দিব্যেন্দু পালিত : কেনো লিখি

কেন লিখি?, এই প্রশ্ন নিয়ে কখনও ভাবিনি। সষ্টিশীল কেউ এই প্রশ্নের সোজাসুজি উত্তর খোঁজেন কি না তাও জানি না। এই ধরনের সন্ধানে সমস্যা থাকে, অর্থাৎ উত্তরটা যদি লেখকের মনন- ও-যুক্তিগ্রাহ্য না হয়, তা হলে থেমে পড়বার সমস্যা থাকে। লোকসংগীত বা মং শিল্পের শিল্পীদের– এমনকী ধ্রুপদী সংগীতের শিল্পীদের ক্ষেত্রে যেমন পরম্পরার অবদান থাকলেও থাকতে পারে, সাহিত্যিকের ক্ষেত্রে তেমন থাকার সম্ভাবনা কম। ঐতিহ্য উদ্বুদ্ধ করে হয়তো, ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য চেনায়, কিন্তু অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও প্রায় ‘’বিমূর্ত’ এই প্রশ্নেরর উত্তর দিতে সাহায্য করে না।
নিজের কাছেই অস্পষ্ট কোনও কারণে সেই বহু বছর আগে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়বার পর থেকে শুধু লিখেই গেছি ; লেখার বিষয় নিয়ে ভেবেছি, ভেবেছি ভাষা ও ভঙ্গি নিয়ে, এমনকি লেখায় বর্জনীয় বিষয় সম্পর্কেও; কিন্তু পরিণত বয়সে পোউঁছেও কেন লাখ তা নিয়ে ভাবনার কারণ ঘটেনি, ভাবতে চাইওনি। সূচনায় যা অস্পষ্ট ছিল এখনও তা স্পষ্ট নয়। এই সুত্রে ভবিতব্যের দান স্বীকার করে নেওয়া যায় হয়তো; কিন্তু গদ্য রচনা যে প্রধানত চিন্তা ও সেই চিন্তাকে ভাষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার পরিশ্রমে বিশ্বাসী, তার পক্ষে এই স্বীকারোক্তিও সহজ হবে না। কবিতা অন্য অভিনিবেশ দাবি করে, সব সময়ে না হলেও কখনও কখনও তা স্বতোৎসারিত। এই পরিপ্রেক্ষিতে কেন লিখি’র একটা দার্শনিক ব্যাখ্যা খাড়া করা যায় হয়তো, কিন্তু তা সত্য স্পর্শ করবে না। 
বরং লেখালেখির শুরু থেকে আমার সাহিত্যচর্চা কীভাবে এগিয়েছে, সাহিত্যিকের কাজ নিয়ে কী ভেবেছি এবং সেই ভাবনার সূত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কোন প্রয়োজনে পাল্টেছে আমার লেখা এবং লেখা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা, সে সব বিষয়ে কিছু জানলে হয়তো তার মধ্য থেকেই পাওয়া যাবে নির্দিষ্ট প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর। যদি না পাওয়া যায় তাহলেও ক্ষতি নেই, কারণ সৃজনশীলতার সঙ্গে অনেক সময়েই নিদিষ্টতার সম্পর্ক থাকে না কোনও, যৌন সম্পর্ক থাকে না যুক্তিবিদ্যা কিংবা অঙ্কের। 
বালক বয়স থেকেই বেশ বই পড়ার অভ্যাস ছিল আমার। বই অর্থে সাহিত্যধর্ম। রচনা–গল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা ইত্যাদি। পরে কবিতা পড়ারও আকর্ষণ জন্মায়। মা খুব বই পড়তেন; তার জন্য প্রায়ই বই আনতে হত ভাগলপুরের বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের লাইব্রেরি থেকে। সেইসব বই যখন যেমন সুযোগ পেতাম আমিও পড়ে নিতাম। এর মধ্যে যেমন বিখ্যাত সাহিত্যিকদের রচনা থাকত, তেমনি থাকত তত বিখ্যাত নন এমনি কারও কারও রচনাও।এই পড়াশুনোয় কোনও নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা ছিল না—যেমন বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের বিশেষ বিশেষ বইগুলি যখন পড়েছি প্রায় সেই সময়েই পড়েছি তারাশঙ্কর,বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও কোনও উপন্যাস ও গল্পের বই, যে-পঠনে ক্রমশ যুক্ত হয় প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, বনফুল, সতীনাথ ভাদুড়ী, সুবোধ ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, সন্তোষকুমার ঘোষ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ আধুনিক সাহিত্যিকের বই। ভাগলপুরের যে-স্কুলে আমি পড়েছি সেই দুর্গাচরণ হাইস্কুলের লাইব্রেরি থেকেও বই পেতাম। তবে, স্কুলে যখন উঁচু ক্লাসে, তখন হেডমাস্টার মশাইয়ের নির্দেশে–ইংরেজিতে সড়গড় করার জন্য কিছু– ছাত্রকে বাংলার বদলে ইংরেজি বই পড়তে হত। সেই সময় আমার চার্লস ডিকেন্স, টমাস হার্ডি, মপাসাঁ, চেখভ প্রমুখের রচনার সঙ্গে পরিচয় হয়। 
বই পড়ার মাধ্যমে সাহিত্যের সঙ্গে এই পরিচয় এক ধরনের মোহ সৃষ্টি করেছিল আমার মনে, ইচ্ছে হত নিজেও লিখব। এই ইচ্ছা থেকেই একা-একা যে-চর্চা শুরু করি তার সঙ্গে কোনও প্রশ্নের সম্পর্ক ছিল না, তা ছিল অনিবার্য এক আগ্রহ। এই আগ্রহ থেকেই যখন কলেজের প্রথম বর্ষে তখন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ আয়োজিত সর্বভারতীয় সাহিত্য প্রতিযোগিতার গল্প বিভাগে একটি ছোটোগল্প পাঠাই। কাউকে কিছু জানাইনি, পুরস্কারের আশাও ছিল না। কিন্তু, ঘটনাচক্রে এবং আমাকে বিস্মিত করে ওই গল্পটিই প্রথম নির্বাচিত হয়। বিচারকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন বনফুল। যেদিন পুরস্কার দেওয়া হল সেদিন তিনি আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে তার নিজের ভাষায় বলেছিলেন, ‘তোর লেখার হাত ভালো। চালিয়ে যা—‘ 
এই ঘটনা, বলা বাহুল্য, লেখালেখির ব্যাপারে প্রবলভাবে উৎসাহিত করেছিল আমাকে।। তখন কলেজে পড়ি, কিন্তু সেই পড়াশুনো যেন নিয়মরক্ষামাত্র। লিখতে হবে, আরও লিখতে হবে—এমন একটা ভাবনায় উজ্জীবিত হলেও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ক্ষীণতম ধারণাও তখন পোষণ করিনি। কেন লিখব তা যেমন ভাবিনি, তেমনি, সেই মফস্বল শহরে আমার আশপাশে সাহিত্যচর্চার এমন কোনও পরিবেশও ছিল না যা নিশ্চিত কোনও সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে দেয়। নিজে লেখক, নিজেই তার নিভৃত পাঠক এবং বিচারকও, এইরকম অবস্থান থেকে আমি কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকায় লেখা পাঠানোর কথা ভাবতে শুরু করি। 
কলেজের গোড়ার ক্লাসের ছাত্র থাকার সময়েই আমার প্রথম মুদ্রিত গল্প ‘ছন্দ-পতন’ প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয়-তে, ১৯৫৫ সালে। তখন রবিবাসরীয় বিভাগের সম্পাদক ছিলেন মন্মথনাথ সান্যাল ; ভাগলপুর থেকে ডাকে পাঠানো ওই গল্প কেন তিনি প্রকাশযোগ্য মনে করেছিলেন জানি না। তবে তাঁর ঔদার্য ওই কিশোর বয়সেই আমার লেখক হওয়ার ছাড়পত্র হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৫৮-য় কলকাতায় আসবার আগে আমার বেশ কয়েকটি গল্প প্রকাশিত হয়ে যায় ‘আনন্দবাজার’, ‘দেশ’, ‘ভারতবর্ষ’ ইত্যাদি পত্রিকায়। কবিতা প্রকাশিত হয় ‘কবিতা’, ‘দেশ’, ‘কৃত্তিবাস’ ইত্যাদিতে। বলা বাহুল্য, কয়েকটি গল্প অমনোনীত হয়ে ফেরতও আসে। তাতে ভাঁটা পড়েনি উদ্যমে। 
অকপটে বলি, গোড়ার দিকের সেইসব রচনায় এমন কিছু ছিল না যা নিয়ে সামান্যতম শ্লাঘা বোধ করতে পারি। কেন লিখি, কী লিখি, ইত্যাদি প্রশ্নে তখন আদৌ চিন্তিত ছিলাম না। গল্প, উপন্যাস কাহিনী চায়—চায় ঘটনা, চরিত্র, সংলাপের বিশ্বাস্য বিন্যাস, এগুলিকে নিয়ে 
পৌঁছাতেছতে চায় এমন একটা পরিণতির দিকে যা ধরে রাখে পাঠকের কৌতুহল। কিছুটা চর্চার মাধ্যমে এই শর্তগুলি আয়ত্ত করতে পারলে অনেকেই লিখতে পারেন গল্প, ধৈর্য থাকলে উপন্যাসও। আমিও তা-ই করেছিলাম। কিন্তু, প্রকাশযোগ্যতা অর্জন করলেও সেগুলি লেখাই হয়েছিল, ‘সাহিত্য হয়নি। 
লেখকের কাছে সাহিত্যের দাবি যে অনেক বেশি এবং লেখকমাত্রেই সাহিত্যিক নন, এসব বুঝতে সময় লেগেছিল আরও কিছুদিন—ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, সংস্পর্শ ও পঠনপাঠনের মধ্য দিয়ে, নিজেকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষকদের অন্যতম ছিলেন বুদ্ধদেব বসু; তিনি একদিন বলেছিলেন, ‘লিখতে লিখতেই একজন হয়ে ওঠে। কিন্তু, কেন লিখছি, সাহিত্যিকের পক্ষে এই প্রশ্নটা সব সময়েই জরুরি।’ 
কী লিখব এবং যা লিখব তা কেমন করে লিখব, এই দুটি প্রশ্নে যে কোনও লেখকই কমবেশি চিন্তিত হন। প্রশ্ন দুটির ঠিকঠাক উত্তর পাওয়ার মধ্যেই কিন্তু লেখার সাহিত্য হয়ে ওঠা নির্ভর করে না। সে জন্য দরকার অভিজ্ঞতায় অর্জিত অন্ধকারগুলিকে নিজস্ব অনুভব দিয়ে আলোকিত করা, বুদ্ধি দিয়ে গ্রহণ, বর্জন ও নির্বাচন। এসে যায় আরও নানা প্রশ্ন। একই সময়ে বসবাস করে এবং সেই সময়ের ঘটনা ও ইতিহাসে অভিজ্ঞ হয়েও একজন লেখক যে তার সমকালীন আর একজন বা অন্যান্য লেখকের চেয়ে সর্বতোভাবে আলাদা হয়ে ওঠেন—এই স্বাতন্ত্র্য তিনি অর্জন করেন কীভাবে? কী লিখব, কেমন করে লিখব ছাড়াও একটি প্রশ্ন – অর্থাৎ, কী লিখব না—কি লেখালেখি সম্পর্কে তার ধারণাকে এমনভাবে পরিশীলিত করে যে তিনি অন্যরকম না হয়ে পারেন না? এই পর্বে পৌঁছতে পূর্ববর্তী সাহিত্যিকদের দ্বারা সৃষ্ট ঐতিহ্য কি কোনও ভাবে সাহায্য করে তাকে? ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাই কি সাহিত্যিকের কাজ, নাকি ঐতিহ্য এক রকমের বন্ধন, যা বাধা সৃষ্টি করে তার স্বতঃস্ফূর্তিতে? সাহিত্যিক কি তার সময়েরই ভাষ্যকার? কিংবা, বহু বছর আগে সেই যে চমকে উঠেছিলাম আলবেয়ার কামুর নোটবুকে একটি বাক্য পড়ে : A Work of art is a confession, and Imust bear witness’–এই কনফেশন বা স্বীকারোক্তি, সাক্ষী হয়ে থাকা, সাহিত্যের নির্মাণে কীভাবে সাহায্য করে এই ধরনের উপলব্ধি? 
লেখাকে সাহিত্য করে তোলার প্রয়াস পর্বে এ সব প্রশ্ন প্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। আমারও হয়েছিল। এখনও হয়। অভিজ্ঞতা, বোধ, বুদ্ধি দ্বারা প্রাপ্ত চৈতন্য নিজস্বতা অর্জনে সাহায্য করলেও সাফল্য এনে দেয় কি না জানি না। ওই একটি শব্দ—সাফল্য—যত না দেয় সম্ভবত কেড়ে নেয় তার চেয়ে বেশি। সৃষ্টির ক্ষেত্রে অতৃপ্তির ভূমিকা আরও জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.