পুরুষোত্তম সিংহের আলোচনা : শেষের দিব্যেন্দু পালিত

১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের ৩০ শে জানুয়ারি ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র রবিবাসরীয়তে ‘ছন্দ-পতন’ নামে একটি গল্প প্রকাশিত হল, লেখকেরবয়স ষোল, নিবাস ভাগলপুরে। বলার অপেক্ষা রাখে না এ লেখক আমাদের অত্যন্ত পরিচিত আজকের প্রতিষ্ঠিত দিব্যুন্দু পালিত।
পরের গল্প ‘নিয়ম’ ছাপা হল ‘দেশ’ পত্রিকায়। ভাগলপুর পর্বে তার সমস্ত লেখাই ডাকযোগে পাঠানোর মাধ্যমে প্রকাশিত হত। এমনকি প্রথম উপন্যাস ‘সিন্ধু বারোয়াঁ’ ডাকযোগে পাঠানোতেই প্রকাশিত হয়েছিল। ভাগলপুরের যুবক নগর কলকাতায় কোনো প্রকাশক চেনে না, হঠাৎ ই একদিন ‘আডেনির’ প্রকাশনের ঠিকানায় পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলেন। পাণ্ডুলিপি পড়ে লেখককে না দেখেই প্রকাশ করে ফেললেন গ্রন্থ, প্রকাশক অমলেন্দু চক্রবর্তী। এরপর বেশ কিছুদিন ধরে আনন্দবাজারে লিখছেন হঠাৎ একদিন সম্পাদকীয় দপ্তরে মন্মথনাথ সান্যালের সঙ্গে দেখা করতে এলেন।মন্মথবাবু দেখে বিস্মিত হয়ে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে বললেন- “নীরেনবাবু, এ যে দেখছি নিতান্ত বাচ্চা ছেলে” (১)। নীরেন্দ্রনাথ বাবু উত্তর দিলেন – “বাচ্চা হলে কী হবে, লেখে তো বুড়োর মতো ! তা হলেই হলো !” (২) সেই যাত্রা শুরু, প্রথম গল্পের বই ‘শীত –গ্রীষ্মের স্মৃতি’। দিব্যেন্দু পালিত তাঁর সাহিত্য জীবনকে দুটি পর্বে ভাগ করেছেন- ১৯৬৪-৬৫ এর আগে ও পরে। ৬৪ এর আগে তিনি মূলত সাদামাঠা লেখক, প্রেম, রোমান্স নিয়েই লিখতে ভালোবাসতেন। নিজেই জানিয়েছেন প্রথম দিকের লেখায় রমাপদ চৌধুরী, বিমল কর, সন্তোষকুমার ঘোষের প্রভাব বিদ্যমান। কিন্তু ৬৫ এর পর থেকেই তিনি নিজস্ব পথ খুঁজে নিলেন। লেখা যেন তাঁর কাছে- “ কিছু স্মৃতি, দুঃখবোধ, কিছু অপমান এই নিয়ে আমি ; আমার লেখাও।“ (৩) প্রথম উপন্যাস ‘সিন্ধু বারোয়াঁ’ (১৯৫৯)। একে একে আমারা পেয়েছি ‘সেদিন চৈত্রমাস’ ( ১৯৬১), ‘ভেবেছিলাম’( ১৯৬৪), ‘মধ্যরাত’( ১৯৬৭), ‘প্রণয়চিহৃ’ ( ১৯৭১), ‘সন্ধিক্ষণ’(১৯৭১), ‘সম্পর্ক’ ( ১৯৭২), ‘আমরা’ ( ১৯৭৩), ‘বৃষ্টির পরে’ (১৯৭১), ‘বিনিদ্র’ ( ১৯৭৬), ‘চরিত্র’ (১৯৭৬), ‘একা’ (১৯৭৭), ‘উড়োচিঠি’( ১৯৭৮), ‘অহঙ্কার’ (১৯৭৯), ‘সবুজ গন্ধ’ (১৯৮২), ‘সহযোদ্ধা’ (১৯৮৪), ‘ঘরবাড়ি’ (১৯৮৪), ‘আড়াল’ (১৯৮৬), ‘সোনালী জীবন’(১৯৮৬), ‘ঢেউ’(১৯৮৬), ‘স্বপ্নের ভিতর’(১৯৮৮), ‘অন্তর্ধান’(১৯৮৯), ‘অবৈধ’(১৯৮৯),’অনুসরণ’(১৯৯০), ‘সিনেমায় যেমন হয়’(১৯৯০), ‘গৃহবন্দী’(১৯৯১), ‘সংঘাত’(১৯৯২), ‘ভোরের আড়াল’(১৯৯৩), ‘অনুভব’(১৯৯৪), ‘অচেনা আবেগ’(১৯৯৫),, ‘সেকেন্ড হনিমুন’(১৯৯৬), ‘মাত্র কয়েকদিন’(১৯৯৮), ‘হঠাৎ একদিন’(২০০০) ইত্যাদি। তাঁর উপন্যাসের সমাপ্তি নির্দেশিকা গুলি এবার আমরা কিছু উপন্যাস অবলম্বনে দেখে নেবো।
দিব্যেন্দু পালিতের ‘সহযোদ্ধা’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় শারদীয় ‘অমৃত’ পত্রিকায়। এ উপন্যাস লেখার আগে তিনি গিয়েছিলেন সমরেশ বসুর কাছে একটি বিষয় জানতে, তা হল একজন লেখক নরনারীর সম্পর্কের ব্যাপারে কতখানি উন্মুক্ত হতে পারে। উত্তরে সমরেশ বসু বলেছিলেন – “ সততা এবং সাহস তোমাকে যতোটা এগিয়ে নিয়ে যাবে, ঠিক ততোতাই।“ (৪) তবুও এ উপন্যাস নিয়ে তিনি দ্বিধায় ছিলেন। তাই শারদ সংখ্যায় উপন্যাসের শেষে লেখেন ‘এটি উপন্যাসের খসড়া মাত্র’। কিন্তু পত্রিকা প্রকাশের পরই সমরেশ বসু পড়ে মতামত দেন।‘এই খসড়া’ দেখে প্রশ্ন তুলছিলেন খসড়া নয় সম্পূর্ণ উপন্যাস হয়েছে, আর একটি শব্দও যেন না পাল্টানো হয়। ফলে লেখক আর কিছুই পরিবর্তন করেন নি। উপন্যাসটি উৎসর্গ করেন সমরেশ বসুকে। উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে ষষ্ট পরিচ্ছেদে। নক্শাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এ উপন্যাসটি লেখা। সংবাদপত্রে প্রচলিত একটি মৃত্যুর চিঠিকে কেন্দ্র করে আদিত্যের পরিবারে অস্থিরতা দেখা দেয়। যে ব্যক্তির মৃত্য হয়েছে তাঁকে আদিত্য চেনে না কিন্তু মৃত্যুর প্রত্যক্ষ দৃশ্যের সাক্ষী সে। অফিসিয়াল রিপোর্ট জানিয়েছে খবরটি মিথ্যা, আবার চারু মজুমদার বিবৃতি দিয়েছেন- যে রাতে শৈবাল মজুমদারকে গ্রেফতার করা হয় সে রাতেই তাঁকে নিহত করা হয়। মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুলিশের তৎপরতা ও সত্য কিভাবে চাপা পড়ে যায় তা লেখক দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু আদিত্য জেদী, লক্ষ্যে অবিচল। আজ তাঁকে শুনতে হয়েছে শ্রেণিশত্রুর তাকমা। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা সমস্ত লাঞ্ছনার মধ্যেও ভেঙে পড়ে না, নিজেদের বিকিয়ে দেয় না, আদিত্য তাদেরই প্রতিনিধি। কিন্তু ব্যক্তিস্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে সে হয়েছে একাকী। এ যেন কবির ভাষায় নিজেরই মুদ্রাদোষে হতেছে একাকী-“ বুদ্ধি পাকলে বুঝতে, আমি কোনও ক্লাসে বিলং করি না ; আমি একা – ভীষণ একা। কিংবা আমি একাই একটি ক্লাস। হয়তো আরও কেউ কেউ আছেন আমার মতো, আমি তাদের চিনি না।“(৫) রাতে পুলিশের ফোনে আর ঘুম হয়নি আদিত্য, স্ত্রী শ্বেতা ও কন্যা পৃথার। পরের দিন ২৩শে আগস্ট পুলিশ গ্রেফতার করতে এসেছে আদিত্যকে। ঘটনার আগে শ্বেতা স্বামীকে নিয়ে পুণায় চলে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু রাজি হয়নি আদিত্য। সে পালিয়ে যেতে চায়নি। ব্যক্তিস্বতন্ত্রতা ও বিবেককে বলিও দিতে চায় নি। আজ সমস্ত ফেলে সে পুলিশের সাথে চলেছে। পুলিশ প্রথমে চেয়েছিল আদিত্যের বিবৃতিকে চাপ দিয়ে মিথ্যে প্রমাণ করার কিন্তু কাজ হয়নি। ফলে এই গ্রেফতার – এখানেই উপন্যাসের শেষ। গ্রেফতারের পরে আর কি হল তা আর জানা যায় নি। তিনি পাঠককে একটি বিনির্মাণের জগৎ তৈরি করার সুযোগ দিয়েছেন। কেননা লেখকের সমস্ত ধারণা, আদর্শের কাছেই পাঠককে হবাহু পৌঁছতে হবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। সন্দর্ভের আলোকে পাঠক নিজেই প্রতিসন্দর্ভ গড়ে নেবে- এটাই হয়ত আজকের উপন্যাসের অন্যতম একটি বিষয়। উপন্যাসের নামকরণটি গুরুত্বপূর্ণ। আদিত্যের স্ত্রী সকলকে ছাড়া নিজেই এগিয়ে এসেছে। মানুষ নামক শ্রেণিকে রক্ষা করতে এসেছে মানুষ। তেমনি মানুষ নামক শ্রেণি ( পুলিশ ) দ্বারা সে আবার অত্যাচারিত হতে চলেছে। এই শ্রেণি, শ্রেণিহীনতার দ্বন্দ্বের কথা লেখেন দিব্যেন্দু পালিত।
‘ঘরবাড়ি’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে। এ কাহিনি জয়া ও হিমাদ্রির জীবন সংগ্রামের আখ্যান। মধ্যবিত্তের আত্মবিসর্জনের আখ্যান। জয়ার ইচ্ছা ছিল একটি নিজস্ব বাড়ি। বহু পরিশ্রমে তা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এই নতুন বাড়িই তাঁর জীবনে ট্র্যাজেডি ডেকে নিয়ে এসেছে। বাড়ি নির্মাণের সাতকাহন আমরা পেয়েছিলাম রমাপদ চৌধুরীর ‘বাড়ি বদলে যায়’ উপন্যাসে। তবে সে উপন্যাস ছিল শ্রেণির বিবর্তনের কথা। ভাড়াটেরা বাড়িওয়ালা হওয়ায় যে চারিত্রিক বিবর্তন তা তিনি দেখিয়েছেন। উপন্যাসের পরিণতিতে রমাপদ চৌধুরী যেখানে শ্রেণির বিবর্তন দেখিয়েছেন সেখানে দিব্যেন্দু পালিত নির্মম, নিষ্ঠুর। এ উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে নবম পরিচ্ছেদে।শত চেষ্টায় গড়া ফ্ল্যাটে উঠে এসেছে জয়া ও হিমাদ্রি। কিন্তু এখানে এসেই মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছেদ ঘটতে থাকে। জয়া নারীদের বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়ে কিছু অর্থ উপার্জন করেছিল সংসারের জন্য। তাঁর একান্ত ইচ্ছা ছিল বাড়ি তৈরি করা, অন্য কোন লালসা বা যৌনবৃত্তির চাহিদা তাঁর ছিল না। হিমাদ্রির কাছে পরামর্শ নিয়েই সে বিজ্ঞাপনে নেমেছিল। অথচ ফ্ল্যাটে এসে দ্বিতীয় দিনেই ঘটে গেল দূর্ঘটনা। সাধুখাঁ কয়েকটি ছবি দিয়েছে হিমাদ্রিকে জয়াকে দেওয়ার জন্য। এই বিজ্ঞাপনের ছবিই হিমাদ্রির মনে সন্দেহের বীজ বুনে দিয়েছে। তবে জয়া ছিল চরিত্রের দিক দিয়ে শুদ্ধ। তবুও স্ত্রীকে উপলব্ধি না করেও লাঞ্ছনার বিদ্রুপ বাক্যে আঘাত আনতে পিছপা হয় নি। পরিণাম রাতে ফ্ল্যাট থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে জয়া। স্ত্রী পোশাকের বিজ্ঞাপন, দেহের বিজ্ঞাপন যে সহ্য করতে পারেনি আজ সেই স্ত্রী বেআব্রু অবস্থায় পড়ে আছে। যে বিজ্ঞাপনের চিত্র সবাই উপভোগ করত আজ ভিড় থাকা সত্ত্বেও উপভোগের কোন দৃশ্য নেই। সম্পর্কের এই ভাঙা- গড়া বিযাদময়ী স্মৃতিতেই উপন্যাসের সমাপ্তি। তবে উপন্যাসের পরিণতিতে লেখক সংযত। জয়ার মৃত্যু দৃশ্য চিত্রণেই উপন্যাসের শেষ। সেখানে আর হিমাদ্রি নিজের অবরুদ্ধ বেদনার বহিঃপ্রকাশের সুযোগ নেই। এ যেন বাঙালি এক যুবকের গালে লেখকের প্রবল চাপেটাঘাত। সে বেদনার্ত তাই চোখ ঝাপসা, ছলছল- এটুকুই, এর বেশি আর লেখক সুযোগ দিতে অপরাগ।
​​‘আড়াল’ (১৯৮৬) উপন্যাসটি উৎসর্গ করেন স্বাতী ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। রুচি ও সোমেনের জীবনবৃত্তান্তের আখ্যান এ উপন্যাস। রুচি জীবনে আড়াল খুঁজতে চেয়েছিল, একাকিত্ব চেয়েছিল। আজ নিজেই যে জীবনের আড়ালে চলে যাচ্ছে। দিব্যেন্দু পালিত সংযত, সংহত ভাবেই কাহিনির অবয়বটি নির্মাণ করেন। দীর্ঘ বক্তব্য বা বর্ণনা নয় কখনও ইঙ্গিত বা স্বল্পাভাসেই চরিত্রের অন্তঃগূঢ় রহস্য পরিস্ফূটিত হয়। চেনাবৃত্তের মধ্যে যে অচেনাবৃত্ত তার কথক তিনি। এ উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে সপ্তম পরিচ্ছেদে। রুচি আড়াল খুঁজেছিল নারী বলেই নয়, আসলে সে জীবনকে উপলব্ধি করতে চেয়েছিল। বিয়াল্লিশ বছরের জীবনে বিবাহিত জীবন চব্বিশ বছরের, স্বামী ছেলে মেয়ে আছে। তবুও মনে হয় এই চব্বিশ বছরের জীবনটা দ্বিখণ্ডিত দ্বীপের মতো। এখানে কোনো স্মৃতি নেই, আছে কেবল কতগুলি ঘটনার সমষ্টি। তাঁর মনে হয়েছে নারীত্বের সমস্ত স্বাদ এখনও উপলব্ধি হয়নি, তবে সময় বদলে যাচ্ছে, জীবন পাল্টে যাচ্ছে। আজ সে ক্যানসারে আক্রান্ত। সোমেনকে বলবে না বলবে না করেও অবশেষে বলেছে। আসলে এখানেও সে আড়াল খুঁজতে চেয়েছিল। সাংসারিক সমস্ত কাজকর্মে, সমাজ গঠনে নারীর ভূমিকা আড়ালেই চাপা পড়ে থাকে। কোন নারী স্বকন্ঠে উচ্চসুর তুললেও বেশিরভাগ নারীই নীরব চিৎকারের অংশভাগী হয়। রুচির আজ আর কোন আড়াল নেই, প্রকাশ করতে হয়েছে যন্ত্রণার কথা। আজ মনে হয় সমস্ত আবরণ খুলে নিজেকে উন্মুক্ত করে দেবে- “ এতকালের চেনা আড়াল আজ তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে নতুন এক আড়ালে। কাউকে বোঝানো যাবে না এ অনুভূতি কেমন, কতখানি অসহয়তা এই আড়াল থেকে আরও আড়ালে ফিরে যাওযায়।“( ৬) এক অদ্ভুত জীবন বিবর্তনের রূপরেখা লেখক অঙ্কন করেন। কোন অভিমান নয়, এই পরিণতিকে সে মেনে নিয়েছে। জীবনে সে যেহেতু আড়ালই খুঁজতে চেয়েছিল তাই এই অসুস্থতা নিয়ে স্বামীর নীরবতায় কোন বাক্যই প্রকাশ করে নি। পরিশেষে দেখা যায় দীপঙ্কর ও সোমেনের কথোপকথন। দীপঙ্কর রোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সোমেন নীরব হয়ে থাকে। এই নীরবতার মধ্য দিয়েই জীবনের আড়ালের, সম্পর্কের আড়ালের সমাপ্তিঘটে।
​​​​​​দিব্যেন্দু পালিত ভিন্ন ধারার এক ঔপন্যাসিক। বাজার চলতি ফর্মে তিনি কোনদিন হাঁটেন নি। নিভৃতে বসে শিল্পের দায়বদ্ধতা পালন করে গেছেন। ‘ঢেউ’ উপন্যাসের রচনাকাল ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের জুন থেকে আগস্ট, গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে। এ উপন্যাসের জন্য বঙ্কিম পুরস্কার পান ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে। জীবনের বহুকৌনিক বোধে তিনি উপনীত হন। মৃত্যুই যেন মানুষকে এক নতুন বোধের জগতে নিয়ে যায়। চেতনার গভীরে এক ঢেউ নিয়ে আসে, যা মানুষকে নতুন করে পথ চলতে শিক্ষা দেয়। এ উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে সপ্তম পরিচ্ছেদে। মিসেস চৌধুরীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মধ্যবিত্ত অপূর্ব ও মালবীর জীবনে এক নতুন চেতনা এসেছে। অপূর্ব চেয়েছিল নতুন করে উপন্যাস লিখবে। শিল্পীর জীবনও যেন এক উপন্যাস। সেই আত্মকেন্দ্রিকতাকেই সে ধরতে চেয়েছিল। লেখক অচেতনে সেই প্লটই যেন দিয়ে গেলেন। অপূর্ব ও মালবীর নতুন বিবাহ, মধ্যবিত্তের সংসার, সেখানে আশা- আকাঙ্ক্ষা আছে। মনোজ হঠাৎ নিয়ে আসে মৃত্যু সংবাদ। শেষ পরিচ্ছেদটি গড়ে উঠেছে মিসেস চৌধুরীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হাসপাতালে সবার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। লেখক নিভৃতে থেকে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কয়েকটি মানুষের ( অপূর্ব, মালবী, মনোজ, বিমলকৃষ্ণ ) চেতনায় যে বিবিধ আলোড়ন তা দেখিয়েছেন। স্মৃতির সঙ্গে বাস্তবের কোন সম্পর্ক নেই। সেই বাস্তবকে সামনে রেখেই সবাই গেছে স্মৃতিচারণায়। জীবনের পথে চলতে গেলে সব সত্য প্রকাশ করা যায় না। স্মৃতি ভেতরে আলোড়ন তোলে তবুও নীরব হয়ে সব সহ্য করতে হয়। সীতার মুখে স্পষ্ট বিষাদ, অপূর্ব কন্দনরত, মালবীর বুকে অচেনা ঢেউয়েরদোলা অন্যদিকে বিমলকৃষ্ণ নিস্তব্ধ। বিমলকৃষ্ণের বুকে আলোড়ন যে নেই তা নয় তবে মানুষের চেতনা যে বিবিধ। একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বিবিধ মানুষের মনের বিবিধ ঢেউয়ের আলোড়নে লেখক উপন্যাস সমাপ্ত করেছেন। এ উপন্যাসের নায়ক যেহেতু অপূর্ব তাই চেতনার ঢেউ প্রবল ভাবে পরে তাঁর উপরে । সে এসব কিছু গভীর ভাবে জানে না, জানে কেবল ঔপন্যাসিক দিব্যেন্দু পালিত। অপূর্বের কাছে সে সব আজ রহস্য। আর সে রহস্য উন্মোচনে বদ্ধ পরিকর ঔপন্যাসিক- “ অপূর্ব জানে না। বুঝতেও পারে না। সে শুধুই তাকিয়ে থাকে নিজের ভিতরের অদৃশ্যের দিকে – যা তাকে ঠেলে দিয়েছিল হাহাকারের মধ্যে, যা তাকে টেনে তুলেছে হাহাকার থেকে ; এতোদিন ধরে যা তাকে টেনে নিয়ে গেছে শুধুই রহস্যের দিকে।“ (৭)
দিব্যেন্দু পালিতের অন্যতম উপন্যাস ‘অন্তর্ধান’ ( ১৯৮৯) উৎসর্গ করেন শ্রীপান্থ- নিখিল সরকারকে। মানুষের অন্তরমননের রহস্য উন্মোচনে অগ্রসর হয়েছেন এ উপন্যাসে। একটি নিখোঁজ মানুষের সন্ধানে অগ্রসর হয়ে নিখোঁজ হয়েছে আরো একটি মানুষ। কন্যা ইনার সন্ধানে বেরিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি সুশোভন মুখার্জ্জি। বিশ্বাস- অবিশ্বাসের সংকটে কে বড় সেই সন্ধানে তিনি অগ্রসর। বেঁচে থাকার এই পৃথিবীতে যে বিশ্বাস ছাড়া কিছু টিকতে পারে না সেই দর্শনে নায়ককে নিয়ে গিয়েছেন লেখক। উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে দশম পরিচ্ছেদে। উপন্যাসের শেষে ফুটনোটে জানান- “ সংবাদপত্রে প্রকাশিত কিছু সংবাদ বিচ্ছিন্ন ও পরিবর্তিত ভাবে ব্যবহার করা হলেও এই উপন্যাসের সব চরিত্র এবং যাবতীয় ঘটনাই কাল্পনিক।“ (৮) বাস্তবকে সামনে রেখেই লেখক প্লট সাজিয়েছেন। আর একজন প্রকৃত ঔপন্যাসিক সেটাই বোধহয় আসল প্রধান কাজ। কন্যা ইনার সন্ধানে বেরিয়ে সুশোভন বাবুর না ফেরার জন্য স্ত্রী লীনা নিজেই থানায় গেছে ডায়েরি দিতে। একটি নিখোঁজ মানুষের অনুসন্ধানে আরেকটি মানুষের নিখোঁজ হয় না। তবে এই নিখোঁজ হওয়াকে সুশোভন অন্তর্ধান বলেনি, সে জানিয়েছে কন্যাকে নিয়েই সে ঘরে ফিরবে। স্ত্রীর দুঃচিন্তা নিবারণের জন্য সে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল যা লীনা পেয়েছে ১৩ই অক্টোবর দুপুরে। জগৎ জীবন সম্পর্কে সুশোভনের যাবতীয় বোধের প্রকাশ রয়েছে এই সুদীর্ঘ চিঠিতে। এই চিঠিতেই উপন্যাসের মূল নির্যাস বলা যেতে পারে। সে ইনার সন্ধানে ধানবাদে পৌঁছে গেছে। তাঁর দর্শন, জীবনবোধ, বিশ্বাস, আকাঙ্ক্ষা, মানবিকতা সমস্তই প্রকাশ পেয়েছে। সর্বপরি রয়েছে লেখকের জীবনবোধ। দিব্যেন্দু পালিত সামান্য প্লট নিয়েও অনন্ত মহিমায় বিরাজ করতে পারেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ কী, সে বেঁচে আছে কিনা এসব ভাবনা তাঁকে বিচলিত করেছে –“ যে থেকেও নেই তার জন্যে এই দিনের পর দিন অপেক্ষা করার নির্দেশ দিয়ে ঈশ্বর আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন ?” (৯) শিক্ষকসত্তা অপেক্ষা তাঁর পিতৃসত্তাই বড় হয়ে উঠেছে। পিতৃহৃদয়ের আর্তনাদের মুখোমুখি হতে হয় পাঠককে। এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁর কন্যাহীন ভাবে আর বেঁচে থাকা উপযুক্ত বলে মনে হয় নি। যন্ত্রণাময় জীবন তাঁর কাছে মৃত্যুতুল্য। এসময়ই দেখা হয়েছে ছাত্র লোহিতের সঙ্গে, যে পুলিশ অফিসার হয়ে গেছে। সুশোভন আজ তিন মাস বাড়ি ফেরে নি, সে নিজেই আজ অনুসন্ধানের বিষয় পরিবারের কাছে। সে প্রতরণার মুখে পড়েও ফিরে এসেছে। কেননা তাঁর কাছে দুটি বিষয়ই জীবন্ত – জীবন নয় মৃত্যু। তাই আজ আত্মসন্ধানে মনে হয়েছে- “ সে জানে, যে কোনও সন্ধানেরই শেষে থাকে হয় জীবন, না হয় মৃত্যু। মাঝখানে কিছু নেই। যেভাবেই হোক দুটির একটি পৌঁছুতে হবে তাকে।“ (১০) কন্যার অনুসন্ধানে গিয়ে তাঁকে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে দেখি। এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনকে জানা শেষ হয়েছে, সেখানেই লেখক ইতি টানতে চেয়েছেন। পরিশেষে দেখি তাঁর শিক্ষকসত্তাকে। আদর্শ ছাত্রও তো সন্তানতুল্য। তাই ছাত্র লোহিতের কাছে শেষ আবেদন জানিয়েছে কন্যাকে ফিরিয়ে দেবার জন্য।
সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে গড়ে উঠেছে ‘অবৈধ’(১৯৮৯) উপন্যাসটি। জিনা- অসীম, পার্থ- গায়েত্রী দুটি দাম্পত্য সম্পর্ক এ উপন্যাসে রয়েছে। সংসারিক বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে জিনা। মুক্ত হয়েছে কিন্তু পরিণতিতে সফল হয়নি। জিনা নিজের সংসার, স্বামী অসীমকে ছেড়ে পার্থের হাত ধরেছে কিন্তু বঞ্চিত হয়েছে। উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছে ষষ্ট পরিচ্ছেদে। অসীমের অনুপুস্থিতি জিনা পার্থের হাত ধরে পুরীতে গিয়েছে, নতুন জীবন শুরু করতে চেয়েছে। আসলে সে জিনার ভালোবাসার সুযোগ নিয়েছে, তাঁকে ভোগ করেছে। তাই ফেরার আগেই সে ভুবনেশ্বরে চলে যায়। জিনা যখন বুঝতে পারে সে দুইকূলই হারাতে চলেছে তখন নিজেই সে টিকিট কেটে কলকাতার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। প্রবৃত্তিময়ী পুরুষের বিবিধরূপ লেখক এখানে দেখিয়েছেন। যারা নারীর ভালোবাসা, ভালোলাগার সুযোগ নেয়। ব্যবহৃত হওয়ার পর জিনা উপলব্ধি করে পার্থ কিভাবে পাল্টে যাচ্ছে। পুরানো পোশাক যেমন পরিত্যাক্ত তেমনি হয়ে যাচ্ছে জিনা। কিন্তু সে প্রতরণা করেনি পার্থ। তবে সে ফাঁকি দিয়েছে স্বামী অসীমকে। পার্থও ফাঁকি দিয়েছে স্ত্রী গায়েত্রীকে। আধুনিক যন্ত্রণাময় জীবনের এক কঙ্কালসার রূপ আমার এখানে দেখি। স্টেশনে ফিরতে জিনা দেখেছে বিচে দেখা বিকলাঙ্গ দলটিকে। সেই মহিলাটিই সমস্ত বিকলঙ্গ মানুষদের নিয়ে যাচ্ছে স্টেশনে। আজ জিনা সে দলেরই অনুগামী হয়ে এগিয়ে চলেছে, ফিরবে কলকাতায়- নিজের সংসারেই আবর বাঁধা পড়বে।
‘সিনেমায় যেমন হয়’(১৯৯০) উপন্যাসটি উৎসর্গ করেন সৈয়দ মুস্তফা সিরাজকে। জীবন যেন কতগুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনাপুঞ্জের সমষ্টি। জীবনের খাতায় সবার হিসেব মেলে না। সিনেমার মতো এখানে বেঁচে থাকতে হয়, মানুষকে ক্রমাগত অভিনয় করতে হয়। এ উপন্যাসে লেখক নরনারীর সম্পর্কের মাধ্যমে জীবনের পরিণতির দিকটি দেখিয়েছেন। প্রকৃত অর্থেই এটি একটি আধুনিক উপন্যাস। দিব্যেন্দু পালিতের কাছে উপন্যাস হল বাস্তবের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও সহানুভূতির মিশ্রণ। এ উপন্যাসের সমাপ্তি চতুর্থ পরিচ্ছেদে। জীবনে বাঁচতে গার্গী হাত ধরেছিল দীপঙ্করের। সেখানে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আজ নিজেই বাঁচতে চেয়েছে সন্তান ধ্রুবকে নিয়ে। নদী যেমন চলতে চলতে বাঁক নেয় জীবনও তেমনি বাঁক নেয় । ভালোবাসা পুরাতন হতেই দীপাঙ্কর আর ফ্ল্যাটে ফেরে না, সে সম্পর্কে গড়ে তোলে শান্তার সঙ্গে। যেখানে স্বামী নেই সে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার কোন প্রয়োজন বোধ করেনি গার্গী। অন্যদিকে বিচ্ছেদের জন্য মামলা করেছে দীপঙ্কর নিজেই। আসলে তাঁর নজর এবার শান্তার দিকে। পুরুষের এই যে বহুরূপী মানসিকতা, যার ফলে সম্পর্কে ভগ্ন হয় মিনিটে মিনিটে এটাই লেখকের কাছে মনে হয়েছে সিনেমার মতো জীবন। উপন্যাসের শেষ হয়েছে একটি দৃশ্যের মাধ্যমে – রাস্তা অতিক্রম করেছিল গার্গী, তখন সিগনালে দেখে গাড়িতে দীপঙ্কর ও শান্তা। কোন অভিমান নয়, সে দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাঁর মনে হয়েছে জীবন এমনই, আবার নতুন করে শুরু, নতুন করে বাঁচা। এই বাঁচা নিজের সঙ্গেই প্রতিনিয়ত চলতে থাকে, আর নারী হলে সে সংগ্রাম আরো ভয়ঙ্কর- লেখক সেটিই উপস্থাপন করেছেন।
​​​‘গৃহবন্দী’ ( ১৯৯১) উপন্যাসে বাঙালি জীবনের প্রচলিত ছককেই ধরেছেন। নারীদের যতই স্বাধীনতার কথা আমরা বলি না কেন আজও তাদের অবস্থা ‘বিনু’র মতোই। কর্মের, চিন্তার তারতম্য হয়ত ঘটেছে কিন্তু সেই গণ্ডিবদ্ধ জীবনে নারীরা যেন আজও বন্দি। এ উপন্যাস সুতপা নামে একটি নারীর বন্দি জীবনের সাতকাহন। স্বপ্ন ছিল, ইচ্ছা ছিল, সাহস ছিল কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালি নারীরা যে খুব বেশি লক্ষ্য পৌঁছতে পারে না তা লেখক দেখিয়েছেন। আর লক্ষ্যে পৌঁছতে পারলেও সংসারের বলয় মেনে নিতে হয়। সুতপার বহু মেধাবীসত্তা থাকলেও স্ত্রী হওয়ার পর সমস্ত স্বপ্ন হারিয়ে গেছে। এ শুধু সুতপার জীবনকথন নয় প্রতিটি মধ্যবিত্ত নারীরই জীবনকথন। সে আজ বেঁচে আছে শিশু টুটুকে নিয়ে। সে গর্ভজাত সন্তান নয়, দত্তক নেওয়া। আসলে মানুষের সমস্ত ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয় না তবুও মানুষকে বাঁচতে হয়- “জীবনের সত্য মানুষের আকাঙ্ক্ষা মেনে চলে না। যদি চলত, তাহলে তোর জন্মে ফাঁকি থাকত না, আমার নারীত্বও অসম্পূর্ণ থাকত না – তাই সরাসরি চলে আসতিস আমারই পেটে। তবু কি ব্যর্থ হয়ে যায় জীবন ! আর ব্যর্থ হয় না বলেই ভেসে যাসনি তুই, আমিও আত্মহত্যা করিনি।”(১১) সুতপা বেঁচেছে। আসলে এই দ্বন্দ্ব- যন্ত্রণার মধ্য দিয়েই মধ্যবিত্ত নারীর বেঁচে থাকা- লেখক সেটিই দেখাতে চেয়েছেন।
দিব্যেন্দু পালিতের অনবদ্য এক উপন্যাস ‘অনুভব’। উপন্যাসটি ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে লিখিত, প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ এ আর সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পায় ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে। তিনি জীবন সম্পর্কে এক অনুভবের গদ্য রচনা করেছেন এ উপন্যাসে। এ অনুভব প্রকাশ পেয়েছে আয়েত্রী নামে একটি নারীর জীবনসংগ্রাম, বেঁচে থাকা, আনন্দ- বেদনার মধ্য দিয়ে। বঙ্কিমচন্দ্র প্রশ্ন তুলেছিলেন ‘এ জীবন লইয়া কি করিব?” জীবনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, জীবন সম্পর্কে বোধ, জীবনচেতনা, আদর্শ প্রতিটি মানুষের কাছেই পৃথক পৃথক।পৃথিবীর বহুবিধ মানুষের জীবনের বহুবিধ লক্ষ্য, আগ্রহ একটি উপন্যাসে ধরা সম্ভব নয়। তবে একটি মানুষের জীবন সম্পর্কে বোধ ও বোধির মাধ্যমে হয়ত অনেক কিছুই পাঠককে ধারণা দেওয়া সম্ভব। দিব্যেন্দু পালিত সেটাই করলেন আয়েত্রী চরিত্রকে সামনে রেখে। এক অস্থির জটিল অবস্থার মধ্য দিয়ে আয়েত্রীর সাতকাহন আমরা শুনি এ উপন্যাসসে। কোনটা ঠিক বা কোনটা ঠিক নয় এবং সে নিজে কোনটা করবে সে নিজেই জানে না। সে শুধু পারে ভাবতে, জীবনকে দেখতে, অনুভব করতে। সিনেমা ও সিরিয়ালে তাঁর নেশা নেই, সে অবসর সময় অতিবাহিত করে বই বা ম্যাগাজিনে। সে চাকরি পায় কল্পতরুর অফিসে। জীবনে নানা হাতছানি, সুযোগ থাকলেও সে গ্রহণ করে নি। এক বিস্মিত বোধেই তার জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। মানুষের জীবনবৃত্তান্ত পরীক্ষা করা তাঁর কাজ। এর মধ্যে সে নিজেকে মেলাতে পারে না, মেলানো সম্ভবও নয়। জীবন সম্পর্কে প্রতিটি মানুষের পৃথক পৃথক ধারণা। এসব সে অনুভব করে, উপলব্ধি করে। শূন্যতা থেকে পূর্ণতার পথে গমন, আবার সমস্ত কিছু থাকা সত্ত্বেও যে শূন্যতা সবাই সে অনুভব করে। কখনও মনে হয় অনুভূতিগুলিই হারিয়ে গেছে। উৎপলের স্ত্রী দেবী অসুস্থ, নিশ্চিত মৃত্যুর পথে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বার্থ, স্বার্থহীনতা, ভালোবাসা, অ্যামবিশান মানুষকে কোন পথে নিয়ে যায় উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিভাবে বলি দেয় দায়িত্ববোধকে আবার জীবনের শীর্ষে পৌঁছে আপন কর্মকান্ডের জন্য যে গ্লানিবোধ তা লেখক দেখিয়েছেন। আয়েত্রী আজ জীবনপঞ্জী পরীক্ষা করছে স্বপ্না নামে একটি মেয়ের। সে মেয়ে কিছুই অস্বীকার করেনি, ডিভোর্স থেকে চাকরি পাওয়া, উচ্চাকাঙ্ক্ষায় ব্যবহৃত হওয়া ও শেষে বর্জিত হওয়া আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। এই সংগ্রাম, পরিণতি ও ক্লান্ত বিধুর জীবন আজ তাঁকে জীবনের অন্যপ্রান্তে নিয়ে যায়। এই দূর্বিসহ জীবন সে মেনে নিতে পারেনি, নিজের জীবনের পরিণতি সে কল্পনা করতে পারে নি। নিজের কাজে ইস্তফা দেয়। উপন্যাসের সমাপ্তি এখানেই। লেখক আত্রেয়ীর জীবনের অনুভবকে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন। মনস্তত্ত্বের আশ্চর্য নিদর্শন এ উপন্যাস। পরিশেষে উপন্যাসে ব্যবহৃত তথ্য সম্পর্কে লেখক ফুটনোট দেন –“ এই উপন্যাসে বিভিন্ন সংবাদপত্র, সাময়িকপত্র, গ্রন্থ এবং নমুনা সমীক্ষায় প্রাপ্ত কিছু তথ্য কাহিনীর প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা হয়েছে।“ (১২)
​​​​​তিনি নিজের উপন্যাসকে বারবার ভেঙেছেন। যেহেতু তিনি নিজেই জানিয়েছেন তাঁর উপন্যাসের প্রথম পাঠক ও সমালোচক তিনি নিজেই তাই অপূর্ণবোধ তাঁকে বারবার পীড়া দেয়। যা তিনি লিখতে চেয়েছেন যতখন পর্যন্ত সেই বোধে পৌঁছতে না পারছেন ততক্ষণ পর্যন্ত চলে ত্রুটিমুক্ত করার সেই প্রচেষ্টা। তাঁর এই শিক্ষানবিশী চলে শূন্য থেকে অনন্তের দিকে। ফলে তাঁর সমস্ত উপন্যাসকে মিলিয়ে পড়া যায় না। বিবিধ সাতকাহনের আখ্যান নিয়ে তিনি উপস্থিত হন। তাঁর কাছে লেখকের সংগ্রাম নিজের সঙ্গেই, এই সংগ্রাম চলতে থাকে মৃত্যু পর্যন্ত। পরিচিত জীবনের যে অনন্ত রহস্য তাকে শিরোধার্য করেই তিনি প্লটে নামেন। কিন্তু সেখানে মিশে যায় তাঁর দর্শন ও জীবনবোধ- ফলে স্বতন্ত্র উপন্যাসের ঘরনা তৈরি হয়।
তথ্যসূত্র
১. দিব্যেন্দু পালিত, ‘সঙ্গ ও প্রসঙ্গ’, প্রথম প্রকাশ জুন ১৯৯১, আনন্দ, পৃ. ১০১।
২.তদেব, পৃ. ১০১।
৩. তদেব,পৃ. ৯৩।
৪. তদেব, পৃ. ৩৮।
৫. দিব্যেন্দু পালিত, ‘দশটি উপন্যাস’, প্রথম সংস্করণ ২০০০, আনন্দ, পৃ. ৬৭
৬.তদেব, পৃ. ২০৪।
৭. দিব্যেন্দু পালিত, ‘ঢেউ’, প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি ১৯৮৭, আনন্দ, পৃ. ১৪৩।
৮. ‘দশটি উপন্যাস’, তদেব, পৃ. ৫২৫।
৯. তদেব, পৃ. ৫২০।
১০. তদেব, পৃ. ৫২৫।
১১. তদেব, পৃ. ৬৪৪
১২. দিব্যেন্দু পালিত, ‘অনুভব’, প্রথম সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৯৪, আনন্দ, পৃ. ১২৮।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=