সতীনাথ ভাদুড়ী ‘র গল্প : পত্রলেখার বাবা

দোলগোবিন্দবাবুর বাড়ির আড্ডায় চেঁচামেচি নেই, হৈ-চৈ নেই, কথাকাটাকাটি নেই। কথাবার্তাগুলো হয় থেমে থেমে। অতি সংক্ষেপে। একটু একজন বলে, বাকিটা সবাই বুঝে নেয়। সবটা কোনো কথার বলতে হয় না। যে রকম গল্পর সবটা করা যায়, সেসব গল্পে এ আসরের লোকের উৎসাহ নেই। রুচির মিলের জন্যই তিন-চারজন প্রৌঢ় ভদ্রলোকের এই আড্ডাটা টিকে আছে। 
রাস্তার ওদিককার বাড়িতে সেতার বাজানো আরম্ভ হল।
‘শুরু হল!’ 
‘হা-অ্যা।’ 
দোলগোবিন্দবাবু বললেন, ‘যেতে দাও। কী দরকার ওসব কথায়।’ 
ওই বাড়ির কর্তা নতুন বিয়ে করেছেন। তার প্রথম পক্ষের স্ত্রীর ছেলেরা বড় হয়েছে। তাদের বন্ধুবান্ধবরা এই বাড়িতে প্রত্যহ সন্ধ্যায় গানের আসর বসায়, এ জিনিস এঁদের চোখে খারাপ লাগে। সেইটা ওঁরা প্রকাশ করলেন ওই তিনটি বাক্যে। 
আবার সবাই নীরব—যতক্ষণ না আর-একটা নূতন বিষয়ের উপর কথা ওঠে। 
নীরবতা ভাঙল সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ শুনে। 
‘ন্যাপলা আসছে।’ 
‘হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা।’ 
দোলগোবিন্দবাবুর মুখচোখে একটু উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেল। 
‘বাড়ির কাছাকাছি এসে ও সাইকেলের ঘণ্টা বাজাবেই বাজাবে।’ 
‘হ্যাঁ-অ্যা।’ 
ঠিকই নেপাল। সাইকেলখানাকে দেয়ালে ঠেস দিয়ে রেখে সে ঢুকে গেল বাড়ির ভিতর। বেরিয়ে এল খবরের কাগজখানা হাতে নিয়ে। 
‘কাগজে কোনো খবরটবর আছে নাকি হে নেপাল?’ 
‘তাই দেখছি।’ 
গভীর মনোযোগে সে খবরের কাগজ পড়ছে দেখে সকলে অবাক হয়। ব্যাপার কী? দোলগোবিন্দবাবু কিন্তু একবারও নেপালের দিকে তাকাননি। 
আবার মিনিট-দুয়েক সকলে চুপচাপ। 
রাস্তার দিক থেকে টর্চ’-এর আলো পড়ল। কারা যেন আসছে। 
‘ও আবার কারা?’ 
‘অনুপ আর পত্রলেখা হবে বোধ হয়।’ 
‘পত্রলেখা বাড়িতে ছিল না? তাই বলো!’ 
মদনবাবু বেফাঁস কথাটাকে সামলে নিলেন, ‘তাই আজ চা পাওয়া যায়নি এখনও।’ 
‘এত রাত করে গিয়েছিল কোথায়?’ 
‘নীলমণিবাবুর বাড়িতে আটকৌড়ে ছিল যে। ওঁর মেয়ের ছেলে হয়েছে জান না?’ 
নীলমণিবাবুর বাড়ির চাকর পত্রলেখাদের পৌঁছে দিতে এসেছে। হাতের ধামিতে আটকৌড়ের মুড়িমুড়কি আর জিলিপি। 
‘আটকৌড়ের খুব ঘটা দেখছি।’ 
‘হ্যাঁ-অ্যা।’ 
অনুপ দেখাল, তার হাফপ্যান্টের দুই পকেটেই মুড়ি-কড়াই ভাজায় ভরা। 
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তোরই তো ছিল আসল নেমন্তন্ন। দিদি তো পেটুকের মতো তোরই পিছনে পিছনে গিয়েছে।’ 
‘সে আর বলতে হয় না। আমাকে ডাকতে এসেছে তবে গিয়েছি! নইলে আমার দায় পড়েছিল। জিজ্ঞাসা করুন বাবাকে।’ 
‘তোকে ডাকতে এসেছিল, সেও ভাইয়েরই খাতিরে। নইলে আটকৌড়ের কুলো পেটাবার জন্য মেয়েদের আবার ডাকে নাকি।’ 
‘আচ্ছা বেশ, আমি পেটুক। হল তো?’ 
‘এই রে, পত্রলেখা চটেছে। আর তোকে চটালে কি আমাদের চলে। এই দ্যাখনা, তুই আজ ছিলি না, তাই আমরা এখনও চা পাইনি।’ 
‘এই নিয়ে এলাম বলে।’ 
পত্রলেখা বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল হাসতে হাসতে। 
‘এই সেদিন বিয়ে হল না নীলমণিবাবুর মেয়ের?’ একটু চাপা গলা মাধববাবুর। নেপাল কাছেই রয়েছে। ছেলেমানুষদের সম্মুখে এসব কথা যত না বলা যায় তত ভাল। তবে হ্যাঁ, নেপাল আর এখন ছেলেমানুষ নেই। এই মাস থেকে কলেক্টরিতে ‘কপিস্ট’-এর কাজ পেয়েছে। চাকরি-বাকরিতে ঢুকলেই ছোটরা বড়দের সঙ্গে সমান হবার অধিকার পায়। তবুও প্রথম প্রথম একটু বাধে। কাল প্রথম দোলগোবিন্দবাবু নেপালকে একটা গোপন কাজের ভার দিয়ে, তার বড় হবার অধিকারের সুনিশ্চিত স্বীকৃতি দিয়েছেন। সে খবর আড্ডার অন্য বন্ধুদের জানা নেই, তাই তারা গলার স্বর একটু নামিয়ে কথা বলছেন। কিছুক্ষণ সকলে চুপচাপ। নেপাল গভীর মনোযোগের সঙ্গে খবরের কাগজ পড়ছে। 
‘শ্রাবণ মাসে।’ 
‘হ্যাঁ-অ্যা।’ 
‘আর আজকে হল এ মাসের তেইশে।’ 
‘হ্যাঁ।’ 
আঙুলের কড় গোনা শেষ হলে দোলগোবিন্দবাবু বললেন, ‘যাগকে, যেতে দাও ওসব কথা।’ 
সকলেই দোলগোবিন্দবাবুর এ স্বভাবের কথা জানে। পরকুৎসা শোনবার আগ্রহ তারই বোধ হয় দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। শাঁসটুকু নিয়ে ছিবড়েটাকে যথাসময়ে বাদ দিয়ে দিতে তিনি জানেন। তাই আসল শোনা হয়ে গেলে, তিনি মৃদু আপত্তি তুলে বলেন, ‘থাক, থাক—কী দরকার আমাদের এইসব পরের কথার মধ্যে থাকবার?’ 
তাঁর এই বারণ কেউ ধর্তব্যের মধ্যে আনে না। তবু এই কম কথার আড্ডাটা আপন নিয়মে কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়ে যায়। 
ভিতর থেকে পত্রলেখা সকলের জন্য আটকৌড়ের মুড়ি-কড়াই ভাজা নিয়ে এল। 
‘দেখুন কাকা, কে পেটুক—আমি না আপনারা।’ 
‘আরে তোকে কি কখনো পেটুক বলতে পারি। তাহলে তো আমাদের চা-ই দিবি না আজ!’ 
‘মা চা ঢালছে ; এই এনে দিলাম বলে। নেপালদা, তুমি হুট করে চলে যেয়ো না যেন রাগ করে। তোমার মুড়ি নিয়ে আসছি। হাত তো আমার মোটে দু’খানা। একসঙ্গে কতগুলো বাটি আনব?’ 
‘পত্রলেখা, একটি লঙ্কা আনিস তো মা আসবার সময়।’ 
“আচ্ছা, কাকা।’ 
তাঁর বন্ধুরা কেমন অনায়াসে মেয়েদের মা বলে সম্বোধন করেন দেখে দোলগোবিন্দবাবু অবাক হয়ে যান। তিনি তো চেষ্টা করেও পারেন না। বাধোবাধো ঠেকে। একটু বাড়াবাড়ি মনে হয়। পত্রলেখা নামটা যা বড়—অনেক সময় যেন মনেই পড়তে চায় না। মা মা বলে ডাকতে পারলে সুবিধা ছিল। পত্রলেখার অন্য কোনো ডাকনাম দেবারও উপায় নেই ; স্ত্রীর কড়া হুকুম মেয়েকে পত্রলেখা বলেই ডাকতে হবে। তিনি নিজে এই পাড়ারই মেয়ে—ডাকনামেই আজও পরিচিত—ভাল নামটা কেউই জানে না—ডাকনামটা আবার বিশেষ ভাল নয়—তাই পত্রলেখার নাম সম্বন্ধে তার এত সতর্কতা। পত্রলেখা নামটায় দোলগোবিন্দবাবুর প্রথম থেকে আপত্তি। বলেছিলেন যে, যদি লেখা দেওয়া নামই রাখতে হয় তবে সুলেখা বা চিত্রলেখা রাখ না কেন? কিন্তু স্ত্রীর কাছে তার কোনো কথা খাটে? যে কথা একবার মুখ থেকে বার হবে, তার আর নড়চড় হবার জো নেই। পাড়ার মেয়ে–ছোটবেলা থেকে দেখে আসছেন তো তাকে। আর নিজের নাম দোলগোবিন্দ যখন, তার কি পত্রলেখা নামটাকে বড় বলবার মুখ আছে? 
কথার খই ফুটোতে ফুটোতে পত্রলেখা চা দিয়ে গেল। 
‘এবার তুমি পড়তে বোসোগে যাও পত্রলেখা।’ 
‘ও কী হে নেপাল, তুমি যে একগাল করে মুড়ির সঙ্গে এক চুমুক করে চা খাচ্ছ! মুড়ির মুচমুচে ভাবটা চা দিয়ে নষ্ট করে লাভ কী?’ 
‘আমার তাই ভাল লাগে।’ 
‘হ্যাঁ-আঁ! আপরুচি খানা!’ 
বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন পাড়ার ইউনিভার্সাল মাসিমা। এঁর জিভের ধার আছে। আর কোনো খবর ইনি এগারাটর সময় শুনলে, সে খবর এগারটা বেজে দশ মিনিটের মধ্যে পাড়ার সব বাড়িতে অবধারিত পৌঁছে যাবে, এইরকম একটা খ্যাতি তার আছে এখানে।
“কিসের গল্প হচ্ছে ছেলেদের?’ 
‘ও, আপনি এখানে ছিলেন? হচ্ছে এইসব হাবিজাবি কথা। আচ্ছা, চা দিয়ে ভিজিয়ে নিলে মুড়ি-চিড়েভাজার মুচমুচে ভাবটা নষ্ট হয়ে যায় না?’ 
‘দাঁতই নেই, তার আবার মুড়ি খাওয়া। সাতকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে আমার এখন। তবে যেকালে খেতাম তখন মুড়ির সঙ্গে শসা খেতে আমার ভালই লাগত। মুড়ির মুড়মুড়ে ভাবটা শসার জন্য নষ্ট হয়ে যেত বলে তো বোধ হয় না।’ 
‘তাহলে দেখছি নেপালেরই জিত।’ 
‘হ্যাঁ-অ্যা, ওরই জয়জয়কার আজকাল।’ 
‘শুনতে পাচ্ছি তো তাই। আচ্ছা, আমি এখন চলি।’ 
‘বড় তাড়াতাড়ি চললেন?’ 
‘এসেছি কি এখন? জপসন্ধ্যা আমার এখনও বাকি।’ 
“আরে দাঁড়ান দাঁড়ান। এই অন্ধকারে একা যাবেন কি! নেপালের চা খাওয়া শেষ হল বলে। ও পৌঁছে দিয়ে আসুক আপনাকে।’ 
‘না না, ও এখন অনেকক্ষণ ধরে একটু একটু করে চা খাবে। কী বলিস নেপাল? আমার আবার কোথাও যাবার জন্য লোক লাগে নাকি? কাশী বৃন্দাবন সেরে এলাম একা ; এ-পাড়া থেকে ও-পাড়া যেতে লোক লাগবে সঙ্গে?’ 
‘না না। নেপাল সঙ্গে যাক।’ 
‘ও বেচারা এসেছে খবরের কাগজ পড়তে—তোমরা ওকে জোর করে পাঠাবে ফোকলা দিদিমার সঙ্গে।’ 
‘ও কাগজ ওর পড়া। এখন এমনি নাড়াচাড়া করছে।’ 
“হ্যাঁ-অ্যা, রিভাইজ করছে।’ 
‘ইংরাজী করে আবার কী বলা হল? এসব কী আমরা বুঝি। ওসব বুঝবে পত্রলেখার মতো আজকালকার ইংরাজী-পড়া মেয়েরা। আচ্ছা আমি চলি। নেপাল, তুমি খবরের কাগজ পড়।’ 
‘পড়া না হয়ে থাকে, কাগজখানা বাড়িতেও তো নিয়ে যেতে পারে।’ 
‘হ্যাঁ-অ্যা।’ 
এতক্ষণে নেপাল কথা বলল। আর চলে না চুপ করে থাকা। 
‘আমার কাগজ-পড়া হয়ে গিয়েছে। চলুন আপনাকে পোছে দিই।’ 
‘দাঁড়ান দাঁড়ান মাসিমা। একটা কথা। নীলমণিদার নাতি দেখতে গিয়েছিলেন তো? কেমন হয়েছে?’ 
‘দিব্বি বড়সড় ছেলে। প্রশ্ন ও উত্তর দুই-ই চাপা গলায়। দুই-ই অর্থপূর্ণ। এর চেয়ে সংক্ষেপে বলা যেত না। 
‘থাক থাক, যেতে দাও, দরকার কী ওসব পরের বাড়ির কথায়।’ 
নেপাল খবরের কাগজখানা সযত্নে ভাজ করছে। বাড়ির ভিতর থেকে দোলগোবিন্দবাবুর স্ত্রীর চিৎকার শোনা গেল ‘চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড় পত্রলেখা! অঙ্ক-টঙ্ক এখন নয়। ওসব চালাকি আমি ঢের বুঝি, বুঝলি।’ 
‘এতক্ষণে শক্ত পাল্লায় পড়েছে পত্রলেখা।’ 
‘হ্যাঁ-অ্যা।’ 
পত্রলেখা জোরে জোরে ইতিহাস-পড়া আরম্ভ করেছে। 
‘বাপের নাম দোলগোবিন্দ, মায়ের নাম খেঁদি, মেয়ের নাম হল কিনা পত্রলেখা! হেসে বাঁচি না। নেপাল, আর কেন—চল এবার আমরা যাই। তোর দরকার থাকে তো আবার না হয় ফিরে আসিস এখানে, আমাকে পৌঁছে দিয়ে।’ 
‘হ্যাঁ-অ্যা।’ 
“না না না—আমি আর আসব না—ওই দিক দিয়েই বাড়ি চলে যাব।’ 
বেশ জোরের সঙ্গে বলা। বোঝা গেল যে এতক্ষণে নেপাল সত্যি সত্যিই মত স্থির করে ফেলেছে। 
অতি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে খবরের কাগজখানা দোলগোবিন্দবাবুর হাতে দিয়ে নেপাল বারান্দা থেকে নেমে এল। তিনিও নিস্পৃহভাবে বাঁ-হাত বাড়িয়ে অকিঞ্চিৎকর জিনিসটাকে নিলেন। বুঝে গিয়েছেন তিনি, কাগজখানা বাড়ির ভিতরে না রেখে নেপাল তার হাতে দিল কেন। বুদ্ধিমান ছেলে নেপাল– 
কারও মুখে একটাও কথা নেই। মাসিমার গলার স্বর ক্রমে ক্ষীণ হয়ে তারপর আর শোনা গেল না। নির্বাক আড্ডায় একজন পা দোলাচ্ছেন, একজন আঙুলের কর গুনছেন, একজন আঙুল মটকাচ্ছেন। এ সবই প্রত্যাশিত আচরণ, হিসাব করবার সময়ের। গুণে, হিসাব করে একটা সঠিক তারিখ বার করবার গুরু দায়িত্ব এখন এদের মাথায়। নীলমণিবাবুর মেয়ের বিয়ের তারিখটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আর এখন এদের উপায় নেই। চুপ করে আছেন বলে যে এরা সময় নষ্ট করছেন তা নয়। 
‘সেটা ছিল উনিশে আগস্ট। ঠিক মনে পড়েছে।’ তারিখের হিসাব মদনবাবুর সব সময় নির্ভুল। সেইজন্য কেউ তার কথার প্রতিবাদ করল না। 
“যেতে দাও ওসব কথা।’ 
‘হ্যাঁ-অ্যা।’ 
এর চেয়ে বেশি কথা খরচ করতে কেউ রাজী না। বহুক্ষণ ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সকলে। দোলগোবিন্দবাবু নেপালের দেওয়া খবরের কাগজখানা হাত থেকে নামাননি তখন থেকে। রোলারের মতো গোল করে পাকিয়ে নিয়েছেন কাগজখানাকে। 
মনের কথা সঙ্গে সঙ্গে মুখে না প্রকাশ পেয়ে যায়, এ সংযম এদের প্রত্যেকেরই আছে। নীলমণিবাবুর মেয়ের বিয়ের সঠিক তারিখটা খুঁজে বার করবার মধ্যে অঙ্কর উত্তর মিলবার তৃপ্তি নেই। ওটা শুধু কৌতূহল জাগ্রত করবার প্রথম ধাপ। তার পরের প্রশ্ন ও উত্তরটাই যে আসল। সেইটা আসছে—এইবার আসছে! এই নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা অতি সংক্ষিপ্ত সারকথা খোঁজবার পালা এখন চলেছে। কার মুখ থেকে সেই কথার নির্যাসটা বার হবে প্রথম, তার এখনও ঠিক নেই। দোলগোবিন্দবাবু পা নাচাচ্ছেন। তিনি যখনই খুব বিচলিত হয়ে পড়েন তখনই এমনি করে পা নাচান। এইরকম অবস্থায়, তিনি অনেক সময় ভুলে পরনিন্দা করে ফেলেন। 
তবে কি ছোট্ট টিপ্পনীটা তাঁর মুখ থেকেই বার হবে? তাঁর অবিরাম পা-নাচানো লক্ষ্য করে বন্ধুরা সেই প্রত্যাশাই করছেন! 
কিন্তু ব্যাপারটা ঘটল একেবারে অন্যরকম। অতি পরিচিত ভঙ্গিতে দোলগোবিন্দবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কটা বাজল?’ 
অবাক হয়ে এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। ব্যাপার কি? সবে আজকের আড্ডাটা জমে আসছিল। বন্ধুরা জানে যে ওই প্রশ্ন দোলগোবিন্দবাবুর নোটিশ–আড্ডা ভাঙবার। রাত সাড়ে-আটটা পর্যন্তই এ আড্ডার মেয়াদ। দোলগোবিন্দবাবুর স্ত্রীর হুকুম। স্ত্রীর কথা না শুনে চলবার সাহস তার নেই। শাসন বড় কড়া। পত্রলেখার পড়াশোনায় একটু মন কম ; তার লেখাপড়ার একটু দেখাশোনা না করলে গিন্নী রাগারাগি করেন।–‘অঙ্ক না-হয় তোমার মাথায় ঢোকে না ; অন্য বিষয়গুলো তো পড়তে পার! আর কিছুনা হোক বানান- টানানগুলোও তো একটু দেখিয়ে দিতে পার। না-ও যদি পড়াও, কাছাকাছি একটু বসে থাকলেও তো মেয়েটা নভেল-নাটক না পড়ে, পড়ার বইটই নাড়াচাড়া করে। মেয়েকে ঢুলতে দেখলে চোখে জলের ঝাপটাও তো দিয়ে আসতে বলতে পার। আমি থাকি সে-ই রান্নাঘরে—’ 
এইসব মুখঝামটার ভয়ে সাড়ে-আটটার সময় আড্ডা ভাঙতে হয় প্রতিদিন। খাওয়া রাত দশটায়। তার আগে কিছুতেই না—মরে গেলেও না। এই হচ্ছে পত্রলেখার মায়ের ব্যবস্থা। 
এইসব ব্যবস্থার কথা দোলগোবিন্দবাবুর বন্ধুদের সকলেরই জানা। কিন্তু কথা হচ্ছে যে, আজকে যেন সাড়ে-আটটা বড় তাড়াতাড়ি বেজে গেল। অবশ্য তাদের কারও কাছেই ঘড়ি নেই—তবে একটা আন্দাজ আছে তো সব জিনিসেরই। দোলগোবিন্দবাবু যেন একটু উসখুস করছেন। এ জিনিস বন্ধুদের নজর এড়ায় না।–কেন?—মেয়ের পরীক্ষার সময় এখন তো নয়। কোনো কথা না বলে বন্ধুরা উঠলেন। যাবার আগে দোলগোবিন্দবাবুর মুখচোখ আর একবার ভাল করে খুঁটিয়ে দেখে গেলেন। 
‘হ্যাঁ-অ্যা’। শুধু এই কথাটা জুতো পরবার সময় একজনের মুখ থেকে অজানতে বার হয়ে গেল। 
এতক্ষণে দোলগোবিন্দবাবু নিশ্চিন্ত হয়ে হাতের খবরের কাগজখানা খুলবার সময় পেলেন!—ঠিকই আন্দাজ করেছিলেন। ছেলেটার বুদ্ধি আছে! পারবে। এ ছেলে পারবে। কোনো কাজের দায়িত্ব দিয়ে বিশ্বাস করা যায় এসব ছেলেকে!—এদের হাতে রাখতে পারলে লাভ আছে! 
খবরের কাগজের ভাঁজের ভিতর, টাইপ-করা চিঠি, আর একখানা খাম। খামের ঠিকানাটাও টাইপ করে লেখা—এত তাড়াতাড়ির মধ্যেও ছেলেটার মাথায় বুদ্ধি খেলেছে খুব! 
টাইপ করবার জন্য কাল রাত্রিতে নিজের লেখা খসড়াটা দিয়েছিলেন নেপালের কাছে। নেপাল ফৌজদারী আদালতে কপিস্ট-এর পদে বহাল হয়েছে নতুন। তার কাছে সব কথা খুলে বলেছিলেন। প্রথমে বুঝতে পারেনি নেপাল ব্যাপারটা। ‘দশের উপকার’, ‘অপ্রিয় কর্তব্য’, ইত্যাদি কথাগুলো দোলগোবিন্দবাবুর মতো অল্পকথার মানুষের মুখে শুনে প্রথমটায় ভ্যাবাচাকা লেগে গিয়েছিল তার। তার উপর আবার ফিসফিস করে বলা। পর মুহূর্তে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল আগাগোড়া জিনিসটা। গলা নামিয়ে সে বলে, ‘এ আর একটা শক্ত কাজ কী কাকাবাবু। কিছু ভাববেন না। মেসিন বাড়িতেও নিয়ে আসতে পারি যদি দরকার পড়ে তো। যখন যা দরকার লাগবে বলবেন কাকাবাবু।’ 
‘না না, আমার নিজের আবার দরকার কী। পাবলিকের উপকারের জন্যই এ কাজ করা।’ 
“সে তো বটেই।’ 
এই হয়েছিল কালকের কথা। নেপাল পত্রলেখায় বাবার আস্থাভাজন হতে পারবার সুযোগ পেয়ে কৃতার্থ হয়ে গিয়েছিল। 
উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারীর সম্বন্ধে বেনামী চিঠি হাতে না লিখে, টাইপ করে পাঠানোই সবদিক বিবেচনা করে যুক্তিযুক্ত। নিজের অফিসের মেসিনে টাইপ করা নিরাপদ নয়। তাই নেপালের সাহায্য নেবার দরকার হয়েছিল। 
বেনামী চিঠি পাঠানো দোলগোবিন্দবাবুর পক্ষে নতুন না। এ তার দীর্ঘকালের অভ্যস্ত বিলাস। স্ত্রীপুরুষ-নির্বিচারে কত বেনামী চিঠি যে তিনি আজ পর্যন্ত লিখেছেন তার ইয়ত্তা নেই। তিনি নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে তার এই কাজ সমাজের কল্যাণার্থে। কিন্তু মনে মনে জানেন কেন লেখেন। এর মধ্যে তিনি একটা অদ্ভুত আনন্দ পান। দুর্বার এর আকর্ষণ। পরকুৎসা করবার বা শোনবার রসটা মিষ্টি সন্দেহ নেই, কিন্তু এর তুলনায় পানসে। এটাকে শুধু আড়াল থেকে খুনসুড়ি করে, মজা উপভোগ করা ভাবলে ভুল হবে। এ হচ্ছে ক্ষমতা-সচেতন মেঘনাদের মেঘের আড়াল থেকে নিজের অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। শিকারের উপর বেনামী চিঠির প্রতিক্রিয়ার কথাটা কল্পনা করেই সবচেয়ে বেশি আনন্দ ; সেটা নিজের চোখে দেখতে পেলে তো কথাই নেই। এই ঘন রসের নেশা তার একদিনে গড়ে ওঠেনি। ধাপে ধাপে এগিয়েছেন তিনি। প্রথম বয়সে স্কুলের পায়খানার দেওয়ালে লিখতেন। তারপর আরম্ভ করেছিলেন রাতদুপুরে শহরের দেওয়ালে আর ল্যাম্পপোস্টে কুৎসা-ভরা প্ল্যাকার্ড আঁটা। কিন্তু ওসবের স্বাদ কিছুদিনের মধ্যে ফিকে মনে হয়েছিল। ওর রস প্রচারে ; চটকদার কুৎসার কথাটা দশজনে মিলে উপভোগ করে। কিন্তু বেনামী চিঠি দেবার আনন্দের জাত আলাদা ; একা উপভোগ করবার অধিকারের আমেজ অনেক বেশি গভীর। তাই তিনি ক্রমে ওসব ছেড়ে এই পথ ধরেন। এ পথে বিপদ-আপদও অপেক্ষাকৃত কম। 
এই নিরাপত্তার দিকে চিরকাল তার দৃষ্টি সজাগ। তার বেনামী চিঠি দেবার কোনো কথা বন্ধুরাও জানেন না। কারও সঙ্গে তিনি কখনও আলোচনা করেননি এসব কথা। কাউকে বিশ্বাসী পাননি। ওসব বিষয়ে কখনো কোনো কথা উঠলে, তিনি চিরকাল একটা নির্লিপ্ত উদাসীনতার ভাব দেখাতে অভ্যস্ত। জানেন এক শুধু তার স্ত্রী—তাও সবটা নয়, কিছু কিছু। যত লুকিয়েই নেশা কর না কেন, স্ত্রীর কাছে কোনো-না-কোনো সময় সেটা ধরা পড়তে বাধ্য। চাবি-দেওয়া দেরাজের মধ্যে চিঠি লিখবার সরঞ্জাম, আর ডাকটিকিটের প্রাচুর্য দেখেই তার স্ত্রীর মতো বুদ্ধিমতী মহিলা হয়তো অন্য একটা মনগড়া মানে করে নিতেন। তাই তিনি তার সমাজসেবার নিজস্ব ধারার কথাটা স্ত্রীকে জানিয়ে দলে টানতে চেষ্টা করেছিলেন। সে অনেকদিনের কথা হল। বেনামী চিঠিও আবার নানারকমের আছে তো। দরকার পড়েছিল সেদিন একখানা মেয়েমানুষের হাতে-লেখা বেনামী চিঠির। উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে স্ত্রীকে বলতেই দেখা গেল যে এ বিষয়ে তার উৎসাহ ও তৎপরতা প্রচুর। একবার জিজ্ঞাসাও করেননি এ কাজে কোনো বিপদ আছে কি না। সম্মতিজ্ঞাপক মৃদু আপত্তি জানিয়ে, পরার্থে, গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে, স্বামীর দেওয়া ‘ডিক্টেশন’ লিখেছিলেন। লেখা শেষ হলে রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘পাড়ার মধ্যে হয়েছিল বিয়ে আমাদের। বরের চিঠিও কোনোদিন পাইনি ; বরকে চিঠি লেখবার সুযোগও কোনোদিন পাইনি। চিঠি লেখার পার্টই আমার নেই। যাক, ফাঁকি দিয়ে সুযোগ পেয়ে গেলাম জীবনে প্রেমপত্র লিখবার।’ 
আর গুণের মধ্যে বেনামী চিঠির কথা পাড়ার অন্য কারও কাছে বলে না ফেলবার মতো বুদ্ধি আছে তার স্ত্রীর। 
এখন কথা হচ্ছে যে, নেপালটারও সে সুবুদ্ধি আছে কি না। নেপালকে বিশ্বাস করে তিনি ভুল করলেন কি না সেই কথাটাই কালকে থেকে তাকে পীড়া দিচ্ছে। তবে আজকে খানিক আগেই নিজের আচরণে নেপাল যা দেখিয়েছে তাতে মনে হয় তাকে বিশ্বাস করতে পারা যায়। 
যাক, সেসব যা হবার তা তো হয়েইছে। এখন তার হাতে অনেক কাজ। উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী সংক্রান্ত টাইপ করা চিঠিখানা দেখেশুনে এখনই ঠিকঠাক করে রাখতে হবে; নইলে ভোরে উঠে মাইল চারেক দূরের ডাকবাক্সে চিঠিখানা ফেলে আসতে পারবেন কী করে। এ পাড়ার পোস্ট অফিসের ছাপ চিঠিখানার উপর কোনোমতেই পড়তে দেওয়া উচিত নয়। তা ছাড়া আবার একটা নতুন কাজ হাতে এসে পড়ল হঠাৎ, আজকের সান্ধ্য আড্ডার গল্প থেকে। নীলমণিবাবুর মেয়ের ‘কেসটা’। এই রকমই হয় ; কোন দিক থেকে যে কখন কাজের বোঝা মাথায় এসে পড়ে তার কি ঠিক আছে! যখন আসে, তখন যেন অনেকগুলো একসঙ্গে হুড়মুড় করে এসে পড়ে—এ তিনি চিরদিন দেখে এসেছেন। এখন নীলমণিবাবুর নামে একখানা বেনামী চিঠি ছাড়তেই হয়। নতুন জামাইয়ের কাছে এখন নয়। সে সব হবে পরে দরকার বুঝলে—একটা সতর্কবাণীর মধ্যে দিয়ে। এখন শুধু নীলমণিবাবুকে দিতে হবে একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রথম চিঠিতে তার চেয়ে বেশি কিছু দেবার প্রয়োজন হবে না। একসঙ্গে বেশি না। নিংড়ে নিংড়ে একটু একটু করে এসব আনন্দের রস নিতে হয়। কোণঠাসা প্রাণীটা এখন সম্পূর্ণ তার আয়ত্তের মধ্যে। আঘাত খাওয়ার পর আহত শিকারটার চোখের মণিটাকে তার বড় দেখতে ইচ্ছা করে ; ভয়ার্ত বুকের অসহায় স্পন্দন আঙুলের ডগায় নিতে ইচ্ছা করে।–জামাইয়ের চিঠিখানাও এখনই দিয়ে দিলে কেমন হয়?—কিন্তু ঠিকানা যে জানা নেই। মদনবাবুর এসব মুখস্থ। কথায় কথায় জেনে নিলেই হত আজ। বড় ভুল হয়ে গিয়েছে।– 
দোলগোবিন্দবাবু উঠলেন, ঘরের ভিতর যাবার জন্য। পত্রলেখা ছুটে আসছিল এই দিকেই—হাতে বই। 
‘নেপালদা। এ কী, নেপালদা চলে গিয়েছে?’ 
‘হ্যাঁ, সে তো মাসিমার সঙ্গে গেল। কেন রে?’ 
‘লাইব্রেরির বইখানা আজ ফেরত দেবে বলেছিল!’ 
নেপালই নিয়মিত লাইব্রেরি থেকে বই এনে দেয় এ বাড়িতে। 
‘যাক, কালকে ফেরত দিলেই হবে। বইখানা দে তো দেখি একবার।’ 
‘এ বই তোমার পড়া। বঙ্কিমচন্দ্রের গ্রন্থাবলী।’ 
‘না, সেজন্য চাচ্ছি না। বইখানা বেশ লম্বা সাইজের আছে। দুচারখানা অফিসের চিঠি লিখতে হবে ; ওই বইখানার উপর কাগজ রেখে লিখবার বেশ সুবিধা।’ 
‘দাঁড়াও, আমি বড় প্যাডখানা এনে দিচ্ছি।’ 
“না না, এতেই হবে। তুই শিগগির পড়তে বসগে যা। নইলে তোর মা এখনই আবার বকাবকি আরম্ভ করবে। চেঁচিয়ে পড়বি, বুঝলি। আর তোর কলমটা দিয়ে যাস তো।’ 
এসব কাজে নিজের কলম ব্যবহার না করে অপরের কলম ব্যবহার করাই ভাল। পত্রলেখা কলমটা দিয়ে যাবার সময় একখানা লম্বা গোছের পাতাও আনে। 
‘লাইব্রেরির বই ; ছিড়ে-ছুঁড়ে যাবে; তার চেয়ে এই খাতাখানার উপর কাগজ রেখে লেখাপড়া করো।’ 
‘লাইব্রেরির বই ছিড়বে কেন? আমি কি বইয়ের সঙ্গে কুস্তি করতে যাব। যা, পড়তে বসগে যা। তুই দেখছি আমাকেও আজ বকুনি না খাইয়ে ছাড়বি না!’ 
মেয়ে যেন একটু ক্ষুন্ন হয়ে চলে গেল। কথাগুলো বোধ হয় একটু কড়া হয়ে গিয়েছে। মেয়েকে তিনি কোনোদিনই বকতে পারেন না। শুধু মেয়েকে কেন, কাউকেই বকা, চিৎকার করা এসব তার কোনোকালেই আসে না। 
চাবি দিয়ে তার প্রাইভেট দেরাজ খুলে, তিনি লেখাপড়ার কাগজপত্র বার করলেন। একে তার স্ত্রী ঠাট্টা করে বলেন, কুনোব্যাঙের দপ্তর খুলে বসা। খাম, পোস্টকার্ড, টিকিট, কাগজ,বহুরকমের কালি আরও অনেক দরকারি জিনিসের তার স্টক থাকে, কখন কাজে লাগবে বলা তো যায় না। বেনামী চিঠি পাঠাবার দিনে ওসব কেনা ঠিক না। নেপালের চিঠিখানা তিনি ভাল করে পড়লেন। দু-চারটে বানানে ভুল করলেও মোটামুটি মন্দ টাইপ করেনি নেপাল। ভুলগুলো কালি দিয়ে সংশোধন করা ঠিক হবে না—কে জানে কিসে থেকে কী হয়। খামখানা থুতু দিয়ে আঁটবার সময় চোখের সম্মুখে ভেসে উঠল সেই সরকারী কর্মচারীটির ছবি। অপ্রত্যাশিত আঘাতে কেমন করে ছটফট করে বেড়াবে, অথচ কাউকে কিন্তু বলতেও পারবে না—এ কথা ভেবেও আনন্দ।–লোকটার উপর লক্ষ্য রাখতে হবে।– 
‘চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়, পত্রলেখা।’ 
এইবার দোলগোবিন্দবাবু দ্বিতীয় চিঠিখানা লিখতে বসলেন। অপ্রতিহত তার ক্ষমতা এখন। পুতুলনাচের সূতো তার হাতে ; যেমনভাবে ইচ্ছা নাচাতে পারেন। আজকের হঠাৎ ঘাড়ে এসে পড়া দায়িত্ব ; সর্বাধুনিক কিনা, তাই এইটাই আজকের আসল কাজ। তিনি একখানা খামের উপর খসখস করে বাঁ হাত দিয়ে নীলমণিবাবুর ঠিকানাটা লিখলেন। অভ্যস্ত হাত। তারপর আরম্ভ হল চিঠি লেখা। কলম হাতে ধরলে কখনও কথার জন্য ভাবতে হয় না তাকে। কিন্তু আজ প্রথমেই আটকাল একটা বানানে! আরম্ভ করেছিলেন ‘আমরা ঘাস খেয়ে থাকি না। লোকের চোখে ধুলো–‘ 
খটকা লাগল ধুলোর বানানে। ধ-এ দীর্ঘউ না ধ-এ হ্রস্বউ? এইটা দেখবার জন্য পত্রলেখার কাজ থেকে বাংলা অভিধানখানা চাইতে একটু সংকোচ বোধ হল। লাইব্রেরির বইয়ের মলাটের উপর ধূলো আর ধুলো দুটো পাশাপাশি লিখে দেখলেন কোনটা দেখায় ভাল। দুটোই সমান যে! যদি ধূলো কথাটা পাওয়া যায় এই ভেবে বঙ্কিচন্দ্রের গ্রন্থাবলীর পাতা ওলটাতে আরম্ভ করলেন।–বঙ্কিম চাটুজ্যে কি আর ধুলোটুলো নিয়ে কারবার করে। গোধুলি, ধূলি, ধুলিকণা এইসব গোটাকয়েক পাওয়া গেল ; কয়েক পৃষ্ঠার পর হাল ছেড়ে দিয়ে অন্যমনস্কভাবে বইখানা নাড়াচাড়া করছেন—একখানা কাগজ বেরিয়ে এল। কতদূর পর্যন্ত পড়া হল, তারই বোধ হয় চিহ্ন দিয়েছিল লাইব্রেরীর কোনো পাঠক ওই কাগজখানাকে দিয়ে। কাগজখানার উপরের লেখাটার দিকে নজর গেল।—এ কী! পত্রলেখার হাতের লেখা না?—লেখাটা পড়লেন। প্রথমটার একটু গোলমেলে ঠেকে। চিঠিখানার নিচে কোনো নাম নেই। কাকে লেখা তারও কোনো উল্লেখ নেই চিঠির ভিতরে। চিঠিখানা তাড়াতাড়িতে লেখা—মনে হয় খানিক আগেই লেখা হয়েছে। 
–সন্ধ্যার সময় বাড়িতে থাকতে পারিনি। ছোট ভাইকে নিয়ে মা’র হুকুমে আটকৌড়েতে যেতে হয়েছিল। আমার যেতে একটুও ইচ্ছা ছিল না। রাগ কোরো না লক্ষীটি।– 
শেষের শব্দটার ভুল বানান এই মানসিক অবস্থাতেও নজরে পড়ে।–না–অসম্ভব! আবার পড়ে দেখলেন।—রাগে সর্বশরীর রি-রি করে ওঠে। নিজের মেয়ের এই কাজ। ইচ্ছা হয় চুলের ঝুঁটি ধরে এখানে টেনে নিয়ে এসে মেয়ের এই আচরণের জবাবদিহি নেন। 
চিৎকার করে মেয়েকে ডাকতে গিয়ে মনে হল যেন হঠাৎ মেয়ের নামটাই মনে পড়ছে না; কেমন যেন গুলিয়ে গেল! পরের মুহূর্তে নামটা খুঁজে পেলেন। তিনি আজ পর্যন্ত কখনো বকেন নি। মারধর বকুনি, ওসব তার আসে না কোনো কালে। ওসব হচ্ছে ওর মায়ের ডিপার্টমেন্ট।–তা ছাড়া মায়ের কাছে কি কখনো ওসব কথা তিনি বলতে পারেন।– 
সব রাগ গিয়ে পড়ল ভিজে-বিড়াল ন্যাপলার উপর। ওটার উপর বিশ্বাস করে তিনি কী ভুলই না করেছেন!—মা-বাপেরই বুঝি এসব জিনিস নজরে পড়ে সবচেয়ে শেষে! এতক্ষণে তার খেয়াল হল যে আজ সন্ধ্যার আড্ডায় বন্ধুদের কথাগুলোর ইঙ্গিত এই দিকেই ছিল। মাসিমা পর্যন্ত নেপালের এত মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ পড়ার উপর কটাক্ষ করতে ছাড়েন নি। দেখা যাচ্ছে সকলেই জানেন, নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেন ; সকলে ঘুরিয়ে তাকেই খোঁটা দিচ্ছিলেন এ নিয়ে। অথচ শুধু তিনিই বুঝতে পারেননি সে সময়। এর আগে ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে।—ছি ছি ছি!–ওই হতভাগাটাকে মেরে ঠাণ্ডা করতে হবে; ওর এ বাড়িতে আসা বন্ধ করতে হবে; করতে হবে তো আরও কত কী! কিন্তু তার সে যে ওসব আসে না কোনো কালেই। পৃথিবীর যত ঝঞ্জাট কি তারই উপর এসে পড়বে!—ওই বাঁদরটাই নিশ্চয় পত্রলেখাকে বইয়ের মধ্যে রেখে চিঠি পাঠানোর ফন্দিটা শিখিয়েছে। ও চালাকিটা আগে থেকে রপ্ত না থাকলে, কখনও কি অত তাড়াতাড়িতে খবরের কাগজের ভাঁজের মধ্যে ভরে চিঠি চালান দেবার কথাটা কারও মাথায় খেলে? ধরে চাবকানো উচিত রাস্কেলটাকে!–কিন্তু মারধোর করলে নেপালটা আবার চটে তার বেনামী চিঠি দেবার অভ্যাসের কথা লোকের কাছে বলে বেড়াবে না তো? তাঁর নিজের হাতের লেখা চিঠির খসড়াটাও যে সেই হতভাগাটার কাছেই থেকে গিয়েছে।—ভয়-ভয় করে। 
কী করা উচিত এখন? অনেকক্ষণ ধরে তিনি চিন্তা করে দেখলেন বিষয়টাকে নানা দিক থেকে। যত ভাবেন তত মাথা গরম হয়ে ওঠে। কোনো কূলকিনারা পাওয়া যায় না। 
শেষ পর্যন্ত পত্রলেখার বাবা তার দেরাজের থেকে একটা পুরনো পেন হোল্ডার বার করলেন। কলমটার নিব নেই। কলমের উলটো দিকটা কালির মধ্যে ডুবিয়ে ডুবিয়ে বাঁ হাত দিয়ে তিনি লিখছেন। লিখছেন নতুন একখানা চিঠি। বেনামী চিঠি। পত্রলেখার মায়ের কাছে। জীবনে স্ত্রীর কাছে তার এই প্রথম চিঠি লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=