অনুকরণীয় আচার্য : হাসান আজিজুল হক

 

রুমা মোদক

উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী অভিঘাত সৃষ্টিকারী ঘটনা বোধকরি দেশভাগ, সুশাসনের কুহকে ঢাকা প্রতারণা ও চাতুর্য্যের ইতিবৃত্ত। রাজনৈতিক হিসাব নিকাশের বলি লক্ষ লক্ষ মানুষ।  যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনিচ্ছা আর পর্যদুস্ততায় আজও বহন করে চলেছে। এ এমন এক ক্ষত, যে ক্ষত সৃষ্টিতে সাধারণ মানুষের কোন দায় ছিলো না,অথচ সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হয়েছে তারাই। 

দেশভাগের এক রক্তাক্ত পথিক হাসান আজিজুল হক।ক্ষত বিক্ষত। নিজ জীবনের অভিজ্ঞতায়, পথচলতি যাপনের অভিজ্ঞতায়। রেডক্লিফের যথেচ্ছ ছুরি তাঁকে  উৎখাত করেছে ভিটেমাটি থেকে, রাঢ়বঙ্গের শিকড় থেকে। তিনি কিংবা তাঁরা চেয়েছিলেন কি চাননি তোয়াক্কা না করে। রাজনীতির চালে জনসাধারণ দাবা খেলার খেলোয়াড়ের ব্যবহার্য গুটির মতো জরুরি কিন্তু ‘জড়’।   তাদের আবার চাওয়া পাওয়া, প্রত্যাশা হতাশা! তাদের ঠেলে দেয়া যায় শিয়ালদা স্টেশনের উদ্বাস্তু জীবনে। তুলে দেয়া যায় মৃত্যুর ট্রেনে। তারা প্রতিবাদ জানেনা,নিয়তি জানে। তারা রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী নেতৃত্বের লোভের যুপকাষ্ঠে গলা বাড়িয়ে দেয় নির্বিবাদে।

রাজনীতি তারপরও ক্ষান্ত নয়। পক্ষপাত দুষ্ট নানা ন্যারোটিভের আশ্রয়ে ভুলিয়ে দিতে চায় প্রতারক সেই সময়কে,যা কিনা সহস্র মানুষের জীবনের মানবেতর পতনের নিয়ামক। মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায়, সে উত্তুঙ্গু। ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতালিপ্সু গোষ্ঠী  অখণ্ড পৃথিবীকে নানা সংকীর্ণতার প্রাচীরে বিভক্ত করতে গিয়ে তাতে আরোপ করে অনিবার্যতার মোড়ক। 

সবাই নয়, কেউ কেউ রুখে দাঁড়ায়। প্রতিবাদে, রোষে। কখনো তাঁর অস্ত্র অসী নয়, বরং তার চেয়ে শক্তিশালী মসী। ক্রমাগত যা আঘাত করে সংবেদনশীলতায়, পুন পুন বলে যায় বিশ্বাসঘাতক সময়ের কথা বিস্মৃত প্রবণ জাতির কাছে। হাসান আজিজুল হক সেই কেউ কেউ এর উজ্জ্বল একজন, যিনি বিশ্বাসঘাতক সময়ের কথা বলেন। সেই সময়ের অসহায় বলি মানুষের নিষ্পেষিত, পতিত জীবন যুদ্ধের কথা বলেন।  

বর্ধমানের ছেলে চলে এলেন পূর্ববঙ্গে। এলেন বটে। সাথে নিয়ে এলেন যে ট্রমা, শৈশব কৈশোর ফেলে আসার ট্রমা, হয়তো তা একটুখানি লালমাটির জন্য, ঘরের টিনের পাঁচিলের জন্য, হয়তো করবী গাছটির জন্য। প্রতিটি দিন অর্জন করলেন দুঃসহ অভিজ্ঞতা। উদ্বাস্তু জীবনের পর্যদুস্ত যাপনের অভিজ্ঞতা। টিকে থাকার নির্মম লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আর তা থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জন্ম নিলেন একজন হাসান আজিজুল হক। শুধু কী তা থেকেই? উৎখাত হবার পর টিকে থাকার লড়াই, আর সেই নির্মমতাকে ক্রমাগত ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা তাও কী কম বড় নিয়ামক একজন হাসান আজিজুল হক তৈরিতে!  

আত্মজা ও একটি করবী গাছের লেখক হিসাবে তাঁকে যখন আবিষ্কার করি আমরা, তার আগে কী ঋত্বিক ঘটকের সাথে পরিচয় হয়?  ঋত্বিক ঘটক মানে,মেঘে ঢাকা তারা। দুই বাংলা থেকে উৎখাত দুই ক্ষনজন্মা। অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির একই বীজতলা। তাই কী আত্মজা ও করবি গাছের বৃদ্ধ পিতা আর ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারার বৃদ্ধ পিতা কোথায় এক গভীর বিষাদের সংবেদনে এক হয়ে যায় আমাদের কাছে। আমরা দেখি মহৎ নির্মাণ হাসান আজিজুল হক আর ঋত্বিক ঘটককে একীভূত করে দেয় এক ফেনোমেনায়। তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ ন্যারেশন, কখনো বইয়ের পাতায় কখনো সেলুলয়েডের ফিতায় সাক্ষ্য হয়ে উঠে ঐতিহাসিক ক্রান্তিকালের।তাঁরা কালের কথক। কালোত্তীর্ণ। বলে যাবার দায় তাড়িত সৃষ্টিশীল প্রাণ। 

চর্যাপদের কবিরা শবরি বালির মতো চরিত্রকে কালের গর্ভে রোপণ করে গেছেন বলে আমরা সে সময়কে জানি। উঁচা পর্বতে তার বাস ছিলো, হাড়িতে ভাত ছিলো না নিত্য উপবাসের জীবন ছিলো। একাডেমিক প্রথাবদ্ধতা যে ইতিহাস পড়ায় পালবংশ,সেনবংশ, মৌর্য আমল,গুপ্ত আমল কোথাও কী এই শবরি বালির কথা বলা আছে?  অথচ এই হাজার হাজার সাব অল্টার্ণ মানুষেরাই তো সভ্যতার পরিবর্তনের মূল নিয়ামক, ভুক্তভোগী এবং আত্মত্যাগী।

হাসান আজিজুল হক সেই ইতিহাসের কথা বলেন, যে ইতিহাস রাজপ্রাসাদ আর রাজসিংহাসন ছেড়ে কুঁড়ে ঘরে আসন পাতে। রাজ সিংহাসন দখলের দুই কুকুরের লড়াই যেখানে কোন অবস্থাতেই টিকে থাকার লড়াইয়ের চেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠে না। আভিজাত্যে যাঁরা উপেক্ষিত অথচ সময়ের উত্থান পতনে যাদের অবস্থান সবচেয়ে গুরুত্ববহ। কখনো সে সময়ের নাম শকুন, কখনো গুনীন,কখনো আত্মজা ও একটি করবী গাছ, কখনো পাতালে হাসপাতালে।

লেখক মূলত ঘুরেফিরে নিজেকেই লিখেন। নিজেকে লিখেন অর্থাৎ নিজের দর্শন আর দায়বোধের দায় শোধ করেন।  এই দর্শন তৈরি হয় অভিজ্ঞতা থেকে। একজন মানুষ যখন হয়ে উঠেন, উঠার বাঁকে বাঁকে তাঁর যে অর্জন কিংবা বিসর্জন যা দিয়ে নির্মিত হয় সে, তার সবটুকু জারিত করে তাঁর লেখা। হাসান আজিজুল হক যে করবি গাছের কথা লিখেন তা মূলত তাঁর লেখক সত্তা নির্মিত। তাঁকে লিখতে হয়েছে সেই বৃক্ষের কথা। যে বৃক্ষে ফুল হয়, সে ফুলে বিষ থাকে। হাসান আজিজুল হক দেশভাগের ট্রাজেডিতে সদ্যতো বটেই  সুদূরতায়ও বিষ দেখতে পেরেছিলেন, জ্যোতিষীর মতো। তাই করবী গাছটা বুড়ো রুয়ে দেন মাটি পরিবর্তন করে এসেই। মেয়ে নয় পিতা নয় করবী ফুলের গাছটাই লেখকের  কাঙ্ক্ষিত নির্মাণ, গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি উদ্বাস্তু জীবনের যে নির্মমতা লিখতে চেয়েছেন, লিখতে চেয়েছেন যে বিষবৃক্ষের কথা,এর চেয়ে নান্দনিক আশ্রয় আর কী হতে পারে? 

শকুন গল্পেও একটা শকুন আঁকেন তিনি। দলছাড়া শকুন। আমরা শকুনের গল্প পড়ি। একদল ছেলের তাঁকে তাড়া করে ফেরা, তিনি হাসান আজিজুল হক, প্রথম গল্পেই মরা শকুনের পাশে মৃত বাচ্চাটি রেখে আর বিধবা মেয়েটিকে কোথাও দেখা যায়না ইংগিত রেখে গল্প শেষ করে দেন। শেষ ধাক্কায় আমরা হতচকিত হয়ে আবিষ্কার করি তাঁকে। প্রথম গল্পের শেষ ধাক্কা। আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দেয়। সত্য এবং  নির্মম নগ্ন সত্যকে বলে দেয়ার দায় নিয়ে তিনি আবিভূর্ত হন। তারপর অনতিদীর্ঘ সাহিত্য জীবনের ভ্রমণে তিনি ক্লান্তিহীন পথিক, লিখে যান লিখে যান কেবল মানুষকেই। লিখে যান বিক্ষুব্ধ,পর্যদুস্ত জীবনকে। 

আমাদের সাহিত্যের ট্রাজিক গন্তব্য  ঈদসংখ্যা। বাজার চলতি লেখকের অপরিসীম ক্ষমতা। সিজনে গোটা কয়েক উপন্যাস।   ঈদে ঈদসংখ্যায় লেখার পরিমাণ বড় লেখকের (?) পরিমাপক। তিনি সে মৌসুমে আত্মসমর্পণের জন্য আসেন নি। লিখে গেছেন। লিখে গেছেন গল্প। পাঠক প্রত্যাশা করছে উপন্যাস। তিনি থোড়াই কেয়ার করছেন পাঠক প্রত্যাশা। বাজার চলতি জনপ্রিয়তার হাতছানি। শেষ বয়সে এসে লিখলেন দুখানি উপন্যাস।

মানুষের কাছে তাঁর দায় ছিলো। এ দায় তাঁকে দিয়েছিলো তাঁর  যাপিত জীবন। জীবন কি কেবলই বিষাদময় যাপনের? তিনি নিজে বলেন, যা দেখেছি তাইতো বলি। আমরাও তাই দেখিনা কী? যদি পক্ষপাতের অন্ধত্ব গ্রাস না করে। ফুলের বিছানা কই এখানে? 

হাসান আজিজুল হক কী “পক্ষপাতদুষ্ট” ছিলেন? মার্কসিস্ট আদর্শে চালিত হয়েছেন, ফলত তাঁর গল্প একরৈখিক আদর্শায়িত বৈচিত্র্যহীন, এমন অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু এখানেই তিনি এক ও অনন্য। তিনি লিখেছেন নিজের তাগিদে। পাঠকের চাহিদা নয়, বিনোদিত করা নয়।  জনপ্রিয়তার মোহ তাঁকে স্পর্শ করেনি, সেলাম ঠুকে সম্ভ্রমে সরে দাঁড়িয়েছে। তিনি তাই লিখেছেন যার প্রতি নিজে  দায় বোধ করেছেন।

লেখক হয়ে উঠা, হয়ে উঠতে চাওয়ার নানা ধাপে আমরা অনেকেই বিভ্রান্ত হই। পাঠকের রুচি নিবৃত্তির বিনিময়ে নানাবিধ প্রাপ্তিতে উচ্ছ্বসিত হই, দিগভ্রান্ত হই। আমাদের গন্তব্য কিংবা দায় ভুলে যাই। কখনো অস্বীকারও করি।জীবদ্দশায় অর্থ বিত্ত খ্যাতির মোহ ত্যাগ করা বড়ো কঠিন। পারি কিংবা না পারি লেখক হিসাবে এই কাঙ্ক্ষার কাছে আমরা নতজানু হই কতো সহজে। হাসান আজিজুল হক তাঁর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন নিজের দৃঢ়তায়, নিবেদনে। 

নিতান্ত ক্ষুদ্র এক লেখক হয়ে আমি মূলত তাঁর এই আত্ম নিবেদন অনুসরণ করি একাগ্রতায়। যে একাগ্রতায় তিনি একজনই, অদ্বিতীয় বাংলাদেশে, বাংলাসাহিত্যে। তাঁর সমতুল্য দূরে থাক, তুলনাযোগ্য কাউকে দেখিনা চতুপার্শ্বে। লিখতে আসা, লিখতে থাকা  বিরতিহীন প্রজন্মের কাছে তিনি সম্মুখ বিস্তার করে থাকা অনুকরণীয় আচার্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=