স্মৃতি ভদ্রের গল্পঃ অবরুদ্ধ

                   

                        

নীহারিকা,
হ্যাঁ, তোমাকে এই নামেই ডাকতে ইচ্ছা করছে। সংসারের নিয়মে হয়তো অন্য কোনো সম্বোধন যুক্ত করতে পারতাম, কিন্তু কেন যেনো সে ইচ্ছা হলো না।
 সেই কবে থেকে তোমার গল্প শুনে শুনে মনের ভেতর যে ছবি এঁকেছি, তাতে তোমাকে সম্বোধনহীন রাখতেই ভাল লাগছে আমার।
তুমি হয়তো ভাবছো তোমার গল্প কে করলো আমাকে। হয়তো কিছু অনুমানও করছো। তবে একজন নয়, আমি তোমার গল্প এ বাড়ির অনেকের কাছেই শুনেছি। তবে অদ্ভুতভাবে সবাই আড়ালে বলতো তোমার কথা। আবার এমনও হয়েছে কেউ হয়তো তোমার কথা বলে ইঙ্গিতে এও বুঝিয়ে দিয়েছে, এ বাড়িতে সে ছাড়া অন্য কেউ তোমার কথা মনে রাখেনি।
কিন্তু সত্যি কথা কী জানো? এবাড়ির প্রায় সবাই লুকিয়ে তোমার গল্প করতো।
তোমার কথা প্রথম কবে শুনেছি জানো? তুমি শুনলে অবাক হবে। এ বাড়ির মানুষগুলোর সাথে ঠিকঠাক পরিচয় হবার আগেই তোমার নামের সাথে পরিচিতি ঘটে গেছে আমার।
বড় আপা আর আম্মা গিয়েছিলেন সেদিন আমাদের বাড়িতে। কথা ছিল পছন্দ হলে তারা আমাকে আংটি পরিয়ে আসবেন।
আমি তখন মাত্র স্কুল শেষ করে কলেজে উঠেছি। ছোটখাটো আমি মায়ের একমাত্র দামী শাড়ি সাউথ কাতান আর সবিতা বৌদির কাছ থেকে ধারে আনা ভারী কিছু গহনা পড়ে জবুথবু হয়ে বসেছিলাম। শ্বশুরবাড়ি সম্পর্কে সব ভারিক্কি ভাবনা দূর করে বড় আপা বলেছিলো, তোমাকে কিন্তু বিয়ের পর পড়াশুনা চালিয়ে যেতে হবে, পারবে তো?
আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করেই মা তুমুল উৎসাহে জবাব দিয়েছিলো, মেয়ে আমার পড়াশুনায় খুব মনোযোগী।
আমি আলগোছে হাত নেড়ে সবিতা বৌদির গোলাপবালায় শব্দ তুলতেই মা আরোও কয়েককদম এগিয়ে বলে, কলেজ পাশ করার ওর খুব শখ। আমি নিজের গৌণ ভূমিকায় নিরাসক্ত হয়ে সাউথ কাতানের আঁচল খুঁটতে শুরু করি।
আর ঠিক তখনই আম্মা প্রথম কথা বলেন।
মা, তুমি গান গাইতে পারো? রাশভারী মানুষটির চশমার ভেতরের স্নেহদৃষ্টিতে আমার চোখ আটকে যায়।
সবিতা বৌদির বাড়িয়ে দেওয়া হারমনিয়ম ধরে দুলে দুলে আমি গেয়েছিলাম,
‘ খেলিছে জলদেবী
সুনীল সাগর জলে
তরঙ্গ লহর তোলে
লীলায়িত কুন্তলে।’
গান শেষ করে সবিতা বৌদিরই শিখিয়ে দেওয়া ভঙ্গিতে হারমনিয়ম সালাম করে আম্মার দিকে তাকাতেই, আমি হোঁচট খেয়েছিলাম।
সেই স্নেহের দৃষ্টি এক মুহূর্তে কেমন রূঢ় হয়ে গেছে। যথাসাধ্য বিরক্তি চেপে আমাকে বললেন, এই গান ছাড়া আরোও কোনো গান গাইতে পারো তো?
বিপদ আঁচ করেই আমার মা আসরের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, শুধু গান না হামদ নাতও জানে। আম্মার চোখ থেকে রূঢ়তা এতেও কমলো না। তখন বড় আপাই এগিয়ে এলেন পরিস্থিতি সামাল দিতে, আম্মা রবীন্দ্রসংগীত খুব পছন্দ করে; তুমি আমাদের বাড়িতে যখন যাবে আম্মাকে শুধু রবীন্দ্রসংগীতই শুনিয়ো।
আগপাছ কিছু না ভেবেই সেদিন আমি ঘাড় নেড়ে আমার নিজস্ব ইচ্ছা প্রথম বিসর্জন দিলাম।
আম্মা আর বড় আপা আমাকে সেদিন আংটি পড়িয়েছিলো। আর ফিরে যাবার আগে বড় আপা বাথরুমে যাবার নাম করে পেছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমাকে বলেছিলো, জোবেদা জানো তুমি আজ গানটি অবিকল মঞ্জুশ্রীর মতো গাইলে!
ও হ্যাঁ, তুমি হয়তো জোবেদা নামটি শুনে একটু গোলকধাঁধায় পড়ে গেলে। ভাবছো কে জোবেদা?
আসলে এ বাড়িতে আসার সাথে সাথেই আমার জোবেদা নামটিকে বনবাসে পাঠানো হয়। বড় আপা আর তার ভাই মিলে আমার নাম রাখে রেনু।
ছিরিছাঁদহীন নামের মতো আমার বাকীসব অসংলগ্নতা দূর করতে বড় আপার ভাই সেদিন থেকেই বেশ তৎপর হয়ে উঠেছিলো।
তুমি হয়তো জানো , ছোটখাটো আমি প্রায় ছয়ফিট মানুষটির পাশে কত বেমানান ছিলাম। তবে এ নিয়ে সত্যি কথা বলতে তারমধ্যে কখনো আফসোস দেখিনি। বরং তার পাশে আমাকে যোগ্য করে তুলতে প্রথমদিন থেকেই তার আগ্রহ ছিল অপরিসীম।
এজন্যই চন্দন আহমেদ এর পাশে আমার বেমানান জোবেদা আখতার নামটি পরিবর্তিত হলো রেনু আহমেদ নামে। জানো, পরিবর্তন কিন্তু শুধু মুখে মুখে হয়নি, রীতিমতো এফিডেফিট করে পরিবর্তন হয়েছে।
আসলে মানুষটি তার কোনো জায়গাতেই আমার অপারগতাকে স্থান দেয়নি। সে ভাল করেই জানতো শুধু নাম নয়, আমি মানুষটিই তার পাশে বেমানান।
তাই আগাগোড়া পরিবর্তন করে ফেললেন আমাকেও।
ছোটখাটো মানুষ বলে শাড়ি পড়লে প্রথম প্রথম আস্ত কাপড়ের পুটলি মনে হতো আমাকে। এজন্য বড় আপাকে দায়িত্ব দিয়েছিলো কীভাবে পাট পাট করে শাড়ি পড়ে নকশি ক্লিপ লাগাতে হয়, তা শিখিয়ে দিতে। আর সেই শাড়ির ক্লিপগুলোও তার পছন্দ অনুযায়ী পড়তে হতো। পেখমখোলা এক ময়ূরের নকশি ক্লিপ দেখে আম্মা তো একদিন রীতিমতো রেগে গিয়েছিলেন,
‘ বাবু, তুমি কি চাইছো বলো তো? একজন হুবহু অন্যজনের মতো হতে পারে?’
আম্মার চিৎকারে থতমত আমি কোনোরকমে মা আর ছেলের মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে শুনেছিলাম,
‘ আম্মা, রেনু তো এরিমধ্যে অন্য মানুষ হয়ে উঠেছে , আপনি মনে হয় খেয়াল করেননি?’
হ্যাঁ, সত্যিই আমি খুব তাড়াতাড়ি তার ইচ্ছেমতোই পরিবর্তিত হয়ে উঠেছিলাম।
সারাজীবন পাঠ্যবই আঁকড়ে থাকা আমি তার উৎসাহে গীতাঞ্জলি প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছিলাম। এমনকি কথার পিঠে কথা নয়, কবিতা বলাও শিখে নিয়েছিলাম।
‘বাহ্, রেনু আজকাল কত পরিপাটি হয়ে থাকো তুমি, এমনই থাকবে সবসময়। শোনো,পরিপাটি হয়ে থাকলে মেয়েদের ব্যক্তিত্বে দ্যুতি বাড়ে।’
আমি সেই যে সবিতা বৌদির শিখিয়ে দেওয়া মুখ নিচু করে কাজললতা চোখ তোলা ভঙ্গিতে বলেছিলাম,
‘বিরাজিছে এ হৃদয়ে যেন নব উষাকাল,
শূন্য হৃদয়ের যত ঘুচেছে আঁধারকাল,
কেমনে শুধিবে বলো তোমার এ ঋণ।
এ দয়া তোমার, মনে রবে চিরদিন।’
আসলে তার ইচ্ছেমতন হয়ে ওঠাই ছিল তখন আমার একমাত্র লক্ষ। আসলেই তো ছিরিছাঁদহীন জোবেদা কেন মন্ডল বাড়িতে জায়গা পাবে?
তুমি হয়তো জেনেই থাকবে এ বাড়ির নাম কিন্তু সেই একই আছে। এ বাড়ির অনেককিছুই আগের মতো আছে। উঠোনের এককোণে সাদা কাঠটগর বা পাতকুয়ার পাশে পানির চৌবাচ্চা সব একইরকম আছে। কিছুই বদলায়নি।
উনি বরং প্রতিবছর রাজমিস্ত্রি ডেকে কুয়ার পাড় আর চৌবাচ্চা মেরামত করিয়ে নিয়েছে এতদিন।
টাইমকলের লাইন আর পানির মোটর লাগানো বাড়িতে পাতকুয়ার উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করলেই উত্তর পেতাম,
‘ রেনু, সব প্রশ্নের উত্তর আমি দেবো এমন আশা করো না।’
হ্যাঁ,আসলেই তো তাই। চন্দন রহমান তো বিয়ের দিন রাতেই আমাকে বলে দিয়েছিলো, তার খুব ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার প্রশ্ন করা চলবে না।
তবে সেদিন অবশ্য আমি বুঝিনি মন্ডল বাড়ির সব ব্যাপারই তার খুব ব্যক্তিগত।
আর বিশেষ করে চিলেকোঠার ওই ঘরটি।
মাসের কোনো কোনো দিন হঠাৎ করেই সে চিলেকোঠায় ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিতো। আর সেসব দিনে তাকে কেউ বিরক্ত করতো না। এমনকি খুব জরুরী কাজেও তাকে ডাকা হতো না।
প্রথম প্রথম খুব অবাক হতাম। একই বাড়িতে থেকে একজন মানুষ কীভাবে সবার থেকে বিছিন্ন হয়ে যেতে পারে হুট করে?
আমার উশখুশ দেখে বড় আপা বলেছিলো, চন্দন যখন একলা থাকতে চায় তখন ওকে বিরক্ত করো না। ভেবো না, কিছুসময় পর দেখবে ও একদম স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
হ্যাঁ, হতোও তাই। কয়েক ঘন্টা পর মানুষটি অবিকল আগের মতো আমাকে ডেকে বলতো, রেনু কলেজের নজরুল জয়ন্তীর জন্য কবিতাটা প্র‍্যাক্টিস করে নিয়েছো তো।
আমিও সব ভুলে বেণী জড়ানো খোপায় আর জলপাই রঙের টাঙাইল বালুচরির সাথে লেস লাগানো ব্লাউজ পড়ে, রওনা হতাম তার সাথে।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন গলায় সবটুকু দরদ ঢেলে আবৃত্তি করতাম,
‘ আমার বেদনা আজি রূপ ধরি শত গীত সুরে
নিখিল বিরহী কন্ঠে বিরহিণী তব তরে ঝুরে
এ পারে ও পারে মোরা নাই নাই কূল
তুমি দাও আঁখি জল, আমি দেই ফুল।’
মঞ্চের একদম সামনের সারিতে বসা বাংলার প্রফেসর চন্দন আহমেদের মুগ্ধ চোখ আমার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতো।
আমি জানতাম সে চোখ আমায় দেখছে না।
দেখবে কী করে বলো? গ্রীবায় এক আলগা অহংকার ফুটিয়ে, স্পষ্ট উচ্চারণে মঞ্চে যে মেয়েটি আবৃত্তি করতো সে তো আর জোবেদা খানম নয়।
জানো মাঝেমাঝে সব আলগা আবরণ ছিঁড়েখুঁড়ে সেই জোয়াদ্দার বাড়ির জোবেদা হয়ে উঠতে মন চাইতো। যে ইচ্ছে করলেই দুলে দুলে ‘ কোন বা দেশে থাকো গো কুমার’ গাইতে পারে। আবার ইচ্ছে করলেই সবিতা বৌদির দুয়ারে বসে বেশী করে কাঁচামরিচ দিয়ে মুড়ি খেতে খেতে, ‘রঙিন রূপবান’ সিনেমার গল্প করতে পারে।
কিন্তু জানো যতই ইচ্ছে হোক না কেনো সাহসে ঠিক কুলিয়ে উঠতো না।
আমি জানতাম যে চন্দন আহমেদ রেনুকে আগলে আগলে রাখে, সে কখনো জোবেদা খানমকে আপন করে নেবে না। আর মানুষটির কাছ থেকে দূরে যাবার ভয়ই আমাকে সবসময় আলগা আবরণ পরিয়ে দিতো।
এমনিতেই সেই দিনগুলো আসলেই আমার হাত পা হিম হয়ে আসতো। চিলেকোঠার তালা খোলার শব্দ আমার বুকের ভেতর হাতুরি পেটাতো। আমি জানতাম এই সময়গুলো খুবই স্বল্পস্থায়ী, তবুও কয়েকঘন্টা ওই চিলেকোঠার সাথে তাকে ভাগ করে নেওয়াই আমার কাছে যন্ত্রণাদায়ক ছিল।
তুমি হয়তো ভাবছো সব পেয়েও আমার কত দু:খবিলাস।
হ্যাঁ, আসলেই আমি সব পেয়েছি। না চাইতেই সব পেয়েছি, যা হয়তো আমার পাবারই কথা ছিল না।
বলো, আমি কী কখনো পরিপাটি আধুনিকা রেনু হতে চেয়েছি? নাকী আমি হুবহু অন্য আরেকটি মানুষের মতো হতে চেয়েছি?
আমি তো চেয়েছিলাম একটি সাধারণ সংসার। যেখানে আলগা কেতাদুরস্তে হাঁপিয়ে উঠবো না বা সংসারের খাঁজে খাঁজে সারাদিন নিজেকে খুঁজবো না।
আমি চেয়েছিলাম একান্ত একটি আটপৌরে সংসার।
কিন্তু সেসব ইচ্ছার কাটাকুটি খেলায় তো চন্দন আহমেদকে পাওয়া হতো না আমার! আমি অনেকবার ভেবেছি, খুব ঠাণ্ডা মাথায় ভেবেছি আসলে আমি কী চাই।
এমনো হয়েছে ভেবে উত্তর পেয়ে এমন ভজঘট পাকিয়ে ফেলেছি যে, নিজেকেই সব গোলযোগ মেটাতে হতো।
একদিন কী হয়েছে শোনো।
বড় আপা সেদিন কোনো কারণে স্কুল কামাই দিয়েছিলো। এমনিতেও স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে বড় আপা খুব দায়িত্ববান ছিলেন। তবুও মাঝেমাঝে বিনাকারণে স্কুল কামাই দিতেন।
আর অদ্ভুতভাবে সেসব স্কুল কামাইয়ের দিনই চিলেকোঠার জং ধরা তালায় চাবি পড়তো।
সারাদিন সে ঘরে কাটিয়ে চন্দন আহমেদ যখন বের হতেন তখন দু’ভাইবোন মিলে জলছাদে বসে গল্প করতেন।
সেদিন মাথায় কী ভূত চাপলো জানি না। আড়ি পাতলাম দু’ভাইবোনের কথায়।
‘ কতদিন এভাবে চলবে? রেনু মনে হয় একটু আধটু বুঝতে পারে এখন।’
বড় আপার কণ্ঠ কেন যেন হতাশায় মোড়ানো মনে হলো।
‘ আমি তো কিছু লুকাতে চাইনি। তুমি আর আম্মা মিলে সবকিছু ঢেকেঢুকে রাখতে চাও। আমার জীবনের এই সত্যটুকু আমি কখনই অগ্রাহ্য করতে পারবো না।’
খুব ভাবলেশহীন চন্দন আহমেদ।
এরপরেই আবার ফিসফিস করে বলে উঠলো, আমার সাথে থাকতে হলে এই সত্য মেনেই থাকতে হবে।
জানো, সত্যটুকুর কোথাও জোবেদা নেই। এমনকি রেনুও নেই। খুব খুব অপমানিত লাগছিলো।
আমি হঠাৎ করেই সব খোলস ছিঁড়েখুঁড়ে জোবেদা আখতার হয়ে উঠলাম।
সিঁড়ি দিয়ে ধুপধাপ করে নেমে এলাম। আম্মার ঘরের সামনে দিয়ে আসার সময় গলা ছেড়ে ‘খেলিছে জলদেবী’ গাইলাম।
এরপর দু’ভাই বোন নীচে আসতেই গল্প জুড়লাম ‘চন্দ্রলেখা’ সিনেমার। এলেমেলো চুলে অপরিপাটি বসে অলিভিয়ার দারুণ অভিনয়ের গল্প বলতে বলতে কচমচ করে মুড়ি খেতে লাগলাম।
বড় আপা হকচকিয়ে ভ্রু তুলে তাকিয়ে রইলেন। আর চন্দন আহমেদ বিরক্তি লুকিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।
সেদিন শোবার ঘরেও কিছু অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা করে ফেললাম।
আমাদের ঘরের ফুলদানিতে সবসময় চন্দন কাঠটগর ফুল রেখে দিতো। সাদা ফুলে নাকী ঘরের পবিত্রতা বাড়ে। কিন্তু জানো, আমার চিরকাল হলুদ চন্দ্রমল্লিকা প্রিয়। আমি ছাদের টব থেকে একগাছি চন্দ্রমল্লিকা এনে রেখে দিলাম ঘরে। আর চন্দন ঘরে ঢুকতেই আহ্লাদী গলায় বললাম,
‘ আমাকে কাল অরুণ বরুণ কিরণমালা সিনেমাটা দেখতে নিয়ে যাবে? সেবার সবিতা বৌদি সিনেমাটার খুব গল্প করছিলো।’
আমার আহ্লাদে এক আকাশ অন্ধকার ঢেলে সে বলেছিলো,
‘ রেনু, মন্ডলবাড়ির কেউ সিনেমা হলে ওসব আজেবাজে সিনেমা দেখতে যায় না।’
ওর স্বরে সেদিন কিছু ছিল। আমি আঁতকে উঠেছিলাম।
আমার গোছানো সংসারের সুখ সুখ মল রুমঝুম করে আবার ফিরে আসতে চায় আমার পায়ে। আমি বুঝতে পারি রেনু ছাড়া সে মল আর কারো পায়ে জড়াবে না।
আমি সুড়সুড় করে রেনুর ভেতরে আত্মগোপন করি। আর জোবেদা খানম অন্ধকার জানালায় জোনাক পোকার মতো জ্বলতে জ্বলতে টুপ করে হারিয়ে যায়।
আসলে এই মন্ডল বাড়ির আনাচেকানাচে এত এত সুখস্মৃতি যে, সেসবে হোঁচট খেতো চন্দন আহমেদ নামের মানুষটি সারাজীবন।
না, আমাকে নিজে মুখে চন্দন সেসব কথা বলেনি।
এই মন্ডলবাড়ির প্রতিটি পুরাতন জিনিষের প্রতি ওর দূর্বলতা দেখে আমি একদিন বড় আপাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কারণ।
একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আপা বলেছিলো, টুকরো টুকরো স্মৃতিই মানুষের পিছু ছাড়ে না আর এতো আস্ত একটা বাড়ি!
মন্ডল বাড়ি মঞ্জুশ্রীদের ছিল সেটা আমি অনেক পড়ে জেনেছিলাম। যেদিন জানলাম সেদিন একই সাথে এও জানলাম পাতকুয়ার পাশে চৌবাচ্চাটিও ছিল মঞ্জুশ্রীরই পরিকল্পনাপ্রসূত।
কারণ সাদা টগর গাছে সকাল বিকাল পানি দেবার খুব সাধ ছিল। আপার কাছেই শুনেছি গাছে পানি দিতে দিতেই মঞ্জুশ্রী গাইতো ‘খেলিছে জলদেবী’ গানটি।
পরিপাটি মঞ্জুশ্রী ছিল মন্ডল বাড়ির প্রাণ। আর তার প্রাণটি ছিল পাশের বাড়ির পড়ুয়া এক সৌম্য ছেলের কাছে। দু’জনে একই সাথে নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করতে করতে বড় হয়েছে। আবার রবীন্দ্রনাথের একই বই ভাগাভাগি করে পড়তে গিয়ে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা পার করেছে।
আসলে মন্ডল বাড়ির মঞ্জুশ্রীর প্রতিটি পদক্ষেপের অতন্ত্রপ্রহরী ছিল কিন্তু সৌম্য ছেলেটি।
তবে যতই প্রহরায় থাকুক না কেন, নিয়মের সাতপাঁচকে তো অবহেলা করা যায় না। সংসারের লেনাদেনায় খুবই অর্থহীন এই আত্মীয়তা।
বাঁধা এলো দু’বাড়ি থেকেই। কিন্তু সেই বাঁধায় উত্তাল সাগর বাঁধ মানবে কেন? মঞ্জুশ্রী এবার সব ছেড়ে পালিয়ে যেতে চাইলো ছেলেটিকে নিয়ে।
কিন্তু তা আর হলো কই?
মনের ভেতর এক সমুদ্র ভালবাসা লুকিয়ে ছেলেটি বাঁধা পড়লো বিধবা মায়ের কসমে,
‘বাবু, উপেন দাদা খুব কান্নাকাটি করে আমার কাছ থেকে কথা নিয়ে গেছে। ওপারে মঞ্জুশ্রীর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তুমি কোনো ঝামেলা করবে না, আমার মাথার কসম রইলো।’
ব্যস্, এটুকু কথাতেই বাবু মঞ্জুশ্রীকে ফিরিয়ে দিলো।
আচ্ছা, বল তো মঞ্জুশ্রী কি আদৌ ফিরে গিয়েছিলো, নাকী সারাজীবনের জন্য একজন মানুষের জন্য রেখে গিয়েছিলো অনন্ত অপেক্ষা?
সেই যে,চিঠির জন্য অপেক্ষা। শব্দে শব্দে দু’জনকে ছোঁবার অপেক্ষা। এমনকি রেখে যাওয়া মন্ডল বাড়িতে আবার মঞ্জুশ্রীর ফিরে আসার অপেক্ষা।
তুমি হয়তো হাসছো। ওপারে চলে গেলে কেউ ফেরে নাকী?
হ্যাঁ, ফেরে তো। চিঠিতে ফেরে, চৌবাচ্চার জলে ফেরে, পাতকুয়ার শানে ফেরে, চিলেকোঠার অন্ধকারে ফেরে।
না ফিরলে কেউ সারাজীবন অপেক্ষা করে, বলো?
হ্যাঁ, মানুষটা শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষায় ছিল। হার্টের জোর ততদিনে অনেক কমে গিয়েছিলো তার। দু’বার হাসপাতালেও ভর্তি হয়েছিলো। তবুও এক মুহুর্তের জন্য অপেক্ষায় ক্ষান্ত দেয়নি।
হাসপাতালে গেলেই ইনিয়েবিনিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করতো, কোনো চিঠি এলো কীনা।
খুব মায়া হতো জানো। মনে হতো, চিঠি পেলেই সুস্থ হয়ে যাবে মানুষটি।
তবুও সারাজীবনের আড়ালকে সম্মান জানিয়েই আমি প্রশ্ন করতাম, কীসের চিঠি? এখন তো ফোনের যুগ। কেউ চিঠি লেখে নাকী এখন?
মুখে যতই বলিনা কেন, আমি জানতাম পৃথিবীতে দু’জন মানুষ এখনো লুকিয়েচুরিয়ে একে অন্যকে লিখতে বসে চিঠি।
তবে তোমার শেষ চিঠি আসার কিছুদিন পরেই চন্দন খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে।
আসলে সদ্য স্কুল থেকে রিটায়ার্ড করা মঞ্জুশ্রী মন্ডলের সাদাকালো চুলের আজীবনের শূন্য সিঁথি ওকে খুব আত্মপীড়ন দিতো।
মঞ্জুশ্রীর বিয়ে হয়ে গেছে এমন মিথ্যে তথ্য জেনেই কিন্তু চন্দন বিয়েতে রাজী হয়েছিলো।
জোবেদা বেগমের আদলে যেদিন রেনুকে বসানোর প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিলো, সেদিনই তোমার প্রথম চিঠিটি এলো।
কিন্তু ততক্ষণে বেশ দেরী হয়ে গেছে।
তবে মন্ডল বাড়িতে রেনু যতই সুখ সুখ ছবি আঁকুক না কেন, এ বাড়িতে মঞ্জুশ্রী ফিরবেই এ যেন ওর বিশ্বাস ছিল।
তাই তো শেষ আধাখান চিঠিতেও ওর সেই একই কথা, ‘একবার এসো নীহারিকা। বাড়ি চিনতে ভুল হবে না তোমার, দেখো। মন্ডল বাড়ি সেই একই আছে।’
চিঠিটি শেষ না করেই চন্দন চলে গেছে।
সেই আধখান চিঠি হাতে পেয়েই আজ আমি লিখতে বসেছি।
চন্দনের ফেলে রেখে যাওয়া অপেক্ষা নিয়ে মন্ডল বাড়িতে এখন অন্য কেউ তোমার অপেক্ষা করছে।
যার অনেকদিনের ইচ্ছে সেই মানুষটিকে দেখার, হবহু যার মতো হতো গিয়ে সে নিজেকে মনের অজান্তেই হারিয়ে ফেলেছে।
এখন আমি চাইলেই রেনুর আবরণ ছেড়ে জোবেদা হয়ে উঠতে পারি। কিন্তু তা হই কই?
মন্ডল বাড়ির আঙিনায় জোবেদার জন্য যে লক্ষণরেখা আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে টেনে দেওয়া হয়েছে, তা উতরানোর মন্ত্র হারিয়ে ফেলেছে রেনু।
মন্ত্র না জানা চক্রব্যূহে বসে নিঃসঙ্গ রেনু তোমার উত্তরের অপেক্ষায় রইলো।
অন্ধকার চিলেকোঠার চাবিটি আমি খুব যত্ন করে রেখেছি। তোমার চিঠি এলে তবেই সে ঘরের তালায় চাবি পড়বে।
আর হ্যাঁ তুমি ফিরে এলে মিলিয়ে দেখবো ঠিক কতটা তোমার মতো হতে পেরেছি আমি।
ইতি
রেনু
বি: দ্র: ঠিকানাহীন চিঠিটা হয়তো তোমার কাছে পৌঁছাবে না। আমার জোবেদা হয়ে ওঠার শেষ ইচ্ছেটুকুও অসংলগ্নতার খাতে ফেলে চন্দন আহমেদ ইচ্ছে করেই তা উপায়হীন করে গেছে।
 
 
 
লেখক পরিচিতি:
স্মৃতি ভদ্র
কথাসাহিত্যিক।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=