
লী এ্যান মৃদু হেসে ওর কাঁধ ছুঁয়ে থাকে। রাস্তা কাঁপিয়ে কোথাও একটা ভারী ট্রাক চলে যায়। অ্যালেক্স জানতে চায়, ‘আমাদের এখন যাওয়া উচিত তাই না?’ 
-‘চল আরেকটুক্ষণ শুয়ে থাকি’। 
-‘তোমার কাকাবাবু আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন’। 
-‘কাকা এতক্ষণে ঘুমিয়ে কাদা। চিন্তা করো না ভোরের আলো ফোটার আগেই তোমাকে পৌঁছে দেব। সামনের রাস্তাটা পেরোলেই ওঁর বাড়ি’। 
-‘কোন দিকে?’ লী এ্যান দেয়ালের দিকে আঙুল তুলে দেখায়, ‘হাইওয়ে ধরে মাইল খানেক গেলেই পৌঁছে যাবে। আমার সঙ্গে আরেকটু থাকো’। 
-‘ঠিক আছে’ 
– ‘ধন্যবাদ’ 
-‘ধন্যবাদ তোমাকেও।’ 
একটু পরেই লী এ্যান নাক ডাকতে লাগলো। ঠিক ওর ছেলের মতই হালকা ঘ্যাঁসঘ্যাঁসে কাঁপন। অ্যালেক্স নিঃশব্দে মেঝে থেকে ওর জামা প্যান্ট তুলে পাশের লিভিং রুমে গিয়ে ঝটপট পরে নিল। চারপাশে দ্রুত চোখ বোলালো ও। রান্নাঘরের দিকে মুখ করা স্বল্প পরিসরের একটা বার। বারের ওপরটা লেমিনেইট করা আর তার ওপরে একটা রূপোলি খাঁচা; ভেতরে কাঠের টুকরোর স্তুপের পাশে চুপটি করে বসে আছে একটা ক্যালিকো গিনিপিগ। খাঁচার ভেতরের বোঁটকা গন্ধ বলে দিচ্ছে বেশ ক’দিন ভেতরটা কেউ পরিস্কার করেনি। অ্যালেক্স আস্তে করে ওর আঙুল খাঁচার ফাঁকে ঢোকালো। ছোট প্রাণিটা হেলেদুলে ওর কাছে এসে ওর আঙুলটা এমনভাবে ধরলো যেন হাত মেলাচ্ছে। 
-‘হ্যালো ছোট্ট মানুষ’ ও ফিসফিসিয়ে বললো। 
অনিচ্ছা সত্ত্বেও আঙুলটা ছাড়িয়ে ঘরের চারপাশটা এবার ভালো করে জরীপ করলো অ্যালেক্স। কোনার বেঞ্চে গুচ্ছের কাগজ গাদা করা, তার ঠিক ওপরের দেয়ালে একটা খাম আটঁকানো। খামটার গায়ে লেবুরঙা আয়তাকার বিদেশী টিকিট আঁটা, তাতে একটা মসজিদের ছবি। খামের ভেতরে ও আঙুল চালালো। নোটের তাড়ায় ওর আঙুল স্পর্শ করার আগেই ও আঁচ করে ফেলেছিল ওখানে কী থাকতে পারে। নোটগুলো আলগোছে তুলে ও নিজের ওয়ালেটে ভরলো। 
বাইরে যেমন ভেবেছিলো ঠিক তেমনই ঠান্ডা হাওয়া। নুড়ির ওপর পা ফেলে সুর ভাজতে ভাজতে ও দ্রুত হাঁটতে লাগলো; ‘জিসাস টেইক দ্য হুইল’। ব্যাপারটা হলো — মানে যে ব্যাপারটা ও ওর এই মুক্ত জীবনাচারণের পরিক্রমায় শিখেছে- তা হলো স্বাভাবিক মানুষ হতে হলে সবসময়ই যে ভালো হতে হবে এমন কোন ধরাবাঁধা নিয়ম নেই । আবার খারাপ অথবা স্বার্থপর হতেই হবে তেমনও নয় – বরং মাঝে মাঝে এধরণের মানুষ বিশাল দয়ালু হতে পারে। গত বছরের কথাই ধরা যাক। ও ওর গাড়িটা দুম করে এক মহিলাকে দিয়ে দিয়েছিল। মহিলার বাবা তখন ফ্লোরিডায় মৃত্যুশয্যায়। ওর মনে হলো গাড়িটা মহিলার জন্যে জরুরী। ওর এই বদান্যতায় মহিলা চূড়ান্ত বিস্ময়ে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। সার কথা এই যে, একজন স্বাভাবিক মানুষ চলবে প্রকৃতির নির্দেশনায় এবং সে চলার পথে সবসময় মনোরম বাঁক নাও থাকতে পারে। তবে এটা নিশ্চিত সামনে অগ্রসরের একটা না একটা পথ ঠিকই মিলে যাবে। এই যেমন ওর ভ্যানের দরকার ছিল প্রকৃতিই ওর সাধ্যসীমার মধ্যে একটা ভ্যানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল যেটা চালিয়ে ও ওকলাহামা পর্যন্ত আসতে পেরেছে। এরপরেই ওর সাহায্যের দরকার ছিল এবং দরকার ছিল টাকার; প্রকৃতিই ওকে জনের মাধ্যেমে লী এ্যানের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে। সেখান থেকে লী এ্যানের বিছানায় এর পরে লী এ্যানের দেয়ালের গায়ে পেরেকে গাঁথা সেই টাকার খামে। ওর কি টাকাটা নেয়া অনুচিত হয়েছে? অবশ্যই নয়। না নিলেই বরং বিশ্বব্রহ্মান্ডের এই জাগতিক স্বতঃস্ফূর্ত নিয়মকে চরম অপমান করা হতো। 
জোরে বাজ পড়লো কোথাও। আকাশ একদম ফকফকা পরিস্কার। সলমাজরির মত তারারা ফুটে আছে আকাশ জুড়ে। হাইওয়ে ধরে প্রায় পনের মিনিট হাঁটার পরে ও দেখতে পেল রাস্তাটা। পাক খেয়ে নেমে গেছে গাছের সারির ভেতরে আর তারই ফাঁক দিয়ে জনের সাদা খামার বাড়িটা উঁকি দিচ্ছে। ও মনে মনে ঠিক করলো মানসনের বাঁধন ছাড়িয়ে ভুট্টাখেতের ভেতর দিয়েই বেরিয়ে যাবে হাইওয়ে ২১৮ তে। প্রকৃতির অনিবার্য নিয়মেই একটা গাড়ি নিশ্চয় থামবে ওদের জন্যে। গাড়ির লোকেরাই ফোন করে হয়তো টো ট্রাকের ব্যবস্থা করবে (অথবা কে জানে একটা টো ট্রাকই হয়তো থামবে ওর সাহায্যে), যেভাবেই হোক ভ্যানটা নিয়ে ও পৌঁছে যাবে এডিসনে, তারপরে আটশো টাকার মধ্যে যেটা সহজ হয় সেটাই করবে । হয় ভ্যানটা ঠিক করাবে অথবা আরেকটা লক্কড়ঝক্কড় পুরোনো গাড়ি কিনে নেবে। আবার কে জানে এই ভ্যানটাই হয়তো ওকে লস এঞ্জেলেসে পৌঁছে দেবে! এসবের একটাও যদি না ঘটে তবুও নতুন দিন শুরুর আগেই কিছু একটা ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়ে যাবেই। এই মুহূর্তে লী এ্যানের দেয়ালে সেই সুঁইয়ের ফোঁড়ে আঁকা পাহাড় চুড়োর সুর্যটার কথা মনে পড়ছে খুব আর মনে পড়ছে উপুড় করে শুয়ে থাকা লী এ্যানের কথা। ও মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় লী এ্যানকে টাকাটা ফেরত দিয়ে দেবে। ২৫% সুদসহ সর্বসাকুল্যে ১০০০ ডলার। লী এ্যান নিশ্চয় মেনে নেবে, যা নিয়েছিল তার চেয়ে বেশিই তো! 
মানসন কাপড়শুকানোর তারের খুঁটির পাশেই মাটিতে শুয়ে আছে। অ্যালেক্স পা টিপে উঠোন পেরিয়ে কুকুরটার কাছে গেল। ‘মান্নি’! ফিস্‌ফিসিয়ে ডাকলো। কুকুরটা নিথর পড়ে আছে। ও নিচু হয়ে হাত দিয়ে ঝাঁকাতে গিয়েই ওর হাত ভিজে কালো দেখাতে লাগলো। দ্বিতীয়বার ঝাঁকুনি দিতে গিয়েই ও টের পেলো মানসনের মাংস খুলে বুকের পাঁজর যেন রাতের আকাশের দিকে উন্মুখ তাকিয়ে! ওর বুক ফাটা আর্তনাদ চাপা পড়ে গেল শটগানের গর্জনে এবং ওর এলোমেলো ভাবনাগুলোও নিমেষে মুছে গেল মুখের পাশ ঘেষে ছুটে যাওয়া এক ঝাঁক গুলির তীব্র যন্ত্রণায়। ও এক পা মুড়ে পড়ে গেল ওর মৃত বন্ধুর পাশে। নিমেষেই সারা পৃথিবী যেন স্তব্ধ হয়ে মিলিয়ে গেল শূন্যে! কিন্তু পরক্ষণেই বন্দুকের সেই ‘কাচাংক’ আওয়াজ ওকে ফের ফেরালো প্রাণে, হুড়মুড় করে ও উঠোন পেরিয়ে ভুট্টার ঘনঝাড়ের ভেতর দিয়েই ছুটতে লাগালো। 
কেউ কোথাও জেগে নেই কেবল ওর নিঃশ্বাসের আওয়াজ নিয়ে ভুট্টার লম্বা পাতাগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে প্রাণপণ ছুটছিলো ও। ছেড়া পাতাগুলোও ঝাপটা দিচ্ছিলো ওর চোখে মুখে। রক্তের ধারা ওর গাল বেয়ে কন্ঠা পেরিয়ে বগলের নিচ দিয়ে টুপটাপ ঝরছিল। মানসনের জন্যে ওর আকাশ ফাটিয়ে চেঁচাতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু ও জানে ওকে অনুসরণ করছে কেউ । পাতার খস খস আওয়াজ কানে আসছে ভেসে। জন হয়তো ভাববে ও যেভাবে হোক গাড়ির দিকেই যাবে এবং গাড়ির ভেতরে নিজেকে বন্দি করে রাখবে অথবা ফোন থাকলে ফোনে কারো সাহায্য চাইবে, অতএব গাড়ির দিকে নয়। ও ধাঁ করে বামে দিকপরিবর্তন করলো এবং আরও অসংখ্য সারি সারি ভুট্টার ঝাড় পেরিয়ে অতঃপর ওর অবসন্ন শরীরটা ধপাস করে ঠান্ডা মাটিতেই আশ্রয় নিল যেন। 
ও বুক ভরে শ্বাস নিল বেশ ক’বার, ওর মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো ছুটছে। নিজেকে শান্ত করে সব প্রথম থেকে ভাববার চেষ্টা করলো ও। মিনিট দুয়েক পরে ঘটনাগুলো পরপর সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে একটা মানে তৈরি করছে। ও মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছে – লী এ্যানের ঘুম চটে গেছে, লী এ্যান দেখছে অ্যালেক্স নেই পাশে। লিভিং রুমে গিয়েই টের পেল দেয়ালে আটকানো টাকার খামটা ফাঁকা। খামারী জনের ঘুম চটে গেল। লী এ্যানের ফোন! ওভারঅল গায়ে চাপিয়ে , সেই নাইকি জুতো জোড়ায় পায়ে গলালো জন। ন্যায় বিচারের সঙ্কল্প নিয়ে প্রকৃত অভিভাবকের ভূমিকা পালনে দ্ব্যর্থহীন দৃঢ়তায় বন্দুক তুলে নিলো হাতে। বাড়ির পেছনে বাঁধা কুকুরটাকে তাক করে গুলি চালালো – এই সেই কুকুর যে তার আত্মীয়কে কামড়েছিল। এই সেই কুকুর যার মালিক, ওর ভাইঝির টাকা চুরি করেছে — 
ওর কল্পনায় ছেদ পড়লো। একটা টর্চের আলো অশরীরী আত্মার মত ওর আশেপাশে কেঁপেকেঁপে ঘুরছে। কিছুক্ষণ স্থির থমকে রইলো আলোটা যেন ভাবছে কোনদিকে যাবে, তারপরে সামনে হারিয়ে গেল। 
ওর বুকের ভেতরে হুহু করে উঠলো। ও একদম একা এখন। কী করবে ও? এই পৃথিবীতে একমাত্র মানসনই ওকে বুঝতো, সহ্য করতো। ওর পরিবারের লোকজন কিংবা বন্ধুরা অনেকদিন আগেই ওর ব্যাপারে হাত ঝেড়ে ফেলেছে। লী এ্যানকে নিজের বিয়ে ভাঙা নিয়ে ও যা বলেছিল তার পুরোটা সত্যি না হলেও কাছাকাছি। তবে যা বলেছে তার চেয়েও অনেক বড় সত্য বলে নি, চেপে গেছে। যেমন হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে ওর মানসিক স্থিতির মূল্যায়ন করা হয়েছিল। ওর স্থিতি একেবারে ক্রান্তিসীমায়, সম্ভাব্য বাইপোলার বলা যেতে পারে ওকে। সম্পর্কের বিশ্বাসঘাতকতা, বার বার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবং মিথ্যা প্রতিজ্ঞা, অর্থআত্মসাৎ, বিচ্ছেদের পরে মাদকাশক্ত হয়ে গাড়ি চালানোর জন্য কিংবা ছোটখাট চুরির জন্যে বার কয়েক জেল খাটা, গভীর রাতে যারা এখনো ওর ফোন তোলে তাদের বিরক্ত করা, সব মিলিয়ে ওর স্খলন, উচ্ছেদ, আর ব্যর্থতা এককথায় এখনকার ও, ওর আগের জীবনের ধ্বংসাবশেষ। 
গতবছর ও সেই পুরোনো কন্ডো বাড়িটাতেই ফিরেছিল। একসময় ও নিজেই এটার সংস্কার করেছে। বাড়ির ব্যবসা যখন তুঙ্গে তখনই ঋণখেলাপী কন্ডোটা ব্যাংকের দখলে চলে যায়। অযত্নে অবহেলায় প্রায় পরিত্যক্ত ভগ্নস্তুপের মতই একলা দাঁড়িয়ে ছিল জঙ্গলের মাঝে। ওর পুরোনো চাবিটা কাজ করেছিল ঠিকঠাক। তারপরেই ও এই কন্ডোর বাসিন্দা হয়ে গেল। 
ও চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে বাড়িটাকে। ঘর ভর্তি ওর রঙের টিন,তুলি আর কুকুরের খেলনা –ব্যস্‌ এই-ই তেমন কিছু নেই আর। বসার ঘরের ঠিক মাঝখানে একটামাত্র চেয়ার। পাশের ঝোরা থেকে জল তুলে আনার জন্যে একটামাত্র বালতি। ওর নোংরা আধোয়া কাজের কাপড়চোপড়ের স্তুপ। এক কোণে একটা তোশক। পুরোনো ওষুধের বোতল কয়েকটা। তিনটা টিনের কাপ। দুটো বই। আর বাড়িজুড়ে ইতিউতি শ্যাওলার প্রলেপ। 
ওর ঘুম ভাঙলো ভোরের ধূসর ভারী আকাশের নিচে। গতকালের পথ চিনে হাঁটা সহজ। গতরাতে ও অন্ধের মত ছুটেছিল। বিধ্বস্ত গাছগুলো তার চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও ভাবলো জনও এই পথ ধরে ওকে ঠিক খুঁজে নিতে পারতো। আচ্ছা যদি খুঁজে পেতো ওকে তবে কি জন ওকে ছেড়ে দিত? ওর চলার চিহ্ন যেখানে শেষ হয়েছে ঠিক সেই খান থেকে ধূসর আকাশের এক ফালি রূপোলি আভা দেখা যাচ্ছে সামনে। ও সেই রশ্মিকে অনুসরণ করে বামদিকে মোড় নিল। 
সামনেই ভ্যানটা। রাস্তার ওপর জ্বলে কালো হয়ে আছে। নিমেষেই আজকের নতুন দিনটা ওর জন্যে একটা ভয়ংকর দিনে পালটে গেল যেন! মনে হচ্ছে জন ওকে নয় বরং ও যা যা ভালোবাসে সব নিশ্চিহ্ন করার যজ্ঞে নেমেছে। জানালার কাচ ভেঙে যেদিকে গ্যাসোলিন ঢালা হয়েছে সেদিক থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে এখনো। ঘন্টা খানেক আগের ঘটনা হলেও গন্ধের তীব্রতা একফোটা কমেনি। ও শার্ট উলটে নাকমুখ ঢেকে তার ভেতরেই নিঃশ্বাস নিতে নিতে এগোতে লাগলো। আগুনের আঁচে গাড়ির টায়ার গলে রাস্তায় মিশে গেছে। আগুনের ভাঁপ হাওয়ার তোড়ে চাকার অদূরে অর্ধবৃত্ত চিহ্ন এঁকেছে। ও ভাঙা জানালাটা দিয়ে উঁকি দিল । গত তিন বছর ধরে ওর আঁকা সমস্ত ছবি সব শেষ! কিচ্ছু নেই! এই ছবিগুলোই ছিল মানসনের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন! এখন পোড়া ছাই। 
হাঁটা ছাড়া ওর এখন আর কোন উপায় নেই। আঠালো হাওয়ায় প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, রাস্তার ধার ঘষ্‌টে উড়ছে। একটা গাড়ি পেরিয়ে গেল ওকে। গাড়িটা থামাবার জন্যে বুড়ো আঙুল দেখালো না ও। ওর মুখে, গলায় রক্ত শুকিয়ে খটখটে হয়ে আছে। চোখের কোণে ভয় আর শোক মিলেমিশে লাল হয়ে জেগে আছে। এমন চেহারার কাউকে রাস্তা থেকে কেউ তুলবে? তার চেয়ে হেঁটেই ও ইন্টারসেকশনে পোঁছে যাবে। ওখান থেকে ডান দিকে গেলে জনের বাড়ি আর বাঁ দিকে গেলে লী এ্যানের বাড়ি। সামনে সোজা আরও অনেকটা পথ হাঁটলে তবেই এডিসন।ও এডিসনের রাস্তাই ধরবে। এডিসনে পৌঁছে সবচে’ আগে গ্যালারিকে ফোন দেবে।প্রদর্শনী বাতিল করবে। এরপরে কাছাকাছি গ্রে-হাউন্ডের স্টেশনে যাবে। কোন একটা বাস ওকে ঠিক পৌঁছে দেবে পূবে; ওর নিজের বাড়িতে। ওর ফেলে আসা জীবনে, যে জীবনের মানে আজ আক্ষরিক অর্থেই তলিয়ে গেছে। 
বাড়ি পৌঁছেই রঙতুলি সব ফেলে দেবে ও। শেষবারের মত বাবার কাছে ধার চাইবে। আবার চিকিৎসা নেবে। ডাক্তারের পরামর্শ মত ওষুধও। ছোট একটা এ্যাপার্টমেন্ট দেখবে এবং সভ্যতার তথাকথিত সংহত হই-হট্টগোলের ধূসর সংস্কৃতিতে ভিড়ে যাবে। 
ইন্টারসেকশন পোঁছেই ও নিজেকে অবাক করে সোজা নয়, বামের সেই নুড়িঢালা পথ ধরে লী এ্যানের বাড়ির দিকেই হাঁটতে লাগলো। ওর ভেতরে সেই স্বতঃস্ফুর্ত তাড়নার বোধটা আবার মাথা চাড়া দিয়েছে যেন। অদ্ভুত এবং প্রশান্তিময় সেই অনুভূতি আবার ফিরছে। কী করছে ও! ঠিক বুঝতে পারছে না, তবুও মনে হচ্ছে যা করছে ঠিকই করছে । যতই সামনে এগোচ্ছে ততই দ্রুততর হচ্ছে ওর পদক্ষেপ। বাড়িটার আভাস ভেসে উঠতেই ও রীতিমত দৌড়াতে লাগলো যেন মানসনের স্মৃতি কিংবা মানসনের আত্মা ভর করেছে ওর ওপরে। লী এ্যানের গাড়িটা কাল যেখানে ছিল ঠিক সেখানেই আছে। গাড়ির আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব ওর ভেতরের অনুভূতিকে সমর্থন করলোঃ হ্যাঁ ও একটা প্রাণীই এখন, নোঙরা অসংলগ্ন এবং মুক্তির অবাধ আনন্দে টইটম্বুর এক সত্যিকারের প্রাণী । 
গাড়ির পাশ দিয়ে উবু হয়ে হেঁটে ও বসার ঘরের জানলায় উঁকি দিল। কেউ নেই ভেতরে। এরপর বাড়ির চারপাশ ঘুরে একে একে রান্নাঘর, পেছনের বারান্দা এবং সবশেষে শোবার ঘরে উঁকি দিল। এই কিছুক্ষণ আগেই ঠিক ঐ বিছানায় লী এ্যানের জন্যে অদ্ভুত মমতায় ভরে উঠেছিল ওর মন । ও কল্পনায় দেখলো জন যেন সকাল সকাল দর্পভরে ভাইঝিকে দেখাচ্ছে ওর গত রাতের কর্মকান্ড। এই ভাবনাটা আসতেই ও লী এ্যানের বাগানের জন্যে তৈরি করা নুড়ির ঘের থেকে একটা পাথর তুলে অবলীলায় সামনের দরজার কাচ ভাঙলো। ভাঙা ফোকরে হাত গলিয়ে দরজার তালা খুলে এক লহমায় ঢুকে পড়লো ভেতরে। এরপর খুব দ্রুত কাল রাতের চুরি করা টাকাটার অর্ধেক ফের ঢুকিয়ে রাখলো খামে। ওর ভেতরে প্রবল অনুশোচনা কাজ করছে এখন। ঝোঁকের ঘোরে চোখ ফেরাতে নজর পড়লো টেবিলের ওপর। লী এ্যান কিংবা নিয়তি, দৈবনির্দেশে যেন গাড়ির চাবি ফেলে গেছে ওখানে। 
চাবিগুলো ‘রাশমোর পাহাড়ে’র স্মারক চাবির রিঙে আটকানো। ট্যুরিস্টদের জন্যে সস্তা স্মারক। ওটার দিকে তাকিয়েই একটা অভিনব পরিকল্পনা ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে শুরু করলো ওর মনে আর সাথে সাথে আনন্দে ওর বুক ভরে উঠলো। ও প্রথমে লস এঞ্জেলেসেই যাবে। গ্যালারির মালিককে সব গুছিয়ে বলবে, চাইলে কিছুদিন ওখানে থাকতেও পারে। এর পরে ওখান থেকে যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাবে, যা মনে চাইবে তাই দেখবে। আসলে অনেকদিন ধরেই ও নর্থ ক্যারোলাইনার জীবন, সেই জীবনের পেছনের ইতিহাস থেকে পালাতে চাইছিল। হয়তো এইসব ঘটনাপরম্পরা অজান্তেই ওকে ঠিক সেই মোড়েই নিয়ে এসেছে। ওর কোন ভয় লাগছে না আর। এমনকি লী এ্যান যদি পুলিশে খবরও দেয় তাও কিছু যায় আসে না আর। ওর গাড়ি কিংবা কুকুরের পরিণতিও ওকে ভীত করছে এখন। 
কুকুরের কথা মনে হতেই ও লী এ্যানের শোবার ঘর থেকে মানসনের সেই ছবিটা নামিয়ে নিল। ‘ছবিটা তোমাকে মনে করাবে’ লী এ্যান বলেছিল। পেছনের ঘরে কেউ কিছু নিয়ে অনুযোগ করছে যেন! প্রায় সাথে সাথেই ঘুম জড়ানো পায়ে জেমী ঢুকলো। ও ওর নিজের গাল ঘষছিল। গালের একপাশে বালিশের চাপে গোলাপি হয়ে আছে। 
-‘মা কোথায়?’ 
-‘কাকাবাবুর সাথে বাইরে গেছে’ 
-‘ওহ্‌’ , বাচ্চাটার চোখে মুখে ঘোর। অ্যালেক্স বুঝতে পারছে জেমী এখন ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি আছে। 
-‘তুমি কে?’ 
-‘আমি কেউ না। তুমি আসলে স্বপ্ন দেখছ। বিছানায় যাও।’ 
বাচ্চাটা নড়লো না, ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। 
-‘তুমি কে?’ 
-‘কাল রাতে আমাদের দেখা হয়েছিল। আমি অ্যালেক্স’। 
ওর হাতে ধরা মানসনের ছবিটার দিকে তাকালো জেমী তারপরে নিজের ব্যান্ডেজের দিকে চোখ ফেরালো। স্মৃতি তাজা হচ্ছে ওর, ‘তোমার কুকুর আমাকে কামড়েছিল’। 
-‘ওর নাম মানসন। ঠিক। ও কামড়েছিল। আমি আসলেই দুঃখিত এবং আমি জানি মানসনও দুঃখিত। তোমার ব্যথাটা কমেছে?’ 
জেমী কাঁধ ঝাঁকালো এবং ওর পেছন পেছন বসার ঘরে এলো। 
-‘তোমার মুখে কী হয়েছে?’ 
-‘কাকাবাবু গুলি করেছেন’ 
-‘কেন?’ 
-‘ওঁর মেজাজ খারাপ ছিল’ 
-‘কেন?’ 
ও উত্তর দেবার জন্যে ঘুরতেই জেমীর চোখে ওর চোখ আটকালো , অ্যালেক্সের গলা আবেগে ধরে এলো। মনে হলো যেন পুরোনো কোন বন্ধুর প্রশংসা করছে ও, ‘শোন জেমী মা ফিরলে বলো আমি প্রায় পুরো টাকাটাই ফেরত দিয়েছি এবং আমি আসলেই দুঃখিত। আমার ভুল হয়েছিল। অবশ্যই ভুল হয়েছিল। কিন্তু আমি সবসময় ভাণহীন জীবনযাপনেরই চেষ্টা করেছি। মা বাড়ি ফিরলে এটা বলবে কিন্তু, ঠিক আছে? আর তুমিও এটা মনে রাখবে। নিজের কাছে সবসময় সৎ থাকবে’। 
বাচ্চাটা কিছু না বলে সরে গেল, হয়তো কিছু বোঝেইনি অথবা বুঝলেও হয়তো একমত হয়নি। শত হলেও লী এ্যানের ভাষ্যে ‘জেমী ওর বাবার ছেলে’। অ্যালেক্স কল্পনায় বিলকে দেখলো। মুখবিহীন শক্তপোক্ত সংকীর্ণ একজন লোক যে আফগানিস্তানে শ্রমসাধ্য ছোট কোন কাজের জন্যে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছে। নিয়ম করে বাড়িতে বিদেশী খামে টাকা পাঠাচ্ছে আর বার্লিনে সেই ‘পরিস্থিতি’র সাথে বোঝাপড়া করছে। 
অ্যালেক্স বাড়ি থেকে বেরিয়ে লী এ্যানের গাড়ির পেছনে মানসনের ছবিটা ঢোকাতে ঢোকাতে বিলের কথাই ভাবছিল হঠাৎ গাড়ির দরজাটা বাঁধতে গিয়ে ব্রিফকেইস হাতে মানসনকে দেখেই ওর মনে হলো আরো একটা কাজ বাকি রয়ে গেছে! 
অ্যালেক্স কাউন্টারটপ থেকে খাঁচাটা তোলার সময় গিনিপিগটা উদ্বেগে ওর নিজের দু’হাত শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছিল। আর সে দিকে তাকিয়ে অ্যালেক্স ওর নতুন আঁকার বিষয় ঠিক করে ফেলেছিল মনে মনেঃ ‘ছোট্ট মানুষের যাত্রা হলো শুরু’। দরজা খুলে অ্যালেক্স পা বাড়াতেই ওর পেছনেই ক্লিক আওয়াজ! অ্যালেক্স ঘুরে তাকালো। আবার বাচ্চাটা! আগের মতই ঘুমের ঘোরে যেন জেমী কিন্তু এখন অন্যরকম লাগছে। খামারী জনের ছোট সংস্করণ যেন কেবল ওর অপরিণত হাতে ধরা বিশাল বন্দুকটা বড্ড কৌতুককর ঠেকছে চোখে! 
অ্যালেক্সের হাসি আর চিৎকারের মিশেল প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই গুলিটা সরাসরি ওর বুকে এসে বিঁধেছিল। ছেলেটা পরমুহূর্তেই দৌড়ে ওর শোবার ঘরে দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিয়েছিল। খাঁচাটা অ্যালেক্সের পাশেই খুলে পড়েছিল মেঝেতে। আর অ্যালেক্স যখন অবিশ্বাসের ঘোর নিয়ে মৃত্যুযন্ত্রনায় শেষ নিশ্বাস টানছে ঠিক সেই মুহূর্তে ‘ছোট্ট মানুষ’ খুব সাবধানে খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসে অ্যালেক্সের মুখ শুঁকেছিল। ওর গোঁফের শলা অ্যালেক্সের ঠোঁটের ওপর আলতো ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। অতঃপর অ্যালেক্সের প্রাণহীন চোখজোড়া অসহায় দেখলো সদর দরজা যা অ্যালেক্সই মাত্র কিছুক্ষণ আগে খুলেছিল, সেই খোলা দরজা দিয়ে ‘ছোট্ট মানুষ’ সটান বেরিয়ে সামনের অবারিত দীর্ঘ পথে দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে!
অনুবাদক পরিচিতি
 রঞ্জনা ব্যানার্জী 
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশে জন্ম।
বর্তমানে থাকেন কানাডাতে।
পেশায় রসায়ণবিদ। গবেষক। 
গল্পকার। অনুবাদক। 

2 thoughts on “একজন স্বাভাবিক মানুষ

  • November 12, 2018 at 1:46 am
    Permalink

    An amazingly spontaneous rendition of 'A Natural Man' by my favorite raconteur who knows how to deliver a story! Here, though, it has two layers: One delivered by the writer himself on waves of identifying and losing almost immediately the definition of the essence of a man formally lost to the society but corralled at last on the final escape of the guinea pig, and the second layer boldly projected by the translator without deviating from the original. The two layers coexist from the beginning without any bump anywhere in the presentation – and here lies the final credit to Ranjana Banerjee – as it comes out in a lucid flow capturing the essential presence of the protagonist Alex.

    My congratulations to Ranjana for a wonderful work done.

    Reply
  • December 6, 2018 at 11:54 am
    Permalink

    ভিন্ন স্বাদের চমৎকার একটি গল্প ।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=