জয়ন্ত দে : বিবাহবাষির্কী

লোকটা এসেই ঠক করে বোতলটা টেবিলের ওপর রাখল। বোতলে জড়ানো কাগজটা তালগোল পাকিয়ে নিয়ে দেখল, যেন ছুঁড়বে। কিন্তু ছুঁড়ল না, হয়তো জায়গা পছন্দ হল না, তাই টেবিলের নীচে আলতভাবে ফেলে দিল। তারপর পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার বের করে বোতলের পাশেই রাখল। আর একটা কাগজের ঠোঙা। বুক পকেটে একটা পেন, আর ছোট মোটা ডায়েরি ছিল। সেটাও রাখল টেবিলে। পিছন পকেট থেকে ম্যানিব্যাগ, বাঁ পকেট থেকে ছোট একটা মোবাইল বের করে স্থির চোখে মেয়েটার দিকে তাকাল। তারপর টেবিলের ওপরই রাখল। যেন মেয়েটাকে দেখিয়ে রাখল। 

এবার একটা একটা করে জামার বোতামগুলো খুলল। জামাটা গা থেকে ছাড়িয়ে চেয়ারের পিছন দিকের হাতলে ঝুলিয়ে দিল। জামার পিঠটা জ্যাবজেবে ভিজে। ঘিয়ে রঙের শার্ট, একদম নতুন। আগে এই দিনে লোকটার বউ নতুন শার্ট কিনে দিত। তাই এই দিনে লোকটা নতুন শার্টই পরে। এবার সে পকেট থেকে একটা রুমাল বের করল। সেটা খুলে ফট ফট করে দুবার ঝেড়ে আচ্ছা সে মুখ মুছল, দু’বগল মুছল। ভাঁজ করে আবার প্যান্টের পকেটে চালান করে দিল। তারপর জোরে একবার গলা খাকারি দিল। বলল, 

‘আজ মেশিন নিইনি। থানায় রেখে এসেছি। আমি রাউন্ডে বেরুলে কোমরে সাঁটিয়ে নিই।’ 

কথাটা বলে লোকটা থামল। তারপর, চাপা গলায় বলল,

‘গুণ্ডা বদমাইশ নিয়ে কারবার। কখন চালাতে হয়।’ কথা বলে দু’চোখ বন্ধ করে আত্মপ্রসাদের হাসি হাসল। বলল, ‘আজ এখানেই রাউন্ড মারব, কোথাও যাব না।
এখানেই পার্টি করব। আজ আমার হ্যাপি ম্যারেজ অ্যানভারসারি!’ কথাটা বলে লোকটা এবার দু’চোখ খুলে বেশ জোরে জোরে হাসল। আবার বিড়বিড় করল,
‘হ্যাপি ম্যারেজ ডে!’ কথাটা টেনে টেনে নিজেকেই বলল।
জ্যোতি ঘাড় নাড়াল না। কোমর বাঁকিয়ে যেমন টেরা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তেমনই দাঁড়িয়ে থাকল। কোনও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল না। কিন্তু লোকটার চোখ জ্যোতির কোমরের দিকে। কোমরের ওই জায়গাটা এমন একটা ভাঁজ মেরেছে, ওদিকেই লোকটার চোখ বার বার আটকে যাচ্ছে। সেই প্রথম যখন দেখল তখন থেকেই।
তখনও মেয়েটা এসে এভাবেই দাঁড়িয়েছিল।
চোখ সরিয়ে লোকটা শান্ত গলায় বলল, 
‘হ্যাপি ম্যারেজ অ্যানভারসারি, মানে বুঝলি— বিবাহবাষির্কী! আজ আমার বিয়ের সালগিরা। টোয়েন্টি ফাইভ ইয়ার্স! স্পেশাল ডে!’
জ্যোতি দরজা বন্ধ করে ঠায় দাঁড়িয়ে। সে এই পুলিশকে নতুন দেখছে। আগে কোনওদিন একে দেখেনি। মদনাদা বলে গেল, থানায় নতুন এসেছে। আজই নাকি প্রথম। কী সব বলল, ভালো করে শোনেনি।
ওদিকে আবার খুকিমাসিও তাড়া লাগাচ্ছে। শাড়ি পালটাতে বলছে, ঠোঁটে লিপস্টিক ঠিক করতে বলছে, বুকে সেন্ট মারতে বলছে। সে এক হইহই কাণ্ড!
এখানকার পুলিশের চক্কর খুকিমাসি আর মদনাই সামলায়। লোকটা আসবে শুনে মদনা এসে খুকিমাসিকে বলেছিল, ‘পুলিশ, নয়া অফিসার। খুব হারামি লোক, তিনমাসে দুজনকে ফেলে দিয়েছে।’
হাবিলদার পবন মদনাকে বলে গেছে, ভালো ছুকরি দিতে, নয়া মাল চাই। পয়সা মিলবে না। ফ্রি। সামালহকে। খুশি করে দিবি।
মদনা খুকিমাসি বলেছে, কোনও চিন্তা নেই, অফিসারবাবুকে নিয়ে এসো। আলাদা ব্যবস্থা করে দেব।
পবন চলে যেতে খুকিমাসি তিনটে মেয়েকে ডেকে পাঠাল, আয়েষা, কমলি আর বিউটি। আয়েষাকে দেখে মুখ কোঁচকাল মদনা। খুকিমাসিকে বলল, আয়েষাকে না, ভাগা।
 খুকিমাসি ঠিকরে উঠল, ‘কেন? তিনজনই নতুন একে বাদ দিবি কেন।’
মদনা নীচুস্বরে বলল, ‘অফিসার বাম্ভন আছেন। খুব পুজোআন্নিক করে।’ 
খুকিমাসি চোখ কোঁচকাল, ‘এই যে শুনি খুব হারামি লোক, খুব রাগী।’
মদনা বিড়ি ধরাল, ‘গুলাবকে কীভাবে মেরেছে জানিস, পুরো তিন মাইল দৌড় করিয়েছে, তারপর নালায় ফেলে পা দিয়ে মুখ চেপে ধরে খতম করে দিয়েছে।’
‘বেশ করেছে, বেশ করেছে মেরেছে, ঠিক করেছে।’ খুকিমাসি ঠিকরে উঠল।
থানার সেই অফিসার এল তখন নটা। ঘিয়ে রঙের শার্ট, টেরিকটের প্যান্ট। এসে বসল স্পেশাল রুমে। মদনা এল প্রায় গায়ে গায়ে— স্যার স্যার করে। একটা হুইস্কির বোতল রাখল স্যারের সামনে। বিগলিত গলায় বলল, ‘এই যে স্যার।’
‘কার মাল?’ অফিসার বলল।
‘আপনার জন্য স্যার, খুকিমাসি দিল।’
খুকিমাসি গায়ে কাপড় টেনে লাজুকমুখ. অফিসারের দিকে তাকাল। অফিসার বাঁ-হাত একটু তুলে মাছি তাড়ানোর মতো করল। বলল, ‘এ তো হুইস্কি। আমি রামভক্ত।’ 
তারপর পকেট থেকে কাগজে মোড়া একটা পাঁইট বের করে দেখাল।
খুকিমাসি রাগ রাগ চোখে মদনার দিকে তাকায়। মদনা ভুল জিনিস দিয়ে বেইজ্জত করল। মদনা এবার দ্বিতীয় স্ট্রোক দিল, ‘স্যার, এক প্লেট চিলিচিকেন দিই। মালের সঙ্গে চাট। শসা পেঁয়াজ আছে। জমিয়ে খান।’
‘নাহ্‌, আমার ব্যবস্থা আছে।’ অফিসার পকেটে থেকে কাগজের একটা ঠোঙা বের করল, ‘বাদাম! আমি বাদাম দিয়ে খাই।’
খুকিমাসি আর দেবি করল না, বলল, ‘স্যার ওদের ডাকি।’
অফিসার হ্যাঁ না কিছু বলল না। মাসি বলল, ‘এই মেয়েদুটো আয়।’ পরপর দুজন ঢুকল ঘরে, কমলি আর বিউটি। মাসি আজ ওদের হেব্বি সাজিয়েছে। যেন বিয়ে দেবে। অফিসারের স্থির চোখ, নড়ে না, কোনও ভাব নেই। মদনা বলল, ‘কমলি থাক স্যার? নাকি বিউটি থাকবে?’ অফিসার কোনও কথা বলল না। বোকাটির মতো তাকিয়ে। খুকিমাসি পাকা মাল, মুখ দেখেই বুঝল, অফিসারের মনে ধরেনি।
নাকি দুটোই ধরেছে, ডিসিশন নিতে পারছে না। বলল, ‘অ্যাই তোরা দুটোই থাক স্যারের ঘরে।’
‘না, তোরা যা। আমি ডেকে নেব।’
ওরা খুকিমাসির দিকে একবার তাকিয়েই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। মদনা বিব্রত মুখে বলল, ‘তালে স্যার?’
খুকিমাসিও ছটফট করছে, এবার কী করবে? এখন তার হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে। সবচেয়ে ভালো মালদুটোই আগে ভাগে দেখিয়ে দিল। আগে দুটো কালোকুলি শুঁটকি দেখিয়ে তারপর এদের দেখানো উচিত ছিল, হায় হায়। তার এই বাড়িতে আটজন মেয়ে থাকে। ও-বাড়িতে জনা সাতেক। পাশের একটা বাড়িতে চারটে। সব মিলিয়ে উনিশজন। সেরা জিনিস খুকিমাসি কোলের কাছে করে রাখে।
 এই-বাড়ির রেট হাই। খুকিমাসি উশখুশ করছিল, মন চাইছিল, আয়েষাকে ডাকতে। সে মিনমিন করে বলল, ‘আর একটা ভালো আছে ডাকব স্যার?’
‘কে জ্যোতি? জ্যোতিকে ডাক।’
জ্যোতির কথা শুনেই মুখ শুকনো হয়ে গেল খুকিমাসির। ‘জ্যোতির থেকে আয়েষা খুব ভালো স্যার।’
অফিসার বলল, ‘জ্যোতি। জ্যোতিকে ডাক।’
মদনা বলল, ‘জ্যোতিস্যার ও-বাড়িতে থাকে। এটা স্যার এস্পেশাল রুম। ওবাড়ি থেকে ওকে রেডি করিয়ে ডেকে নিয়ে আসতে হবে। দেরি হবে স্যার।’
ঝাড়া মেরে উঠে পড়ল অফিসার, ‘ওকে আসতে হবে না। আমি ও-বাড়িতেই যাব। চল। আমি রেডি।’ কথাটা বলেই অফিসার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বিব্রত মুখে মদনা বলল, ‘চলেন স্যার, আমি নিয়ে যাচ্ছি।’
খুকিমাসি হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। কী হারামি লোক মাইরি। বেছে বেছে জ্যোতিকেই মনে ধরল! মেয়েটা সবে একটু কাজেকর্মে মন দিয়েছে, আবার যদি. বিগড়ে যায়। কিন্তু কিছু করার নেই, সইতে হবে। সবাই বলছে হারামি অফিসার।
এমনিতেই এই তিনচারটে বাড়ি নিয়ে মাঝেমাঝেই এলাকার লোকজন ঝামেলা পাকায়। অথচ আশপাশে মিনিট দশেকের মধ্যে জনবসতি নেই। কিন্তু আশপাশের জনবসতির যাবতীয় গোলমাল এখানে এসে পড়ে। যেন এটা নর্দমা!
অফিসারকে নিয়ে মদনা ও-বাড়ি চলে গেল। খুকিমাসিও গেল পিছন পিছন— ওই জ্যোতি বড় তেদড়া। অফিসারবাবুকে ঘরে বসিয়ে জ্যোতিকে একটু বুঝিয়ে বলে দিতে হবে। সাজিয়েগুজিয়ে দিতে হবে। বেশি নখরামি যেন না করে বলতে হবে।
দুই
মদনা আর মাসি হইহই করছে। মাসির কথা জ্যোতি হেসেই উড়িয়ে দিল। সারা জীবনে কম পুলিশকে বিছানায় রগড়ায়নি। নতুন তো কী!
জ্যোতি কোমর বেঁকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। মেয়েটার কোমরটা মারাত্মক। লোকটা বলল,
‘তোর কাছে গেলাস আছে?’
জ্যোতি এগিয়ে এল। লোকটা যেখানে বসেছিল তার মাথার কাছে একটা শোকেস।
সেখানে নতুন একসেট কাচের গেলাস রাখা। মেলা থেকে শখ করে কিনেছিল। এমনি। কোনও পার্টিকে মাল খাওয়াবার জন্য নয়। পাল্লা খুলে একটা গেলাস বের করল। লোকটা বলল, ‘একটা গেলাস, তুই খাবি না?’
মেয়েটা কঠিন গলায় বলল, ‘আমি রাম খাই না। খুব গন্ধ।’
‘তবে কী খাবি?’
‘বিয়ার, হুইস্কি।’
লোকটা বলল, ‘তোদের ওই লোকটাকে একটা বিয়ার আনতে বল।’
‘আমার একটায় হবে না, দুটো চাই।’
‘দুটোই বল।’
‘সঙ্গে আর কী বলব?’
‘আমার খাবার আছে। তুই যা যা খাবি তার অর্ডার দিয়ে দে।’
‘টাকা ছাড়া মদনাদা অর্ডার নেবে না।’
‘ওর বাপ নেবে। তুই কাউকে দিয়ে বলে পাঠা।’
‘আপনার কাছে মদনাদার মোবাইল নম্বর নেই। ওকে ফোন লাগিয়ে বলে দিন। নইলে সব আমার হিসেবে ধরবে। না দিলে মেরে টাকা কেড়ে নেবে।’
লোকটা টেবিল থেকে ফোনটা তুলল। ফোন করল, কনস্টেবল পবনকে। ও এখানেই কাছাকাছি আছে। বলল, ‘পবনবাবু আপনার ওই মদনাকে বলুন আমার কাছে আসতে। আর বানচোদটা নাকি মেয়েদের ধরে ধরে মারে। ওকে এখন কিছু বলবেন না। কাল এসে যে কোনও একটা কেস দিয়ে মেয়েদের সামনে ফেলে প্যাঁদাবেন, মনে থাকবে।’
লোকটার হুকুম শুনে আঁতকে উঠল জ্যোতি। ঝটিতে এগিয়ে এল, ‘আপনি তো মদনাদাকে কাল মারতে বলে দিলেন, মার খেলে মদনাদা ঠিক বুঝে যাবে আমি ওর নামে কমপ্লেন করেছি।’
‘ঠিক আছে কাল মারবে না। কদিন পরে মারতে বলব।’
হুড়মুড় করে মদনা এল। এমনভাবে এল যেন পায়ে পড়বে। লোকটা বলল, ‘ও বাড়িতে খাইনি বলে কি এ-বাড়িতে জিগ্যেস করবি না? আজ হোল নাইট পার্টি হবে, আমার চারটে বিয়ার লাগবে। চিলিচিকেন, শসা, আর যা যা খুশি নিয়ে আয় জলদি।’
মদনা সেলাম ঠুকে চলে গেল।
লোকটার কথায় জ্যোতি খুশি হল। বলল, ‘আপনি কোন থানার হাবিলদার, আমাদের থানার? নতুন এসেছেন? আপনাদের ওখানে তো আর একটা নতুন অফিসার এসেছে?’
‘হ্যাঁ এসেছে, কেন?’ লোকটা চোখ নাচিয়ে বলল।
‘আপনি কি তার আন্ডারে?’
লোকটা মাথা ঝোঁকায়, মুখে মৃদু হাসির রেখা কিন্তু হাসি নয়, ব্যঙ্গই।
জ্যোতি বলে, ‘ওই অফিসার কিন্তু খতরনাক। সমঝে কাজ করবেন গো।’
‘কেন?’
‘সে-ই তো গুলাবকে মেরেছে?’ চাপা গলায় বলল জ্যোতি।
‘গুলাবকে সে কেন মারবে? গুলাব মাল খেয়ে নালায় পড়ে গিয়ে মরেছে।’
‘ফালতু কথা। পাত্তা লাগান ওই অফিসার মেরেছে। আপনি কদিন থাকুন, সব জেনে যাবেন। তার আগে ও নানকুকেও মেরেছে। নানকু অবশ্য ডাকাতি করত। মানুষের হাত পা কেটে দিত। ভালো ভালো মেয়েদের ধরে রেপ করত।’
‘নানকু লরির ধাক্কায় মরেছে।’
জ্যোতি চোখ ঠিকরায়, ‘আপনি থানায় নয়া এয়েছেন— জানেন না। আমাদের কাছে সব খবর আসে।’
লোকটা মদের বোতল খোলে। একসঙ্গে দু পেগ মদ ঢালে গেলাসে, সামান্য জল দেয়। ‘গুলাব তো তোদের এখানে এসে হুজ্জতি করত। মদনাকে মারধর করত। যখন খুশি মেয়ে তুলে নিয়ে চলে যেত, শুনেছি। একটা মেয়েকে ও বিয়ে করবে বলে, লাভ-টাভে ফাঁসিয়ে এখানে এনে মাসির কাছে দিয়েছিল। তার টাকাও নিত।’
লোকটার কথায় জ্যোতি চুপ করে থাকল। কী যেন ভাবল। দু হাত তুলে চুল ঠিক করল। এই কায়দাটা পুরনো, এরমভাবে চুল ঠিক করলে পুরুষগুলো হাঁ করে বুকের দিকে তাকিয়ে থাকে। তখন আর বেশিক্ষণ নড়নচড়ন করে না কাজের কথায় চলে আসে।
লোকটা বলল, ‘বাদ দে ওইসব কুত্তারবাচ্চাদের কথা।’
কথাটা শুনেই জ্যোতি হাসল, এই তো ওষুধ ধরেছে। ফালতু কথা বলতে চাইছে না, শুধু বল গুলাব মরেছে ভালো হয়েছে, না খারাপ হয়েছে?’
জ্যোতি ফিসফিস করল, ‘নানকু মরেছে ভালো হয়েছে। কিন্তু গুলাবকে মারবে কেন? ঠ্যাং খোঁড়া করে দিতে পারত?’
‘ঠ্যাং খোঁড়া হলে ওকে কে খাওয়াত—তুই?’
লোকটার কথায় জ্যোতি কঠিন মুখে তাকিয়ে থাকল। কিন্তু তারপরেই যেন গলে গেল, বলল, ‘তোমার ঠ্যাং ভাঙলে তুমি আমার কাছে চলে এসো, তোমাকেও আমি খাওয়াব।’
চারটে বিয়ার , চিলিচিকেন, শসা, আট পিস রুটি এল। সঙ্গে মদনা। বলল, ‘স্যার আর কিছু।’
‘না, ভাগ!’
লোকটা বলল, ‘দুটো বিয়ার খাবি, আর দুটো বিয়ার লুকিয়ে রেখে দে পরে খাবি। চারটে খেলে মরে যাবি। চিলিচিকেন রুটি খেয়ে নে।’
লোকটা দাঁত দিয়ে একটা বিয়ারের বোতলের মুখ খুলে দিল। আহা!
কতদিন পরে জ্যোতিকে কেউ এমন যত্ন করে বোতল খুলে দিল। দেখতে দেখতে সে একটা চিকেন তুলে মুখে দিয়েছে। আঙুল চুষছে। লোকটা বলল, ‘আজ আমার টোয়েন্টি ফাইভ ইয়ার্স ম্যারেজ অ্যানভারসারি। আজ তুই আমার গেস্ট। যা তোকে নেমন্তন্ন করে খাইয়ে দিলাম।’
‘তাই!’ জ্যোতি যেন নেচে উঠল। চিকেন চেবাতে চেবাতে বলল, ‘তা বউয়ের কাছে গিয়ে তো এই দিনটা পালতে হয়, কেউ কখনও মাগিবাড়ি এসে বিবাহবাষির্কী করে?’
লোকটার গেলাস শেষ। আবার গলগল করে মদ ঢাকল গেলাসে। ‘অবশ্য সিনেমায় দেখেছি ফুলশয্যার দিনেও বর বাঈজিবাড়ি যাচ্ছে। ও তো সিনেমায় হয়—। তা বউয়ের কাছে গেলে না কেন? বউ আছে, না গেছে?’
‘গেছে।’ লোকটা গেলাসে লম্বা চুমুক দিল। বলল, ‘নে, দুটো বাদাম খা।’
‘গেছে মানে? মরে গেছে, না ছেড়ে গেছে?’
‘বাদাম খা বলছি।’ লোকটা চাপা ধমক দেয়।
ধমক খেয়ে জ্যোতি ঠোঁট উলটায়। ‘চিকেন ছেড়ে বাদাম চিবাব!’ ও মুখ বিকৃত করল। ‘তুমি নাকি আগে ও বাড়ি গিয়েছিলে, ওখানে বিউটি কমলিকে দেখে পছন্দ হয়নি! আমার কাছে আসতে চেয়েছ?’
লোকটা ঘাড় নাড়ল।
‘কেন? তুমি তো এদিকে নয়া। আজই এসেছ শুনলাম। প্রথমদিন এসে মাগিবাড়ি এসেছ? আজ তো শুনলাম ফ্রি। টাকা দেবে না? টাকা নেই, না পুলিশ বলে—?’
‘কোন শালা বলল টাকা দেব না? আমি তোর টাকা দিয়ে যাব।’ লোকটা বেশ খিঁচিয়ে উঠল।
ফিক করে হাসল জ্যোতি, ‘তাহলে রোজ আসবে নাকি? এক ঘরে রোজ আসবে, না ঘর পালটাবে?’
লোকটা জ্যোতির দিকে তাকাল। বলল, ‘তুই যে পুলিশের জেরা করছিস?’
‘বাহ্‌ রে বাজিয়ে নেব না। তুমি আমার নাম বলে ঘরে এসেছ, তোমাকে তো দেখতে হবে একটু।’
‘রোজ আসব না। রাতে আমার কাজ থাকে। আজ বললাম না, আমার হ্যাপি ম্যারেজ আনভাসারি! বিবাহবাষির্কী!’
‘সেটা বউয়ের সঙ্গে করতে হয়, জ্যোতির সঙ্গে কেন? কার কাছে আমার নাম শুনলে? পবন হাবিলদারের কাছে? পবন হাবিলদার তো মাগিঘরে যায় না, তবে?
আমার নাম তোমাকে কে বলল?’
লোকটা ভ্রূ তুলে হুকুম করল, ‘বিয়ার খা।’
জ্যোতি আর একটা গেলাস বের করল, বলল, ‘তুমি তো সারারাত থাকবে। তালে একটু আরাম করেই খাই।’ লম্বা এক চুমুক বিয়ার খেয়ে জ্যোতি বলল, 
‘আমার নাম তোমাকে কে বলল?’
লোকটা বলল, ‘কী নাম বললি— বিউটি, কমলি আর একটার নাম বলল আয়েষা। নাহ্‌! আমার জ্যোতি চাই, আমি তোকে অর্ডার দিয়েছি। তারপর তো এই বাড়ি এলাম।’
‘সেটাই তো কেন এলে?’
‘তুই ভালো শুনলাম।’
সামান্য জল দিয়ে লোকটা অর্ধেকের বেশি মদ ঢোকে ঢোকে খেয়ে নিয়েছে। জ্যোতি লোকটার মদ ঢালার বহর দেখে বলল, ‘তুমি তো পুরো পাঁইট এখুনি খেয়ে নেবে। সারা রাত লড়বে কী করে?’ কথাটা বলে জ্যোতি খুব হাসল। ওর একজনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু বলল না। পুলিশের লোক আবার কী মনে করবে, তাই সে বলল না। 
সে-ও রাম খেত। বোতল পেলেই গব গব করে খেয়ে নিত। তারপর তার বিয়ারের বোতল ধরে টানাটানি করত। তার হুইস্কিও খেয়ে নিত। না দিলে চড় চাপড়া মারত। তুলকালাম করত। সারাবাড়ি হল্লামাচিয়ে দিত। দু দুবার খুকিমাসিকে ধাক্কা দিল। মদনাদাকে ফেলে লাথি মেরেছিল। জ্যোতি কতবার তাকে ধমকেছে। আর একটু জল নে। মরবি। জ্যোতি এখনও বলল, ‘এ হাবিলদারবাবু আর একটু জল নাও গেলাসে—।’
‘চাপ! আমি হবিলদার নই, অফিসার।’
‘অফিসার!’ খিলখিল করে হাসল জ্যোতি। এখনও ওর তার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। সে-ও একটু মাল খেলেই নিজেকে এখানকার এমএলএ কার্তিক সামন্ত ভাবত।
জ্যোতি হাসতে হাসতে লোকটার কাঁধে হাত রাখে। কাঁধে হাত পড়তেই লোকটা একটু নড়ে বসল। এবার সে একটা হাত রাখল জ্যোতির কোমরে। আর জ্যোতি ঠিকরে উঠল, কী মরণ! এ-ও দেখি কোমর নিয়ে পড়েছে!
লোকটা জ্যোতির কোমরে হাতের তালু ঘষছে। বহুত আচ্ছা!
জ্যোতি হাসতে হাসতে বলল, ‘কী হল বললে না অফিসারবাবু তোমাকে কে আমার কোমরের খবর দিল?’
ঢক করে মদটা গলায় ঢেলে বলল, ‘গুলাম! গুলাম তোর নাম বলল।’
মেয়েটা গেলাস তুলছিল মুখে। আটকে গেল। তারপর ঢকঢক করে পুরো গেলাস মেরে দিল। ফিসফিস করল, ‘তুমি গুলামকে চেনো? এক হারামি নয়া পুলিশ অফিসার এসেছে থানায়, সে-ই মেরে দিল ওকে। ওর কথাই তো বলছিলাম।’
লোকটা বলল, ’মারেনি, নালার পাঁকে গুলাম পড়ে মরে গেছে।’
‘ও তো সাজিয়েছে।’ জ্যোতি কাঁপা হাতে বিয়ারের গেলাস ভর্তি করে চোখ বন্ধ করে খেতে শুরু করল। শেষ করে হাতের উলটোদিক দিয়ে মুখ মুছল।
লোকটা বলল, ‘ওর নামে ছটা মার্ডার কেস আছে, জানিস?’
‘তো, আছে তো আছে। আমার কী?’
‘তোর কিছু নয়? ও ক্রিমিনাল!’
‘ওর কাম ধান্দায় ও কী করেছে আমার কী দরকার। আমাকে ও ভালোবাসে, ব্যাস।’
লোকটা হাসে। ‘তোকে ভালোবাসে?’ লোকটা হো হো করে হাসে, ‘শুনেছি, তোকে বিয়ে করবে বলে, লাভ করে বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল। বলেছিল, বিয়ে করবে। করেনি। এই মাসির কাছে রেন্ডিটোলায় তুলে দিয়েছে। তোকে ঠকিয়েছে।’
‘বেশ করেছে, আমাকে করেছে, তোদের ওই পুলিশ অফিসারের মেয়েকে কি গুলাম রেন্ডিটোলায় তুলে দিয়েছে?’
মদের গেলাসটা রেখে ঠাস করে একটা চড় মারে লোকটা। বলে, ‘একদম মেয়ে তুলে কথা বলবি না। আমার মেয়েকে করলে আমি ওর কপালে দানা ভরে দিতাম।’
চড়টা খেয়ে গালে হাত বোলায় জ্যোতি। দু চোখে আগুন। অনেকদিন পরে কেউ আবার তার গালে চড় মারল। সে ঝাড়া মেরে উঠে দ্রুত শাড়ি খোলে। পটাপট ব্লাউজের বোতাম খুলে, ব্রা খুলে লোকটার গায়ে ছুঁড়ে মারে। শায়ার দড়িতে হাত রেখে বলে, ‘আমি খুলব, না তুমি খুলে নেবে? কাজ করতে এসেছ—আগে কাজ করো। ফালতু বাত রাখো।’
লোকটা শাড়ি আর ব্লাউজটা মাটি থেকে তুলে ওর গায়ে ছুঁড়ে দিল। বলল, ‘বল শালি একটা খুনে ডাকাতকে কেন এত ভালোবাসিস?’
জ্যোতি শুয়ে পড়েছিল। শুয়ে শুয়ে হাত দিয়ে উরুর ওপর শায়াটা টেনে তোলার চেষ্টা করল, মুখ উঁচিয়ে বলল, ‘কাজ করতে এসেছ—আগে কাজ করো। যত ফালতু কথা। আগে এসো। আমার ঘুম পাচ্ছে।’
‘আগে আমার কথার জবাব দে।’ লোকটা ফুঁসে উঠে জ্যোতির শরীর ঢেকে পড়ে থাকা শাড়ি সুদ্ধু ওকে চেপে ধরল। বলল, ‘আগে বল কেন এত ভালোবাসিস?’
জ্যোতি লোকটার দিকে তাকিয়ে, বলল, ‘বলব? আগে বলো, চড় মারলে কেন?’
‘আমার মেয়ের কথা তুললি কেন?’
‘তোমার মেয়ে কেন বলব, আমি তো ওই নয়া অফিসারের মেয়েকে বললাম। তোমার কি মেয়ে আছে? তোমার সঙ্গে থাকে?’
‘না, ওর মা নিয়ে চলে গেছে?’
জ্যোতি মুখ দিগে চুক চুক আওয়াজ করল, ‘বাপের কাছে আসে না?’
‘না, ঘেন্না পায়। ওর মা ওকে শিখিয়েছে, আমি খুনি অফিসার, সুযোগ পেলেই মানুষ মারি। মায়ের মতোই আমাকে ও ঘেন্না করে।’
জ্যোতি স্থির চোখে লোকটার দিকে তাকাল। বলল, ‘তুমি গুলামকে মেরেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন?’
‘ক্রিমিনাল ছিল। ওর নামে ছটা মার্ডার কেস আছে।’
‘থানায় তো ওকে কতবার ধরেছিল।’
‘প্রমাণ করা যায়নি। ওপর থেকে অর্ডার ছিল। আমি না মারলে অন্য কেউ মারত।’
জ্যোতি শান্ত হয়ে শুয়ে থাকল। দাঁতে ঠোঁট চেপে।
লোকটা বলল, ‘তুই জানতিস ও ক্রিমিনাল, খুন করেছে, মার্ডার করেছে! তবু তুই গুলামকে ছাড়িসনি কেন?’
‘ওই যে তোমাকে আগেই বললাম— ভালোবাসি।’
‘আরে তোকে ও রেন্ডি বানিয়েছে।’
‌জ্যোতি কান্না চাপল, ‘বানাক, আমাকে বানিয়েছে। কিন্তু রেন্ডিকে ছেড়ে যায়নি। আমিও ছেড়ে দিইনি।’
‘ও ক্রিমিনাল ছটা মার্ডার!’ লোকটা ফুঁসে উঠল।
‘ওটা ওর কাম। তুমিও তো মানুষ মেরেছ, এটা তোমার কাম—।’
‘আমার কাজের জন্য আমার বউ মেয়ে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আর ওর মুখ যখন পাঁকে ঠেসে ধরেছিলাম, ও জ্যোতি জ্যোতি করে ডাকছিল।’
‘ও ভাবছিল, আমি থাকলে ঠিক ওকে বাঁচিয়ে দেব।’ জ্যোতি হাসল।
লোকটা জ্যোতিকে ছেড়ে ভারী শরীর নিয়ে দুমড়ে বিছানার ওপর শুয়ে পড়ল। জ্যোতি উঠল। হাত বাড়িয়ে ভরা বিয়ারের বোতলটা তুলে নিল, ভাবল, লোক মাথায় মারলে—। লোকটা মুখ ঢেকে যেন কাঁদছে। কাঁদছে কি, না গোঁগাচ্ছে। সে মারল না। বলল,
 ‘এ অফিসার, আমার বিয়ারের বোতল খুলে দাও। আজ হোল নাইট পার্টি হবে বললে— আজ তোমার বিবাহবাষির্কী, ওঠো।’

5 thoughts on “জয়ন্ত দে : বিবাহবাষির্কী

  • November 1, 2021 at 3:52 am
    Permalink

    অসাধারণ গল্প। ভালোবাসার উদযাপন !

    Reply
  • November 1, 2021 at 7:38 am
    Permalink

    দারুণ লাগলো, ভালোবাসার কাঙাল

    Reply
  • November 1, 2021 at 1:40 pm
    Permalink

    দারুন লাগল। একটা অজানা অচেনা জগৎ চোখের সামনে মুর্ত হচ্ছিল ।

    Reply
  • November 2, 2021 at 9:57 am
    Permalink

    অপূর্ব

    Reply
  • November 4, 2021 at 6:26 pm
    Permalink

    খুব ভালো লাগলো!

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.