রুমা মোদক : গল্পের কাছে কী চাই

গল্পের কাছে কী  চাই? পাঠক হিসাবে নাকি লেখক? যেহেতু আমি নিজেও গল্প লিখি, নিজে কেমন গল্প লিখতে চাই এই আবিষ্কার যতোটা গুরুত্বপূর্ণ, ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ কেমন গল্প পড়তে চাই। দুটি বিষয় আমার কাছে একে অপরের পরিপূরক, বিশেষত লেখার জন্য। কারণ পাঠক হিসাবে একটি গল্প যেভাবে আমাকে আবিষ্ট করে ভাষায়, গদ্যে, শৈলী কিংবা উপস্থাপনের রীতিতে আমি সেই বৈচিত্রময়তায় অনুপ্রাণিত হই।এবং নিজ গল্পে সেই উৎকৃষ্টতা অর্জনের চেষ্টা করি। 
মানুষের মৌল অনুভূতি অভিন্ন, অভিন্ন জৈবিকতা। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশ কাল পাত্রভেদে মানুষের জীবনে যুক্ত হয় নানা জটিল অনুষঙ্গ। জীবনের নানা বাঁকে নানা ঘটনা কিংবা চরিত্র আখ্যান রচনায় প্ররোচিত করে।সেই প্ররোচনায় যখন লিখতে প্রবৃত্ত হই তখন মস্তিষ্ক ক্রিয়াশীল হয় আখ্যানটি উপস্থাপনের কৌশল অন্বেষণে। আমি তখন খুঁজে বের করতে চাই তা উপস্থাপনের কৌশল। আর এক্ষেত্রে ডুব দেই নিজের পাঠ অভিজ্ঞতার অন্তরালে। পাঠক এবং গল্পকারের এক অলক্ষ্য কিন্তু অনিবার্য সংযোগ ঘটে তাই ‘কেমন গল্প চাই’ প্রশ্নে। 
“মেয়েটির নাম যখন সুভাষিণী রাখা হইল তখন কে জানিত সে বোবা হইবে” এভাবে যে গল্পের শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর গল্পের প্রতিটি শব্দ কথা বলে যায়। প্রতিটি শব্দ,বাক্য এবং দৃশ্যকল্পে আমরা একটি বোবামেয়ের মনোজগৎ, বাহ্যিক আচরণ, সামাজিক এবং পারিবারিক সংকট আবিষ্কার করে যাই। যাতে গল্পের শেষে সুভাষিণীর কি পরিণতি হয়, তা আমার কাছে পাঠক হিসাবে খুব বড় কোন আবিষ্কারের জন্য অপেক্ষা করে থাকেনা। বরং প্রতিটি বাক্য আমাকে উত্তর দিয়ে যায় আমি যেমন গল্প চাই, গল্পটি ঠিক তেমন। 
“কথায় আমরা যে ভাব প্রকাশ করি সেটা আমাদিগকে অনেকটা নিজের চেষ্টায় গড়িয়া লইতে হয়, কতকটা তর্জমা করার মতো; সকল সময়ে ঠিক হয় না, ক্ষমতা-অভাবে অনেক সময়ে ভুলও হয়। কিন্তু, কালো চোখকে কিছু তর্জমা করিতে হয় না— মন আপনি তাহার উপরে ছায়া ফেলে; ভাব আপনি তাহার উপরে কখনো প্রসারিত কখনো মুদিত হয়। কখনো উজ্জ্বলভাবে জলিয়া উঠে, কখনো ম্লানভাবে নিবিয়া আসে; কখনো অস্তমান চন্দ্রের মতো অনিমেষভাবে চাহিয়া থাকে, কখনো দ্রুত চঞ্চল বিদ্যুতের মতো দিগ্‌বিদিকে ঠিকরিয়া উঠে। মুখের ভাব বৈ আজন্মকাল যাহার অন্য ভাষা নাই তাহার চোখের ভাষা অসীম উদার এবং অতলস্পর্শ গভীর— অনেকটা স্বচ্ছ আকাশের মতো, উদয়াস্ত এবং ছায়ালোকের নিস্তব্ধ রঙ্গভূমি। এই বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ত্ব আছে। এইজন্য সাধারণ বালকবালিকারা তাহাকে একপ্রকার ভয় করিত, তাহার সহিত খেলা করিত না। সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন।” একটি শব্দহীন বোবা মেয়ের অবস্থা ও অবস্থানের বর্ণনা এর চেয়ে হৃদয়গ্রাহী করে লেখা যায় কিনা আমি জানিনা। বাকহীন মেয়ের মুখের ভাষা ছাপিয়ে যে জীবন্ত হয়ে উঠে চোখের অভিব্যক্তি, এবং তার ভাষা যে অসীম এবং গভীর গল্প সেই অসীম গভীরতাকে যেভাবে প্রাণ দেয় তাতে একটি গল্পপাঠ যেনো চৈত্রের দাবদাহে সরোবরে অবগাহনের তৃপ্তি দেয়। কোন না কোনভাবে আমি গল্পের কাছে সেই অবগাহনের পাঠতৃপ্তি প্রত্যাশা করি। বহুদিন, বহুক্ষণ যা আমার মধ্যে ক্রিয়াশীল থাকবে,আমার মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করবে,আমার চিন্তার জগতকে তরঙ্গায়িত করবে। একটি ভালো গল্প পড়ার পর আমার ঠিক এমন একটি গল্প লেখার সাধ হবে। নতুবা মনে হবে এমন একটি গল্প না লিখতে পারলে আমি গল্প লিখি কেনো। সম্প্রতি কুলদা রায়ের ‘মার্কেজের পুতুল’ পড়ে আমার এমন বোধ হয়েছে। ভাষায় কিংবা শৈলীতে, বিষয়ে কিংবা চরিত্র ণির্মাণে। আমি এমন গল্পই পড়তে চাই, যার প্রতিটি শব্দ আমার সাথে পারস্পরিক কথা বলে। কথা বলে এর চরিত্ররা। চমৎকৃত করে এর নির্মাণ। 
মার্কেজ গল্পের প্রথম বাক্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন। আমার কাছে তা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের বাংলা গল্প বলার যে ধরন, এক যে ছিলো রাজা,প্রায় সব গল্প একইরকম ভাবে শুরু, নটে গাছটি মুড়ালো বলে শেষ। ঠাকুরমার লেপের নিচে সেই দুই বাক্যের মধ্যবর্তী গল্পটি শুনতে শুনতে আমরা হাসি কাঁদি, আর্দ্র হই, ভয় পাই। বীর রস, বীভৎস রস, প্রেম রস নানা রসে সিক্ত হই। 
আবার আউটসাইডার যখন শুরু হয় একটি ভয়াবহ বাক্যের নির্মোহ উচ্চারণ দিয়ে,আমার মা কাল মারা গেছেন…।কিংবা রাত ভরে বৃষ্টির প্রথম বাক্য, আমার ওটা হয়ে গেছে…। পাঠক হিসাবে এক সজোর ধাক্কা সঙ্গী করে আমরা পাঠে প্রবৃত্ত হই। পাঠক হিসাবে গল্পের কাছে প্রত্যাশা তখন অন্যমাত্রা পায়, লেখক যে ধাক্কা দিয়ে গল্প শুরু করেন শেষ পর্যন্ত সেই ধাক্কার ঢেঊ তিনি পাঠকের কাছে ক্রিয়াশীল রাখতে পারেন কিনা সেও এক চ্যালেঞ্জ। এবং এই প্রথম বাক্যের ধাক্কা একটি উল্লেখযোগ্য শৈলী বটে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রথম বাক্য অতিক্রম করে মূল আখ্যানই পাঠককে আলোড়িত করে।পাঠক হিসাবে আমি গল্পের এই শৈলী যেমন খুঁজি, তেমনি এর আখ্যানও খুঁজি। 
পোস্টমাস্টার গল্পের রতনের মনস্তত্ব আবিষ্কারে যেমন বিস্মিত হই, তেমন চমৎকৃত হই, এর দার্শনিক ভাষ্যে,ফিরিয়া ফল কি,পৃথিবীতে কে কাহার। দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশে পড়ার মতো যে গতিময় মানব জীবন একজন গল্পকারের পক্ষেই তা আবিষ্কার সম্ভব। একটি গল্পের কাছে চাই সাদাত হোসাইন মান্টোর “খোল দো” র মতো সুতীব্র চাবুক, মোঁপাসার নেকলেসের মতো আর্দ্র বেদনা। 
গল্পের কাছে পাঠক কিংবা লেখক হিসাবে গভীর অন্তর্দৃষ্টি জাত বিশ্বস্ততা চাই। যেখানে সুবোধের স্ত্রীর নাম স্বপ্নাই হয়। সুবোধ কিংবা স্বপ্নারা যে শ্রেণী থেকে উঠে আসা চরিত্র তাদের নাম কখনোই শশীন্দ্রনাথ কিংবা কাদম্বিনী হবে না। পতিতার গল্পে আমি বকুল, জাহানারা, সখিনা, মর্জিনা নামগুলো চাই। কোন গল্পের চরিত্রদের নাম যদি গল্পের বিষয়বস্তু, আখ্যানের সাথে সামঞ্জস্যতা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়,সেই গল্প শেষপর্যন্ত দুর্বলতর গল্প হিসাবেই প্রতিভাত হয়। 
গল্প পড়তে গিয়ে আমরা মূলত গল্পকারকে পাঠ করি,পাঠ করি তাঁর অন্তর্দৃষ্টি, জীবন দর্শন। এই দুটি বিষয় যদি গল্পে অনাবিষ্কৃত থাকে সেই গল্প পাঠে আমি তৃপ্ত হইনা। এবং নিজেও গল্প লিখতে গিয়ে সেই অন্তর্দৃষ্টি এবং জীবন দর্শন স্পষ্ট সজাগ রাখতে চেষ্টা করি সচেতন ভাবে। যেনো কোনমতেই কোন চরিত্র বা ঘটনা আরোপিত মনে না হয়। গল্পকার এবং পাঠকের মাঝে যে সংযোগ স্থাপিত হয় তাতে আরোপ করা যে কোন বাক্য কিংবা চরিত্র গল্পটিকে দুর্বল করে তুলতে যথেষ্ট। 
পাঠক হিসাবে ভাষার কাছে সুচিন্তিত শব্দ প্রয়োগ প্রত্যাশা করি। প্রত্যাশা করি পরিণত প্রয়োগ। সংবাদ কিংবা প্রতিবেদনের ভাষা গল্পে আমি প্রত্যাশা করিনা। সাহিত্যের ভাষা আটপ্রৌরের প্রাচীর ডিঙিয়ে পাঠককে চমৎকৃত করবে, একেবারে ডালভাত করে পাঠকের হাতে তুলে দেয়া ভাষা আমি গল্পের কাছে প্রত্যাশা করিনা। কারণ সাহিত্যের পাঠকের প্রস্তুতি আমার কাছে কাম্য। 
সর্বোপরি সবশেষে আমি গল্পের কাছে অবশ্যই একটি আখ্যানই চাই।গল্পহীনতার গল্প আমি পাঠক হিসাবে পাঠ করেও তৃপ্ত হইনা, লিখেও তৃপ্ত হইনা। কিন্তু গল্পহীন গল্প যিনি লিখেন পাঠক হিসাবে তাঁকে বাতিলও করিনা। 
গল্প বলা এবং শোনার আনন্দ এই মাটির হাজার বছরের ঐতিহ্য। এই জনগোষ্ঠীর শিক্ষা থেকে বিজ্ঞাপন সবই গল্পকেন্দ্রিক। গল্পের মধ্য দিয়েই গল্প কথক এবং পাঠক,শ্রোতা কিংবা আপামরকে স্পর্শ করা সহজতর বোধ হয় আমার। গল্প লেখক হিসাবে আমিও তাই গল্পে একটি আখ্যানই বলার চেষ্টা করি সবসময়। আর চাই শৈলী কিংবা ভাষা হবে লেখকের নিজস্ব সিগনেচার। 
একটি সার্থক ছোটগল্প হয়ে উঠবে বহুমাত্রিক সম্ভাবনার উৎস। লেখক যেখানে শেষ করবেন, পাঠকের সেখানে সুযোগ থাকবে মনোজগতে হাজারো দরজা খুলে যাবার। গল্পকার প্রত্যক্ষ কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবেন না বরং তাঁর গল্প বলার ভঙ্গি পরোক্ষে জানিয়ে দেবে পাঠকের করণীয়,হয়তো বদলেও দিতে পারে জীবনবোধ। 

2 thoughts on “রুমা মোদক : গল্পের কাছে কী চাই

  • January 13, 2021 at 12:11 pm
    Permalink

    চমৎকার করে বলেছেন দিদি।

    Reply
  • January 19, 2021 at 4:09 pm
    Permalink

    ভালো লেখা রুমা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.