শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য’এর গল্প : যে শহরে কোনও মেয়ে ছিল না

প্রথমে বুঝেছিল দাঁড়কাকেরা, কারণ অনেক উঁচু থেকেও ওদের চোখ মাটিতে গিঁথে থাকে, নোঙর ফেলার স্টাইলে, যদিও চিকন ও সুঠাম পাখার উড়াল তখন পশ্চিমগামী। বালিহাঁসের ঝাঁক থেকে একটা কমে যাওয়া, অথবা হাওয়াতে মৃদু কম্পন যাতে ভারসাম্যের অভাব অনুভূত হয়, সংগে সংগে চোখ নিচে করলে পতনশীলতা ছোঁয়া যায়। জালের ফ্রেমে আটকে থাকা মালবাহী স্টিমারকে অতিক্রম করে দেখা যাবে বালিয়াড়িতে সরু চুলের মত রক্তের ধারা খোলা চোখ থেকে নেমে এসেছে, যা তখনো কম্পনময়, রবিনের ভাল লাগল। অনেকদিন তার হাতে বিশুদ্ধতার স্বাদ নেই।
‘আ ফাইন ক্রিচার ! কী করবে বলো এটাকে নিয়ে। রোস্ট না ফ্রাই? প্রিমিটিভ একটা টাচ থাকবে কিন্তু।’
আরব সাগরের লোনা বাতাস নীলকণ্ঠ চাকীর গলায় চিকচিকে ঘামের লবণপ্রলেপ দিচ্ছে। বালিয়াড়িতে নৌকা চিত হয়ে পড়ে আছে, কিন্তু নোঙর অদৃশ্য। বহুদূরের নারকোল পাতায় ছাওয়া ঝুপড়িগুলো এখন ধোঁয়া ধোঁয়া, তার ওপারে সন্ধ্যের বাজার ধীরে আড়মোড়া ভাংছে, এরপর টুপটাপ জোনাকির মত হোমস্টে-র আলোরা জ্বলে উঠবে। প্রেতের মত এই বালিয়াড়ি আর ঝাউবনের সিঁথির ভেতর এফোঁড় ওফোঁড় করে এগিয়ে গেলে সীমান্ত পর্যন্ত নাকি চলে যাওয়া সম্ভব, আইজ্যাক বলছিল কাল। নীলকণ্ঠ দেখল রবিনের নিঃশ্বাস পড়ছে ঘনঘন আর নাকের ডগা থেকে একটা লালচে ভাব ছড়িয়ে যাচ্ছে ঘাড় বরাবর, ফর্সা বলেই শুধু না উপরন্তু ব্লাড প্রেশারও বরাবরের বেশি, ডানপাশের ঝাউগাছের গোড়ায় আইজ্যাক মদ খেয়ে পা ছড়িয়ে চিতপটাং ঘুমোচ্ছে হাঁটুর ওপর মুণ্ডু তুলে, এমনকি বন্দুকের আওয়াজেও নির্বিকার, তখন নীলকণ্ঠের চোখে পড়ল ক্যাচম্যাচ করে নামতে থাকা দাঁড়কাকের দল, আজ এই নিয়ে তিনবার হল। ‘আমার পরিবারে পাখির মাংস খাওয়া নিষেধ, কখনো চিকেন খেতে দেখেছ?’
‘এসব ছাড়ো তো ! রামানার বেয়ারাদের দেখলে? কাফ্রিদের মত কালো। ওদের উঠোনে আজ কান্ট্রি বাজাবে, লোকাল একটা ব্যান্ড, আমাকে জানাল। ওয়াইনের সংগে হাঁসের রোস্ট, ধোঁয়া উড়ছে।’ চকচকিয়ে উঠল রবিনের ঠোঁট, নীলকণ্ঠ দেখল হাঁসের খোলা চোখ ধীরে ধীরে অস্বচ্ছ নীল হয়ে উঠছে এবং মাথার ওপর শেষকৃত্যের সময়কার পূর্বপুরুষের দলের মত কুণ্ডলী পাকানো কাকের দল ছাতামাথা করেছে, এ নিজন কাঠপালার অন্দর থেকে এবার বেরতে হবে, কিন্তু রবিন বলেই চলেছে, ‘সার্ডিন ভেজে দিতে বলব না হয় দুটো… কিন্তু কারিমিন দিয়ে ওদের যে স্পেশাল প্রেপারেশনটা হয়, ডাক ছাড়া খোলে না। একবার স্বাদ নিয়ে দেখো, নলীতে কামড় বসিয়ে সুত করে মজ্জাটুকু চুষে নেবার পর আর ভুলতে পারবে না চাকী !’
রবিন কোথাকার লোক নীলকণ্ঠ জানে না, তবে ওর নীল চোখ, পেশল চোয়াল আর হালকা রঙের এলোমেলো দাড়ি সাগরপাড়ের দুর্দমনীয় কোনও নির্বেদকে মনে পড়ায়, যার সময় কয়েক শতাব্দী আগে শেষ হয়ে গেলেও তলানি হিসেবে থেকে গেছে রক্তের ময়লা অবশেষ। তবে করিৎকর্মা লোক, এখানে কোম্পানির কাজে এসেও কানেকশন বার করে ঠিকই পাখি শিকারের অনুমতিপত্র জোগাড় করে ফেলেছে দুইদিনে। এমনকি কোন বালিয়াড়িতে গেলে মিলবে, সেসবও জানে। এই রবিন যখন দিনেরবেলায় দুই পা ফাঁক করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ইতিউতি নির্দেশ দেয় আইজ্যাককে আর নীলকণ্ঠকে শোনায়, ঠিক কোথা থেকে নতুন বন্দরের ভিত খোঁড়া ও শুরু করতে চাইছে, ধু ধু ঝাউবন আর নিকনো নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে ওর শরীরটাকে নিভাঁজ তলোয়ারের মত ক্রান্তদর্শী লাগে, যুগ যুগ আগে মহা-পুরুষদের দিগ্বিজয়ের কৃপাণ, এখনও। ফ্যাকাসে চুল হাওয়ায় ওড়ে কিন্তু রে-ব্যানের কাচে কিছুতেই সমুদ্রের ছিটে লাগাতে দিল না। নীলকণ্ঠকে হাসতে হাসতে ও বলে, ‘আই অ্যাম আ ড্রিমার, বাট আই অ্যাম নট দ্য ওনলি ওয়ান। তুমিও হও।’
‘আমার ভয় করে।’
‘স্টুপিড ! ভাবার সাহস চাই চাকী, আর কতদিন বাজেট সেকশনে মাথা গুঁজে পড়ে থাকবে ! এই টাউনের ভোল পালটে দেবে কোম্পানি, আর তুমি সেটাকে ভাবতে ভয় পাচ্ছ?’
‘ফেরা যাক এবার। আইজ্যাক ইডিয়টটা সেই দুপুর থেকে ঘুমিয়ে যাচ্ছে। লাথি মেরে ওকে তোলো চাকী, ও না থাকলে ফেরার পথ খুঁজে পাব না। অনেকটা ভেতরে ঢুকে গেছি।’
ফেরবার রাস্তায় আইজ্যাক ঘুম ঘুম চোখে চেনাচ্ছিল পরিত্যক্ত দুর্গ, মিউজিয়াম, মশলার বণিকদের বাড়ি, তখন সূর্যাস্তের আলো ভাল লাগল, তাই ছায়া ঘেঁসে সরে এল নীলকণ্ঠ। আর আইজ্যাক খালি স্যার স্যার বলে হাত কচলায়, ওকে চাকরি জুটিয়ে দেবে বলেছে রবিন, যখন এ শহরে বন্দর গড়বার কাজ শুরু হবে। দুই পায়ের ফাঁকে ল্যাজ গুটিয়ে মোদো হাসিতে আইজ্যাকের মুখ তেলতেলে হয়ে উঠল, ‘যা চাইবেন স্যার , শুধু একবার হাঁক দেবেন। জোগাড় হয়ে যাবে। রামানা সাহেবের হোমস্টে ভালই বেছেছেন। সেরা ঘরদুটো দিয়েছে আপনাদের। ওদের উঠোনে যে কাঁঠালগাছটা দেখছেন, একশ বছরের কাছাকাছি বয়েস। আমার গ্র্যান্ডড্যাডও দেখেছে ছোটবেলায়। ওদের বেয়ারাদের আফ্রিকা থেকে ধরে আনে। নাকি জিভ কেটে দেয়, তাই কথা বলতে পারে না। কিন্তু আপনি হুকুম দিলে তামিল করে দেবে এক মিনিটে। আর আমি তো রইলামই। কাল সার্ভের দিন যেহেতু, ভোর থেকে সংগে থাকব স্যার, আপনারা চাইলে দরজার সামনে আজ রাত্রে জিরিয়ে নেব না হয়, পাপোষের ওপর। তিনটে হাঁস মারলেন নাকি? বাহ, আপনাদের বরাত ভাল। শালারা চালু আছে, সহজে ধরা দিতে চায় না।’
‘যা বলব সব মিলবে?’
‘বলেই দেখুন না !’
‘মেয়েমানুষ মিলবে?’ কুতকুতে চোখে খিকিয়ে হাসল রবিন।
আইজ্যাক থমকে গেল। মাথা নিচু করে কয়েক পা হেঁটে গিয়ে বলল, ‘না স্যার। ওটা মিলবে না। এই শহরে কোনও মেয়ে নেই।’
‘নেই মানে? এখানে কেউ বিয়েশাদি করেনা নাকি?’
‘সে করবে না কেন ! আমিই তো করেছি। কিন্তু বউ রেখে এসেছি দেশগাঁয়ে। এখানে মেয়েরা থাকে না স্যার, অনেকদিনের ব্যাপার আর কী !’
‘কেন থাকেনা?’
‘তা তো বলা যাবে না ! কিন্তু অনেকদিন হল, সেই শেষ কলেরার সময় থেকেই, যে কজন থাকত তারা মরে গেল আর বাকিরা উধাও হয়ে গেল এদিক ওদিক। সেই থেকে আমরা শুধুই পুরুষেরা থাকি। আমরা দোকান চালাই, হোমস্টে চালাই, জাহাজ বানাই, মশলার কারখানায় কাজ করি, স্থানীয় ব্যাংকে চাকরি করি, রাত্রে এখানে ওখানে বসে মদ খাই, মারামারি করি, বমি করে পড়ে থাকি নর্দমার ধারে, রবিবার করে চার্চে যাই, মাছ ধরতে চলে যাই সমুদ্রের মধ্যিখানে, এই সব আমরা পুরুষরা মিলে করি।’
‘অদ্ভুত তো !’ বিড়বিড় করল নীলকণ্ঠ, সত্যিই কাল থেকে এসে একটাও মেয়ে দেখেনি তারা।
‘হেল উইথ ইওর ক্র্যাপ ! মিলবে, না মিলবে না?’
‘শহরের মধ্যে মিলবে না স্যার। একটু গা ঘেঁষে গ্রাম আছে একটা, তবে যাওয়া রিস্কি, ওখানে মিলবে। টাকা দিলেই পাওয়া যাবে।’
‘রিস্কি আবার কী ! যাব, টাকা ফেলব, পোষালে আসবে, না পোষালে আসবে না।’
‘আরে মারধরও তো করতে পারে লোকাল লোকজন !’ বলল নীলকণ্ঠ।
‘ওহ, এসবের ভয় আছে নাকি? কী রাবিশ জায়গায় এলাম চাকী ? একটা মেয়েছেলে মিলবে না? আমার লেবাররা এতদিন কাজ করবে কীভাবে? যুদ্ধটা তো জিততে হবে !’
‘না না ওসব ভাববেন না স্যার। মারধোর ওদের কেউ করবে না। তবে, বিপদ তো থাকেই কতরকম। আমরা কেউ ওদিকটায় যাই না।’
‘মারধর না করলে আর কীসের ঝুঁকি ! আজ রাত্রে নিয়ে চলো তাহলে।’
সন্ধ্যের অবসিত আলোতে আইজ্যাকের বাদামী বলিরেখাময় মুখ প্রাচীন মমির মত মনে হচ্ছিল, ‘কী দরকার স্যার ! তার থেকে পাখি মেরেছেন, রোস্ট করে খান। মাছ আছে অনেক, বিয়ার দিয়ে খান। কাল থেকে খোঁড়াখুঁড়ি চলবে, অনেক কাজ আছে তো !’
‘কী ব্যাপার বলো তো, এড়িয়ে যাচ্ছ কেন? তোমার ফ্যামিলি ওখানে থাকে?’ জিভ দিয়ে ঠোঁটের ওপর বুলিয়ে নিল রবিন।
মরা মাছের চোখে আইজ্যাক দূরের নারকোলপাতায় ছাওয়া শ্যাকগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল, যেখানে থরে থরে সাজানো রয়েছে ট্রলার থেকে তুলে আনা সার্ডিন চিংড়ি শিয়ার আর পমফ্রেটের রূপোলী শরীর। এরপর তাদের গ্রিলে সেঁকা হবে, নরম মাংস ঝলসে উঠবে রগরগে আগুনে, শিরা তন্ত্রীর ভেতর চারিয়ে যাবে স্মোকি ফ্লেভার, তারপর কলাপাতার ওপর পেঁয়াজ লেটুস আর লংকা সহযোগে টুরিস্টদের চকচকে চোখের সামনে চলে আসবে, লোভরসে ভরে উঠবে তাদের জিভ। ‘না, আমার কেউ ওখানে নেই। আমাদের কেউ থাকে না।’
‘তাহলে ফালতু কথায় সময় নষ্ট করিও না। আমাদের ভেড়ার পাল ভেবেছ নাকি? আজ রাত্রেই ব্যবস্থা করো। দুজনের দুটো। টাকাপয়সা যা লাগবে নিয়ে যেও।’
‘আমার লাগবে না।’ নীলকণ্ঠ ঢোঁক গিলল।
‘এসব ভীতুপনা ছাড়ো চাকী !’ ধমক দিল রবিন, ‘এখানে আমি তোমার বস। মুখ দেখে বুঝেছি, ইচ্ছে আছে ষোল আনা। কেন বেকার সাধু সাজছ?’
‘আরেকবার ভেবে নিন স্যার। ওখানে আমরা কিন্তু কেউ যাই না।’
‘কেন যাওনা বলবে একবার? এরকম রহস্য করছ কেন?’
‘রহস্যের কিছু নেই স্যার। আপনারা গেলে যাবেন। আমি পৌঁছে দেব। আমরা যাই না কারণ নিষেধ আছে। বাইরের টুরিস্টপার্টিকে তো আর না বলতে পারি না !’ আইজ্যাকের তামাটে পেশিবহুল হাত থেকে তিনটে হাঁস ঝুলছিল, তাদের চোখের গোড়ায় কালচে রক্তের ছিটে লেগেছে। একটি খাঁড়ি পেরিয়ে এল তারা, যা দিয়ে কখনো এককালে যাতায়াত করত জাহাজ, আর এখন খাঁড়িপথ শুকিয়ে গিয়েছে। রাস্তার ধারের একটা প্রাচীন বাড়িতে ঝিনুকের খোলার রকমারি সামগ্রীর দোকান। তার ছাদে ওমেগার মত দেখতে আর্চ, মরচে পড়া, ঝুল নেমে গিয়েছে, এর ওপর টেলিস্কোপ বসালে তারাখসা দেখতে পাওয়া যায়। স্কাইলাইট চুইয়ে আসা আবছা আলোর ভেতর দোকানের ভেতরটা রহস্যময় লাগছিল, অনেক দড়িদড়া ঝুলছে, যেন এবার টাঙিয়ে রাখা হবে আদিম জাহাজ। জানালার কবাটে বসানো নারকোল তেলের দীপ, মাঝে মাঝে আলতো হাওয়ায় কেঁপে ওঠা তাদের আলোতে গোটা ঘর দুলে উঠছে আর মনে হচ্ছে একটা টোকা দিলেই চুরচুর করে ভেঙে পড়বে স্বপ্ন ও স্মৃতি, যাবতীয়। রবিন ঢুকেছিল একটা কাঁটালাগানো বেল্ট দেখে পছন্দ হয়েছিল বলে। বাইরে বেরিয়ে বলল, ‘এই বাড়িটা ভাঙা পড়বে। পজিশনের মধ্যে পড়ছে।’
‘কয়েকশো বছর আগে এক ইহুদি মশলার বণিকের বাড়ি ছিল। এখন নায়ার কমিউনিটির একজন কিনে নিয়ে দোকান দিয়েছে।’
কাঁধ ঝাঁকিয়ে এগিয়ে গেল রবিন, তার পেছন পেছন আইজ্যাক ও নীলকণ্ঠ রাস্তা মাড়াচ্ছিল। পাথরের রাস্তার ওপর রবিনের পায়ের শব্দ শোনা গেল না, কিন্তু টপ টপ করে রক্তের ফোঁটা পড়েই যাচ্ছিল। যাত্রাপথে নীরবে তাদের দেখে যাচ্ছিল বুড়ো জোয়ান শিশুদের দল, যাদের চোখ মরা মাছের মত আর চলনে নিষ্কম্প্র লাইটহাউসের অপেক্ষা। সকলেই তাদের চিনে গিয়েছে, হাওয়ায় জেনেছে একটি বন্দরের সুসংবাদ, কিন্তু এগিয়ে আসেনি সম্ভাষণে। রবিন হাসতে হাসতেই রেগে উঠল, ‘গডড্যামড টাউন। এখানে এসে জোশী কী করে মিসিং হয়ে যায়, আমি বুঝে পাই না চাকী ! এইটুকু তো আয়তন। ইচ্ছে করলেই হাতের মুঠো পাকিয়ে তার ভেতর লুকিয়ে ফেলা যায়, তাই না? জোশী ওয়াজ আ লুজার ! দেখো গিয়ে, কোন ছুকরিকে ফাঁসিয়ে সৌদি ফৌদি পালিয়েছে।’
ছয় মাস আগে কোম্পানির সার্ভেয়র শংকর জোশী এখানে এসে নিরুদ্দেশ না হয়ে গেলে যে বন্দরের ব্যাপারটা আরও তাড়াতাড়ি হত, নীলকণ্ঠ তা জানে। রবিন অনেকবার মাতাল হয়ে জোশীর উদ্দেশ্যে খিস্তি করেছে ব্লাডি বাগার ফাগার বলে, কারণ মিসিং ডায়েরি হলেও জোশীর বউয়ের বদ্ধ বিশ্বাস জোশী তার গুজরাটি গার্লফ্রেন্ডটিকে নিয়ে ভেগেছে, ক্ষয়াটে চেহারার যে ফর্সা মেয়েটিকে ধাওয়া করে অফিস পর্যন্ত চলে এসে তার বউ বিস্তর সিনক্রিয়েট করেছিল একবার। এখন ছয় ফুট দুই ইঞ্চির রবিন তার পেটানো চেহারা নিয়ে হালকা ঝুঁকে যখন চোয়াল শক্ত করছে, নীলকণ্ঠর মনে পড়ল, হোয়াটসআপে পাঠানো জোশীর শেষ ছবি, পরিত্যক্ত জাহাজঘাটায় কোমরে দুই হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে, মাথার ওপর ঠেলে তোলা রোদচশমা, পেছনের আকাশে উড়ছে অসংখ্য দাঁড়কাক, ডানপাশে বন্ধ শ্যাক, তার নাল্লিকেট্টুর দরজায় আগাছা জন্মেছে, ওপর থেকে নেমে আসা দড়িদড়ার একটা আভাস মিলছে ছবির প্রান্তে। আস্ত শহরে কোনও মেয়ে নেই, কেমনভাবে সম্ভব? সংস্কার আছে নাকি? নৈশফুর্তির গ্রাম পেতে গেলে কতটা রাস্তা যে হাঁটতে হবে, নীলকণ্ঠ ভেবে পেল না।
ক্রমে রাত গড়াল, রামানার হোমস্টের উঠোনের কাঁঠালগাছটির ছায়া দীর্ঘ ছড়িয়ে পড়ল গোল হয়ে বসে থাকা খালাসিদের শরীরে এবং কাঠের বেঞ্চে সারে সারে রাখা বিয়ারের বোতলগুলোর গায়ের হিমতাপ জলীয় ফোঁটা হয়ে নেমে যাচ্ছিল মাটির দিকে, মাছের আর্দ্রতা দেওয়ালের শ্যাওলায় ঘুমভাব চারিয়ে দিল, তখন আইজ্যাক এসে ডাক দিল তাদের, ‘চলুন স্যার, এবার যেতে হবে’, এবং প্যাকড পাখির রোস্ট আর মদের বোতল হাতে ঝুলিয়ে তারা রওনা হল গ্রামটির উদ্দেশ্যে। গাড়িতে করে আধ ঘণ্টা মতন লাগবে, কিন্তু সাবধানে চালাতে হবে কারণ গ্রামে এখনো ইলেক্ট্রিসিটি আসেনি, তাই অন্ধকার রাস্তা। দুটো মেয়েকে বাছাই করা হয়েছে, আইজ্যাক গ্যারান্টি দিয়েছে তাদের রাং দাবনা ও নিতম্বের নিখুঁত গড়ন সম্বন্ধে, এবং পরিচিত সাবধানবাণী আরেকবার উল্লেখ করতে ভোলেনি, ‘ভেবে নিন একবার’, যাতে কর্ণপাত করেনি দুজন। রবিন শুধু বলে দিয়েছে কাল ভোর ছয়টার মধ্যে যেন আইজ্যাক এসে নিয়ে যায় কারণ কাজ শুরু হবে।
অন্ধকার গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে কুপি জ্বলছে মিটমিট করে। ছোট ছোট নারকেলপাতায় ছাওয়া ঘর, যাদের সামনে দাওয়া, দেখলে একঝলক বীরভূমের সাঁওতাল গ্রাম মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়, এমনকি দেওয়ালে আঁকা আলপনাও চোখে পড়ল আবছা। রাস্তা শেষের মুখে হাঁ চোয়ালে দাঁড়িয়ে একটা পত্রহীন গাছ, দুদিকে দুটো ডাল হাড়িকাঠের মত উঠে গেছে যাকে আবছা আলোর আকাশের গায়েও অভ্রান্ত চেনা যেতে পারে। একটা পরিত্যক্ত চুল্লির শুকনো ঠোঁট তাদের যাত্রাপথ পেরিয়ে গেল। প্রতিটি ঘরের সামনে নারীপুরুষ চিত্রার্পিত তাদের দেখছে, আর হেঁটে যেতে একটু অস্বস্তি লাগছিল দুজনের। সামনে আইজ্যাক লণ্ঠন দুলিয়ে নীরবে হাঁটছে। শেষপ্রান্তে এসে একটা কুঁড়েঘরে ধাক্কা দিল। ‘ভেতরে যান। দুটো ঘর আছে। সব ব্যবস্থা পাবেন।’
‘তুমি?’
‘আমি ভেতরে যাব না স্যার। বললাম না, নিষেধ আছে ! আমার এটুকুই যাত্রা ছিল।’
ভেতরে ঢুকে মিটমিটে ল্যাম্পের আলোতেও চোখ লেগে গেল দুজনের। সুন্দরী দুটো মেয়ে, একজন খাটে আর একজন মাটিতে বসে। দুজনেই স্কার্ট ব্লাউজ পরা। শরীরের গড়ন দেখলে গিটারের কথা মনে পড়ে। গায়ের রঙ অন্ধকারে বোঝা না গেলেও জলপাই হবার সম্ভাবনা সর্বাধিক। ঈষৎ পুরু ঠোঁট, ভারী উরু, একজনের স্তনাভাস কিছুটা অপুষ্টতার ইংগিত হয়ত দেয়, কিন্তু সেটুকুকে অনায়াসেই ক্ষমা করা চলে। আধখোলা মুখে দুজনেই তাকিয়ে আছে, চকচকে চোখের মণিতে সাদাটে ভাবের আধিক্য রবিনের চোখে লাগল। দুম করে কথা আসছিল না, তা ছাড়াও বুঝছিল না তার ভাষা এরা বুঝবে কী না, সে নীলকণ্ঠের দিকে ফিরল, কিছুটা অস্বস্তিতেই, কারণ ঘরের দরজা বন্ধ করে আইজ্যাক চলে গিয়েছে, ‘ইওর টার্ন। তুমি আগে বেছে নাও।’
‘এখনই ঢুকে যাবে নাকি? তাহলে মদ আর খাবারগুলোর কী হবে?’
‘ভাগাভাগি করে নেওয়া যাক । ফালতু সময় নষ্ট করে লাভ কী !’ কথাগুলো নিজেদের মধ্যে বলছিল, মেয়েদুটোকে অগ্রাহ্য করেই, যারা সেভাবেই অপেক্ষমাণ, হয়ত এদের ভাষা বুঝছেও না, এবং রবিন অলসভাবে কাঁধ ঝাঁকাল, ‘খাটের মহিলাকে নাও বরং। স্ট্রাকচারটা তোমার টাইপ মনে হচ্ছে।’
পাশের ঘরের অন্ধকারের মধ্যে ভাল করে দেখতে পাচ্ছিল না, হাতড়ে হাতড়ে পাখির রোস্ট একটা প্যাকেটে করে এগিয়ে দিল, সংগে ওয়াইনের বোতল আর পাউরুটি। মেয়েটা আবছা হাসল, ঝিকিয়ে উঠল সাদা দাঁতের সারি। অল্প অল্প করে পাউরুটি ভেঙে চিবোচ্ছিল, নীলকণ্ঠ তখন জামা ছাড়ছে, মেয়েটার হঠাৎ কী মনে হতে নীলকণ্ঠর খোলা কোমর ধরে ঝটকায় ঘুরিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল, একহাত দিয়ে চুলের মুঠি ধরে সামনে এগিয়ে এনে দুই ঠোঁটকে আশ্লেষে কামড়ে ধরল, আর জিভ বাড়িয়ে নীলকণ্ঠর মুখের ভেতর পুরে দিল মদে ভেজানো রুটির টুকরো।
পরদিন ভোরবেলা তার ঘুম ভাঙল দাঁড়কাকের কর্কশ চিৎকারে, এবং একফালি জানালা দিয়ে চোখে পড়ল কালো ডানার ঝাপটা। আবার রবিন কোনও হাঁস মারল কি না এখানে এসে, ভাবতে ভাবতে সে শূন্য শয্যা দেখল, চাদরের নিচে অনুভব করল রিক্ত শরীর, জানালা দিয়ে দূরে দেখা যায় স্থানীয় মন্দিরের ধ্বজা যাতে রক্তলাল, গতরাত্রির কোমল নিষাদের অবিভাজ্য খেলার পর ধ্বস্ত সকাল যে ক্লিন্নতা নিয়ে আসে, তাকে চাখতে চাখতে আরেকবার ঘুমিয়ে পড়তে চাইল নীলকণ্ঠ। তবু মাথার ওপর ঘুরছে অসংখ্য কাক, তাদের কুটির ঘিরে চিৎকার করছে, এবং কী ঘটেছে বোঝার জন্য দরজা খুলে পাশের শূন্য ঘর পেরিয়ে বাইরে এল।
অনেক লোক জমা হয়েছে বাইরে, তাদের মধ্যে আইজ্যাক, আর রবিন ঘরের চৌকাঠে বসে আছে, শূন্য চোখ তার, কিছুটা সাদাও, নীলকণ্ঠকে দেখেও ভাবান্তর হল না। অন্যরাও নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে, নীলকণ্ঠ দেখল অদূরে দুটো গাধা খুঁটিতে বেঁধে রাখা, নিরুদ্বেগে ঘাস চিবিয়ে যাচ্ছে। সকালের আলোয় গ্রাম কিছুটা স্পষ্ট হল, এবং দূরের ধানক্ষেতের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়া ভাঙা নারকোলগাছ দেখল নীলকণ্ঠ, মাথার ওপর কাকেরা ঘুরেই যাচ্ছে, সে রবিনকে ডাকল, কিন্তু সাড়া মিলল না। ভুরু কুঁচকে চারপাশের লোকজনকে কিছু বলতে গেল নীলকণ্ঠ, কী ভাষায় বলবে ভাবতে ভাবতে দেখল, সবার নাক চোখ মুখ পায়ের পাতায় লালচে দাগ, ফোলা ফোলা, দুই একজনের নাক যেন খুবলে খেয়ে নেওয়া হয়েছে, রস গড়াচ্ছে চাকা চাকা দাগগুলো থেকে, আর গতরাত্রের মেয়েদুজনকেও সে দেখল এবার, একজনের কনুইয়ের কাছে পাঁচটাকার কয়েনের মত লাল স্পট, মাংস উঠে গিয়ে রগরগ করছে, অন্যজনের গলা ছেয়ে গিয়েছে, দাগ চলে গিয়েছে পিঠ অবধি, একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল, গতরাত্রের মতই হাসল তাকে দেখে, তাদের চোখের মণির অত্যাধিক সাদা অংশটুকুর চকচকানি রূপোর টাকার মত লাগছিল, এবং নীলকণ্ঠ আস্তে আস্তে বসে পড়ল রবিনের গা ঘেঁসে। তার পেটের কাছে খালি অনুভূতি হল।
আইজ্যাক এগিয়ে এল, ‘আমি অনেকবার সাবধান করেছিলাম স্যার, আপনারা শুনলেন না। কী বলব বলুন !’
দুজনের কেউ উত্তর দিল না। একটু অপেক্ষা করে আইজ্যাক আবার বলল, ‘এই কারণেই আমাদের শহরে কোনও মেয়ে নেই। কলেরার সময়ে যে কয়েকজন বেঁচে ছিল, পেট চালাবার জন্য এখানে ওখানে শরীর বেচতে বাধ্য হয়, কারণ ততদিনে সবাই মরে গিয়ে দোকানপাট বন্ধ, টুরিস্ট আর আসে না, খাবার জোটে না। এক শহরের সাহেব খদ্দের এসেছিল এখানে বন্দর বানাতে, আপনাদেরই মত, সে কুষ্ঠরোগ বয়ে এনেছিল। তার থেকে মেয়েটা পায়। তাকে আর অন্য সব মেয়েদের এই গ্রামে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ততদিনে রোগ ছড়িয়ে গেছে আশেপাশের শহর গ্রামে, কারণ সেই মেয়েটার কাছে যারা আসত, ভালবাসা পেতে আসত, তাদের অনেকেই নিজেরাও নিজেদের মধ্যে ভালবাসাবাসিগুলো ছড়িয়ে দিয়েছিল। তাদের কারোর বউ ভালবাসা দিল অপর কাউকে, অথবা কোনও পুরুষ আরেক পুরুষকে ভালবেসে ফেলল, আর এভাবেই একটা একটা করে গ্রাম আর শহর নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। তাদের সবাইকে তাই এই গ্রামে নিয়ে এসে রাখা হল। এসব অনেকদিন আগের কথা, আর সেই থেকে আমরা শহরে কোনও মেয়েমানুষ রাখি না।’
নিরুত্তাপ বাতাসের ভেতর দিয়ে ভেসে আসছিল মন্ত্রের মত কথাগুলো, নীলকণ্ঠ আর রবিনের পায়ের নিচে শেকড় গজিয়ে ঢুকে গেছে মাটির অনেক নিচে। ‘আগে বলোনি কেন?’ অনেক কষ্টে ফ্যাসফ্যাসে গলাতে রবিন বলল।
‘কী করে বলতাম ! টুরিস্টদের ওপর বেঁচে আছে আমাদের শহর। এখানে কুষ্ঠরোগ এসেছিল, সে যত আগেই আসুক না কেন, সেটা জানলে ব্যবসার কী হত? সবাই তো না খেয়ে মরতাম, সেই কলেরার সময়কার মত।’
কাকেদের চিৎকার বেড়ে চলেছে, মাথার ওপর গোল হয়ে ঘুরছে তারা। নীলকণ্ঠর গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, কোনওরকমে বলল, ‘বাড়ি যাব’।
‘কোথায় যাবেন স্যার !’ হাসল আইজ্যাক, ‘এ বাজে ধরণের কুষ্ঠ। ফিরে গেলেও থাকতে পারবেন না, হাসপাতালে পাঠাবে বা অ্যাসাইলামে, কিন্তু সারবেন না। এর কোনও চিকিৎসা নেই। আর ফিরবেনই বা কীসে, শেপাশের সবাই জেনে গেছে আপনাদের ব্যাপারে, কোনও গাড়ি পাবেন না। দুই একজন তাও ফিরে গিয়েছিল জোর করে, হাঁটতে হাঁটতে শহরে ফিরেছিল, আবার তিন দিনের মধ্যে ফেরত এসেছিল কারণ কেউ তাদের গ্রহণ করেনি। এখান থেকে আর ফেরা যায় না স্যার। বরং এই গ্রামেই থেকে যান, মেয়েদুটোকে বিয়ে করে নিন। যে কটা দিন আছেন, একটু শান্তিতে থাকবেন। ইস্টারে এখানে নাচাগানা হয়, যাত্রাপার্টি বসায়, নিজেরাই অভিনয় করে, মাঝে মাঝে ফিস্ট হয় গোটা গ্রাম জুড়ে, খারাপ লাগবে না।’
রবিনের গলা দিয়ে গ্যাঁ গ্যাঁ করে আওয়াজ বেরল, কিছু বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু বিকৃত হাওয়া ঢেকে দিল স্বর। ‘তাহলে পোর্টের কী হবে?’ নীলকণ্ঠ ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করল।
‘কতজনেই তো এলেন, আপনাদের মত। হবে হয়ত কখনো, অন্য কোনও সময়ে। যখন কুষ্ঠরুগীর এই গ্রাম হাওয়াতে মিলিয়ে যাবে, পৃথিবী ভুলে যাবে আমাদের কাহিনী, তখন বোধ করি একটা সোনালী রঙের বন্দর আমাদের শহরে গড়ে উঠবে, হাওয়াতে পিঠ মেলে শুয়ে থাকবে মেয়েদের প্রতীক্ষায়। সেদিন মেয়েরাও নতুন করে আবার শহরে এসে থাকবে।’
এবার এগিয়ে এল একটা বুড়ো। ছেঁড়া আলখাল্লা পরা, মাথায় কাঁটাঝোপ দিয়ে বানানো মুকুট জাতীয় কিছু, তার এলোমেলো দাড়ি হাওয়াতে উড়ছে, গলে গিয়েছে একটা চোখ। সে এসে রবিন আর নীলকণ্ঠের সারা মুখে আঙুল বোলাল, শিউরে উঠল দুজন।
‘ভয় পাবেন না। গ্রামের পুরোহিত রিচুয়াল করছে। আমি এলাম স্যার, কারণ এখানে আমার আর কিছু কাজ নেই। আপনাদের এখন নিয়ে যাওয়া হবে সমুদ্রের ধারে। স্নান করিয়ে সারা শরীরে ঘি আর মশলা মাখানো হবে, তারপর ঘরের ভেতর দরজা বন্ধ করে রেখে দেবে তিনদিন। তিনদিন পরে আপনারা যখন বেরবেন, উৎসব শুরু হবে গ্রামে। মুরগি কাটা হবে, নাচগান চলবে, নতুন বাসিন্দাকে এভাবেই এরা বরণ করে নেয়।’
শরীরের ওপর কোনও দখল ছিল না, দুজনকে টেনে তুলল অন্যরা, গাধাদুটোকে খুঁটি ছাড়িয়ে নিয়ে এসে তাদের পিঠে তোলা হল, আর গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হল মৃত হাঁস, যাদের শরীর ঠাণ্ডা ছিল আর চোখ থেকে গড়িয়ে যাচ্ছিল আঁশগন্ধী রক্ত। গতকালকের হাঁসদের তো তারা খেয়ে ফেলেছিল, তাহলে আজকেরগুলো তালিকায় নতুন কী না এ প্রশ্ন কারোর মনে আসেনি, কারণ দাঁড়কাকেদের চিৎকারে তখন ভেঙে যাচ্ছিল শান্ত স্থৈর্য, সমুদ্রের হিম হাওয়া কোনও ভোঁতা স্মৃতি বয়ে আনলনা, তবুও লোকজন হাসছিল, হাসতে হাসতেই তাদের চোখ থেকে ঝরে পড়ছিল জল, এ কান্না আনন্দের, গতরাত্রের দুটি মেয়েও সে হাসির অংশীদার ছিল, আর দুর্বোধ্য স্বরে মন্ত্র উচ্চারণ করছিল সবাই, যে ভাষা অকুষ্ঠ নাগরিক বুঝত না। ভিড়টা দুইভাগ হয়ে গেল, আর মধ্যিখানের রাস্তা দিয়ে গাধার পিঠে চাপিয়ে দুজনকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল সমুদ্রের দিকে, আর আইজ্যাক শহরের রাস্তায় মিলিয়ে গেল, তারা দেখল নিষ্পত্র গাছের নিচে বসে আছে গলিতমুখ লোলচর্ম একজন, যে চাইলেও আনন্দযাত্রায় সংগী হতে পারত না কারণ ততদিনে চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়েছে। অস্ফুটে ‘জোশী’ ধ্বনিটুকু রবিনের গলার ভেতর মিলিয়ে গেল, ততক্ষণে তাদের মাথার ওপর শুকনো ফুলের বৃষ্টি শুরু হয়েছে, যারা প্রবাহের মত শান্ত বাতাসে উড়ে উড়ে পড়ছিল পথ, গাছ ও কুটিরগুলোর গায়ে, আর রাজার মত, ত্রাতার বেশে ও সমর্পণের বিশুদ্ধতায় দুজনের যাত্রা শেষ হল বেলাভূমিতে এসে। শান্ত সমুদ্র দুইহাত বাড়িয়ে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল যেমন দিগ্বিজয়ী পুত্রের জন্য দ্বারপ্রান্তে সন্ধ্যাবেলা দাঁড়িয়ে থাকেন অকম্প্র বৃদ্ধা মা। সন্তানের বিক্ষত শরীর তিনি স্খালন করবেন, মার্জনা করবেন নিজের হাতে, তার পৌরুষ ঢেকে দেবেন চন্দনের কোমলতায়, স্নেহে ও করুণায়, দিনান্তের এটুকু চাওয়াই বাকি ছিল।
মাথার ওপর তখনও কাকের দল উড়ছিল, নাবিকের আশ্লেষে মাপছিল লোনা হাওয়ার শূন্যতা ও ভারসাম্য। নিয়মিত ও ধীর ছন্দে যে ঢেউগুলো বেলাভূমিতে আছড়ে পড়বার পর সাদা ফেনা উথলিয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল , সেগুলোকে গুণে যাচ্ছিল, একটার পর একটা। সবার আগে দাঁড়কাকেরা টের পায়। সবার আগে টের পায় দাঁড়কাকেরা…
———————————————————————
এই গল্পটি যুবশক্তি পত্রিকার ২০২১- শারদ সংখ্যাতে বেরিয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.