পাঠপ্রতিক্রিয়া : ত্রিসীমানায় কয়েক গুচ্ছ আনাগোনা

জুবায়ের ইবনে কামাল
ত্রিসীমানা গল্পগ্রন্থের প্রথম গল্পটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ফিলোসফি বাক্যালাপের আড়ালে মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। কোথাও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ কিংবা বিপক্ষ শক্তির বালাই নেই। তবুও এরকম রাজনৈতিক সচেতন দৃষ্টিতে ১৯৭১ দেখাটা বেশ অন্যরকম লেগেছে। আমরা ঠিক এই মুহুর্তে যেই অদৃশ্য সংকটের মধ্যে আছি, তার রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন দৃষ্টিকোনের সরলরৈখিক উত্তর পাওয়া যায় ওয়াসি আহমেদের ‘পরিবেশবাদী’ গল্পে। যদিও তা শেষমেষ সরল থাকে না, বাস্তবে যেমনটা থাকে না। শহুরে উত্তাপে পুড়ে যাচ্ছে শরীর, সেই সময় কোন একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে এসি বন্ধ রেখেই প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করে বসে, ১৯৭১ সালে আপনি কী করতেন? যার জবাবে সময় মনে করতে সফেদ উত্তরদাতা ভেবে বলে, ‘গন্ডগোলের সময়’ ওটা করতাম। এই যে সময়টাকে উল্লেখ করতে শব্দচয়ন, তা যেন ওয়াসি আহমেদের রাজনৈতিক সচেতনতার প্রভাবই প্রকাশ পায় না; বরং আমাদের মধ্যকার রাজনৈতিক ইতিহাসের অস্থির টানাপোড়েনের একটি দিক মাত্র।
ত্রিসীমানা বইটির নাম গল্পটা এরকমই ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের ইশারা দেয়। স্বামী-সন্তানকে অকালে হারিয়ে ফেলে খড়কুটো নিয়ে বেঁচে থাকা স্কুল শিক্ষিকা শাহানা মাঝেমাঝেই ভাবে, মানুষের আসলে কয়শো বছর বাঁচা উচিত। বৃদ্ধ শশুরের সঙ্গে খানিক হেয়ালি ধরণের তর্ক করে বেড়ায় তিনি কত বছর বাঁচতে চান। আর বৃদ্ধ শশুর কিশোরীদের মত করে তাকে বোঝান। এবং রাতে শুয়ে হাত ভাজ করে যখন মুনাজাত করেন তখন বিভ্রান্ত হয়ে যান। তবে এই ব্যক্তির মনস্তাত্বিক টানাপোড়েনের বাইরেও গল্পটির দারুণ এক রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। গল্পটি কেমন যেন ছন্দ মিলিয়ে নির্মান করা হয়েছে।

কবিতায় যেমন সনেটে একটি পঙক্তির সাথে আরেকটির ভাবে মিল থাকে। তেমনি গল্পটিতে একধরণের ছন্দের গতি দেখতে পাওয়া যায়। গল্পের মুল চরিত্র শাহানার ভাবনা, ভাবনাটা শশুরকে বলতে এসে মোনাজাত করতে দেখা, স্কুলে জ্যামিতি ক্লাসে গল্প ফেঁদে আসা, বাসায় ফিরে সব অগোছালো দেখতে পাওয়া ইত্যাদি ঘটনাগুলো লিনিয়ার ভাবে ঘটার পরে আবার তার পূর্বের অবস্থাগুলো ছন্দের মাধ্যমে দেখতে পাই। দেখতে পাই কেন অগোছালো হলো, কেনইবা জ্যামিতির ক্লাসে গল্প ফাঁদতে হলো, শাহানা কী ভাবছিলো এবং তা বলতে এসে শশুরকে মোনাজাত করতে দেখার সময়ে বৃদ্ধ শশুরের চিন্তাগুলো কী ছিলো এসব বিষয়ে যেভাবে গুছিয়ে লেখা হয়েছে, তা গল্পকে রূপতাত্ত্বিকভাবে শুধু আলাদা বৈশিষ্ট্যই যুক্ত করেনি; বরং গল্পের ন্যারাটিভকে করেছে বেশ শক্তিশালী।

রূপতাত্ত্বিকতার বিচারে এই বইটিতে গল্পের আকারেও ভিন্নতা দেখা যায়। তারমধ্যে ‘দীপার দুপুর’ এবং ‘সন্ধ্যায়’ গল্প দুটো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আকারের দিক থেকে এই গল্পগুলো তেমন একটা বড় নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সেই কথার মত ‘শেষ হয়েও হইলো না শেষ’ করার মত রেশ রয়ে গেছে। গল্পগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করলে বারবার সংলাপ ও বর্ণনার মিশ্রন দেখতে পাওয়া যায়। তবে গল্পকার ওয়াসি আহমেদের অন্যতম এক গুণ হলো বর্ণনায় বাহুল্য খুব কম। তাই ছোটগল্পের রূপতাত্তত্বিক বিচিত্রতা ফুটে উঠেছে সংলাপে বিভিন্নভাবে। উচ্চ শ্রেনীর কাছে বরাবরের মত কু-প্রস্তাবকে চরিত্র দীপা বলে ফেলে এভাবে- ‘ কিন্তু বিছানায় ফেলেও লোকটার আগ্রহ, মনোযোগ ছিল না। তড়িঘড়ি সেরে কাপড় পরতে বলেছিল’।
একটি পূর্ণ গল্পগ্রন্থ পড়তে গিয়ে পাঠক বারবার চমকে যাবেন, কপালের ঘাম মুছবেন কিংবা সাহিত্যের অদ্ভুত সব অলিগলি ঘুরে বেড়াবেন- হয়তো এটাই কোন গল্পকারের সার্থকতা। আমি ত্রিসীমানা বইটি পড়তে গিয়ে এরকম একটি ইঙ্গিত পাই ‘লাইলি সুন্দরী ও জীবনযাপনের রূপকথা’ নামক গল্পে। বোধ করি এজন্যই হয়তো গল্পটিকে ‘ত্রিসীমানা’ বইয়ের শেষে রাখা হয়েছে। গল্পের প্রেক্ষাপট খানিক অদ্ভুতুড়ে হলেও বেশ নিরেট বাস্তব। এক গ্রামের নদীতে দেখা যায় নগ্ন নারীকে সাঁতরে যেতে। যদিও তা কোন জলকন্যার মত আবহে ছিলো না। প্রায় অসহায় হয়ে মাঝিদের কাছে নৌকায় ওঠার অনুমতি না পেয়ে অচেনা এক নারীকে এভাবে সাঁতার কাটা দেখতে গিয়ে কীভাবে যে নাম হয়ে যায় ‘লাইলি সুন্দরী’ তা কেউ জানে না। কিন্তু সাহস করে জলে নেমে যখন লাইলি সুন্দরীকে কিছুটা ভোগের আশায় আবার কিছুটা বিলুপ্ত বস্তুকে ছোঁয়ার লোভে যখন চারজন তাকে জাপটে ধরে, তাদের জাপটে ধরা লাশ পাওয়া যায় অদূরেই। পুলিশ তদন্ত করতে এসে এমন কাউকেই খুঁজে পায় না, যে কিনা লাইলি সুন্দরীকে ধরতে জলে নামেনি। পুলিশ যখন দড়ি বেধে সবাইকে নিয়ে যায় থানায় তখন পুরুষ শুন্য গ্রামে বিভিন্ন ছাপড়া ঘরে লুকিয়ে থাকা নারী-স্ত্রীরা ভাবতে থাকে লাইলি সুন্দরীর রূপ। যা তাদের মধ্যে খুঁজে পায়নি ঘরের কর্তা। না দেখেও মাথার ভেতরের জগতে তৈরি হয় এক লাইলি সুন্দরীর অবয়ব। যার অস্তিত্ব শুধুই মগজে। একসময় রূপকথার বন্ধন ঘটে এই বাস্তবতায়। পুরুষরা যখন থানা-পুলিশকে পেছনে ফেরে ঘরে ফেরে, দেখতে থাকে রাগে-ক্ষোভে অথবা কিসের কারণে যেন মৃত্যুতে পতিত হয়েছে ঘরের স্ত্রীরা। শকুন তাদের জানান দেয় এই গ্রাম এখন রূপকথার। পুরুষরাও যেন হাতছানি দেয় রূপকথায়। শুরু হয় পালা করে মৃত্যুর সঙ্গে আলিঙ্গন। এ যেন এক জাদুবাস্তবতার উঠোনের গল্প।
তবে বহু বছর পর কেউ কেউ, হ্যাঁ কেউ কেউ লাইলি সুন্দরীকে চিন্তা করে। আমরা বুঝতে পারি, মানুষ মরে গিয়ে পঁচে গলে যায়। কিন্তু তার মাথায় অঙ্কন করা কিছু অদেখা লাইলি সুন্দরী টিকে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
এরকম বিভিন্ন প্রজন্মের মাথার ভেতরের অদ্ভুত সব আঁকিবুকি জানতে গিয়ে আমার সাথে গল্পকার ওয়াসি আহমেদের পরিচয়।

লেখক পরিচিতি

জুবায়ের ইবনে কামাল
জন্ম ঢাকায়। ১৯৯৮ সালে।
ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই মুহুর্তে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করছেন৷

Leave a Reply

Your email address will not be published.