সাদিক হোসেন’এর গল্প : ভ্রমণ বৃত্তান্ত

আমার মেয়ে ছবি আঁকে। আমার মেয়ে ছবির ব্যাখ্যাও দেয়। 
প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পর তার সঙ্গে এই আমার খেলা। সারাদিন ধরে আঁকা ছবিগুলো সে প্রথমে আমাকে দেখাবে তারপর আবার ব্যাখ্যাও দেবে। তার সঙ্গে আমার কোনদিন মতের মিল হয় না। 
সেদিন সে বলল, জানিস, আজকে আমি মানুষ, ঘর আর বৃষ্টির ছবি এঁকেছি। এই দ্যাখ্‌।
ড্রয়িং খাতার উপর রঙ প্রায় সন্ত্রাস চালিয়েছে। ফ্যাটফ্যাটে সবুজ মাঠ, দূরে একটা ঘর, ঘরের পাশে মস্ত বড় গাছ। আর চারদিক দিয়ে সাদা রঙ তিরের মত ছুটে বেড়াচ্ছে; ঐটা বৃষ্টি।
সে বলল, বল্‌, কেমন এঁকেছি?
–ভাল। কিন্তু তুই যে বললি মানুষ এঁকেছি, এখানে তো একটাও মানুষ নেই!
–আরে আছে তো, সে এমন করে আমাকে মুখ ভেঙায় যেন আমি এতক্ষণ তার ছবিটা ধরতেই পারিনি। বলে, আরে বৃষ্টি হলে কি কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে? ওরা তো ঐ ঘরের মধ্যেটায় চলে গিয়েছে। এইটাও বুঝতে পারিস না!
–ও, তার মানে এই ছবিটায় মানুষগুলো আছে?
–আছে তো, ঐ ঘরটার মধ্যে আছে।
–কতজন আছে? 
কিছুক্ষণ ভেবে, নিজের কড়ে আঙুলের দিকে তাকিয়ে বলে, মনে কর্‌ পাঁচজন।
–মনে করব কেন? সঠিক সংখ্যাটা বল্‌।
–আচ্ছা, পাঁচজন।
–এই পাঁচজন কারা?
–একজন বাবা, একজন মা আর তিনজন ওদের ছেলেমেয়ে।
–তা ওরা এখন ঘরের মধ্যে ঢুকে কী করছে?
বাইরে তো বৃষ্টি হচ্ছে। তাই ওরা বাইরে বেরতে পারছে না। কিন্তু ওদের কাছে রেডিও আছে। ওরা গান শুনছে।
–টিভি দেখছে না?
–না। ওদের টিভি নেই।
–রেডিওতে কি গান শুনছে?
আমার মেয়ে ভাবতে থাকে। ভাবতেই থাকে। ওকে এই অবস্থায় রেখে দিয়ে আমি বাথরুমে চলে যাই। শাওয়ার চালাই। বুঝতে পারি গায়ে বৃষ্টির জল পড়ছে। ওদিকে সে দরজায় নক্‌ করতেই থাকে।
–কী হল?
–তুই তো ছবিটা বুঝতেই পারিস নি।
–কেন?
–আরে এত দূর থেকে আমি কী করে জানব ওরা কী গান শুনছিল?
এখন ওর কথায় হেসে উঠলে ও রেগে যাবে। তাই বেশ বিস্ময়ের সঙ্গে বলি, তাই তো! এটা আমার মাথায় ঢুকল না?
সে হি হি করে হেসে ওঠে, মা ঠিক কথাই বলে। তুই একটা পাগলা।
পেছন থেকে তার মায়ের গলা শুনতে পাই, এই তরী!
সে দৌড়ে পালায়।
এদিকে আমার, মুনমুন আর তরীর মধ্যে সেই পাঁচজন কখন যেন ঢুকে পড়ে। তারা আমাদের মধ্যেই থাকে। আমাদের সামনেই ঘোরাঘুরি করে, আমরা তাদের চিনতে পারি, আবার তারা আবছা হয়ে যায়। যদিও ছবিটা তরী এঁকেছিল প্যাস্টেলে, সাদা পৃষ্ঠার উপর ঘষে ঘষে রঙ তুলে। তার হলুদ মানে হলুদ, সবুজ মানে সবুজ, বৃষ্টি মানে সাদা রঙের তির, শুধু মানুষ বলতে মানুষ নেই; উধাও!
–কিন্তু উধাও মানুষগুলো গেল কোথায়?
এবার মুনমুন বলে, কেন ঘরের মধ্যেই তো আছে।
–সেতো অনেকক্ষণ হল। এখন বৃষ্টি থেমে গেছে!
থামলেই বা, তরী ফুট কাটলো, বাইরে তো জল জমেছে। তাছাড়া ওদের মা খুব কড়া। এখন বাচ্চাগুলোকে খেলতে দেবে না।
–তার মানে ওদের মা ওদের এবার পড়তে বসাবে? মুনমুন বলল।
কিন্তু ওদের ছোট বোনটি কিছুতেই পড়বে না। সে এখুনি কেঁদে ফেলবে। নিজেই ঠোঁট উলটে তরী উত্তর দিল।
–আর ওদের বাবা? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
এবার তরী খুশি, বাবার তো অনেক কাজ!
এই বৃষ্টির দিনে অনেক কাজ কেন?
মুনমুন বিরক্ত, আর মা বুঝি সারাক্ষণ ভেরেন্ডা ভাজে?
তরী মুনমুনকে জবাব দিল না। বলল, সেই যে সকালে বাজারে গিয়েছিল, ফেরবার সময় সাইকেলের চেইন পড়ে গিয়েছে। এখন বাবা সাইকেলটা ঠিক করবে।
আমি বলি, কিন্তু ছবিটাতে তো কোথাও সাইকেল নেই!
কেউ কি ঘরের সামনে সাইকেল রেখে দেয়? সাইকেলটা ঘরের পেছনে রাখা আছে। এখন বাবাটা ঘরের পেছনে সাইকেল ঠিক করতে যাচ্ছে।
আর বাবার সঙ্গে ছোট মেয়েটাও যাবে বুঝি?
তরী হাসে, তুই জানলি কী করে?
মুনমুনের মুখ ভার, বাবারা সব জানে!
জানে তো! আমি তরীর দিকে তাকালাম।
তরী বলল, ছোটটা তো যেতে চায়। এদিকে ও গেলে বাকি দুজনও জেদ ধরবে। তাই মা কাউকে যেতে দেবে না। সবাইকে একসঙ্গে পড়তে বসাবে। 
কী জ্বালা! আমি মুনমুনকে বিরক্ত করতে থাকি। 
সে উঠে যায়। বলে, আমি ছাদে যাচ্ছি। তোমরা বকরবকর কর।
মুনমুন চলে যায়। ওকে যেতে দেখে তরী বলে, আচ্ছা মা কি রেগে গেল?
তাই তো মনে হল!
খানিকক্ষণ সে যেন কি ভাবল। ভেবে বলল, ছাদে হাওয়া দিচ্ছে তো তাই মা ছাদে গিয়েছে।
– এই তো সুযোগ। এখন তো ওরা তিন ভাইবোন বাবার সঙ্গে ঘরের পেছনটায় চলে যেতে পারে। কি রে, তোর কী মত?
তরী হাসে। চোখ ঘোরায়। হয়ত একবার টুক করে দেখে নেয় মা ছাদ থেকে ফিরে আসছে কী না। তারপর বলে, তাহলে আমরা কি ঘরের পেছেনটায় যাব?
এতক্ষণ যেটাকে ঘর ভাবা হচ্ছিল সেটা কি অদৌ ঘর? ঘর হলে কাদের ঘর এইটা? এই ঘরের লোকজনদের সম্পর্কে তরীও বিশেষ কিছু জানে না। তাদের সঙ্গে কথা বলার উপায়ও নেই। আমরা শুধু তাদের কাজকর্ম দেখে যেতে থাকি। তাদের বাবা হাবাগোবা, ছেলেমেয়েগুলো বোকাসোকা। বড়টার বয়েস বারো-তেরো হবে, হাতে একখানা বাটি। 
এই রে! আমি তরীকে ফিসফিসিয়ে বলি, এইবার ছেলেটা নির্ঘাৎ মায়ের কাছে মার খাবে।
কেন?
এই দেখ্‌, চা খাবার বাটিতে মোবিল নিয়ে এসেছে। 
ইস্‌। এখন কী হবে? তরীর মন খারাপ।
আমি ওকে সান্ত্বনা দিই, চল্‌ না, বাড়ির আশপাশ থেকে একটু ঘুরে আসি। 
সে এককথায় রাজি হয়ে যায়।
ছবিতে সড়ক পথের চিহ্ন ছিল না। এখন দেখি সড়ক পথটি ভাঙাচোরা। কিছু আগে বৃষ্টি হওয়ায় জায়গায় জায়গায় জল জমেছে। জল জমেছে তো কী, তা দিয়ে তো মানুষের যাতায়াত কমে না। আমাদের সামনে থেকে প্যাঁক প্যাঁক করে একটা রিক্সা চলে গেল।
তরী বলল, লোকটাকে তুই চিনিস?
চিনব কী করে?
তরী হাসে, আমি চিনি। লোকটা ঐখানে কাজ করে। রোজ হেঁটেই যায়, কিন্তু আজ বৃষ্টি হয়েছে বলে রিক্সা নিয়েছে।
সে আঙুল দিয়ে দূরের কিছু নির্দেশ করে। অনেকদূর। অতদূরে আমি কিছুই দেখা পাই না।
আমি ওকে রাগিয়ে দিই, এইটা তুই বানিয়ে বানিয়ে বলছিস। গল্প বানাচ্ছিস!
বা রে, সে আমাকে হেলায় উড়িয়ে দেয়, এই লোকটা তো শহর থেকে আসে। রোজ আসে। স্টেশন থেকে রোজ হেঁটে হেঁটে যায়। ঠিক এই সময় লোকটাকে রোজ দেখা যায়।
তা সে কী কাজ করে?
ওইখানে যে ছোট্ট ঘরটা দেখা যাচ্ছে। ঐটা তো হেলথ সেন্টার। ঐখানে কাজ করে।
হেলথসেন্টার! তরীর মুখে এই শব্দটি আগে কোনদিন শুনিনি। সে এই শব্দটি শিখল 
কোথা থেকে? 
সড়ক পথ ধরে কিছুদূর এগোলে ‘তরুণসংঘ স্পোটিং ক্লাব’। ক্লাবটির লাগোয়া মাঠটি বেশ বড়। এখন এতবড় মাঠ মফস্বলে দেখতে পাওয়া যায় না। মাঠটির দুই প্রান্তে দুটো করে বাঁশ পোঁতা। দেখলেই বোঝা যায় এইখানে নিয়মিত ফুটবল খেলা চলে। 
ক্লাবঘরের ভেতর থেকে ক্যারামের আওয়াজ ভেসে আসছিল। 
চল্‌। ভেতরে যাই। তরীকে লোভ দেখাই।
ঐ দেখ্‌ ‘মেম্বার্স অনলি’ লেখা। আমাদের ঢুকতে দেবে না। সে বাঁধা দেয়।
আরে চল্‌ না, ঐসব এমনিই লেখা থাকে। আমি ওকে প্রায় টেনে ক্লাবঘরের ভেতর নিয়ে
চলি। ও মা! গিয়ে দেখি আমাদের বাপ-বেটিকে কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না। তারা খেলায় এতটায় মত্ত যে একটা সাড়ে ছয় বছরের মেয়ে ঘুরঘুর করছে সেদিকে কোন খেয়াল নেই।
রংচটা দেয়াল। দেয়ালে মেসি, রোনাল্ডো আর নেইমারের ছবি পরপর সাঁটা। সবার উপরে শচীন তেন্ডুলকর, সেটা বাঁধানো। একপাশে কাঠের আলমারি, পাল্লাগুলো কাচের। ভেতরে বেশ কয়েকটা শিল্ড রয়েছে। সবচেয়ে বড় শিল্ডের নিচে খোদাই করা – বীণাপাণি দেবী স্মৃতি টুর্নামেন্ট, ১৯৯৬।
তরীর প্রশ্ন, এই বীণাপাণি দেবী কে?
আমি হেসে ফেলি। 
কি রে বলছিস না কেন?
মনে কর বীণাপাণি দেবীর পুত্রের নাম বিনোদবিহারি। তিনি তাঁর মায়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছিলেন।
মনে করব কেন? ঠিক করে বল্‌। 
আমি চিন্তায় পড়ে যাই। শেষপর্যন্ত বলি, এই বীণাপাণি দেবী কিন্তু যে সে মানুষ নন।
তবে? তরী উত্তেজিত।
তবে কী?
আরে বীণাপাণি দেবী মানুষটা কেমন? 
সেতো অনেকদিন আগেকার কথা। সবটা মনেও নেই। তখন আমাদের দেশ স্বাধীন হয়নি। সেই বৃটিশদের সময়ের গল্প।
বৃটিশরা কী করত?
ওরা তখন আমাদের শাসন করত।
কেন ওরা আমাদের শাসন করত?
তরীর প্রশ্নের আমি কোন উত্তর খুঁজে পাইনা। কী বলব বুঝতেও পারিনা। আমাকে বিব্রত হতে দেখে সে নিজেই উত্তর করল, ও বুঝেছি, এখন যেমন আমাদের প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী থাকে – সেইসময় বৃটিশদের লোক আমাদের প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী ছিল, তাই না?
ঠিক এরকম বলা যায় না। তবে খানিকটা এইরকমই।
হুম। বুঝেছি। এইবার বীণাপাণি দেবীর কথা বল্‌।
সে-এক মস্ত ঘটনা, বুঝলি!
তরী চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকায়। এতক্ষণ যারা ক্যারাম খেলছিল তাদের গেম বুঝি শেষ হয়ে গিয়েছে। তারাও তরীর আশপাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের মধ্যে থেকে একজন বলল, আমরা কিন্তু সেবার ফাইনাল জিতেছিলাম। আমাদের শ্যামলদা তিনটে গোল করেছিল। আহা! সেই দিনটা এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তো আপনি কী বলছিলেন?
বীণাপাণি দেবী! তরী সবাইকে চুপ করিয়ে দেয়।
আমি আবার শুরু করি – সে-এক মস্ত ঘটনা। বেশ কয়েকদিন কালাজ্বরে ভুগে বীণাপাণি দেবীর স্বামী মারা গেলেন। মৃত্যুর আগে সংসারের জন্য তিনি প্রায় কিছুই রেখে যেতে পারেননি। এখন পাঁচ বছরের বাচ্চাটিকে নিয়ে বীণাপাণি দেবী বড় ফাঁপরে পড়লেন। কী করবেন কিছুই ঠিক করতে পারলেন না। এদিকে দিন যত গড়াতে লাগল, সংসার তত খড়কুটোর মত ভেসে যেতে থাকল। কোন কোন রাতে তিনি সারারাত ঘুমতে পারেন না। চুপচাপ শুয়ে থাকেন। জানালার ওপারে কত কিসিমের আওয়াজ পান তখন। হয়ত কোন ছুঁচো ঘরের পেছনের দিকটায় ঘুটঘুট করছে। তারপর যেন শেয়ালের আওয়াজ। দূর থেকে, বহু দূর থেকে বুঝি কী যেন ভেঙে পড়ছে। ঝুরঝুর করে মাটি বুঝি গড়িয়ে নেমে গেল নদীতে। বীণাপাণি দেবী তাঁর সন্তানের কপালে হাত দেন। চুলগুলো চোখের উপর থেকে সরিয়ে দেন। কখনো হয়ত জানলার ফাঁক থেকে দেখেন সামনের গাছটার ডালে একখানা লক্ষ্মী পেঁচা বসে রয়েছে। চাঁদের আলোয় তার গা চকচক করছে। 
তারপর ভোরবেলা দরজা খুললে দেখেন কুয়াশা! একটা ভারী চাদর যেন তাঁদের গ্রামের উপর নেমে এসেছে। তাঁর গা ভিজে ভিজে যায়। ‘কুইহু’ ‘কুইহু’ করে একটা পাখি ডেকে ওঠে। তিনি খামোকা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন খানিক। কুয়াশার ওপার থেকে একজন অপরিচিতকে এইদিকে আসতে দেখেন।
কে? কে ওখানে?
কোন উত্তর আসেনা। 
অবয়বটি নিকটবর্তী হলে বোঝা যায় তিনি বীণাপাণি দেবীর কবেকার সাথী। সেই কবে কোন শৈশবে তাঁরা দুইজন মেয়ে কত অহেতুক খেলাধুলোয় জীবন কাটিয়ে ছিল। হায়! বীণাপাণি দেবীরও একদা শৈশব ছিল, তা বুঝি বীণাপাণি দেবী নিজেই ভুলতে বসেছিলেন।
তাঁর বন্ধুটি রংচঙে। পরনে ঘাগরা। তাও সবুজ রঙের। গায়ে পাতলা চাদর। 
বীণাপাণি দেবী বন্ধুটিকে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
বিনোদবিহারি এতক্ষণ চুপচাপ মায়ের বন্ধুটিকে দেখছিল। সে এই রংচঙে মানুষটির ধারেকাছে ঘেষছে না।
এতসবে খেয়াল করা হয়নি, বন্ধুটির কাঁধে একখানা ঝোলা ঝুলছে। ঝোলাটিও বিচিত্র। বিভিন্ন রঙের কাপড়ের তাপ্পি দিয়ে সেটা বানানো হয়েছে। তিনি বিনোদবিহারিকে কাছে ডাকলেন। ছেলেটি কী করবে বুঝতে পারছিল না। খালি মায়ের দিকে তাকায়। যেন মা নির্দেশ দিলে তবেই সে ওদিকে পা বাড়াবে।
ছেলেটির এ হেন ভঙ্গি দেখে বন্ধুটি হেসে ফেললেন। হাত ধরে ছেলেটিকে পাশে বসালেন। তারপর ঝোলা থেকে একখানা ফল বার করে বললেন, এই নাও। তোমার জন্যে এনেছি।
ফলটি অচেনা। এই ফল এখানকার নয়। বিস্ময়ে বিনোদবিহারির চোখ ছানাবড়া।
বন্ধুটি বললেন, কী নাম বলতো এইটার?
বীণাপাণি দেবীও আগে এই ফল দেখেননি। তিনিও অবাক। কী ফল?
বন্ধুটি রহস্য মিশিয়ে বললেন, স্ট্রবেরি!
হতেই পারেনা, হতেই পারেনা। তরী চেঁচিয়ে উঠল।
ক্লাবের লোকজনও হতাশ। বলল, এ আপনি কী বলছেন? ঐ অজপাড়াগাঁয়ে স্ট্রবেরি! তাছাড়া বিনোদবিহারির মত লোক, সে স্ট্রবেরি খাবে? বিনোদবিহারি নামের সঙ্গে স্ট্রবেরি কিছুতেই যায় না। আপেল হলে তবু চলত। সবথেকে ভাল মানাত আতা, কিংবা আঁশফল। তা বলে স্ট্রবেরি!
আসলে স্ট্রবেরিই! আমি আমার দাবী থেকে কিছুতেই সরলাম না। উল্টে বললাম, এই স্ট্রবেরির অন্য গল্প আছে।
আবার তুই মিথ্যে বলবি! তরীর অভিমান তখনো কমেনি।
আমি ওকে শান্ত করতে বলি, আচ্ছা শুনেই দেখ্‌ না। বিনু, মানে আমাদের বিনোদবিহারি, কিন্তু স্ট্রবেরিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। তার কচি হাতের তালুতে টকটকে লাল ফল, ফলের চামড়াটা খানিকটা খরখরে, নিচের দিকটা ছুঁচলো – সে শুধু ফলটি নাকের কাছে তুলে গন্ধ নেয়। তার নাকে এক অচেনা গন্ধ আসে। এই গন্ধ তার চারপাশের গন্ধ না। তার গ্রাম, তার গাছপালা, তার নদনদীর থেকে এই সুবাস অনেক আলাদা। এ যেন বিদেশ। বিনু মুঠোর মধ্যে বিদেশ ধরে আছে। মুঠো খুললেই তার সম্মুখে বিদেশ উপস্থিত। 
বীণাপাণি দেবীর অনুভূতিটাও খানিকটা তেমন। তিনিও বিনুর তালুর উপর ঝুঁকে পড়েন। তারপর ফলের গন্ধ নিতে নিতে কখন বিভোর হয়ে যান। মনে হয় তার এতদিনকার দেশ পাল্টিয়ে গেছে। দেশটি যেন দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। তিনি এখন যে খন্ডটিতে বসবাস করছেন সেইটি তার বিদেশ। এই বিদেশের সুবাস তাঁকে বড় উতলা করে দেয়।
ওদিকে বন্ধুটি মা-ছেলের কান্ড দেখে আবাক। তিনি বলেন, আমাকে আবার দোষ দিও না। সব দোষ কিন্তু ঐ ফলের।
তুই এই ফলটা পেলি কোথায়?
সে অনেক কাহিনি। এখন ওসব থাক। বরঞ্চ তোমাদের কথা বল। 
বীণাপাণি দেবী আর নিজের মুখে কী কথাই বা বলবেন। তিনি শুধু তাঁর ভাঙাচোরা ঘরের দিকেই তাকিয়ে থাকেন। তাঁর সবকিছুই ভেঙে গিয়েছে। একটি আসবাবও অবশিষ্ট নেই যা পেরেক ঠুকে জোড়া লাগানো হয়নি।
বন্ধুটি বুঝি কিছুটা বুঝতে পেরেছিলেন। বললেন, তোরা এবার আমার সঙ্গে চল্‌। এই বিনু আমার সঙ্গে যাবি তো?
কোথায়?
সে আর এক বিদেশ।
অনেকদূর?
অনেকদূর!
এতটা বলে আমি থামতে চাইছিলাম। ক্লাবের লোকগুলো আমাকে চেপে ধরল, দাদা তো দেশভাগের গল্প বলছেন। বীণাপাণি দেবী তবে কি বাংলাদেশের মানুষ ছিলেন?
বাংলাদেশ এখান থেকে কতদূর? তরী জানতে চাইল।
তরীকে উত্তর দিতে চাইছিলাম। অমনি দেখি হুলস্থূল বেঁধে গেছে। কী ব্যাপার? না, যাকে নিয়ে প্রথমে কথা হচ্ছিল, তিনিই স্বয়ং উপস্থিত হয়েছেন। ফাইনালে তিন গোল করা শ্যামলবাবু প্রায় রাজার মত ক্লাবে ঢুকলেন। তাঁকে সংক্ষেপে আমার গল্পটি শোনানো হল। তিনি সব শুনে বললেন, বীণাপাণি দেবীর বিষয়ে তো তেমন কিছু জানি না। তবে বিনোদবিহারি মশাইকে চিনতাম। হ্যাঁ, ওরা ওপার থেকে এসেছিল বটে। ঠিক কোথা থেকে এসেছিল তা বলতে পারব না। ওরা তো ঠিক এখানকার মানুষ না। হাকিমপুরে ওদের বাড়ি ছিল। এখন বোধহয় ওখানেও কেউ থাকে না। যা হয় আর কি, সেবার টুর্নামেন্টে তিনি বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। তাই তাঁর মায়ের নামে টুর্নামেন্টের নাম রাখা হয়েছিল। এ আর এমন কী? এসব তো হয়েই থাকে।
তরী শ্যামলবাবুর অনেক কথাই বুঝি বুঝতে পারেনি। সে বলল, কিন্তু ‘ওপার’ মানে কি? ওটা কি বিদেশ?
ওর কথা শুনে সকলেই হেসে উঠল। আমি আর দেরি করলাম না। তরীকে বললাম, কাকুদের গুডবাই বল্‌। এবার আমরা এখান থেকে উঠব।
শ্যামলবাবু বাঁধা দিলেন, আরে চা খেয়ে যান।
তরী চা খাবে না। আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম।
আকাশে মেঘ কেটে গিয়েছে। মেঘ কেটে গেলেও হাওয়া দিচ্ছে, সেটা ঠান্ডা। 
তরী বলল, এখানে কি বর্ষাকাল?
না রে। আমি চারদিকের গাছপালা দেখে নিয়ে বোঝবার চেষ্টা করি। বলি, বর্ষাটা শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু শেষ হয়ে যাবার পরেও তো খানিকটা বৃষ্টি নামে হঠাৎ হঠাৎ। এই বৃষ্টিটা সেইরকমের।
হুম, বুঝেছি। তরী বেশ গ্রামের বুড়িদের মত করে বলল, সেইকারণে মাটিটা আবার শুকনো হয়ে গেছে, দ্যাখ্‌। বর্ষাকাল হলে ভেজা মাটিতে এখনো জল জমে থাকত।
আমাদের পাশ দিয়ে মোটর ইঞ্জিন লাগানো একটা ভ্যান রিক্সা চলে গেল। ভাঙাচোরা রাস্তায় সেটি প্রায় পিংপং বলের মত লাফাচ্ছে। 
তরীকে বললাম, দেখিস, আর কিছুদূর গেলেই কতরকমের সব্জির চাষ দেখা পাব।
কী করে জানলি?
বাবারা সব জানে। 
ও রহস্য মিশিয়ে আমার দিকে তাকাল। ওর চোখে গভীর অবিশ্বাস।
আমরা হাঁটছিলাম। আমাদের দু’দিক দিয়ে মাঠ, ঘরবাড়ি, চায়ের দোকান সব পেছনে চলে যাচ্ছিল। একটি ছেলে, তরীর মতই বয়েস হবে, সাইকেলের টায়ার ঘোরাতে ঘোরাতে চলে গেল। পুকুরের উপর নারকেল গাছটি প্রায় কুঁজো হয়ে শুয়ে আছে। তারওপর একটা কাটবেড়ালি কীসব খুটুর খুটুর করছে। প্রাণীটার সবকিছুতেই যেন তাড়া। দু’দন্ড স্থির হতে শেখেনি। কয়েকটা ইট বিছিয়ে ঘাট মত বানানো। সেইখানে উবু হয়ে বসে বাড়ির মেয়েটি ছাই দিয়ে থালাবাসন মাজছে। সে তার কাজে মগ্ন নয়। মাজতে মাজতে বুঝি অন্যকিছু ভাবছিল। সেই সুযোগে একটা কাক এসে পাশে রাখা থালা থেকে খাবার খুঁটে খেয়ে নিল। 
বেশিদূর নয়, সামনেই সব্জির চাষ। সারি সারি গাছ লাগানো হয়েছে। তাতে নীল নীল বেগুন। সব বেগুনের প্রায় একই সাইজ। সামান্য হাওয়াতেই গাছগুলি মাথা ঝাঁকায়। আড়মোড়া ভাঙে। কান পাতলে আমরা দু’জনাই হাই তোলার আওয়াজ পেলাম। 
বেগুনের পর ঢ্যাঁড়স, তারপর পটল, তারপর কি শসার চাষ দেখতে পাব? শসা গাছগুলি তো নিজের ফলটিকে যেন বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে। গাছগুলি মা। গুচ্ছ গুচ্ছ সবুজ শিশুকে নিয়ে মিটি মিটি হাসে। শিশুগুলির গায়ে কী ছোট ছোট কাঁটা; কাঁটা নয় – রোঁয়া। চাষির নাম নুরুল বিশ্বাস। সে শসাটি হাতে ঘষে রোঁয়াগুলি তুলে নেয়। তারপর তরীকে দিয়ে বলে, নাও বেটি। এ তো চাষের জিনিস। খোসা ছাড়াতে হবে না। কামড়ে খেয়ে নাও। 
আমরা শসা খাচ্ছিলাম। নুরুল বিশ্বাস বিড়িতে টান দিচ্ছিল। গাছগুলি পরস্পর হাত ধরে ছিল। নির্দিষ্ট সময়ের পর পর দমকা হাওয়া আসছিল। হাওয়া এলেই তারা ঘোরোঘোরো-চাকাচাকা খেলছিল। তারপর হাওয়া চলে গেলে আবার চুপ করে অপেক্ষা করছিল। 
নুরুল বিশ্বাস সেইদিকে চেয়ে হাসছিল। তার সঙ্গে সব্জিগুলি কথা বলতে পারে। আচমকা ‘কুইহু’ ‘কুইহু’ করে একটা পাখি ডেকে উঠল।
তরী বলল, তারমানে এইখানেই কোথাও বীণাপাণি দেবী থাকতেন?
কে? নুরুল বিশ্বাস বুঝি কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিল। আমরা আর দেরি করলাম না। ওইখান থেকে উঠে পড়লাম।
কিছুদূর যেতে দেখি রাস্তাটা দু’দিকে ভাগ হয়েছে। একদিক গেছে হাকিমপুর। অন্যদিকটা রামরাজাতলা। মাঝখানের জমিতে একটা ঝাঁকড়া গাছ। পাশেই টিউবওয়েল। একটা প্রস্তরখন্ড খুব হেলাফেলায় স্থাপন করা হয়েছিল। সেইটাতে খোদাই করে লেখা – শহীদ বাবলু সামাদ্দার অমর রহে (১৯৫২ – ১৯৮৩)
তরীকে বলি, কীরে কোনদিকে যাবি?
সে বেশ চিন্তিত। খানিকক্ষণ ভেবে বলে, এতক্ষণ বুঝি ওদের মায়ের রাগ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে বল?
তাই তো মনে হচ্ছে। কিন্তু তুই কি ওদের ঘর চিনতে পারবি এখন? আমরা কিন্তু অনেকটাই হেঁটে চলে এসেছি!
অচেনা জায়গায় ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসে। এখানেও তেমনটাই হল। গাছগুলি হঠাৎ লম্বা হয়ে গিয়েছে। আকাশে তারা ফুটেছে। আধখানা চাঁদ। চাঁদের উপর দিয়ে মেঘ সরে যায়। গাছগুলির উপর দিয়ে অন্ধকার নামে। মাঝে মাঝে দুয়েকটা রিক্সা। কেউ সাইকেল করে বেরিয়ে যায় চেনা রাস্তা ধরে। 
মোড়ে লম্ফ জ্বালিয়ে একজন ঘুগনি বিক্রি করছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল। সে উত্তর করতে পারল না। ‘তরুণসংঘ স্পোটিং ক্লাব’টিও নাকি অনেকটাই দূর। কতটা হেঁটেছি আমরা হিসেব করতে পারলাম না। তরী বলল, ক্লাবের কাছটায় যেতে পারলে ঠিক চিনতে পারব। 
মাঝখানে একটা খাবারের দোকান পেলাম। কী খাবি?
তরীর কোন খাবারই পছন্দ হল না।
আমি বললাম, ভাত খাব।
একটা স্টিলের বাটিতে চারাপোনা ভেজে দিল। সঙ্গে ডাল। মোটা মোটা ভাত ডাল দিয়ে মেখে খেয়ে নিলাম। তরীও দুগাল খেল।
আর কী আশ্চর্য! দোকান থেকে বেরিয়েই দেখি মস্ত বড় গাছটা দারোয়ানের মত দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাছটার পেছনে আমরা ঘরটিকে চিনতে পারলাম।
তরী হাততালি দিয়ে উঠল। আমরা দৌড়ে চলে গেলাম ঘরটার কাছে। 
তরী বলল, এইদিকে আয়।
আমরা ঘরটার পেছনে গেলাম। পুরনো আমলের একটা সাইকেল। সেটি কাত করে দেয়ালের গায়ে দাঁড়ম করানো। সাইকেলটির গলায় বাজারের থলি ঝুলছে। 
একটি জানালা অর্ধেকটা খোলা। তা দিয়ে ঘরের আলো কিছুটা বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ভেতর থেকে খুটখাট সাংসারিক আওয়াজ আসছে। 
তরীকে কোলে তুলে নিলাম। তারপর পাল্লাটা আর একটু ফাঁক করে মুখ রাখলাম। দেখি মা বিছানা ঝাড়ছে। বড় ছেলেটি বকা খেয়েছিল। সে মাদুরের উপর বসে দুলে দুলে পড়ছে। অন্যজন সোকেস থেকে কী একটা পাড়তে চাইছিল।
কিন্তু বাবা কোথায়? আর ছোট মেয়েটা?
আমরা ওদের কাউকেই দেখা পেলাম না। রেডিওতে খবর পড়ার শব্দ পেলাম। তারপর গান শুরু হল।
তরীর মুখ ভার। 
আমি ওকে কোল থেকে নামিয়ে দিই। এদিকে আয়।
সে আমার পিছু পিছু বেড়ালের মত হাঁটছিল। তার ছোট ছোট পা, হাল্কা শরীর, হাঁটলে এমনিতেও শব্দ হয় না।
আমরা ঘরের সামনেটায় এলাম। এখান থেকে সড়ক পথটা দেখা যাচ্ছে। তবে মস্ত বড় গাছটা সড়ক থেকে যেন ঘরটাকে আড়াল করতে চাইছে। দরজাটা ভেজানো। ভেতর থেকে বন্ধ করা হয়নি।
কি রে ভেতরে যাবি? গিয়ে কথা বলবি?
তরী হ্যাঁ-না কিছুই বলে। শুধু কোনরকমে দু-দিকে মাথা নাড়ে। তার চোখ ছলছল হয়ে আসে।
তাহলে ফিরে চলি?
সে আমার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিজেই হাঁটতে শুরু করে দেয়।
রাতের হাওয়া অনেক অনেক দূর থেকে আসে। বিদেশ থেকে আসে। রাতের হাওয়া সবসময় ওপারের হাওয়া।
যখন ছাদের গেলাম, তখন সেই হাওয়ায় মুনমুনের চুল উড়ছে। তার মাথার উপর আধখানা চাঁদ। মুখের উপর স্ট্রীটলাইটের আলো। 
সে আমাদের দেখে মিটমিট করে হাসছিল। রেডিওতে পুরনো গান চলছিল। আমরা তিনজন মিলে অনেকক্ষণ গান শুনলাম।

লেখক পরিচিতি
সাদিক হোসেন
কথাসাহিত্যিক
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন। 

One thought on “সাদিক হোসেন’এর গল্প : ভ্রমণ বৃত্তান্ত

  • March 16, 2021 at 10:50 am
    Permalink

    এই ধরনের গল্প বাংলা ভাষায় বিরল। খুব কঠিন কাজকে সহজ করেছেন লেখক।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=