সিলিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকার

লুই ফার্দিনান্দ সিলিন(Louis-Ferdinand Céline):
জন্ম প্যারিসে, সৈনিক, ডাক্তার ও লেখক। ফরাসি সাহিত্যের আধুনিক বাস্তববাদীদের কাছে ইনি গুরুতুল্য। প্রথম দিকে অবহেলিত ছিলেন, ইংরেজিতে অনুবাদ হবার পর, বিশেষতঃ আমেরিকায় সিলিন-কে নিয়ে সাড়া পড়ে যায়, বলা হতে থাকে ‘সিলিনের লেখার সঙ্গে সাহিত্যের একবিংশ শতাব্দী শুরু হয়ে গেছে।’ ইউরোপ ও আমেরিকায় এঁর লেখা এখন কাফকার চেয়েও ভয়াবহ মনে করা হয়, বস্তুত সিলিনের দুঃস্বপ্ন কাফকার চেয়েও অতিকায়, কারণ সম্ভবত এই যে তিনি কাফকা অপেক্ষা দীর্ঘকাল বেঁচে ছিলেন। তাঁর ‘জার্নি টু দ এন্ড অফ দ নাইট’কে এ শতাব্দী উল্লেখযোগ্য রচনা গুলির মধ্যে ধরা হয়।
অনুবাদক : সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
সিলিনের সঙ্গে দেখা করা, সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। সিলিন, যিনি ভয়ঙ্কর! সিলিন, যিনি হতমান! সিলিন যিনি মদ্যপ!
প্যারিসের উপকণ্ঠে মোদঁ, সিলিন বাসবাস করেন সেখানে। স্ত্রী লুসেৎ আলমানজার ও ডজন খানেক (যদি আমার গণনা নির্ভুল হয়ে থাকে) কুকুরের সঙ্গে তিনি বাস করেন। তাঁর স্ত্রীই বাড়িটির মালিক, তিনি বললেন….
“ভেবেছিলাম আপনি আগামীকাল আসবেন…আজ আমি ঠিক আপনাকে আশা করিনি… আমি একেবারে তৈরী ছিলাম না… ভেবেছিলাম কাল…. আসুন, আসুন।” এই হল তাঁর অভ্যর্থনা।
স্ত্রীকে ফরাসীভাষায় বললেন আমার কোট খুলে নিতে ও চেয়ার দিতে বললেন। প্রকাণ্ড তার শরীর, তবে কুঁজো হয়ে গেছেন। আস্তে আস্তে তিনি নড়াচড়া করেন, যেন যে-কোনো কাজ করার পক্ষেই তিনি অত্যন্ত দুর্বল। বিশাল ঘরের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে তিনি শরীর বয়ে নিয়ে যান, যে-ঘরটি, আমার ধারণা, একাধারে রান্না খাওয়া ও তাঁর লেখার ঘর। একটা মস্ত গোলাকার টেবলের পিছনে তিনি বসলেন। টেবলের ওপর স্তূপাকার বই, কাগজপত্র ও ম্যাগাজিন এককোণে ঠেলে দিলেন। কিছু মেঝেয় পড়ে গেল, যেন আমাদের কথাবার্তার জন্য তিনি খানিকটা জায়গা করে নিলেন।
‘কী চান আপনি? কী জন্যে এসেছেন? কোনোরকম কেচ্ছার মধ্যে আমি আর নেই, যথেষ্ট হয়েছে!’
যাইহোক, এ-ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত আমি তাঁকে আশ্বস্ত করতে পেরেছিলাম। তারপর কিছুটা স্বস্তির সঙ্গে তিনি নড়েচড়ে বসলেন।
‘আমেরিকায় আপনার ব্যাপারে প্রচুর উৎসাহ রয়েছে,’ আমি শুরু করলাম কিন্তু তিনি ফুঁ দিয়ে এবং হাত নেড়ে আমাকে নিরস্ত করলেন।
‘উৎসাহ? কিসের, কার উৎসাহ? 
লোকের উৎসাহ তো মার্লিন ডিয়েট্রিচ আর ইনসিওরয়েন্সে–ব্যাস, আর কী!’
‘আপনার এখন কেমন কাটছে, এখনো কি ডাক্তারী করছেন?’
‘না না, মাস ছয়েক হল প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়েছি। আমি খুব ভালো নেই।’
লোকে কি এখানে আপনাকে সিলিন বলে জানে?’ ( সিলিনের আসল নাম লুই-ফার্দিনান্দ ডেসটাউচেস,এম.ডি ।)
‘খুব ভালো করেই জানে এবং জেনে খুব একটা খুশি নয়।’ এর বেশি কিছু তিনি বললেন না।
‘বেশিরভাগ সময় কী ভাবে কাটান?’
‘বাড়িতেই থাকি সবসময়… কুকুরগুলোও রয়েছে… অনেক কিছুই করার থাকে…ব্যস্তই থাকি….কারো সঙ্গে দেখা করি না…বাইরে যাই না… আমি খুব ব্যস্ত।’
‘লিখেছেন?’
‘হ্যাঁ,হ্যাঁ লিখছি বৈ কি….বেঁচে থাকতে হচ্ছে তো, কাজেই লিখি ….না! লিখতে আমার ঘৃণা হয়। চিরকাল লেখাকে আমি ঘৃণা করেছি…লেখাই হচ্ছে আমার পক্ষে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কাজ…..আমি কখনো লিখতে চাই নি, কিন্তু আমি এ কাজটা ভালোই পারি…কখনো ইচ্ছে হয়নি লিখতে, কখনো সুখ পাইনি লিখে, যে-সব বিষয় নিয়ে লিখি… তবুও লিখতে আমাকে হয়ই। এ এক অসম্ভব অত্যাচার, লেখাই পৃথিবীর কঠিনতম কাজ।’
তাঁর মুখ শক্ত, হাড় ওঠা, ছাই-রঙের মুখ তাঁর। চোখদুটি ভয়ংকর, চোখের দিকে চাওয়া যায় না; এখনো, এ-বয়সেও লিখতে হচ্ছে বলেই হয়ত তাঁকে এমন ক্রুদ্ধ দেখায়।
‘আমার বয়স ৬৭ হল…..মে-তে ৬৭ হবে…এখনো ওই অত্যাচার –জগতের সবচেয়ে কঠিন কাজ..’
গলিমার্ড, তার প্রকাশক, সম্প্রতি তাঁর শেষ বই ‘নর্থ’ বের করেছেন। 
‘জার্মানরা যুদ্ধে কী রকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এ বইটা সেই বিষয়ে লিখেছি। এ নিয়ে এ-যাবৎ কেউ লেখেনি….না ! না ! খবর্দার, তাদের কী ক্ষতি হয়েছিল, এ-নিয়ে একটা কথাও উচ্চারণ করা চলবে না….চুউউপ !’ সিলিন বললেন, ‘শ্ শ্ শ্ !’ ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে তিনি চুপ করে থাকতে বললেন, ‘এ বিষয়ে উচ্চবাচ্য করলে খুব খারাপ হবে – চুপচাপ থাকুন -না! শুধু এক পক্ষেরই ক্ষতি হয়েছিল –শ্ শ্ !’
সিলিনের বই-এর মধ্যে ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে ‘ডেথ অন দি ইনষ্টলমেন্ট প্ল্যান’, ‘জার্ণি টু দ এণ্ড অফ দ নাইট’ ও ‘গুইগনোলস্ ব্যাণ্ড।’ বহু দায়িত্বজ্ঞান-সম্পন্ন লোক এ রকম অভিযোগ করেন যে জার্মানী কর্তৃক ফ্রান্স অবরোধের সময় সিলিন বেনামে ইহুদি-বিদ্বেষী উত্তেজক প্রবন্ধ ও পুস্তিকা রচনা করেছিলেন। সেগুলি বিভিন্ন ফরাসী সংবাদ-পত্রে প্রকাশিত হয় এবং জার্মানরা নাকি সেগুলি জার্মানিতে প্রচার-উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। তাঁর বই কিন্তু জার্মানীতে নিষিদ্ধ ছিল । যাই হোক, এই অভিযোগের দরুণ তাঁকে ফ্রান্স থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি ডেনমার্কে চলে গিয়েছিলেন, সেখানে ৬ বছর কাটান। যার মধ্যে ২ বছর কাটে ডেনিশ জেলে।
‘ আপনি ডেনমার্কে যেতে গেলেন কেন?’
‘সেখানে আমার কিছু টাকা ছিল। এখানে কিছুই ছিল না।’ 
আপনাকে কি ফ্রান্স ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল? সরকারি নির্দেশে আপনি গিয়েছিলেন, নাকি নিজে থেকেই চলে যান?’
‘ওরা আমার মপার্নেস-এর ঘর তছনছ করে ফেলে…’
‘কারা ?’
‘পাগলারা, আবার কারা ? তারা যা-কিছু আমার ছিল সব ভেঙে ফ্যালে বা ছিঁড়ে ফ্যালে… আমার সব কিছু….স্ত্রীর সঙ্গে তখন আমি বাইরে গিয়েছিলাম….আমরা ফিরে এসে দেখলাম আমাদের ঘর ধ্বংস করে রেখে গেছে…সম্পূর্ণ ধ্বংস….সবকিছু খুন করে রেখে গেছে…আমি ডেনমার্কে চলে গেলাম ।’ 
সিলিনের সঙ্গে আমার এইসব কথাবার্তা হবার দিনকয়েক পরে ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের এক পূর্বতন নেতার সঙ্গে আমার দেখা হয় । সিলিনের ঘরে যারা হামলা করেছিলো, তিনি তাদের মধ্যে ছিলেন । এই ভদ্রলোক আমাকে জানান যে যখন হাঙ্গামা হয়েছিল, সিলিন যদি তখন ঘরে থাকতেন তিনি নিশ্চয়ই সেদিন নিহত হতেন।
‘ডেনমার্কে আপনার জেল হয় কেন ?’
‘যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আমাকে ধরা হয় ।’
‘আপনাকে জার্মানদের সহযোগিতা করার অভিযোগে ধরা হয়েছিল কি?’
‘বললাম তো । যুদ্ধাপরাধী! আপনি তো কিছুই বুঝতে পারছেন না! যুদ্ধাপরাধী! সহযোগিতা করার কোনো অভিযোগ ছিল না ঠিক… তবুও আমি ছিলাম যুদ্ধাপরাধী! এবার বুঝতে পেরেছেন?’
‘শোনা যায় আপনি ইহুদীদের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন?’
‘ইহুদীদের বিরুদ্ধে আমি কিছুই লিখিনি আমি শুধু বলেছিলাম যে ইহুদীরাই আমাদের যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে–ব্যাস, শুধু এই ! হিটলারের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া হচ্ছিল, তাতে আমাদের কী, আমাদের তার ভেতর ঢুকে পড়া উচিত হয়নি। ২০০০ বছর ধরেই তো তারা লড়ছে, দুর্ভোগ ছাড়া যুদ্ধ তাদের কি দিয়েছে? হিটলারের হাতে তারা আবার মার খেল । না, ইহুদীদের বিরুদ্ধে আমি নই….৫০ লক্ষ লোক সম্পর্কে চট্ করে ভালো-মন্দ যা হয় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা ঠিক নয় । ‘
ঐ বিষয়ে কথাবার্তা এখানেই শেষ । খুবই অসুখী- ৬ বছর তাঁকে ডেনমার্কে কাটাতে হয়, ১৯৫০ সালে ফ্রান্সে ফিরে এলেন। কিন্তু ফিরে আসার পরেও সংবাদ পত্র ও সরকারের নানা মহল থেকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড চিৎকার শোনা যেতে লাগল। ‘তাঁকে আরো শাস্তি দেওয়া হোক,’ –তাঁরা দাবি করলেন। সরকারীভাবে অবশ্য কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি, কিন্তু প্রতিবেশিরা, অন্তত সিলিনন মনে করেন, তাঁর সম্পর্কে তাদের ধারণা কি তা ভালোভাবেই জানিয়ে দিয়েছিল । সিলিনের রান্না ঘরে বসে, তাঁকে দেখতে দেখতে ও তাঁর কথা শুনতে শুনতে আমার মনে হয়েছিল যে তাঁর এলোমেলো কথা বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ রাখা সম্পর্কে তাঁর আপাত-ঘৃণা সত্বেও আসলে কোনো একজন তাঁর কাছে এসেছে, তাঁকে প্রশ্ন করছে বা তাঁর কথা শুনেছে, এতে তিনি বেশ খুশিই হয়েছেন, যে তাঁকে অতীতের কথা স্মরণ করতে বলছে, বলছে তাঁকে কেউ ভুলে যায় নি, বলছে লোকে আজও তাঁর ‘ডেথ অন দ ইনস্টলমেন্ট প্ল্যান’ বা ‘জার্নি টু দ এণ্ড অফ দ নাইট’ পড়েছে । 
বহু লোকের তাঁর প্রতি ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা বা তাঁকে নিয়ে সব রকম অসুবিধা সত্বেও তাঁকে নিয়ে গোটা ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে এখন আলোচনা হচ্ছে । যদি তাঁর মধ্যে এখনো কোনো বিশ্বাস থাকে, আছে কিনা সন্দেহজনক, তবে তা হল এই যে, ‘আমি জানি প্রকৃত গান কাকে বলে… ঠিক সুরটা জানি আমিই –ওরা কিচ্ছু জানেনা ।’ 
‘আপনি এক সময় বলেছিলেন যে আধুনিক বই আপনি পড়েন না, আধুনিক লেখা হচ্ছে ‘নষ্টভ্রুণ, অপরিণামী, তা লেখাই নয়’ আপনি বলেছিলেন…. এখন কি আপনি কিছু পড়েন?’
‘এনসাইক্লোপিডিয়া পড়ি, পাঞ্চ পড়ি, ব্যাস …আবার কী! পাঞ্চে অবশ্য রগড় কিছুই থাকে না, ওরা রগুড়ে হতে চায়, কিন্তু পারে না।’
‘এমন কোনো লেখক কি আছেন যাকে আপনি আজকের দিনে একজন ভালো লেখক বলে মনে করেন?’
কারুর নাম করার আগেই আমাকে থামিয়ে দিয়ে সিলিন বললেন, ‘কে, হেমিংওয়ে ? এক নম্বরের ফাঁকিবাজ, একজন সখের লেখক –উনিশ শতকের ফরাসী বাস্তববাদীরা তার চেয়ে শতগুণে ভালো ।’
এর পরেই অতি দ্রুত তিনি একগাদা ফরাসী লেখককে ভূপাতিত করলেন। এত দ্রুত যে তাদের নামগুলিই ভালো করে শুনতে পেলাম না, ”ডস প্যাসোজ-এর ষ্টাইলটা ভালো ছিল, কিন্তু ওই পর্যন্তই ।’
নিরীহ গলায় আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কাম্যু সম্পর্কে তাহলে কি বলবেন ?’
‘কাম্যু!’ মনে হলো তিনি একটা ফুলদানি ছুঁড়ে মারবেন আমাকে।
‘কাম্যু!’ তিনি আবার বললেন, ভয়ানক আশ্চর্য হয়েছেন আমার প্রশ্নে ‌।
‘ও কিছুই নয়….একটা নীতিবাগীশ….লোককে সব সময় বলছে কোনটা ভালো বা কোনটা মন্দ, কোন কাজটা তারা করবে, কোনটা করবে না… বিয়ে করবে, না করবে না —আরে বাবা ! এ সব তো চার্চে ঠিক করবে…না না, ও একটা অপদার্থ!’ তারপর সিলিন নিজের থেকেই ইংরেজ ঔপন্যাসিক লরেন্স ডারেলের কথা তুললেন, ‘একখানা গোটা বই কী নিয়ে লেখা হল, না, একটা মেয়ে কিভাবে চুমু খায়, কত রকম ভাবে সে তা খেতে পারে এবং ঐ সব নানা-রকমের মানে বা কী ? ….একে কি লেখা বলে নাকি ? এ লেখা নয়, এ কিছুই নয় । এ আবর্জনা । ওসব ভূষিমাল আমার লেখায় নেই । আমার লেখা হচ্ছে ষ্টাইল, স্রেফ ষ্টাইল, ষ্টাইল ছাড়া আর কিছু নয় । শুধু এই জন্যই লেখা যেতে পারে ।’
‘কে জানে কত লোকে আমার স্টাইল কপি করতে চেয়েছে…. কিন্তু পারে না । ৪০০ পাতা অব্দি ঐ ষ্টাইল বজায় রাখতে পারে না, ঐ চেষ্টাই করে, কিন্তু পারে না….ঐ আমার যা কিছু। ঐ ষ্টাইল, আমার আর কিছু নেই । আমার বইতে কোন বাণী নেই, বাণী চার্চে আছে।’ আবার তিনি ফুঁ দিলেন বাতাসে, হাত নেড়ে মনে হল প্রসঙ্গে যবনিকা টানলেন । 
‘না, আমার লেখা লোকে ভুলেই যাবে, আমার মধ্যে কোনো কিছুর মানে করে দেওয়া নেই, তারা কিছু পাল্টে দেয় না, কোনো মানেই হয় না বইগুলোর…. আমি সব কিছু করেছি, আমেরিকায় ঘোড়া চরিয়েছি, লন্ডনে জুতো পালিশ করেছি… সবকিছু করেছি। ১১ বছর বয়স থেকে কাজ করেছি…কিসে কী হয় আমি জানি ….ফরাসি ভাষাটা জানি… মানে লিখতে পারি ফরাসী ভাষায়, এই আর কী !
‘রাস্তার কথাবার্তা একটু কান পেতে শুনবেন… বইফই নিয়ে কোন কথাই নেই… শুধু ‘তারপর আমি তাকে বল্লাম…শুনে সে আমাকে বল্ল…শুনে আমি বল্লাম…’ শুধু এই, সব অভিনেতার দল! সবাই হাততালি চায়… বিশপও বলে ‘গতকাল আমি ২০০০ লোকের সামনে বক্তৃতা করেছি । আগামীকাল ৩০০০ লোকের সামনে বক্তৃতা করতে চাই –এইতো ধর্ম! পোপের দিকে চেয়ে দেখুন–লোকে যখন পোপকে দ্যাখে, বোধহয় ভাবে একে খেতে পারলে বেশ হতো । তিনি প্রচুর খান, প্রচুরতর পান করেন ….অভিনেতা–সব শালা অভিনেতা!
‘লোকে ইনসিওরেন্স চায় আর চায় স্ফুর্তিতে কাটাতে– আবার কি চাই? সেক্স? আরে ঐ নিয়েই তো চলছে গোলমাল….সকলেই সকলেরটা খেতে চায় । এই জন্যেই তো ওদের কালো-চামড়া কে এত ভয় । কালো-আদমীর গায়ে জোর বেশি, সে ঢের বেশি পুরুষ! সে-ই নেবে । সেই জন্যেই তো তাদের এত ভয়…এবার তাদের সময় এসেছে…. সংখ্যাতেও তারা বিস্তর, কালো-আদমী…তারা পেশী দেখাচ্ছে…শাদা চামড়া লেজ গুটোচ্ছে …সে নরম । বহুৎ দিন মাথায় চড়ে ছিল, …….এখন গন্ধ ছাদ পর্যন্ত উঠেছে এবং কালোরা সে গন্ধ পাচ্ছে, বুঝতে পেরেছে, তারা হস্তান্তরের জন্যে অপেক্ষা করছে…খুব দেরী নেই আর ।
‘এখন সময় আসছে হলুদ চামড়ার… শাদা-কালো মিশে তৈরী হবে হলুদ, হলুদ-চামড়াই প্রভুত্ব করবে । এ একটা বিজ্ঞান-সম্মত কথা, কালো আর শাদা যদি মিশে যায় তবে হলুদই হবে সব চেয়ে কড়া রঙ — শুধু হলুদ রঙই থাকবে — ২০০ বছরের মধ্যেই লোকে শাদা মানুষের মূর্তির দিকে চেয়ে বলবে, ‘এ-রকম অদ্ভুত জিনিস ছিলো নাকি ?’ …উত্তরে কেউ তাকে বলবে, ‘না, এ নিশ্চয়ই শিল্পীর কল্পনা ।’
এই হচ্ছে উত্তর । শাদা মানুষ অতীতের জিনিস হয়ে যাচ্ছে- ইতিমধ্যেই ফুরিয়ে গেছে, সব খতম। নতুনের সময় এখন । এখানে সবাই লম্বা-চওড়া কথা বলে, কিন্তু কেউ কিছুই জানেনা ….তারা ওখানে যাক, দেখে আসুক, তারপর কথা বলুক, ….আমি আফ্রিকায় ছিলাম, আমি জানি সেখানে অন্য গান গাওয়া হচ্ছে…. এ গান ভরাট গলার, তারা জানে হাওয়া কোনদিকে…. শাদা মানুষ বহুকাল মুখ ডুবিয়ে ছিল স্ত্রীলোকের পেটে…. চার্ট তাকে নষ্ট করে ফ্যালে এবং সে তা করতে দেয়…. সকলকেই নষ্ট করেছে ওই চার্চ… অবশ্য এ-সব কথা বলা নিষেধ…. পোপ শুনতে পাচ্ছেন…. সাবধান… মুখ খুলো না । ঈশ্বরের অভিশাপ…. না! এ-কথা বলাও পাপ… তোমাকে ঐ ক্রুশবিদ্ধ করবে… চুপচাপ থাকবে…চুউপ… পোষা কুকুরের মতো হবে…ঘেউ ঘেউ করবে না…কামড়াবে না ….এইযে মাংসের টুকরো–চোপরাও !
শাদা আদমির এর মধ্যে আর কোন পদার্থ নেই… সব ষাঁড়ের মত …শিং-এর সামনে একটা কিছু নাড়াতে থাকো, স্তনের বোঁটা কি দেশপ্রেম বা চার্চ যা হয় কিছু একটা নাড়াও, দেখবে তারা লাফিয়ে উঠবে । বেশী কিছু লাগবে না …এ খুবই সহজ ….ওরাও সব সময় যা-হয়-একটা কিছু চাইছে…ওদের কাছে সব এক-জিনিস … জীবন বড় মসৃণ চলছে ।’
এরপর আমার মনে হল বহুক্ষণ, সিলিন কোনো কথা বললেন না, শেষকালে আমি বললাম আমি এমন কোনো স্ত্রীলোক দেখিনি যার তাঁর বই পড়ে কুচ্ছিত লাগে নি, স্ত্রীলোকে তার বই কিছুতেই শেষ করতে পারে না, আমি জানালাম ।
‘আলবাৎ, আলবাৎ, আপনি তবে কী আশা করেছিলেন? আমার বই মেয়েছেলেদের জন্যে নয় …তাদের কায়দা কানুনই আলাদা …বিছানা টাকা… তাদের ছোটখাটো আহ্লাদ …আমার বইগুলো তাদের আহ্লাদের জন্যে নয় …আমার লেখাই বলবে তাদের ওষুধ কী…
‘না, কোনোরকম লোকের সঙ্গে আমি আর দেখা করি না হ্যাঁ, …আমার মেয়ে বেঁচে আছে… প্যারিসেই আছে… আমি কখনো তার সঙ্গে দেখা করি না । তার ছেলেপুলে পাঁচটি । তাদের একজনকেও আমি কখনো দেখিনি।’
অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন সিলিন, ও তারপর, – 
‘এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে আমি একজন অভিশপ্ত মানুষ- আমি একটা কুষ্ঠরোগী–‘
নীরবতা,- ‘আমি দরজা খুললেই একজন শত্রু এসে ঢোকে-,’ নীরবতা, ‘আচ্ছা এবার আপনি আসুন–মাপ করবেন, আমাকে এখন লিখতে বসতে হবে ।’ 
দরজা পর্যন্ত সিলিন আমাকে এগিয়ে দিলেন ।
•••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••••
🗒️ মূল সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন রবার্ট স্ট্রোমবার্গ , যা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯নং এভারগ্রীন রিভিয়্যুতে, জুলাই-আগষ্ট ১৯৬১ সংখ্যায় । এর অল্পকাল পরে সিলিন মারা যান ।
🗒️ ১৯৬২ সালে শারদীয় চতুস্পর্ণায় অনুবাদ করেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় । 
এই ‘জ্বলন্ত সাক্ষাৎকারটি’ পুনর্মুদ্রিত হয় ‘জিরাফ’ পত্রিকায় । সংকলন ৬ঃ অক্টোবর ১৯৭৪ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.