আন্তারেস – পর্ব ৫/৬


পূর্বের অধ্যায়গুলোর লিঙ্ক

পর্ব – ৫

বাবাকে নিয়ে পরাকণা যেখানে সংরক্ষণ করা হয় সেই চক্রটি মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত হল। আমরা আর্তনাদ করে উঠলাম। সবচেয়ে বেশি জোরে চিৎকার করে উঠল ইন্দল–যে কিনা আমার মা নয়­–অথচ যাকে আমি মা বলে চিনি জন্ম থেকে, কিন্তু যে কিনা ঠিক মানুষ নয়। মা আমাকে বললে, “এই ঘর থেকে বার হোস না শোগি।” এই বলে ছুটে বেরিয়ে গেল নিরাপদ ঘর থেকে। আমরা স্ক্রিনে দেখতে পেলাম বাবার হেলমেট-পরা মাথাটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। 
তেজষ্ক্রিয়তা থেকে বাঁচতে হেলমেট পরা ছিল, কিন্তু মহাশূন্যের শূন্য চাপ বা বায়ুহীনতা থেকে বাঁচার জন্য তার সঠিক পোষাক পরা ছিল না। বাবার শরীরটা ধীরে ধীরে বিন্দু হয়ে যেতে লাগল। আধ মিনিটের বেশি মানুষ ঐ চরম পরিবেশে বাঁচে না। নেনা আর তমাল আমার কাছে এল, নেনা আমাকে জড়িয়ে ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। আমার চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকল। 

তিন মিনিটের মাথায়, একটা ছোট মহাকাশযান যাকে সাটল বলা যায় সেটা দেখলাম রওনা হয়ে গেল বাবার দিকে। এরপরে স্ত্রিনটা বন্ধ করে দেয়া হল। নেনা আমার হাত ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে গেল, পাশে তমাল। আমি নিঃশব্দে কাঁদছিলাম। নেনা বলল, “শোগি কেঁদো না, তোমার বাবার কিছু হয় নি।” আমার বাবার কিছু হয় নি, ঐ মহাশূন্যে পাঁচ মিনিটেরও বেশী নিশ্চয় সে ভেসে ছিল, তার কিছু হয় নি? আমি বুঝতে পারলাম না নেনা কী বলছে, কিন্তু বাবার কিছু হয় নি শুনে কান্না থামিয়ে দিলাম। নেনার দিকে তাকিয়ে বললাম, “বাবা বেঁচে আছেন?” বাবা কী করে বেঁচে থাকতে পারেন ঐ বায়ুশূন্য, চাপশূন্য মহাকাশে বুঝতে পারলাম না, কিন্তু তার যে বাঁচার একটা সম্ভাবনা আছে সেটা ভেবেই আমার সমস্ত হতাশা দূর হয়ে গেল। নেনা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিল বুঝতেই পারছিলাম না। অবশেষে বুঝলাম আমরা এসেছি মহাকাশযানের মূল নিয়ন্ত্রণকক্ষে। সেখানে জাহাজের অধিনায়ক ড্রেগলেস ছাড়া আর কেউ নেই। ড্রেগলসে, নেনা আর তমাল এই তিনজন বড়দের সাথে আমি একা, খুব ভয় করতে লাগল, জানি না কেন। ড্রেগলসকে আমরা বাচ্চারা সবাই ভয় করতাম। কিন্তু এখন ড্রেগলস হেসে বলল, “ভয় পেয়ো না, শোগি! সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার বাবাকে এখুনি দেখতে পাবে।” আমি বললাম, “বাবাকে পাওয়া গেছে?” ড্রেগলস বলল, “পাওয়া শুধু যায় নি, তোমার বাবা অক্ষত আছেন। তোমার মা তার সাথে আছেন।” এই বলে ড্রেগলস নেনার দিকে চাইল। নেনা হ্যাঁসূচকভাবে মাথা নোয়াল। 

ড্রেগলস চেয়ার ছেড়ে পায়চারি করা আরম্ভ করল। ড্রেগলসের যেন আরো কিছু বলার ছিল, কিন্তু আমি ভাবছিলাম বাবাকে এখন কীভাবে উদ্ধার করা হচ্ছে। বললাম, “সাটল কি বাবাকে তুলতে পেরেছে?” ড্রেগলস বলল, “অবশ্যই!” ড্রেগলস দুটো ঠোঁট মুখের ভেতর ঢুকিয়ে কী যেন চিন্তা করে। তারপর বলে, “শোগি, তোমাকে আজ একটা কথা বলার সময় এসেছে। ধীরে ধীরে তুমি বা এই জাহাজের তোমার যত ছোট বন্ধুরা তারা এটা জানতে পারবে। আমরা জানতাম এটাকে কোনোভাবেই গোপন করা যাবে না। কিন্তু কিছু অনভিপ্রেত ঘটনারা জন্য তুমিই প্রথম এটা জানছ।” 

আমার মনে একটা অবোধ্য প্রকাশ্য ভয় দানা পাকাচ্ছিল, আমার পেটটা মোচড় দিয়ে উঠছিল, ড্রেগলস যে কী বলবে তা যেন আমি বুঝতে পারছিলাম, মনে মনে বলছিলাম বলো বলো না, আমি শুনতে চাই না। সত্যি কথাটা আমি শুনতে চাই না। আমি মা’কে হারিয়েছি, বাবাকেও হারাতে চাই না। ড্রেগলস যেন বুঝল আমার মনের অশান্তি, সাহায্যের জন্য আবার চাইল নেনার দিকে। নেনা বলতে শুরু করল, “শোগি, তুমি খুব বুদ্ধিমান মেয়ে। তোমার মা’র সঙ্গে ইতিমধ্যে তোমার কথা হয়েছে। তুমি এখন বুঝতে পেরেছ সে কে। শোগি…..”

আমি আমার দু-কান চেপে ধরলাম, চিৎকার করে উঠলাম, “শুনতে চাই না, আমি শুনতে চাই না।” নেনা বলে, “শোগি, তুমি বুঝতে হয়তো পারছ আমি তোমাকে কী বলতে চাইছি। তোমার মা’র মত মানুষ যাদের কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে তাদের একটা নাম আছে। তাদের বলা হয় রোমা – এই নামটা রোবট ও মানুষ এই দুটি কথার আদ্যাক্ষর নিয়ে গঠিত হয়েছে। শোগি, তোমার মা যেমন একজন রোমা, তোমার বাবাও সেরকম একজন রোমা।” 

“না-আ-আ-আ,” বলে চিৎকার করতে করতে আমি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে চাই। তমাল আমাকে জড়িয়ে ধরে আবার ঘরের মধ্যে নিয়ে আসে। “শোগি, রোমা হলেও তোমার বাবা মা তোমাকে মানুষের চেয়ে কম ভালবাসে না, বরং আমি বলব তাদের ভালবাসার বোধ আরো তীব্র। তাদের সংবেদনা আরো গভীর।” আমি কিছু চিন্তা করতে পারছিলাম না। এটা কেমন করে সম্ভব? এর মধ্যেই ঘরে ঢুকল বাবা, তার সাথে মা। কিন্তু এরা কেউ আসলে আমার বাবা মা নয়, যে পৃথিবীটা আমি চিনতাম সেটা ধ্বসে যাচ্ছে। ইন্দল আমাকে মিথ্যা কথা বলেছে, সে বলেছিল আমার বাবা তার মত নয়। তাহলে আমার বাবা কোথায়? 

এই মহাকাশযানে যাকে আমি বাবা বলে এতদিন জেনেছি, যার নাম ক্লেভান, সে দূরে দাঁড়িয়ে অসহায় মুখে আমাকে দেখছিল। মায়াময় ছিল আমার বাবার মুখাবয়ব, বেদনা ভরা, কিন্তু সে তো মানুষ নয়। মহাশূন্যের চরম বিরুদ্ধে পরিবেশে মিনিটের পর মিনিট ভেসে থেকেও তার কিছু হয় নি; না কিছু হয় নি বলব না, গালের চামড়া কেমন ঝুলে পড়েছে, ডান হাতের দুটো আঙুল নেই, কিন্তু তাতে তার যেন কোনো যন্ত্রনা হচ্ছে না। আমি সান্ত্বনা চাইছিলাম, কিন্তু ক্লেভানের যেন সাহস হচ্ছিল না আমার কাছে আসবার; কিন্তু ইন্দল এগিয়ে এল, বলল, “শোগি, তোর ভালর জন্যই আমি মিথ্যে বলেছিলাম।” আমি নেনার হাত ধরে পিছিয়ে আসতে চাইলাম, কিন্তু নেনা তার জায়গা থেকে নড়ল না। আর তখনই যখন ইন্দল আমার খুব কাছাকাছি এসে পড়েছে আমার মনে একটা ভয়াবহ চিন্তা জেগে উঠল। আমি নেনার হাত ছেড়ে দিলাম। 

ঘরে পাঁচটি মানুষ ছিল, আমাদের মহাকাশজানের অধিনায়ক ড্রেগলস, সহঅধিনায়ক ক্যাপ্তেন নেনা, যে কিনা আমার বন্ধু বেলকের মা; নিরাপত্তা অফিসার তমাল, আমার বাবা ক্লেভান আর মা ইন্দল। ইন্দল আর ক্লেভান যে মানুষ নয় সেটা আমি জানি, কিন্তু এমন কি হতে পারে এর সবাই রোমা, কেউই মানুষ নয়, অর্থাৎ ড্রেগলস, নেনা আর তমালও রোমা। আর তাহলে জাহাজের বাদবাকি সবাই? সিয়ানা, বিজন, আস্টার, রুডাবা? এই বড়রা যদি কেউ মানুষ না হয়, তবে আমরা এতদিন কাদের ওপর ভরসা করে চলেছি, কারা আমাদের ভালবেসেছে, আমরাই বা কাদের ভালবেসেছি? আর বাচ্চারা? আমার বন্ধুরা? লাহে, এমা, ইলিয়াল, মালাই, তিলাই, মিলা, রিনা, লেনাক? তারাও কি রোমা? আর বেলক, আমার প্রিয় বন্ধু। না, সে রোমা হতেই পারে না। 

ঘরের পাঁচজন আমার বিস্ফারিত ভয়ার্ত চোখে যেন আমার আতঙ্ক বুঝতে পারে। ইন্দল আর ক্লেভানের চোখের আকুতি আমার কাছে অলক্ষিত থাকে না, কিন্তু তাদের বেদনা কি সত্যিকারের বোধের বেদনা, নাকি যান্ত্রিক? এবার নেনা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “শোগি, তোমার মনে যে প্রচণ্ড ঝড় বইছে তা আমরা সবাই বুঝতে পারছি। তুমি বোধহয় ধরতে পেরেছ যে এই ঘরে আমরা সবাই রোমা।” 

পর্ব – ৬


এতদিন ধরে যাদের বাবা-মা
জেনে এসেছি, জাহাজের বড় সবাইকে আত্মীয় স্বজনের মত ভালবেসেছি সেই ভালবাসা কি এক মুহূর্তে
বদলে যেতে পারে? শুধু যে আমার বাবা ও মা মানুষ নয়, এই জাহাজের বড় কেউই মানুষ না। প্রথম
যে চিন্তাটা মাথায় এসেছিল সেটা হল পালাতে হবে, এখান থেকে পালাতে হবে। কিন্তু মা ও বাবার
অসহায় মুখমণ্ডল দেখে কেন জানি ভরসা এল। মা বলতেন, শোগি ভয় পেলে খুব জোরে নিশ্বাস নিবি,
অনেকখানি বাতাস যেন ভেতরে ঢোকে, তারপর দু সেকেন্ড ধরে রাখবি, জোরে প্রশ্বাস ফেলবি।
আমার মা এখন ইন্দল, সে এখন রোবট-মানুষ রোমা। তবু তার কথাটা তো এখনও কাজে লাগছে। জোরে
নিশ্বাস টানি আমি। বাতাসটা যেন বুকে ছড়িয়ে যায়, হৃৎপিণ্ড শান্ত হয়ে আসে।

এসময়েই বেলক নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ঢোকে, বুঝলাম তমাল দরজা তালাবদ্ধ করতে ভুলে গেছে। ক্লেভানকে
অক্ষত দেখে বেলকের মুখ বিস্ময়ে ভরে গেল, আমার দিকে তাকিয়ে ওর মুখমণ্ডল বিস্ময় থেকে
কিছুটা আতঙ্কের রূপ নিল, বুঝলাম আমার মুখাবয়ব শান্ত হয় নি। নিজের অজান্তেই আমার মুখ
থেকে শব্দ বের হল, বেলক, এরা কেউ মানুষ নয়। বেলকের মা, আন্তারেসের সহ-অধিনায়ক, নেনা বলে উঠল,
বেলক, তুই বুদ্ধিমান ছেলে, ভয় পাস না, আমার
কথাগুলি আগে শোন।

এটা সত্যি যে বেলকের মত বুদ্ধিমান ছেলে আন্তারেসে আর নেই। সে আমার মত ভয় পাবার পাত্র
নয়। তবু পরিস্থিতিটা এতটাই অস্বাভাবিক যে বেলকও ঘাবড়ে গেল, নেনার কথাগুলি তাকে স্বান্তনা
দিল না। বেলক ধীরে ধীরে পেছতে লাগল, নেনাও বেলকের দিকে এগোলো। হঠাৎ বেলক ঘুরে গিয়ে
মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বাইরে বের হয়ে গেল, নিরাপত্তা কর্মী তমাল ও নেনা
বেলককে ধরতে দৌড়াল। নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ঢোকার দুটি দরজা। গোলমালের মধ্যে আমি অন্য দরজাটি
দিয়ে ছুটে বের হলাম। পেছনে শুনলাম ড্রেগলস চিৎকার করে বলছে, ওকে
ধর।
পেছনে পদশব্দ শুনলাম,  মনে হল ইন্দল ও ক্লেভান আমার পেছনে দৌড়াচ্ছে।     

নিয়ন্ত্রণকক্ষের বাইরে করিডরটা বেঁকে গেছে। দৌড়াতে থাকলাম। নিজের বাবা মাকে
কি কেউ ভয় করতে পারে? ইন্দল আর ক্লেভান, এতদিন ধরে যাদেরকে আমি মা আর বাবা বলে জেনে
এসেছি তারা আমার রক্ত মাংসের কেউ নয়, ইন্দল আমাকে যা বলেছিল সব মিথ্যা, কারণ এই জাহাজের
বড় কেউই কারুর বাবা নয়, এমন কি নেনাও বেলকের মা নয়। তবে আমরা কোনখান থেকে আসছি? আমাদের
জন্ম কেমন করে হয়েছিল? রোমা নামে রোবট-মানুষদের সঙ্গে পৃথিবীরই বা সম্পর্ক কী? মা আমার
রোমা হতে পারে, কিন্তু বাবা যখন তেজষ্ক্রিয়তার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল কিংবা মহাশূন্যে
উৎক্ষিপ্ত হল তখন সে কীরকম ভয় পেয়েছিল তা তো আমি দেখেছি। এরকম ভাবতে ভাবতে আর ছুটতে
ছুটতে আমি দেখলাম করিডরের সাথে লাগানো একটা দরজা, এই দরজা দিয়ে একটা সুরঙ্গে ঢোকা যায়
যে সুরঙ্গ আমাদের ঘুরন্ত চাকতির কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সুরঙ্গের মধ্যে একটা মই লাগানো,
কেন্দ্রে যেতে হলে ওই মই বেয়ে উঠতে হবে। আমি কিছু ভাবনা-চিন্তা না করেই মই ধরে ওপরে,
আসলে চক্রের কেন্দ্রে, উঠতে শুরু করি। এরকম ছ
টি সুরঙ্গ বাইরের চক্র
থেকে ভেতরে দিকে বের হয়ে কেন্দ্রে একটি গোলাকার ঘরে মিলিত হয়েছে। সেখান থেকে একটা বড়
করিডর চলে গেছে মহাকাশযানের মূল ইঞ্জিনের দিকে। এর মধ্যে তিনটিতে লিফট লাগানো আছে যাতে
খুব সহজেই কেন্দ্রে পৌঁছানো যায়। আমি আশা করছিলাম কেউ যেন লিফট না নিয়ে আমার আগেই পৌঁছে
যায় সেখানে। চক্রের ঘূর্ণনের জন্য যে কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তৈরি হয়েছিল তা আমাকে
নিচের দিকে আকর্ষণ করছিল। কিন্তু যত ওপরে উঠলাম মাধ্যাকর্ষণ কমে আসতে শুরু করল। আমি
কখনও এখানে আসি নি। নিচে শোরগোল শুনলাম, মা চিৎকার করছে,
শোগি,
ওখানে যাস না, শোগি ফিরে আয়।
মার গলায় উৎকন্ঠা, তাহলে
কি সামনে কোনো বিপদ আছে।

বেশ সময় লাগল আমার কেন্দ্রে পৌঁছাতে। কেন্দ্রে গোলাকার একটি ঘর, আমি বুঝছিলাম ইন্দল
ও ক্লেভান খুব শীঘ্রই আমাকে ধরে ফেলবে। সিঁড়ির শেষ ধাপে উঠে আমি নিজেকে জোরে ঠেলে দিলাম,
ভরশূন্য হয়ে ভাসতে ভাসতে আমি গোলাকার ঘরের অন্যপ্রান্তে চলে যেতে থাকলাম। সেই মুহূর্তেই
বেলক অন্য একটি সুরঙ্গ থেকে বের হল। ও চিৎকার করে বলল, শোগি,
লিফটের দরজার দিকে যাও।
আমি ভাসতে ভাসতে অন্যদিকের দেয়ালে পৌঁছলাম।
তার একপাশেই একটা লিফটের দরজা, এই লিফট দিয়ে আবার চক্রের বাসস্থানে ফিরে যাওয়া যাবে।
কিন্তু ওপরের আলোর সংকেতে বুঝলাম লিফ্ট চক্র থেকে উঠে আসছে। চিৎকার করে উঠলাম,
বেলক,
ওরা লিফট দিয়ে উঠছে।
বেলক হাত দিয়ে বড় করিডরটার দিকে দেখাল। সাধারণত
ওই করিডরের গোলাকার দরজাটা বন্ধ থাকে, কিন্ত আজ পরাকণা সংরক্ষাণাগারের দুর্ঘটনার পরে
দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গেছে সবাই। করিডরটা দিয়ে হেঁটে যেতে হলে চুম্বকের জুতো পরে যেতে
হয়, আর আমাদের পায়ের আকারের জুতোও সেখানে নেই, আর থাকলেও আমাদের জুতো পরার সময় নেই।
বেলককে অনুসরণ করে করিডরটায় ঢুকি, কোথায় চলেছি কেন চলেছি জানি না। এর মধ্যেই নেনার
গলা করিডরে লাগানো স্পিকারে ভেসে আসে,
শোগি, বেলক, তোমরা ফিরে
এসো, যেদিকে যাচ্ছ সেদিকে প্রচণ্ড তেজষ্ক্রিয়তা।
কিন্তু আমরা কথাগুলো অগ্রাহ্য
করলাম, মনে হল পালাতে হবে রোমাদের কাছ থেকে। কিন্তু এই মহাকাশযান ছেড়ে কোথায় পালাব?
তারপর মনে হল অন্য সব ছোটদের সতর্ক করতে হবে। আমি করিডরের দেয়াল ধরে থামি, বেলককে বলি,
ওদের সবাইকে সাবধান করতে হবে।বেলক
দেয়ালের পাশেই একটা প্যানেলের সামনে থামে, সেটাই একটা বোতাম টিপলে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের
ছবি ভেসে ওঠে, সেখানে কেউ নেই। বেলক প্যানেলের মাইক্রোফোন ব্যবহার করে,
আন্তারেস মহাকাশযানের সমস্ত ছোটদের উদ্দেশ্য করে বলছি,
তোমরা এতদিন যাদের নিজেদের মা বাবা বলে ভেবেছিলে তারা আসলে তোমাদের মা বাবা নন। তারা
আসলে কী আমরা জানি না। তারা মানুষ নয় সেটুকু বলা যায়।

আমি আশ্চর্য হয়ে বেলকের দিকে তাকিয়ে থাকি। বেলককে শুধু আমি একটা কথাই বলেছিলাম বেলক এরা মানুষ
নয়। ওইটুকু কথাতে বেলক আমাকে বিশ্বাস করেছে? না, তা হতে পারে না। নিশ্চয় ও আমার আগেই
এই জিনিসটা অনুমান করতে পেরেছিল। আমি প্যানেলের মাইক্রোফোনে চিৎকার করে বলি,
ওরা
নিজেদের রোবট-মানুষ বা রোমা বলে।
বেলক প্যানেলের একটা বোতামে চাপ দেয়। চক্রাকার
বাসস্থানের একটা করিডর দৃশ্যমান হয়। সেখানে কয়েকটি ছেলেমেয়ে বিস্মিত ও ভয়ার্ত চেহারা
নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা টিভি স্ক্রিনে আমাদের দেখতে পাচ্ছে। ওদের মধ্যে রিনা
ও লেনাককেও দেখলাম। এরপর ওরা সবাই একদিকে তাকাল, তারপর অন্যদিকে দৌড়াল। এরপর বড়দের
মধ্যে কাউকে ওদের দিকে দৌড়ে যেতে দেখলাম, কিন্তু কে বুঝতে পারলাম না। এর মধ্যে পেছন
দিকে তাকিয়ে দেখি বাবা, না তাকে তো ক্লেভান বলাই সঙ্গত, ও রুডাবা লিফট থেকে কেন্দ্রীয়
গোলাকার ঘরে ঢুকেছে। আমাদের দেখে ক্লেভান শান্ত গলায় বলল,
শোগি,
আমরা এতদিন যেরকম তোমাদের মা ও বাবা ছিলাম, এখনও তাই আছি, কিছুই বদলায় নি। আর তোমরা
আর সামনে এগিও না, পরাকণা তৈরির একটা চক্র আমরা উৎক্ষেপণ করতে পারলেও আর একটা চক্রে
একটা ফুটো দেখা দিয়েছে, সেটাকে আমরা সারাই করতে পারি নি। সেখান থেকে নির্গত গামা রশ্মি
ও ইলেকট্রন প্রবাহের মাত্রা খুবই সাংঘাতিক, যাই কর না কেন ওদিকে আর এগিও না। শোগি,
লক্ষ্মী মেয়ে আমার।
শেষের কথাগুলো বলতে গিয়ে ক্লেভানের গলা কেঁপে
গেল। ক্লেভান ও রুডাবা আমাদের ধরবার চেষ্টা না করে কেন্দ্রীয় গোলাকার ঘরটির দরজায় দাঁড়িয়ে
রইল।

আমি কথাগুলো শুনে থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। বেলক বলল, এই করিডরের শেষে আর একটা
সুরঙ্গ আছে ঘুরন্ত চক্রাকার অংশে ফিরে যাবার জন্য।
আমরা করিডরের দেয়ালে ধাক্কা
দিয়ে ইঞ্জিনের দিকে এগোতে থাকলাম। ক্লেভান চিৎকার করল,
শোগি।
পেছনে তাকিয়ে দেখলাম ক্লেভান ও রুডাবা আমাদের ধরতে করিডরের দেয়াল ধরে ভেসে আসছে। কয়েক
মিটার যাবার পরই দেয়ালে রাখা একটা স্পিকার থেকে এই কথাগুলো ভেসে আসল,
তেজষ্ক্রিয়তার
পরিমাণ ১৫০ মিলি সেইভার্ট, খুবই বিপজ্জনক মাত্রা, কেন্দ্রে ফিরে যাও।
আমরা কথাগুলোকে
অগ্রাহ্য করে এগোতে থাকলাম। আরো কিছু দূর গেলে শুনলাম
তেজষ্ক্রিয়তা
২৭০ মিলি সেইভার্ট।
ক্লেভান আর রুডাবা এর মধ্যে আমাদের কাছাকাছি
চলে এসেছিল। আমরা একটা চক্রাকার দরজা পেরিয়ে অন্যদিক থেকে বোতাম টিপে সেটা বন্ধ করতে
চাইছিলাম, কিন্তু এর মধ্যে ক্লেভান আমাকে ধরে ফেলল। আমাকে দুহাত দিয়ে জাপটে সে কেন্দ্রীয়
গোলাকার ঘরটিতে ফিরে যেতে চাইছিল, কিন্তু আমি এমনভাবে হাত পা ছুঁড়ছিলাম তাতে সে কোনো
সুবিধা করতে পারছিল না, মাধ্যাকর্ষণ না থাকায় আমরা করিডরের এক দিক থেকে ভেসে অন্য দিকে
যাচ্ছিলাম, মাথা গিয়ে লাগছিল দেয়ালে, তাতে ব্যথাই পাচ্ছিলাম। ওদিকে রুডাবাও বেলককে
কব্জা করতে পারছিল না। এরমধ্যে ঘোষণা শুনলাম,
তেজষ্ক্রিয়তা ৫২০ মিলি
সেইভার্ট।
ক্লেভান রুডাবাকে বলল, বেলককে
দরজার ওই পাড়ে ঠেলা দিয়ে পার করে দাও।
এই বলতে বলতেই ক্লেভান
আমাকে হাত দিয়ে ভীষণ জোরে ঠেলা দিল, আমি ভাসতে ভাসতে কেন্দ্রীয় গোলাকার ঘরটির দিকে
ভেসে যেতে থাকলাম। দেখলাম বেলকও একই ভাবে রুডাবার ধাক্কায় আমার সাথে ভেসে যাচ্ছে। পেছন
ফিরে তাকিয়ে দেখলাম ক্লেভান ও রুডাবা উভয়ই ইঞ্জিনের দিকে ভেসে চলেছে, সেই দূর থেকে
একটা ঘোষণা শোনা যাচ্ছে
তেজষ্ক্রিয়তা ১০২০ মিলি সেইভার্ট।গোলাকার
ঘরটিতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল ইন্দল, নেনা, ড্রেগলস। আমরা তাদের হাত থেকে পালাবার
চেষ্টা করলাম না। সেখানে পৌঁছালে তারা আমাদের কিছুই বলল না, তারা উৎকন্ঠিতভাবে তাকিয়ে
ছিল করিডরের শেষ প্রান্তর দিকে যেখানে ক্লেভান ও রুডাবা একটা ভয়ানক তেজষ্ক্রিয়তার সম্মুক্ষীণ,
যে তেজষ্ক্রিয়তায় মানুষের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।  
       
                
(চলবে)

     



Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=