অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত’র গল্প : জমি

শেষ হয়ে গেল? জিজ্ঞেস করল হেলালদ্দি। জিজ্ঞেস করল আরও অনেকে। পাড়াবেপাড়ার দশজনে। 
মোকদ্দমায় কে পেল কে ঠকল সেটা জিজ্ঞাস্য নয়। মোকদ্দমা যে শেষ হয়ে গেল এটাই আপসোসের কথা। 
এ ক’দিন সমানে তারা ভিড় করেছে আদালতে।
কে কী বলে বা এক কথা বলতে আরেক কথা বলে ফেলে তাই শুধু শুনেছে এ ক’দিন। কে কি রকম হিমসিম খায়, কার কী কেচ্ছাকীর্তি বেরোয়, কার দায়মূল হয়েছিল, কে বেটিচুরি করেছিল, কে পড়েছিল ঘরপোড়া মোকদ্দমায়। সকাল থেকে শেষ বেলায় কাচারি পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে এক জায়গায়। ভিড়হুড় দেখে আদালত-ঘর থেকে তাদেরকে বের করে দিলে চাপরাশীআর্দালির হাতে টিকিটের পয়সা গুঁজে আবার গুটিগুটি এসে দাঁড়ায়। সাক্ষীর প্রতি সহানুভূতিতে নিজেরই অলক্ষ্যে ঘাড় নেড়ে হাঁ-না ইঙ্গিত করে বসে। শত্রু মিত্র সব যেন তাদের ঘরের লোক। 
জীবনে আর কোন নেশা নেই। রোমাঞ্চ নেই। ক্রিকেট-ফুটবল নেই, থিয়েটার-বায়স্কোপ নেই, রেস-রেশালা নেই। নেই কোন জুয়োখেলা। মদ-গাঁজা। থাকবার মধ্যে আছে এই মোকদ্দমা। দাদ-ফরিয়াদ। তার হার-জিতের খামখেয়াল। উকিলে-উকিলে কাছি টানাটানি। 
‘মোকদ্দমার ফল বেরিয়েছে শুনলাম। পেল কে?’ ফলের কথা একমাত্র জিজ্ঞেস করলে আমিরন। 
‘আর কে পাবে?’ সোনামন্দি তাকিয়ে রইল দুর্বলের মত। 
‘তার মানে? আমরা পাইনি?’ 
‘আমরাই তো পাব। যেদিকে ধর্ম সেইদিকেই তো জিত হবে।’ 
আহ্লাদে ঘাই মেরে উঠল আমিরন। আমরা পেয়েছি? আমাদের দিকে রায় হয়েছে? ঠকে গেছে জলিল মুন্সি? বল কি খোদাতালার এত রহমৎ হয়েছে আমাদের উপর? জমিজায়গা আমাদের থেকে গেল নিজ চাষে ? মোকদ্দমা জিতলাম তবু তুমি অমন মন-করার মত তাকিয়ে আছ কেন? তোমার জেল্লা-জলুস সব গেল কোথায় ? 
‘এব পর আবার আপিল আছে। জলিল মুন্সি আপিল করবে বলছে।’ 
সে পরের কথা পরে। এখন তো আমোদ করে নাও। কাল উপোস করতে পারি ভেবে আজকের বাড়া ভাতে তো ছাই দিতে পারি না। নাও তামাক সেজে দি এক ছিলিম। উজুর পানি এনে দি। আছরের নামাজ পড়। মজিদে যাও। মজিদে পয়সা দিয়ে এস কারীর হাতে। দরগার খাদেমের কাছে চেরাগী দিয়ে এস। সঙ্গে মহবুবকে নিয়ে যাও। আমাদের বুকচেরা ধন মহবুব। 
পাকা স্বত্বের জমি পেলাম। এবার আর ভাবনা কি। থিত-ভিত হল এতদিনে। 
কিন্তু না, এর পর আবার আপিল আছে। আবার খরচান্ত। আবার ভোগান্তি। আবার আইনের খামখেয়াল। 
তোমার কোন ভয়-ডর নেই। কড়া করে তামাক সেজে আনে আমিরন। জলিল মুন্সির সাজানো মোকদ্দমা ফেঁসে যাবে নির্ঘাত। তার জুলুমদারি টিকবে না শেষপর্যন্ত। আমাদের ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে যাক, জমি ছাড়িয়ে নিতে দেব না। 
রায়তি স্বত্বের জমি ছিল হুকুমালির। লড়াইয়ে গেছে সে কুলি-মজুরের ঠিকাদায় হয়ে। যাবার আগে বেঁচে দিলে সে সোনামন্দির কাছে। প্রায় মাটির দরে। উনিশ গণ্ডা জমি, মোটে আড়াই শো টাকা বহায়। সোনামন্দির বউটা সোনাচাপার মত দেখতে। সেই একটু দরকষাকষি করেছিল। না, শাড়ি-জেওর টাকা-পয়সা কিছুই সে চায় না। সে জমি চায়, জোরের জমি। শুধু ফলনের জোর নয় স্বত্বের জোর। পাকাপোক্ত স্বত্ব। যাতে কায়েম হয়ে থাকতে পারে তারা। গাঁথনিটা মজবুত হয়। যাতে না পরের জমিতে বর্গাইত হতে হয়। জমিতে চষি-রুই কিন্তু তা পরের জমি। নিজের জমি চাই। স্থিতিবান স্বত্ব। যাতে না এক নুটিশেই মেছমার হয়ে যায়। 
একটু মায়া পড়েছিল কি হুকুমালির? 
“কি মিয়া, বেচবেই যদি জমি, একবার আমাকে যাচতে পারলে না? না, আমরা উচিত দাম দিতাম না?’ জলিল মুন্সি পাকড়াল হুকুমালিকে। 
রোকের জমি। জলিল মুন্সির বাড়ির বগলে। ডাক নাম আশি-মণি। এক কানিতে আশি-মণ ধান হয়। কলার কথা শুনে জলিল মুন্সি করাতের পাতের মত লকলক করে উঠল। 
‘বলি, দিয়েছে কত সোনামদ্দি ? আড়াই শো? এই বাজারে ঐ জমির দাম আড়াই শো? আমি তোমাকে পাঁচ শো দিতাম’। 
‘দলিল এখনও রেজেস্ট্রি হয়নি’। চোখ ছোট করল হুকুমালি। ক্রমে ক্রমে যুদ্ধের দিকে এগুচ্ছে বলেই বুঝি মন তার শক্ত হচ্ছে। 
‘না হোক, রেজেস্ট্রিতে কিছু এসে যায় না।’ 
হুকুমালির সঙ্গে ঘর করলে জলিল মুন্সি। নগদ দুশো টাকা দিয়ে আরেকটি কবালা লেখাপড়া করিয়ে নিলে। যোগসাজস করলে স্ট্যাম্প ভেন্ডারের সঙ্গে। সোনামন্দির কবালার যে তারিখ তার চারদিন আগেকার তারিখ বসালে স্ট্যাম্পবেচার তায়দাদে। সেই মোতাবেক দলিল-সম্পাদনের তারিখ দিলে। ফলে দাঁড়াল এই, জলিল মুন্সির কবলা সোনামদ্দির কলার আগুড়ি হয়ে গেল। সোনামদ্দির কবালা যদি পাঁচুই, জলিল মুন্সির হল পয়লা। স্ট্যাম্পবেচার খাতাপত্রেও সেই পয়লা লেখা। কোথাও আর ফাঁক-ফেঁকড়া রইল না। তক্তায় তক্তায় মিশে খেয়ে গেল। 
ওয়াকিবহাল লোক এই জলিল মুন্সি। সে জানে দলিলের স্বত্ব হয় দলিল লেখাপড়ার তারিখ থেকে, রেজেস্টারির তারিখ থেকে নয়। কারসাজি করে তারিখ পিছিয়ে দিতে পারলেই তার স্বত্ব প্রবল হয়ে উঠবে। 
‘কোন ভেজালে পড়ব না তো’? হুকুমালি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলে। 
‘তোমার ভয় কী! তুমি তো যুদ্ধে গিয়েছ কুলির জোগানদার হয়ে। তোমার লাগ এখন পায় কে? যখন মামলার ডাক হবে আদালত জিজ্ঞেস করবে, বায়া কোথায়, বায়া কী বলে? কোথায় বায়া, কে তাকে সমন ধরায়? আমি বলব, বাধ্য হয়েছে সোনামন্দির। সোনামদ্দি বলবে, দায়াদী আছে জলিল মুন্সির সঙ্গে। শুধু দলিল তজদিগ করে হাকিমের বিচার করতে হবে। ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় ধোকা লাগিয়ে দেব।’ 
সেই মামলার রায় বেরিয়েছে আজ। 
দলিললেখক, ইসাদী সাক্ষী, নিশানদায়ক সবাই হলফান জবানবন্দি দিয়েছে জলিল মুন্সির দিকে। রেজিস্ট্রি আপিসের টিকিটবরাত, ভেন্ডারের খাতা-তলব, সব কিছুরই তজবিজ হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। লখাইয়ের বজ্রসার লোহার ঘরে কোথায় একটি ফুটো লুকোনো ছিল, ঢুকল কালকেউটে। জলিল মুন্সির তঞ্চকী মামলা বেফাঁস হয়ে গেল। 
দখল ছাড়েনি সোনামন্দি। এক দিনের জন্যেও নয়। একবার হাল-গরু নিয়ে জবরান দখল করতে এসেছিল জলিল মুন্সির কিরষান। তারা সোয়ামী-স্ত্রীতে মিলে হাল তাড়িয়ে দিয়েছে। নিজ হাতে জুয়ালি খুলে দিয়েছিল আমিরন। বলেছিল, বুকের মাংস ছিড়ে নিয়ে যেতে পার, কিন্তু জমি নিতে দেব না। হাট-ঘাট বাজার-বন্দর করতে সোনামদ্দি বাইরে যায়, ততক্ষণ আমিরন চোখ রাখে পাখির চোখের মতন চোখ। জমি তার বাড়ির বন্দের সামিল, এক ঘেরের মধ্যে। খাটে-পিটে, খায়-লয় আর সব সময় চোখ রাখে জমির কিনারে। ঘেষতে সাহস পায় না জলিল মুন্সি। 
তাই জলিল মুন্সিকেই আর্জি করতে হল। নিজের দখল-স্থিরতরের নয়, বিবাদীর জবরদখল উচ্ছেদের। 
কিন্তু টেকাতে পারল না মামলা। ডিসমিস খেয়ে গেল। আদালত রায় দিল, সোনামদ্দির কবালাই খাঁটি, বাদীরটা জালসাজ, ফেরেবী। তাই জমিতে স্বত্ব শুধু সোনামদ্দির। তার দখল আইনী দখল। জলিল মুন্সি বেমালেক। 
আপিল করবে জলিল মুন্সি। এই আদালতই শেষ নয়। আছে আরও উপরতলা। সেই ঘরে উঠবে সে সিঁড়ি ভেঙে। 
উঠুক। উঠতে দাও। আমরা নিচে থেকেই আসমান দেখি। উপরের দিকে তাকাল আমিরন। 
‘আপিল করলে ওর সঙ্গে আর পেরে উঠব না’। বললে সোনামদ্দি। 
‘আমরা না পারি, ধর্ম পারবে। আপিল করুকই না আগে। আগেই তুমি ঘাবড়ে যাচ্ছি কেন? প্রথম জিতের পর যে একটু আমোদ করব তা করতে দিচ্ছ না।’ 
কাঁচা চিকন ধান ফলেছে জমিতে। কালচে ধরেছে এখন, কদিন পরেই পাকা সোনার রং ধরবে। আলের আগায় দাঁড়িয়ে যে একটু রূপ দেখি তার তুমি ফুরসৎ দেবে না। দাঁড়াও, বালি দিয়ে কাস্তে কাঁচি ধার করি আগে, আমিও তোমার সঙ্গে গিয়ে ধান দাইব। ঢেঁকিঘবের তদবির করি, “সুন্দইরার হাতি” টেকিগাছটাকে ঝাড়িপুঁছি। একদিন ফিরনিপায়েস তৈরি করি, একদিন বা চিটে গুড় দিয়ে চিতই পিঠা খাই। তুমি আগে থেকেই কু ডেকো না। 
সব বিষয়ে বুঝজ্ঞান হয়নি এখনও আমিরনের। কড়ি খেলতে বসে কখন চার চিতে চক আর কখন পাঁচ চিতে পাঞ্জা—এ কে বলতে পারে। কে বলতে পারে মোকদ্দমার ফলাফল। সাজানো বাগান শুকিয়ে যায় এক শ্বাসে। আবার কখনও বা মরা গাছে বউলমউল ধরে। কেউ বলতে পারে না। হয়ত ঘাটে এসে ঘাটের নৌকো ঘাটে পচল। আর পাল মেলল না। 
‘আর এমনও তো হতে পারে যে আমাদের জিত বহাল থাকল শেষ পর্যন্ত। যা সত্য তার আর রদবদল হল না। হতে পারে না এমন?’ কুচকুচে কালো চোখে জিলকি খেলে গেল আমিরনের। 
এতটা যেন সোনামদ্দির বিশ্বাস হয় না। যে দুর্বল তাকে নিয়ে ধর্ম শুধু খেলা দেখায়, 
ছলচাতুরী করে। দরজার গোড়ায় স্থির হয়ে বসে থেকে সারা জীবন পাহারা দেয় না। কখন আবার চলে যায় একলা রেখে। 
আপিলের শুনানি তো আর কালকেই হয়ে যাচ্ছে না। রায়ও উলটে যাচ্ছে না রাতারাতি। এখুনিই মুখ কালো করব কেন? বাজার-সওদা কর, কুটুম্বিতেয় যাও, ভাইবন্ধুর সঙ্গে হৈ-হল্লা কর, পান-তামুক খাও। আমিও কটা দিন একটু হাল্কা পায়ে হাঁটা-চলা করি, মেন্দি পাতায় হাত-পা রাঙাই, চোখের কোলে কাজল আঁকি। ছেলেটাকে নাচাইখেলাই। 
“তুমি কিছু ভেবো না, মন খারাপ কোরো না’। আমিরন বসে এসে সোনামদ্দির পাশ ঘেঁসে : ‘আমার মন বলছে আমাদের পাওয়া-জমি আমাদেরই থাকবে। দেখছ না, জমি কেমন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে বান্ধবের মত’। 
তা তো দেখছি। কিন্তু খরচ-তখরচ করতে হবে আপিলের মোকদ্দমায়। তা জুটবে কোত্থেকে? 
আমিরন ঝাঁকরে উঠল : ‘আমারও তো জিৎপাট্টি, আমাদের আবার খরচ কি?’ 
আনাড়ি, অবুঝ আদালতী কাণ্ড কিছুই জানে না। জলিল মুন্সি এরই মধ্যে কত তালাসী-তদবির আরম্ভ করে দিয়েছে। আপিলের মামলা কার ঘরে চালান করে নিলে সুফল হবার আশা তার তদবির। অমুক হাকিম নতুন সবজজ হযেছে, আপিল পেলেই হাতে মাথা কাটে, তার ঘরে নিয়ে চল। এর আবার উল্টা-বুঝ আছে অমুক হাকিম। বোঁটা খসতে আর দেরি নেই, বেশি লিখতে-বকতে চায়না, নম নম করে সেরে দেবে। যা আছে তাই বহাল রাখবে। তার ঘরে নিয়ে চল। অমুক না তমুক তার দরবিট চলবে। তারপর উকিল নিয়ে টানাটানি। কোন্ ঘরে কোন্ উকিলের পসার তার খোঁজ-তলাস। প্রতি পদে তহরি, প্রতি পদে মেহনতানা। 
“তোমার কিছু করতে হবে না। তুমি শুধু আল্লার নাম করে বসে থাক।’ 
বুঝজ্ঞান থাকলে এমন কথা কেউ বলে না। ঘরগৃহস্থি করে, সংসার-সৃষ্টির জানে কী? শেষকালে জেতা মামলা বে-তদবিরে না ফস্ত হয়ে যায়। ওষুধে-সারা ভাল রুগী না শেষকালে পথ্যের অভাবে মারা পড়ে। 
নিম্ন আদালতের খরচ টানতেই সোনামদ্দি নাকাল হয়ে পড়েছে। উপরোউপরি গত দুই খন্দে ধান বেচে কতক টাকা পেয়েছে, জমি কিনে বাকি সব গিয়েছে মামলার অন্দরে। তাতেও কুলোয়নি পুরোপুরি। ভাণ্ডবাসন বেচতে হয়েছে, বেচাতে হয়েছে আমিরনের লাউ-খাড়ু। হয়েছে কিছু হাওলাত-বরাত। তবু আমিরন জমি ধরতে দেয়নি। খবরদার, জমির গায়ে হাত দিতে পারবে না। জমি আমাদের নিটুট থাকবে। একেবারে নিষ্পাপ। বাঁধা-বেচা করতে পারবে না ওকে নিয়ে। ও আমাদের বুকের মাংস, কলজের রক্ত। 
অনেক রকম লোয়াজিমা। হাঁপিয়ে উঠেছিল সোনামন্দি। মহাফেজখানা থেকে নথি তলব করে আনতে হবে তার তদবির চাই। সাক্ষীর বারবরদারি লাগবে, অন্য পক্ষকে দিতে হবে মুলতুবি খরচ। সোনামন্দির হাত খালি। আমিরন খোরাকির ধান বের করে দিল। বললে, বাঁধা মাইনের চাকর খেটে খাব দুজনে, তবু তোমাকে আমি জমি বেচতে দেব না। না, না, পত্তন-রেহানও না, কিছু না, আমার লক্ষ্মীকে পরের হাতে সঁপে দেব না কিছুতেই। 
খরচ যখন টানতে পারে না, ভাইবন্ধুরা বলেছিল, জলিল মুন্সির সঙ্গে আপোষরফা করে ফেল। আপোষের সর্ত আর কিছুই নয়, যে দামে কিনেছিল কিছু না-হয় বেশি নিয়ে জমি বেচে দাও জলিল মুন্সিকে। কিছুটা গড়িমসি হয়ত করেছিল সোনামচ্ছি, কিন্তু আমিরন হাঁকার দিয়ে উঠল : কিছুতেই না। ধর্মের কাছে ঠকি, বুকে ধরে জমি ওকে দিয়ে দেব স্বচ্ছন্দে। অধর্মের কাছে ঠকে জমি-জিরাত খোয়াতে পারব না। ভিখ মেগে খেতে হয়, সাধু গৃহস্থের বাড়ি মাগব, চোরের কাছে খয়রাত নেব না।’ 
সেই কষ্টের জমি তাদের বজায় রয়েছে। বলবৎ রয়েছে ধর্ম। তার আবার ফির-যাচাই হবে আপিলের আদালতে। কিন্তু তার খরচ কই? খন্দ উঠতে এখনও ঢের দেরি আছে। আংটি-চুংটিও নেই আর আমিরনের কানে-নাকে। হাঁড়ি-পাতিলের দাম কি! 
‘ছুটা খতে আর ধার পাওয়া যায় না। জমি এবার বন্ধক রাখতে হবে’। ভয়েভয়ে বললে সোনামন্দি। 
‘কী করবে?’ 
‘বন্ধক রাখব’। 
‘পাপ কথা মুখেও এনো না। বন্ধক উদ্ধার করবে কি করে?’ 
‘খন্দ উঠলে ধান-পান বেচে শোধ করে দেব।’ 
‘ওসব শোধবোধের ধার দিয়েও যাবে না মহাজন। সে শুধু ফন্দি দেখবে কি করে জমিতে ঢুকতে পারে। ওয়াশিল দিয়ে শুধু তামাদি বাঁচাবে। তাই যেই একবার খন্দ খারাপ হবে, ঝোঁপ বুঝে কোপ মেরে জমি দখল করে নেবে। তোমার পায়ে পড়ি, আমাদের জমি তুমি পরাধীন করে দিও না।’ 
ভাই বন্ধুর সল্লা-পরামর্শ নিল সোনামন্দি। 
বউ বলে, ধর্মের দুয়ার ধরে বসে থাক। এক আদালতের রায় যখন আমাদের দিকে হয়েছে, তখন সব আদালতের রায়ই আমাদের দিকে হবে। বলে, আপিলে আমাদের হাজির হবারই দরকার নেই। দেখি ধর্মের রায় কে ওলটায! 
মুরুব্বি-মাতব্ববরা হেসে উঠল। ঠাট্টা করে উঠল। বলল, শুধু সদূরে আপিল কি, দবকার হলে হাইকোর্ট করতে হবে। তার জন্যে তৈয়ার হও মিয়া। কারবার-দরবারের কথায় বউকে ডেকো না। 
সত্যিই তো। যদি সদরে সোনামদ্দি ঠকে তবে চুপ করে সে-হার সে মেনে নেবে নাকি? শেষ চেষ্টা দেখবে না? কুটুম-মহলে বলবে না বুক ফুলিয়ে, হাইকোর্ট করেছিলাম? 
আমিরন ঘরের বউ, সে আইন-বেআইনের জানে কী! 
সে কিছু জানতে না পারলেই হল। জমির চাষদখল ঠিক থাকলেই সে নিশ্চিন্ত থাকবে। 
কিন্তু বন্ধকী মহাজন কই আজকাল দেশগাঁয়ে? ঋণসালিশী আর মহাজনী আইন তাদেরকে কাবু করেছে। তবে যদি খাই-খালাসী দাও, দেখতে পারি। তাতে সোনামন্দি রাজি হতে পারে না। তাহলে তাকে জমির দখল ছেড়ে দিতে হয়। তা কি করে চলে? তা হলে যে আমিরন জেনে ফেলবে। 
অগ্রিম পাট্টা নেবার লোক আছে। ওয়াদা করে নগদ খাজনায় লাগিয়ে একথোকে বেবাক টাকা নিয়ে নাও আগাম। কায়েমী প্রজা নয়, ওয়াদা অন্তে জমি আবার ফেরৎ পাবে। কিন্তু অল্প কয়েক বছরের জন্যেও জমির উপরে রায়ত-বর্গাইত সইতে পারবে না আমিরন। অশান্তি করবে। চোখের জলে নিবিয়ে ফেলবে আখার আগুন। 
এখন শুধু সাফকবলার দিন। যদি বল জমি বেচব, রায়তি স্বত্বের জমি, কাড়াকাড়ি 
পড়ে যাবে। ঢোল দিতে লাগবে না, দেশবিদেশের লোক এসে হামি হবে। কিন্তু জমিই যদি বেচে ফেলল তা হলে থাকল কী? আপিলও যদি সে পায়, সে কেবল রায়ই পাবে, জমি পাবে না। 
এক উপায় শুধু আছে। রায়তি স্বত্ব বেচে ফেলে তার তলায় ফের কোলরায়তি বন্দোবস্ত নেওয়া। জমিতে জমি রইল কাবেজের মধ্যে শুধু স্বত্বের যা একটু বরখেলাপ হল। স্বত্বের কারিকুরি অতশত বুঝবে না আমিরন। আমল-দখল ঠিক থাকলেই সে খুশি। বছর-বছর খাজনা টানতে হবে বটে তা জমির দোয়ায় আটকাবে না। জানতে দেয়া হবে না আমিরনকে। সালিয়ানা খাজনা দিয়ে যেতে পারলে কেউ আঁচড় কাটতে পারবে না জমিতে। তাদের ভোগ-তছরুপ ঠিক থাকবে। 
আশ্চর্য, সহজেই খদ্দের পাওয়া গেল। আপিলের আদালতে স্বত্বের চুড়ান্ত নিষ্পত্তি হবার আগে কেউ কিনতে চাইবে না এই সবাই আন্দাজ করেছিল। কিন্তু যুবনালি এল এগিয়ে। মোলায়েম ভাবে বললে, ‘আমি নিতে রাজি আছি। জমি নিয়ে অমন ফটকা খেলি। যদি আপিলে সোনামদ্দি ঠকে, আমিও না হয় ঠকব। সরল কিস্তিতে শোধ করে দেয় দেবে, না দেয় তো মারা পড়ব না।’ 
নগদ নিশো টাকায় কিনল যুবনালি। দশ টাকা জমায় কোলরায়তি পত্তন নিল সোনামদ্দি। কাবালা হল। কবুলতি হল। জমি রইল সোনামন্দির নিজ চাষে। 
আমিরন টু শব্দটিও জানতে পেল না। দাওয়া ধান আগের মতই আঁটি বেঁধে এল তার উঠোনে। ধান ঝাড়ল, ধান সারল নিজের হাতে। এবার আগের মতই ধান কাঁড়বে টেকিতে। পাড়ার গরিব চাষানীরা আসবে তার ধানের খিদমতে। একসঙ্গে ধান ভানার গান গাইবে তারা। 
খবর এল আপিলেও সোনামদ্দি জিতেছে। 
আমিরন উছলে উঠল : এবার কী খাওয়াবে খাওয়াও। বাউ-খাড় গড়িয়ে দাও নতুন করে, গড়িয়ে দাও পার্শি-মাকড়ি। এবার একখানা শান্তিপুরী তাঁতের শাড়ি কিনে দাও।” 
কিন্তু সোনামদ্দির মন খারাপ। বললে, “অনেক তত্ত্বতাউত করেছি বলেই না জিততে পারলাম। সবচেয়ে বড় উকিল লাগিয়েছি। টানাটানি করে আপিল রেখেছে খোদ জজসাহেবের কামরাতে। বহু টাকা খরচ হয়ে গেছে’। 
কোন কথা আর গায়ে মাখে না আমিরন, দেখে না তলিয়ে। বললে, ‘হোক খরচ, জমি তো আমাদের থাকল। লক্ষ্মী তো বাঁধা রইল ঘরের কানাচে। পাকাপোক্ত স্বত্বে তো কায়েম হলাম। যার জমি আছে তার ভাত আছে। যার ভাত নেই তার জাতও নেই।’ 
কিন্তু সোনামন্দি কী করে বলে তার সত্যিকারের হারের কথা? মামলায় সে নিচু হল বটে, কিন্তু জমির স্বত্ব দিল নিচু করে। সব সময়ে ভাঙানদীর মুখে ছাড়াবাড়ির মত বসে থাকবে এখন থেকে। ফুকা, ঠুনকা স্বত্ব। দায়রহিতের একটা নুটিশ জারি হলেই ফক্কিকার। এক সন খাজনা না দিলেই ডিক্রি, আর ডিক্রির টাকা তিরিশ দিনের মধ্যে না দিলেই উৎখাত। 
কিন্তু তা না হলে টাকার সে জোটপাট করত কি করে? মোকদ্দমা চালাত কি করে? স্বত্ব সাব্যস্ত করত কি করে? 
হুশিয়ার থাকবে সব সময়। যুবনালি দেবতার মত লোক, সে কখনও দিললাগি করবে না। অনেক জমি আছে তার, এ উনিশ গণ্ডার জন্যে তার লোভ নেই। হয়ত বা কবালার পণ সুদসমেত ফেরৎ পেলে সে স্বত্ব ফিরিয়ে দেবে, ফির-বিক্রি করবে। তা না দিক, ঘোর দুর্দিনে কিস্তি খেলাপ হলেও উচ্ছেদ করে দেবে না। 
কিন্তু শুনতে পেল যুবনালি জলিল মুন্সির বেনামদার। কলার টাকা যুবনালি দেয়নি, জলিল মুন্সি দিয়েছে। তার হিসাবের খাতায় ঐ তারিখে ঐ টাকা খরচ লেখা। কবালাও এখন তার হেপাজতে। শুধু তাই নয়, যু্বনালি জলিল মুন্সির বরাবর মুক্তিপত্র করে দিয়েছে। মুক্তিপত্রে কবুল করেছে কবলার স্বত্ব জলিল মুন্সির। 
ফল দাঁড়াল এই, জমিতে সোনামদ্দি কোর্ফা প্রজা আর জলিল মুন্সি তার মুনিব। বছর-বছর তার দশ টাকা খাজনা। আমিরন শুনতে পেলে গাঙে ডুবে মরবে। 
সোনামন্দির শরীরে-মনে সুখ নেই। খেতে-মাখতে আহ্লাদ নেই। তামুকে-বিড়িতে ঝাঁজ নেই। 
‘কেন, তোমার কী হয়েছে? মনের মধ্যে যেন কী ভার বেঁধে বেড়াচ্ছ! রাগ-রঙ্গ করে আর কথা কও না আমার সঙ্গে’! 
জোর করে হাসল সোনামদ্দি। বললে, ‘বা, বয়স বাড়ছে না দিন-দিন?” 
‘সত্যি বল তো, জমির কিছু করেছ? 
‘বা, জমি কী করব? আমাদের যেমন জমি তেমনি আছে।’ 
‘বেচাবাঁধা নেই তো কোথাও ?” 
‘বুদ্ধিকে তোমার বলিহারি। জমি রইল আমাদের নিজ চাষে, ধান ‘আমরা গোলাজাত করছি, আউশ বুনলাম এ বছর, জমি বেচা বাঁধা হয়ে গেল’? 
‘না, জমি যদি তোমার ঠিক থাকে, আমি যদি তোমার ঠিক থাকি, তবে তোমার আর দুঃখ কী! তবে তুমি কেন মন ভার করে থাক?’ 
না গো বউ না, জমি ঠিক আছে। মানুষই আর ঠিক নেই।” 
এক কিস্তিও খাজনা খেলাপ করে না সোনামদ্দি, ঠিক জলিল মুন্সির তশিলদারকে পৌঁছে দিয়ে আসে। রসিদ নেয়। সালিয়ানা হলে দাখিলা আদায় করে। যাতে খাজনার বকেয়ায় না উচ্ছেদের আর্জি পড়ে তার নামে। আর, উচ্ছেদের আর্জি পড়লেই বা কি ডিক্রির তিরিশ দিনের মধ্যে টাকা দিয়ে দিলেই খালাস। শুধু আমিরন না টের পায়। 
জলিল মুন্সি সে-পথে গেল না। নিজে খাজনা বাকি ফেলে নিজের রায়তিস্বত্ব নিলাম করালে। কেনালে চাচাত বোনাই দরবার মোল্লাকে দিয়ে। টাকা দিলে নিজে। নিলাম ইস্তাহার গোপন করলে। ঝাঁপিয়ে পড়ল সোনামদ্দির উপর। দায়রহিতের নুটিশ নিয়ে। সোনামদ্দির কোলরায়তি বিলোপ হয়ে গেল। 
এবার সোনামদ্দির দখল জবর-দখল বলে সাব্যস্ত হতে দেরি হল না। জলিল মুন্সি ঘর ভেঙে খাসদখলের ডিক্রি পেল একতরফা। 
এল দখল জারির পরোয়ানা। ঘরদোর ছেড়ে বেরিয়ে যাও হালট ধরে। পাঁচ দোরের কুকুর হয়ে। 
‘এ সব কী?’ আমিরন চোখে আগুনের হলকা নিয়ে তাকাল সোনামন্দির দিকে। 
‘তোকে ফতুর করে দিয়েছি, আমিরন। জমির জন্যে মামলা করলাম, মামলার জন্যে জমি গেল। পথের থেকে নতুন করে আবার আমাদের আরম্ভ করতে হবে’। সোনামদ্দির চোখ ছলছল করে উঠল। 
রাস্তায় নেমে এল তারা মহবুবের হাত ধরে। বাড়িঘর ভূমিসাৎ হয়ে গেল চোখের সামনে। জমির দিকে তাকাল। মনে হল যেন গৃহহারার মত তাকিয়ে আছে। 
কোথায় আর যায়! আতুর-এতিমের জন্যে কোথায় কোন মুসাফিরখানা! কে তাদেরকে আশ্রয় দেবে? 
জলিল মুন্সিই তাদেরকে আশ্রয় দিল। জমিতে সোনামন্দি হালিয়া খাটবে আর বাড়িতে আমিরন দাসীবাদী হবে। 
উপায় কি। জমি যখন নেই তখন ভাত নেই। আর যার ভাত নেই তার জাত কোথায়! 
‘আমিই তোকে পথের কাঙাল করলাম।’ বলে সোনামন্দি। 
‘আমার জন্যে তুমি ভাবো কেন? জমির জন্যে ভাবো। আমার চেয়েও জমির অনেক দাম বেশি’। 
বেশি দিন থাকতে হল না সে-বাড়ি। আমিরনকে জলিল মুন্সি নিকা করলে। মহল্লার মোল্লা এসে কলমা পড়াল। 
সোনামদ্দি হতবুদ্ধির মত বলে, ‘বা, তালাক দিলাম কখন’? 
‘ঐ হয়েছে তোমার তালাক দেওয়া। ওর কাছে নিকা বসে জমি আবার ফিরিয়ে দিলাম তোমাকে। এই দেখ কবালা’। আমিরন কবালা দেখাল। 
জলিল মুন্সিকে দিয়ে ফির-বেচার কবালা করিয়ে নিয়েছে আমিরন। রেজেস্ট্রি হয়ে গিয়েছে। রায়তি স্বত্ব আবার চলে এসেছে সোনামন্দির দখলে। ঘর তুলে দিয়েছে নতুন করে। 
“আর তুই?’ 
‘আমিই কবালার পণ। আমার জন্যে মন খারাপ কোরো না। আমার চেয়ে তোমার জমির অনেক দাম বেশি। আমি গেলে কী হয়? কিন্তু জমি তো তোমার ফিরে এল। তোমার জমির গায়ে তো কেউ হাত দিতে পারল না’। 
‘মহবুব?’ 
‘যদি রাত্রে খুব কাঁদে, চুপি-চুপি দিয়ে আসব তোমার কাছে।’ 
——–
রচনা
(১৩৫৩]

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=