ইউসুফ ইদ্রিসের গল্প: জীবনযুদ্ধ

অনুবাদঃ বেগম জাহান আরা

সে বেল বাজালে বদির দরজা খুলে দিলো। তার পরনে তখন ছিলো গ্যালাবিয়া-র ( এক ধরনের মিশরীয় ঢোলা পোশাক), ওপরে গোসল সেরে পরার একটা কোট। মাথায় সাদা উলের টুপি। আর তার ওপর পাগড়ির মতো করে একটা স্কার্ফ জড়ানো।
দরজা খুলে ফিরে গিয়ে বসতে বসতে বদির বললো, “ ওহ, আমার হাঁটু দুটো একেবারে ভেঙে আসছে। আমি নিশ্চিত যে, তুমি কোথাও ধরা খেয়েছিলে। কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
– “ কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম।”

– “পেলে কোনও কাজ?”

– “হ্যাঁ।”

– “কি কাজ?”

– “আমি প্রাইভেট পড়াতে যাচ্ছি।”

– “কোথায়?”

– “এখানে।”

অট্ট হাসিতে ফেটে পড়লো বদির। হাসির তোড়ে চেয়ার কাঁপতে লাগলো। যে পত্রিকাটা সে পড়ছিলো, কাঁপতে লাগলো সেটাও। এলোমেলো হয়ে যেতে থাকলো তার গায়ের গোসলের কোটটা পর্যন্ত।

– এখানে কোথায়, জানতে পারি কি?”

– এখানে, এই অ্যাপার্টমেন্টে।”

– ও, তবে তো খুব ভালো। তোমার রসবোধ আছে বলতে হয়। ওরা তাহলে তোমার সম্বন্ধে আজে বাজে ফজুল কথা বলে কেনো? … যাই হোক, রাতের খাবার খেয়েছো?

– খেতে ইচ্ছে করছে না, খিদে নেই।”

– আমি বিশ্বাস করি না। খেতে ইচ্ছে করে না, এমন ঘটনা তোমার জীবনে ঘটেনি। এটা ডাহা বানোয়াট। কি বলছো তুমি? খিদে নেই? খেতেই হবে তোমাকে রাতের খাবার।

এসো কিছু খাবে। তোমার সাথে কিছু কথাও বলতে চাই।”

 
এরপর হামজা আর বেশি আপত্তি করলো না। উপায়ও ছিলোনা, তাকে বসে রাতের খাবার খেতেই হলো।

বদির একটু গম্ভির ভাবে বললো, “ শোনো হামজা, অন্তর থেকে আমি তোমার কথা ভাবি। তুমি আমার ভাইয়ের মতো। আমরা দুজন পনরো বছরের বন্ধু এবং সহকর্মী। তাই আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই।”

– “কি বলতে চাও, বলোনা।”

– “হামজা, ভাই আমার, এবার স্থির হও। এই সবের শেষ করো। জীবনের যথেষ্ট সময় অপব্যয় করেছো। আর বেশি বাকি নেই। অধিকাংশ সময় শেষ করেই ফেলেছো। সারাজীবন কেবল দৌড়োলে। এবার ঠিক করো, কি করবে? আমার কথায় কিছু মনে করো না ভাই। বিষয়টা বুঝতে হবে তোমাকে। হয়তো আমার কথা রূঢ় শোনাচ্ছে, কিন্তু এটাই বাস্তব।”

একটু হেসে হামজা বললো, “ঠিকই বলেছো। আমার মা-ও ঠিক এই রকমই বলতো। কিন্তু সুস্থির হবো কেমন করে?”

– সুস্থির হও – কাজ করো, ঠিক কাজটা করো। বিয়ে করে সংসারি হও। বাড়ি হবে, পরিবার হবে। বাদ দাও ওসব। তোমার মতো শিক্ষিত মানুষের এরকম ভাবে জীবন কাটানো ঠিক নয়।”

– “কিন্তু আমার বর্তমান জীবন যাপন নিয়ে আমি সুখী।”

– “সুখী? কেমন করে?”

– “ আমার সুখী হওয়ার কারণ হলো এই যে, কোথায় এবং কেমন করে তুমি বেঁচে আছো তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কেনো তুমি বেঁচে আছো, অন্য মানুষের জন্য কি করছো, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

– “আমি বুঝলাম না। তুমি আমার সাথে তামাশা করছো ভাই। এসব কি বলছো?”

– “ঠিক আছে। অবশ্যই তুমি বুঝতে পারবে না আমার কথা। তোমার নিজের বউ বাচ্চা আছে, নিজের বাড়ি আছে, নিজের কাজ আছে। আমার কিন্তু একান্ত নিজস্ব কোনও জীবন নেই। আমি আমার সমস্ত জীবন মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেছি। ওদের প্রয়োজনে আমি ছুটে বেড়াই, আমি দৌড়োই … আমি জেলে যাই, আমি জেলে যাই… মরি। এই তো আমার জীবন।”

– “আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে তোমার বয়ান । ব্যাস কথা শেষ? তুমি তাহলে নবী হয়ে গিয়েছো, সাধু? এই পৃথিবীর কিছুই চাও না তুমি? কোনও উচ্চাকাঙ্খা নেই তোমার?”

– “সাধারণ লোকের চাওয়া পাওয়া আর আমার ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া একেবারে এক।”

– আহা, কি সুন্দর কথা! তাহলে কি আমি ধরে নিতে পারি যে, তুমি কোনও দিন বিয়ে করবেনা? কোনও দিন নিজের সংসার, বাড়ি গড়বে না?

– “নিশ্চয় আমি বিয়ে করবো, সন্তানাদিও নেবো। তবে আমার বিয়ে অবশ্যই আমার আদর্শের অনুগত হবে। শুধু সুখী জীবন যাপনের জন্য নয়। নিশ্চয় আমার বাড়িও হবে, যে বাড়িতে অবাধ আসা যাওয়া থাকবে সর্বসাধারণের।”

– “তার মানে তুমি সারা জীবন এই রকমই বাস্তুহারা ভবঘুরে থাকবে?

– একেবারেই না। আমাকে যা বাস্তুহারা বা ছিন্নমূল করেছে, তা কোটি কোটি মিশরীয়দেরও বাস্তুহারা করেছে। এবং এটা ঠিক যে, কোটি কোটি মানুষ এভাবে চিরদিন বাস্তুহারা বা ভবঘুরে থাকতে পারে না।”

বাদির অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, “হুম, ভালো। মনে হয়, আমার এসব কথার কোনও দাম নেই। বেশ ঠিক আছে, শুভরাত্রি।” গায়ের ওপর কাপড় টেনে নিয়ে বদির শুয়ে পড়লো এবং নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো অবিলম্বে।

 
হামজা ঘুমাতে পারলো না। একটু আগের কথাবার্তা তাকে মনে করিয়ে দিলো, সে আর বদির অনেক দূরের শুধু নয়, একেবারে আলাদা মানুষ। এই ঝলমলে অ্যাপার্টমেন্টে আসার পর থেকেই তার এমন মনে হয়েছিলো। এমন কি এখানে “জনতা” শব্দটা উচ্চারণ করাও অদ্ভুত মনে হলো। এই ঝাড়বাতি, মূল্যবান কার্পেট এবং ব্র্যান্ডেড আবাবপত্রের মাঝে এমন কথা বলা বড়োই বেমানান। তার ইচ্ছেগুলো মনের চোখে অনেকগুণ বড়ো হয়ে উঠেছিলো। তার মা, তার বাবা, সবার কথা বেশি করে মনে হলো। রেল কর্মী বাবার দুই ধারে সরু করে পাকানো বিশাল গোঁফ ছিলো। রেল ক্যাম্পই তাঁর শৈশব এবং কৈশোরের একমাত্র স্মৃতিচারণ ক্ষেত্র। কর্মকর্তারা এই ক্যাম্পগুলো রেল কর্মীদের জন্য তৈরি করেছিলো স্টেশনগুলোর মধ্যবর্তী স্থানে যাতে লাইন মেরামতির কাজে সুবিধে হয়। বদ্ধ ছোটো ঘুপচি এলাকায় বাস করতো রেল কর্মীরা। সবার সাথে সবার নিত্য মুখোমুখি দেখা হতো। দারিদ্র ছিলো তাদের নিত্যকার গোপন সঙ্গি। তারা জীবনের সংগ্রাম করতো একসাথে। কর্মীদের বউরা শুক্রবার সকালে একসাথে গোসল করতো আর রাতের নানা ঘটনা নিয়ে গর্বিত হয়ে গল্প করতো। কর্মীরা সেচ খালে একসাথে গোসল করতো স্ত্রী সঙ্গের পর পবিত্র হওয়ার জন্য। ক্যাম্পের জীবনে সকালটা ছিলো মহিলাদের দখলে। আবার সন্ধ্যায় হাঁস মুরগি হারিয়ে যাওয়া নিয়ে চলতো তুমুল বিরামহীন ঝগড়া। মহিলাদের টাকার একমাত্র উৎস ছিলো হাঁসের ডিম। আর পুরুষদের ছিলো হাতে বানানো সিগারেট। কিন্তু আসল টাকা পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে ঘুরতো অন্যহাতে। প্রত্যেক ক্যাম্পেই একটা করে নেকড়ের মতো ধূর্ত মানুষ থাকতো, যারা তাদের দাড়ি দেখিয়েই বউদের পেছনে লুকাতো। তারা জানতো না, কিন্তু ছেলেমেয়েরা এবং বউয়েরা তাদের জন্য সতর্ক থাকতো। প্রত্যেক ক্যাম্পেই একজন করে চিহ্নিত কৃপন থাকতো, যে লক্ষ লক্ষ টাকা জমাতো নিজের দেশের গাঁয়ে একখন্ড জমি কেনার জন্য। প্রত্যেক ক্যাম্পেই একজন করে ধার্মিক স্বপ্নদর্শি মানুষ থাকতো, পুরুষেরা যাকে নিয়ে ঠাট্টা করতো। আর মহিলারা তারই কাছ থেকে দোয়া চেয়ে নিতো। প্রত্যেক ক্যাম্পেই একজন করে সুন্দর বউ থাকতো, যাকে নিয়ে হিংসা বিদ্বেষ ঝগড়ার অন্ত থাকতো না। প্রতিবছর ডজন ডজন শিশুর জন্ম হতো ক্যাম্পে। লক্ষ লক্ষ মশা এবং কীট পতঙ্গের উৎপাত ছিলো। আর ছিলো সারা রাত কুকুরের ঘেউ ঘেউ। তারা যেন পাহারা দিতো দারিদ্র, পানির জগ এবং ক্ষীণজীবি মানুষগুলোকে।
 
প্রতিদিন কোনও না কোনও সমস্যা, ঝগড়া, চেঁচামেচি , কাড়াকাড়ি, ফোরম্যানের কর্তৃত্ব নিয়ে কথা কাটাকাটি, কর্মীদের দ্বারা কর্তৃত্ব কেড়ে নেয়ার চেষ্টা, বেতনের স্কেল নিয়ে কথা, বেতন না বাড়ার কথা, ইত্যাদি লেগেই থাকতো। মহিলারা গর্ভধারণের জন্য উন্মুখ থাকতো, পুরুষেরা ঋনের ধান্দায় থাকতো। কর্মীদের সম্পদ ছিলো মেরামত করা হলুদ প্যাণ্ট, লম্বা কাঠের ক্যাপ এবং পায়ে মিশরীয় সৈনিকদের পরিত্যক্ত ভারি বুট। রেলের হুইসেল আসে যায়। কোনও কিশোরী জানালা খুলে রেল দেখে, চিন্তা করে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে, স্থানীয় কোনো শহর এবং তাঁর শিক্ষিত মানুষের স্বপ্ন দেখে, এবং তিনটে সোনার পাতের চুড়ির কথা ভাবে।
 
প্রত্যেকদিন সমস্যা, ঝগড়া চেঁচামেচি, কাড়াকাড়ি তো লেগে থাকার পরও, দিন শেষে সূর্য ডোবার পর চুলোর ধোঁয়া বন্ধ হয়ে গেলে এবং রেলের ধোঁয়া বন্ধ হয়ে গেলে মানুষগুলো বাড়ি ফেরে। কি শীত কি গ্রীষ্ম তারা এসে জমা হয় বাড়ির সামনে। সেখানে নিচু টেবিল পাতা থাকে। তাঁর চারপাশে মানুষেরা গোল হয়ে বসে। রাতের খাবার শুরু হতেই শেষ হয়ে যায়। তারপর আয়াস করে। কখনও স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কিছু ভালো মন্দ কথা বার্তা হয়। তাদের চোখ তখন ঘুমে ভারি। হতাশার চেয়ে আশার কথাই তারা তখন বলে। স্ত্রীরা অস্থির থাকে, স্বামীরা থাকে শান্ত। মহিলারা শঙ্কিত থাকে, পুরুষরা আশ্বাস দেয়। স্ত্রীরা হাঁই তোলে, স্বামীরা ক্লান্ত স্বরে বলে, “কাল সকালে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
 
হামজা এবং অন্য ছেলেমেয়েদের জন্য দিনটা আসতো তাদেরই জন্য। তারা দৌড়াদৌড়ি করতো, লাফালাফি করতো, সেচ খালের পানিতে সাঁতার কাটতো। তারা রেলে লাইনের পাতগুলো গুনতো, একটা লাইনের ওপর দিয়ে হাঁটতো, নুড়ি কুড়িয়ে চকমকি খেলতো। বাবাদের অনুকরণ করে চড়ুই শিকার করতো গুলাল এবং ছোটো ছোটো পাথর ছুঁড়ে। তাদের সবচেয়ে ভালো খেলা ছিলো, লোহার কাঁটা রেল লাইনের ওপর রেখে অপেক্ষা করা রেলের জন্য। রেলের চাকার চাপে সেটা সমান হয়ে পাতলা এবং চাকুর মতো ধারালো হতো। রেল লাইনের দুধারে ক্যাকটাস ঝোপে এক ধরনের ফল ( অপুনিয়া ) হতো অনেক। মৌসুমে বহু মানুষ সেটা কেটে নিতে যেতো। রেল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ব্যাবসায়িরাও যেতো সেই ফল কাটতে এবং তারা পাহারা দিতো যেন অন্যেরা ফল কেটে নিতে না পারে।
 
তার মতো ছেলেমেয়েরাও সবাই অসুস্থ থাকতো ‘বিলহাজারিয়া’ (রক্তে বীজাণু ঘটিত অসুখ), পেটে হুক ওয়ার্ম, হাম, মালেরিয়া এবং চোখের অসুখে। তাদের মধ্যে কারও জন্ডিস এবং প্লীহার অসুখ থাকতো। ওদের গায়ের স্বাভাবিক রং কোনও দিন ফিরে আসতো না।
 
তার ওপর আছে শেখ জিদান কোরানিক স্কুলের বাধ্যতামূলক পড়া এবং কড়া পিটুনি। প্রাথমিক স্কুলে প্রথম সে ইউনিফরম পায়, তার সাথে পায় গাঢ় বিশ্রি রঙের ফেজ টুপি। শতকরা ৮৫% নম্বর পেয়ে সে পাস করে এবং মাধ্যমিকে ফ্রি পড়ার যোগ্য হয়। তার বাবা আনন্দিত হয়। কিন্তু মা চাইলো, সে ব্যাবসা শিখুক, আর পড়ার দরকার নেই। তার বাবা চাইলো, সে একজন ইঞ্জিনিয়র হবে এবং রেল কোম্পানিতে কাজ করবে তার বসের বসের বসের বসের মতো। মা তার বাবার হিংসাত্মক প্রতিযোগিতা প্রতিরোধ করার জন্য তুকতাক জাদুমন্ত্রও প্রয়োগ করেছিলো। বাবা তাঁর শতছিন্ন প্যাণ্ট দেখিয়ে বলেছিলো, “নিজেকে উন্নত শ্রেণি মর্যাদার মানুষ হিসেবে গড়ে তোলো। নইলে এই রকম শতছিন্ন প্যাণ্টই জুটবে তোমার কপালে।” এবং সে উন্নত হয়েছিলো। 
 
মাধ্যমিক সার্টিফিকেটের পর দুর্যোগটা নেমে এলো। বহুদুরে আলেকজান্দ্রিয়ায় নির্বাসনের সময় মাত্র এক পাউন্ড বা পঞ্চাশ পিয়াস্তারের জন্য হামজাকে প্রচন্ড বেদনাময় সংগ্রাম করতে হয়েছে। এই ভাবে এক বছর কেটে গেলো। আরও তিন বছর কাটাতে হবে। সে প্রার্থনা করতো, ‘ও দয়াময়, আমার জন্য সব কিছু সহজ করে দাও।’ কিন্তু এরই মধ্যে তার কিছু বদ অভ্যেস গড়ে উঠেছিলো। মানুষকে খুঁচিয়ে জ্বালাতন করতো, তাসের জুয়া খেলতো, মদ খেতো, কসাইখানার মাংসের ওপর লাল ছাপের মতো টকটকে লাল লিপস্টিক দেয়া কোঁকড়া চুলের মহিলাদের পেছনে ঘুরতো। বাবার কাছে মিথ্যে কথা বলতো। বন্ধুদের ঠকাতো। এক বছর সে ফেল করলো। বাবার কাছে গোপন করলো সেই কথা। তার বাবার ধারণা, মেধাবী ছাত্র হিসেবে নিশ্চয় সে পাশ করেছে। কিন্তু না। প্রতারিত হলো বাবা এবং মর্মে মর্মে মরে গেলো।
 
তার বাবা আর পেরে উঠছিলো না। হামজার চাহিদা তার গলা চেপে ধরেছিলো। তার মা মাথার স্কার্ফে নকশা করতে শিখেছিলো। সংসারটাকে টিকিয়ে রেখেছিলো সেইটুকু আয়। এমন কি ফোরম্যান প্রতিমাসে পঞ্চাশ পিয়েস্তার দিতো। তার বাবা হামজার ছোটো ভাইকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিলো, যেন হামজার লেখা পড়াটা অন্তত চালানো যায়। কারণ সে বড়ো এবং প্রায় রোজগারের উপযুক্ত হয়ে আসছে। ৬ মার্চ শুরু হলো মিছিল, কমিটি এবং সম্মেলন। সেই সময় তার ভাই শান্টিং ইয়ারডে কাজ করতো। একদিন সকালে রেলের চাকার নিচে পড়ে তার তার পা কাটা গেলো। ছয় মাস মিউনিসিপ্যাল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সে আবার কাজে ফিরে এলো এক-পা নিয়ে। রেল ক্রসিঙের জায়গায় পাহারাদারের চাকরিতে বহাল হলো সে।
 
হামজা গ্র্যাজুয়েট হয়ে একটা কারখানায় চাকরি শুরু করলো। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে সে খবরের কাগজ ছাপালো ইউনিয়নের সংবাদ দিয়ে। রাজনীতিতে মিশে গেলো সে। তাঁর জীবন হয়ে উঠলো রাজনীতি। সারাক্ষণ বেকার সমস্যা নিয়ে মিটিং এবং আলোচনা এই সব নিয়ে থাকতো। রাজনৈতিক পুলিশ তাকে চিহ্নিত করেছিলো। তার প্রথম সাজা হয়েছিলো মিথ্যে অভিযোগে। সে হয়ে পড়েছিলো আটচল্লিশ নম্বর নজরবন্দি মানুষ। তারপর আল-তুর, হাইকসটেপ এবং আলেকজান্দ্রিয়া বিদেশি জেলেও বিশ মাস কাটাতে হয়েছিলো তাকে। তারপর ছাড়া পেয়েছিলো। কিন্তু মিশরে যখনই কোনও বৃটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আসতো, তখন বন্দি করা হতো তাকে। এছাড়াও প্রত্যেক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানাদির সময় দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ তাকে আটক রাখা হতো পুলিশ স্টেশনে। বিষয়টা এমন হলো যে,বছরের শুরুতেই সে হিসেব করতে পারতো , বছরের কোন কোন সরকারি ছুটির দিনে সে আবার কোনো না কোনো অভিযোগে পুলিশ স্টেশনে আসবে।
 
সম্পদ বলতে গ্র্যাজুয়েশনের সময় তৈরি করা একটা মাত্র স্যুট ছিলো তার। ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টার থেকে এক পাউন্ড দিয়ে একটা চশমা কিনেছিলো। আর ছিলো পুরনো একজোড়া জুতো। কখনও সে বাবার কাছে টাকা পাঠাতো। কিন্তু মায়ের চাহিদা সত্বেও তাকে এক জোড়া কালো স্যান্ডেল কিনে দিতে পারেনি। তার মা তখনও স্কার্ফে নকশা সেলাই করতো। বাবা বুড়ো হয়ে গিয়েছিলো। সাদা হয়ে গিয়েছিলো তার গোঁফ। ফোরম্যানের চাকরিটা আর ছিলো না। খোঁড়া ছোটো ভাই তখনও রেল আসা যাওয়ার সময় গেট খুলতো এবং বন্ধ করতো। বোন নাবাবিয়ার তখনও বিয়ে হয়নি। এই অবস্থায় তারা অন্য ক্যাম্পে চলে গেলো।
 
মা তার সন্তানের সুমতির জন্য প্রার্থনা করতো নিয়ত। আর বাবা মানুষদেরকে বলতো তার নিজের শোষণ বঞ্চনার কথা এবং শাপ শাপান্ত করতো সরকার ও রেল কর্তৃপক্ষকে। চারপাশের সমস্ত ব্যাপারটাই তার কাছে বীরত্বের গাথা হয়ে উঠেছিলো, যখন একটা রেল যাওয়ার পর ছোটো ছেলেমেয়েরা বলতো, “ ঐ রেল হামজার কাছে যাচ্ছে ।”

– “তুমি কি ঘুমাবে না হামজা?”

– ” হ্যাঁ বদির, এখনই ঘুমাবো আমি ।”

 
—————–
মূলগল্প: ‘সিটি অফ লাভ এন্ড অ্যাশেজ’, লেখক ইউসুফ ইদ্রিস
 
 
লেখক পরিচিতি: ইউসুফ ইদ্রিস, মিশরীয় লেখক। জন্মঃ ১৯ শে মে, আল বায়রুম, মিশর; ১৯২৭; মৃত্যুঃ ১ আগস্ট, ১৯৯১নিবেদিতপ্রাণ বামপন্থী এই লেখক ডাক্তারি পড়েছেন কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে। পেশাগত জীবন শুরু হওয়ার পর তিনি সাহিত্যচর্চায় ব্রতী হন। প্রথমে তিনি গামাল আব্দেল নাসেরকে সমর্থন করেছেন। পরে নাসেরের সমালোচনা করার জন্য ১৯৫৪ সালে তাঁকে কারা বরণ করতে হয়েছে।

তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ, আল হারাম ( নিষিদ্ধ ), এবং আল-আইব ( পাপ )। লেখকের প্রধান বৈশিষ্ট হলো, ক্লাসিক্যাল আরবির সাথে চলিত মৌখিক আরবির মিশ্রনে সাহিত্য রচনা করা।

ইংরেজি অনুবাদক: নীল হেবিসন একজন লেখক, সম্পাদক এবং অনুবাদক। জন্ম এবং শিক্ষা ইংল্যান্ডে। স্বেচ্ছাসেবায় মিশরের ফাইয়োমে ইংলিশ পড়াতে গিয়েছিলেন। ইন্টারন্যাশনাল স্কুল হাউসে ৪ বছর ইংলিশ পড়ান। ১৯৮৬ সালে কায়রো-র আমেরিকান ইউনিভার্সিটি প্রেসে সহযোগি সম্পাদক হিসেবে কাজে যোগ দেন এবং ২০১৭ পর্যন্ত কাজ করেন।। মিশরেই তিনি রপ্ত করেন আরবি ভাষা।

বিখ্যাত আরবি উপন্যাস “সিটি অব লাভ এন্ড অ্যাশেজ” এবং “ওয়েডিং নাইট” ইংলিশে অনুবাদ করে খ্যাতি পান । 

 

বাংলা অনুবাদক পরিচিতি:

বেগম জাহান আরা
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গল্পকার। অনুবাদক
বর্তমানে বাংলাদেশে থাকেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=