নাগিব মাহফুজের গল্প: ‘যাই’ বলে যাওয়ার সেই দিন

 
  অনুবাদ: রঞ্জনা ব্যানার্জী

জীবন তার আপন গতিতেই চলছিল যেন কোথাও কিছুই বদলায় নি । প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব গোপনীয়তাকে নিজের ভেতরেই আগলে রাখে। আমিই একমাত্র নজির নই নিশ্চয়। যদি এই ভেতরের ‘আমি’ স্বরূপে প্রকাশিত হতো তবে অপরাধ এবং বীরত্বগাথায় এই দুনিয়াও সয়লাব হয়ে যেত। আমার বেলায় আমার দুর্বিনীত তাড়নাই এই দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে। এখন এই বিদায়ী সফরে বেরিয়ে পড়া ছাড়া আমার আর কিছুই করবার নেই। জীবনের এই মোড়ে দাঁড়িয়ে আমার আবেগ বাধ মানছে না, স্মৃতিরা যেন নতুন করে জন্ম নিচ্ছে। এ এক ভয়াবহ সঙ্কট! যেভাবেই হোক একে আমায় নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে নতুবা বিদায়বেলার মুহূর্তগুলোর কোনো অর্থই রইবে না আর। দু’চোখ ভরে উপভোগ করা যাক যতটা দেখা যায়, বিরতিহীন চলুক পা জোড়া, কেননা এই পথের প্রতিকোণেই ছড়িয়ে আছে ভুলে যাওয়া আনন্দ-ক্ষণ- সেইসব সুখস্মৃতি জেগে উঠুক মনে। কী চরম আঘাতই না ছিল সেটি! তিক্ততা, ক্রোধ, ঘৃণার যেন চুড়ান্ত প্রকাশ! আমি সাত-পাঁচ না ভেবেই ঝাঁপ দিয়েছিলাম। যে জীবন তেমন একটা অসহনীয় ছিল না আজ সেটিও হাওয়ায় মিলিয়ে গেল! মনকে বলি দেখ এবং মনে রাখো, আনন্দিত হও, অতঃপর বিষণ্ন হও। যুক্তিযুক্ত কারণেই হিসেব মেলানোর সময় নেই আর, দেবদূত পিশাচ বনে গেছে। সামান্য পঁচন থেকে কতবার যে সমস্ত উৎকর্ষ আক্রান্ত হয়! আমার হৃদয় থেকে সকল ভালোবাসা উপড়ে সেটিকে নিরেট পাথর বানানো হয়েছিল। অবশিষ্ট এই সময়টুকুর স্বার্থেই সেইসব ভুলে থাকা যাক। কী ভয়ঙ্কর সে আঘাত! এর মানেই বা কী ছিল?

শরতের সাদা মেঘের ছাতা মাথায় পোর্ট সাঈদ সড়ক ছুটছে। অথচ আমার ভেতরের ধোঁয়ার কুণ্ডলি চারপাশের সমস্ত সুন্দরে কালি ঢেলে দিয়েছে । ফেলে আসা অতীত মনের দুয়ারে টোকা দিয়ে ডাকছে অবিরাম। এবং আমার পা জোড়া আমায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে বোনের বাড়ির পথে। তার বিষণ্ন শান্ত মুখ দরজার ওপার থেকে আমায় দেখছে । খুশিতে ঝিলিমিলিয়ে উঠছে সেই মুখ। “সক্কাল সক্কাল এ যে দুর্লভ এবং অভাবনীয় আনন্দ!”, সে বলেছিল।

এরপর কফি বানাতে ভেতরে গেল সে এবং আমি বৈঠকখানায় বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমাদের পিতামাতা এবং ভাইবোনেরা যারা অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছে তারা সকলে টেবিলগুলোর ওপরে ফ্রেমের ভেতর থেকে ঝুঁকে আমাকে দেখছে। এই বিধবা সন্তানহীন বোনটি ছাড়া আমার আর কেউ নেই, সে আমাকে তো বটেই সামিরা এবং গামালকেও সীমাহীন ভালোবাসায় জড়িয়ে রেখেছে। আমি কি তাকে আমার ছেলেমেয়ের দায়িত্বের ভার দিতে এসেছি? কফি হাতে ফিরল সে। তার পরনে সাদা ড্রেসিং গাউন। “তুমি অফিসে যাওনি কেন?”

“শরীরটা জুতে নেই তাই ছুটি নিয়েছি।”

“তোমায় ভালো দেখাচ্ছে না- ঠান্ডা লেগেছে?”

“হুম”

“নিজের অযত্ন করো না”.

আমার চেহারা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছিল। আমার অসুখি ফ্ল্যাটটায় এই মুহূর্তে কী চলছে তার কথাই ভাবছিলাম আমি ।

“গতকাল সামিরা আর গামাল এসেছিল”

“তুমি যেমন ওদের ভালোবাস ওরাও তোমাকে তেমনই ভালোবাসে।”

“আচ্ছা সেহাম কেমন আছে?”

কী নির্মল প্রশ্ন!

“ভালো আছে।”

“তোমাদের ভেতরে সমস্যা মিটেছে তো?”

“আমার মনে হয় না তা আদৌ মিটবে।”

“আমি ওর সঙ্গে সবসময়ই আন্তরিক ব্যবহার করি, বুঝতে পারি আমার সঙ্গে সে সহজ হতে পারে না”

বিষণ্নতা আমাকে চেপে ধরছে, আমি চুপচাপ শুনে যাই।

“আমরা যে সময়ে বাস করছি সেখানে ধৈর্য এবং বিচক্ষণতা জরুরি।”

ইচ্ছে হচ্ছিল তাকে সামিরা এবং গামালকে দেখে রাখার কথাটা বলি, কিন্তু কীভাবে বলব? পরে সে নিজেই জেনে যাবে আমার তাকে দেখতে আসার আসল উদ্দেশ্য। সামিরা এবং গামাল কি আমার কৃতকর্মের জন্যে আমাকে কখনো ক্ষমা করতে পারবে? আমার এই দুর্দশা কতটা ভয়ঙ্কর?

“আমি তোমার সঙ্গে এখনই ডাক্তারের কাছে গেলে কেমন হয়?”

“তার প্রয়োজন নেই, সিদ্দিকা । আমাকে যেতে হবে, কিছু জরুরি কাজ আছে।”

“আমি কীভাবে জানব যে তুমি ঠিক আছ?”

“আমি কাল আবার আসব।”

“কাল?”

আমি ফের রাস্তায় নামি। মনকে বলি দু চোখ ভরে দেখ এবং পা চালাও।

“ক্রীড়া সমিতি সৈকত” আজ ভারী নিরিবিলি। জনশূন্য। ঢেউগুলো হাততালি দিয়ে ডাকছে অথচ সাড়া দেওয়ার মতো কেউ নেই কোথাও। দুশ্চিন্তার কঠিন খামের ভেতরে চেপে রাখা আমার হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করছে। সেইদিন যে মুহূর্তে তার তন্বীদেহ জল ছেড়ে উঠে এসেছিল, সূর্যের মিহি তন্তু রাঙিয়ে দিয়েছিল তাকে , বিচ-রোবে নিজেকে আবৃত করে সে দ্রুত ছুটে গিয়েছিল কেবিনে এবং বাবামায়ের পায়ের কাছে আসন গেড়ে বসেছিল। শর্টস পরা আমি ওকে পেরিয়ে যাওয়ার সময় চোখাচোখি হয়েছিল আমাদের। এক অপার্থিব আনন্দ আমাকে ছুঁয়ে দিয়েছিল, আমার হৃদয়ও চিনেছিল সেই সুর। ঠিক সেই মুহূর্তে কেউ একজন আমায় ডেকেছিল, এবং আমি উত্তর দিয়েছিলাম অতঃপর নিজেকে ওদের সান্নিধ্যে আবিষ্কার করেছিলাম। যিনি আমায় ডেকেছিলেন তিনি ছিলেন ওর চাচা, আমাদের ফার্মের সহকর্মী। আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল এরপরে কিছু এলেবেলে আলাপও হয়েছিল – সবকিছু কী চমৎকারই না ছিল। সর্বার্থেই অনাবিল আনন্দময় মুহূর্ত, এইসব মুহূর্তেরা আর ফিরে আসে না, এমন মুহূর্ত ফিরতে অস্বীকৃতি জানায়। এখন সেইসব মুহূর্তেরা আমার হৃদয়ের চারপাশ ঘিরে আকুল আকাঙক্ষার মতো বয়ে যাচ্ছে যার উষ্ণ উপস্থিতি আমি অনুভব করছি অথচ যে সুতোর ডোরে ওরা বাস্তবের সঙ্গে জুড়ে ছিল, তার জোড় ছিন্ন হয়ে গেছে। আর সেইদিন ও বলেছিল, “ তোমার খুব সুন্দর একটা হৃদয় আছে অর্থের বিচারে যার মূল্য নির্ধারণ অসম্ভব।” এই কথা কি সত্যি? তাহলে “তোমার মতো ঘৃণ্য ইতর আর নেই” এই কথাটি যে জন বলেছিল সে কে? এবং কে এও বলেছিল যে, “তোমার মতো মানুষকে ঈশ্বর কেবল আমাকে নিপিড়নের জন্যে সৃষ্টি করেছেন?”

কথা ছিল ভালোবাসা সকল বৈষম্যকে দূর করবে অথচ শেষমেশ বৈষম্যই ভালোবাসার ইতি টানল। আমরা দুজনই সমান জেদী ছিলাম,দুজনেরই একটিই দাবী- হয় সবটুকু নয়তো কিছুই নয়। তুমি আমার বৈশিষ্ট্যহীন বাইরের রূপ নিয়ে ক্রুদ্ধ হতে এবং আমাকে মানসিক প্রতিবন্ধী বলে তিরস্কার করতে। সামিরা এবং গামাল ভয়ে ওদের কক্ষে আশ্রয় নিত। আমরা কী ভয়ানকভাবেই না ওদের অনিষ্ট করেছি। আমাদের দুজনের মধ্যেকার ভালোবাসা তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঘণ্টার পরে ঘণ্টা দিনের পরে দিন কষ্ট পেয়েছে। আমাদের নিত্যকার তর্ক, ঝগড়া এবং গালাগালের তোড়ে সেই ভালোবাসার শ্বাসরোধ করা হয়েছিল। অথচ সেইদিন এই চত্ত্বরের ক্যাফেতে, ঠিক এই কোণটিতেই আমি ওর চাচার কাছে আমার মুগ্ধতার কথা প্রকাশ করেছিলাম।

“যদিও সে বিশ্ববিদ্যালয়ের অলিন্দে প্রবেশ করে নি, কিন্তু সে সুশিক্ষিত। ওর বাবার নিজস্ব নীতি আছে। মাধ্যমিকের পরে মেয়েকে তিনি পর্যাপ্ত উপার্জনক্ষম কারো উপযুক্ত গৃহিনী হিসেবেই গড়েপিটে তুলছেন।“

“খুবই যথার্থ উদ্যোগ”, আমি বলেছিলাম।

উনি আমাদের দুজনকে সান্টা লুসিয়াতে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, এবং এর পরে আমরা প্যালিক্যান গার্ডেনে দেখা করেছিলাম। আহা আমাদের সেইসব দিন ছিল প্রেমের, স্বপ্নের, মধুর ব্যবহারের দিন। আমি সেই সুললিত কণ্ঠের উল্লাস শুনেছি, যদিও যে স্বরযন্ত্রের তন্ত্রিতে তা বাজানো হতো তার সবকটিই বিকল তখন। কী ভয়ানক আঘাত ছিল সেটি! ফ্ল্যাটে কী চলছে এখন? কেন জীবন সেই অভিসারের দিনগুলির মতোই বহমান রইল না? আহ্‌! আমাদের মুখোশের তলায় কী নীপুণতায় মিথ্যাগুলি লুকিয়ে রাখি আমরা! নিজেকে চেনার একটি কল্যাণকর প্রক্রিয়া থাকা প্রত্যেকের জন্য জরুরি।

“জনাব মোস্তফা ইব্রাহিম?”, যিনি ডাকছেন তাকে আমি চিনেছে, আমাদের ফার্মের পরিদর্শক। তিনি নিশ্চিত কাজে যাচ্ছেন।

“কী খবর আমীর বে।”

“ছুটিতে আছেন?”

“ভালো বোধ করিছি না।”

“দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আমি কি আপনাকে কোথাও নামিয়ে দেবো?”

“না, ধন্যবাদ।”

তিনিই হয়তো ঘটনার প্রথম সাক্ষী। না, আমার পড়শী ডাক্তার সাহেব আমাকে ফ্ল্যাট থেকে বেরুতে দেখেছিলেন। উনার কাছে কি কিছু অস্বাভাবিক লেগেছিল? দালানের নিরাপত্তার দায়িত্বে যিনি, তিনিও দেখেছেন। অবশ্য এসবে কিছু যায় আসে না। পালানোর চিন্তা আমার মাথাতেই ছিল না। আমি এর শেষ দেখতে চাই। এই শেষ বিদায় জানানোর তাগিদ না থাকলে আমি নিজেই এতক্ষণে পৌঁছে যেতাম।

আমার নিজের পক্ষে জীবনকে বাতিল করা সম্ভব ছিল না। আমার কাছ থেকে বলপূর্বক একে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এইভাবে জীবন শেষ হোক আমি কখনই চাই নি। পঞ্চাশ হতে আমার আরো পাঁচ বছর বাকি ছিল। ভোগান্তি সত্ত্বেও জীবন সুন্দরই ছিল। সেহাম আমাকে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করতে পারে নি। সামিরা আর গামালের সংগে কলেজ অফ সায়েন্সে গিয়ে কি আমার দেখা করে আসা উচিত? ওরা আমার সঙ্গে দেখা না করেই চলে গিয়েছিল এবং পরবর্তিতে যা ঘটেছিল তা আমি আগাম দেখতে পাইনি। ওদের চোখের দিকে তাকানোর সাহস নেই আমার। ওদের ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিতে আমার প্রচণ্ড কষ্ট হয়েছিল। আমি দিব্যচোখে দেখতে পাচ্ছিলাম ওরা দরজায় কড়া নাড়ছে অথচ ওদের মা ছুটে এসে দরজা খুলছে না । এই দিনটা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওদের মনে ছাপ রেখে দেবে। এবং ওরা যদি আমায় অভিশাপ দেয় তো দিতেই পারে, ওদের সেই অধিকার আছে।

আমি কবে আমার এই শোক উজিয়ে এই চিরবিদায় জানানোর কাজে মনোনিবেশ করতে পারব ? চল দেখি যতটা দেখা যায়, উপভোগ করি এবং পা চালিয়ে চলি যতটা যাওয়া যায়। বাজার। সেই দিন আমরা দোকান ঘুরে ঘুরে বাজার করেছিলাম। নববধূ পাশে থাকলে যে কোনো পুরুষেরই মনে হয় যেন এই দুনিয়াটা একান্তই তার, মনে হয় সুখ মানে এই পৃথিবীর সেই সবকিছু যা মেথিলেটেড স্পিরিটের মত চট করে উবে যায় না। প্রেমে উদ্‌বেল আমি বলছি, “চল সান জিভোওন্নি যাই।” উল্লসিত সে উত্তর দিচ্ছে, “মাকে ফোন দিচ্ছি”।

দয়া, মিষ্টতা এবং স্বর্গীয় স্নিগ্ধতায় ঘেরা ছিলো আমাদের প্রথমদিকের দিনগুলো। কখন এবং কীভাবে এই নতুন সেহাম উদয় হয়েছিল? মা হয়ে যাওয়ার পরেই; তবে সেইভাবে কোনো মুহূর্তকে বিশেষ করে চিহ্নিত করা যাবে না। কীভাবে আশাভঙ্গের অনুভূতি আমার নিজের নিয়ন্ত্রণ নিল? সামিরা একবার বলেছিল, “কত অল্পে তুমি প্রচন্ড রাগে ফেটে পড় বাবা!” আর একবার আমি সেহামের কাছে স্বীকার করেছিলাম, “আমি রেগে গেলে আমার কাণ্ডজ্ঞান থাকে না ঠিক তবে রাগবার পেছনে কিন্তু যৌক্তিক কারণ থাকে । “

“এবং ভুল বোঝাবুঝি ছাড়া আসলে আর কোনো কারণই নেই ।”

“তুমি তুচ্ছ কারণে আমাদের জীবনটা তছনছ কর।”

“তুচ্ছ কারণ? তুমি জীবনই বোঝো না।”

“তুমি ভয়ানক স্বেচ্ছাচারী। যুক্তির কোনো বালাই নেই তোমার কাছে। মাথায় কিছু একটা ঢুকলে যেভাবেই হোক তা আদায় করে ছাড় তুমি।”

“আমি যদি তোমার কথা শুনে চলতাম তবে এতদিনে আমাদের বারোটা বাজতো।”

দু চোখ ভরে দেখি যা কিছু দেখা যায়, উপভোগ করি এবং পা চালিয়ে চলি যতটা যাওয়া যায়। আবু কিয়ের গ্রীষ্মের জন্য আদর্শ অবকাশকেন্দ্র। ঐখানে মাছ দিয়ে মধ্যহ্নভোজ সারা যেতে পারে। পেট পুরে খাওয়া যাক এবং হোয়াইট ওয়াইন দিয়ে উদযাপন করা যাক। এইখানেই আমরা দুজনে বসে কাটিয়েছি এবং এইখানেই সামিরা আর গামালকে ছেলেবেলায় আমরা সাঁতার শিখিয়েছিলাম। কথায় বলে নিশ্চলতার দুই কার্যকর স্তরের একটি হলো হতাশা। ওকে ছেড়ে দিলেই কি ভালো ছিল না?

“ডিভোর্স দিয়ে আমায় মুক্তি দাও”

“সামিরা আর গামালের জন্যে ভাবনা না থাকলে আমার জন্য সেটিই উত্তম ছিল।”

“বরং ভাবনাটা তোমার নিজের জন্যই ভাবা উচিত। তুমি নিজে যে কতটা অসহনীয় সেটা তোমার নিজেরই উপলব্ধি করা জরুরি।”

সত্যি বলতে কি আমি প্রায়শই তোমার মৃত্যু কামনা করেছি। কিন্তু নিয়তি তো আমার অধীন নয়। আমার ঘৃণার সেই নারকীয় আগুনের পাশে অন্য যে কোনো দুর্ভোগ সয়ে যাওয়া সহজ ছিল। কোনো লুকোছাপা ছাড়াই আমরা পরস্পরের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতাম। নিকৃষ্ট এবং নিষ্ঠুরতম গালাগালের পরে কীভাবে আমি রুচি অক্ষুণ্ণ রেখে মুখে খাবার তুলতাম? আসলে হতাশা একধরনের আনন্দকেও ধারণ করে যাকে খাটো করে দেখা উচিত নয়। রেডিওতে বাজছে, “আমি তোমার উৎপীড়ক এবং তোমার ভালোবাসা”, আমার ভেতরে হুহু করে উঠল। এটি সেই গান যেটি আমাদের প্রপঞ্চময় মধুচন্দ্রিমার দিনগুলোতে আমার প্রিয় গান হয়ে উঠেছিল। সুখ কীভাবে তার অস্তিত্ত্বের চেয়েও তীব্রতা নিয়ে বিলীন হয়ে যায়? যে হৃদয় হতে সে উৎসারিত হয়, সেই উৎসবিন্দু মুছে গেলেও তার প্রতিবেশের সঙ্গে দিব্যি মিশে থাকে। অতঃপর, পাখির মতো শুকনো ডাঙায় বর্ণিল পাখার কাঁপন তুলে হঠাৎ মুহূর্তের জন্যে উদয় হয়। “আমি, তোমার উৎপীড়ক, এবং তোমার ভালোবাসা” এবং সেই বিধ্বংসী আঘাত।

খুব সম্ভব সেইদিন তুমি রাগে বেসামাল হয়েই সামিরার দিকে তেড়ে গিয়েছিলে। ভীত আমি তোমাকে জোর ধাক্কা দিয়েছিলাম, তুমি পড়ে গেলে এবং তোমার মাথায় আঘাত লাগল। সেইদিন তোমার চোখের তারায় অমানুষিক দৃষ্টি যেন বিষ ছিটাচ্ছিল, “আমি তোমাকে ঘৃণা করি।”

“তো?”

“আমি তোমাকে আমৃত্যু ঘৃণা করব।

“জাহান্নামে যাও।”

“আমার হৃদয়ে যদি একবার আঁধার জমে তবে সেই মেঘ সরানো দুরূহ হয়ে যায়।”

দুঃখজনক হলেও এটাই সঠিক। ওহে আঁধার হৃদয়ের মানবী ক্ষমা চাওয়া বা সন্ধি করা কিংবা সম্প্রীতির কোনো পথই তোমার জানা ছিল না। সেই ঘটনার পরে কেজো কথা এবং সংসারের জমাখরচের হিসেবের বাইরে আমাদের মধ্যে আলাপই হতো না। প্রতিশোধ স্পৃহা জীবন নির্বাহের কৌশলেই মিশে গেল। সৌহার্দ্রের ফল্গুধারায় খরা নামল। কারাগারের বন্দির মতো আমিও পালানোর স্বপ্নে বিভোর ছিলাম। আমার হৃদয়ের সমস্ত বাসনা শুকিয়ে গিয়েছিল, ঊষরতা তাকে রুদ্ধ করেছিল। এবং এই পুরোটা সময় সে একজন মুক্ত নারীর মতো আচরণ করছিল, আমার অনুমতির কিংবা আমাকে জানানোর তোয়াক্কা না করে যখন ইচ্ছে যেত-আসত। নৈঃশব্দ্য তাকে ঘিরে রেখেছিল এবং প্রয়োজন ছাড়া সে একটি শব্দও উচ্চারণ করত না। অহম ওর ভেতরের মনোভাবকে বেরোতে দেয় নি এবং সে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর জন্য অন্য কেউ নয় আমারই সহোদরা সিদ্দিকার কাছে গিয়েছিল। যখন সিদ্দিকা সেহামের প্রত্যাশা অনুযায়ী কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আমাদের দুজনের মধ্যে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করল, সে তখন উল্টে তাকেই ঘৃণা করতে শুরু করেছিল। সে বলেছিল কেবল একজনই নয় এই পরিবারের সকলের ধমনীতেই পাগলামির রক্ত বইছে।

একবার সামিরা আর গামালকে একা পাওয়ার সুযোগে আমাদের পরিস্থিতি নিয়ে তাদের মতামত জানতে চেয়েছিলাম, “তোমাদের পরিস্থিতি মোটেও সুখকর নয় বাবা,” গামাল বলেছিল।

“একে আমাদের দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে এমনকি তার চেয়েও গুরুতর এবং আমি প্রথম সু্যোগেই দেশান্তরী হওয়ার পরিকল্পনা করছি।”

জামালের গোয়ার্তুমি আমার ভালোই জানা, কিন্তু সামিরা, সে তো সমঝদার মেয়ে, ধার্মিক এবং একই সময়ে আধুনিক, অথচ সেও বলেছিল, “আমি দুঃখিত বাবা তোমাদের দুজনের কারোরই সমঝোতার মানসিকতা নেই।”

“কিন্তু আমি তো তোমার পক্ষ নিয়েই অমন করেছিলাম সামিরা”

“তুমি এটা না করলেই বরং ভালো ছিল। তাহলে ঘণ্টাখানিক পরেই আমার সঙ্গে তার মিটমাট হয়ে যেত কিন্তু তুমি এত তাড়াতাড়ি রেগে গেলে বাবা!”

“কিন্তু সে তো যুক্তিহীন।”

“আমাদের পুরো বাড়িটাই তো যুক্তিহীন!”

“আমি তোমাকে বিচার করতে বলছি।”

“না আমি কোনো ভাবেই তা করার উপযুক্ত নই।”

“আমি তোমাদের দুজনের কারো কাছ থেকেই সান্ত্বনা পেলাম না।”

এর জবাবে জামাল বলল, “আমাদের কাছে তোমাদের কিংবা আমাদের নিজেদের জন্যেও কোনো সান্ত্বনা নেই।”

এরা দুজন যদি আমাকে আমি যেমন করে তাদের ভালোবাসি তেমন করে না চায়, তবে আমার এই বেঁচে থাকার কী অর্থ থাকে আর? আহ্‌! চোখ ভরে দেখ, উপভোগ কর এবং পা চালিয়ে চল। যে জীবন ক্ষয়ে গেছে তার জন্যে নয় যে জীবন এই মুহূর্তের তার জন্যে বাঁচো এবং অতীত মুছে দাও মন থেকে। নিজেকে পূর্ণ কর কারণ যে সময় তুমি পেরিয়ে যাও তাতে আর ফেরা হয় না। প্রতিটি মুহূর্তই অন্তিম মুহূর্ত। যে দুনিয়ায় আমার আজও তৃষ্ণা মেটেনি এবং যার আনন্দ উদ্‌যাপনকে আমি পরিত্যাগ করি নি সেই দুনিয়া আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে অবিবেচক ক্রোধের বিস্ফোরণে। এই রাস্তাগুলির কোনটি আমাদেরকে এক সঙ্গে দেখে নি? অথবা খানিক এগিয়ে হাঁটা সামিরা এবং গামাল সহ আমাদের পুরো পরিবারকে? এই অমিলগুলোর সংশোধনের কি কোনো উপায়ই নেই?

সবচেয়ে নিষ্ঠুর শাস্তি হলো এমন সময়ে বিদায় নেওয়া যখন কিনা আলেক্সজেন্দ্রিয়া তার সফেদ শরতের সম্ভার নিয়ে নিজেকে সাজিয়েছে এবং আমিও পরিণত পৌরুষের চূড়ান্ত সময়ে পৌঁছেছি। এবং এইখানেই আবু -কিয়েরের অন্যপাশে আছে সেই শান্ত সমুদ্র এবং আমরা দুজনেই যুগলে গেয়েছিলাম, “আশিস হয়ে এলে তুমি, হৃদয়ের মণি” । দুই অতন্দ্র হৃদয়ের পরস্পরের সঙ্গে সুরে সুরে কথোপকথনের সেই গান। আমাদের বাচ্চারা, সামিরা আর গামাল চাঁদের ঝিলমিল আলোর ওপরে নোঙ্গর ফেলা জেলে নৌকাগুলির সংখ্যা গোনায় ব্যস্ত তখন। একটা দিনে কি শত বর্ষের এক চতুর্থাংশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছুঁয়ে ফেলা যায়? কেন আমরা আমাদের মধুর প্রতিশ্রুতিগুলি পরিচর্যা করি না যাতে করে শুষ্ক মুহূর্তগুলোতে ওরা আমাদের আশ্বস্ত করতে পারে? আমাদের স্মৃতির সংখ্যা গাছের পাতার মতো অগুনতি অথচ যে সময় হাতে থাকে তা সুখের মতোই ক্ষণস্থায়ী। সুখ যখন উদয় হয় তখন আমরা তাকে চিনতে পারি না সে যখন হারায় তখন আমরা তাকে হন্যে হয়ে খুঁজে মরি।

এবং ‘দৌলতের’ সঙ্গে আর কাকে আনতে হতো আমায়? অবশ্য তার আর কোনো প্রয়োজন নেই। যদিও বা সম্ভব হতো তাতে কেবল পরিস্থিতির অবনতিই ঘটত এবং আমাকে নিজের সঙ্গে সময়ের আগেই বোঝাপড়া করতে হতো। আর যে ভালোবাসার কোনো অস্তিত্বই নেই তাকে নিয়ে ভাণ করার যুক্তিই বা কি? হতাশাই আমাকে এই পরিস্থিতিতে ঠেলে দিয়েছে। ও আমাদের বিয়েকে আঘাত করেছে বরাবর, সামিরা আর গামালের ভবিষ্যতের কথা কখনোই ভাবে নি। এটা ভালোবাসা নয় বরং প্রতিশোধের সাময়িক ঝোঁক বলা যেতে পারে। কেবল আমি যদি নিজেকে সামলাতাম এবং পরিস্থিতিকে সেই অন্তিম আঘাত হানার পর্যায়ে যাওয়ার আগেই রোধ করতে পারতাম ।

বিকেল গাঢ় হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে আমাকে খোঁজার তৎপরতাও নিঃসন্দেহে বেড়েছে। কাজেই এস্টেরিয়াতেই প্রতিক্ষা করা যাক ; সন্ধ্যা কাটাবার জন্যে আমার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা এটি। পরিবার, প্রেমিক কিংবা গোলাপী স্বপ্ন দেখার জায়গা। বিয়ার এবং হাল্কা সান্ধ্য ভোজ। হয়তোবা আজ আমি একাই থাকব সেখানে। আমাকে মাফ করে দিও, সামিরা, মাফ করে দিও গামাল। আজকের সকালকে আমি আন্তরিক এবং খোলা মন নিয়ে বরণ করেছিলাম, কিন্তু ক্রোধ আমাদের সংকটের পথে ছুঁড়ে দেয় অবলীলায়। আমি মনেপ্রাণে কেবল এক মিনিটের জন্যে হলেও সেই একঘণ্টা ফিরে পেতে চেয়েছিলাম। যখন সেই ক্রোধোন্মত্ত সময়টা পেরিয়ে গেল তখন আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না কেবল বরফের মতো কঠিন, মুখে কুলুপ আঁটা হতাশা ছাড়া। আমার এই বিদায়ী সফর শুরু করেছিলাম মৃত্যুকে সঙ্গী করে সে কখনো সমুখে কখনোবা পেছন থেকে আমাকে অনুসরণ করেছে আগাগোড়া। জীবন এখন কেবল কয়েক ঘণ্টার দৈর্ঘ্যে সংকুচিত হয়ে গেছে এবং এই সময়েই আমি জীবনকে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। আমার চার পাশের সবাই কী ভীষণ সুখি এবং আমার এই গোপনীয়তা তাদের কাছে প্রকাশ পেলে কি তারা এমনই সুখি থাকত! বেয়ারা আন্তরিকভাবেই জিজ্ঞেস করছে, “ম্যাডাম আসেন নি?”

“তিনি শহরের বাইরে,” আমি বিরক্তি চেপে বললাম। হাতে আর সময় নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে দুই বা ততোধিক মানুষ আমার দিকে এগিয়ে আসবে।

“আপনিই মোস্তফা ইব্রাহিম?”

“জ্বী স্যার।”

“আপনি কি আমাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত আছেন?”

আমি প্রশান্তচিত্তে উত্তর দিলাম,

“আমি আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।” 

————–
মূলগল্প: ‘অ্যা ডে ফর সেয়িং গুডবাই’ লেখক নাগিব মাহফুজ, ইংরেজিতি অনুবাদ: ডেনিস জনসন ডেভিস
 
 
লেখক পরিচিতি: খ্যাতনামা মিশরীয় লেখক নাগিব মাহফুজের জন্ম কায়রোতে ১৯১১ সালে। তাঁর অসাধারণ সৃষ্টিকর্মের জন্য তিনি ১৯৮৮ সালে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। আরবি ভাষাভাষী লেখদের মধ্যে তিনিই প্রথম নোবেল জয়ী লেখক। নাগিব মাহফুজ শতাধিক ছোটোগল্প এবং ত্রিশটির মতো উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘কায়রো ট্রিলজি’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে। ২০০৬ সালে নাগিব মাহফুজ মৃত্যু বরণ করেন।
 

অনুবাদক পরিচিতি:

রঞ্জনা ব্যানার্জী
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক
কানাডায় থাকেন।

One thought on “নাগিব মাহফুজের গল্প: ‘যাই’ বলে যাওয়ার সেই দিন

  • January 7, 2022 at 10:52 pm
    Permalink

    দারুন লাগলো! যদিও আমার original কাজটা পড়া হয়ে ওঠেনি, আমি অনুবাদ টার ওপরে কোনো মতামত দিতে পারবোনা – তবে এটুকু স্বীকার করতে কোন অসুবিধে নেই যে মোটামুটি নিশ্বাস বন্ধ করে পড়তে হয়েছে পুরোটা। কথাশিল্পী রঞ্জনা ব্যানার্জীর পরিবেশন আমার সব সময়ই ভালো লাগে, এবারেও তাই – তবে বুঝতে পারছি এটা এক নিঃশ্বাসে পড়লে চলবে না। অন্ধকারে চোর যেমন ধীর-স্থির ভাবে এগোয়, পাঠককেও সেই ভাবে এগোতে হবে – নিজেরই প্রয়োজনে।

    Saumen Sengupta

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.