স্মরণ : কিংবদন্তী মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় – একটি প্রতিষ্ঠানের নাম!


নায়লা নাজনীন
“ডুমুরের ফুল, তুমি আজও ফোটো? নিজে-নিজে?
সত্যি বলো, কোন্ গাছে ফোটো?”-
কবিতাপ্রেমীরা হয়ত জানবেন পংক্তি দু’টো কার লেখা।
“কবিতারও স্থাপত্যের দিক আছে, এটা মনে রেখো।
কবি কে? শব্দের মিস্ত্রি। শব্দ তার কৌটোর ভ্রমর। শব্দ কেড়ে নিলে সে তো জীবন্মৃত, নিঃস্ব, নিঃসহায় ” 
– কবিতাকে, কবির ভাবদর্শনকে এভাবেই অনুভব করতেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। অসাধারণ পাণ্ডিত্য আর বহুমাত্রিক প্রতিভার বিস্ময়কর সমন্বয় মানবেন্দ্র ছিলেন প্রধানত কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং অনুবাদক। 

তিনি জন্মগ্রহণ
করেছিলেন ১৯৩৮ সালে অবিভক্ত বাংলার শ্রীহট্টে, যা অধুনা বাংলাদেশের সিলেট
জেলা সদর নামে পরিচিত। শিক্ষাজীবনে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক
হওয়ার পর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে পড়াশোনা
করেছেন। ভারতীয় নন্দন তত্ত্ব এবং শিল্পের ইতিহাস নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন
কানাডার টরেন্টো এবং পোল্যান্ডের ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
 

কর্মজীবনের
শুরুতে শিক্ষকতা করেন বার্মার রেঙ্গুনে, পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে
তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে। অধ্যাপনা জীবনের সিংহভাগ কাটিয়ে দিয়েছেন সেখানেই।

 
প্রবন্ধ, কবিতা,শিশুসাহিত্য,উপন্যাস, ভারতীয় ক্রিকেট, নাটক, সংগীত
প্রভৃতি বহুক্ষেত্রেই তিনি অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। শিশুদের
জন্য লেখার পাশাপাশি দেশ-বিদেশের শিশুসাহিত্য নিয়ে কাজ করেছেন প্রচুর।
ক্রিকেট প্রিয় ছিলেন খুব। একাধিক বই লিখেছেন ক্রিকেট নিয়ে। মৌলিক রচনার
পাশাপাশি অনুবাদ করেছেন ভিন ভাষায় রচিত কালজয়ী সাহিত্যসমূহ। শিশুসাহিত্যে
অবদানের জন্য মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘খগেন্দ্রনাথ মিত্র স্মৃতি
পুরস্কার’ ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘বিদ্যা সাগর পুরস্কার’ পেয়েছেন। অনুবাদ
সাহিত্যে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য ভারতীয় সাহিত্য একাদেমি তাঁকে ‘অনুবাদ
পুরস্কার’-এ ভূষিত করেছিলো।
 
অনুবাদক হিসেবে তিনি দুর্লভ,
প্রবাদপ্রতিম। গল্প-উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, ভাষণ যা-ই হোক বা কেন তাঁর
অনুবাদ যেন একজন সুদক্ষ কারিগরের সুনিপুন নির্মাণ। প্রতিটি রচনা এককভাবে
স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং মৌলিক। বিশ্বসাহিত্য বলতে বাঙালির বিচরণ যখন
শেক্সপিয়ার, মিল্টন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং এলিয়েট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো সেসব
দিনে তিনি আমাদের সামনে উন্মুক্ত করেছেন বিশ্বসাহিত্যের দিগন্ত বিস্তৃত
সম্ভার। প্রায় একক প্রচেষ্টায় দক্ষিন আমেরিকা ও পূর্ব ইউরোপের শ্রেষ্ঠ
রচনাগুলি বাংলায় অনুবাদ করেছেন। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ থেকে শুরু করে
এডগার অ্যালেন পো, আর্থার কোনান ডয়েল, জুল ভের্ন,স্প্যানিশ কবি লোরকা,
ডেনিশ লেখক অ্যান্ডারসন, বেলজিয়ান লেখক জর্জ রেমি, চেক ভাষার কবি মিরোস্লাভ
হোলুব, পোলিশ কবি চেসোয়ার মিউশ, পোলিশ লেখক স্তানিসোয়াভ লেম, অস্ট্রিয়ান
কবি পিটার হ্যান্ড, সার্বিয়ান কবি ভাস্কো পোপা, শার্ল পেরো, হুয়ান রুলফো,
প্রমুখসহ আরও অনেক বিখ্যাত কবি সাহিত্যিকদের কালজয়ী সৃষ্টিকর্ম আমরা বাংলায়
পেয়েছি তাঁর বদান্যতায়। শুধু ইউরোপ,আমেরিকা বা আফ্রিকাই নয়, আমাদের পড়শী
সাহিত্যিক গিরিশ কারনাড, ভৈকম মুহম্মদ বশীর, কৃষণ চন্দর প্রমুখদের রচনাও
বাংলা রূপ পেয়েছে তাঁর কলমে। বিংশ শতাব্দীর সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়
কমিক্সগুলোর অন্যতম কমিক্স দুঃসাহসী টিনটিন-এর নির্মল হাস্যরস, পরিশীলিত শ্লেষ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বক্তব্য নির্ভর গল্পে বাঙালি আশৈশব মজেছিলো তাঁরই অনুবাদের কল্যানে।
 
তিনি
শুধু অনুবাদ-ই করেছেন তা নয়, সংশ্লিষ্ট রচনাটি পাঠকের বোধগম্য করার জন্য
জরুরী তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে লিখেছেন অসামান্য ভূমিকা ও পরিশিষ্ট। তাঁর
‘বাস্তবের কুহক, কুহকের বাস্তব’ গ্রন্থের সবক’টি প্রবন্ধই জাদুবাস্তবতা
নিয়ে রচিত। তাঁর আরেকটি বড় পরিচয়, সমকালীনদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম একজন
সাহিত্য সমালোচকও। “আত্মহত্যার অধিকার ও অন্যান্য সনদ” বইটিতে লাতিন
আমেরিকান রচনা এবং নাইজেরিয় ওলে সোয়েঙ্কা, সুদানের তায়েব সালিহ, জঁ জেনে
প্রমূখদের রচনার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের ‘তারকার আত্মহত্যা’, জগদীশ গুপ্তের
‘অসাধু সিদ্বার্থ’, জীবনানন্দের ‘উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতা’, মানিক
বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিবারাত্রির কাব্য’, আত্মহত্যা সম্পর্কে তলস্তয়ের
বক্তব্য, বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদ, শিবরাব চক্রবর্তীর রচনা বা অন্নদাশঙ্কর
রায়ের ছড়া ইত্যাদির চমৎকার সহাবস্থান বইটিকে নিয়ে যায় অধরা উচ্চতায়।
তুলনামূলক সাহিত্যের তুখোড় অধ্যাপক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের চমৎকারিত্ব
এখানেই।
 
অনুবাদের বিশাল ব্যপ্তি দেখে আমরা ভুলে যাই মূলত তিনি
কবি। অধ্যাপক প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের ভাষায় -“মানব দলছুট কবি। আমাদের থেকে
আলাদা, যথার্থ কবি।”

“অন্তহীন ধাতুর আদেশ
বাসনা, প্রয়াস, ফোয়ারার
অবিরল জলধারা – সব –
একদিন খোলে ছদ্মবেশ,
শুধু থাকে স্মৃতির প্রহার,
স্মৃতি, আর নিরুত্তাপ শব….”

শব্দচয়নে
তিনি ভীষণ সচেতন এবং স্পর্শকাতর। কাছাকাছি অর্থ কিন্তু কিছুটা ভিন্ন
দ্যোতনা জাগায় বলে ‘অনুবাদ’ শব্দেও ছিলো মৃদু আপত্তি, এর পরিবর্তে ‘তর্জমা’
শব্দেই ছিলেন সাবলীল। সাগর সেঁচে মুক্তো তুলে আনার মত বাংলা শব্দভান্ডার
থেকে যোগ্যতম শব্দটি তুলে এনেছেন লেখায়। এমনকি অপ্রচলিত, আঞ্চলিক শব্দদেরও
ছড়িয়ে দিয়েছেন আপন শৈল্পিক বিশুদ্ধতায়।
 

নিজে ছিলেন একজন পিপাসু এবং
দরদী পাঠক। পাঠের আনন্দ থেকেই সাহিত্যসেবায় আত্মনিবেদন করেছিলেন।
নিঃস্বার্থ ভাবে নিজের লেখার ওপরে স্থান দিয়েছেন বাংলা সাহিত্যভান্ডারকে
সমৃদ্ধশালী করার কাজকে। একজন দায়িত্বশীল পাঠকেরও লেখকের প্রতি, সমাজের
প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে। আমৃত্যু তিনি সেই দায় মিটিয়ে গেছেন,ভালোবেসে,
আনন্দের সাথে। তাঁর ভাষায়-“তাঁদের প্রাপ্য, অনুবাদ করছি যাঁদের।”
 
গত
৩ আগস্ট ২০২০ আমরা হারিয়েছি সাহিত্যের এই মহান সাধককে। যেতে যেতে তিনি
আমাদের দিয়ে গেছেন অমূল্য রত্নসম্ভার। কিন্তু আমাদেরও কিছু করার ছিলো,
অনুবাদক সত্ত্বার আড়ালের লেখক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে যথাযথ চর্চা
করা। প্রত্যাশা, অদুর ভবিষ্যতে তাঁর কাজ নিয়ে গবেষণা হবে, কেউ নিশ্চয়ই
এগিয়ে আসবেন। বাঙালি পাঠক হৃদয়ে মানবেন্দ্র বেঁচে থাকবেন যুদ্ধবিধ্বস্ত
কলম্বিয়ার কর্ণেলের অনন্ত অপেক্ষায়, উলিসিস এরেন্দিরার প্রেমে, ভাস্কো
পোপার কবিতায় বা কিউবার বিপ্লবী গানে…

Leave a Reply

Your email address will not be published.