ইন্দ্রাণী দত্তের গল্প: পয়লা আষাঢ়

রুবির বাঘের নাম শান্তনু। বাঘ যেমন হয়-পেল্লায়, ডোরা কাটা, বিশাল খণ্ড ত ল্যাজ। ভারি বলিষ্ঠ থাবা ঘিরে সাদা নরম রোঁয়া। বিষণ্ণ পোখরাজ চোখ। কানের পিছনে, থাবায় গভীর ক্ষতচিহ্ন। এখন রাত বারোটায় মোড়ের মিষ্টির দোকানের ঝাঁপ বন্ধ – দু’ধাপ সিঁড়ির নিচে ভাঙা ফুটপাথ-সেখানে এক ছটাক ঘাসের দখল নিয়ে কাড়াকাড়ি স্ট্রীটলাইট আর জ্যোৎস্নার; দুটো লাল গাড়ি পর পর পার্ক করা। মিত্র সুইটস আর গাড়ির মাঝখানে ঐ জ্যোৎস্নার ওপর হিসি করছিল শান্তনু – আকাশের দিকে মুখ, সামনের দুপায়ে শরীরের সম্পূর্ণ ভর, পিছনের পা ভাঁজ করা এবং লম্বা ল্যাজ মাটির সঙ্গে সমান্তরাল-ওর পিঠের ডোরা এই মুহূর্তের চাঁদের আলোয় সিপিয়া আর সাদা। রুবির হাতে একটা বড় কালো চাদর ভাঁজ করা; সে শান্তনুর পিঠে হাত রেখে সটান দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছিল। রুবি যেন এক বন্ধ দরজার পাল্লা-যার আড়ালে বসে, প্রকৃতির ডাকে নিশ্চিন্তে সাড়া দিচ্ছিল শান্তনু- ঝাঁঝালো বুনো গন্ধ সিঁড়ির ধাপ বেয়ে পৌঁছোচ্ছিল মিত্র সুইটসের সাইনবোর্ড অবধি, ঘাসের ওপর চাঁদের আলো তরল আর হলুদ হয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ।
 
রুবিদের গলিটা আদতে জটিল ও প্যাঁচালো- তবে, এর দেওয়ালে ওর দোকানে ঠোক্কর খেতে খেতে শেষ অবধি বড় রাস্তায় পৌঁছে গেছে। গলিতে রিক্শা, ঠ্যালাগাড়ি ছাড়া কিছু চলে না-ইদানিং অবশ্য রাতের দিকে অটো চলার আওয়াজ পায় রুবি। শান্তনুও অটোতেই এসেছিল। সেদিন রুবি আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়েছে, বেশ রাত- অটোটা রুবিদের বাড়ির সামনের গাড্ডায় পড়ে ক্যাঁক করে উঠেছিল যেন পা ভেঙেছে-তারপরেই অদ্ভুত গন্ধে রুবির দোতলার ঘর ভরে গিয়েছিল- আশ্চর্য গন্ধ – কেউ যেন মাধবীলতার ফুল আর চিড়িয়াখানার গন্ধ একটা বোতলে ঢুকিয়ে খুব ঝাঁকিয়ে তারপর ফটাস করে ছিপিটা খুলে দিয়েছে। অত রাত, ঐ গন্ধ, তার আচম্বিত ও তীব্রতা- রুবি আলো জ্বালায়, দরজা খোলে – সিঁড়ির ল্যান্ডিংএ শান্তনু বসে ছিল -ডোরা কাটা বিশাল পিঠের পেশী চল্লিশ ওয়াটের আলোয় সামান্য ময়লা দেখাচ্ছিল; কানের পাশে রক্ত শুকিয়ে আছে। লতানো মাধবীলতা ছিল সিঁড়ির পাশে, সেই ফুল মাড়িয়ে ল্যান্ডিং অবধি উঠেছিল শান্তনু-সিঁড়িতে পিষ্ট ফুল, কাদা ও রক্ত লেগে ছিল। রুবির চোখে চোখ রেখে বিশাল হাই তুলেছিল সে-মুখের ভিতর গোলাপি জিভ আর তীক্ষ্ণ সাদা দাঁত দেখা গিয়েছিল। রুবির মনে হয়েছিল, যেন এক রণক্লান্ত মহারাজ যুদ্ধ শেষে ফিরেছেন। মহারাজ ভাবতেই পরের শব্দটা সৌরভ নয়, শান্তনু মনে হয় রুবির – অটোম্যাটিক। পাসপোর্ট ছবির মতো ছোটো চৌকো ফ্রেমে কমলা মুকুট, কমলা আর কালোতে রাজপোষাক, কমলা ধনুর্বাণে মহারাজ শান্তনু, নীল ব্যাকড্রপ -তলায় লেখা হস্তিনাপুরের মহারাজ শান্তনু। সেই রাত থেকে শান্তনু এই বাড়িতে রুবির সঙ্গে।

আজ পয়লা আষাঢ়- এখন রাত বারোটা, রুবির জন্মদিন। রুবি দিনক্ষণ এইভাবে বলতে ভালোবাসে অর্থাৎ যেখানে বাকি নিরানব্বই জন বলবে ১৬ই জুন জন্মদিন, রুবি বলবে পয়লা আষাঢ়। কখ্নও দু একদিন বাড়িয়ে কমিয়েও নেয় রুবি-যেমন ওর ভাইয়ের জন্মদিন আদতে তেরই অগাস্ট, রুবি বলবে বিলু জন্মেছিল স্বাধীনতা দিবসে। তো এইভাবেই রুবির মা বাবার বিয়ের তারিখ পঁচিশে বৈশাখ, মায়ের মৃত্যুদিন দোলপূর্ণিমা। এই রকম বলতে বলতে দিনগুলো নিজেই বিশ্বাস করতে শুরু করে রুবি তারপর দেখতে পায়-বিলুর জন্মদিনে জাতীয় পতাকা উড়ছে- ও হাসিমুখে বিলুকে কোলে করে বারান্দায় – প্রভাতফেরি বেরিয়েছে- বিলুর কপালে চন্দনের একটা টিপ অথবা আকাশ জুড়ে মস্ত বড় সোনালি চাঁদ – হরিধ্বনি দিয়ে ওরা মা কে নিয়ে যাচ্ছে-চাঁদের আলোয় খইগুলি, খুচরো পয়সা। স্কুলে পড়ার সময়ই রুবির এই দিনক্ষণ এদিক ওদিক করার ব্যাপারটা জানাজানি হয়, তারপর যথারীতি কানে কানে পল্লবিত হতে থাকে। একদিন ছন্দা আঙুল তুলে ওকে মিথ্যুক বলে, তারপর সুনন্দা; ফার্স্ট গার্ল নয়নতারা সুপ্তিদির কাছে ওর নামে নালিশ করে। শাস্তি, নালিশ, নামের আগের বিশেষণ- রুবি বদলায় নি- সে ঘটনার পঁয়ত্রিশ বছর পরেও ওর জন্মদিন পয়লা আষাঢ়।

বস্তুত, আজ পয়লা আষাঢ়, দুপুর একটায়, পঁয়ত্রিশ বছর পরে রুবির সঙ্গে সুনন্দা, ছন্দা, নন্দনা, দীপ্তি, অনসূয়াদের দেখা হবে। নয়নতারা আমেরিকা থেকে এসেছে -সিটি সেন্টারে আজ দুপুরে সবাই একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া গল্পগাছা। দীপ্তিই ফেসবুকে বিলুকে খুঁজে বের করেছিল, বিলুর থেকে রুবির ল্যান্ডলাইনের নম্বর-ফোন করে বলেছিল, ‘আমরা তো সবাই আছি ফেসবুকে, কত খুঁজেছি তোকে – কোথায় ছিলি তুই? ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট নেই?’
রুবি বলেছিল, ‘ কোথায় যাব? বরাবর এখানেই তো…’
দীপ্তি হেসে হেসে বলেছিল, ‘ আরে, তোদের পাড়ায় খোঁজার কথা মনেই হয় নি, জানিস? আসলে সবাই তো বিয়ে টিয়ে হয়ে অন্য কোথাও, তাই আর কি…’ রুবি বুঝে গিয়েছিল, মাঝখানের এই পঁয়ত্রিশ বছরের পুরো গল্পটা বিলুর থেকে অলরেডি জেনে নিয়েছে দীপ্তি। তবু, দীপ্তির হাসির সঙ্গে, কথার সঙ্গে হু হু করে ছোটোবেলা ঢুকছিল রুবির ঘরে-সুপ্তিদি, পূরবীদি- সবুজ গেটের পাশে দুটো কদম গাছ- ক্লাস থ্রীতে ‘ পূজারিণী’ হচ্ছে-ভাস্কর ওকে একটা জাহাজের ছবি এঁকে দিচ্ছে-বেগুনি জাহাজ, সবুজ ঢেউ তারপর বলছে, ‘বিয়ে করবি আমাকে ?…’ রুবির একবার মনে হ’ল, জিগ্যেস করে-‘ভাস্কর কোথায় রে? কী করছে?’ তারপর এক কথায় সম্মতি দেয়; বলে, ‘যাবো, নিশ্চয়ই যাবো সেদিন।’ আসলে, বহুদিন রুবিকে কেউ ফোন করে নি; যেতেও বলেনি কোথাও।যাতায়াতের পথে রুবি দেখেছে সিটি সেন্টার, দেখেছে, আলো জ্বলা বিপণি, গাড়ির ভিড়- মানুষজন ঢোকে বেরোয়, তাদের হাসি, হাতে ধরা শিশু, বেলুন ও পণ্যসম্ভার – ভিতরে ঢুকতে ইচ্ছে হয়েছে খুব। পরক্ষণেই নিজে নিজেই ভেবে নিয়েছে – যেদিন ও আসবে এখানে, হয়তো একবারই আসবে-খুব বিশেষ একটা দিন যেন হয়- হয়তো বড়দিন কিম্বা- দীপ্তির ফোন রেখে দিয়ে ওর মনে হতে লাগলো- ওর পঞ্চাশ বছরের জন্মদিনটাই পারফেক্ট হবে- জন্মদিনের দুপুরে সিটি সেন্টার-উজ্জ্বল আলো, সামনে বড় কেক, মোমবাতি, ছোটোবেলার বন্ধুরা আর সে –

টেলিফোনে এই সব কথোপকথন কিছু আগের -শান্তনু তখনও আসে নি। আজ এখন ১৬ই জুন-আর তেরো ঘন্টা বাদে পয়লা আষাঢ়ের দুপুরে ওকে সিটি সেন্টার যেতে হবে। শান্তনু কীক’রে এতক্ষণ একলা থাকবে বাড়িতে -ভাবতে ভাবতে রুবি মিষ্টির দোকানের সামনের ফুটপাথে উঠল। এই ক’দিন শান্তনুকে লুকিয়ে রেখেছে রুবি। ওদের পাড়ায় আর কোনো বাঘ নেই- অন্ততঃ রুবি জানে না- দেখতে পেলে শান্তনুকে হয়ত পাড়া থেকে বের করে দেবে। সবার তো সব সহ্য হয় না- রুবির জেঠুর যেমন কুকুরে অ্যালার্জি ছিল, মায়ের ছিল বিড়ালে। বড়পিসি টিকটিকি ভালোবাসত, আবার আরশোলা দেখলেই ঝাঁটার বাড়ি। ওদের পাড়ার সবার হয়ত বাঘে অ্যালার্জি- কে জানে। কোনদিন কথা তো হয় নি কারোর সঙ্গে। ওর বাড়িতে এমনিতে কেউ আসে না, বাড়ির কাজকর্ম নিজেই করে, সকালের দিকে পাঁচ মিনিট হেঁটে দুটো আলু পেয়াঁজ দু টুকরো মাছ। কেউ এসে শান্তনুকে দেখে ফেলবে, সে সম্ভাবনা ছিল না। ভয় ছিল গন্ধে আর গর্জনে। শান্তনু চুপচাপ ছিল- এই ক’দিন, ওর কানের পাশের ক্ষতে, থাবায় ডেটল লাগালে সামান্য আঁক করে চুপ করে যেত, আর গন্ধটা দরজা জানলা এঁটে সামলে দিয়েছিল রুবি। খাওয়া নিয়ে কোনো ঝামেলাই নেই -রুবির সঙ্গেই ভাত ডাল মাছের ঝোল। রুবি কাঁটা বেছে সামান্য লেবু চিপে দেয় ডালে- পেটির মাছ বেজায় ভালোবাসে শান্তনু। আর দাদাগিরি। দা দা গি রি শুনলেই এক লাফে টিভির সামনে। রাতের দিকে, পাড়া নিঝুম হ’লে শান্তনুকে নিয়ে হাঁটতে বেরোয় রুবি- মিত্র সুইটসের সামনে প্লাস্টিকের প্লেট, চামচ, মাটির খুরির ছোটো স্তূপ- জায়গাটা বাথরুম হিসেবে শান্তনুর পছন্দ।
 

এইমাত্র রাত বারোটায় শান্তনুর বাথরুমপর্ব শেষ হ’ল। গোটা পাড়া দিব্যি ঘুমিয়ে। সোনার তরী অ্যাপার্টমেন্টসের তিনতলায় এক বিন্দু লাল আলো দেখা যাচ্ছিল-কেউ সিগ্রেট খাচ্ছে, সম্ভবতঃ বসাকবাবু; রুবি চট করে শান্তনুর গায়ে কালো চাদরটা ফেলে দিল। এই টেকনিক রুবির পরীক্ষিত ও প্রমাণিত- ও নিজেও যখন বাড়ি থেকে বেরোয়, চোখে কালো চশমা, গায়ে পরিপাটি জড়ানো আঁচল, শীতে চাদর ও ঘোমটা -রুবি দেখেছে, এভাবে সে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে; পথে ঘাটে কেউ তাকায় না, কেউ জিগ্যেস করে না-‘অত বড় বাড়িতে একলা থাকো, ভয় করে না? এত রোগা হয়ে যাচ্ছ কেন? খাও না? ইশ কী কালো হয়ে গেছ! শোনো,শোনো, সমীরণের সঙ্গে যোগাযোগ নেই আর?’ পাড়ায়, বাজারে, বাসে, মেট্রোয় ওর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ হাসে না, গায়ের ওপর দিয়ে, ওকে ভেদ করেই চলে যায় একটুও না হেসে, কথা না ব’লে অথচ কালো চশমার ভিতর দিয়ে রুবি সবাইকে দেখতে পায়। এভাবেই ও কালো চাদরের উপকারিতা উপলব্ধি করে। এখনও রাত বারোটায় ওর গায়ে আঁচল।
 
শান্তনুকে চাদরে ঢেকে খানিকটা নিশ্চিন্ত হল রুবি। চাদরের তলায় শান্তনুর হাঁটা, পেশীগুলির নড়াচড়া চাঁদের আলোয় স্পষ্ট-মস্ত কালো ছায়া পাশে নিয়ে রুবি গলির শেষে পৌঁছে যায়। বড়ঘরে টিভি, সামনের সোফায় শান্তনুর বিছানা, জানলার পাশে জলের বাটি। শান্তনু জল খেয়ে গুটিসুটি হয়ে শোয়। রুবি টিভি চালায় এবং সামান্য উদ্বেগে থাকে-কেউ যদি দেখে থাকে শান্তনুকে। আধঘণ্টা কেটে গেলে কালো চাদরের কামাল সম্পর্কে সে নিঃসংশয় হয় এবং মনস্থির করে – সিটি সেন্টারে শান্তনুকে সঙ্গে নিয়েই যাবে-কালো চাদরটা ওর গায়ে জাস্ট ফেলে দিলেই হবে।

রুবির বাড়ি থেকে সিটি সেন্টার হাঁটা পথ। যদিও বাস চলে, অটো-ও, রুবি ঠিক করল হেঁটেই যাবে। দুপুর বারোটা নাগাদ শান্তনুকে নিয়ে সে বড় রাস্তার মোড়ে এল। আজ সে সানগ্লাসবিহীন, গায়ে আঁচল জড়ায় নি-তার জন্মদিনে সে আজ ছোটোবেলার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে- অনেকদিন পরে ফ্রায়েড রাইস খাওয়ার সাধ হচ্ছিল রুবির -ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, আর আইসক্রীম। বিশালদেহী শান্তনু কালো চাদরের তলায় গদাইলস্করি- ল্যাজ গুটিয়ে এক বিশাল অন্ধকার ছায়ার মত হেঁটে চলছিল রুবির সঙ্গে, রাস্তা ক্রস করার সময়ে রুবির ইঙ্গিতে থামছিল, মাঝে মাঝে রুবি কালো চাদর সরে গিয়েছে কি না চেক করছিল, ল্যাজের দিকের চাদরের প্রান্ত টেনেটুনে দিচ্ছিল মাঝে মাঝে তারপর একসময়ে পোঁছে গিয়েছিল সিটি সেন্টারে।

ফুডকোর্টে পৌঁছে রুবি দেখল মধুছন্দা, প্রতিমা, সুলতা, লতিকা, দীপ্তি, যমুনা, সুনন্দা, ছন্দা আর নয়নতারা-চিনতে অসুবিধে হচ্ছিল না রুবির। বাকিরা খুব সম্ভব এখনও পৌঁছোয় নি। প্রতিমার হাত -গলার গয়না দেখছিল দীপ্তি, নয়নতারা সেল্ফি তুলছিল। যমুনা আর ছন্দা ঠেলাঠেলি করে হাসছিল। কে এফ সির সামনে কালো চাদরের তলায় শান্তনুকে বসিয়ে রুবি এগোল। যমুনা ছন্দারা ততক্ষণে ফুডকোর্টের টেবিল দখল করছে-একটা দুটো তিনটে চারটে পাঁচটা-নয়নতারার গলা জড়িয়ে ছবি তুলেই যাচ্ছিল সুলতা, প্রতিমা এইবার তাতে যোগ দিল। একে একে চন্দনা, ঝিমলি, উমাকে আসতে দেখছিল রুবি। এক একজন করে আসছে-গলা জড়াজড়ি করে ছবি তুলছে, টেবিলে ব্যাগ রেখে বসে ঘাম মুছছে আর প্রবল হাসছে। এই ক’বছরে অনেক বদলে গেছে মেয়েগুলো- ভারি শরীর, গয়না গাঁটি, জমকালো শাড়ি -রুবির সামান্য নার্ভাস লাগছিল। ও রুমাল দিয়ে ঘাম মুছল তারপর প্রথম টেবিলে নয়নতারার পাশে গিয়ে বসল। প্রতিমা চন্দনা আর দীপ্তি নয়নতারার অন্য পাশে, উল্টোদিকে ঝিমলি আর উমা-অনর্গল কথা বলে চলছিল ওরা- শ্বশুরমশাই, কোমরব্যথা, ছোটো মেয়ের মাধ্যমিক, বড় ছেলের জয়েন্ট, অম্বল, সুপ্রকাশ, চঞ্চল, বিজন-এই সব শব্দ আর খুচরো বাক্যবন্ধ কানে আসছিল রুবির। নয়নতারা, প্রতিমা, যমুনার চোখের দৃষ্টি ওর মুখের ওপর ভেসে বেড়াতে দেখছিল রুবি অথচ ওর চোখে চোখ রাখছিল না কেউ। ও সবার দিকে তাকিয়ে হাসছিল সেই কখন থেকে-এতটা সময় হাসি ধরে রাখতে গিয়ে চোয়াল ব্যথা করছিল রুবির। দীপ্তি চশমা খুলে চোখ মুছল একবার-রুবি ভাবল এইবার চশমা পরলেই ওকে ঠিকঠাক দেখতে পাবে দীপ্তি, তারপর চন্দনা, ঝিমলি, মধুছন্দা -একসঙ্গে বলে উঠবে-‘আর্রে! হ্যাপি হ্যাপি বার্থডে -কখন এলি- একটুও বদলাস নি তুই ‘
দীপ্তি চশমা পরল, তারপর নয়নতারার দিকে তাকাল। নয়নতারা উঠে দাঁড়িয়ে নাটকীয়ভাবে ঘোষণা করল-‘আজ আমি খাওয়াব তোদের- এত দিন পরে দেখা- আই অ্যাম সো সো সো গ্রেটফুল-তোরা আমার জন্যই এলি- সো সুইট অফ ইয়ু’। দীপ্তি সঙ্গে সঙ্গে আঁচল কোমরে গুঁজে সবাইকে জিগ্যেস করতে লাগল-‘ এই, কে কী খাবে-যমুনা এই যমুনা শিগ্গির বল। ঝিমলি, এই তোর না আজ নিরামিষ? উমা তুই? মধুছন্দা তোর কিসে কিসে অ্যালার্জি ফটাফট বলে ফ্যাল…’
 

রুবি খুব মরিয়া হয়ে হাত নেড়ে বলল, ‘এই আজ আমি খাওয়াই? আজ তো আমার জন্মদিন। কী রে, মনে নেই তোদের?’ বাল্যবন্ধুদের দৃষ্টি ওকে পেরিয়ে, ওকে ফুঁড়ে উল্টোদিকের দোকানপাট, আলোর মালা, বার্গার, মোমো, পিজ্জা, ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন দেখছিল। রুবি আবার হাত নাড়ল, উঠে দাঁড়াল, দুহাত মাথার ওপরে তুলে নাড়ল এবারে- জনে জনে নাম ধরে ডাকল-উমা, এই উমা, মধু, মধুছন্দা, দীপ্তি, নয়নতারা…ক্রমশঃ রুবির গলা ভেঙে যাচ্ছিল, শেষের দিকে যমুনা ডাকটা কান্নার মত শোনাল। ওদের চারপাশে ঝলমলে আলো জ্বলা দোকানপাট, উজ্জ্বল মানুষজন-সবার কাছেই তা দৃশ্যমান- অদৃশ্য শুধু রুবি আর কালো চাদরের তলায় শান্তনু। এতকাল নিজেকে অদৃশ্য রাখতে চেয়েছে রুবি, আজ পয়লা আষাঢ় ওর পঞ্চাশবছরের জন্মদিনে ভীষণভাবে দৃশ্যমান হতে চাইছিল সে এই মুহূর্তে -চাইছিল সবার সঙ্গে হাসতে, গলা জড়িয়ে ছবি তুলতে, একসঙ্গে খেতে। একইসঙ্গে সামান্য আবছাভাবে বুঝতে পারছিল, ওর কালো চাদরের বাইরে দুনিয়া একেবারে বদলে গিয়েছে- এখন, দৃশ্যমান হওয়ার জন্য কিছুক্ষণের জন্য কালো চাদর খুলে ফেললেই হয় না।
 
রুবি চোখ মুছল- ঠিক করল বাড়ি ফিরে যাবে- টেবিল থেকে উঠে গিয়ে কে এফ সির দিকে গেল। কালো চাদরের আর তো কোনো দরকার নেই-রুবি ভাবছিল; ওর মনে হচ্ছিল – ওরা সম্পূর্ণ অদৃশ্য -এমনিতেই। সামনে বসে থাকা শান্তনুর চাদর খুলে ফেলল একটানে; বলল-‘চল, শান্তনু, বাড়ি যাই চল। ‘
 
কালো চাদরের তলায় বসে শান্তনু ঝিমোচ্ছিল এতক্ষণ- রুবি চাদর খুলে নিতেই সিটি সেন্টারের ফুডকোর্টে আড়মোড়া ভাঙল বিশাল শার্দূল। তারপর ল্যাজ আছড়ে হুঙ্কার- চুরচুর হয়ে গেল সিটি সেন্টারের যাবতীয় কাচ এবং শান্তনু প্রবলভাবে দৃশ্যমান হ’ল। পয়লা আষাঢ়ের মেঘলা দুপুরে, দীপ্তি, উমা, ঝিমলি, সিটি সেন্টারের মানুষজন, আলো, বেলুন, দোকানপাট, ম্যানিকুইন চোখ কচলে দেখল কে এফ সির সামনে কমলা কালোয় ডোরা কাটা বিশাল বাঘ ল্যাজ আছড়াচ্ছে আর মুহুর্মুহু গর্জন করছে। শান্তনুর একেবারে সামনে তখন দীপ্তি অনসূয়া নন্দনা। নয়নতারা ওর পঞ্চান্ন নম্বর সেল্ফি তুলতে গিয়ে ঠোঁট ওল্টাচ্ছিল একটু আগে -শান্তনু যন্ত্রটা চেনে, ভঙ্গিটাও-ওর ল্যাজ মুচড়ে ধরে এইরকম যন্ত্র দিয়ে ছবি তুলেছিল দু পেয়েটা। ল্যাজের এক বাড়িতে আইফোন আছড়ে পড়ল ফুডকোর্টের মেঝেয়। শান্তনু ওর তুমুল গোলাপি জিভ বের করে থাবা চেটে নিল একবার। বার কয়েক পাক খেলো টেবিল ঘিরে তারপর কালো কমলা বিদ্যুৎ উঠে এল ফুডকোর্টের টেবিলে। দীপ্তি সম্ভ্বতঃ অজ্ঞান হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। সিকিউরিটি গার্ড দৌড়ে এসে বন্দুক তোলার সঙ্গে সঙ্গে শান্তনু সিকিউরিটির চোখে চোখ রাখল, টান হয়ে দাঁড়াল- ঐ যন্ত্রও শান্তনুর চেনা। ঠিক সেই মুহূর্তে রুবি লাফ দিল, টেবিল টপকে গিয়ে বিশাল কালো চাদর ফেলে দিল সিকিউরিটি গার্ডের ওপর-ছিটকে পড়ল পুরোনো বন্দুক। ফুডকোর্টের টেবিলের ওপর এখন শান্তনু দাঁড়িয়ে – তার সামনে থরথর করে কাঁপছে সিটি সেন্টারের রোব্বারের পাব্লিক। শান্তনু মাথা তুলে আর একবার গর্জন করল, তারপর পিছনের পা সামান্য ভাঁজ করে, ডোরাকাটা লম্বা ল্যাজ টেবিলের সঙ্গে পারফেকটলি প্যারালাল রেখে তীব্র ধারায় সিটি সেন্টার ভাসিয়ে দিল অনেকক্ষণের জমিয়ে রাখা হলুদ হিসিতে।

সিটি সেন্টারের এস্কালেটর, প্রবহমান জনস্রোত পেরিয়ে শান্তনু আর রুবি এখন রাস্তায়। রুবির হাতে ধরা দুটো আইসক্রীম। রাস্তায় অটো, ট্যাক্সি, রুটের বাস। সিটি সেন্টারের মাথার ওপর নীলচে কালো মেঘ জমছিল। ওলোট পালোট হাওয়া বইছিল কলকাতা জুড়ে। বিদ্যুতে বিদ্যুতে বেগুনি দেখাচ্ছিল আকাশ -ধুলোবালি, ঝরা পাতা আর কদম ফুলের গন্ধ পাক খাচ্ছিল শহরে। তারপর সেই বেগুনি আকাশের বুক চিরে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে তুমুল বৃষ্টি এল; ঠিক তখনই এক টকটকে লাল দোতলা বাস হেডলাইট জ্বালিয়ে, হর্ন বাজিয়ে রুবিদের সামনে এসে দাঁড়াল।

রুবি আর শান্তনু এখন ডাবলডেকারের দোতলায় – সামনের সিটে। পেল্লায় উইন্ডস্ক্রিনে বৃষ্টির ফোঁটা বাসের প্রবল গতিতে নিচের দিকে না গড়িয়ে ক্রমশঃ উপরের দিকে উঠছিল। গোটা কলকাতা দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছিল সেই সময়- যে অসুখে মনের চোখ অন্ধ হয়ে যায়।

সেই রুগ্ন শহরের সরণিতে, পয়লা আষাঢ়ের সন্ধ্যায় রুবি আর শান্তনু আইসক্রিম খাচ্ছিল পাশাপাশি।

 

লেখক পরিচিতি:
ইন্দ্রাণী দত্ত
কথাসাহিত্যিক
কলকাতার
উপকন্ঠে বেড়ে ওঠা ইন্দ্রাণী বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা। লেখালেখি
শুরু প্রবাসে। নিরন্তর খুঁজে চলেছেন শব্দের অভ্যন্তরীণ স্পর্শ, পাঠকের
সঙ্গে সংযোগের ম্যাজিক। প্রকাশিত ছোটো গল্পের সংকলন ‘পাড়াতুতো চাঁদ’।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=