সমরেশ বসুর উপন্যাস ‘গঙ্গা’র পাঠ প্রতিক্রিয়া : দেবদ্যুতি রায়

গঙ্গা: এক জলোজীবনের গল্প 

দেবদ্যুতি রায় 
ওরা ‘মাছমারা’-ওরা মানে বিলাস, ওর কাকা পাঁচু, মরে যাওয়া বাপ নিবারণ সাইদার, তার বাপ, আরও আরও অসংখ্য মানুষ। দূর নদীতে আর সাগরে মাছ ধরে চলে ওদের জীবন যে জীবন নিতান্তই মাছের টানে টানে ভেসে যাওয়া গভীর থেকে গভীরতর জলের। যে জীবনের পুরোটা জুড়েই জলের ঘূর্ণি আর ঝড়ের শঙ্কা সত্ত্বেও আছে গভীর জলের প্রতি অমোঘ টান। সেই জীবনের জল আর সোঁদামাটির গন্ধ যেন ছুঁয়ে আসা যায় মাছমারাদের সাথে সাথে। 
গল্পটা সমরেশ বসুর উপন্যাস ‘গঙ্গা’র। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে উৎসর্গ করা এই উপন্যাসের ভূমিকায় সমরেশ বসু লিখেছেন ‘মৎসজীবীদের মাছ ধরার একটি বিশেষ মরশুমী যাওয়া-আসাকে কেন্দ্র করেই গোটা কাহিনী গড়ে উঠেছে। আমার বিশ্বাস, এ রকম কাহিনীকে পরিচ্ছেদে ভাগ করলে এর মানুষগুলো ও তাদের কাজ এবং নদী সব টুকরো হয়ে যায়।’ এ কারণেই ‘গঙ্গা’য় নেই কোনো পরিচ্ছেদ। এই বইয়ে একইসাথে দু’টি আলাদা সময়ের কাহিনী সমান্তরালে বয়ে চলে। আর তারপর কোথায় কখন কীভাবে যেন একই বিন্দুতে মিলে যায় নিবারণ আর তারই ধাতুতে গড়া বড় ছেলে বিলাসের জীবন। কীভাবে যেন অনেক বছর আগের কোনো গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটে সেই একই গঙ্গার তীরে, আবার কখনও বর্তমান অনেক অনেক দূর ছাপিয়ে যায় তারই রক্তের অতীতকে। একটানে লিখে যাওয়া এ উপন্যাসে বারবার মিলেমিশে যায় একাল আর সেকাল। 
‘গঙ্গা’র গল্প, লেখকের মতে, যাবৎ মৎসজীবীদের, জেলে, কৈবর্ত, নিকিরী, চুনুরি, মালো-সব্বাইয়ের, তাদের সাথে আছে রাজবংশীদের মতোন মৎসজীবীরা যারা এ পেশায় আসতে বাধ্য হয়েছে নেহাৎই বাপ-পিতামহের জমিটুকু খুইয়ে। ইছামতী, রাইমঙ্গল আর ‘মা ঠাকরুণ’ গঙ্গার সাথে সমুদ্রের জলই এদের জীবন, এদের মরণ। ‘মা ঠাকরুণ’ দেবী গঙ্গা আর দক্ষিণ রায়ের দয়া দাক্ষিণ্যে চলে এদের জীবিকা। এই জীবনের গল্প পড়তে পড়তে মনোযোগী পাঠককে কোথাও হোঁচট খেতে হয় না গল্পকথকের নিপুন গল্পবুননের কারণে। 
উপন্যাসের শুরু সমুদ্রের ঝড় অর্থাৎ ‘দখনে বাওড়’-এর তাড়া খেয়ে অগুণতি নৌকার সঙ্গে কেষ্টপুরের দিকে পাঁচু আর তেঁতলে অর্থাৎ তেঁতুলতলার বিলাসের ফেরার সময় থেকে। তারপর গল্প এগোয়, কখনও অনেক বছর আগের জীবনের, কখনও ঝড়-ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ বর্তমান কিন্তু সবই সেই মাছমারাদের গল্প যারা জলের টানে আর পেটের টানেও জলের গভীরে যায় বর্ষার দিনে, থাকে মাসের পর মাস, তারপর ফেরে, তারপর সাই নিয়ে যায়, তারপর আবার বাড়ি ফেরে, তারপর আবার… 
সমরেশ বসুর দক্ষ কলম লিখে গেছে আচারে-প্রথায়-বিশ্বাসে গড়ে ওঠা জলোজীবনের নিবিড় চিত্র। সমুদ্রে থাকলে চুল-দাড়ি না কাটা, চৈত্রমাসে কাপড় ছুপিয়ে গাঁজন নেয়া মাছমারাদের গল্প। ‘গঙ্গা’ অভাবি জেলেদের রাতজাগা নির্ঘুম চোখের বউদের গল্প। নদী আর সমুদ্রে আট-নয় মাস কাটানো জেলেদের জন্য উৎকণ্ঠায় কাটানো নির্ঘুম বউয়েরা ফাল্গুনে প্রিয়জন ফিরে এলেও রাত জাগে। কেন? কারণ ওদের জীবনে তখন ‘চোত-কোটা’। মহাজনের বকেয়া সুদ শোধ করতেই গাঁটের কড়ি খোয়ানো জেলেদের হাঁড়িতে লাগে টান। তখন ওদের কারও কারও বউদের ভূতে ধরে, ভূতে ধরা বউয়েরা রাতবিরেতে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়, ‘মেছো-পেতনিরা’ কোনো একদিন গুণীনের বেতের বাড়ি খেয়ে ঘেন্নায়, ক্ষোভে চেঁচিয়ে অভাবের কথা বলে, অভাবে স্বভাবদোষের কথা বলে দেয়, তারপর সে পেতনি চলে গেলে ফুলে ওঠা শরীরে বরের মাখিয়ে দেয়া তেলের ঝাঁঝে কাঁদে, কাঁদে মনের দুঃখে। কিন্তু শুধু বউদেরই ভূতে ধরলে কেমন করে জীবন চলে? অভাবের সংসারে অত সহজে নিস্তার মেলে না কারও। মাছমারাদের কেউ কেউ তাই ‘সনজে’ হতেই আকুলি বিকুলি করে বাড়ি থেকে বেরোয় কোন পাপের উদ্দেশ্যে। 
যেকোনো পাঠকেরই চোখে পড়বে লেখকের কলমে বিলাস আর ওর মৃত কিন্তু ভীষণভাবে জীবন্ত বাপের জীবনের পদে পদে মিলগুলো। সমুদ্রের ফড়েনি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর দামিনীকে কখনও পায়নি নিবারণ সাইদার কিংবা কে জানে, না পেয়েই হয়ত আরও ভীষণভাবে পেয়েছে। তেমনই খুব কাছে পেয়েও দামিনীর নাতনি ‘মহারানী’ হিমিকে পাওয়া হয় না ‘ঢপ’ বিলাসের। ব্যাপারটা হয়ত আজকের শহুরে পাঠকের চোখেও বেখাপ্পা ঠেকতে পারে, বাপের প্রিয়তমার নাতনির সাথে সেই বাপের ছেলের প্রেম! কিন্তু সমরেশ বসু সেই ১৯৬৩-তে বসেই এ কথা চিন্তা করতে পেরেছিলেন। একসাথে চলতে চেয়ে মহারানী হিমি একদিন উঠেও বসে বিলাসের নৌকায়। কিন্তু না, ডাঙার জীবনে অভ্যস্ত হিমি মাটির টানে শেষ মুহূর্তে নৌকা থেকে নেমে যায়। গভীরতর জলোজীবনের অনিশ্চয়তা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় পুরনো জীবনে আবার। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে হিমি হয়ত আরও বেশি আপন হয়ে ওঠে বিলাসের। এ কারণেই সখা সয়ারামের কথার উত্তরে বিলাস জানায় ‘সোমসারে কেবল তার নয়, সকলেরই বুক উথালি-পাথালি করে’। 
সেই উথালি-পাথালি করা বুকের কথা ভাবলে মাছমারার ছেলের জীবন চলে না। তার চেয়ে হিমি চলে যাক, জোয়ারের ‘আগনায়’ হিমিকে দেখতে আসবে বরং। হিমি সঙ্গে না এলেও গহীন জলের টানে আবারও ছুটে চলে তেঁতুলতলার বিলাস। এ পর্যায়ে পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হতেই পারে- আহা রে, এত যে প্রেম, কীই বা এমন ক্ষতি হতো হিমি আর বিলাসকে মিলিয়ে দিলে? কেনই বা বাপ আর ছেলে দু’জনেই উথালি পাথালি করা বুক নিয়ে বাঁচবে সারাজীবন? 
উপন্যাসের শেষে দেখা যায় সেই অগ্রহায়ণে বেতনা নদীতে আঠারো গণ্ডা নৌকার পালে হাওয়া লাগিয়ে সমুদ্রে ছুটে যায় সাইদার বিলাস, তেঁতলে বিলেস, মাছমারাদের বর্তমান প্রজন্মের তুমুল পুরুষ। সবকিছুর পর এই মাছমারা জীবনই তাদের প্রজন্মান্তরেরই সঞ্চয়, ঠিক যেমন অমৃতের বউয়ের বিষে নীল বিলাসের সঞ্চয় তার মহারানী হিমি। সমরেশ বসু সুনিপুণ সাহিত্যিক। তাঁর কলম যে গল্পই লিখেছে, সেটি সেই নির্দিষ্ট জীবনের নিখাদ চালচিত্র হয়ে উঠতে পেরেছে নিঃসন্দেহে। এ উপন্যাসটিও তাই চমৎকার উপভোগ্য এক পাঠ হয়ে উঠতে পারে পাঠকদের জন্য। 

One thought on “সমরেশ বসুর উপন্যাস ‘গঙ্গা’র পাঠ প্রতিক্রিয়া : দেবদ্যুতি রায়

  • January 3, 2019 at 4:09 pm
    Permalink

    এমন গ্রুপে লিখলে একটা লাইকও নাই। 'বইয়ের হাট' এ দাও। আমাকে জানিও।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.