হারুকি মুরাকামির গল্প: নির্যাস

ভাষান্তর – উৎপল দাশগুপ্ত
ঘটনাটা আমার এক তরুণ বন্ধুকে বলছিলাম। অনেকদিন আগে, যখন আমার বয়স আঠেরো, অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটেছিল। কথাটা কেন তুলেছিলাম সেটা আমার মনে নেই। গল্প করতে করতে কথাটা হয়ত আপনিই উঠে এসেছিল। ব্যাপারটা ঘটেছিল অনেক বছর আগে। মান্ধাতার আমলেই বলা যায়। সব থেকে বড় কথা হল, আজ পর্যন্ত আমি এই ঘটনার কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি।
“উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে বসেছিলাম, কলেজে ভর্তি হইনি তখনও,” ওকে বুঝিয়ে বলছিলাম। “বলতে পার, ছাত্রজীবনের ভবঘুরে দশা চলছে তখন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় ফেল করে আবার পরীক্ষায় বসার চেষ্টা করছি। কেমন ছাড়া ছাড়া একটা ভাব,” আমি বলে চললাম। “অবশ্য আমার খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না এ নিয়ে। চলনসই একটা প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হতে অসুবিধে যে হবে না, সেটা জানতাম। এদিকে বাবা-মা পেছনে পড়ে আছেন যাতে আমি কোনও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য চেষ্টা করি। তাই আবার পরীক্ষায় বসলাম, আগে থেকেই জানতাম যে কোনও লাভ হবে না। যথারীতি আমি ফেল করলাম। সেই সময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় গণিত একটা আবশ্যিক বিষয় ছিল, আর ক্যালকুলাস আমার মাথায় ঢুকত না। গড়াতে গড়াতেই কেটে গেল পরের বছরটা। একটা অ্যালিবাই তৈরি করার চেষ্টা ছিল অবশ্য। মগজে ঠুসে পরীক্ষা পাশ করিয়ে দেবার স্কুলে না গিয়ে, আমি স্থানীয় লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ে থাকতাম। মোটা মোটা উপন্যাস পড়বার জন্য। বাবা-মা হয়ত ধরে নিয়েছিলেন ওখানে আমি মন দিয়ে পড়াশোনা করছি, আর এদিকে আমি চুটিয়ে জীবন উপভোগ করে চলেছি। বালজ়াকের সমস্ত লেখা পড়ে ফেলা, ক্যালকুলাসের তত্ত্বের গভীরে যাওয়ার চেয়ে আমার কাছে অনেক বেশি উপভোগ্য মনে হত।”

সে বছর অক্টোবরের প্রথম দিকে, পিয়ানো-আসরের একটা নিমন্ত্রণ পেলাম। যে মেয়েটি নিমন্ত্রণ করেছে, স্কুলে আমার থেকে এক ক্লাস নীচে পড়ত, আর আমি যাঁর কাছে পিয়ানো শিখতাম, মেয়েটিও তাঁর কাছেই শিখত। একবার আমরা দুজনে মিলে পিয়ানোতে চার হাতে বাজানোর মত মোৎসার্ট সৃষ্ট সংগীতের ছোট একটি অংশ বাজিয়েছিলাম। অবশ্য ষোলো বছরে পা রাখার পর থেকে পিয়ানো ক্লাসে আমি আর যাইনি, মেয়েটির সঙ্গেও এরপর আর দেখা হয়নি। তাই ঠিক বোঝা গেল না মেয়েটি আমাকে নিমন্ত্রণপত্রটা পাঠাতে গেল কেন। আমার ব্যাপারে ওর কি কোনও আগ্রহ ছিল? হতেই পারে না। একটা আকর্ষণ ছিল মেয়েটির, স্বীকার করতেই হবে, তবে ঠিক আমার পছন্দের সঙ্গে খাপ খায় না, অন্তত রুচির দিক থেকে। পোশাক-পরিচ্ছদ সর্বদা কেতাদুরস্ত, পড়ত ব্যয়বহুল একটা মেয়েদের স্কুলে। আমার মত সাদামাটা বৈশিষ্ট্যহীন একটা ছেলের প্রেমে পড়ার মত মেয়েই ও নয়।

এক সঙ্গে বাজানোর সময়, আমার সুর কেটে গেলে প্রতিবারই আমার দিকে বিরক্ত চোখে তাকাচ্ছিল। পিয়ানো আমার থেকে ও অনেক ভাল বাজাত, আর আমার ছিল খালি খালি ঘাবড়ে যাওয়ার অভ্যেস। ফলে ওর পাশাপাশি বসে বাজানোর সময় বেশ অনেকবারই আমি তাল কেটে ফেললাম। তাছাড়া আমার কনুইয়ে বেশ কয়েকবার ওর কনুইতে ধাক্কাও লেগেছিল। খুব কঠিন কিছু ছিল না, আর আমার ভাগে সোজা জায়গাটাই পড়েছিল। যতবার আমি তালগোল পাকিয়েছি, ততবারই দেখেছি ওর ‘এবার একটু ক্ষান্ত দাও’ ধরণের চোখমুখের ভাব। মুখের ভেতর জিভ দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা আওয়াজ করছিল সে, খুব জোরে নয়, কিন্তু আমার কানে এসে পৌঁছনোর মত জোরে অবশ্যই। সেই শব্দ এখনও আমার কানে ভাসে। আমার পিয়ানো বাজানো ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে ওই শব্দের একটা ভূমিকা নিশ্চয়ই ছিল।

সে যাই হোক, আমরা একই স্কুলে পিয়ানো বাজানো শিখতাম, মেয়েটির সঙ্গে এটুকুই আমার সম্পর্ক ছিল। মুখোমুখি পড়ে গেলে ‘হাই-হ্যালো’ হত, তবে ওর সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবের আদানপ্রদানের কোনও স্মৃতিই আমার নেই। তাই হঠাৎ করে ওর পিয়ানো-আসরে নিমন্ত্রণ পাওয়ায় (তাও ওর একক নয়, তিনজন পিয়ানোবাদকের একটা আসর), বেশ একটু হকচকিয়ে গেলাম –বলা যায় একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। তবে বছরের সেই সময়টাতে, একটা জিনিস আমার কাছে অফুরন্ত ছিল –সময়, তাই জবাবি পোস্টকার্ডে জানিয়ে দিলাম আমি আসছি। এর একটা কারণ তো এই যে আমাকে নিমন্ত্রণ পাঠানোর পেছনে উদ্দেশ্যটা কী, সেটা জানার কৌতুহল হচ্ছিল –অবশ্য উদ্দেশ্য যদি কিছু একটা থেকে থাকে। এত বছর বাদে, আমাকে অপ্রত্যাশিত একটা নিমন্ত্রণ ও পাঠাল কেন? হতে পারে, পিয়ানো বাজানোয় এখন ও অনেক বেশি পারদর্শী হয়ে উঠেছে, আর সেটাই আমাকে দেখাতে চায়। অথবা হয়ত ব্যক্তিগত কোনও কথা আমাকে জানাতে চায়। অন্যভাবে বলতে গেলে, আমার এই কৌতুহল চরিতার্থ করার আগ্রহটা ঠিক কী ভাবে কাজে লাগাব, তা নিয়ে তখনও ভেবে চলেছি, আর সদুত্তর পেতে হলে আমাকে ঠিক কী কী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে সেটা নিয়েও মাথা ঘামিয়ে চলছি।

অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে কোবে শহরের এক পাহাড়-চূড়ার একটা হলে। হানকিউ রেলপথ ধরে যত দূর যাওয়া যায় গেলাম। তারপর একটা বাস ধরলাম যেটা সর্পিল খাড়া পাহাড়ি পথ ধরে ওপরে উঠবে। একেবারে চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে একটা স্টপে বাস থেকে নামলাম। অল্প একটু হেঁটে মাঝারি আকারের এক কনসার্ট হল চত্বরে এলাম। এই চত্বর বিশাল এক কর্পোরেট গোষ্ঠীর, ওরাই এর দেখভাল করে। পাহাড়ের ওপরে, অভিজাত একটা আবাসিক কলোনির শান্ত পরিবেশে অথচ বেশ অসুবিধেজনক একটা জায়গায় এইরকম একটা কনসার্ট হল আছে, সেটা আমার জানা ছিল না। বুঝতেই পারছ, পৃথিবীর এমন অনেক জিনিসই আছে, যা আমার জানা নেই।

মনে হল আমন্ত্রণ পাওয়ার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আমার কিছু একটা হাতে করে নিয়ে যাওয়া উচিত। তাই স্টেশনের কাছে একটা ফুলের দোকান থেকে উপলক্ষের সঙ্গে মানানসই একগুচ্ছ ফুল পছন্দ করে সেগুলোর একটা তোড়া বানিয়ে নিয়ে চললাম। বাসটা ঠিক তখনই এসে দাঁড়িয়েছে। আমি লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম। রবিবারের শীতল দিন। ঘন ধূসর মেঘে আকাশ ঢাকা। দেখে মনে হচ্ছিল বৃষ্টির শীতল ধারা যে কোনও মুহূর্তে নেমে আসতে পারে। বাতাস চলছিল না অবশ্য। পাতলা সাধারণ একটা সোয়েটার পরেছিলাম। তার ওপর হালকা নীলের আভাস লাগানো ধূসর হেরিংবোন জ্যাকেট। ক্যাম্বিশের একটা ব্যাগ কাঁধ থেকে ঝুলছে। জ্যাকেটটা ছিল আনকোরা নতুন, আর ব্যাগটা যথেষ্ট পুরোনো আর জীর্ণ। আর আমার হাতে ধরা জমকালো সেই লাল রঙের ফুলের তোড়া, সেলোফেনে জড়ানো। এহেন মূর্তি নিয়ে বাসে যখন চড়লাম, অন্যান্য যাত্রীরা আমার দিকে তাকাতে লাগল। অন্তত আমার মনে হল যে ওরা তাকাচ্ছে। বুঝতে পারছি আমার গালদুটো ক্রমে লাল হয়ে উঠছে। তখনকার দিনে অল্পেই আমি রাঙা হয়ে উঠতাম। সেই রাঙাভাব কাটতে অনাদিকাল লেগে যেত।

“আমি হঠাৎ এখানে এলাম কেন?” সীটের ওপর ঝুঁকে বসে পড়ে, নিজেই নিজেকে জিগ্যেস করি। হাতের তালু দিয়ে লাল হয়ে ওঠা গাল দুটোকে জুড়োতে জুড়োতে। মেয়েটির সঙ্গে দেখা হওয়ার জন্য আমি মোটেই ব্যগ্র নই, কিংবা ওর পিয়ানোবাদন শোনার জন্য, তাহলে আমার হাত খরচের পুরো টাকা একটা ফুলের তোড়া কিনতে খরচ করে ফেললাম কেন, কেন নভেম্বরের রবিবারের এক বিষণ্ণ বিকেলে, পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছনোর জন্য এতটা পথ বেয়ে যাচ্ছি? জবাবি পোস্ট কার্ডটা ডাকবাক্সে ফেলার সময় নিশ্চয়ই আমার মাথায় ভূত চেপেছিল।

পাহাড়ের যত ওপরে উঠছি, যাত্রীসংখ্যা ততই কমে যাচ্ছে। নিজের গন্তব্যে যখন পৌঁছলাম, তখন বাসে ড্রাইভার আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই। বাস থেকে নেমে পড়লাম। নিমন্ত্রণপত্রে দেওয়া নির্দেশ ধরে একটা হালকা চড়াই পথ ধরে এগোতে লাগলাম। এক একটা বাঁক নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নীচের বন্দরটা পলকের জন্য দেখা দিয়েই মিলিয়ে যেতে লাগল। নিস্তেজ মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, যেন সীসার চাদরে ঢাকা। বন্দরের অনেকগুলো ক্রেন আকাশের দিকে মুখ বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সমুদ্রের গভীর থেকে বেয়াড়া কোনও পোকার শুঁড়ের মত হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এসেছে।

চড়াইয়ের ওপরের বাড়িগুলো বেশ বড় বড় আর বিলাসবহুল। পাথরের বিশাল পাঁচিল তোলা, মনোরম প্রবেশদ্বার, দুটো গাড়ি রাখার গ্যারেজ। অ্যাজ়ালিয়া ফুলের সবকটা ঝোপই বেশ পরিপাটি করে ছাঁটা। দূর থেকে আওয়াজ আসছে, মনে হল প্রকাণ্ড একটা কুকুর কোথাও ঘেউ ঘেউ করছে। তিনবার বেশ জোরে জোরে ঘেউ ঘেউ করল, তারপর যেন কারো ধমক খেয়ে, হঠাৎ থেমে গেল, পরিবেশ শান্ত হয়ে গেল।

(২)
নিমন্ত্রণপত্রে দেওয়া সরল ম্যাপটা ধরে এগোতে এগোতে অস্পষ্ট কিন্তু গোলমেলে একটা আশঙ্কা মনে দানা বাধতে লাগল। কী একটা ব্যাপার যেন ঠিক ঠিক লাগছে না। প্রথমত, রাস্তায় লোক সমাগমের অভাব। বাস থেকে নামার পরে, একজন পথচারীও আমার চোখে পড়েনি। পাশ দিয়ে দুটো গাড়ি চলে গেল, তবে ওরা চড়াই থেকে নীচে নামছিল, চড়াই বেয়ে ওপরে উঠছিল না। অনুষ্ঠানটা যদি সত্যিই হবার থাকে, তাহলে আরও বেশি মানুষের দেখা পাওয়ার কথা। অথচ, পাড়াটা বড়ই শান্ত, বড়ই নিস্তব্ধ, যেন মাথার ওপরের ঘন মেঘ সব শব্দকেই গিলে ফেলেছে।

আমার কি বুঝতে ভুল হয়েছিল?

জ্যাকেটের পকেট থেকে নিমন্ত্রণপত্রটা বের করে তথ্যগুলো আবার মিলিয়ে নিলাম। হতেই পারে, আমি ঠিকঠাক পড়িনি। খুব মন দিয়ে পুরোটা পড়লাম, কিন্তু ভুল কিছু চোখে পড়ল না। ঠিক রাস্তাই নিয়েছি, বাস স্টপটাও ঠিকই, তারিখ আর সময়েও কোনও গরমিল নেই। একবার জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে, আবার হাঁটতে শুরু করলাম। একটাই কাজ করতে পারি, কনসার্ট হলে পৌঁছে আন্দাজ লাগানোর চেষ্টা।

অবশেষে সেই বাড়িটাতে এসে পৌঁছলাম। লোহার গেটটা ভাল করে বন্ধ করা। বেশ মোটা একটা শেকল জড়ানো, আর বড়সড় এক তালা ঝোলানো। আশেপাশে কাউকে দেখতে পেলাম না। গেটের সরু ফোকর দিয়ে নজরে এল, গাড়ি রাখবার জন্য মাঝারি আকারের একটা পার্কিং লট। একটাও গাড়ি দাঁড়িয়ে নেই। শানের পাথরের ভেতর থেকে আগাছা উঁকিঝুঁকি মারছে। পার্কিং লটটাও অনেকদিনের মধ্যে ব্যবহার হয়েছে বলেও মনে হল না। এসব সত্ত্বেও, প্রবেশদ্বারের সামনের বিশাল নেমপ্লেটটা বুঝিয়ে দিচ্ছে আমি সঠিক জায়গাতেই এসে পৌঁছেছি।

প্রবেশদ্বারের পাশেই রাখা ইন্টারকমের বোতামটা টিপলাম। কেউ সাড়া দিল না। একটু অপেক্ষা করলাম, তারপর বোতামে আবার চাপ দিলাম, এবারও কোন সাড়া এল না। ঘড়ি দেখলাম। আর পনেরো মিনিটের মধ্যেই অনুষ্ঠান শুরু হবার কথা। কিন্তু গেট খোলার কোনো লক্ষণই নেই। জায়গায় জায়গায় পলেস্তরা খসে পড়েছে, জং ধরাও শুরু হয়েছে। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না, তাই ইন্টারকমের বোতামটা আবার টিপলাম, কিছুক্ষণ টিপে ধরে থাকলাম। পরিণামে কোনও হেরফের হল না –গভীর নৈঃশব্দ্য।

কী করি, মাথায় কিছু আসছিল না। ভারি লোহার গেটের ওপর হেলান দিয়ে দাঁড়ালাম। প্রায় দশ মিনিট ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে ক্ষীণ আশা, কিছুক্ষণের মধ্যেই কাউকে না কাউকে দেখা যাবে। কেউ এল না। না ভেতরে, না বাইরে, চলাফেরার কোনও আওয়াজ নেই। হাওয়া চলছে না। পাখিরা কিচিরমিচির করছে না, একটা কুকুরও ঘেউ ঘেউ করছে না। মাথার ওপর, ধূসর মেঘের ঘন চাদর, আগের মতই।

হাল ছেড়েই দিলাম শেষমেশ –কী আর করা যায়? –ভারি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে রাস্তায় নেমে বাসস্টপের দিকে চললাম। কী যে হচ্ছে তা নিয়ে পুরোপুরি অন্ধকারেই রইলাম। একটা জিনিসই স্পষ্ট হয়ে গেল যে এখানে আজ পিয়ানো-আসর বা অন্য কোনও অনুষ্ঠান হচ্ছে না। লাল ফুলের তোড়াটা হাতে ধরে বাড়ি ফিরে যাওয়া ছাড়া গত্যান্তর নেই। মা নির্ঘাত জিগ্যেস করবেন, “ফুল –কী ব্যাপার?”, আমাকেও বিশ্বাসযোগ্য জবার দিতে হবে। ইচ্ছে হচ্ছিল স্টেশনের ডাস্টবিনে ওগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিই, কিন্তু না, ওগুলো –অন্তত আমার কাছে –ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার পক্ষে বেশ দামি।

পাহাড়ের তলায়, সামান্য দূরে, ছিমছাম ছোট পার্ক একটা, মোটামুটি একটা আবাসনের জন্য যতটুকু জায়গা লাগে, ততটাই জায়গা নিয়ে। পার্কের অন্য প্রান্তে, রাস্তা থেকে দূরে, কৌণিক গড়নের একটা পাথরের প্রাচীর। নামের গরিমাতেই -পার্ক –ফোয়ারা বা খেলার মাঠের সরঞ্জাম –কিছুই নেই। আছে বলতে পার্কের মাঝামাঝি জায়গায় একটা ছোট বাগানের মত কিছু তৈরি করা। সেই বাগানের আঁকাবাঁকা জাফরি কাটা পাঁচিল আইভি লতায় ঢেকে আছে। চারধারে গুল্মের ঝাড়। মাটির ওপর পা রাখবার জন্য সমতল চৌকো বেদী। পার্কটা কোন প্রয়োজনে তৈরি করা হয়েছিল বলা খুব শক্ত, তবে নিয়মিতভাবে কেউ এর যত্ন নেয়। গাছ আর ঝোপ যত্ন করে ছাঁটা, আগাছা বা আবর্জনার চিহ্নমাত্র নেই। পাহাড়ে চড়বার সময়, পার্কটার পাশ দিয়েই গেছিলাম, খেয়াল না করেই।

অবান্তর ভাবনাগুলোকে দখলে আনার জন্য পার্কের ভেতরে এসে সেই ছোট-বাগানের সামনে একটা বেঞ্চিতে বসে পড়লাম। মনে হল আরও একটু অপেক্ষা করা দরকার, ঘটনার গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য (কে জানে কিছু লোকজন হয়ত এখুনি এসে হাজির হবে)। বসে পড়ার পর বুঝতে পারলাম কতটা ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। অদ্ভুত এক অবসাদ, ক্লান্তি যেন অনেকক্ষণ ধরেই ঘিরে রেখেছে আমাকে, শুধু খেয়াল হয়নি, এই মাত্র যেন টের পেলাম। বন্দরের এক দিগন্ত জোড়া ছবি, এখান থেকে দৃশ্যমান। বেশ কয়েকটা বড় বড় জাহাজ নোঙর করা রয়েছে। পাহাড়ের ওপর থেকে জাহাজগুলোকে ছোট ছোট টিনের কৌটোর মত লাগছে, ডেস্কের ওপর জেমস ক্লিপ বা কয়েন রাখার পাত্রের মত।

খানিক পরে, দূর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। গলার স্বরটা স্বাভাবিক নয়, লাউড স্পীকার দিয়ে বাড়িয়ে দেওয়া আওয়াজ। কী বলা হচ্ছে ঠিক বোধগম্য হল না। প্রত্যেক বাক্যের শেষে বেশ দীর্ঘ একটা বিরতি। আবেগহীন, উত্থানপতনহীন গলায় বক্তা যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনও বিষয় অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করছেন। একবার মনে হল বার্তাটা হয়ত আমারই উদ্দেশ্যে, কেবল আমার উদ্দেশ্যেই। কেউ যেন কিছু বলতে চাইছে, কোথায় আমার ভুল হল, বা কোন ব্যাপারটা আমি খেয়াল করিনি। সাধারণত, এভাবে হয়ত আমি ভাবতাম না, কিন্তু কেন জানি না, কথাটা আমার মনে হল। খুব মনযোগ দিয়ে শুনলাম। ধীরে ধীরে কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল, বোঝাও সহজ হয়ে গেল। কোনও গাড়ির ছাদে লাগানো লাউডস্পীকার থেকে নিশচয়ই আওয়াজটা আসছে। গাড়িটা চড়াই বেয়ে সর্পিল পথ ধরে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে, ব্যতিব্যস্ততার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। অবশেষে বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা কী – গাড়ি থেকে খ্রিস্টধর্ম সম্বন্ধীয় কোনও বাণী প্রচার করা হচ্ছে।

“প্রতিটি মানুষেরই মৃত্যু হবে,” নিরুত্তাপ একঘেয়ে স্বরে সেই কণ্ঠ বলে চলেছিল। “প্রতিটি ব্যক্তিকেই কালক্রমে চলে যেতে হবে। মৃত্যু বা তার পরবর্তী শেষ বিচারের দিন থেকেও কারও রেহাই নেই। মৃত্যুর পরে প্রত্যেককেই পাপের জন্য কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।”

বেঞ্চে বসে থাকতে থাকতেই এই বাণী আমি শুনলাম। পাহাড়ের চূড়ায় এমন জনশূন্য এক জনপদে কেউ বা কারা এমন প্রচার করে চলেছেন –ব্যাপারটা একটু অদ্ভুতই লাগল আমার কাছে। এখানকার বাসিন্দারা একাধিক গাড়ির মালিক, এবং এরা রীতিমত স্বচ্ছল জীবনযাপন করে। এরা কি পাপ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য খুব ব্যগ্র –কেমন যেন সন্দেহ হয় আমার! না কি খুবই উদ্বিগ্ন? কে জানে রোজগার আর প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সঙ্গে পাপ আর মুক্তিলাভের কোনও সম্পর্কই হয়ত নেই।

“কিন্তু যারা যিশু খ্রিস্টের শরণ নিয়ে পরিত্রাণ লাভ করতে চাও, এবং নিজের নিজের পাপের জন্য অনুতাপ করতে চাও, প্রভু তাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নরকের আগুনে জ্বলবার হাত থেকে তারা পরিত্রাণ পাবে। ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখ, কারণ যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখবে একমাত্র তারাই মৃত্যুর পর মুক্তিলাভ করে অনন্ত জীবন লাভ করবে।”

খ্রিস্টানদের সেই প্রচার-যান রাস্তায় আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে শেষ বিচার আর মৃত্যু নিয়ে আরও কিছু বলুক, তারই প্রতীক্ষায় আমি ছিলাম যেন। হয়ত আমি মনে মনে দৃপ্তকণ্ঠে কিছু আশ্বাসবাণীও শুনতে চাইছিলাম, সে বাণী যেমনই হোক না কেন। কিন্তু গাড়িটা এলই না। ধীরে ধীরে কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট হতে লাগল, তারপর আর কিছুই শুনতে পেলাম না। গাড়িটা হয়ত অন্য দিকে ঘুরে গেছে। আমি যেখানে আছি তার থেকে দূরে। গাড়িটা হারিয়ে যেতেই মনে হল সমস্ত পৃথিবী আমাকে পরিত্যাগ করে চলে গেছে। একটা কথা হঠাৎ আমার মনে হল। পুরো ব্যাপারটাই হয়ত একটা ফাঁকি –মেয়েটির মস্তিষ্কপ্রসূত। এই ধারণাটা –বা বলব সন্দেহটা –কোথা থেকে এসে উদয় হল কে জানে! ইচ্ছে করেই হয়ত মেয়েটি মিথ্যে খবর দিয়ে রোববারের দুপুরে আমাকে ঘরছাড়া করে এত দূর এক পাহাড়-চূড়ায় টেনে নিয়ে এসেছে। অবশ্য এরকম কাজ কেন করল সেটা ভেবে পেলাম না। কে জানে হয়ত এমন কিছু কখনও করে ফেলেছি, যার ফলে আমার প্রতি ও একটা বিদ্বেষ পুষে রেখেছিল। অথবা হয়ত তেমন কোনও বিশেষ কারণই নেই, আমাকে ওর এতটাই অপছন্দ, যে আমাকে সহ্যই করতে পারে না। ফলে এমন একটা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাল ও আমাকে, যার কোনও অস্তিত্বই নেই। আর এখন নিশ্চয়ই আমার অবস্থা দেখে (বা কল্পনা করে) প্রাণ ভরে হাসছে, আর ভাবছে কেমন বোকা বানিয়েছে আমাকে, কেমন হাস্যকর আর করুণ দেখাচ্ছে আমায়!

ঠিক আছে, তবুও কেউ কাউকে হয়রান করবার জন্য এত কাঠখড় পুড়িয়ে এমন জটিল একটা চক্রান্ত করবে, কেবলমাত্র আক্রোশ চরিতার্থ করার জন্য? এমন কি ওই পোস্টকার্ডটা ছাপতেও তো উদ্যোগ নিতে হয়েছে! কেউ কি সত্যি সত্যিই এত নীচে নামতে পারে? আমাকে এতটা ঘৃণা করার মত কোনও কাজ করেছি বলেও তো মনে করতে পারছি না! অবশ্য অনেক সময়, কিছু না বুঝেই তো আমরা অন্যের অনুভূতিকে দাবিয়ে দিই, আত্মাভিমানে আঘাত করে ফেলি, মনঃকষ্টের কারণ হয়ে পড়ি। অকল্পনীয় এই বিদ্বেষের সম্ভাবনাগুলোকে নিয়ে মনে মনে নানারকম জল্পনা করতে শুরু করলাম, যে সব কারণে ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু গ্রহণযোগ্য কিছুই আবিষ্কার করতে পারলাম না। ক্রমেই আমি বিবিধ বিভ্রান্তির অতলে তলিয়ে যেতে লাগলাম। কিছু বোঝার আগেই আমার শ্বাসকষ্ট হতে শুরু করল।

বছরে একবার দুবার এরকম হয়। মনে হয় মানসিক চাপ থেকেই এরকম শ্বাসের সমস্যা আমার হয়ে থাকে। হঠাৎ একটা দমক এসে কণ্ঠরোধ করে ফেলবে, আর ফুসফুসে পর্যাপ্ত পরিমাণে বায়ু চলাচল করবে না। খুব আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ব, মনে হবে তুমুল একটা স্রোত আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, আমি এখুনি ডুবে যাচ্ছি, আমার সমস্ত শরীর জমে যাচ্ছে। এরকম সময়ে উপুড় হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে শরীরকে তার স্বাভাবিক ছন্দে পৌঁছানোর অপেক্ষা করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার থাকে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সব লক্ষণ আর দেখা দেয় না (এমন কি কথায় কথায় লজ্জায় লাল হয়ে ওঠাও কোনও এক সময় বন্ধ হয়ে গেছে), কিন্তু সেই কিশোর বয়সে এই সমস্যা তখনও আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখত।

পার্কের সেই বেঞ্চেই চোখ শক্ত করে বুজে শুয়ে পড়লাম। অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তিলাভের প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। পাঁচ মিনিটও হতে পারে কি পনেরো। জানি না কতটা সময় পেরিয়ে গেল। অন্ধকারের ভেতর অদ্ভুত সব আদল চোখের সামনে ভেসে উঠেই মিলিয়ে যেতে লাগল। ধীরে ধীরে সেগুলো গুনতে গুনতে শ্বাসপ্রশ্বাসকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার সব রকম চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলাম। বুকের ভেতরে দ্রুতলয়ে একটা ইঁদুর যেন ভয় পেয়ে চারদিকে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছে।

গোনাগুনিতে এতই মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম যে অন্য কোনও ব্যক্তির উপস্থিতি বুঝতে আমার একটু সময় লাগল। মনে হল কেউ যেন সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে লক্ষ্য করছে। খুব সাবধানে, অত্যন্ত ধীরে ধীরে চোখ খুলে মাথাটা অল্প একটু তুললাম। বুকের ভেতর ধড়ফড় তখনও থামেনি।

খেয়ালই করিনি যে একজন বৃদ্ধ বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসে আমার দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে আছেন। কিশোর বয়সের একটা ছেলের পক্ষে বয়স্ক কারোর বয়স আন্দাজ করা খুব সহজ নয়। ওঁরা সবাই আমার চোখে বৃদ্ধ। ষাট হোক কি সত্তর –তফাৎ কোথায়? ওরা কেউই আর অল্পবয়সী নয়, সেটাই হল ব্যাপার। ভদ্রলোক শীর্ণ, মাঝারি উচ্চতার, পরনে ধূসর-নীল রঙের একটা কার্ডিগান, কার্ডোরয়ের বাদামি ট্রাউজ়ার আর নেভি-ব্লু রঙের স্নীকার্স। মনে হল, আনকোরা অবস্থাটা এরা বহুদিন হল পেরিয়ে এসেছে। তার মানে এই নয় যে ভদ্রলোককে খুবই মলিন দেখাচ্ছিল। মাথার ধূসর চুল বেশ ঘন এবং অনমনীয়। কানের ওপর দিয়ে এক গুচ্ছ করে চুল বেরিয়ে আছে, স্নান করার সময় পাখিরা যেমন ডানা ছড়িয়ে দেয় সেভাবে। চোখে চশমা নেই। কতক্ষণ উনি এখানে আছেন আমি জানি না, কিন্তু মনে হল বেশ কিছুক্ষণ ধরেই উনি আমাকে লক্ষ্য করছেন।

নির্ঘাত আমাকে “তুমি ঠিক আছ তো?” জিগ্যেস করতে যাচ্ছেন, বা সেরকমই কিছু, কারণ আমাকে দেখে নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছিল, আমি কষ্ট পাচ্ছি (সত্যিই পাচ্ছিলাম)। বৃদ্ধকে দেখার পর এই কথাটাই আমার প্রথম মনে হল। কিন্তু উনি কিছুই বললেন না, জিগ্যেসও করলেন না কিছু, কেবল ভাঁজ করা কালো ছাতাটা, যেটা উনি ছড়ির মত ব্যবহার করছেন, সেটাকেই শক্ত করে আঁকড়ে থাকলেন। হলদে বাদামি রঙের কাঠের হাতলওয়ালা ছাতা, বেশ শক্তপোক্ত, প্রয়োজনে অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহার করা যেতেই পারে। মনে হল, কাছাকাছিই কোথাও থাকেন উনি, কারণ ওঁর সঙ্গে বিশেষ কিছুই আর নেই।

আমি ওখানে বসেই শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে থাকলাম। বৃদ্ধ নীরবে আমাকে লক্ষ্য করতে লাগলেন। এক পলকের জন্যেও নজর ঘোরালেন না। অস্বস্তি হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল –আমি যেন অনুমতি ছাড়াই খিড়কি দিয়ে কারো বাড়ির উঠোনে ঢুকে পড়েছি। ইচ্ছে করছিল বেঞ্চ থেকে উঠে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাস-স্টপের দিকে চলে যাই। কিন্তু কী কারণে জানি না পায়ে জোর পেলাম না। কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল, তারপর হঠাৎ বৃদ্ধ কথা বলে উঠলেন।

“একটা বৃত্ত যার অনেকগুলো কেন্দ্র।”

ওঁর দিকে তাকালাম। চোখাচোখি হল। বেশ চওড়া কপাল ওঁর, ছুঁচলো নাক। পাখির ঠোঁটের মত ধারালো। মুখ থেকে কোনও কথা বেরলো না। বৃদ্ধ ভদ্রলোক তাই আবার বললেন, “একটা বৃত্ত যার অনেকগুলি কেন্দ্র।”

স্বভাবতই উনি ঠিক কী বলতে চাইছেন, বোঝা গেল না। চকিতে একটা কথা মনে হল –এই ভদ্রলোকই বোধহয় ওই লাউড স্পীকার লাগানো খ্রিস্টান প্রচারগাড়িটা চালাচ্ছিলেন। আশেপাশেই গাড়িটা কোথাও দাঁড় করিয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছেন? না, সেটা হতে পারে না। ওঁর কণ্ঠস্বর আগে যেটা শুনেছিলাম তার থেকে আলাদা। লাউড স্পীকারের বক্তা কম বয়সী কেউ হবেন। কিংবা হয়ত রেকর্ড করা কণ্ঠ।

“বৃত্ত বললেন, তাই না?” বেশ অনিচ্ছার সঙ্গেই জিগ্যেস করলাম। বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ, সাড়া দেওয়াটাই শিষ্টাচার সম্মত।

“অনেকগুলি কেন্দ্র আছে যার, কখনো কখনো সেই সংখ্যাটা অসীম হতে পারে – আর এই বৃত্তের কোনও পরিধি থাকে না।” বলতে বলতে বৃদ্ধ ভ্রূকুঞ্চিত করলেন, কপালের বলিরেখাগুলো গভীরতর হয় উঠল। “মনে মনে তুমি কি এরকম একটা বৃত্তের কল্পনা করতে পারলে?”

মন এখনও আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরেই রয়েছে, তবুও ভাববার চেষ্টা করলাম, ভদ্রতার খাতিরেই যদিও। একটা বৃত্ত, তার অনেকগুলো কেন্দ্র আর কোনও পরিধি নেই। অনেক ভাবনাচিন্তা করেও এমন একটা কিছু কল্পনা করে উঠতে পারলাম না।

“নাহ্‌, ভেবে পাচ্ছি না,” বললাম আমি।

বৃদ্ধ নীরবে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে হল আরও একটু ভাল উত্তরের প্রতীক্ষা করছেন।

“অঙ্কের ক্লাসে এরকম ধরণের বৃত্তের ব্যাপারে আমাদের কিছু শেখানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না,” আমি মিনমিন করে বললাম।

বৃদ্ধ আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ, নিশ্চয়ই শেখানো হয়নি। এটা তো জানা কথা। কারণ স্কুলে ওরা তোমাদের এই ধরণের জিনিস শেখায় না। জরুরি কোনও ব্যাপারই ওরা তোমাদের স্কুলে শেখায় না। সেটা তুমিও ভাল করেই জান।”

আমি ভাল করেই জানি? বৃদ্ধ ভদ্রলোক এমন কথা ভাবলেন কেন?

“এরকম একটা বৃত্তের অস্তিত্ব থাকা কি সম্ভব?” জিগ্যেস করলাম।

“অবশ্যই সম্ভব।“ বৃদ্ধ কয়েকবার মাথা নেড়ে বললেন। “ওই বৃত্তের অস্তিত্ব অবশ্যই আছে। তবে সবাই সেটা দেখতে পায় না। বুঝেছ?”

“আপনি দেখতে পান?”

বৃদ্ধ কোনও জবাব দিলেন না। আমার প্রশ্নটা বেয়াড়াভাবে কিছুক্ষণ বাতাসে ভেসে রইল, তারপর অস্পষ্ট হতে হতে মিলিয়ে গেল।

(৩)

বৃদ্ধ আবার মুখ খুললেন। “শোনো, একে তোমার নিজের ক্ষমতা দিয়েই কল্পনা করে নিতে হবে। তোমার সমস্ত ধীশক্তি দিয়ে এর একটা মানসিক চিত্র তৈরি কর। একটা বৃত্ত যার অনেকগুলি কেন্দ্র, কিন্তু কোনও পরিধি নেই। ঐকান্তিক চেষ্টা করতে হবে তোমাকে। রক্ত জল করা চেষ্টা। তাহলেই আস্তে আস্তে এই বৃত্তটা ঠিক কী সেটা তোমার কাছে পরিষ্কার হবে।”

“খুব শক্ত কাজ মনে হচ্ছে,” আমি বললাম।

“অবশ্যই তাই,” কথাটা এমনভাবে বললেন মনে হল যেন শক্তমতো একটা কিছু মুখ থেকে নিক্ষিপ্ত হল। “এই দুনিয়ায় কোনও কাম্য বস্তুই সহজলভ্য নয়।” তারপর যেন নতুন কোনও প্রসঙ্গের অবতারণা করতে চলেছেন, কেশে গলা সাফ করে নিলেন। “তবে সময় নিয়ে আন্তরিক প্রয়াস করে যদি তুমি সেই দুরূহ বস্তুকে আয়ত্ত করতে পার, সেটাই হবে তোমার জীবনের নির্যাস।”

“নির্যাস?”

“ফরাসি ভাষায় একটা কথা আছে – ক্রেম দ্য লা ক্রেম। শুনেছ কথাটা?”

“না, শুনিনি,” বললাম আমি। ফরাসি ভাষা আমি জানি না।

“ক্রেম দ্য লা ক্রেম। সেরাদের সেরা। এটাই হল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্যাস – ক্রেম দ্য লা ক্রেম। বুঝলে? বাকি যা কিছু, সবই ক্লান্তিকর আর অন্তঃসারশূন্য।”

সেই সময় বৃদ্ধ মানুষটি ঠিক কী বলতে চাইছিলেন আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি। ক্রেম দ্য লা ক্রেম?

“কথাটা নিয়ে ভাব,” বৃদ্ধ ভদ্রলোক বললেন। “আবার চোখ বুজে, একাগ্রমনে ভাব। একটা বৃত্ত যার অনেকগুলি কেন্দ্র, কিন্তু পরিধি নেই। কঠিন বিষয় নিয়ে চিন্তা করার মত করেই তোমার মস্তিষ্ক তৈরি হয়েছে। এক সময় যেটা তুমি বুঝতে পারনি, এখন সেটাই দিশা নির্দেশ করছে তোমায় বুঝতে সাহায্য করার জন্য। আলসেমি বা অবহেলা করলে চলবে না। ভাবনাচিন্তা শুরু করার এটাই সঠিক বয়স। কারণ এই বয়সেই মস্তিষ্ক আর মন পরিণত হতে শুরু করে।”

আবার চোখ বুজে বৃত্তটা কল্পনা করার চেষ্টা করতে লাগলাম। আলসে হতে বা অবহেলা করতে আমি চাই না। অনেকগুলি কেন্দ্র কিন্তু পরিধি নেই, এমন একটা বৃত্তের ছবি মনে মনে আঁকার চেষ্টা করতে লাগলাম। যত মন দিয়েই মানুষটির কথাগুলো ভাবার চেষ্টা করি না কেন, সেই বয়সে কথাগুলোর সঠিক অর্থ বোঝা আমার পক্ষে অসম্ভবই ছিল। যেসব বৃত্তের কথা আমার জানা ছিল, তাদের একটাই মাত্র কেন্দ্র থাকত, আর সেই কেন্দ্রের থেকে সমদূরত্ব বজায় রেখে একটা বক্র পরিধি দুটো বিন্দুকে জুড়ত। খুবই সহজ একটা আকৃতি যা একটা কম্পাস ব্যবহার করে যে কেউ এঁকে ফেলতে পারে। আচ্ছা, বৃদ্ধ মানুষটি যে বৃত্তের কথা বলছিলেন সেটা বৃত্তের স্বাভাবিক ধারণার বিরোধী নয় কি?

না, আমি মোটেও ভাবিনি যে বৃদ্ধ ভদ্রলোকের মাথার গোলমাল আছে। আর উনি আমার পেছনে লাগছেন, এমনও মনে হয়নি। একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথাই উনি আমাকে জানাতে চেয়েছিলেন। এটুকু অন্তত বুঝতে পেরেছিলাম। তাই বোঝবার চেষ্টায় বিরত হলাম না, মন আমার অন্ধকারে হাতড়েই চলল, আলোর দেখা পেলাম না। একটা বৃত্ত অসংখ্য (হয়ত বা সংখ্যায় অসীম) কেন্দ্র নিয়েও কী ভাবে বৃত্ত হয়েই থাকতে পারে? তাহলে কি এটা উন্নত স্তরের কোনও দার্শনিক রূপক? ব্যর্থ হয়ে চোখ খুললাম। সমাধানের জন্য আরও কিছু সূত্র দরকার।

কিন্তু বৃদ্ধ মানুষটিকে আর ওখানে দেখতে পেলাম না। চারদিকে তাকালাম। পার্কে আর কেউ আছে বলে মনে হল না। অনুভব করলাম আমার যেন কোনও অস্তিত্বই ছিল না। তাহলে কি আমি স্বপ্ন দেখছিলাম? হতেই পারে না, এটা মোটেও আমার কল্পনা নয়। উনি এখানেই, আমার সামনেই ছিলেন, ছাতাটা শক্ত করে ধরে ছিলেন, শান্ত স্বরে কথা বললেন, অদ্ভুত একটা প্রশ্ন জিগ্যেস করলেন, তারপরে চলে গেলেন।

লক্ষ্য করলাম আমার শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, মনটাও সুস্থির হয়েছে। স্রোতের প্রাবল্য কমে গেছে। বন্দরের ওপরে ঘন মেঘের আস্তরণে কোথাও কোথাও ফাঁক দেখা যাচ্ছে। ক্রেনের মাথায় অ্যালুমিনিয়ামের চাদরের ওপর এক ঝলক রোদ পড়ে ঝকঝক করছে। যেন ওই বিশেষ জায়গাটা আলোয় ভরিয়ে দেওয়াটাই এখন একমাত্র উদ্দেশ্য। স্তম্ভিত হয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে এইসব অবাস্তব দৃশ্য দেখতে থাকলাম।

সেলোফেনে মোড়া লাল ফুলের ছোট তোড়াটা আমার পাশে পড়ে। অদ্ভুত যে সব ঘটনা আমার সঙ্গে সেদিন ঘটল তার সাক্ষী হয়ে। এটা নিয়ে কী করব সেটা নিয়ে খানিকক্ষণ ভাবলাম, শেষে সেই বেঞ্চের ওপরই ফেলে যাব বলে ঠিক করলাম। মনে হল এটাই সেরা পন্থা। উঠে দাঁড়িয়ে যে বাস-স্ট্যান্ডে নেমেছিলাম তার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ঝোড়ো হাওয়া শুরু হয়ে আকাশের ঘন মেঘের আস্তরণকে সরিয়ে দিচ্ছে।

আমার গল্প বলা শেষ হবার পর একটুক্ষণ চুপচাপ, তারপর আমার তরুণ বন্ধু বলল, “ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হল না। এর পরে কী হল? কোনও উদ্দেশ্যে ছিল, না কেবলই তত্ত্বকথা?”

যে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা আমার হল, কোবের সেই পাহাড়ের ওপরে, হেমন্ত শেষের এক রোববারের বিকেলে –নিমন্ত্রণ পত্রে দেওয়া নির্দেশ মত এসে, যেখানে কোনও একটা পিয়ানো-আসর বসবার কথা ছিল, কিন্তু আবিষ্কার করলাম সেটা একটা পরিত্যক্ত বাড়ি –এসবের মানে কী? আর এতকম হলই বা কেন? এটা আমার বন্ধু জানতে চাইছে। খুবই স্বাভাবিক কৌতুহল, বিশেষত যে ঘটনাটা আমি ওকে শোনালাম, তার কোনও নিষ্পত্তি হল না।

“আমি নিজেই বুঝে উঠতে পারিনি, আজও,” আমি স্বীকার করলাম।

প্রাচীন কোনও হেঁয়ালির মত এরও স্থায়ী কোনও সমাধান নেই। সেদিন যা ঘটেছিল তা বুদ্ধির অগম্য, ব্যাখ্যাতীত, আর সেই আঠেরো বছর বয়সের ‘আমি’কে রীতিমত বিমূঢ় এবং বিহ্বল করে ফেলেছিল। এতটাই যে ক্ষণিকের জন্য মনে হয়েছিল আমি দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়েছি।

“তবে একটা উপলব্ধি মাঝে মাঝে টের পাই,” আমি বললাম, “ব্যাপারটা ঠিক উদ্দেশ্যমূলক বা তাত্ত্বিক নয়।”

বন্ধুকে দেখে মনে হল ও খুবই বিভ্রান্ত। “তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, ঘটনাটা ঠিক কী ধরণের, সেটা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকারই নেই?” আমি সায় দিলাম।

“কিন্তু ঘটনাটা যদি আমার সঙ্গে ঘটত,” ও বলল, “অসম্ভব বিব্রত বোধ করতাম। সত্যিটা জানবার জন্য কৌতুহল হত। এরকম একটা ব্যাপার কেন ঘটল? মানে আমি যদি আপনার জায়গায় থাকতাম, আর কি।”

“অবশ্যই। সেই সময়ে আমিও বিব্রত হয়েছিলাম। ভাল মতই। মর্মাহত হয়েছিলাম। পরে যখন এটা নিয়ে ভেবেছি, দূর থেকে, অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পর, মনে হয়েছিল ঘটনাটা খুবই অকিঞ্চিৎকর, মর্মাহত হয়ে পড়ার মত কোনও ব্যাপারই নয়। মনে হয়েছে জীবনের নির্যাসের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্কই নেই।”

“জীবনের নির্যাস,” কথাটার পুনরাবৃত্তি করল আমার বন্ধু।

“এরকম ঘটনা আমাদের জীবনে ঘটেই থাকে,” বললাম ওকে। “যাকে ব্যাখ্যা করা যায় না, বা যা যুক্তিগ্রাহ্য নয়, অথচ গভীরভাবে মনকে অশান্ত করে ফেলে। আমার মনে হয় সেগুলো নিয়ে মাথা না ঘামানোই ভাল, চোখ বন্ধ করে ওদের অতিক্রম করে যাও। যেন প্রবল একটা ঢেউকে আমরা পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি।”

তরুণ বন্ধুটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, প্রবল ঢেউয়ের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবল। একজন অভিজ্ঞ সার্ফার ও, ঢেউ নিয়ে ভাবতে গেলেই ওর মনে আরও অনেক ব্যাপার, বেশ জরুরি ব্যাপার, এসে পড়ে। অবশেষে কথা বলল, “ঠিকই বলেছেন। বেশ কঠিন ব্যাপার হবে সেটা।”

এই দুনিয়ায় কোনও কাম্য বস্তুই সহজলভ্য নয়, বৃদ্ধ মানুষটি বলেছিলেন, অবিচল প্রত্যয়ের সঙ্গে, ঠিক যেন পিথাগোরাস তাঁর উপপাদ্যের ব্যাখ্যা করছেন।

“ওই বৃত্তটা, যার অনেকগুলো কেন্দ্র কিন্তু কোনও পরিধি নেই,” বন্ধু জিগ্যেস করল, “আপনি কি তার কোনও উত্তর পেয়েছিলেন?”

“ভাল প্রশ্ন,” আস্তে আস্তে মাথা নাড়লাম। পেয়েছি কি আমি?

আমার জীবনে যখনই কোনও ব্যাখ্যাতীত, অযৌক্তিক, অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটে (এটা বলছি না যে এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে, কিন্তু কয়েকবার ঘটেছে), আমি সেই বৃত্তের নিকটবর্তী হয়ে পড়ি –সেই বৃত্ত যেটার বহু কেন্দ্র, কিন্তু যার পরিধি নেই। আর যখনই সেটা হই, আঠেরো বছর বয়সে পার্কের সেই বেঞ্চে বসে যা করেছিলাম, চোখ বন্ধ করে হৃদয়ের শব্দ শুনতে থাকি।

কখনো কখনো মনে হয় বৃত্তটা কী সেটা যেন খানিকটা ধরতে পেরেছি, কিন্তু সম্যক উপলব্ধি আমার ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যায়। বারেবারেই এরকম হয়। এই বৃত্তটার, খুব সম্ভবত, কোনও নির্দিষ্ট বাস্তব আকার নেই, বরং এর একমাত্র অস্তিত্ব আমাদের মনের ভেতরে। এটাই আমার ধারণা। আমরা যখন কাউকে সমস্ত অন্তর দিয়ে ভালবাসি, কিংবা গভীর সমবেদনা অনুভব করি, অথবা আদর্শবাদী চোখ নিয়ে পৃথিবীকে কল্পনা করি, বা ঈশ্বরবিশ্বাসের (বা ঈশ্বরবিশ্বাসের কাছাকাছি কোনও বিশ্বাসের) ওপর আস্থা রাখতে শুরু করি, তখনই কেবল সেই বৃত্তের অস্তিত্ব অনুভব করি এবং হৃদয়ে গ্রহণ করে নিই। যদিও বলতে পারি ব্যাপারটাকে যুক্তিগ্রাহ্য একটা রূপ দেওয়ার জন্য খুব সম্ভব আমার এক অনিশ্চয় প্রয়াস।

কঠিন বিষয় নিয়ে চিন্তা করার মত করেই তোমার মস্তিষ্ক তৈরি হয়েছে। এক সময় যেটা তুমি বুঝতে পারনি, এখন সেটাই দিশা নির্দেশ করছে তোমায় বুঝতে সাহায্য করার জন্য। এটাই হল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্যাস – ক্রেম দ্য লা ক্রেম। বাকি যা কিছু সবই ক্লান্তিকর আর অন্তঃসারশূন্য। পক্ককেশ বৃদ্ধ মানুষটি এই কথাটাই সেদিন বলেছিলেন। হেমন্ত শেষের মেঘলা রবিবারের এক বিকেলে, কোবের একটা পাহাড়ের চূড়াতে বসে, আমার হাতে ধরা লাল রঙের ফুলের ছোট একটা তোড়া। আজও, কখনও যদি মন অশান্ত হয়ে ওঠে, আমি সেই বিশেষ বৃত্তের কথা মনে করি, যা কিছু ক্লান্তিকর আর অন্তঃসারশূন্য, সেটা নিয়ে ভাবি। আর জীবনের যে নির্যাস সেখানে, আমার মনের গভীরে থাকতেই হবে, তার কথাও।

—————-
 
লেখক পরিচিতি: হারুকি মুরাকামি – জাপানি লেখক। জন্ম ১২ জানুয়ারি ১৯৪৯। তাঁর লেখা উপন্যাস এবং ছোটগল্প কেবল জাপানে নয়, সারা বিশ্বে সমাদৃত। বিশ্বের পঞ্চাশটি ভাষায় তাঁর লেখা অনুবাদ করা হয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু উপন্যাস হল – ‘নরওয়েজিয়ান উড’, ‘দ্য ওয়াইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিক্‌ল’, ‘কাফকা অন দ্য শোর’। বর্তমান রচনাটি তাঁর ‘ফার্স্ট পারসন সিঙ্গুলার’ সঙ্কলনের ‘ক্রীম’ গল্পের অনুবাদ। মুরাকামি বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন।

অনুবাদক পরিচিতি:

উৎপল দাশগুপ্ত
অনুবাদক। আলোকচিত্রী
কলকাতায় থাকেন।

7 thoughts on “হারুকি মুরাকামির গল্প: নির্যাস

  • January 15, 2022 at 1:39 pm
    Permalink

    এরকম গল্প পড়ার পর একটা শব্দই ঘুরেফিরে মনে আসে। তা হল অন্তসারশূণ্য। আজকালকার পোস্টমডার্ন গল্প নাকি এমনই হয় যাতে কোন গল্প থাকে না। থাকে শুধু অবাস্তব কল্পনা। কিন্তু পাঠ একবার শুরু করলে শেষ না করে পারা যায় না। এ ধরনের কিছু গল্প আছে যেগুলি পড়ার পর স্তব্ধ হয়ে কিছু সময় বসে থাকতে হয়। এটা অবশ্য তেমন নয়। অনুবাদ সাবলীল ও স্বচ্ছন্দ। শব্দচয়নও খুব ভালো। কিন্তু বন্ধুর সাথে কথায় আপনি কেন?

    Reply
  • January 29, 2022 at 3:08 pm
    Permalink

    বন্ধুটি বয়সে তরুণ। অর্থাৎ গল্পকার বয়োজ্যেষ্ঠ। সেই হিসেবে 'আপনি' বেছে নিয়েছি। অবশ্য 'তুমি' সম্বোধনেও অসুবিধে ছিল না। গল্পটির একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা আছে বলে মনে হয়েছে আমার। অবশ্য মুরাকামির সমস্ত গল্প এবং উপন্যাসেরই একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা থাকে।
    অনুবাদের ভাঢা আপনার ভাল লেগেছে জেনে আপ্লুত হলাম। ধন্যবাদ।

    Reply
  • January 30, 2022 at 1:10 am
    Permalink

    তৃণার পোস্টের সুতো ধরে এসে আপনার এই অনুবাদ পড়া হল। ভাগ‍্যিস এসেছিলাম। অসাধারণ অনুবাদ করেছেন আপনি। মুরাকামি পড়ার আনন্দ পূর্ণমাত্রায় উপভোগ করলাম। ভবিষ্যতে আপনার আরো লেখালেখি পড়ার ইচ্ছা রাখি।

    Reply
    • January 30, 2022 at 2:29 am
      Permalink

      অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। মুরাকামি আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক। অনুবাদটা ভাল লাগায় সার্থক লাগছে। গল্পপাঠে প্রতি সংখ্যাতেই আমার একটা দুটো অনুবাদ থাকে। পড়ে মতামত জানালে ভাল লাগবে।

      Reply
    • January 30, 2022 at 5:56 am
      Permalink

      উত্তর নিচে চলে গেছে মনে হচ্ছে 🙂

      Reply
  • January 30, 2022 at 5:55 am
    Permalink

    অবশ্যই পড়ব। আমিও চেষ্টা করছি হাজির থাকতে। এ সংখ্যাতেও আছি‌। নাগিব মাহফুজের গল্প নিয়ে। আপনি পড়লে ভালো লাগবে। মুরাকামির গল্পও করেছি এখানে – এক শিনাগাওয়া বানরের স্বীকারোক্তি।

    Reply
    • February 1, 2022 at 4:24 am
      Permalink

      হ্যাঁ দুটোই পড়েছি। মুরাকামি থাকলে আমি পড়েই ফেলি। খুব প্রিয় লেখক আমার। শূন্য কাফেও পড়েছি। খুবই ভাল লেগেছে।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=