মোহিত কামালের গল্প: চারপাশ যখন ভাঙতে থাকে

নদীতে ভরা জোয়ার।

প্রমত্ত মেঘনার ঢেউগুলো ফুলেফেঁপে উঠছে, ধেয়ে আসছে অসুরের মতো, আঘাত হানছে পাড়ে, গর্জন তুলে ফেটে যাচ্ছে, ছিটকে পড়ছে নোনাজল।
ঢেউয়ের আঘাতে চারদিক কেঁপে কেঁপে ওঠে, পাড়ের মাটি নরম হয়, ফাটল ধরে। আবার আসে ঢেউ, আবার, বারবার।
প্রকৃতির রুদ্ররোষ সইতে না পেরে ঝপাৎ করে ভেঙে পড়ে পাড়, কোমল মাটি। খরস্রোতা নদী দানবের মতো গিলে খায় জনপদ, লোকালয়, স্কুল, কলেজ, হাট-বাজার-বন্দর, মসজিদ, মন্দির। ঘোলাটে পানির ঘূর্ণির টানে ভেসে যায় সব, সমূলে উৎপাটিত হয় বুকের শেকড়।
কোথায় যায় এই মাটি? কোথায় যায় বংশের আদি শেকড়? কোথায় জ্বলে ছারখার করা গোপন পিদিম? চারদিকে নিঃস্ব মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর কত শুনবেন, কত দেখবেন ভাঙনের করাল গ্রাস!
কপালে হাত রেখে কড়া রোদ থেকে দু’চোখকে আড়াল করে স্টিমার ঘাটে, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভাবছেন মোশাররফ ভুঁইয়া, ঐতিহ্যবাহী সন্দ্বীপ কারগিল হাইস্কুলের এককালের জাঁদরেল শিক্ষক। সত্তরের মতো বয়েস, হালকা-পাতলা ছিপছিপে শরীর। চোখে চশমা, কালো ফ্রেম। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে অপলক চোখে তাকিয়ে আছেন উত্তাল স্রোতের দিকে।
স্রোতের টানে সব গেছে তার, গেছে পৈতৃক ভূসম্পত্তি, ঐশ্বর্যময় পুরনো বাড়ি। বাড়ির সামনে বিরাট মসজিদের পশ্চিমের দেয়াল যেদিন হেলে পড়ল, বজ্রনিনাদ এবং অট্টহাসি শুনেছিলেন কেবল। পশ্চিমের তোলপাড় করা বিশাল জলরাশি থেকে ভেসে আসছিল ওই ভয়াবহ শব্দরাজি, স্রোতের গর্জন। কখনও কাঁদেননি তিনি, কেবল ওই দিন মসজিদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুকের ভেতর হুহু করে জেগে উঠেছিল কান্নার ঢেউ, দু’চোখ বেয়ে নেমেছিল অশ্রুঢল।
হঠাৎ স্টিমারের সিটি শুনতে পেলেন তিনি। ধ্যান ভেঙে গেল তাঁর।
দক্ষিণের দিগন্তসীমায় চোখ স্থির হয়ে গেল। হ্যাঁ, স্টিমার আসছে। ঘাটে অপেক্ষমাণ নারী-পুরুষ, কুলি সবাই সচকিত হয়ে উঠেছে। কারও আত্মীয়স্বজন আসবে চট্টগ্রাম থেকে, অনেকে আবার বরিশালের যাত্রী।
মোশাররফ ভুঁইয়ারও বড় ছেলে, ছেলের বউ এবং নাতি-নাতনি আসবে আজকের স্টিমারে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, চট্টগ্রামে থাকে।
সিটি শুনে বিষাদ কেটে গিয়ে আনন্দে ভরে উঠছে মন। ভরা জোয়ারের উপচে ওঠা ঢেউয়ের মতো এগিয়ে আসছে আনন্দঢেউ।
স্টিমারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই নিয়ন্ত্রণ হারা হয়ে পড়েন তিনি। একি! খুশির সময় চোখে পানি কেন!
পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করেন। চোখ মোছেন।
স্লামুয়ালাইকুম, স্যার।
সালামের সম্বোধন শুনে চমকে উঠে ডানপাশে তাকালেন তিনি। এক সুদর্শন যুবক পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে পায়ের ধুলো নিল সে।
যুবকটিকে চেনা চেনা লাগছে, চিনতে পারছেন না। বয়সের কারণে কি স্মৃতিশক্তি কমে গেল?
আমার নাম জসিম, আপনার ছাত্র। উনিশশ ছিয়াত্তর সালে কারগিল হাইস্কুল থেকে পাস করেছি।
আনন্দে চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠল। জসিমকে চিনতে পেরেছেন। অসম্ভব মেধাবী ছাত্রটিকে কাছে পেয়ে বিচলিত হলেন তিনি। বুকে জড়িয়ে ধরেছেন পরম মমতায়।
জসিমের পেছনে আছে ফুটফুটে একটি মেয়ে। বয়স চার-পাঁচের বেশি না। তার হাত ধরে আছে মেয়েটির মা, অসাধারণ রূপবতী।
জসিম পরিচয় করিয়ে দিল ওদের।
ছোট্ট মেয়েটিকে হাত ধরে কাছে টেনে নিলেন তিনি।
কী নাম তোমার লক্ষ্মীমণি?
শামা।
কী! ভুরু বাঁকিয়ে আবারও প্রশ্ন করলেন মোশাররফ ভুঁইয়া।
মেয়েটি খুব চটপটে। জড়তাহীনভাবে দু’বার উচ্চারণ করল,
শামা। শামা। কেন, শোনোনি, তুমি কি কানে কম শোনো?’
একটু হোঁচট খেলেন মোশাররফ ভূঁইয়া। যুগ পাল্টেছে, যুগের সঙ্গে নামের ধরনও পাল্টেছে, আজকাল শিশুরা অনেক এগিয়ে গেছে। সময়ের স্রোত এভাবে পাল্টে দেয় সব, পুরাতন মুছে দেয়, নতুন কিছু গড়ে তোলে। নদীর স্রোতের মতোই এ-কূল ভাঙে, ও-কূল গড়ে।
শামা অর্থ জানো, দাদুমণি?
জানি। শামা অর্থ পিদিম, চেরাগ, আলোর উৎস।
এত জানো! খুশি হলেন তিনি। দুরন্ত মেয়েটিকে কোলে তুলে নিলেন। তাঁর খারাপ মন ভালো হয়ে গেল।
নতুন জেনারেশন। নতুনের সঙ্গে পুরাতনকে খাপে খাপে মিলিয়ে নিতে হবে। মিলাতে না পারলে কষ্ট, কেবলই কষ্ট বাড়বে। মোশাররফ ভুঁইয়াও পুরাতন খোলস ঝেড়ে নতুন মোড়কে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন।
শামামণি, তোমরা কোথায় থাক?
বরিশাল।
বরিশাল?
হ্যাঁ। আব্বু তো বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার। এফসিপিএস, সার্জারি।
বাব্বা! এত বড় ডাক্তার তোমার আব্বু?
হ্যাঁ। বড় ডাক্তার। সার্জন। অপারেশন করেন।
গর্বে বুক ফুলে ওঠল, তার হাতে গড়া ছাত্র, আজ কত বড় সার্জন!
বাঁ হাতে আবার তিনি জসিমকে বুকের কাছে টেনে নিলেন।
আনন্দ! কেবলই অনুভবের। এই আনন্দ কি টাকা দিয়ে কেনা যায়? যায় না। মনে হলো সহস্র কোটি টাকার আনন্দ পুরে নিলেন বুকে। তিনি সার্থক। সার্থক তার শিক্ষকতা জীবন।
বেড়াতে এসেছিলে? জসিমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন।
জি। এক সপ্তাহ থেকে গেলাম, আজ চলে যাচ্ছি।
তোমাদের বাড়ি আজিমপুর গ্রামে না?
জি।
আছে, না খেয়ে নিয়েছে রাক্ষুসে মেঘনা?
এখনও আছে। যায় যায় অবস্থা। বাবা তো নেই, মা থাকেন বাড়িতে, কিছুতেই বাবার ভিটে ছেড়ে যেতে চান না। এখনও বাবার কবর আগলে বসে আছেন।
ওহ্! মনটা হঠাৎ আবার ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল।
না। এ সময় মন খারাপ করা চলে না। বার্ধক্যের ভারে নতজানু তিনি। মন এখনও শক্ত। আনন্দের সময় মন খারাপ রাখতে নেই। আনন্দ তো কখনও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই যখন ‘সময়টি আসবে পরিপূর্ণ উপভোগ করাই শ্রেয়। অপচয় করা উচিত নয়। ভাবলেন তিনি।
মুখে হাসি টেনে আনলেন, শামার মায়ের দিকে তাকালেন। তোমাদের বাড়ি কোথায়, মা?
খুলনা। খালিশপুর। আলতো করে জবাব দিল শামার মা, রোজি আকতার।
আবার একবার ধাক্কা খেলেন মোশাররফ ভুঁইয়া। তাদের সময় বিয়েপ্রথা চালু ছিল একই গ্রামে কিংবা ভিন্ন ইউনিয়নে। নিজ থানার বাইরে কেউ বিয়ে করত না।
এটাও সময়ের দাবি। নতুন প্রজন্ম কোনো ব্যারিকেড মানে না। দেশের এ-প্রান্তে ও-প্রান্তের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিয়ে হচ্ছে। এখন বিদেশিনী বিয়ের হারও বেড়ে গেছে। প্রাচীন সামাজিকপ্রথা ভেঙে পড়ছে, নতুন কাঠামো গড়ে উঠছে। সহজে এসব মেনে নেওয়া উচিত। না মানলে যে দুর্ভোগ বাড়বে। পরিস্থিতি, পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই তো জীবন। এই শিক্ষা তো তিনি দিয়ে এসেছেন ছাত্রদের। অথচ কী আশ্চর্য! বড় ছেলে আবুল কালাম আজাদ যখন চট্টগ্রামের মেয়ে বিয়ে করল কেমন ভেঙে পড়েছিলেন। শোকে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলেন। নিজের গোঁড়ামির জন্য সময় বয়ে গেছে…সময়ের নির্মমতার কাছে পরাজিত হয়েছেন তিনি।
স্টিমারটি দেখা যাচ্ছে, নির্দিষ্ট জায়গায় চলে এসেছে। সাদা পেইন্টিং করে স্টিমারের ব্রিজের ওপর নাম লেখা আছে, ‘আবদুল মতিন’। নামের চারপাশে মরচে ধরে গেছে। অশীতিপর বৃদ্ধের মতো জাহাজের কলকব্জাও ঢিলেঢালা, নড়বড়ে। সংস্কারের ব্যবস্থা নেই। কর্তৃপক্ষের নিমর্ম উদাসীনতার শিকার হয়েছে জাহাজটি। চলেও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। প্রায় দু’ঘণ্টা লেট করে এসেছে। কূল থেকে অনেক দূরে জাহাজটিকে নোঙর ফেলতে হবে। এটুকু পথ সাম্পানে করে পাড়ি দিতে হবে। এভাবে যাত্রীরা ওঠানামা করে। এ এক ভয়াবহ যুদ্ধ।
ভাটার সময় সরাসরি শুকনো মাটিতে নামার উপায় নেই। নামতে হবে কাদায়। হাঁটু পরিমাণ কাদা মাড়িয়ে তবেই শুকনো মাটি। কোলে করে ছেলেমেয়েদের পার করতে হয়, এজন্য মজুর শ্রেণির লোক আছে। টাকার বিনিময়ে অনায়াসে কাজটি করে থাকে প্রতিনিয়ত।
বিরাট এক ঢেউ এসে প্রচন্ড আঘাত হানল পাড়ে। থরথর করে কেঁপে উঠলেন মোশাররফ ভুঁইয়া।
শামা কোল থেকে নেমে গেছে। ছিটানো পানির কয়েক ফোঁটা এসে ঝাপটা দিয়েছে তার মুখে, খিলখিল করে হেসে ছুটে গিয়ে মায়ের হাত ধরল সে।
জসিম এগিয়ে গেল পাড়ের কিনারায়। যাওয়ার পূর্বে আর একবার প্রিয় শিক্ষককে সালাম করে বিদায় নিল।
ওরা সাম্পানে উঠছে। ঢেউয়ের তোড়ে সাম্পানটি ওঠানামা করছে। এপাশ-ওপাশ দুলছে। এখন ভরা জোয়ার। তাই রক্ষা। শুকনো মাটি থেকে সহজে ওঠা গেল সাম্পানে।
শামার মায়ের মধ্যে একধরনের জড়তা কাজ করছে, তবে ভয় পাচ্ছে না সে। মুখে আনন্দমাখা হাসি। সে উপভোগ করছে প্রকৃতির দোলানো এই রুদ্ররোষ।
জাহাজ থেকে আবার ভেসে এল গগনবিদারী সিটি, পাড়ের যাত্রী ডাকছে।
গরগর করে নোঙর ফেলার আওয়াজ হচ্ছে। জোরালো গর্জন বাস্তবে ফিরিয়ে আনল মোশাররফ ভুঁইয়াকে।
এদিক-ওদিক তাকালেন তিনি।
ছোট ছেলে শাহিন লাফিয়ে উঠেছে সাম্পানে। সঙ্গে ওর দুই বন্ধুও আছে। ওরা যাচ্ছে ভাই-ভাবিকে রিসিভ করতে।
একে একে কয়েকটি সাম্পান যাত্রী ভরে জাহাজ থেকে ফিরে এসেছে। ছেলে আসছে না এখনও।
নিশ্চয় ভিড় কমে গেলে আসবে, শেষবারের ফিরতি সাম্পানেই আসবে ওরা, নিজেকে প্রবোধ দিলেন।
সকলের কাছে পরিচিত তিনি।
অনেকে পাড়ে নেমে তাকে সালাম করছে। সেদিকে মনস্থির করতে পারছেন না। অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে। প্রতিটি ফিরতি সাম্পানের দিকে তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। না নেই। শাহিনেরও দেখা নেই।
ধৈর্য ধরতে পারছেন না, মায়ার তৃষ্ণায় এখন কাতর তিনি। বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দ বাড়ছে কেবল। একবার চশমা খুলছেন, আবার চোখে লাগাচ্ছেন। এক মিনিটকে একযুগ মনে হচ্ছে।
ওই তো! শেষ সাম্পানটি আসছে। কয়েকটি ছোট ছোট শিশু আছে সাম্পানে। মহিলাও আছে, বোরখা পরা।
হোঁচট খেলেন তিনি। শুনেছেন বউমা অতি আধুনিক। বোরখা পরার কথা না। আবুল কালামকেও তো দেখা যাচ্ছে না।
হ্যাঁ, স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। শাহিন বসে আছে। ওর মুখ এত কালো কেন? এত বিষণ্ণ কেন?
তবে কি আসেনি ওরা?
বুকে একটা মোচড় টের পেলেন। নদীর উন্মত্ত ঢেউ নয়, জীবনযুদ্ধের কঠিন ঢেউ এবার তার পায়ের তলের মাটি কাঁপিয়ে দিল।
শুদ্ধ আকাশের দিকে তাকালেন তিনি। কড়া রোদ তির্যকভাবে চোখে পড়ছে, কিছুই দেখতে পেলেন না।
মাথা একবার চক্কর দিয়ে উঠল। পুরো জীবনের স্তম্ভটি ডুবে যাচ্ছে জোয়ারভরা নদীতে। ব্যর্থতার স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছেন তিনি। পড়ে যাচ্ছিলেন প্রায়। শাহিন একলাফে নামল সাম্পান থেকে। ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
খুব খারাপ লাগছে বাবা? শাহিনের মুখ থেকে ভাঙা স্বর বেরিয়ে এল।
কোনো জবাব দিলেন না মোশাররফ ভূঁইয়া, কোনো প্রশ্নও করলেন না ছেলেকে। বাঁ হাত দিয়ে চশমাটি খুলে নিলেন। শাহিনের মুখ ঝাপসা লাগছে। লাগুক। জীবনটাই তো ঝাপসা হয়ে গেছে। কৃত্রিম চশমা পরে আর কিছু দেখতে চান না। দীর্ঘজীবনে অনেক কিছু তো দেখা হয়েছে। প্রকৃতির রুদ্ররোষ দেখেছেন বহুবার। জলোচ্ছ্বাসের ভয়াবহতা দেখেছেন, বহু স্বজন হারিয়েছেন। দেখতে-দেখতে হারাতে-হারাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। মানুষের নির্মমতার রুদ্ররোষ দেখার ইচ্ছে নেই, অন্ধ হয়ে যাওয়াই তো ভালো।
শাহিনকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে চশমাটি নিলেন ডান হাতে। ছুড়ে মারলেন নদীতে। স্রোতের টানে হারিয়ে গেল দীর্ঘদিনের প্রিয় চশমাটি।
এ কী করলেন আব্বা! চশমা ছাড়া তো আপনি পড়তে পারেন না। ভালো করে কিছু দেখতেও পান না।
আর কিছু দেখতে চাই না, পড়তেও চাই না।
প্লিজ ওঠেন। শক্ত হোন। নিশ্চয় কোনো বিপদ-আপদ হয়েছে। এজন্যে ওরা আসতে পারেননি। সদরঘাটে স্টিমারে এসে আমাদের পরিচিত এক সুকানীর কাছে ভাইয়া চিঠি দিয়ে গেছে আপনার নামে। নিন, চিঠিটি নিন।
শাহিনের হাত থেকে ছোঁ মেরে নিলেন খামটি। মুঠি করে ধরে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন চিঠিটির দিকে। ছেলে আসেনি, ছেলের চিঠি এসেছে, কম পাওয়া কিসে? অল্পতে সন্তুষ্ট হওয়া উচিত, অসন্তুষ্টির মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে গেলে দুঃখ বাড়বে। দুঃখ পেয়ে লাভ নেই।
কীভাবে পড়বেন চিঠিটা? চশমা তো ফেলে দিয়েছেন। বাড়িতে গিয়েই বা বলবেন কী?
বাড়ির সবাই অপেক্ষা করছে। প্রথমবারের মতো ছেলের বউ আসবে। সবার ভেতর আনন্দ। হই হই রই রই করছে বাড়ির বাচ্চারা, গৃহিণীরাও কম মুখর নয়।
ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়েছে। নতুন টয়লেট তৈরি করা হয়েছে। নতুন বিছানা চাদর, বালিশের কভার, মশারি কেনা হয়েছে। নিজেদের পুকুরে মাছ নেই। প্রতিবেশির বড় পুকুরে জাল ফেলা হয়েছে। বড় বড় রুই-কাতল ধরা হয়েছে, পড়শিরাও এই আনন্দধারায় যোগ দিয়েছে। তিনি জানেন আজাদ কেবল তার একার সন্তান না, সবার সন্তান, গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করা গৌরবের প্রদীপ।
ছেলে তাকে না জানিয়ে চট্টগ্রামে বিয়ে করেছিল। কষ্ট পেয়েছিলেন। রাগ করে অনেক দিন আর ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। রাগ কমতে কমতে অনেকদিন পেরিয়ে গেছে। নাতি-নাতনিও বড় হয়ে গেছে।
একসময় মনে হয়েছে নিজেই ভুল করেছেন। এভাবে ভুল বোঝাবুঝি শেষ হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে আজ বউমাকে নিয়ে আসার সব প্রোগ্রাম ঠিক করা হয়েছিল।
চিঠিটা আবার স্পর্শ করলেন। একবার বুকের সঙ্গে সেঁটে ধরলেন। সঙ্গে সঙ্গে মন নরম হতে লাগল। নিজেকে সামলে নিয়ে। খামটি খুলে চিঠিটি পড়তে দিলেন শাহিনকে।
শাহিন পড়তে থাকে :
‘প্রিয় আব্বা,
জানি খুব কষ্ট পাবেন।
অনেক কষ্ট দিয়েছি আপনাদের। আরও হয়তো দেব।
স্টিমারঘাট থেকে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছি। আপনার বউমা শুনতে পেয়েছে সন্দ্বীপ ঘাটে জেটি নেই। একহাঁটু কাদা মাড়িয়ে পাড়ে উঠতে হয়। যাত্রীদের আরও নানা দুর্ভোগের কথাও শুনেছে। তাই বিগড়ে গেল। আমিও জোরাজুরি করলাম না। কারণ জোর করে কিছু পাওয়ার চেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাওয়ার আনন্দ আলাদা।
আমার বিশ্বাস একদিন সে রাজি হবে, নিজে যেতে চাইবে কষ্ট করে। আপনি চলে আসুন। আপনার নাতি-নাতনিসহ সবাইকে দেখে যাবেন। আমাকে ক্ষমা করেছেন তো?
আপনার স্নেহের আজাদ।’
বুকের ভেতর আবারও মোচড় টের পেলেন মোশাররফ ভুঁইয়া। একটু পর চোখ উপচে দরদর করে নামতে থাকল আশ্রুধারা।
না, ছেলের প্রতি রাগ আর নেই। বউমার প্রতিও নেই। সত্যিই তো, কী আদিম যুগে আছে দ্বীপবাসী। আহ্! কবে দ্বীপটির উন্নয়ন হবে? ভাঙতে ভাঙতে একটি ঐতিহ্যবাহী দ্বীপ বিলীন হয়ে যাচ্ছে! কবে টনক নড়বে দেশের কর্ণধারদের?
কবে ‘সন্দ্বীপ নদীভাঙন প্রতিরোধ পরিষদের’ দাবি পূরণ হবে? লাখ লাখ মানুষের প্রাণের দাবি, নোয়াখালী-সন্দ্বীপ-উড়িরচরের প্রস্তাবিত সড়কটি কবে নির্মিত হবে? কবে একটি জেটির মুখ দেখবে দ্বীপবাসী? কে দেবে এসব প্রশ্নের উত্তর, কে?
মাথায় নানা প্রশ্ন নিয়ে চট করে পূর্ব দিকে ফিরে দাঁড়ালেন মোশাররফ ভুঁইয়া। দ্বীপের জন্য আলাদা মায়া টের পেলেন তিনি। এ মায়ার কাছে সব মমতা তুচ্ছ হয়ে যায়।
সামনে পা বাড়ালেন। না, এগোতে পারলেন না। বসে পড়লেন মাটিতে। পায়ের শক্তি কী নিঃশেষ হয়ে গেছে? জীবনের সংঘাত কী দেহের মাটিতেও ধস নামিয়ে দিল?
হতাশার করাল স্রোতে এখন তলিয়ে যাচ্ছেন তিনি। দুহাতে খামছে ধরলেন মাটি। না, মাটিও তার ভার বহন করছে না। তিনি শব্দ শুনতে পাচ্ছেন, ভাঙনের শব্দ। দেহের ভূমিতেও ভাঙন। হুহু করে এগিয়ে আসছে সেই ভয়ানক শব্দরাজি।
*********************************************************************************
বি: দ্র : * গল্পটি ১৯৮৬ সনে লেখা। তবে বইতে সংকলিত হয়েছে ১৯৯৫ সনে আমার প্রথম বই ‘কাছের তুমি দূরের তুমি’ গল্পগ্রন্থে। প্রকাশক : সময় প্রকাশন।
লেখক : অধ্যাপক ও পরিচালক, জাতীয় মানসিক ইনস্টিটিউট।
কথাসাহিত্যিক, বাংলা একাডেমি ফেলো।
সম্পাদক, শব্দঘর।
ইমেইল : shabdagharbd@gmail.com; drmohitkamal@yahoo.com
ঠিকানা : বাড়ি-২৬ (ফ্ল্যাট- ডি২), রোড-০৬, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ঢাকা- ১২০৫, ইধহমষধফবংয।
মোবাইল : +৮৮০১৭১১৮৩২৯৫৫
আমার পৈত্রিক নিবাস সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.