আনন্দময়ী মজুমদারের জার্নাল : প্রেরণার দুই কিস্তি

[দুই-পয়সা শিরোনামে কালানুক্রমিক জার্নাল আকারের লেখা হত। লেখাগুলি নিজের সঙ্গে নিজের সংলাপ; অভিজ্ঞতা ও ভাবনাচিন্তার সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া। হয়ত কিছু লেখার ক্ষেত্রে আমি এখন আর লেখক নই, পাঠক শুধু, যে-মানুষ লিখেছে, পাঠকের মতো, আমিও তাকে বাইরে দাঁড়িয়ে দেখি। উপস্থিত কালে সেই আবেগকে ধারণ করি, কিন্তু ভেসে যাই না, ধারণ করি, যেমন ধারণ করি একটা কাছের মানুষের লেখনী, যে আমি নই। লেখাগুলির নাম রাখা হচ্ছে `প্রেরণার দুই কিস্তি’। প্রেরণা নামটি উঠিয়ে রেখেছিলাম প্রিয় ঝুড়ির মধ্যে। এখানে যে সত্তা এই লেখা লিখেছে তাকে হয়ত এই নামটা দেয়া যায়, ভেবে ঝুড়ি থেকে নামটা বের করলাম। এতদিন পরও দেখছি নামটার মধ্যে শ্বাস বইছে!]

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কিছু সাদামাঠা ভাবন
বর্ণ নিয়ে বিবাদ হয়, অর্থ নিয়ে বিবাদ হয়, সামাজিক স্তরে স্তরে হাজার বিবাদ মানুষ কে মানুষ থেকে শুধু বিচ্ছিন্ন করে | এই বিবাদের মূলে আছে কিছু না-জানা না-বোঝা বিষয়, যা অহংকার নামক মানুষী এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছে | অহংকার – যা সকল কষ্টের ও পাপের মূল |
যে-অহংকার মানুষের অস্তিত্বের সকল স্তরকেই স্পর্শ করে, করে না শুধু মাতৃত্বকে|
তাই পৃথিবীর সকল মা একই দুঃখের-অনলে পোড়া, একই আকাশ উপুড়-করা জননী |
মাতৃত্বের মধ্যে যেমন বিভেদ নেই, তেমনি, তার মধ্যে ক্ষোভ এবং অভিযোগ নেই | এই জন্য অন্য অনেক ধরনের একাত্মতার সুতো থেকে তা একটু আলাদা |
মাদাম কুরী তাঁর মাতৃত্বের দিনেই আরম্ভ করেন তাঁর আশ্চর্য গবেষণা | তাঁর ছিল তিনটি খাতা: একটিতে রাখতেন সংসারের খরচের হিসেব, একটিতে গবেষণা, অন্যটিতে সন্তানের খাওয়ানোর, ঘুমানোর ইত্যাদির হিসেব | গবেষণা এবং মাতৃত্ব, দুটি-ই সৃষ্টিশীল … সম্ভবত, দুটি-ই মানুষের মনন, দায়িত্ব এবং সৃজনশীলতার চর্চা বাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে বলেই?
সকল দুঃখই পবিত্র, গভীর | কিন্তু কিছু দুঃখ আনন্দের আদল নেয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকে, কষ্ট ছেড়ে ঋজু হয়ে ওঠে, আলোর উৎসবে শিরীষ-ডালের মতো সাড়া দেয় বলে, মাঝেমাঝে সেই সব দুঃখে আমরাও পবিত্র হতে পারি | আর তখনই কাব্যের জন্ম | মা হবার দৈনন্দিন আটপৌরে ঘটনার মধ্যে পৃথিবী সেই কাব্যের সম্ভাবনা লুকিয়ে রেখেছে |
এই দুর্দিনেও কাব্য তাহলে জন্মাতে পারে | `সকল গৃহ হারালো যার’, এই শব্দচয় যেখানে আক্ষরিক সত্য, সেই ক্ষেত্রেও, এক অসহায় সামাজিক ও পারিবারিক পরিস্থিতেও অনেক সময়ই এক বিপন্ন নারী তার মাতৃত্বের ঐশ্বর্যে আশ্চর্য হয়ে যান | আর তখন এক দুঃখ কষ্ট মাখা রক্তের কুন্ডুলির মত লেখা মাটিতে পতিত হতে থাকে, যেখানে মাতৃত্বের হাত তাকে ব্যগ্র হাতে আঁকড়ে ধরে |
মা হবার যাত্রা যেমন একাকীর, তেমনি তা বিপন্নতার এমন একটি আশ্চর্য কোঠায় নারী কে নিয়ে যায়, যা সব চেয়ে সুঠাম নারী-ও কোনো দিন কল্পনা করেনি| মা হবার যাত্রা তাই এককভাবে যেমন সুখকর নয়, তেমনি তা অশেষ শান্তিময় নয় | যেমন শেকড়ের যাত্রা অন্ধকারে, সকলের অগোচরে, তেমনি মাতৃত্বের যাত্রা চলে বেবাক নিভৃতে, শুধু তথাকথিত নয় মাস নয়| আর তখন উড়তে থাকা সত্তাও আকাশে আকাশে বিচরণ করতে করতে পাদুটো গুটিয়ে স্থিতি খোঁজে মাটিতে, শক্তিসঞ্চয়ের জন্য |
বিষয়টি এমন নয়, যে এই একটি জৈবিক প্রক্রিয়া কিছু নারীকে বিশেষভাবে আলাদা করে রেখেছে | এখানে অভিজ্ঞতার আগুন সেই সীতার আগুনের মত – যে না গিয়েছে, তাকে বরণ করা যায় না, বোধের সেই জায়গায় – যদি না সহমর্মিতা থাকে| আকাশের দিকে তাকিয়ে যেমন রক্তক্ষরণ কাকে বলে বোঝা যায় না, এও তেমনি | আটপৌরে হলেও, উপায় নেই, এই এক জৈবিক প্রক্রিয়াগুলির সঙ্গেই পৃথিবীর যাবতীয় সৃষ্টি ও গতি যখন জড়িত, তখন একে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় কি?
৮ মার্চ ২০১২
খুচরো চিন্তা
ইংরিজিতে শব্দটা মিউজ… বাংলায় সুরাহা করতে পারছি না, তাই একে বলতে যাচ্ছিলাম, ‘সত্ত্বা’ – জানি ঠিক হলো না, তবুও | মিউজ শুধু সত্ত্বা নয়, তার বেশি কিছু, সত্ত্বার সচ্ছ্বতা, আনন্দ সে, প্রজাপতির মত উড়তে উড়তে আসে,..অনুভূতির গহন, ফুরফুরে, সুরেলা ভাবটা নিয়ে … সে যাহোক.. মিউজ নিয়েই কথাবার্তা এখানে… নিজের অন্তরের সঙ্গে বাতচিত, বা মিউজের সঙ্গে বাতচিত করতে হলে, তাকে তো পেতে হবে |
রাত্তিরে ছোট শিশুর হাত ধরে ঘুমোতে নিয়ে যাই, এছাড়া এইরকম উষ্ণতা আর নির্জনতা, একই সঙ্গে, আর কোথায় পাওয়া যাবে এই জটিল, ব্যস্ত জগতটাতে? কারণ মিউজ বড়ই স্পর্শকাতর, ওই হালকা দুলকি চালের মন ভোলানো কথার চটকদারীতে তাকে মোটেও ধরা যায় না, আবার আকাশচুম্বী বড় বড় শব্দের গম্বুজ তুলেও তাকে পাওয়া যায় না… তার জন্য নিভৃতে দেখা করার ব্যবস্থা করতে হয় | সেই সময় এসে দিয়ে যাওয়া তার গুপ্তধন নিমেষেই হারিয়ে যায়, কর্পুরের মত… সে মুহুর্তে মনে টুকে নিলেও বাকি থাকে সামান্য… কিন্তু তাকে ধরতে হবে, তাকে ধরতে হবে, চাই যে সেই সোনার হরিণকেই |
আর এখন সেই মিউজকে জিজ্ঞাসা করছি বারবার, যেখানে সব কিছু হারিয়ে যাচ্ছে, ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, যেখানে স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে, সেখানে মানুষের বেঁচে থাকার রসদটা কি? মন ভোলানো ঘুমের বড়ি, জলপটি, ধোলাই, সাফাই, কম্প্রমাইজ… নাহ কিছুতে তো মন শান্ত হয় না, প্রশ্নের মৌমাছি ভনভন বন্ধ করে না… বেঁচে আছ, শুয়ে আছ, জেগে আছ, আছ, এই তো, শিশুর সম্পূর্ণ ভালবাসা, তার নিবিড়, মুক্ত সমর্পণ, থেকে একটা সমীহ, একটা অদ্ভুত বোধ তৈরী হয়… কী সেটা বলা কঠিন… কিন্তু হয়, আর তখন হঠাৎ এক লহমার জন্য মিউজ আসেন… এক স্বপ্নের মত আলোকবর্তিকা… বেঁচে-থাকা এক মুহুর্তের জন্য হলেও সার্থক হয়, সম্পূর্ণ হয়… কোনো ভেল্কিবাজি দিয়ে নয়, সত্যের সঙ্গে নিবিড় আলিঙ্গনের মাধ্যমে… যে সত্যকে প্রায় চেনা যায় না, এমন অন্ধকারে থাকতে হয়…. নিবিড় কালো না হলে, যে ধরা দিতে চায় না…
মে ১৬, ২০১২
রুডিয়ার্ড কিপলিং
শুনেছি রুডিয়ার্ড কিপলিং বর্ণবাদী ছিলেন – অথচ কী আশ্চর্য অবর্ণবাদী কিছু লেখা লিখে গেছেন, মানুষের সব কিছু সাদা কালো তো নয়…ভালো করে তাঁর লেখা কখনো পড়া হয়নি – শুধু কিছু পংক্তি ছোটবেলা থেকে বাবা আওড়াতেন, তাই ভুলতে পারি না –
Teach us delight in simple things,
And Mirth that has no bitter springs;
Forgiveness free of evil done,
And Love to all men ‘neath the sun!
৪ঠা মার্চ ২০১৪
হাউজ অভ বিলঙ্গিং
বইটা ভাই এনে দিল!
ডেভিড হোয়াইটের, হাউজ অভ বিলঙ্গিং!
উড়তে চায় যে, সে-ও বাসা বাঁধে।
সেও লালন করে, লালিত হতে চায়!
উষ্ণতা বিলাতে চায়, চায় উষ্ণতা পেতে!
তারপরও – কারো কারো মানবজন্ম এমন যে তারা স্থির থাকতে চায় না, অথবা, স্থির থাকতে চেয়েও কিছুতে পারে না, যে বাড়ি তাদের আস্তানা তা আস্তানা হয়ে ওঠে না। আস্তানা খুঁজে বেড়ায় তাঁরা সারা জীবনভর।
এছাড়া ভেবে দেখতে গেলে, তৃতীয় বিশ্বের কতো মানুষ তো এখন আকাশের নিচে। উদ্বাস্তু।।ভুমিকন্যা ভূমিপুত্র। বিড়ম্বিত সংখ্যালঘু। ভূমিহীন কৃষক।
দেশ জাতি সমাজ জায়গা দেয়নি তাদের, কাছের মানুষ উচ্ছেদ করেছে।
এক বিঘা জমির মালিকের মতো ধরণীর এক কোনায় বাঁচতে চাওয়া একটি সাধারণ মানুষের জমি লুট হয়ে যাওয়া।
সেই সব মানুষের জন্য, যাদের ভিতরে প্রশ্ন জাগায় বোধ, আর বোধে জেগে ওঠে অমোঘ অশ্রুফোঁটা বা রক্তস্রোতের মত কবিতা, তাদের জন্য এই বই।
০৪ ডিসেম্বর ২০১৬
দেশে প্রজনন হার
দেশে প্রজনন হার (ফারটিলিটি রেইট) ২ এর কাছাকাছি – কিন্তু সিলেট ও চট্টগ্রামে এই হার ৩ এর কাছাকাছি।
মানবশিশু আশ্চর্য সুন্দর – কিন্তু অশিক্ষিত সমাজের চাপ তাদের এক একটি অ-বিকশিত কুশিক্ষা ও অযত্নের চাপে নুয়ে পড়া প্রাণী সৃষ্টি করে – আর শিশুদের তেমন তেমন মানুষ হবার শিক্ষা দেবার শক্তি অধিকাংশ বাবা-মার নেই।
সারা দিন যখন ৪ ঘণ্টা জ্যামে বসে দিনের সব চেয়ে দুর্মূল্য কর্মক্ষম সময়ের ৩৩% জনসংখ্যার বিস্ফোরণের চাপের কাছে বিকিয়ে বাড়ি ফিরে আর কোন ভালো কাজ করার মত শক্তি পাই না আমরা, তখন হয়ত এ কথাটা মনে রাখার সময়।
ম্যান পাওয়ার উওম্যান পাওয়ার – এ সমস্ত কথা সব ফালতু লাগে সে সসময়।
যত জনসংখ্যা কমবে, তত ডিম্যাণ্ড এবং কদর বাড়বে মানব শক্তির।
তত কদর বাড়বে শিশুদের।
তত বাড়বে পাব্লিক সার্ভিসের মান।
আমাদের মূল্য এখন খুব কম।
মূল্য পেতে হলে জনসংখ্যা এর চেয়ে অর্ধেক হতে হবে।
৯ মার্চ ২০১৭
রিক্সায়
রিক্সায় দুটো গান গুনগুন করতে করতে ফিরছিলাম, সঙ্গে শিশু।
শিশু তো বন্ধুই, তাই মাঝে মাঝে নানা বিষয়ে যেমন তার মতামত চাই, তেমন জিগ্যেস করলাম গানটা তার ভালো লাগল কিনা। সে জানাল লেগেছে (ভোলানাথের সব কিছু ভালো লাগে)। জানতে চাইলাম, এইটা না আগেরটা তার বেশি ভালো লেগেছে। শিশু কিছু বলার আগেই রিক্সাওলা বলে উঠলেন,
‘প্রথমটা বেশি ভালো!’
পরে তাঁর সঙ্গে আলাপ করলাম। তিনি গান শুনছেন জেনে কেমন যেন কৃতার্থ বোধ করলাম। শান্তিদেব ঘোষ নাকি বলতেন জনরুচির কাছে যেতে। জনরুচি যদি আমাদের গান নির্বাচনে এভাবে এগিয়ে আসে, তাহলে আমাদের আপত্তি নেই। আমরা বটতলায় বসতে পারি আউল-বাউল গান নিয়ে!
৯ মার্চ ২০১৭

নিরাময়
বিদেশে গিয়েছিলাম এক সেমিনারের কাজে, আসার সময় একটি Cake নামের ছবি দেখেছিলাম বিমানে – জেনিফার এনিস্টোনের অভিনয়ে বিস্মিত হয়েছিলাম ।
একজন আত্ম-বিধ্বংসী মেয়ে, অসুস্থ, অন্ধকার তার হৃদয়, কোন কিছুতেই আস্থা নেই যার, নিজে সে পিছলে গেছে নিজেরই হাত থেকে, টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে সামনে, তুলতে পারছে না, চাইছে না যেন সে।
মধ্যবয়েসী। বারবার আত্মহত্যা করতে গেছে, কিন্তু পারেনি। অনেক পরে জানা যায় তার সন্তানকে সে হারিয়েছে।
ছবিটা দেখার পর একটা লেখা মাথায় এসেছিল, বিমানে।
মাথায় খেলে যায় অনেকবার অনেক গল্পে উপন্যাসে পড়া অনেক মেয়ের নানা গল্প। হানা দেয় রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর পত্র, আমার আশেপাশের জোনাকির মতো উজ্জ্বল শিশু মেয়েরা, দারুণ চমক যারা রেখেছিল ছাত্রজীবনে, পরে দেখতে গেলে যাদের আর চেনা যায় না, যেন ছাঁচে ঢালা পুতুল।
আসলে তা তো নয়। কী হয়? যে নিরাময় লাগত তা কি ওরা পেল?
কে দেবে ওদের সুখ, স্বস্তি, নিরাময়? মেয়ে হবার সুবাদে, কেউ দেয় না তো, আপনি নিরাময় খুঁজে নিতে হয়। এই কথা শিখতে গিয়ে কারো কারো আয়ু শেষ হয়ে যায়। বসে থাকে কেউ ভাগ্যের দিকে তাকিয়ে। সন্তানের দিকে, সংসারের দিকে। উত্তর মেলে না। মিললে ভাল হত। যেন নিরাময়ী হাত তাদের দিকে এগিয়ে আসে।
সিনেমা দেখার পর নানা চিন্তা মাথায় লেখা, সেই কাঁচা লেখা এখানে দিলাম:
~~~
এত অন্ধকার নারীর ভিতর !
সব যন্ত্রণা লুকিয়ে রাখা
পরিপাটি ভঙ্গুরতা –
প্রকৃতির মতো।
আত্মঘাতী তার স্বপ্ন কত মোহনীয়!
পৃথিবীর অপর প্রান্তে কান রেখে
কেউ তা শোনেনি কখনো।
জলের অতলে তার শরীর
মৃত্যুর অতলে তার অসুখ
খড়কুটো প্রতিমার গন্ধ
কত মৃন্ময়!
পাতালের গান
তাকে শাশ্বত করে।
তাকে ঘিরে পাতার ঘণ্টা বাজে।
একটু ছায়ায় ভিড়তে চাওয়া
ফেরারি হৃদয়,
তাকে নিরাময় দিও।
হতে দিও এলোমেলো,
অসময়-অসুন্দর।
রত্নগর্ভ সমুদ্রে ফিরতে দিও তাকে
তার মোহনাকে ।
১৬ এপ্রিল ২০১৫
দুর্বলতার সামনে না দাঁড়ালে
মেয়েদের কথা এলে ব্যাপারগুলি ব্যক্তিগত থালায় ব্যক্তিগত রেসিপিতে (আসলে উত্তরাধিকার ও পরিবেশগত রেসিপিতে) সাজাতে হয়। সত্যগুলি সব ব্যক্তিগত, আত্মিক।
কোন অভিজ্ঞতা ফেলে দেবার নয়। কোন বেদনা ভুলে যাবার নয়। আর পথে এক-দুজন দুর্লভ বন্ধু পেয়ে যাওয়া আশ্চর্য আনন্দের।
এত দিন এত কিছু মোকাবেলা করতে হয়েছে যে সেসব ভাবতে গেলে অবাক লাগে, তবে বেশি আলোচনা করিনে।
ইংলিশ বই বাংলায় অনুবাদ করছি শৈশব থেকে। প্রথম অনুবাদ ছিল ইন্দিরা নেহেরুকে লেখা তাঁর বাবার চিঠি – ক্লাস ৭ এ অনুবাদ করেছিলাম। তারপর কবিতা পড়ে শখ হল কবিতা লেখার, পারি না পারি লিখেই চললাম শয়ে শয়ে। সমালোচনা উৎসাহ ইত্যাদি কিছুই পাইনি যা দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজে লাগাতে পারি। অনুবাদের বেলাতেও তাই। গানের ক্ষেত্রে বাবাকে কাছে পেয়েও গিয়ে বসা হয়নি। দূর থেকে শিখেছি, পরিবেশ থাকে স্পঞ্জের মত নিয়ে। এই সব কাজ আমার ভালো লাগত। ভালো লাগত শিশুদের নিয়ে নাটক গান করতে করাতে।
গবেষণার পথও যখন থেকে শুরু দেখছি একটা হার্ডল রেস।
ছাত্রজীবন শেষ হবার পর সংগ্রাম তীব্র হয়, বেঁচে থাকার, নিজেকে গভীর ভাবে খনন করে, খুঁজে পাবার।
উপরে উল্লিখিত ভালোবাসা ও আত্মিক জায়গা টিকিয়ে রাখতে সময় লাগে, অবসর লাগে, শূন্য লাগে, অর্থাৎ কিনা স্পেইস। বাই ডিফল্ট একজন সাংসারিক মহিলা সে স্পেইস পাবেন না। আপাতত ডাক্তার দেখানর মত সময় হাতে নেই। আমি উঠে পড়ে লাগি যেন ডাক্তারের কাছে যেতে না হয়। অত লাক্সারি আমার কাছে নেই যে।
দেখেশুনে মনে হয়, আমরা কোনভাবে জীবিকা অর্জন করে সন্তান পালন ও সংসার লালন করতে পারলেই হল। বাকিটা সকলে ভেবে নেয় – এটা ওর প্রিভিলেজ, বা ভাগ্য।
ফাল্গুনী নাটকে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, সব আলো হারিয়ে গেলে অন্ধ বাউল নিজের আলোয় পথ চলে। অন্যেরা সে আলো দেখতে পায় না, কিন্তু বিশ্বাস করে। শঙ্খ ঘোষ অন্ধের স্পর্শের মত বোধ আর ইন্দ্রিয়র কথা বলেছেন, মোক্ষম, সত্য, সরল, অন্তরলীন। সে পথটা হোঁচট খাবার শুধু নয়, শ্রমশীল ও উদ্গ্রীব ভাবে খুঁজে বের করার। আমাদের প্রাণী-প্রবণতা (animal instinct) তখন বেরিয়ে আসে—একটি চিতা বাঘ যেমন তার প্রত্যেকটি রোমকূপ দিয়ে বেঁচে থাকার, বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে যায়।
মুখের কথা, পল্লবগ্রাহী পরিচয়ে আমাদের বিশ্বাস হারিয়ে গেছে কবে, বাস্তবকে চিনতে হয় শুধুই পরীক্ষামূলক ভাবে, সাবধানে, নিজের ওপর আস্থা রেখে। যখন সকলে বারণ করছে, তখন আরও আরও বেশি। নিজের gut instinct বলে একটা কথা আছে। একে ফেলনা মনে করলেই মার।
অহং-কে চিনেছি এই পথে, সকলের সব চেয়ে বড় অন্তরায়। সেই মারছে আমাদের, বিচ্ছেদ আনছে। তাঁকে এখানে ওখানে উঁকি মারতে দেখলে যখন চিনি, তখন বুঝি, হয়ত, হয়ত এ পথটা এখন সত্য।
এই সব মানুষের, নারীসত্তার সংগ্রামের সঙ্গে নিরন্তর জড়ান কথা। কথাগুলি আচমকা আমার ব্যক্তিগত থাকে না, কারণ আমি দেখতে পাই কেউ না কেউ কখনো না কখনো এই পথে তাদের বাতি নিয়ে এগিয়ে আসেন। সেটা বেশ আনন্দের। ‘বিশ্ব হতে চিত্তে বিহার’ এর মতো।
Soul Sisterhood-এর ওপর আমার আস্থা আছে, কিন্তু বোনদের ভিতরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বোধ না থাকলে সেটা সম্ভব নয়। শুধু নারী বলে একজন নারীর বোন হওয়া যায় না, নারী হবার সংগ্রামের, বিশেষ করে অন্তরের সব চেয়ে কঠিন সংগ্রামের পথ না হাঁটলে, হাতে হাত রাখা যায় না, এক প্লাটফর্মে আসা যায় না।
নিজের অহং, নিজের তাবৎ দুর্বলতার সামনে না দাঁড়ালে, শক্তি থাকে না।
রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, বড় বড় কথার আড়ালে কী ভাবে মিডিওক্রিটি ঢুকে যায়। কী ভাবে মহৎ মানুষের আত্মত্যাগ ধ্বংস করে পিছ দরজার কমরেডরা। ‘চার অধ্যায়’ পড়েই জানা যায়।
নারীবাদের পিছনে সব নারী সেই মহত্বের বা নিরহং ভালোবাসার শক্ত ভূমিতে এসেছি তো, অন্তত চেষ্টা করছি তো, নিজেদের অজ্ঞতা আর গোঁড়ামি-কে চিনে নেবার?
আমাদের দেখা এক মহীয়সী নারী বলতেন, ‘নিজের স্বার্থ বাদ দিয়ে দিতে পারলে, কোন কাজ সফল হবেই।‘ উনি স্বার্থ বলতে লোভ, আক্রোশ, এইগুলি বুঝিয়েছেন।
লোভ আর আক্রোশ নিয়ে বড় কাজ করা যায় না। আমাদের দুঃখের কথা, বেদনার কথা, সমস্যার কথা বলতে এসে এই বিষয়-টি বারবার মনে পড়ে যায়।
৭ মার্চ ২০১৭
মেয়েদের ক্ষমতায়নের পথটা কঠিন
মা-র অলৌকিক ক্ষমতা আমরা স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করেছিলাম। সংসারের পরিচালক, কর্মী, সংগঠক, ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, গণযোগাযোগ কর্মী ও নেতা এবং আরও একশটা পারিবারিক ও সামাজিক ভূমিকায় তিনি, কিন্তু যেহেতু ব্যাপারটা তাঁর কাছে এত প্রত্যাশিত আর থ্যাঙ্কলেস, অর্থাৎ ধন্যবাদ দিয়ে ছোট হয়ে যাবার ভয়ে সংসারে কেউ আর এ-কথা বলেনি, তাই বহুদিন বুঝতে পারিনি, যে মা-র (বা মা-দের) ভূমিকা কেমন হয়, আর কীসের জন্য আমাদের জীবন এতটা মসৃণ, সুস্থ, সুন্দর।
স্বভাবত এই কারণে, ছোটবেলায় বাবাই ছিলেন রোল-মডেল।
দুই রোল মডেলের মধ্যে বাবা-কে বাইরে থেকে বাহবা দেবার কেউ না থাক, পিসিরা ছিলেন। তাই জানতে পেরেছিলাম বাবার প্রতিভা, তাঁর সঙ্গে মহত্ব, শক্তি, পান্ডিত্য, বিনয়, সরলতা, সাহস আর মমতার কথা – না বললেও বুঝতে পারতাম হয়ত। প্রজ্ঞার ব্যাপারটা বুঝেছি নিজেরাই, আরও পরে।
তো, সেই বাবা বলতেন ছোটবেলায় একটি কথা, যে কথা আজ তাঁর মনে আছে কিনা জানি না। আমার ভাই তখনও জন্ম নেয়নি। আমার বয়েস ৬-৭-৮। বলতেন, ‘তুমিই আমার ছেলে, তুমিই আমার মেয়ে।’ কপালে আদর করে দিয়ে।
তাতেই সমস্যাটা হল!
আমরা শিভালরি অথবা পুরুষের সাহায্যের জন্য কোনদিন অপেক্ষা করিনি। নিজেই শিভালরি চর্চা করেছি। বাজারের ভারি ব্যাগ টানা, সংসারের দায়িত্ব বোঝার চেষ্টা করা, সামাজিক দায়িত্ব, সহনশীলতা, চুপ করে সহ্য করার চর্চাটাও সেখান থেকে। সাহায্য চাইবার ব্যাপারে এখনও আমার অসুবিধে হয়।
পরে বুঝেছি মেয়েরা সর্বদা শিভালরাস – অন্তত আমাদের মা-কে তেমনটাই দেখেছি। কারুর বিপদ যেন সর্বদা তাঁর। ঝাঁপ দেবেনই। আমার মা হেট্রেড মানেন না। কেউ তাঁর বিপদ-আপদ ঘটালেও মানেন না। দুর্দিনে তাঁদের বিপদে তবু তিনি ঝাঁপ দেবেন।
আমরা হয়ত লাভবান হলাম, অবাধ দাতার কাছ থেকে গ্রহণ করার সুবিধে হল, ধন্যবাদ দিতে হয় না, কৃতজ্ঞ হতে হয় না, গুছিয়ে নেওয়া যায় ঠিক।
আমাদের সীমায়িত গণ্ডীতেও আমরা এমন অভিজ্ঞতা যেমন শিখে নিলাম।
নিতে না পারার এই দোষটা ভালো না। এখন মানুষ হিসেবে নিজেকে একটু সম্মান করেই, এবং বয়েসের সাথে প্রজ্ঞা বাড়ছে বলে বোধহয়, হার্দিক দান হাতে এসে পড়লে, তা নম্র হয়ে নিতেও শিখছি।
এম্পাওয়ারমেন্টটা ঠিক মত হল কিনা জানি না, তবে এই এম্পাওয়ারমেন্টের পথেই ছিলাম সারা জীবন। বাংলাদেশে এমন ঘটনা অনেক ঘটে, আবার ঘটেও না।
সব্যসাচী পরিশ্রমের জায়গায় কখনো গলিপথ বা পিছনের পথ খুঁজতে যাইনি। অন্যের দিকটা রাখতে গিয়ে ভদ্রতার খাতিরে নিজেই বিপন্ন হয়েছি। এই জেনে যে আমরা তো পারি। আহা বেচারা, ওরা তো পারে না।
এম্পাওয়ারমেন্টের এই পথ কঠিন।
ভিক্ষাজীবি হব না, আমাদেরটা আমরা বুঝব, অন্যেরটাও বুঝব, আমরা যে মানব-পরিবার – এমন স্বর্গ চিনিয়েছিলেন আমাদের মা বাবা, পিসি-পিসে, দাদামশাই, মামা-রা। অবশ্যই তাঁদের সীমার মধ্যে। ছোট অহঙ্কারের সীমা লঙ্ঘনের প্রসিদ্ধিও ছিল তাঁদের।
যে-সময় সাজগোজ করে বেড়াতে যাবার ছিল (আমাদের সময় সেলফি ছিল না, কিন্তু বসন্তের বাতাস নিশ্চয়ই ছিল), সে সময় পাত্তা দিইনি চেহারাকে, নিজের রঙিন সত্তাকে। চিন্তা ছিল বই নিয়ে, পড়াশুনো নিয়ে, মাথায় গিজগিজ করত লেখা, সেসব আলোর মুখ দেখুক না দেখুক। এ নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই। ফ্যাক্টস আর ফ্যাক্টস। ভালো-মন্দ সব আপেক্ষিক।
মাথায় এক সময় বিজবিজ করত রবীন্দ্রনাথ – ‘সব নিতে চাই’ এবং ‘সব দিতে চাই’ এর বীজ। এসব মনে হতে পারে ভ্রান্ত স্বর্গ ।
সমাজ-এর নানা কষ্টকর গ্লানিকর, দৃষ্টিকোণের সঙ্গে এমন এক শিশুসুলভ দূর রচনা করে ভালোবাসা আর শুভবোধের মধ্যে নিজেদের স্বর্গ যারা লালন করতে পারেন, তারা শক্তিমান।
৭ মার্চ ২০১৭
বালতি-ভরে জল ঢালেন
কেউ কোন ইতিবাচক কাজ উৎসাহ নিয়ে করলে সেই কাজটা আমাদের ভালো না-ও লাগতে পারে। কিন্তু উৎসাহ-কে বিনাশ করার জন্য যারা বদ্ধপরিকর, বা নিদেনপক্ষে বালতিভরে জল ঢালেন (বিশেষ করে পাব্লিক্লি) – তাঁদের কাছে বিনীত নিবেদন, মানুষ তার জন্মে গন্ডার, হাতি, পদ্ম, পাঁক, বরফ, জল, আগুন সব কিছুর মধ্যে নিহিত বলেই তারা জানে কী করে অবতার থেকে অবতার-অন্তরে যেতে হয়। অকরুণ নিবেদনে সেই সদিচ্ছা-প্রাণিত মানুষের লোহার চামড়া পোড়ে আর গজায় বিনিদ্র ঘাস। হিম নেতিতেও তাদের শিকড়কে তারা ফিরে অনুভব করেন।
গরম ভিড়ে দাঁড়িয়ে একা হবার অভিপ্রায় না নিয়েও আমরা জানি আমাদের জেনেটিক ব্লু প্রিন্ট মানব ভিড়ে আর কারো নেই – প্রকৃতির এই অপরূপ অসামান্যতা সকলের জন্মগত অধিকার।
আমরা জানি সামান্যদের বাঁচবার আর কাজ প্রকাশ করার অধিকার যাদের প্রিভিলেজ আছে, তাদের সমান।
আমাদের অনেকের সংবেদ-শিরা জমে গেছে। চারদিকে শিশুদের কাছ থেকে আমরা শিখতে পারি কী করে দুঃখে কাঁদতে হয়, কীভাবে নিজের অনুভূতির সঙ্গে ভাব পাতাতে হয়, কীভাবে বিস্ময়বোধ থেকে আসে সাত রাজার ধন, কীভাবে সরলতা থেকে আসে খুশির আবেগ।
আমাদের প্রার্থনা – যেন কচি আর কাঁচাই থাকতে পারি।
দিনের শেষে আমাদের সব বোঝাপড়াই নিজের সঙ্গে।
আর পুনশ্চ একটা আছে সেটা ইংলিশে দিতে হবে কারণ সেটা একটা উক্তি–
“our fullest potential requires that we notice distraction—and work diligently to overcome it.”
সামান্য মানবিক এক ডিস্ট্র্যাকশন-কে সিস্টেম থেকে বের করে দিতে এই লেখা।
১৯ ডিসেম্বর ২০১৭
শেষের কবিতা নিয়ে এই মুনির যা-মত
শ্রেষ্ঠ বই সেগুলি যেগুলি নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকে। ইয়ে মুনি মানে আমরা যারা মাথা ঘামাতে না পারলে ভাত হজম করতে পারি না আর কি। শেষের কবিতা নিয়ে এই মুনির যা যা মত তা আবার সময়ের সঙ্গে পালটে গেছে বারবার।
ভেবে দেখতে বাধ্য হলাম যে শেষের কবিতা উনি লিখেছেন নতুন যৌবনে নয়, মাঝবয়েসে নয়, পরিণত অপরাহ্ণে। পরিণত ‘বাঁধন খোলা’ সম্পর্ককে বুঝতে হলে বৌদ্ধ দর্শনের নির্মোহ করুণাময় মৈত্রীর ভাবনায় না এসে উপায় নেই। পড়ুয়া হিসেবে সাহিত্য বুঝলেই হল না, ভাবুক হিসেবে কিছুটা জলের তলায় চুপচাপ কাটাতেও হয়। এই বইয়ের পাতায় পাতায় প্রেমকে নিয়ে যে intellectualism আছে। এটার পিঠোপিঠি আছে প্রেম বলতে রবীন্দ্রনাথ যে মুক্তিকে বোঝেন, তা।
যতই হাততালি পড়ুক কল্লোল যুগের লেখকদের কাছে (এখন অবশ্যি রবি ঠাকুর বেশ “অবসোলিট” হয়ে পড়েছেন পড়ুয়া বাঙালিদের তরুণ প্রজন্ম আর মাঝবয়েসীদের কাছে) – বলতেই হবে আম-বাঙালিয়ানা তে প্রেম-বিরহ-রিরংসা-প্রগল্ভতা-হিংস্রতা-আপোস ইত্যাদি বুঝতে যত সহজ মনে হয়, করুণা প্রীতি মুক্তি আর নির্মোহ ঐকান্তিক প্লেটোনিক ভালোবাসা হজম করতে ততটাই শক্ত লাগে। সোনার পাথর বাটির মত।
সে সময় শেষের কবিতার যা যা পয়েন্ট পাঠককে ঘা দিয়েছিল তা কি এই এক্সপেকটেশন থেকে মুক্ত এক এক্সেপ্টেন্স এর মত Zen বৌদ্ধ ভাবনাকে এড়িয়ে গিয়ে হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছিল। বেশির ভাগ আমরাই ভোগবাদী। যা ভোগের ব্যাপার নয় তা আবার নিজের হয় কী করে?
যা বুঝি না, প্র্যাক্টিস করি না, তা চাক্ষুষ করতে কষ্ট হয় বৈকি।
বাউল সাধক আর লালন শাহ এদেশে জন্মে এত খ্যাতি পেলেন কী করে?!
প্রেমের মধ্যে আকাশ আর সীমা, তৃষ্ণা আর উন্মীলন সব আধার আর ফর্ম-কে দেখার পর লেখক তাঁর চরিত্রদের মধ্যে দিয়ে বেছে নিলেন – আকাশ, উন্মীলন। এখানে একটা অনন্ত আবেগ রিনরিন করতে লাগল – এই রহস্যটা কি অত সহজেই ধরা দেবে রে ভাই!
৭ ডিসেম্বর ২০১৭
বার্থ-রাইট ভালোবাসা
পুরুষ লেখক আর শিল্পীদের লেখায়, গানে ছবিতে, যে ভালোবাসার কথা পাল ফুলিয়ে রেখেছে, সে সব কিছুতেই বোঝা গেল না। আর মহিলা লেখক ভালোবাসার খেরোর খাতারর লৌকিক চালচিত্র বেশি দেখলেন। এটা একটা গড়পড়তা হিসেব। ব্যতিক্রমী লেখাও থাকে।
রবি ঠাকুর বললেন বটে, ভালোবাসার মধ্যে অনায়াসে দরজা খোলা রেখে দিয়েছেন। আসা-যাওয়া দুই দিকেই। সে কথা আজকের নারীবাদীরা একটু বোধহয় বলছেন। মাণিক সাহস করে দিবারাত্রির কাব্যে জানালেন, ভালোবাসার জৈবিক মৃত্যু আছে। ‘দুই নারী’ উপন্যাসে মোরাভিয়া দেখালেন ভালোবাসার জন্য দুই পয়সা অপেক্ষা না করে বেঁচে-থাকা লোক – লড়ে বাঁচতে পারে। নিজেকে গভীর ভালোবেসে, সম্মান করে।
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক প্রজ্ঞা নিয়ে এখানে কেউ আর নতুন কথা বল্ল না দেখা যায়। কান্না, ঢেউ, উচ্ছ্বাস, বাষ্প, অভিশাপ, অভিমান, ভেসে-যাওয়া – ইত্যাদি বাদ দিলে, কী থাকল? বিশ বছর পর এক নস্টালজিয়া? আহা, ভালোবাসা কি শুধু তাই?
কেউ বলল না, ভালোবাসা একটা প্র্যাক্টিস। একটা ক্লাস। এসো, শিখি, চলো, শেখাই। সত্যি কি?
ভালোবাসা কি ‘লং সাফারিং’?
বুড়ো মানুষটা রূপ আর দৈহিক ক্ষমতা হারালে সকলে তাঁকে ত্যাগ করে যায় কেন? তাঁর কি ভালোবাসায় কোনো অধিকার নেই?
১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
বাদশাদের মহল্লায়
রিক্সাহীন তল্লাট। বরং পাজেরো গাড়ি ভুঁইফোড় গজিয়েছে। দুই কদম ইস্কুলে বা অফিসে যেতে আজকাল গাড়ি লাগে। তাই হয়ত ছাঁটাই হচ্ছে রিক্সা। একদা বাড়িতে এক মাল্টি মিলিনেয়র এসেছিলেন। চকচকে মুখ। কষ্টের অর্জিত টাকা, সে কথা অনেকে বলে। এতো ওপরে উঠেছেন যে নিচে কবে ছিলেন সে কথা মনে করার নস্টালজিয়া আসেনি। অনেক আগে হয়তো রিক্সা চড়তেন। বললেন: রিক্সাওয়ালারা এতো এতো রাস্তা সব দখল করে রেখেছে। হুম, নিজেদের এরা সব রাজা বাদশা ভাবে। আরে গাড়ি যে রাস্তা দিয়ে যায় তোরাও সেই রাস্তা দিয়ে যাবি নাকি?
এই সব যুক্তি নিয়েই হয়ত স্থানীয় রাজা বাদশাদের আদেশে মহল্লায় রিক্সা ছাঁটাই চলছে। আসছে তাদের বদলে নিত্য নতুন গাড়ি। পাবলিকের রাজস্বে নির্মিত হালকা পলকা রাস্তা তার নিচে মড়মড় করছে। বাড়িগুলো ধুলোর রেশমে আবৃত হচ্ছে। যেখানে সবুজ ছিল বা থাকার কথা, সেখানে ধূসর ফাটা মাটি হাঁ করে আছে। জমি তো নেই পৃথিবীর রসদে। জীবনের রঙ উথলে আছে হাতে গোনা কিছু বাগানে। মালির তংখা সেখানে দশ হাজার। ফুটপাথহীন রাস্তায় লোহার গ্রিলের নিচে খোলা খোলা ম্যানহোলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে স্নিকারস অথবা চটি পরা কোরিয়ান, আফ্রিকান, বাঙালি, অবাঙালি। শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ। হাঁটু অপারেশন করতে চাওয়া মহিলা। তাদের ফুটপাথ নেই, তাই হাঁটার জায়গা নেই। রোদের রোশনাই না পেয়ে শরীরে ভিটামিন ডি-র অভাব। ডাক্তাররা চশমার আড়াল থেকে জানান, এমন হচ্ছে শতকরা ৭০ ভাগ মানুষের।
স্কুটারের সংখ্যাও বাড়ছে। কালোর ওপর শাদা ছিট ছিট পলিস্টার শার্ট বাতাসে বেলুনের মতো ওড়াতে ওড়াতে খালি জমির ভিতর দিয়ে ইন্দ্রলুপ্ত এক লোক নাকে নীল কাপড় বেঁধে প্যান্টের চেইন টানতে টানতে বেরিয়ে স্কুটার স্টার্ট দিল। ফুলেফেঁপে ওঠা জামার বেলুনের নিচে তার ভুঁড়ি ঢাকা পড়ে গেল। একজন পেয়াদা সেলাম জানালে বোঝা গেল লোকটি রাজা-বাদশার একজন।
১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
নীল রঙের মধ্যে
অনেক উপরে সিলিং ফ্যান লম্বা ঠ্যাং বেয়ে নেমে এসে নারকেল পাতার লম্বা ডানার মত আর্দ্রতাকে বাষ্পীভূত করছে। সে পাখার কাজ আপাতত প্রায় বিশ জন মানুষের ঘাম শুকানো। পুরোন আমলের দালান। ঠাসা বুনট। কর্মব্যস্ততা। নীল রঙের স্তূপীকৃত কাগজ। রংটা শাদা বা ফ্যাকাশে হলুদ নয় ভাগ্যিস । নীল রঙের মধ্যে আকাশ আছে। আর বেদনার চুপচাপ শরীর দিস্তে দিস্তে। যে এসব দেখছে সে একজন কবি-কবি লোক যার নীল রঙের কাগজকে মনে হয় নীল বেদনার পরিবার – অথচ মজা দেখো – এরা পরস্পর শরিক হলেও, কেউ কাউকে চেনে না।
বেদনা আর বেদনার ঘনঘটা নিয়ে একজন স্মার্ট চেক শার্ট, চকলেট রঙের প্যান্ট আর ভারি জুতো পরে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছেন। মেদহীন শরীরে শারীরিক যত্নের ছাপে তাঁর বয়স ঠিক ঠাহর হয় না। কথা বলতে থাকলে খেয়াল হয়, দীর্ঘ দিনের বেদনারা, যারা আদর-যত্ন পায়নি তেমন তার কাছে, তারা কপাল আর চোখের নিচে হঠাৎ প্রকট হয়ে ওঠে ভূমিকম্পের ফাটলের মত। তর্জনী তোলার নির্মম রেখা বুঝিয়ে দেয় বেদনারা কেন তুষ্ট হয়ে আশীর্বাদ না করে রুষ্ট হয়ে, ফেটে চৌচির হয়ে গেল। বুঝি সে ফাটা শুকনো চৌচির মাটিতে সীতা তলিয়ে যেতে পারেন। যান, হয়ত।
সেসবের দিকে খেয়াল না ক’রেও দেখা যায়, কলা, আপেল, আঙু্‌র, বেদানা, নাসপাতি, খেজুর, বাদাম ইত্যাদি নানা দেশের ফলের দোকানীরা ঈষৎ লাভে সততার সঙ্গে বেচাকেনা করছে। মশমশে জুতো, চশমা, ঘামের মধ্যে কলা কিনে সকলকে বিতরণ করতে লেগেছে এতক্ষণে কবি কবি লোকটা। কেউ কেউ সেই কলা ছুঁতে চায় না। দেশী কলায় এসিড হয় না, এই মর্মে ফিসফিস করে সে আকাশে তাকালে দেখা যায় নক্সিকাথার মত নরম সুগন্ধী পাতা আছে আকাশ ঢেকে। সূর্যবান্ধব পরিবেশে পাতাদের সিলিং ফ্যান লাগে না। উপঢৌকনের মত পাতারা এখন কথা বলছে একটা একপায়ে লাফিয়ে চলা শাদা-কালো দোয়েলের সঙ্গে। অথবা সেরকম হয়ত ভাবতে চায় লোকটা। মাথায় তার নারকেল তেলের গন্ধ ভুরভুর করে। একটা আখের খেতের মত ঝুরঝুর মিষ্টি গন্ধের স্মৃতি জেগে ওঠে। সকাল বেলার আলোয় শিশুদেরও সেই গন্ধ থাকে গালে আর কপালে।
অম্লজান পাঠানো এই বন্ধুর কথা ভুলিনি, যেন ভাবছে নাচিয়ে দোয়েল, গাছের পাতার সবুজ ঝালরে মাখামাখি ডালের কাঁধে চড়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে যেতে যেতে।
এসব শেষ হলে হুড়োহুড়ি করে ভাত, মাছ, কাঁচকলার ঝোল, বেগুনের তেলতেলে ঝাল আর পাতলা ডাল খেয়ে নিচ্ছে তারা, যারা বেদনার নীল দিস্তে দিস্তে কাগজের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করে ফি-রোজ। একটা মাছ কম পড়লে তারা সেটা ভাগাভাগি করে খেয়ে নেয়। কে কম নেবে, এই নিয়ে তাদের প্রতিযোগিতা। রক্তের সম্পর্ক নেই, তবুও।
১৯ মার্চ ২০১৮
কবিতাও সেই রকম
একজন লেখক আছেন যিনি কবিতা ভালবাসেন না। কবিতার কথা বলতে গেলে যিনি অস্বস্তিতে পড়ে যান। নাবাল মাটির ঘাসের মতো ভিজে নরম মরণহীন সব কবিতা তিনি প্রকাশ করতে লজ্জা পান। নিজের কাছেও। ছোটকালে নাকি লিখতেন সেই সব। আজ আবার লেখেন। শুধু নিজের জন্য। লাজুক পাতার মতো নিরাভরণ নিজস্ব নির্জনতা সেই সব। কাউকে দেখানো যায় না।
শৈশব কৈশোর আর যৌবনের বাইরে এক দিন সে ফিরে এসে দেখে, কাব্যের মতো অলৌকিক আর আপন, তাদের দুই শ বছর পুরোন বারবাড়ি এখন এঁদো সুনীল ধ্বংসস্তুপ। ফাঁকে অশ্বত্থের চারা, দেওয়ালের ফাটলে লোনা গন্ধের ইঁদুরেরা বাসা বেঁধেছে। বাদুড়, সাপ, গিরগিটি আর বেড়াল ভালোবাসে সেই ঠিকানাহীনতা। গোছগাছহীন এক মধ্যবয়েসের মতো। হারিয়ে যাওয়া কোনো খাতা, সব আগুনে পুড়ে গেলে, যা সে ঠিক আগলে রাখত এক দিন, সেই খাতা এখন ঘুনের মাংস। আরেক দিন অটো থেকে নেমে জানা যায় সেই বীলিয়মান, দুর্জয় স্তূপও আর নেই। ভূমিদস্যুর বুল ডোজারের কাছে পরাস্ত হয়ে গেছে। এখন এখানে পানের বরজ। অনন্ত প্রান্তর, দোহারা ভূমির অবয়ব খোপ-কাটা। সেই পান বিক্রি হয়ে টাকা আসে।
কেউ কেউ শিয়রের কাছে মধু তুলসীপাতা রেখে দিয়েছে। সে দেখল রুপালি, সোনালি, মাছের চোখ। আঁশে স্রোতের সাহসী রেখা। সে দেখল নক্ষত্রের চোখ চূর্ণ হয়ে আলো ঝরে। পাহাড়ের শিঙের ডগায় মেঘ ঝোলে। পাখির ঠোঁটে খড়, বাসা বাধার মৃত্যুঞ্জয় আকাঙ্ক্ষারা।
মানুষ মরে গেলে সবখানে ছড়িয়ে যায়। মানুষের বেঁচে থাকার কবিতা- কাহিনিও সেই রকম।
৩০ এপ্রিল ২০১৮
‘চৈত্র সংক্রান্তি’
চারুকলার উদ্যান। অন্ধকার কালো জলে বেঙাচি দেখা যাচ্ছিল। জলের তলায় নয়, জলের ওপরে অম্লজানের অভাব। অন্যের গায়ের তাপ পাওয়া যাচ্ছে খুব কাছ থেকেই। তৈরি হচ্ছে যে বিশালাকায় পুত্তলিকা তার বর্ণাঢ্য রঙিন শোভা ঢেকে গেছে এই তাপে আর প্রশ্বাসের দূষণে। তবে তার মধ্যেই কারা যেন ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে কুশল বিনিময় করেই আয়ত আনন্দে ছবি তুলছে। মুখোশের মুখেও ভীষণ খুশি। আসল কথা প্রেম। প্রেম আছে নিশ্চয়ই এই চত্বরে। প্রেমের আশ্বাসও আছে। তাই। বৃতির মতন এক অদৃশ্য অভিন্ন হৃদয়ের চারপাশে যেন বসে আছে কিছু ছেলেমেয়ে। কী গান করছে তারা? দেশের সব চেয়ে জনবহুল উৎসবের মত এই উৎসবেও টাকা-পয়সার বাহুল্য থাকা না-থাকার সঙ্গে অসঙ্গতিহীন এই ফ্যাক্ট – যে পাব্লিক টয়লেট একটাই এবং তার অবস্থা বিষণ্ণ। এই বিষণ্ণতা কি এতোই ছোট যে কোটি কোটি মানুষের বিষণ্ণতা গুণ করেও কিছু দাঁড়ায় না ব’লে কিছু পালটায় না? সারা রাত ধরে গান, রঙ আর বেঁচে থাকার প্রগাঢ় কিছু স্মৃতি তৈরি হবে এখানে – এই বাগানে, এই ভাপ-ছাড়া মাঠে। হচ্ছে। কল্যাণ হোক এই দারুণ সহিষ্ণুতার। এই বহুমুখী আবেগের, যা কলের মত ঝরে পড়ছে চেষ্টা না করতেই। আনন্দ পাবার জন্য মানুষ সব রঙের পাত্রে হাত ডুবিয়ে রেখেছে এখানে। হাওয়াই মিঠাই চেয়ে, না-পাওয়া শিশুর এক ফোঁটা আপসোস মুছিয়ে দিচ্ছে এক প্রস্থ আদুল-গা বাতাস।
১৩ এপ্রিল ২০১৮
লেখক পরিচিতি
কবি। গল্পকার। প্রবন্ধকার। অনুবাদক।

আনন্দময়ী মজুমদারের শৈশব কেটেছে স্বদেশে ও আফ্রিকায়। 
পরিসংখ্যানে পি.এইচ.ডি. করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। অধ্যাপনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সতেরো বছর বয়েসে তাঁর প্রথম অনুবাদ পাবলো নেরুদার স্মৃতিকথা হাসান আজিজুল হক সম্পাদিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রাকৃত-তে প্রকাশিত হয়। সাহিত্য, গান, অনুবাদ, শিক্ষকতা ও গবেষণা তাঁর কাজের ক্ষেত্র। 
অনুবাদ করেছেন জুলিয়াস ফুচিকের সূর্যোদয়ের গান, ডেভিড গেস্টের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ, পাবলো নেরুদার স্মৃতিকথা এবং ভালোবাসার শত সনেট, ডেভিড হোয়াইটের ঘরে ফেরার গান ও অন্যান্য কবিতা, ব্রেনে ব্রাউনের আমিই সেই অরণ্য: আপন স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজ আর একলা দাঁড়ানোর সাহস, ক্যারল ম্যাকক্লাউডের তুমি কি আজ বালতি ভরেছ?  রজার হারগ্রিভসের ছোট্ট মিঠি রোদ্দুর, ছোট্ট মেয়ে টিপটপ, ছোট্ট মেয়ে তম্বিতম্বা, তিক নাত হানের ছোটোরা যা জানতে চায়, অঁতোয়ান দ্য স্যাঁৎ-একজ্যুপেরির ছোট্ট রাজপুত্র। এই বইগুলো প্রকাশিত হয়েছে। 
আর এক বালতি সুখ নিয়ে বেড়ে ওঠা: আরো খুশি তৈরি করার তিনটি উপায়–এই বইটি প্রকাশিতব্য।

Gitbitan in English নামের একটি ব্লগে রুমেলা সেনগুপ্তের সাথে যৌথভাবে রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান-এর প্রায় এক হাজার গানের অনুবাদ করেছেন। তার নিজের লেখা কয়েকটি বই: মা-বেলার ডায়েরি, উন্মাদিনী আয়, ও হলদে কুটুম-পাখি ও লাল গুবরে পোকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

-+=