জগদীশ গুপ্ত ‘র গল্প : সায়ং শান্তি

প্রামাণিক শব্দটা রূপে ও সুরে অমধুর বলিয়া নীহাররঞ্জনের স্বীয় নাম সম্বন্ধে অত্যন্ত লজ্জা আছে। ঐ শব্দটার সঙ্গীত নাই ; উহা দেখিতে শ্রীহীন—একটা পিণ্ডের মতন। কবিত্ববিহীন এবং লজ্জার বিষয় হইলেও বর্জন করিবার জিনিস নহে বলিয়াই উট যেমন কুঁজ বহন করে, তেমনি নীহারের সঙ্গে প্রামাণিককে সে প্রতি মুহূর্ত বহন করিতেছে ।
নীহার শব্দটার উপর প্রামাণিক শব্দটার সুষ্ঠু প্রতিক্রিয়া আদৌ হয় নাই—বরং প্রামাণিক নীহারকে যেন অভব্য করিয়া রাখিয়াছে। অর্জুনের গাণ্ডীব, শ্রীকৃষ্ণের পাঞ্চজন্য, ভগবান ষড়ৈশ্বর্যশালী, লক্ষ্মীজনার্দন প্রভৃতি সংযোজিত শব্দ সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে সমঝঙ্কারের মিলন মাধুর্যবশতই, আরাম দেয় বলিয়া : কিন্তু নীহার আর প্রামাণিক গায়ে গায়ে দাঁড়াইয়া আরামপ্রদ মিলিত ছন্দের সৃষ্টি তো করেই নাই, তাহারা একই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণও করে না… শঙ্খ এবং ঘণ্টার মতো দুইটি পরস্পরবিরোধী যন্ত্র যেন দুইদিকে মুখ করিয়া বাজিতেছে। 
কেহ নাম জিজ্ঞাসা করিলে নীহার লাল হইয়া ওঠে, আর শেষ শব্দটা তাড়াইয়া অস্পষ্ট করিয়া বলে। 
যৌবনে ভাবুক হইতে হইবে ইহার যেমন কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নাই, তেমনি যৌবনাবির্ভাবে বদ অভ্যাস অর্জন করিতে হইবে ইহারও কোনো হেতু নাই। 
যৌবন আসিয়াছে বলিয়া নয়, অমনিই একটা অভ্যাস নীহারের আছে—রাস্তার কাগজ কুড়াইয়া পড়া ; আস্ত কাগজ নয়, পোস্টকার্ড নয়, সন্দেহজনক ছেঁড়া কাগজ। এই অভ্যাসটা যে কু তাহা নীহার না জানে এমন নয়– নতুবা সে তাহা লুকাইবে কেন? মানুষকে লুকাইয়া সে ছেঁড়া কাগজ কুড়াইয়া পড়ে–পড়িয়া ফেলিয়া দেয় । 
মামলার আরজির ছেঁড়া টুকরা, বাজার-ফর্দের খানিকটা, ছেলেদের ক্লাস এক্সারসাইজের খাতার কিয়দংশ, লোকের প্রেমের আর ভিতরের খবরের খোঁজে এইসব কুড়াইতে কুড়াইতে একদিন দাড়ি-মাখানো সাবানের ফেনা তার সারা আঙুলে মাখামাখি হইয়া গেল। হাত ধুইয়া ফেলিয়া সেইদিনই এই অভ্যাস তার ত্যাগ করা উচিত ছিল। 
কিন্তু গোলাপে কণ্টক আছে, প্রেমে বিচ্ছেদ আছে, চন্দ্রমার কলঙ্ক আছে’, কাগজে সাবান আর কুচি দাড়ি থাকিবে না কেন! তাই বলিয়া কি মনকে ফেরানো যায়! 
খুঁজিতে খুঁজিতে ক্ষ্যাপার একদিন পরশপাথর লাভ হইল। 
ঘটনার দিন সূর্য অস্তান্মুখ হইতেই নীহার বৈকালিক ভ্রমণে বাহির হইয়া পশ্চিম মুখে চলিতে লাগিল। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের বর্ণশোভা সন্দর্শন জন্য সে প্রাতঃকালে পূর্ব দিকে এবং অপরাত্নে পশ্চিমাভিমুখে যায়– 
সেদিনও যাইতেছিল … 
সূর্যাস্ত বড় মনোহর রূপ ধারণ করিয়াছে ; বর্ণপ্লাবন এত প্রচুর আর এত প্রবল যে তাহা পশ্চিমাকাশ ভাসাইয়া, মধ্য-গগন ছাপাইয়া পূর্ব দিগন্ত স্পর্শ করিয়াছে …. বর্ণের বিভিন্নতা, গতি, পরিবর্তনশীলতা, ঔজ্জ্বল্য, এবং বিকিরণ দেখিয়া নীহার অবাক হইয়া গেল … 
সম্মুখের ছাদের আলিসার উপর হইতে এক ঝাঁক কপোত সহসা উড্ডীন হইয়া আকাশপ্লাবী আলোকগঙ্গার বর্ণবারি কয়েক বিন্দু পান করিয়া আসিয়া দলে দলে আবার আলিসার উপর বসিল। নীহার এক মনে অগ্রসর হইতে লাগিল … 
আকাশের আয়তন গৃহারণ্যের অন্তরালে খর্ব হইয়া আসিল … ঘন্টা বাজাইয়া তাহাকে সরাইয়া দিয়া দ্বিচক্রযানারোহী চলিয়া গেল—চক্রোত্থিত ধুলার দরুন আরামে বাধা পাইয়া নীহার বিরক্ত হইল … 
এইদিকে বসতি ‘ঘিঞ্জি’ হইয়া আসিয়াছে– 
বেণে বাটির রাস্তা আসিয়া যেখানে বিনয় সান্যালের বাড়ির দক্ষিণ ধরে আমলা বাটির রাস্তায় পড়িয়াছে সেই মোড়ে পৌঁছিয়া নীহার দেখিল, সম্মুখে কিছু দূরে ত্রিকোণাকৃতি ফিট্‌ সাদা রঙের একখানি কাগজ রাস্তার পাশে ঘাসের উপর পড়িয়া আছে– হরিতের উপর শ্বেত বস্তুটা অপূর্ব শ্রী ধারণ করিয়াছে … আরো নিকটবর্তী হইয়া নীহার দেখিল, কাগজখানির তিন বাহুর এক বাহু বড় সর্পিল অর্থাৎ টানিয়া ছেঁড়া … লেখা যদি কিছু থাকে তবে যে পিঠ ঘাসের উপর তথায় আছে … নীহারের প্রাণ ব্যস্ত হইয়া উঠিল…
একটা স্থান হইতে পাশা খেলার জয়নাদ আসিতেছে– নীহার থমকিয়া দাঁড়াইয়া সেইদিকে কান পাতিয়া রহিল … 
লাল কাপড়ে মোড়া একখানা খাতা বগলে করিয়া একটি মজুর ক্লাসের লোক যেন হঠাৎ তার সম্মুখে আসিয়া পড়িল—নীহার চমকিয়া চলিতে শুরু করিল—এবং তখনই মুখ ঘুরাইয়া দেখিল, ওদিক হইতে একটি স্ত্রীলোক আসিতেছে—তার হাতে একখানা কাস্তে এবং মাথায় ছোট একটা ঘাসের বোঝা রহিয়াছে … 
ইহাকে নীহার গ্রাহ্য করিল না–বুড়ি চোখে ভালো দেখে কি না সন্দেহ ; দেখিলেও কাগজপত্রের ব্যাপার অত বোঝেসোঝে না। 
স্ত্রীলোকটির চোখের সামনেই হেঁট হইয়া নীহার কাগজ তুলিয়া লইল ; উল্টাইয়া দেখিল, ছিন্ন পত্রাংশ … ‘লেটার পেপার’ দামি … 
লেখা রহিয়াছে ‘… নিও। ইতি। 
তোমারই তরে তৃষিতা শান্তি।’ 
পাঠ করিয়া নীহারের ওষ্ঠদ্বয়ের দক্ষিণ সীমা হিল্লোলিত করিয়া অনিন্দ্যসুন্দর একটু হাসি ফুটিল … ঠায় দাঁড়াইয়া নিষ্পলক চক্ষে চাহিয়া সে হস্তাক্ষর পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিল… 
ইহা যে স্ত্রীহস্তের অক্ষরমালা তাহাতে সন্দেহ নাই– অনেকগুলি রেখায় লেখা পাকিয়া আসিবার লক্ষণ দেখা যাইতেছে …. 
তারপর তার গবেষণার বিষয় হইল নামটি– 
শান্তি-দ্বিঅক্ষরের নামটিতে একখানি কাব্য ঘনীভূত হইয়া আছে … এত বৃহৎ আর এমন অপরূপ সে কাব্য যে তাহার কাহিনীর আর রসের শেষ যেন নাই … কে সে ভাগ্যবান যাহার তরে শান্তি তার ভাণ্ডার পূর্ণ করিয়া লইয়া আকুল চিত্তে বসিয়া আছে, আর সেই একতম ব্যক্তিকেই আহ্বান করিয়া শ্রান্তি নাই! … সম্পদশালিনী—উদ্দেশেই অকাতরে দান করিয়া চলিয়াছে। 
তারপর নীহারের চোখে পড়িল, কাগজের গায়ে শান্তি নামটি বেশ মানাইয়াছে ; অন্য নাম মানাইত না—সে নাম অপর ভাবরাজ্যে যতই চমৎকার হউক, আর যতই তার প্রতিষ্ঠা থাকুক! 
তারপর ‘তৃষিতা’ … এই তৃষ্ণাটা কিসের তৃষ্ণা? নিজের কোনো অসহনীয় তৃষ্ণার দুঃখ জানাইয়া তাহা নিবারণের জন্য সে আহবান করিতেছে! কেবল কাছে পাওয়ার তৃষ্ণা! … যাহাকে জানাইয়াছে সে-ই জানে … তথাপি তা শব্দটার আবেদন নীহারকে মুগ্ধ করিল .. স্থানমাহাত্ম্যে শব্দার্থের এমন নব নব উন্মেষ ঘটে, নীহার তাহা হৃদয়ঙ্গম করিয়া পুলকিত হইল। 
বিরহের সঙ্গে বাসন্তী রঙের নিবিড় সম্বন্ধ তাই নীহারের মনে হইল, তার বাসন্তী বসনাঞ্চলপ্রান্তে চাবি বাঁধা নাই—তাহা স্কন্ধচ্যুত হইয়া শিথিলদেহীর ক্রোড় আশ্রয় করিয়াছে; কবরী উন্মোচিত হইয়া গেছে ; চুর্ণ কুন্তলপাশি পবনে দোদুল ছন্দে পৃষ্ঠে লুটাইতেছে… লুটাইতে লুটাইতে এক সময় আকাশের দিকে সমুচ্চ হইয়া চলমান জলদ দলকে সম্ভাষণ করিতেছে … পীতাভ কেশাগ্র যেন তাহার লালায়িত প্রাণের অগ্নিনির্ভ শিখা– 
নীহারের মনে পড়িল না যে, এটা কার্তিক মাস ; মেঘোদয় যদি হয় তবে সেই মাঘের শেষে। 
যাহা হউক, স্বপ্ন স্বপ্নই– 
নীহার দেখিতে লাগিল, বিরহ-সন্তপ্তার নয়নকোণসঞ্চারী অশ্রুবিন্দুতে একদিকে নীলিমার ছায়া অপর দিকে পক্ষ-বিলম্বিক স্বর্ণহারের আভা পড়িয়া মেঘ বিদ্যুতের স্থির সম্মিলন ঘটিয়াছে। তারপর বিবেচ্য ঐ ‘নিও’ কথাটা– 
কী বস্তু সে পত্রযোগে দান করিয়াছে, যে দান প্রত্যাখ্যান হইবে বলিয়া কিছুমাত্র শঙ্কা নাই! ভালবাসা না চুম্বন? স্বর্ণমুদ্রার বুকে রাজ্ঞীর মুখচ্ছবির মতো ঐ কথাটাই যেন লিপিভাষণকে বহুমূল্য সার্থক করিয়া তুলিয়াছে … 
নীহার পত্রখানা পকেটে রাখিল এবং চক্ষু মুদ্রিত করিয়া যেন কী একটা সংশয় ভঞ্জন করিয়া লইল … 
একেবারে সমাপ্তিতে সে ভালবাসা দেয় নাই, চুম্বনই দিয়াছে– বিদায়-চুম্বন … একটি নহে দুটি নহে—আরো । সে লিখিয়াছে হয়তো একবারই, কিন্তু প্রাণের ভাষা অক্ষরে রূপান্তরিত হইবার পূর্বে এবং পরেও তার অন্তরলোকে যে অশরীরী আদান প্রদানের স্রোত চলিয়াছিল তাহা অশেষ … তাহার একটি মাত্র সরসীর বুকে উৎপলের মতো উপরে ভাসিয়া উঠিয়াছে—চোখে পড়িতেছে… 
শান্তির নয়নপল্লবে যে ছায়া আর দৃষ্টিতে যে আবেশ ঘনাইয়াছিল সুখহিল্লোল– আর কৌতুক চপলতাসহ যে লিপ্সা শান্তির প্রাণে উত্তপ্ত হইয়া উঠিয়াছিল তাহা অনুভব করিয়া নীহার তদুপযুক্ত একটি উত্তপ্ত ও আর্ত নিশ্বাস ত্যাগ করিল … 
-কী হে, কী ভাবতে ভাবতে চলেছ অজ্ঞান হয়ে? 
পার্থিব প্রশ্নে নীহার চমকিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল! চোখ তুলিয়া দেখিল, একজন না, তাহার অন্তরঙ্গ বন্ধু পাঁচ সাত জন কালীতলার উঠানে বসিয়া আছে ; সে ভাবিতে ভাবিতে রাস্তা ছাড়িয়া একবারে বেড়ার ধারে আসিয়া পড়িয়াছে … কখন দাঁড়াইয়াছিল, এবং তারপর কখন চলিতে শুরু করিয়াছিল তাহা মনে করিতে না পারিয়া নীহার হতবুদ্ধি হইয়া গেল– দু’পা পিছাইয়া আসিল… 
দলের ভিতর হইতে প্রসাদ জিজ্ঞাসা করিল,—চলেছ কোথায় হে কবি? 
–বেড়াতে বেরিয়েছি। 
—এস, বস। 
নীহার যাইয়া বসিল … 
উহাদের যে গল্প চলিতেছিল তাহাই চলিতে লাগিল; সত্যব্রত বলিতে লাগিল, সেই ভোরেই পঙ্কজবাবু প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছেন, দেখলেন, সন্ন্যাসী হনহনিয়ে আসছেন ; পাশবালিশের ওয়াড়ের মতো লম্বা একটা গেরুয়া রঙের ঝোলা তাঁর কাঁধে ফেলা— মাঝখানটা কাঁধের ওপর দুই মুড়ো জিনিসের ভারে ঝুলে পড়েছে … 
পঙ্কজবার প্রণাম করলেন ; সন্ন্যাসী আশীর্বাদ করলেন, কিন্তু বিশেষ বিলম্ব করলেন না। 
মিনিট দু’তিন পরেই দেখা গেল, রূপপুর কুঠির মেজবাবু দারোয়ান নিয়ে ছুটে আসছেন … ব্যাপার কী। অত ভোরেই? কিন্তু মেজবাবুর তখন দাঁড়াবার সময় নেই– তিনি কেবল জিজ্ঞাসা করলেন, একটা সন্ন্যাসীকে এদিকে যেতে দেখেছেন? 
পঙ্কজবাবু ‘হুঁ’ বলতে না বলতে মেজবাবু ততক্ষণে দশ গজ এগিয়ে গেছেন … 
তারপর শোনা গেল, ধনবতী শিষ্যার সিন্দুক খুলে সন্ন্যাসী ঠাকুর— 
নীহার জিজ্ঞাসা করিল,–শান্তি কার নাম হে? 
প্রভাস বলিল—বোর্ডের কেরানী নবীনবাবুর ভাগনে টাউন ক্লাবের সেন্টার ফরোয়ার্ড। 
ভূপেন বলিল,–যাক, তারপর সন্ন্যাসীর কী হল? 
সতব্রত বলিল,–খানাতল্লাশি হয়ে পৃথিবীতে যত প্রকারের চাবি আছে তার, আর বাঙালি মেয়ের গায়ে যত প্রকারের অলঙ্কার থাকে তারও নমুনা বেরুল। 
–নগদ টাকা? 
–নোটে টাকায় অজস্র ; মুখোশ পরচুলো পর্যন্ত … উঠলে যে কবি? বস বস ; শান্তি কে তা বলছি। বলিয়া সত্যব্রত নীহারকে হাত ধরিয়া টানিয়া বসাইল। 
নীহার উৎসুক হইয়া বলিল—কে বল দেখি? 
—কী জন্যে তাকে খুঁজছ তা আগে বল । 
মোহিত বলিল,–মেয়ে না ছেলে? 
নীহার অকারণেই লজ্জা পাইল ; বলিল,—যাকে চেন তারই একটা বর্ণনা দাও। 
—একটি মেয়েকে চিনি সে দেখতে ভালো, একটি ছেলেকে চিনি সে-ও দেখতে ভালো—দুজনারই নাম শান্তি। কাকে তোমার দরকার? বলিয়া সত্যব্রত হাসিতে লাগিল। 
–কাউকে নয়। বলিয়া নীহার উঠিবার জন্য অস্থির হইয়া উঠিল … কল্পনার পক্ষ প্রসারণ আর গুঞ্জরণ সে আর চায় না … একটি স্থানে সে বসিতে চায় যেখানে চেতনা রুদ্ধ হইয়া কেবল অজ্ঞানে মধুপন চলিবে … 
—চললাম ভাই। বলিয়া প্রভাসের হাত এবং সকলের পাল্লা ছাড়াইয়া নীহার চলিয়া আসিল। … হৃদয়-মুকুরে কল্পনার প্রতিবিম্ব দেখিয়া বহ্নি যেন আরো জ্বালাময় হইয়া ওঠে … তাহারই চক্ষুর মণি-আধারে নিজেকে প্রতিবিম্বিত দেখিতে পাইলেই যেন মূর্ছিত বুকে পুনরায় প্রাণের স্পন্দন ফিরিবে! 
গত বৈশাখে নীহারের শুভ বিবাহ হইয়াছে। তাহার স্ত্রী কণিকা তাহার কল্পনার কোষে বাস না করিলেও অতিশয় সুন্দরী, স্বাস্থ্যবতী, বয়স্থা এবং শিক্ষিতাও বটে; সেই তখনো তাহাকে নীহার ফাঁকি দিয়া ডাকিয়া আনিয়া মুগ্ধ চক্ষে তাহাকে দেখিয়া আসিয়াছে— 
নীহারের ছোট বোন কুঞ্জ বলিয়াছিল, দাদা বউ-পাগলা। ঘুরেফিরে কেবলই বউকে দেখতে আসে …. 
সে কথা শুনিয়া কণিকা কুঞ্জের গায়ে চিমটি কাটিয়াছিল, আর নীহার নিজে অহঙ্কার বোধ করিয়াছিল ; কিন্তু এখন তার মনে হইতে লাগিল, কণিকার সঙ্গে বিবাহ না হইয়া শান্তির সঙ্গে হইলে বিশেষ তৃপ্তি পাওয়া যাইত … কণিকার যে বৈশিষ্ট্য এতদিন সে দেখিয়াছে তাহা ভ্রমাত্মক– অচিন্তনীয় সে মোটেই নয় … একেবারে আটপৌরে, ঘরোয়া। 
অপূর্ব একটা উন্মাদনা লইয়া নীহার বাড়িতে আসিয়া উঠিল— 
দেখিল, মা ধূপপানিতে আগুন করিতেছেন ; কয়লা ভাঙার হাতুড়িটা দিয়া শানের উপর ঘষিয়া ঘষিয়া কণিকা ধূপ চূর্ণ করিতেছে, এবং কুঞ্জ তাহার পুতুল-বউয়ের ঘোমটা তুলিয়া বউদিকে মুখ দেখাইতেছে …। 
যে উল্লাস জীবনের আনন্দ আর আকর তাহা এখানে কই? 
নীহার গম্ভীরভাবে উপরে উঠিয়া গেল– মা বলিলেন,–বউমা, যাও, কী চায় যেন! 
কুঞ্জ ঝঙ্কার দিয়া উঠিল,—চায় না ছাই! অমনি মুখ করে মানুষকে ভয় দেখায়। 
মা হাসিতে লাগিলেন …. 
নীহার ঘরের ভিতর ঘুরিতেছিল মনের– একদিকে হাসি অন্যদিকে অসময়ের ভৎর্সনা লইয়া কণিকা উঠিয়া আসিতেই নীহার বলিল,—তোমার নাম আমি রাখিলাম শান্তি, বুঝলে? কোনো আপত্তি আমি শুনব না। 
কণিকা ইতিপূর্বে স্বামীর অবাধ্যতা অনেক করিয়াছে, কিন্তু সে জিদের কি রাগের বশে … 
‘নূতন নূতন কত সাধই হয়’ মনে করিয়া এখন সে মনে মনে হাসিয়া বলিল,– ‘আচ্ছা’, বলিয়া কণিকা চলিয়া যায় দেখিয়া নীহার বলিল,-শোন।’ 
কণিকা দাঁড়াইল– 
আরো কাছে সরিয়া আসিয়া নীহার স্ত্রীর ওষ্ঠাধরে সেই শান্তিকেই চুম্বন করিল— চুম্বনটি অতলস্পর্শ আর ক্ষিপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=