সুচরিত চৌধুরীর গল্প : স্বাতীর চিঠি

স্বাতী সেনের চিঠিখানা যতোবার পড়ি ততোবারই ডুবসাঁতারে গিয়ে ভেসে উঠি পনেরো বছর আগেকার সেই কৈশোরিক দিনগুলির ডাঙ্গায় ।
এধারে ঝাউয়ের পংক্তি, ওধারে সাদা রাস্তা, মাঝখানে ঢালু মাঠ। বিকেলের কামরাঙা রোদ চুলে জড়িয়ে স্বাতী সেন এসে দাঁড়াতো দাড়িবান্ধা খেলার লাইনের পাশে।
বলতাম—‘স্বাতীদি, খেলবি আয়’।
আসতো না, শুধু দেখতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
সবার চোখে আকাশের তারার মতো জিজ্ঞাসা ছিলো এই স্বাতী সেন। খেলে না, ছুটোছুটি করে না, কথা বলে কম। যা বলে তা কেমন যেন রঙডোবা ভাসা ভাসা ।
একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম—‘স্বাতীদি, তোর নামের মানেটা কি?’
— “আকাশের তারা!’
— ‘তাই বুঝি সারাক্ষণ মিট মিট করে জ্বলে যাস?’
কথা ফুটতো না ওর ঠোঁট থেকে। চোখ দুটি মেলে ধরে চেয়ে থাকতো শুধু,–কাজলা কাজলা, এপারে ছায়া ওপারে সন্ধ্যা মাঝনদীতে যেন ভাসমান এক জোড়া নৌকো।
কালো কালির কচঙ্গনে স্বাতী সেনের রূপের সাজন ব্যাখ্যা করা যায় না। আজ যদি ঝাউতলার সেই খয়েরী দালানের ছাদে এসে দাঁড়াতো সে, তবে বলতাম—‘দেখুন, দেখুন, স্বাতীদিকে দেখুন।’ দেখতেন,–স্বাতীদি দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে, শেষরাতের ষ্টেশনের মতো, অথবা ছিটিয়ে ছড়িয়ে আছে বিকেলের পাতলা রোদের মতো—যার আড়ালে সুপ্ত থাকে সন্ধ্যা, একটু একটু ছাইরঙ মিশিয়ে যে মেরে ফেলে দিনকে। হয়তো বা কিছুই দেখতে পেতেন না, শুধু শুনতেন তার হাজার হাজার চুলের শব্দ।
ওই চুলই ছিলো স্বাতী সেনের অঙ্গরাগ।
কতোই বা বয়স হবে তখন, হয়তো চৌদ্দ—তবু মনে হতো কুড়িটি শীত বর্ষাকে যেন ঘুম পাড়িয়ে রেখে চলে গেছে স্বাতী সেন ।
বাড়ন্ত চুলগুলি যখন কটি পর্যন্ত নেমে গেলো তখন সে হয়ে গেলো এক অজানা নারী।
কিন্তু আমার কাছে তার কিছুই অজানা ছিলো না, আমি যে ওর অন্তরতম সখা—একটা টিয়া পাখির মতো। আমায় সে সব কথা খুলে বলতো, বলতো তাও আবার দিব্যি করিয়ে, যেন কোনোদিন কাউকে না বলি।
বলতাম—‘তুমি যা বলেছে তা সব ভুলে গেছি।’
হেসে, তাও আবার একটুখানি হেসে বলতো স্বাতীদি-‘ভুলে যাস বলেই তো তোকে সব কথা বলি।’
আশ্চর্য! কেন যে বলে, কেন যে শুনি, তার রহস্য ছিলো অজ্ঞাত। পরে বুঝেছিলাম ওর চুলই ছিলো এর একমাত্র কারণ।
–‘‘জানিস, কাল দুপুরে কে যেন এসে আমার চুলগুলিকে এলোমেলো করে দিয়েছিলো। মনে হচ্ছিলো—’
এই অবধি বলেই স্বাতীদি চুপ।
–‘এই অবধি স্বাতীদি, কি মনে হচ্ছিলো বল্ না!’ বলেই ওর বিসর্পিল চুলগুলিকে আঁকড়ে ধরি।
–‘আঃ! বলছি, বলছি–ছাড় দিকিন।’ দু’হাতে চুলের গোছা গলার একপাশে সরিয়ে দিয়ে ফিসফিসে স্বরে বলেছিলো—‘সে।’
–‘সে? সে আবার কে?’ আমার চোখে রাতের কুয়াশা।
কিছু না বলে স্বাতীদি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো গাছ পাতার ওপর নেমে আসা গোলাপী সন্ধ্যার দিকে।
তারপর বলেছিলো—‘তাকে তুই চিনবিনে।‘
–‘চিনি না চিনি সে পরের কথা। আগে বল্।’
— ‘না। আমি বলতে পারবো না।’
শত আবদারেও সেদিন স্বাতীদির মন টলেনি। একটা বিমূর্ত মন যেন তার মাঝে ঢাকা পড়েছিলো, আর ওই দিকেই আমার অন্বিষ্ট মন ছুটে গিয়েছিলো বার বার। শেষে অভিমানের প্রলেপ মেখে বলেছিলাম—‘সব কথা উজোর করে দিলি, অথচ আসল কথাটা রেখে দিলি নিজের কাছে। না, শুনতে চাইনে।’
মেঘ ছায়ার মতো সরতে সরতে চলে যাচ্ছিলাম, পেছন থেকে হাওয়ার দোলা পাতার স্বরের মতো স্বাতীদির গলার স্বর উঠেছিলো কেঁপে—’শোন, বলছি শোন্।’
সে-স্বাতীদির সে। তার মতো এমন প্রেমিক পুরুষ নাকি স্বাতীদি কখনো দেখেনি। একদিন ভোরে বেড়াতে গিয়ে দুই পাহাড়ের মাঝপথে দেখা হয়েছিলো দু’জনের। শীত শীত ভোর, ধোঁয়াটে খোয়াই, আর কেউ ছিলো না সেদিন। ছিলো থরে থরে সাজানো পলাশ গাছ, নিচে অজস্র ফুল–যেন কস্তা রঙের থমকানো মেঘ।
স্বাতীদির মুখ থেকে এসব কথার কারুরঙ যা সুন্দর করে ফুটে উঠতো, তা শুনে চোখের সমুখে বিস্পষ্ট হোতো একটা জলরঙা ছবি।
নাম জিজ্ঞেস করতেই স্বাতীদি গম্ভীর। বলেছিলো—‘নাম আমি বলবো না।”
– ‘নাইবা বললি। ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দে।’
–‘না।’
সব উৎসাহ সেদিন এক ফুঁয়ে নিভে গিয়েছিলো। রাগ করে চলে এসেছিলাম।
তারপর স্বাতীদির সাথে আর দেখা নেই। পরীক্ষার আগে ঘর থেকে বেরোতাম না, পরে চলে গিয়েছিলাম দেশে। সেখানে জলডোবা ধানে, ঘুঘু পায়রার আসরে, পুকুরের আয়নাজলে–শহর, স্বাতী যেন, খেলার মাঠ, স্কুল সব ভুলে গিয়েছিলাম।
সব ভুলে হয়ে গিয়েছিলাম জলকাদা মাখা একখানা ডিঙ্গি।
হঠাৎ স্বাতী সেনের চিঠি গিয়ে হাজির।
লিখেছিলো…তুই এমন চালা ছেলে, কিন্তু সামান্য এক নামের জন্যে বোকামী করে ফেললি। নাম জেনে যদি তোর মন ভরে, তবে তার নাম হলো ‘পলাশ সেন’। এবার পরিচয়ের পালা–এই কাজটি তোর। রঙের নাম জানিয়ে দিলাম, দেখে নিবি তুই। জেনে রাখিস–মেয়েরা জানাতে পারে, দেখাতে পারে না।’
এই চিঠি পেয়ে মনের দেয়ালীতে স্বাতী সেনের বিশিখা প্রদীপ জ্বলে উঠেছিলো তার চুলেরই মতো।
তারপর স্বাতী সেনের দিনগুলি ছিলো সবুজ সোনায় মোড়া। সে তখন প্রেমিকা নারী।
একদিন বলতো—‘কাল তুই ছাদ থেকে চলে যাবার পর পলাশ সেন এসে দাঁড়িয়েছিলো ওই ঝাউ গাছটার ছায়ায়।’
আরেকদিন বলতো—‘সে বলে কি জানিস! বলে,—আমার চুলে নাকি আগুন। আছে।’
এমনি দিনে দিনে পালশ সেনকে নিয়ে কতো কথা, কতো রঙ সে ছড়িয়ে দিতো আমার বিলোল চোখে। আর তার পরিণামে ম্যাট্রিকে ফেল্‌ হয়ে গিয়েছিলো স্বাতী সেন।
তার বাবা ভীষণ চটে গিয়েছিলেন।
গাছপড়া শব্দের মতো চিৎকার ছেড়ে বলেছিলেন—’ছাত, ছাত, ছাত। শুধু ছাত। মায়ের ষোলো আনা বাতিক পেয়েছে হতচ্ছাড়া মেয়ে। কি এক বিদঘুটে নাম রেখে উনি গেলেন স্বর্গে— স্বাতী, তারা না ছাই। নাঃ! এ মেয়েকে বিয়ে দিয়ে না দিলে একদিন তারার মতোই খসে পড়বে।’
যেমন বলা তেমন কাজ।
সাথে সাথে বর ঠিক হয়ে গেলো। নাম শুনে আমি মহাখুশি—পলাশ সেন।
শুভদৃষ্টির কালে সবাই জেনেছিলো এই-ই ওদের প্রথম দেখা। কিন্তু এর আগে কতো দৃষ্টি দু’জনার চোখে বিনিময় হয়ে গিয়েছিলো—তা কেউ জানতো না, জানতাম শুধু আমি।
ভোর-সকালে বাপের ভিটে ছেড়ে চলে যাবার সময় স্বাতীদির সে কি কান্না।
তা শুনে সেদিন মনে হয়েছিলো—স্বাতীদির মতো বোকা মেয়ে পৃথিবীতে নেই। পরে বুঝেছিলাম, ওই কান্নাই হোলো মেয়েদের প্রথম সন্তাপ—জন্ম থেকে জন্মান্তরে যাবার চেতনার মতো।
গাড়িতে বসে অবগুণ্ঠনের ছায়া থেকে চোখ মেলে স্বাতীদি কি যেন আমাকে বলতে চেয়েছিলো—বলা হয়নি। চাকা ঘুরে গিয়েছিলো ধুলো উড়িয়ে।
তারপর সেই চিরাচরিত প্রবচনের মতো দু’জন দু’দিকে খসে পড়ে গিয়েছিলাম।
অতীতের সব কথা আমাদের মনে থাকে না, থাকে শুধু তার আভাসটুকু; তেমনি বছর পেরিয়ে বছরের শেষে স্বাতী সেনের অবয়ব মুছে গিয়ে তার চুলগুলির নরম স্পর্শই শুধু আমি অনুভব করতাম। কেমন আছে। মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করতো। ইচ্ছে করতো ছুটে গিয়ে তার চুলগুলি আঁকড়ে ধরে বলি…’চল স্বাতীদি, আমরা আবার ছোট হয়ে যাই।’
কিন্তু তা হবার উপায় নেই। বুড়ো পৃথিবীটা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলছে—‘আয়, চলে আয়।’
এবার স্বাতী সেনের গল্প আসছে ফুরিয়ে।
আগেই ফুরোতো—যদি তার চিঠিখানা এসে না পৌঁছতো হাতে। এলো, তাও আবার পনেরো বছর পরে।
লিখেছে,..‘আমার সে—যার নাম তোকে একদিন চিঠিতে লিখে জানিয়েছিলাম। সে পলাশ সেন নয়, অন্য নাম তার। কিন্তু কি আশ্চর্য দেখ—যে আমাকে বিয়ে করলো তার নামও মিলে গেলো হুবহু। ভাবলি, তোর কাছে স্বাতীদির আর কিছুই গোপন রইলো না। তুই একটা আস্ত বোকা, বুঝলি না কিছুই! মিথ্যেটা সত্য হয়ে গেলো, সত্যটা পড়লো ঢাকা। সময় পেলে একবার আসিস্। ঠিকানা দিলাম।’
সাথে সাথে রওনা হয়ে গেলাম।
শহরের হৈ চৈ ঠেলে নৌকা ঘাটে, সেখান থেকে ভাসতে ভাসতে কর্ণফুলীর জলে, চর, ব্রিজ পেরিয়ে খেলাঘাটের মুখে।
নৌকোর গলুইয়ে হেলান দিয়ে ভাবছিলাম–দেখা হলে বলবো—‘স্বাতীদি, তুমি এতো রহস্য জানো?’ স্বাতীদি তার নীরব তারার মতো দৃষ্টি মেলে বলবে—‘তুই আমার গোপন কথা ছড়িয়ে দিতে চাস্? না, আমি তা হতে দেবো না।’ বলবো–স্বাতীদি, তুমি আমায় বিশ্বাস করো, কাউকে বলবো না। বলো, বলো স্বাতীদি সে কে?’ শত আবদারেও স্বাতীদির মন ভিজবে না।
ভাবতে ভাবতে নদীর জলে আঙুল ডুবিয়ে জিজ্ঞেস করি কর্ণফুলীকে—‘স্বাতীদির সে—তাকে তুমি চেনো?’
জলজল স্বর আসে ভেসে—‘না।’
খেয়া ঘাটে এসে মাঝির হাঁকে চমক খাই।
ঘাট থেকে উঠে পথ ভেঙ্গে যখন স্বাতীদির শ্বশুর বাড়ির সামনের পুকুরের ধারে গিয়ে দাঁড়াই, তখন সন্ধ্যা হয় হয়।
দেখি, স্বাতীদি বসে আছে শান বাঁধা ঘাটে।
দিনের মরা আলোয় জলে ছাইরঙা ছায়া পড়েছে আকাশের– ঘোমটাহীনা স্বাতীদি বসে বসে কি যেন ভাবছে।
–‘এই স্বাতীদি।’
চমকে মুখ ফিরালো স্বাতীদি, ঠিক পনেরো বছর আগেকার ভঙ্গিতে। কিন্তু কোনো কথা না বলে অস্পষ্ট ছায়ার মতো ঘাট থেকে উঠে চলে গেলো।
ভাবলাম, রাগ করেছে।
বাড়িতে গিয়ে হাঁক দিলাম। পলাশ বাবু এলেন বেরিয়ে। নাম শুনে বলে উঠলেন—‘আরে তুমি! এসো, এসো ভেতরে এসো।’
একেবারে শোবার ঘরে নিয়ে বসালেন আমায়। কি বলি কি বলি উশখুশ করে শেষে জিজ্ঞেস করলাম—‘স্বাতীদি কেমন আছে?’
–‘আগে বিশ্রাম করো, সরবত খাও, তাল পাতার হাওয়া খাও—তারপর তোমার স্বাতীদির প্রসঙ্গ। নাও, পাঞ্জাবীটা খুলে ফেলো দেখি । ওরে বাবা, কি যে গরম! কে যেন চিতা জ্বেলেছে আবার।’
বাইরে থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো—‘পলাশদা, তোমার পাশার দান হা করে বসে আছে।’
–‘আসছি, আসছি। এই কে আছিস্! একটা পাখা দিয়ে যা।’
বলেই হারিকেন নিয়ে চলে গেলেন পলাশবাবু।
আমি তখন অন্ধকারে।
এলো স্বাতীদি। হাতে প্রদীপ। ঘরে ঢুকতেই আলো নিভে গেলো।
–‘স্বাতীদি, তুমি রাগ করবে জানতাম। কিন্তু আমার কি দোষ বলো! অনেকদিন পরই তো তোমার চিঠি পেলাম!’
স্বাতীদি নীরব।
অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে হয়তো চলেই গেলো।
কিছুক্ষণ পর পলাশবাবু আবার এসে হাজির।
বললেন—’ইস, কি ভুলো মন আমার। তোমাকে অন্ধকারে ফেলে চলে গিয়েছিলাম। আসল কথা কি জানো ভায়া! জীবনের পাশা খেলায় যারা হারে তারা পাশা খেলায় মেতে গিয়ে আর সব ভুলে যায়।’
তারপর হারিকেনটা তুলে ধরে বাইরের দিকে যেতে ইঙ্গিত করে বললেন–“তোমার স্বাতীদিকে দেখবে চলো। ওদিকে আবার দান মেরে চলে এসেছি, জানি এবারও হেরে যাবো।’
ভেতরের উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘর, তার পেছনে ছোট্ট একটি পুকুর, কিছুদূরে হাত দেখিয়ে বললেন পলাশ বাবু—‘ওই তোমার স্বাতীদি।’
আমায় একা রেখে পলাশবাবু চলে গেলেন।
দেখলাম—একটা পলাশগাছ দাঁড়িয়ে আছে, তার নিচে জ্বলছে নিবু নিবু প্রদীপ।

5 thoughts on “সুচরিত চৌধুরীর গল্প : স্বাতীর চিঠি

  • January 8, 2022 at 9:43 am
    Permalink

    এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    Reply
  • January 8, 2022 at 9:43 am
    Permalink

    এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    Reply
  • January 14, 2022 at 7:45 am
    Permalink

    ভাল লেগেছে

    Reply
  • January 17, 2022 at 11:22 am
    Permalink

    অসামান্য গল্প।

    Reply
  • January 31, 2022 at 12:36 pm
    Permalink

    ভালো লাগলো।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.