গল্পের কাছে কী চাই : হামিরউদ্দিন মিদ্যা

একজন পাঠক হিসাবে আমার চাওয়া 

প্রথমেই বলি,আমি আগে একজন পাঠক।বই পড়তে পড়তেই সাহিত্যের প্রেমে পড়া। কিছু লেখকের গল্প পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে টুকটাক লেখালেখিরও চেষ্টা করি। 
সারাবছর ধরে অনেক গল্পই পড়ি।ওয়েবে,সংকলনে,বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।সব গল্প মনে থাকে না। কিছু গল্প মনে দাগ কাটে।বহুদিন সেগুলো মনে থাকে। কিছু গল্প পড়ার পর মাথার ওপর দিয়েই বেরিয়ে যায়। মনে হয়,কী পড়লাম এতক্ষণ? তাহলে আমি পাঠক হিসাবে যা চাইছিলাম,তা কি লেখক পূরণ করতে পারেননি?নাকি লেখক লিখতেই পারেননি? প্রশ্নটা বড়ই জটিল।
একজন পাঠক হিসাবে আমি পড়তে চাই সেই গল্পটা যা এর আগে কেউ কোনোদিন লিখেনি। বহুচর্চিত বিষয়কে নিয়ে লেখা গল্প আমি বার বার পড়তে চাই না।একজন পাঠক হিসাবে আমি পড়ে জানতে চাই সেই জীবন-যাপনের কথা,সেই সুখ-দুঃখের কথা,সেই চরিত্রগুলোর কথা যা আমার কাছে এতদিন অজানা ছিল।যেখানে সেভাবে আলো ফেলেনি কেউ।যারা ছিল অন্তরালে।
আমি তাদের কথা আরও বেশি করে জানতে চাই, যারা মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেয়। সেই মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচয় হতে চাই,যারা আড়ালে থেকে দেশের,সমাজের,পরিবেশের জন্য লড়াই করে চলে।এমন কিছু গল্প পড়তে চাই,যা জীবনের চলার পথে সাহস জোগায়,ভুল পথ থেকে সরে আসতে পারি। দুঃখ পেলে মুখে হাসি ফোটাতে পারে, মনখারাপ হলে পড়ে মন ভালো হয়ে যায় এমন কিছু গল্প পড়তে চাই।
যে কথা এর আগে আমাকে এমন করে কেউ কক্ষনো ভাবায়নি, তেমন কিছু গল্প পড়তে চাই। এমন কিছু গল্প পড়তে চাই,যে লেখক প্রচলিত ধারার বাইরে, সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে আমাকে একটি নতুন গল্প শোনাবে।পড়ে যেন মনে মনে বলতে পারি,বাহ!বেশ গল্প তো! কোথায় ছিলেন এতদিন? এর আগে কেন আপনার লেখা পড়িনি!তখন আমি পাগলের মতো সেই লেখকের লেখা খুঁজব।তার বই সংগ্রহ করব।কোনো পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা দেখলে কিনে নেব।বন্ধুবান্ধবদের কাছে তাঁর লেখার কথা জানাব।অন্যদের পড়াব। হ্যাঁ,আমি পাঠক হিসাবে গল্পের কাছে তা-ই চাই,যা আমার মনের ক্ষুধাকে মেটাতে পারে।যে গল্প একবার পড়েও আমাকে শান্তিতে ঘুমাতে দেয় না,সবসময় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াই,আবার পড়ার ক্ষুধা তৈরি করে সেরকম গল্প পড়তে চাই। 
একজন গল্পকার হিসাবে আমার চাওয়া 
লিখতে বসার আগে বিষয় নির্বাচন করা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। কী লিখব আর কী লিখব না এটা আগে ভেবে নিতে হয়। পাঠক হিসাবে আমার যেমন দাবি আমার লেখা যিনি পড়বেন তিনিও তো সময় পার করার জন্য পড়বেন না। তাই সবসময় চেষ্টা থাকে অজানা কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে বসার। যেন গল্পটি পড়ে পাঠক হতাশ না হন। গল্পে কিছু একটা যেন থাকে। কিছু একটা। 
নিজের গল্পের কাছে আমার চাওয়া বলতে পাঠক হিসাবে আমার যা চাওয়া সেগুলোই। কিন্তু চাইলেই তো গল্পে সব ধরা দেয় না। এ এক অনিশ্চিত পথে পাড়ি দেওয়া। কখনো লিখতে লিখতেই এমন কিছু কথা বেরিয়ে আসে এমন কিছু আর্ট সৃষ্টি হয়ে যায়, পরে যখন নিজের লেখাটি পড়ি, মনে হয়—আরে! এটা কী করে লিখলাম? 
আবার এমনও হয়, লিখে খুব গদগদ খুশি। ভাবলাম,কি কাজই না করে ফেলেছি! পরে সেই লেখা পড়ে মাথা চাপড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না। খুব আফসোস হয়, লেখাটি কেন ছাপতে দিয়েছিলাম! বা মনে হয়,এখন এই বিষয়টি নিয়ে লিখলে আরও ভালো করতে পারতাম। 
সবচেয়ে বড় কথা পাঠক কেমন গল্প চাইছেন। কোন গল্পগুলি আজও টিকে আছে।কোন গল্পগুলির কথা আজও মুখে মুখে ঘুরে।সেই গল্পগুলি মন দিয়ে পড়ে আর্টটা বোঝার চেষ্টা করি।গল্পগুলির কথা সবাই কেন বলে? কেন আমরা মনে রেখেছি? তার উপাদানগুলিকে খুঁজি। সেখান থেকেই শেখার চেষ্টা করি। 
নিজের লেখা নিয়ে লেখকদের বেশি কথা বলা ঠিক না। আমি মনে করি,লেখকের লেখার কথা পাঠকরা বলবেন।ভালো বুঝবেন। একজন গল্পকার হিসাবে আমার গল্পের কাছে শুধু এটুকুই চাওয়া,খুব জটিলতা সৃষ্টি না করে,নানান তথ্যকে গুঁজে না দিয়ে সহজসরল বাক্যে, মায়াময় গদ্যে পাঠকের মনে দোলা দিয়ে যেন অক্সিজেন জোগাতে পারি, বিষয়টি যেন আমার মতো করে বলতে পারি শুধু সেটুকুই চাই। আর গল্পকার হিসাবে ইচ্ছা, যে গল্প পড়ে আমি অনুপ্রাণিত হই, আমার নিজের ভালো লাগে,যেন তেমন গল্প লিখতে পারি। এক অনিশ্চিত পথের যাত্রী, পাঠক আপনিই জানেন কোন স্টেশন দিয়ে যাচ্ছি। 

7 thoughts on “গল্পের কাছে কী চাই : হামিরউদ্দিন মিদ্যা

  • January 13, 2021 at 11:50 am
    Permalink

    ভাল লাগল।

    Reply
  • January 13, 2021 at 1:47 pm
    Permalink

    গল্পকারের অনুসন্ধিৎসা ভালো লেগেছে। দারুণ।

    Reply
  • January 14, 2021 at 2:41 am
    Permalink

    বাহ্। ছোট্ট করে সরল শব্দে বলেছেন।

    Reply
  • January 14, 2021 at 9:23 am
    Permalink

    পাঠক ও লেখকের কাছে 'গল্প' মানে ঠিক যেন Discovery আর Invention. লেখকের কাছে যেটা নতুন সৃষ্টি, পাঠকের কাছে সেটাই নতুন রূপ মাত্র। সমাজের আসে পাশে অহরহ ঘতে যাওয়া ঘটনাগুলোকে নতুনভাবে সাজিয়ে প্রকাশ করাই লেখকের কাজ, পাঠক সেই ঘটনার মধ্যে যখন নিজেকে খুঁজে পাবে তখনই সে বার বার পড়বে, আবার পড়বে এবং শেষ বার পরেও অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অনুভব করবে, – শেষ হয়েও হইলো না শেষ।

    Reply
  • January 15, 2021 at 4:08 am
    Permalink

    খুব ভাল লিখেছ হামিরউদ্দিন। গল্পের কাছে মায়া রেখে যেতে চাই। মায়াময় গদ্যে আর ভাবনার আন্তরিকতায় গল্প হয়ে উঠুক খোলা জানালা দিয়ে আসা সকালের আলোটূকুর মতন। লিখে যাও অবিরত তেমন গল্পই যা বারে বারে পড়তে চায় পাঠক।

    Reply
  • January 19, 2021 at 4:22 pm
    Permalink

    অনেক গোছানো লেখা ।

    Reply
  • January 22, 2021 at 2:36 am
    Permalink

    খুব ভাল লিখেছ হামিরুদ্দিন। সহজ সরল বাক্যে মায়াময় গদ্যই তুমি লেখো। অনেক শুভকামনা।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=