স্বপ্নময় চক্রবর্তী : গল্পের কাছে কী চাই

একজন লেখক তো প্রথমে পাঠক-ই। প্রকৃষ্ট পাঠক সত্তা না থাকলে সে লেখক হয়ে উঠতে পারেনা। প্রকৃষ্ট পাঠক মানে পুস্তক পাঠক্লান্ত হতে হবে এমন নয়। প্রকৃতিপাঠও পাঠ। একজন নিরক্ষরও ভালো পাঠক হতে পারেন। প্রকৃতি থেকে, মানব জমিন থেকে তাঁরা পাঠ নেন। চোখ-কান খোলা রাখা, মনটাকে গ্রন্থিমুক্ত রাখা, ইংরেজিতে যাকে বলে বায়াসলেসনেস, এরকম একটা মন তৈরি করতে পারলে মানব জীবনের পৃষ্ঠাগুলি পড়া যায়। 
যিনি লেখেন, তিনি আগে জীবন পড়েন। অন্যের লেখা জীবন কাহিনীও পড়েন মুদ্রিত অক্ষরে। মানে সাহিত্য পাঠের কথা বলছি এবার। এই সাহিত্য পাঠ জীবনে জীবন যোগ করে। সাহিত্য শব্দটির ব্যুৎপত্তিতে সহিত বা হিত শব্দের সম্পর্ক আছে কিনা জানিনা। তবে সহিত শব্দের মানে যদি সংযোগ হয়, বা একত্রীকরণ হয়, তবে তো তা জীবনযোগ ই হয়। 
সাহিত্যের বিভাগগুলির মধ্যে একটা হ’ল গল্প। গল্পের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকে। লেখক হিসেবেও আমার একটা মনোবাঞ্ছা থাকে, অভিলাষ থাকে। আমি কী বলতে চাই সম্পর্কিত একটি ইচ্ছাকুসুমের কুঁড়ি থাকে। যদি সেটা সুপ্রস্ফূটিত হতে পারে, তবে মনের ভিতরে একটা আনন্দবোধ হয়। আমরা যে শরীরে আছি, ইচ্ছামত তার বৃদ্ধি ঘটাতে পারিনা, কিন্তু যে মনে আছি, তার বিস্তার ঘটানো যায়। একটা গল্প ঠিক মত লেখা হয়ে গেলে আমি যেন আর একটু বেড়ে যাই। আর একটু বিস্তার লাভ করলাম যেন। প্রাণের ধর্ম বিস্তৃত হওয়া। লক্ষ বছর ধরে বিস্তৃত হয়েছে মানুষ। একটা সার্থক লেখা, একটা সার্থক গান তৈরি, শিক্ষা অন্যশিল্প কর্মের মাধ্যমে নিজের ব্যক্তিগত বিস্তার ঘটায়। এককোষী প্রাণীরা কোষ বিভাজন করে বাড়ে, চৈতন্যবান মানুষেরা চৈতন্য বিভাজন করে বাড়ে। 
ব্যক্তিগত ভাবে বলি, আমার ছোট গল্পের যেটা কুঁড়ি বলেছি, সেটা সমাজ জীবন থেকে উঠে আসা লতাগুল্মের মুকুল। যে সমাজ জীবনের সঙ্গে থাকে ইতিহাসের যোগ, আমাদের গণ মনে ঘন হয়ে থাকা কোন হিতকারী বোধ, মুকুলিত হয়ে সেটা ঠিক কী রূপ নেবে শেষটা হয়তো জানা থাকেনা আগে। হয়ত পূর্ণপুষ্প হয় না, তবে গল্পের কাছে পূর্ণপুষ্পিত রূপটাই চাই। চাই ইচ্ছের গুটিপোকাটি থেকে রঙিন প্রজাপতি তৈরি হয়ে উঠুক। গল্পের কাছে গপ্পো চাই না নিশ্চয়ই আমরা আড্ডায় কত গল্প করি, কিন্তু সেই গল্প আসলে গপ্পো। গল্প লেখায় আড্ডাপ্রসূত কিছু উপকরণ উঠে এলে অন্যভাবে আসে। গল্পের কাছে আমরা ধারাবিবরণী চাই না। গল্পের কাছে এমন একটা ছিদ্রও চাইনা, যে ছিদ্রে চোখ রেখে অন্যের ঘর, ঘরের অন্দর দেখা যায়। বরং অন্তর দেখার আশ্চর্য লেনস্ খানি চাই। গল্পের কাছে বাস্তব সত্য চাই না। কোন ঢেউ দোলানো নদীটার ভিতরে বাস্তব সত্য হ’ল জল। জল ফোটালে বাষ্প উড়ে গেলে পড়ে থাকবে পাঁক, হয়তো দু’চারটে মৃত মাছ। নদী তো আর নয়। সাহিত্যের কাছে ওরকম ঢেউ, স্রোত, ঝিকমিক নদী চাই। একটা ফাঁপা বাঁশকে বাঁশী হিসেবেও ব্যবহার করা যায়, বিড়াল তাড়ানোর লাঠি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। গল্পের কাছে বাঁশীটাই হয়ত চাই, তবে লাঠিটা যে কখনো চাইনা এমন নয়। লাঠিটাও চাই। 
এটা একটা জটিল ব্যাপার। কী যে চাই ঠিক নিজেও জানিনা। প্রশান্তিও চাই আবার বিক্ষত হতেও চাই। ক্ষত সৃষ্টি করতেও চাই। পাঠক হিসেবে মিলনান্তক গল্পে হর্ষ, বিয়োগান্তক গল্পে বিষাদ, আবার কোনও গল্পে ভয়ার্ত হই, কখনো বিক্ষত, কিন্তু একই সাথে আনন্দ পাই। গল্প লেখার সময়ও ভাবি আমার গল্প যেন কেবল ইচ্ছাপূরক না হয়। কাঁদাক, ভাসাক, উড়িয়ে নিক, রক্তাক্ত করুক। আবার জীবন আবিস্কারের আনন্দ দিক। নিজের স্বরচিত হাতের ব্যাসার্ধকে বড় করে দিলেই জীবনটা যত বড় হয়ে যায়। ব্যপ্ত বিস্তৃত জীবনের মধ্যে অবাক বিস্ময়ে ঢুকে যাই। কখনও ভুলভুলাইয়ার মত একই রাস্তায় ঘুরি। একই ভ্রমণের ভ্রম ও যদি গুছিয়ে লেখা যায় সেটাও মন্দ না। অন্য কারোর লেখায় তাদের দেখা ভ্রমণ যদি আন্তরিক হয়, নিজের সঙ্গে মেলাই। শেষ পর্যন্ত ভেবে দেখি, গল্পেরকাছে আমি চাই আমি একা নই এই বোধ। যৌথতা চাই। শুশ্রূষা ও চাই অনেক সময়। আর প্রেরণাও কি চাই না? চাই। একটা সময় ছিল মহাশ্বেতা দেবী বা শ্যামলের গল্প পড়ে মনে হয়েছে যদি এরকম পারতাম…। আবার রাস্তা পার হতে চেষ্টা করছে এমন ক্ষীণদৃষ্টির মানুষকে হাত ধরে রাস্তা পারও করে দিয়েছি। গল্পের কাছে এই কাজটাও চাই। 

One thought on “স্বপ্নময় চক্রবর্তী : গল্পের কাছে কী চাই

  • January 22, 2021 at 3:41 am
    Permalink

    চমৎকার ভাবনার মেলবন্ধন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.