গল্পের কাছে কী চাই : উম্মে মুসলিমা

গল্পের কাছে গল্পই চাইতে হবে তার কোনো মানে নেই। সেই পুরোনো কথা – গল্পকার কী লিখেছে তার চেয়ে কীভাবে লিখেছে গল্পের কাছে সেটাই প্রথম চাওয়া। তবে গল্পকার, পাঠক এবং সম্পাদক সকলেই আপেক্ষিক। সামাজিক মাধ্যমে এখন সহজেই নিজের লেখা প্রকাশ করা যায় তবুও কোন কাগুজে বা ভাসমান (ভার্চুয়াল) ম্যাগাজিনে লেখা ছাপা হওয়ার মর্যাদা আলাদা। বুঝদার পাঠক, বেশি অনুপ্রেরণা, খানিক সমালোচনা। যেমন কিছু গল্প চায় বেশি পাঠক পড়ুক, কিছু চায় কম কিন্তু বিদগ্ধ। কিছু পাঠক আছেন যারা তাদের স্বনির্বাচিত গল্পকারদের বাইরে অন্যগুলোতে তেমন আগ্রহ দেখান না। আবার পছন্দের লেখকরাও কোনসময় মন জুগাতে অপারগ। সমমনা পাঠকদেরও রুচির ভিন্নতা দেখা যায়। এক বন্ধু সকালে উঠে এক দৈনিকের সাহিত্যপাতায় একটি গল্প পড়ে তার সমমনা বন্ধুকে ফোনে উচ্ছ্বাসে আবেগে একাকার হয়ে বললো ‘দোস্ত, সব কাজ ফেলে রেখে এক্ষুণি অমুক দৈনিকের গল্পটা পড়। তোর সাথে শেয়ার করতে না পারলে হাসফাঁশ লাগছে’। দোস্ত বললো ‘কিন্তু ওই পত্রিকা তো আমি রাখি না’।
‘আরে ব্যাটা, তাড়াতাড়ি কিনে আন। এ গল্প না পড়ে তোকে মরতেও দেব না’ 
দোস্ত ঘন্টাখানেক পর সমমনাকে ফোনে ঝাড়ি- 
‘তুই আমার পুরো একটা ঘন্টা নষ্ট করেছিস। সন্ধ্যায় খেসারত দিবি’। 
এখানে সম্পাদকের কথা কেন আসছে? গল্পের কাছে কিছু চাইতে গেলে সে গল্পকে অলোর মুখ দেখাবে তো সম্পাদকরাই। আবার সম্পাদকেরও রকমভেদ আছে। এমন অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত বই-গল্প-উপন্যাসের কথা জানা যায় যেগুলি প্রথমদিকে সম্পাদক ও প্রকাশকরা আমলে নেননি। দেশের মধ্যেই এমন সম্পাদককূল আছেন যারা কেউ কোন গল্পকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন, কেউ সেই একই গল্পকে লুফে নেন। যুদ্ধ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, পরিবেশ, জলবায়ু, মাইগ্রেশন, অভিবাসন, নগরায়ন, শিল্পায়ন, পুঁজিবাদ, সমতা, বৈষম্য, সম্পর্ক, যোগাযোগ, উন্নয়ন ইত্যাদি গল্পকারের জীবনে প্রভাব ফেলে। এসব নিয়ে কালের যত পরিবর্তন হচ্ছে গল্পের গতানুগতিক ধারাও পাল্টে যাচ্ছে। ছকে বাঁধা গল্পে আনন্দ পাওয়া পুরোনো পাঠক কেবল বর্ণনাসমৃদ্ধ গল্পে মজা না-ও পেতে পারেন। তাই গল্পের কাছে কী চায় তা হয়ে দাঁড়ায় একবারে ব্যক্তিপাঠককেন্দ্রিক। 
সৌন্দর্যের মাপকাঠি যেমন নারীর ক্ষেত্রে গৌর গাত্রবর্ণ, আজানুলম্বিত কেশ, আয়ত লোচন, বিম্বাধর, সুদৃঢ় কুচযুগ, সরু কোমর, সুডৌল নিতম্ব ইত্যাদি তেমনি গল্পেরও মাপকাঠি আছে। রবীন্দ্রনাথও তার বর্ণনা দিয়েছেন। তবে হিসেব নিকেষ কষে ছাঁচে ফেললেই তা মনোহর হয়ে উঠবে তার কোন মানে নেই। ছাঁচে ফেলা নারীর সবই পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু কী যেন নেই! 
ওই ‘কী যেন’ গল্পের কাছেও চাওয়া। তা কারো কারো কাছে হতে পারে আখ্যান, শৈলী, আংগিক, ভাষা, সংলাপ, কূহক, চমক, ধরন। আমার নিজের কাছে যে ছোটগল্প একটি বড় কবিতার মত ধরা দেয় সেই গল্প ভাললাগার। যে গল্পের কোন চরিত্র আমাকে কয়েকরাত ঘুমাতে দেয় না বা একটা ঘোরের মধ্যে রাখতে পারে সে গল্প মনে রাখার। আলাদা ভঙ্গির বিশেষত্ব নিয়ে যে লেখক কালেভদ্রে উদয় হন, আমি কান পেতে রই। এছাড়া শিল্পের জন্য শিল্প মাথায় রেখেও একটা বিশেষ বার্তা না থাকলে সে গল্প অসম্পূর্ণ মনে হয়। আর গল্পে পিতৃতান্ত্রিক আচরণ ধরা পড়লে সে গল্পের লেখককে ভবিষ্যতের জন্য স্ট্রেট বর্জন করি।

One thought on “গল্পের কাছে কী চাই : উম্মে মুসলিমা

  • January 19, 2021 at 6:49 am
    Permalink

    অনেক সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম বিষয় উঠে এসেছে লেখায়। গল্পের কাছে চাইতেই হবে? যদি পাওয়া যায় না চাইতেই 🙂

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.